অধ্যায় ১ ॥ রেখাগুলি মুছে যাচ্ছে
সে-দিনের এই সব অতি অদ্ভুত ঘটনাবলীর বিশদ বিবরণ হয়তো কালের হস্তাবলেপনে একদিন মুছে যেতে পারে। তাই আমার স্মৃতি-পটে সেগুলি সুস্পষ্ট থাকতে থাকতে এখনই লিপিবদ্ধ করে রাখা আমার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য। আর সেই কাজটি করতে বসে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখছি যে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, প্রফেসর সামারলী, লর্ড জন রক্সটন এবং স্বয়ং আমি—‘হারানো পৃথিবী’-র আমাদের একই ছোট দলটি এই বিস্ময়কর পথটাও পার হয়েছিল।
কয়েক বছর আগে যখন আমি “ডেইলি গেজেট” পত্রিকায় আমাদের যুগান্তকারী দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ-কাহিনি লিখেছিলাম, তখন আমি ভাবতেও পারিনি যে তার চাইতেও অধিকতর বিস্ময়কর এমন একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমাকে শোনাতে হবে যেটা মানুষের ইতিহাসে দ্বিতীয়রহিত এবং ইতিহাসের পাতায় অনুচ্চ পর্বতমালার মধ্যে এক মহান গিরিশৃঙ্গ বলে গণ্য হবার যোগ্য। সেটা তো সর্বকালেরই এক পরমাশ্চর্য ঘটনা হয়েই থাকবে, কিন্তু এই অসাধারণ অধ্যায়টির সূচনাকালে যে পরিবেশের মধ্যে আমরা চারটি প্রাণী একত্র হয়েছিলাম সেটা কিন্তু রচিত হয়েছিল খুবই স্বাভাবিক এবং প্রকৃতপক্ষেই অনিবার্যভাবে। যে ঘটনাগুলির সূত্র ধরে এই পরিবেশটি গড়ে উঠেছিল তাকে আমার সাধ্যমতো সংক্ষেপে এবং পরিষ্কার করে বোঝাবার চেষ্টা করব, যদিও আমি ভাল করেই জানি যে এ রকম একটি বিষয়কে আমি যত বেশি বিস্তারিত ভাবে বলতে পারব, পাঠক তত বেশি আগ্রহের সঙ্গে সেটাকে গ্রহণ করবেন, কারণ সাধারণ মানুষের কৌতূহল আগে যতটা অতৃপ্ত ছিল এখনও তাই আছে।
এক সাতাশে অগাস্ট শুক্রবার—তারিখটি পৃথিবীর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে—আমার পত্রিকার আপিসে গিয়ে সংবাদ বিভাগের অধিকর্তা মি. ম্যাআর্ডল-এর কাছে তিন দিনের ছুটি চাইলাম। ভাল মানুষ বুড়ো স্কচ লোকটি প্রায় উঠে যাওয়া স্বল্প কিছু লালচে চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে বারকয়েক মাথা নাড়লেন এবং শেষ পর্যন্ত তার অনিচ্ছাকে ভাষায় প্রকাশ করলেন।
“মি. ম্যালোন, আমি ভাবছিলাম কয়েকটা দিনের জন্য আপনাকে দিয়ে একটা কাজ করিয়ে নেব। আমি ভাবছিলাম—এমন একটা গল্প পাওয়া গেছে যেটাকে একমাত্র আপনিই যথাযথভাবে গড়ে-পিটে তুলতে পারবেন।”
আমার হতাশাকে লুকোবার চেষ্টায় আমি বললাম, “এ বিষয়ে আমি দুঃখিত। অবশ্যি আপনি যদি আমাকে কাজে লাগাতে চান তাহলে তো ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমার কাজটা গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত। আমাকে যদি ছেড়ে দিতে পারেন-”
“দেখুন, আপনি ছাড়া পাবেন বলে তো মনে হয় না।
অবস্থাটা তেতো তো বটেই, কিন্তু আমাকে সোনামুখ করেই সেটা মেনে নিতে হলো। আসলে, দোষটা তো আমারই; এতদিনে আমার জানা উচিত ছিল যে নিজের মতো কোনও পরিকল্পনা করার অধিকার একজন সাংবাদিকের থাকতে পারে না।
এত অল্প সময়ের নোটিসে যতটা খুশি-খুশি ভাব মুখে আনা যায় সে ভাবেই আমি বললাম, “ও ব্যাপারটা নিয়ে তাহলে আর আমি কোনও রকম ভাবনা-চিন্তা করছি না। আপনি আমাকে কি কাজের কথা বলছিলেন?”
“আরে, সেটা তো রদারফিল্ড-এর সেই শয়তান লোকটার একটা সাক্ষাৎকারের ব্যাপার মাত্র।”
“আপনি নিশ্চয় প্রফেসর চ্যালেঞ্জার-এর কথা বলছেন না?” আমি গলা তুলে বললাম।
“আরে, আমি তো ঠিক তার কথাই বলছিলাম। গত সপ্তাহে তিনিই তো বড় রাস্তায় ‘কুরিয়ার’-এর এলেক সিম্পসনকে এক হাত নিয়েছেন। আপনিও হয়তো পুলিশের প্রতিবেদনে খবরটা পড়েছেন। শীঘ্রই আমাদের ছেলেরাই চিড়িয়াখানার এক মুক্ত কুমীরের সাক্ষাৎকার নেবে। কিন্তু এ-কাজটা তো আপনিও করতে পারেন—আপনি আমাদের পুরনো বন্ধু লোক।”
আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম; বললাম, “সে কি, তাহলে তো ব্যাপারটাই সহজ হয়ে গেল। এটাই ঘটনা যে রদারফিল্ডে গিয়ে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে দেখা করার জন্যই আমি ছুটিটা চেয়েছিলাম। আসলে তিন বছর আগে উপত্যকা অঞ্চলে আমরা যে বড় মাপের অভিযানটা করেছিলাম, এটা তারই বার্ষিক উৎসব। তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এবং উৎসব পালন করতে তিনিই তো আমাদের পুরো দলটাকেই ডেকে পাঠিয়েছেন।”
“বহুৎ আচ্ছা!” ম্যাক্আউল চেঁচিয়ে বলে উঠলেন। “তাহলে তো তাঁর মনের সব কথা আপনি টেনে বার করতে পারবেন। অন্য কারও ব্যাপার হলে বলতাম যে সবই মরীচিকামাত্র, কিন্তু এই লোকটি তো একবার ভাল কাজই করেছেন, আর কে জানে আবারও তা করতে পারেন।”
“তাঁর কাছ থেকে কী টেনে বার করব? আমি প্রশ্ন করলাম। “তিনি এমন কি কাজ করে চলেছেন?”
“আজকের ‘টাইমস’ পত্রিকায় ‘বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা’ লেখাটি প্রসঙ্গে তার চিঠিটা আপনি পড়েননি?”
“না।”
ম্যাক্আর্ডল মাথাটা নিচু করে মেঝে থেকে একখানি পত্রিকা তুলে নিলেন। আঙুল দিয়ে একটা কলাম দেখিয়ে বললেন, “গলা তুলে এটা পড়ুন। আরও একবার ওটা শুনতে পেলে আমি খুশিই হব। কারণ লোকটির বক্তব্যের অর্থটা আমার মাথায় ঠিক-ঠিক ঢুকেছে কি না সে বিষয়ে এখনও আমি নিশ্চিত হতে পারছি না।”
“গেজেট”-এর বার্তা-সম্পাদককে যে চিঠিটা পড়ে শোনালাম সেটা এই :
“বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা।”
“মহাশয়,—গ্রহ এবং স্থির নক্ষত্র উভয় ক্ষেত্রেই বর্ণচ্ছটা (spectrum) থেকে ফ্রাউয়েন হোপার-এর রেখাগুলি ক্রমশ মুছে যাবার বিষয়টির প্রসঙ্গে আপনাদের কলাম-এ জেমস উইলসন ম্যাক্কাইল-এর আত্মতুষ্টিসূচক ও অতিশয় দুর্বল যে পত্রখানি প্রকাশিত হয়েছে সেটা আমি খোশমেজাজেই পড়েছি—অবশ্য সেই সঙ্গে কিছুটা অপ্রশংসার আবেগও অনুভব করেছি। তিনি তো একেবারে তাৎপর্যহীন বলে ব্যাপারটাকে উড়িয়েই দিয়েছেন। ব্যাপকতর বুদ্ধির অধিকারী কোনও মানুষের কাছে এটাকে তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার আকর বলেও মনে হতে পারে, এমন কি এই গ্রহের প্রতিটি নর, নারী ও শিশুর পরম কল্যাণও তার মধ্যে নিহিত থাকতে পারে। সাধারণ মানুষ দৈনিক সংবাদপত্রের কলাম থেকেই তাদের ধ্যান-ধারণাগুলি গড়ে তোলে। তাই আমি কোনও বৈজ্ঞানিক পরিভাষা এখানে ব্যবহার করব না। তাদের সীমাবদ্ধতার স্তরে নেমে গিয়ে এমন একটি সহজ, সরল উপমা ব্যবহার করে আমি পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করব যাতে আপনাদের পাঠকবর্গের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমানার মধ্যেই সেটা থাকে।”
চিন্তার সঙ্গে তাল রেখে মাথাটা নাড়তে নাড়তে ম্যাকআর্ডল বললেন, “বাপু হে, তিনি একটি পরম আশ্চর্য—এক জীবন্ত আশ্চর্য! লোকটি তো দেখছি ঘুঘুর পালক খুলে দেবেন, যাজকদের সভায় দাঙ্গা বাধাবেন। তাঁর পক্ষে তো এখন লন্ডনে বাস করাই কঠিন হবে। খুবই দুঃখের কথা মি. ম্যালোন, কারণ একখানা মাথা বটে! ঠিক আছে, এবার উপমাটা শোনা যাক।”
আমি পড়তে শুরু করলাম, “আমাদের ধরে নিতে হবে—একটার পর একটা কর্ক জুড়ে দিয়ে বানানো একটা ছোট বান্ডিলকে অতলান্তিক মহাসাগর পার হবার অভিযানে মন্থরগতি স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। দিনের পর দিন একই পরিবেশের মধ্যে কর্কগুলো ধীরে ধীরে ভেসে চলল। কর্কগুলোর যদি বোধশক্তি থাকত তাহলে আমরা কল্পনা করতে পারতাম যে তারা এই পরিবেশটাকেই স্থায়ী এবং নিশ্চিত বলে ধরে নেবে। কিন্তু উন্নততর জ্ঞানের সাহায্যে আমরা জানি যে এমন অনেক কিছুই ঘটতে পারে যাতে কর্কগুলিও অবাক হয়ে যাবে। হয়তো তারা একটা জাহাজের সঙ্গে, একটা ঘুমন্ত তিমি মাছের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে, অথবা সমুদ্র-শেওলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। যাই ঘটুক না কেন, লাব্রাডর-এর পাহাড়ি উপকূলে ধাক্কা খেয়েই তাদের অভিযানের সমাপ্তি ঘটবে।
“তোমার পাঠকবৃন্দ হয়তো বুঝতে পারবে যে এই নীতিমূলক উপকথায় অতলান্তিক মহাসাগর মানে মহাশক্তিমান এক ইথার-সমুদ্র যার বুকে আমরা ভেসে চলেছি, আর কর্কের বান্ডিলটা হচ্ছে একটি অতি ক্ষুদ্র, অজ্ঞাত, অস্পষ্ট জ্যোতিষ্ক- মণ্ডল যেখানে আমরা বাস করি। একটা তৃতীয় শ্রেণীর সূর্য আর তার অতি তুচ্ছ, ওঁচা উপগ্রহমণ্ডলীতে সেই একই দৈনন্দিন পরিবেশের মধ্যে আমরা ভেসে চলেছি এক অজানা পরিণতির দিকে, এমন একটা নোংরা বিপদের মধ্যে যা শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রাস করবে; আমাদের আছড়ে ফেলবে একটা ইথারময় নায়েগ্রার উপর, অথবা আমরা ছিটকে পড়ব একটা অচিন্ত্যনীয় লাব্রাডর-এর গায়ে। এখানে তোমাদের সংবাদদাতা মি. জেমস উইলসন ম্যাকফাইলের অজ্ঞানতাপ্রসূত ভাসা ভাসা আশাবাদের কোনও অবকাশ আছে বলে তো আমার চোখে পড়ছে না। কিন্তু তার বক্তব্যের মধ্যে এমন কিছু যুক্তি আছে যার জন্য আমাদের জাগতিক পরিবেশের যে কোনও প্রকার পরিবর্তনের উপর সাগ্রহ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখা একান্ত কর্তব্য।”
ম্যাকআর্ডল বলে উঠলেন, “বাপুহে, লোকটি একজন ভাল পরামর্শদাতা হতে পারতেন। তাঁর কথাগুলো যেন অর্গ্যান বাদ্যযন্ত্রের মতো ঝংকার দিয়ে ওঠে। আমরা বরং আরও ভাল করে জানতে চেষ্টা করি কিসের জন্য তিনি এতটা বিপদের কথা ভাবছেন।”
“আমার মতে বর্ণচ্ছটার ফ্রাউয়েন হোপার-এর রেখাগুলির মুছে যাওয়া ও স্থান-পরিবর্তন সূক্ষ্ম ও অসাধারণ একটি ব্যাপক জাগতিক পরিবর্তনেরই নির্দেশ দিচ্ছে। কোনও গ্রহ থেকে যে আলো আসে সেটা সূর্যের প্রতিফলিত আলো। একটা নক্ষত্র থেকে যে আলো আসে সেটা তার নিজস্ব আলো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গ্রহ এবং নক্ষত্র থেকে আগত সব বর্ণচ্ছটারই একই পরিবর্তন ঘটেছে। এটা কি তাহলে ঐ সব গ্রহ ও নক্ষত্রেরই পরিবর্তন? এ রকম একটা ধারণা তো আমার পক্ষে অভাবনীয়। কি সেই একই পরিবর্তন যেটা একই সঙ্গে তাদের সকলের মধ্যেই ঘটতে পারে? এটা কি আমাদের বায়ুমণ্ডলেরই কোনও পরিবর্তন? এটা সম্ভবও হতে পারে, কিন্তু অসম্ভাবনার মাত্রাটাই তো তুঙ্গে, কারণ আমাদের চারপাশে তার কোনও লক্ষণ আমরা দেখছি না, আর রাসায়নিক বিশ্লেষণেও সেটা ধরা পড়ছে না। তাহলে তৃতীয় সম্ভাবনাটা কি? সেটা হতে পারে সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ইথার-তরঙ্গের একটা পরিবর্তন যেটা ছড়িয়ে আছে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে, পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে মহাবিশ্বে। সেই মহাসমুদ্রের একটা ধীরগতি স্রোতে আমরা ভেসে চলেছি। কোনও না কোনও স্থানে একটা পরিবর্তন ঘটেছেই। বর্ণচ্ছটার এই জাগতিক গণ্ডগোলই তার প্রমাণ। এই পরিবর্তন ভাল হতে পারে, আবার মন্দ ও হতে পারে। আবার নিরপেক্ষও হতে পারে। আমরা কিছুই জানি না। পল্লবগ্রাহী পর্যবেক্ষকরা ব্যাপারটাকে কোনও গুরুত্ব নাও দিতে পারে, কিন্তু আমার মতোই যাঁরা দার্শনিকসুলভ গভীরতর বুদ্ধির অধিকারী তাঁরা অবশ্যই বুঝতে পারবেন যে এই বিশ্বের সম্ভাবনার কোনও হিসাব হয় না; তাই তিনিই বিজ্ঞতম মানুষ যিনি অপ্রত্যাশিতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে রাখেন। একটি সহজবোধ্য দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। আজই সকালে তোমাদের কলামে সুমাত্রার আদিবাসী সমাজের মানুষদের মধ্যে যে রহস্যময় সার্বিক মহামারীর খবর ছাপা হয়েছে, তার সঙ্গে এই জাগতিক পরিবর্তনের কোনও সম্পর্ক নেই এ-কথা কে বলতে পারে? প্রশ্নটাকে আমি তুলে ধরলাম মাত্র। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাকে সমর্থন করা বা অস্বীকার করা দুই-ই সমান নিষ্ফল, কিন্তু এটা যে বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার মধ্যেই পড়ে এই সত্যটাকেও যে উপলব্ধি করতে পারে না সে তো একটি কল্পনাশক্তিহীন মহামূর্খ।
ভবদীয়
জর্জ এডোয়ার্ড চ্যালেঞ্জার
“বন্যগোলাপ, রদারফিল্ড”
কি যেন ভাবতে ভাবতে একটা লম্বা কাঁচের নলের মধ্যে সিগারেটটাকে ঠিকমতো বসিয়ে ম্যাআর্ডল বললেন, “চিঠিটা বেশ উত্তেজক। এ সম্পর্কে আপনার কি মত মি. ম্যালোন?”
আলোচিত বিষয় সম্পর্কে আমার সামগ্রিক ও নিন্দাই অজ্ঞতার কথাটা স্বীকার করতেই হলো। যেমন, ফ্রাউয়েন হোপারের রেখাগুলি আসলে কী? আপিসের এক ভীরু বিজ্ঞানীর সাহায্যে ম্যাক-আর্ডল বিষয়টি নিয়ে পড়াশুনা করছিলেন। নিজের লেখার ডেস্ক থেকে তিনি দুটো নানা রংয়ের বর্ণচ্ছটার ফিতে বের করলেন। সেগুলি দেখতে অনেকটা ক্রিকেট ক্লাবের উঠতি যুবকদের টুপির ফিতের মতো। তার উপর আঙুল দিয়ে তিনি আমাকে কতকগুলি কালো রেখা দেখালেন যেগুলি এক প্রান্তে উজ্জ্বল লাল থেকে আরম্ভ করে পরপর উজ্জল জরদ, হলুদ, সবুজ, নীল হয়ে অপর প্রান্তে উজ্জ্বল বেগুনি রংয়ের উপর আড়াআড়িভাবে আঁকা ক্রুশ-চিহ্নের মতো দেখতে।
তিনি বললেন, “ওই কালো ফিতেগুলোই হলো ফ্রাউয়েন হোপারের রেখা। আর রংগুলি রং ছাড়া অন্য কিছু নয়। একটি ত্রিশির কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখলে একই রং দেখা যাবে। রং দেখে আমরা কিছু জানতে পারি না। রেখাগুলিই আসল। গত এক সপ্তাহ ধরে এই রেখাগুলি উজ্জ্বল হওয়ার পরিবর্তে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর যত জ্যোতির্বিদ সব এর কারণ নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে। এই হচ্ছে অস্পষ্ট রেখাগুলির একখানি ফটোগ্রাফ যেটা আমাদের আগামী কালের কাগজে ছাপা হবে। এখনও পর্যন্ত এই ব্যাপারটা নিয়ে জনসাধারণের কোনও আগ্রহ নেই, কিন্তু ‘দি টাইমস’-এ প্রকাশিত চ্যালেঞ্জারের এই চিঠি তাদের ঘুম ভাঙাবে বলে মনে হচ্ছে।”
“আর এই সুমাত্রার ব্যাপারটা কি?”
“আরে, বর্ণচ্ছটায় অস্পষ্ট রেখা থেকে সুমাত্রার এক রুগ্ণ নিগার–দুইয়ের মধ্যে যে অনেক ফারাক। তবে—আমাদের এই উপরওয়ালা আগেও একবার দেখিয়েছেন যে তিনি যা বলেন জেনে-বুঝেই বলেন। অনেক দূরের ভাঁটিতে যে একটা অদ্ভুত রোগ দেখা দিয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, আবার এইমাত্র সিঙ্গাপুর থেকে একটা তার এসেছে যে সুন্দাযোজকের আলোক-স্তম্ভগুলো অকেজো হয়ে গেছে, এবং তার ফলে উপকূলবর্তী দুটো জাহাজের অবস্থাও তথৈবচ। যাই হোক, চ্যালেঞ্জারের একটা সাক্ষাৎকার নিলে আপনার পক্ষে কাজটা ভালই হবে। যদি আপনি সঠিক কিছু পেয়ে যান তাহলে সোমবারের মধ্যে আমরা যেন একটা কলাম পেয়ে যাই।”
নতুন কাজের কথাটা মাথায় রেখে আমি বার্তা-সম্পাদকের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, এমন সময় নিজের বিশ্রাম-কক্ষ থেকে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকল। একটি টেলিগ্রাফ-বয় আমার স্ট্রেথাম-এর বাসা থেকে পাঠানো তার- বার্তা নিয়ে এসেছে। খবরটা এসেছে ঠিক সেই মানুষটির কাছ থেকেই যার কথা আমরা এতক্ষণ বলাবলি করছিলাম। বার্তাটা এই রকম :
“ম্যালোন, ১৭ হিল স্ট্রীট, স্ট্রেথাম।—অক্সিজেন নিয়ে আসুন,—চ্যালেঞ্জার।”
“অক্সিজেন নিয়ে আসুন!” আমার যতদূর মনে পড়ে এই প্রফেসার ভদ্রলোকটি গজবৎ রসিকতায় অভ্যস্ত ছিলেন; অত্যন্ত এলেবেলে ও অর্থহীন লম্ফঝম্ফও করে থাকেন। এটাও কি তারই একটা নমুনা? শব্দগুলি আর একবার পড়লাম, কিন্তু তার মধ্যে রসিকতার কণামাত্রও খুঁজে পেলাম না। তাহলে এটা নির্ঘাৎ একটি সংক্ষিপ্ত হুকুম—যদিও খুবই বিস্ময়কর হুকুম। তিনি ছিলেন পৃথিবীর এমন একটি মানুষ যার ইচ্ছাকৃত হুকুমকে আমি অমান্য করতে পারি না। হয়তো কোনও রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে; হয়তো—আচ্ছা, কেন তিনি এই বস্তুটি চেয়ে পাঠিয়েছেন সেটা তো আমার ভাববার কথা নয়। এটা আমাকে পেতেই হবে। ভিক্টোরিয়া থেকে ট্রেন ধরতে হলে প্রায় এক ঘণ্টা সময় হাতে আছে। আমি একটা ট্যাক্সি নিলাম। টেলিফোনের বই থেকে ঠিকানাটা দেখে নিয়ে অক্সফোর্ড স্ট্রীটের ‘অক্সিজেন টিউব সাপ্লাই কর্পোরেশন’-এর দিকে যাত্রা করলাম।
গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যখন পাকা রাস্তায় নেমে পড়লাম তখন দুটি যুবক একটি লোহার সিলিন্ডার বয়ে নিয়ে দোকানের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। বেশ কষ্ট করেই তারা একটা অপেক্ষমাণ মোটর গাড়িতে সিলিন্ডারটা তুলে দিল। একটি বয়স্ক লোক ভাঙা-ভাঙা কর্কশ গলায় বকুনি দিতে দিতে তাদের পিছন পিছন এল. লোকটি আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সেই গুরুগম্ভীর চেহারা আর ছাগুলে দাড়িকে ভুল করবার কোনও কারণ ছিল না। এ তো আমার রসকষহীন পুরনো বন্ধু প্রফেসর সামারলী।
তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “সে কি? তুমিও কি আমাকে বলবে যে অক্সিজেনের জন্য এই রকম একটা অদ্ভুত টেলিগ্রাম তুমিও পেয়েছ?”
আমি টেলিগ্রামটা দেখালাম।
“আচ্ছা, আচ্ছা! আমিও একটা পেয়েছি, আর দেখতেই পাচ্ছ যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তদনুযায়ী কাজও করেছি। আমাদের ভালমানুষ বন্ধুটিকে সামাল দেওয়াই কঠিন। যদি অক্সিজেনের জরুরি দরকারই হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কি সরাসরি নিজেই কিনে নিতে পারতেন না?”
হয়তো এই মুহূর্তেই তিনি এটা পেতে চেয়েছিলেন—আমি কেবল এইটুকুই বলতে পারলাম।
“তিনি হয়তো এই রকমটাই ভেবেছিলেন, কিন্তু সেটা তো অন্য ব্যাপার। এখনকার মতো আমি যখন হুকুমমতো মালটা কিনেই ফেলেছি তখন তোমার আর একটা কেনা তো অনাবশ্যক।”
“তবু, যে কারণেই হোক তিনি হয়তো চাইছেন যে আমিও একটা অক্সিজেন নিয়ে যাই। তিনি আমাকে যা বলেছেন সেইমতো কাজ করাটাই নিরাপদ।”
অতএব সামারলীর অনেক রকম ওজর-আপত্তি সত্ত্বেও আমি একটা বাড়তি টিউবের অর্ডার দিলাম, আর সেটাকেও তাঁর গাড়িতেই তুলে দেওয়া হলো, কারণ নিজের থেকেই তিনি আমাকে ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত লিফ্ট দিতে চেয়েছিলেন।
আমার ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিতে আমি তার কাছে ফিরে গেলাম। বাড়তি ভাড়া দাবি করায় তার সঙ্গে কিছুটা ঝামেলা হলো। তারপর প্রফেসর সামারলীর কাছে ফিরে গিয়ে দেখি, যে দুটি লোক তার অক্সিজেনটা বয়ে এনেছিল তাদের সঙ্গে তার ভয়ংকর কথা-কাটাকাটি হচ্ছে। প্রচণ্ড বিক্ষোভে তার ছোটখাটো পাকা ছাগুলে দাড়ি এদিক-ওদিক নড়ছে। এখনও আমার মনে আছে তাদের একজন তো তাকে বলেই ফেলল, ‘তুমি একটা ছাল-ছাড়ানো বোকা বুড়ো কাকাতুয়া।’ সে-কথা শুনে তার শোফার এতই রেগে গিয়েছিল যে এক লাফে সিট থেকে বেরিয়ে এসে সে অপমানিত মালিকের সঙ্গে যোগ দিল। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টাচরিত্র করে আমরা গণ্ডগোলটা থামিয়ে দিয়েছিলাম।
এই তুচ্ছ ঘটনাটা এখানে সবিস্তারে বলাটা হয়তো অবান্তর বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এখন পিছন ফিরে তাকিয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি, যে-গল্পটা আমি বলতে যাচ্ছি তাতে এই ঘটনাগুলির গুরুত্ব অনেক।
তখন আমার মনে হয়েছিল যে শোফারটি নেহাৎ আনাড়ি, অথবা গণ্ডগোলে তার মেজাজটাই বিগড়ে গিয়েছিল, কারণ স্টেশনে পৌঁছবার পথে সে খুবই বাজেভাবে গাড়িটা চালিয়েছিল। দুই-দুই বার তো ঐ একই রকম এলোপাথাড়িভাবে চলা দুটো গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগাবার জো করে ফেলেছিল। মনে পড়ছে, তখন আমি সামারলীকে বলেছিলাম যে লন্ডনে গাড়ি চালানোর মান খুব নেমে গেছে। একবার তো একটা বড় রকম ভিড়ের একেবারে গা ঘেঁষে আমরা বেরিয়ে গিয়েছিলাম। ম্যাল-এর এক কোণে অনেক লোক ভিড় করে একটা লড়াই দেখছিল। লোকগুলো খুব উত্তেজিত অবস্থায়ই ছিল। বেপরোয়া গাড়ি চালানো দেখে তারা তো রেগে হৈ-চৈ ফেলে দিল। একটা লোক তো লাফিয়ে গাড়ির পা-দানিতে উঠে আমাদের মাথার উপর একটা লাঠি পর্যন্ত চালিয়েছিল। আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম, এবং ভিড় ঠেলে নিরাপদে পার্ক থেকে বেরিয়ে এসে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। একটার পর একটা এই রকম ছোট ছোট ঘটনার ফলে আমার স্নায়ুর উপর বেশ চাপ পড়েছিল; আমার সঙ্গীর খিটখিটে মেজাজ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম যে তার নিজের ধৈর্যেও বেশ ভাঁটার টান পড়েছে।
তবে যখন দেখতে পেলাম যে লর্ড জন রক্সটন প্ল্যাটফর্মে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন তখন আমাদেরও মেজাজটাও ভাল হয়ে গেল। হলদে টুইডের শুটিং-স্যুট পরিহিত দীর্ঘ ক্ষীণতনু; তীক্ষ্ণ মুখ, দুটি অবিস্মরণীয় চোখ, ভয়ংকর অথচ রসসিক্ত; আমাদের দেখতে পেয়ে খুশিতে আরক্তিম। লাল চুলে সাদার ছোপ পড়েছে; কপালে মহাকালের হাতে আঁকা গভীর বলিরেখা। কিন্তু অন্য সব কিছুর বিচারে এখনও তিনি সেই লর্ড জন, যিনি একদা ছিলেন আমাদের আনন্দ-সঙ্গী।
আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “হাল্লো হের প্রফেসর। হাল্লো যুবক বন্ধু।”
আমাদের পিছনে পোর্টারের ট্রলিতে সিলিন্ডার দুটো দেখে তিনি সকৌতুকে হো-হো করে হেসে বললেন, “তাহলে আপনারাও দুটো এনেছেন! আমারটা ভ্যান-এ আছে। আমাদের প্রিয় বুড়োটির ব্যাপারটা কি বলুন তো?”
“আপনি কি ‘দি টাইমস’-এ তার চিঠিটা দেখেছেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“সেটাতে কি ছিল?”
“ছাইপাঁশ—মাথামুণ্ডু!” কর্কশ কণ্ঠে সামারলী বলে উঠলেন।
“আহা, আমি যদি ভুল বুঝে না থাকি, তাহলে এই অক্সিজেন ব্যাপারটার গোড়াতেই সেটা আছে।”
অকারণ কঠোর কণ্ঠে সামারলী আবার চেঁচিয়ে বললেন, “ছাইপাঁশ আর মাথামুণ্ডু!”
আমরা সকলেই একটা প্রথম শ্রেণীর ধূমপান-ঘরে ঢুকে পড়লাম। ইতিমধ্যেই তিনি আগুনে ঝলসানো বুনো গোলাপের পুরনো পাইপটাতে আগুন ধরিয়েছেন।
প্রচণ্ড আগ্রহে তিনি বলতে লাগলেন, “বন্ধুবর চ্যালেঞ্জার বুদ্ধিমান মানুষ। সেটা কেউ অস্বকীকার করতে পারে না। এ-কথা যে অস্বীকার করে সে মূর্খ। তার টুপিটার দিকে তাকাও। তার ভিতরে আছে একটি ষাট-আউন্সের মস্তিষ্ক—একটা মস্তবড় ইঞ্জিন—সহজভাবে চলছে, পরিষ্কার কাজ দিচ্ছে। ইঞ্জিন-ঘরটা আমাকে দেখাও, তাহলেই ইঞ্জিনের আয়তনটা আমি বলে দিতে পারব। তিনি এক জন্ম- শার্লাটান—আপনারা শুনেছেন তাঁর মুখের উপরেই তাঁকে আমি এ-কথাটা বলেছি—প্রসিদ্ধিলাভের এক নাটকীয় কৌশল তাঁর করায়ত্ত। আপনারা কল্পনা করতে পারবেন না যে ইথারের পরিবর্তন আর মনুষ্যজাতির বিপদ সংক্রান্ত এই সব অর্থহীন কথাকে তিনি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেন। জীবনে কেউ কখনও এ রকম গাঁজাখুরি গল্প শুনেছে?”
একটা বুড়ো সাদা কাকের মতো বসে তিনি কা-কা করে বিদ্রূপের হাসি হাসতে লাগলেন।
সামারলীর কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মধ্যে একটা ক্রোধের ঢেউ খেলে গেল। যিনি ছিলেন আমাদের নেতা, আমাদের সমস্ত খ্যাতির যিনি উৎস ছিলেন, যিনি আমাদের এমন একটা অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়েছিলেন যা কোনও মানুষ আজ পর্যন্ত ভোগ করেনি, তাঁর সম্বন্ধে এরকম মন্তব্য করা খুবই লজ্জার ব্যাপার। একটা উচিত জবাব দেবার জন্য আমি মুখ খুলতে যাচ্ছিলাম এমন সময় লর্ড জন আমার আগেই মুখ খুললেন।
কঠোর কণ্ঠে তিনি বললেন, “আগেও একবার বৃদ্ধ চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে আপনার একটা খিটিমিটি বেধেছিল, আর দশ মিনিটের মধ্যে আপনি কুপোকাত হয়েছিলেন। আমার মনে হয় প্রফেসর সামারলী, তিনি আপনার মতো লোকদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরের লোক, আর তাঁর সঙ্গে চলতে হলে আপনার সেরা পথ হবে তাঁর চাইতে অনেক দূরত্ব রেখে চলা এবং তাঁকে একা থাকতে দেওয়া।”
“তা ছাড়া”, আমি বললাম, “তিনি আগাগোড়াই আমাদের প্রত্যেকের একজন সৎ বন্ধু। তাঁর দোষ-ত্রুটি যাই থাকুক, তিনি একটা রেখার মতো সরল, এবং আমি বিশ্বাস করি না যে তিনি কখনও তাঁর সহকর্মীদের অগোচরে তাদের নিন্দাবাদ করেন।”
লর্ড জন রক্সটন বললেন, “আমার পুত্রসম সহকর্মী যুবক, তুমি খুব ভাল কথা বলেছ।” তারপর সদয় হাসি হেসে প্রফেসর সামারলীর পিঠটা চাপড়ে দিলেন। “দেখুন হের প্রফেসার, দিনের এই সময়টাতে আমাদের কোনও রকম ঝগড়া বিবাদ করা ঠিক নয়। আমরা বড় বেশিদিন একসঙ্গে থেকেছি। কিন্তু চ্যালেঞ্জারের কাছে যখন যাবেন, তখন একটু সাবধানে পা ফেলবেন, কারণ এই প্রিয় বৃদ্ধ মানুষটি সম্পর্কে এই যুবক সহকর্মী ও আমার কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে।”
কিন্তু সামারলীর মনে তখন আপোসের কোনও স্থান ছিল না। কঠোর অসম্মতিতে তার মুখটা বন্ধই রয়ে গেল। তার পাইপ থেকে ধোঁয়ার ঘন কুণ্ডলিগুলো যেন ক্রোধভরে ঘুরে ঘুরে উপরে উঠতে লাগল।
তিনি খ্যাক-খ্যাক করে বলে উঠলেন, “আপনাকেও বলি লর্ড জন রক্সটন, নতুন ধরনের একটা গাদা-বন্দুক সম্পর্কে আমার মতামতের যতটা মূল্য, বিজ্ঞানের ব্যাপারে আপনার মতামতের মূল্যও কিন্তু আমার চোখে ঠিক ততটাই। আমারও বিচার-বিবেচনা আছে, আর সেটাকে আমি আমার মতো করেই ব্যবহার করি। আমি আপনাকে বলতে চাই স্যার, আমারও একটা মাথা আছে, আর সেটাকে যদি কাজে না লাগাই তাহলে তো নিজেকেই একটা ইতর ও ক্রীতদাস বলে ভাবব। ইথার এবং বর্ণচ্ছটার উপর ফ্রাউয়েন হোপারের রেখা নিয়ে এই সব অসার বকানিকে বিশ্বাস করে আপনি যদি খুশি থাকেন তো থাকুন, কিন্তু যে লোকটি বয়সে এবং জ্ঞানে আপনার চাইতে বড় তাকে আপনার বোকামির অংশীদার হতে বলবেন না। তার কথামতো ইথারের যদি এতটাই পরিবর্তন ঘটে থাকে, এবং সেটা যদি মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে এতটাই দূষণীয় হয়, তাহলে কি তার ফলাফলটা এর মধ্যেই আমাদের মধ্যে প্রকাশ পেত না?” এই পর্যন্ত বলেই তিনি স্বীয় যুক্তির সাফল্যে হো-হো করে হেসে উঠলেন, “হ্যাঁ স্যার, ইতিমধ্যে আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অনেক ছিটকে যাওয়া উচিত ছিল, আর একটা রেলগাড়িতে শান্ত হয়ে বসে বিজ্ঞানের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে যে বিষটা আমাদের মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তার আসল লক্ষণগুলি আমাদের দেহে ফুটে ওঠা উচিত ছিল। এই জাগতিক বিষক্রিয়ার কোনও লক্ষণ কি আমরা কোথাও দেখতে পাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তরটা আমাকে দিন স্যার! উত্তর দিন! বলুন, বলুন, এড়িয়ে যাবেন না! একটা উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে ছাড়ছি না!”
আমার রাগ ক্রমেই বাড়তে লাগল। সামারলীর আচরণটা ছিল খুব বিরক্তিকর ও আক্রমণাত্মক।
আমি বললাম, “আমার তো মনে হয় আপনি যদি ব্যাপারটাকে আরও ভাল করে জানতেন তাহলে আমার মতটা এতখানি সুনিশ্চিত হত না।”
পাইপটাকে মুখ থেকে হাতে নিয়ে সামারলী পাথরের মতো কঠিন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।
“তোমার এই অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যের মানেটা কি সেটা দয়া করে বলবে কি মশায়?”
“আমি বলতে চাই, আপিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় বার্তা-সম্পাদক আমাকে বলেছিলেন যে সুমাত্রার আদিবাসীদের মহামারীকে সমর্থন করে একটা টেলিগ্রাম এসেছে; তাতে আরও জানানো হয়েছে যে সুন্ডা যোজকে আলোই জ্বলেনি।”
এবার সত্যি সত্যি রেগে উঠে সামারলী চিৎকার করে বললেন, “সত্যি, মানুষের বোকামিরও একটা সীমা থাকা উচিত! চ্যালেঞ্জারের অযৌক্তিক ধারণাটাকে যদি এক মুহূর্তের জন্যও মেনে নেই, তা হলেও ইথার যে একটি সার্বভৌমিক পদার্থ যা এখানে যেমন পৃথিবীর উল্টো দিকেও ঠিক তেমনই থাকে—এই সত্যটা তোমরা বুঝতে পারছ তাও কি সম্ভব? তোমরা কি ক্ষণিকের জন্যও ভাবতে পার যে একটা ইংলিশ ইথার এবং একটা সুমাত্রার ইথার বলে কিছু আছে? হয়তো তোমরা এটাও কল্পনা করতে পার, যে সারে অঞ্চলের ভিতর দিয়ে ট্রেনটা এখন আমাদের নিয়ে ছুটে চলেছে তার ইথারের চাইতে কেন্ট-এর ইথার উন্নত মানের। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসপ্রবণতা ও অজ্ঞতার সত্যি কোনও সীমা- পরিসীমা নেই। এটা কি ভাবা যায় যে সুমাত্রার ইথার যখন এতখানি মারাত্মক হয়ে উঠেছে, ঠিক একই সময়ে এখানকার ইথারের কোনওরকম প্রভাবই আমাদের উপর পড়ছে না? ব্যক্তিগতভাবে আমি সত্যি বলতে পারি সারা জীবনে আমি কখনও দেহে অধিকতর শক্তিশালী অথবা মনে অধিকতর স্থিতি-স্থাপকতা অনুভব করিনি।”
আমি বললাম, “তা হতে পারে। নিজেকে আমি একজন বিজ্ঞানবিদ বলে জাহির করতে চাই না, যদিও কোথায় যেন শুনেছি যে এক পুরুষের বিজ্ঞান সচরাচরই পরবর্তী পুরুষের কাছে কূটতর্ক হয়ে ওঠে। কিন্তু এটা বুঝতে খুব বেশি সাধারণ বুদ্ধির দরকার হয় না—যেহেতু ইথার সম্বন্ধে আমরা খুব অল্পই জানি, তাই এমনও হতে পারে যে জগতের বিভিন্ন অঞ্চলের ইথার কতকগুলি স্থানীয় অবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়, এবং অন্য কোনও অঞ্চলের ইথারের পরিবর্তনের ফলটা আমাদের কাছে কিছু দিন পরেও আসতে পারে।”
সামারলী ভীষণভাবে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “ও সব ‘হয়’ এবং ‘হতে পারে’ দিয়ে কোনও কিছু প্রমাণ করা যায় না। শুয়োরের বাচ্চারা হয়তো উড়তে পারে। হ্যাঁ স্যার, হয় তো পারে,—কিন্তু তারা উড়তে পারে না। তোমার সঙ্গে তর্ক করে কোনও লাভ নেই। চ্যালেঞ্জার তোমাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছেন, তাই তোমাদের দু’জনেরই বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে। কোনওদিন আমিও হয়তো রেলের আসনগুলোর সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেব।”
এবার লর্ড জনও তীব্র কণ্ঠে বললেন, “আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি প্রফেসর সামারলী, আপনার সঙ্গে শেষবার যখন দেখা হয়েছিল তার পর থেকে আপনার আচরণের কোনও রকম উন্নতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে না।”
তেতো হাসি হেসে সামারলী উত্তর দিলেন, “আপনারা লর্ড সাহেবরা সত্য কথা শুনতে অভ্যস্ত নন। কেউ যখন আপনাদের বুঝিয়ে দেয় যে বড় বড় উপাধি থাকা সত্ত্বেও আপনারা সেই হদ্দ মূর্খই থেকে যান তখন সেটা আপনাদের বুকে বড় বাজে, তাই না?”
লর্ড জন কঠিন কণ্ঠে বললেন, “দিব্যি করে বলছি মশায়, আপনার বয়সটা যদি আরও কম হত তাহলে আমাকে এ রকম আপত্তিকর কথা বলার সাহস আপনার হত না।”
ছাগুলে দাড়িটা ঈষৎ দুলিয়ে সামারলী তাঁর থুতনিটা বাড়িয়ে দিলেন।
“স্যার, আপনাকে আমি জানিয়ে দিতে চাই যে যৌবনে বা বার্ধক্যে আমার জীবনে কখনও এমন সময় আসেনি যখন একটি জাঁকসর্বস্ব মূর্খ লোককে আমার মনের কথাটি বলতে আমি ভয় পেয়েছি—হ্যাঁ স্যার, ক্রীতদাসরা আবিষ্কার করতে পারে আর মূর্খরা গ্রহণ করতে পারে এমন যত উপাধির মালিকই আপনি হোন না কেন আসলে আপনি একটি জাঁকসর্বস্ব মহামূর্খ।”
মুহূর্তের জন্য লর্ড জন-এর চোখ দুটো জ্বলে উঠেছিল, আর তারপরেই প্রচণ্ড চেষ্টার ফলে তিনি সেই ক্রোধকে সংবরণ করলেন, এবং দুটি হাত ভাঁজ করে আর মুখের উপর একটা তিক্ততার হাসি ছড়িয়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন। এ সব কিছুই আমার কাছে ভয়ংকর ও শোচনীয় বলে মনে হচ্ছিল। একটা ঢেউয়ের মতো অতীতের স্মৃতি আমার উপর আছড়ে পড়ল, সৎ বন্ধুত্ব, সুখী, রোমাঞ্চকর দিনগুলি—সেইসব কিছু যার জন্য আমরা কষ্ট সয়েছি, কাজ করেছি এবং জয়লাভ করেছি। আর এই তার পরিণতি—এই অপমান ও তিরস্কার। হঠাৎ আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। সঙ্গীরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি দুই হাতে মুখটা ঢাকলাম।
বললাম, “সব ঠিক আছে। কেবল—কেবল বড়ই সকরুণ!”
লর্ড জন বললেন, “তুমি অসুস্থ যুবক-বন্ধু। প্রথম থেকে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি একটি অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ।”
মাথাটা ঝাঁকিয়ে সামারলী বললেন, আপনার অভ্যাসগুলো স্যার, তিন বছরেও শোধরায়নি। দেখা হওয়া মাত্রই আপনার আশ্চর্য সব রকমসকম আমার দৃষ্টিকে এড়াতে পারেনি। আপনার সহানুভূতির অপব্যয় করার কোনও দরকার নেই লর্ড জন। ওই চোখের জল তো নির্ভেজাল মদ্যপ্রসূত। ছেলেটা সারাদিন মদ গিলেছে। ভাল কথা লর্ড জন, এইমাত্র আমি আপনাকে বেহদ্দ মূর্খ বলেছি; সেটা হয়তো বড় বেশি কঠোর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ শব্দটা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিল আমার একটা ছোট্ট বিদ্যার কথা। বিদ্যাটা তুচ্ছ হলেও মজাদার। আপনি আমাকে একজন গম্ভীর প্রকৃতির বিজ্ঞানের মানুষ বলেই জানেন। আপনি কি বিশ্বাস করবেন যে এক সময় আমি বেশ কয়েকটা নার্সারিতে খামার বাড়ির হরবোলা হিসাবে খুবই খ্যাতি অর্জন করেছিলাম? সময়টা যাতে বেশ আনন্দে কেটে যায় সে ব্যাপারে আমি আপনাদের সাহায্য করতে পারি। আমি যদি একটা মোরগের ডাক ডাকতে পারি, সেটা শুনে কি আপনারা মজা পাবেন?”
লর্ড জন তখনও খুবই রুষ্ট হয়ে ছিলেন। তিনি বললেন, “না স্যার, ওতে আমি কোনও রকম মজা পাব না।
“এইমাত্র ডিম পেড়েছে এরকম একটি কুক্কুটির ডাক আমি অবিকল নকল করতে পারতাম। সেটা শোনাব কি?”
“না স্যার, না—নিশ্চয়ই না।”
কিন্তু এই একান্ত নিষেধ সত্ত্বেও প্রফেসর সামারলী তাঁর পাইপটা নামিয়ে রেখে আমাদের ভ্রমণের বাকি সময়টা পর পর নানা রকম পাখি এবং অন্য জন্তুর ডাক শুনিয়ে আনন্দ দিলেন বা দিতে পারলেন না, কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা এতই উপহাস্য হয়েছিল যে হঠাৎই আমার কান্নাটা অট্টহাসিতে পরিবর্তিত হয়েছিল। তখন আমার হাসিটা নির্ঘাৎ মৃগীরোগীর আক্ষেপের মতোই হয়েছিল। একবার তো লর্ড জন তাঁর সংবাদপত্রখানা আমাদের দিকে ঠেলে দিলেন, আর তার মার্জিনে পেন্সিলে লিখে দিলেন, “বেচারা শয়তান! এক টুপিওয়ালা জাদুকরের মতোই পাগল।” ব্যাপারটা পাগলামির খুবই কাছাকাছি পৌঁছেছিল; তবু তার হরবোলার অভিনয়টা আমার কাছে অসাধারণ ও মজাদারই মনে হয়েছিল।
যাই হোক, নানা রকম গল্পগুজবে আমরা যখন একেবারে চরমে পৌঁছেছি ঠিক তখনই ট্রেনটা জার্ভিস ব্রুক-এ ঢুকল। আমাদের আগেই জানানো হয়েছিল যে ওটাই রদারফিল্ড যাবার রেল-স্টেশন।
আমাদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য চ্যলেঞ্জার স্টেশনেই অপেক্ষা করছিলেন। কী গৌরবমণ্ডিত চেহারা! তাঁর অতীতদিনের চেহারার যদি কোনও পরিবর্তন ঘটে থাকে সেটা তার আকৃতিতেই সীমাবদ্ধ। তাঁর প্রকাণ্ড মাথা, প্রশস্ত ললাট, মসৃণ কালো চুল—সবই যেন আগের থেকেও বড় দেখাচ্ছে। তাঁর কালো দাড়ি যেন আরও মনোহর ভঙ্গিতে জলপ্রপাতের মতো দোলায়িত হচ্ছে; আর তাঁর পরিষ্কার দুটি ধূসর চোখ আর উদ্ধত ও বিদ্রূপাত্মক চোখের পাতা যেন আগের চাইতেও অধিক প্রভুত্বব্যঞ্জক হয়ে উঠেছে।
তিনি হাসিমুখে আমার সঙ্গে কর-মর্দন করলেন। অন্যদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। সকলের ঝোলা-ঝুলি ও অক্সিজেন-সিলিন্ডারের যথাযথ ব্যবস্থা করে সবাইকে নিয়ে একটা ঢাউস মোটর-গাড়িতে তুললেন। গাড়ির চালক সেই শান্তশিষ্ট অস্টিন। অল্প কথার মানুষ। প্রথমবার প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাকে আমি খানসামার চরিত্রে দেখেছিলাম। সুন্দর পল্লীগ্রামের ভিতর দিয়ে আঁকা-বাঁকা একটা পাহাড় বেয়ে আমরা উপরে উঠতে লাগলাম। আমি বসেছিলাম সামনের সিটে শোফারের পাশে। আমার তিন সঙ্গী পিছনে বসে উঁচু গলায় সাংঘাতিক এক বৈজ্ঞানিক বিতর্ক নিয়ে মেতে উঠলেন। অস্টিন হঠাৎ স্টিয়ারিং- এর চাকায় হাত রেখেই তার মেহগেনি মুখটা আমার দিকে ফেরাল।
বলল, “আমাকে নোটিস দেওয়া হয়েছে।”
“বল কি?” আমি বললাম।
আজ সব কিছুই কেমন অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। সকলেই অপ্রত্যাশিত, বিদ্ঘুটে কথা বলছে। যেন স্বপ্ন দেখছিলাম।
চিন্তিত গলায় অস্টিন বলল, “এই সাতচল্লিশ বার হলো।”
অন্য কোনও কথা খুঁজে না পেয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কবে চলে যাচ্ছ?”
“চলে যাচ্ছি না তো”, অস্টিন বলল।
তখনকার মতো বাক্যালাপ শেষ হলো বলেই মনে হলো, কিন্তু সে আবার সেই কথাতেই ফিরে গেল।
“আমি চলে গেলে ওর দেখাশুনা কে করবে?” সে মালিকের দিকে মাথাটা বাঁকালো।”সেবা করার লোক পাবেন কাকে?”
“অন্য যে কাউকে”, আমি হঠাৎই বলে ফেললাম।
“কাউকে পাবেন না। একটা সপ্তাহও কেউ টিকবে না। আমি চলে গেলে এই বাড়িটাও মূল স্প্রিংটা থেমে-যাওয়া ঘড়ির মতোই বন্ধ হয়ে যাবে। আপনি ওর বন্ধু বলেই আপনাকে বলছি, আর জানাটা আপনার দরকার। ওর কথা শুনে চলতে হলে তো—কিন্তু না। সেটা আমি পারব না। আমিই তো সব। আর উনি আমাকেই নোটিস দিচ্ছেন।”
“কেউ টিকবে না কেন?” আমি জানতে চাইলাম।
“আহা, তারা তো বুঝবে না যে উনি যা বলেন তা করেন না। তাহলে শুনুন ওঁর সব কীর্তি-কথা। উনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশবেন না। তাদের অনেকেই তো মনে করেন যে আপনি যে সব দৈত্য-দানবদের কথা লিখেছেন তাদের সঙ্গে যখন উনি ছিলেন তখন তো সেটাই ছিল আমার মালিকের কাছে ‘বাড়ি—আমার মধুর বাড়ি”। তারা তো এই সব কথাই বলে। কিন্তু আমি তো দশ বছর ধরে তার সেবা করছি, আর ওনাকে ভালও বাসি। তাছাড়া, মনে রাখবেন, যে যাই বলুক উনি একটি মহাপুরুষ লোক, ওঁকে সেবা করা তো একটা সম্মানের কাজ। তবে মাঝে মাঝে কেমন যেন নিষ্ঠুর হয়ে যান। এবার ওটার দিকে একবার তাকান স্যার। একটিবার শুধু পড়ুন
তখন গাড়িটা খুব ধীর গতিতে চলছিল। সামনেই একটা খাড়া ঘোরানো চড়াই। তার কোণেই একটা ঝোপের সঙ্গে নোটিস-বোর্ডটা আটকানো ছিল। অস্টিনই বলে দিল, ওটা পড়তে কষ্ট হবে না, কারণ অল্প কয়েকটা শব্দ হলেও সেগুলি বেশ আকর্ষণীয়—
সতর্ক-বার্তা
দর্শনার্থী, সাংবাদিক এবং সন্ন্যাসীরা বাঞ্ছনীয় নয়
জি. ই. চ্যালেঞ্জার
শোচনীয় বিজ্ঞাপনটির দিকে তাকিয়ে মাথাটা নাড়তে নাড়তে অস্টিন বলল, “না, যাকে আপনারা ‘সহৃদয়’ বলেন এটা সে রকম কিছু নয়। ক্রিস্টমাস-কার্ড-এও এটা মানায় না। আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার, অনেক বছর হয়ে গেল আমি এত কথা বলিনি, কিন্তু আজ আর আমি চুপ করে থাকতে পারলাম না। উনি আমাকে ছাঁটাই করতে পারেন, কিন্তু আমি যাচ্ছি না। এটা আমার সাফ জবাব। আমি ওনার লোক আর উনি আমার প্রভু। আশা করি, এই অধ্যায়ের শেষ পর্যন্ত তাই থাকবে।”
রাস্তার দুই পাশে রডোডেনড্রনের ঝোপ পেরিয়ে আমরা সিংদরজার দুটো সাদা থামের ভিতর দিয়ে ঢুকে গেলাম। অদূরেই একটা নিচু ইঁটের বাড়ি, তাতে সাদা কাঠের কাজ, দেখতে বেশ আরামদায়ক ও সুন্দর। আমাদের অভ্যর্থনা করতে খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ছোটখাটো, সুন্দর চেহারার হাস্যমুখী মিসেস চ্যালেঞ্জার।
শশব্যস্তে গাড়ি থেকে নেমে চ্যালেঞ্জার বললেন, “শোন প্রিয়তমে, এঁরাই আমাদের অতিথি। আমাদের কাছে অতিথি আসাটা একটা নতুন ব্যাপার, তাই না? এঁদের নিয়ে আমাদের এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে কোনও ঝামেলা হবে না, কি বল?”
মহিলাটি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “কী সাংঘাতিক—কী সাংঘাতিক! জর্জ যাকে পায় তার সঙ্গেই ঝগড়া করে। আশেপাশে আমাদের একটিও বন্ধু নেই।”
ছোট, মোটা হাত দিয়ে মহিলাটির কোমরটা জড়িয়ে ধরে চ্যালেঞ্জার বললেন, “তাই তো আমার তুলনাহীনা স্ত্রীটির প্রতি আমার সব মনোযোগ ঢেলে দিতে পারি।” মনে মনে একটি গরিলা এবং একটি সুন্দর হরিণের ছবি আঁকুন, তার মধ্যেই যুগলকে পেয়ে যাবেন। “চল—চল, ভদ্রলোকরা পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন; আগে লাঞ্চ তৈরি করা চাই। সারা ফিরেছে কি?”
মহিলা সখেদে মাথা নাড়লেন, আর প্রফেসর গৃহকর্তার ভঙ্গিতে দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে হো-হো করে হাসতে লাগলেন।
চেঁচিয়ে বললেন, “অস্টিন, গাড়িটা তুলে দিয়ে দয়া করে লাঞ্চটা সাজাতে তোমার কর্ত্রীকে একটু সাহায্য করবে। এবার মশাইরা, দয়া করে একবার আমার স্টাডিতে চলুন, কারণ দু’একটা খুবই জরুরি কথা আপনাদের বলার জন্য আমি উৎসুক হয়ে আছি।”
