অধ্যায় ৩ ॥ প্লাবনের কবলে

অধ্যায় ৩ ॥ প্লাবনের কবলে

বিধির বিধানে যে-কক্ষটি আমাদের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার দৃশ্যপট হবার জন্য নির্দিষ্ট ছিল সেটা চোদ্দ অথবা ষোল বর্গফুটের মনোরম একটি মেয়েদের বসবার ঘর। তার শেষ প্রান্তে ছিল লাল ভেলভেটের পর্দা দিয়ে আলাদা করে দেওয়া একটা ছোট ঘর। সেটাই প্রফেসরের বেশ-কক্ষ। তারপরেই ছিল একটা বড় শয়ন-কক্ষ। পর্দাটা তখনও ঝোলানোই ছিল, কিন্তু আমাদের নিরীক্ষা-কার্যের সময় দুটো ঘরকে একটা ঘর হিসাবেই ব্যবহার করা চলবে। একটি দরজা এবং জানালার কাঠামোটাকে বার্নিশ-করা কাগজ দিয়ে আগাগোড়া মুড়ে দিয়ে একেবারে সিল করে দেওয়া হয়েছিল। সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর দিককার অপর দরজাটির মাথার উপরে ঝোলানো ছিল একটা ফ্যানলাইট; বায়ু-চলাচলের বিশেষ প্রয়োজনের সময় একটা দড়ির সাহায্যে সেটাকে নামিয়ে দেওয়া যায়। ঘরের প্রত্যেকটি কোণেই টবের মধ্যে একটা করে বড় ঝাঁটা রাখা ছিল।

বারান্দার উপর একটা প্রশস্ত, নিচু জানালা ছিল। সেখান থেকে যে দৃশ্যটি চোখে পড়ে তার প্রশংসা আগেই করেছি। বাইরে তাকিয়ে কোথাও কোনওরকম বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ল না। ঐতিহাসিক যুগের একটা সেকেলে গাড়ি স্টেশন থেকে পাহাড়ি পথ বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসছিল। তারও নিচে একটি নার্স- মেয়ে এক হাতে দ্বিতীয় শিশুটিকে ধরে অন্য হাতে একটা পেরামবুলেটর চালিয়ে আসছিল। নিচের বাড়িগুলো থেকে যে নীল ধোঁয়ার কুণ্ডুলিগুলো উঠে আসছিল তাতে সমগ্র পল্লী-দৃশ্যেই ফুটে উঠছিল একটা সুশৃঙ্খল, আরামদায়ক জীবনযাত্রার আভাস। দূরের নীল আকাশে অথবা সূর্যকরোজ্জ্বল পৃথিবীর কোথাও কোনও বিপদের আভাসমাত্রও ছিল না। ফসল-কাটা মানুষগুলো আবার মাঠে ফিরে এসেছিল, গল্ফ-খেলোয়াড়রা দু’জন করে এবং চারজন করে দল বেঁধে লিংকের চারদিকে ঘুরছিল। আমার মাথার মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত গোলমাল চলছিল, আর আমার ক্লান্ত স্নায়ুগুলো এমন এলোমেলো হয়ে পড়ছিল যে ঐ লোকগুলোর উদাসীনতা আমার কাছে খুবই বিস্ময়কর ঠেকছিল।

এরই মধ্যে আবার টেলিফোনটা বেজে উঠল।

লাঞ্চ খাবার সময় এবং তার পরেও মাঝে মাঝেই টেলিফোনটা সশব্দে বেজে উঠছিল, আর প্রফেসরেরও ডাক পড়ছিল। কয়েকটা কাটা-কাটা বাক্যে তিনি আমাদের সংবাদগুলো দিচ্ছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনও এমন ভয়ংকর সংবাদ লিপিবদ্ধ হয়নি। দক্ষিণ দিক থেকে মৃত্যুর উত্তাল জোয়ারের মতো একটা বিরাট ছায়া ধীরে ধীরে উঠে আসছে। মিশর প্রলাপ বকার পরে এখন কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। স্পেন ও পর্তুগাল পাগলের মতো দুর্দান্ত লড়াই চালিয়ে এখন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোনও খবর আসছেই না। দক্ষিণ আমেরিকা এবং যুক্তরাষ্ট্র সমূহ কিছু ভয়ংকর জাতি-দাঙ্গার পরে বিষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। মেরিল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না, আর কানাডায় কিছুই চোখে পড়ছে না। বেলজিয়াম, হল্যান্ড এবং ডেনমার্ক পর পর আক্রান্ত হয়েছিল। প্রত্যেক জায়গা থেকেই হতাশাপূর্ণ সংবাদ আসছে বিদ্যার বড় বড় পীঠস্থানগুলিতে এবং বিশ্ববিখ্যাত রসায়নবিদ ও ডাক্তারদের কাছে। সকলের কাছেই তারা পরামর্শ চাইছে। জ্যোতির্বিদরাও অনুসন্ধানের স্রোতে ভেসে যাচ্ছেন। অথচ কিছুই করার নেই। ব্যাপারটা সর্বজনীন এবং মানুষের জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ তো মৃত্যু—বেদনাহীন কিন্তু অনিবার্য—মৃত্যু যুবক ও বৃদ্ধের, দুর্বল ও শক্তিমানের, ধনী ও দরিদ্রের,—আশা নেই, কারও পালাবার পথও নেই। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া এই সব খবরই টেলিফোনে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

আমরা বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মনে হলো কিছু গুজব হয়তো এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ আমরা দেখলাম ধান-কাটাররা দ্রুত মাঠ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কয়েকজন গল্ফ-খেলোয়াড় ক্লাব-ঘরে ফিরে যাচ্ছে। তাদের দৌড়ে যেতে দেখে মনে হচ্ছে বুঝি বৃষ্টির জন্যে কোথাও আশ্রয় খুঁজছে। নার্সটিও ঘুরে গিয়ে পেরাম্বুলেটারটাকে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের উপর দিকে ঠেলে তুলছে। অথচ মাথার উপর গ্রীষ্মকালের চমৎকার আকাশটা যেন টানা নীল রংয়ের একটা খিলান ছাদ—তার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে কিছু সাদা পশমের মতো মেঘ। মানুষ জাতটাকে যদি আজই মরতে হয় তাহলে আর যাই হোক সেটাই হবে একটা গৌরবময় মৃত্যু-শয্যা।

কিন্তু আগেই বললাম যে টেলিফোনটা আরও একবার বেজে উঠেছে। হঠাৎ হল থেকে ভেসে এল চ্যালেঞ্জারের ভয়ংকর কণ্ঠস্বর

তিনি চিৎকার করে বললেন, “ম্যালোন, তোমার ডাক পড়েছে।”

আমি ছুটে যন্ত্রটার কাছে চলে গেলাম। লন্ডন থেকে কথা বলছিলেন ম্যাক আর্ডল।

তাঁর পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে এল, “কে? মি. ম্যালোন? শুনুন? মি. ম্যালোন, লন্ডনে সাংঘাতিক সব কাণ্ড-কারখানা চলছে। ঈশ্বরে দোহাই, দেখুন তো প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আমাদের কি করণীয় সে বিষয়ে কিছু বলতে পারেন কি না।”

আমি জবাব দিলাম, “তিনি কিছুই বলতে পারবেন না স্যার। এই সংকটকে তিনি সর্বজনীন এবং অনিবার্য বলে মনে করছেন। এখানে আমাদের কাছে কিছুটা অক্সিজেন আছে, কিন্তু তা দিয়ে আমাদের নিয়তিকে কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া যাবে মাত্র।”

যন্ত্রণা-ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর চিৎকার করে উঠল, “অক্সিজেন! সেটা পাবার মতো সময়ই তো নেই। সকালে আপনি চলে যাবার পর থেকেই এখানে কুরুক্ষেত্র-কাণ্ড চলছে। কর্মচারীদের মধ্যে অর্ধেক তো অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমারও মাথাটা কেমন যেন ভারী-ভারী লাগছে। জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ফ্লীট স্ট্রীট ভর্তি করে মানুষ পড়ে আছে। সব যানবাহন বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ টেলিগ্রামের খবর হচ্ছে, সমগ্র জগৎটাই—”

তাঁর কণ্ঠস্বর একটু একটু করে ক্ষীণ হয়ে আসছিল, হঠাৎ থেমেই গেল। মুহূর্তকাল পরেই টেলিফোনের মারফৎ “ধপাস” করে একটা শব্দ শুনতে পেলাম; মনে হলো, বুঝি তাঁর মাথাটাই সোজা ডেস্কের উপর ঢলে পড়ল।

আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম, “মি. ম্যাক আর্ডল! মি. ম্যাক আর্ডল!”

কোনও জবাব এল না। রিসিভারটা রাখতে রাখতেই জেনে গেলাম যে তাঁর কণ্ঠস্বর আর কোনওদিন শুনতে পাব না।

ঠিক সেই মুহূর্তে সবে পিছনের দিকে একটা পা ফেলেছি, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা আমাদের উপরেও চেপে বসল। মনে হলো আমরা বুঝি স্নান করছি, গলা পর্যন্ত জলে ডুবে গেছে, হঠাৎই একটা ঘূর্ণি-ঢেউ এসে আমাদের অর্ধ-জলমগ্ন করে ফেলেছে। মনে হলো, একটা অদৃশ্য হাত নিঃশব্দে এসে আমার গলাটাকে চেপে ধরে একটু একটু করে আমার জীবনটাকে নিঙড়ে বের করে দিচ্ছে। আমি তখনও সচেতন ভাবে বুঝতে পারছিলাম যে আমার বুকের উপর একটা প্রচণ্ড চাপ পড়ছে, মাথার ভিতরটা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাচ্ছে, দুটো কানেই ভোঁ-ভোঁ শব্দ হচ্ছে, আর চোখের সামনে উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি খেলছে। টলমল করতে করতে কোনও রকমে সিঁড়ির রেলিং-এর কাছে পৌঁছনোমাত্রই আহত মহিষের মতো নাক দিয়ে গর্জন করতে করতে তীরবেগে ছুটে এসে চ্যালেঞ্জার আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য! রক্ত-রাঙা মুখ, ঠেলে-ওঠা দুটো চোখ, কুঁচির মতো খাড়া চুল। তাঁর অচেতন, ছোটখাট চেহারার স্ত্রীকে কাঁধের উপর ফেলে তিনি সম্পূর্ণ মনের জোরেই একটা সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা দেখে আমিও হাঁচোড়-পাঁচোড় করে, কখনও উঠে কখনও পড়ে, রেলিংটা ধরে উঠতে উঠতে এক সময় অর্ধ- অচৈতন্য অবস্থায় উপরের ল্যান্ডিং-এ মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম। লর্ড জনের ইস্পাত-কঠিন আঙুলগুলো আমার কলারটা চেপে ধরল, আর একটা মুহূর্ত পরেই আমাকে চিৎ করে সটান শুইয়ে দেওয়া হলো বুদোয়ারের কার্পেটের উপর। তখন আমার অবস্থা ন যযৌ ন তস্থৌ। একটা কথা বলারও শক্তি ছিল না। মহিলাটি শুয়েছিলেন আমার ঠিক পাশে। সামারলীকে জুবুথুবু করে বেঁধে রাখা হয়েছিল জানালার ধারে একটা চেয়ারের সঙ্গে; তাঁর মাথাটা ঝুলে পড়েছিল প্রায় তাঁর দুই হাঁটুর উপর। যেন স্বপ্নের মধ্যে আমি দেখতে পেলাম চ্যালেঞ্জার একটা রাক্ষুসে গুবরে পোকার মতো মেঝের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে চলেছেন। মুহূর্তকাল পরেই শুনতে পেলাম বেরিয়ে আসা অক্সিজেনের মৃদু হিহিস্ শব্দ। চ্যালেঞ্জার বেশ বড় বড় ক্ষেপে দু’তিনবার প্রশ্বাস টানলেন; সেই প্রাণদায়ী গ্যাসটা টানার সময় তাঁর ফুসফুস থেকে গড়-গড় শব্দ বের হতে লাগল।

তিনি জয়োল্লাসে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “এই তো কাজ হচ্ছে। আমার যুক্তিটাই প্রমাণিত হলো।” সতর্কভাবে তিনি সদর্পে আবার উঠে দাঁড়ালেন। একটা টিউব হাতে নিয়ে ছুটে গিয়ে তাঁর স্ত্রীর মুখের কাছে ধরলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি একটু কাতরালেন, নড়াচড়া করলেন, তারপর উঠে বসলেন। ভদ্রলোক এবার আমার দিকে ফিরলেন। আমার মনে হলো, জীবনের জোয়ার অলক্ষ্যে আমার ধমনীতে বইতে শুরু করেছে। জীবনের এই আকস্মিক প্লাবনে যে আনন্দের উচ্ছ্বাস তখন অনুভব করেছিলাম তেমনটি আগে কখনও করিনি। আমার ফুসফুসের উপর থেকে একটা বোঝা নেমে গেল, ভুরু থেকে বাঁধনটা যেন খুলে গেল, শান্তি এবং মৃদু আরামের একটা মধুর অনুভূতি আমার উপর ছড়িয়ে পড়ল। শুয়ে থেকেই আমি দেখতে পেলাম সামারলীও সেই একই ওষুধে পুনর্জীবন লাভ করলেন, এবং সব শেষে লর্ড জনের পালা এল। এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আমাকে টেনে তোলার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলেন, আর চ্যালেঞ্জার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে একটা সেটির উপর শুইয়ে দিলেন।

স্বামীর হাতটা চেপে ধরে তিনি বললেন, “ওহ্ জর্জ, তুমি আমাকে ফিরিয়ে আনায় আমার কী যে দুঃখ হচ্ছে! তুমিই তো বলেছিলে যে মৃত্যুর দরজায় কত সুন্দর, ঝলমলে পর্দা ঝোলানো থাকে; দম বন্ধ হবার অনুভূতিটা চলে যাওয়ামাত্রই সব কিছুই এত শান্ত ও সুন্দর মনে হয়েছিল যে সেটা বলে বোঝানো যায় না। কেন তুমি আমাকে ফিরেয়ে নিলে এলে?”

“কারণ আমার ইচ্ছাটা হচ্ছে সে-মহাযাত্রাটা আমরা দু’জন একসঙ্গেই করব। অনেক বছর ধরে দু’জন একসঙ্গেই আছি। সেই পরম মুহূর্তে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সেটা খুবই দুঃখের হতো।”

সামারলীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠস্বরে আনন্দের এবং বৈজ্ঞানিক জয়োল্লাসের ছোঁয়া লাগিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, “এত মানুষ থাকতে একমাত্র আমিই এই শোচনীয় বিপদটা দেখতে পেয়েছিলাম এবং তার পূর্বাভাসও দিয়েছিলাম। এবার বলুন ভালমানুষ সামারলী, বর্ণচ্ছটার ভিতরকার রেখাগুলি মুছে যাবার অর্থটা অবশ্যই আপনি বুঝতে পেরেছেন; এবং এর পরেও আপনি কখনও বলবেন না যে ‘দি টাইমস’-এ প্রকাশিত আমার চিঠিটা একটা ভ্রান্ত ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।”

এই একবারই দেখলাম যে আমাদের বিতর্কপ্রিয় সহকর্মীটি কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ডাকে সাড়া দিলেন না। তখনও যে তিনি সত্যি সত্যি এই গ্রহেই বাস করছেন সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্যই তিনি যথাস্থানে বসেই লম্বা, লিকলিকে হাত-পাগুলি টান-টান করতে লাগলেন। চ্যালেঞ্জার অক্সিজেন টিউবটার কাছে এগিয়ে গেলেন। উচ্চগ্রামের হিস্ হিস্ শব্দটা ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল।

তিনি বললেন, “আমাদের গ্যাসের ব্যবহারটা ভেবেচিন্তে করতে হবে। আমাদের ঘরের বায়ুমণ্ডলটা বড় বেশি মাত্রায় অম্লজান-বাষ্পায়িত হয়ে আছে, এবং আমি ধরে নিচ্ছি যে আমাদের মধ্যে কেউই কোনওরকম কষ্টদায়ক লক্ষণ অনুভব করছেন না। বাতাসের সঙ্গে কত পরিমাণ অক্সিজেন যোগ করলে তার বিষক্রিয়াটা নষ্ট করা যায় সেটা আমাদের স্থির করতে হবে হাতে-কলমে পরীক্ষা করে। এখন দেখা যাক সেটা কী ভাবে করা যায়।”

নিজ নিজ অনুভূতির উপর নজর রেখে আমরা নিঃশব্দ স্নায়বিক চাপের মধ্যে পাঁচ মিনিট অথবা কিঞ্চিৎ অধিক সময় বসে থাকলাম। ঠিক তখনই আমার মনে হতে লাগল আমি যেন কপালের চারদিকে আবার একটা সংকোচন অনুভব করছি। মিসেস চ্যালেঞ্জার তাঁর চেয়ারে বসেই ডেকে বললেন যে তাঁর মূর্ছা যাবার উপক্রম হয়েছে। তাঁর স্বামী গ্যাসের পরিমাণ বাড়াবার জন্য নবটা ঘোরালেন।

তারপর বলতে শুরু করলেন, “প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগে প্রত্যেকটা ডুবোজাহাজে একটা করে সাদা ইঁদুর রাখা হত, কারণ ইঁদুরের দেহ-গঠনটি এতই স্পর্শকাতর যে আবহওয়ায় কোনও রকম ক্ষতিকর লক্ষণ দেখা দিলে নাবিকরা সেটা বুঝবার আগেই ইঁদুরের শরীরে সেটা প্রকাশ পেত। ওগো প্রিয়তমা, তুমিই হবে আমাদের শ্বেত মূষিক। এখন আমি গ্যাসের সরবরাহটা বাড়িয়ে দিলাম, আর তুমিও ভাল হয়ে উঠছ।”

“হ্যাঁ, আমি আগের চাইতে ভাল বোধ করছি।”

“সম্ভবত আমরা সঠিক মিশ্রণটা ধরতে পেরেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইতিমধ্যেই আমরা গ্যাসের প্রথম টিউবটার অনেকটাই খরচ করে ফেলেছি।”

লর্ড জন এতক্ষণ দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে জানালাটার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি প্রশ্ন করলেন, “তাতে কি কিছু যায়-আসে? চলেই যদি যেতে হয়, তাহলে কিছুটা বেশি সময় বেঁচে থাকার দরকারটা কি? আপনি নিশ্চয় মনে করেন না যে আমাদের বেঁচে থাকার কোনও সম্ভাবনা আছে?”

চ্যালেঞ্জার হেসে হেসে মাথাটা নাড়তে লাগলেন।

“আচ্ছা, আপনি কি তাহলে মনে করেন না যে কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার জন্য অপেক্ষা না করে ঝাঁপ দেওয়াটাই অধিক মর্যাদার যোগ্য? মরতেই যদি হয় তো আমি চাই যে প্রার্থনাটা সারা হোক, গ্যাসের নবটা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেওয়া হোক, আর জানালাটাও খুলে দেওয়া হোক।”

মহিলাটিও সাহসিকার মতো বলে উঠলেন, “কেন নয়? সত্যি জর্জ, লর্ড জন ঠিকই বলেছেন, আর সেটা করাই শ্রেয়।”

সামারলী অসন্তুষ্ট গলায় চেঁচিয়ে বললেন, “আমি তীব্রভাবে আপত্তি জানাচ্ছি। মরতেই যখন হবে, তখন আসুন, আমরা মরার মতোই মরি; চিন্তা-ভাবনা করে সাক্ষাৎ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে থাকাটা তো আমার মতে একটা বোকামি, একটা অযৌক্তিক কাজ।”

“আমাদের যুবক বন্ধুটি কি বলেন?” চ্যালেঞ্জার প্রশ্ন করলেন।

“আমি তো মনে করি আমাদের শেষ পর্যন্ত দেখা উচিত।”

“আর আমিও ভীষণভাবে ঐ একই মতের পক্ষে”, তিনি বললেন।

“তাহলে জর্জ, তুমি যদি এ কথা বল, তাহলে আমিও সেটাই মনে করি”, মহিলাটি চেঁচিয়ে বললেন।

এবার লর্ড জন বলে উঠলেন, “আমি তো কথাটা বলেছিলাম তর্কের খাতিরে; আপনারা সকলেই যদি শেষ পর্যন্ত দেখতে চান তো আমিও আছি আপনাদের দলে।”

সামারলীও চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “আমিও বেশ জোরের সঙ্গে ঐ মতটাকেই সমর্থন করছি।”

লর্ড জন বলে উঠলেন, “বিনা বিরোধিতায় প্রস্তাব পাশ হয়ে গেল। এবার জর্জকে বলছি, আপনার যে হতভাগ্য শোফারটি নিচের উঠোনেই ছিল তার তো শেষ যাত্রা হয়ে গেছে। সেই অবরুদ্ধ সৈনিককে উদ্ধার করে ভিতরে আনার কি কোনও দরকার আছে?”

সামারলী চেঁচিয়ে বললেন,”সেটা তো হবে নেহাৎ পাগলামি।”

লর্ড জন বললেন, “তা—আমারও তাই মনে হয়। বরং আমি বলি কি, গাছটার নিচে যে ছোট পাখিগুলো পড়ে আছে সেদিকে একটু নজর দিন।”

চারটে চেয়ার টেনে নিীেয় আমরা টানা জানালাটার কাছে বসলাম। মহিলাটি তখনও দুই চোখ বন্ধ করে সেটিটার উপরেই বিশ্রাম করছিলেন।

আমাদের চোখের ঠিক নিচেই ছোট উঠোনটাতে অর্ধেক ধোয়া-মোছা মোটর গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। শোফার অস্টিন অনেক আগেই শেষ নোটিসটা পেয়ে গিয়েছিল। গাড়ির চাকার পাশেই সে হাত-পা ছড়িয়ে পড়েছিল। তার কপালের উপরে থেঁতলে-যাওয়ার একটা মস্ত বড় কালো দাগ। ঢলে পড়ার আগে পা-দানি বা মাড-গার্ডের উপরেই কপালটা ঠুকে গিয়েছিল। নলের মুখটা তখনও তার হাতের মধ্যেই ধরা ছিল। সেই নলটা দিয়েই সে গাড়িটা ধুচ্ছিল। উঠোনের এক কোণে ছিল একজোড়া ছোট গাছ, আর তার নিচেই ছোট ছোট পাগুলো উপরে দিকে তুলে পড়ে ছিল কয়েকটি ছোট ছোট নরম পালকের বল। ছোট-বড় সব কিছুর উপরেই পড়েছিল মৃত্যুর করাল খড়্গা

উঠোনের পাঁচিলের উপর দিয়ে তাকাতেই আমাদের চোখে পড়ল স্টেশনে যাবার আঁকা-বাঁকা রাস্তাটা। কিছুক্ষণ আগেই যে ফসল-কাটা মানুষগুলোকে আমরা মাঠ থেকে ছুটে যেতে দেখেছিলাম তারা সকলেই একে অপরের মৃতদেহের উপর এলোপাথাড়ি হয়ে পড়েছিল রাস্তাটার একেবারে নিচে। তার কিছুটা উপরে ঘাসে- ঢাকা ঢালুর উপরে মাথা ও গলাটা আটকে পড়েছিল নার্স-মেয়েটি। পেরাম্বুলেটার থেকে সে শিশুটিকে তুলেও নিয়েছিল; শিশুটি তখন তার হাতের একটা নিথর পুঁটুলিমাত্র। তার ঠিক পিছনেই রাস্তার ধারে ছোট ছেলেটি টান-টান হয়ে পড়ে ছিল। আমাদের আরও কাছে গাড়ি-টানা ঘোড়াটা হাঁটু ভেঙে গাড়ির দণ্ডের সঙ্গে ঝুলছিল, আর বুড়ো গাড়োয়ানটা দুই হাত ছড়িয়ে অদ্ভুতদর্শন একটা কাক-তাড়ু য়ার মতো ঝুলে ছিল। আরও কত বিচিত্র সব শোচনীয় দৃশ্য। নীল আকাশে একটাও পাখি উড়ছে না। যতদূর চোখ যায় একটা মানুষ নেই, একটা জন্তু নেই। অস্তসূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে, কিন্তু সেই উজ্জ্বল, শান্ত পরিবেশকেও আচ্ছন্ন করে আছে মহামরণের নিস্তব্ধ নীরবতা—অচিরেই আমরাও যার অংশীদার হব। কিন্তু সে আর কতক্ষণ! এক সময় গ্যাস ফুরিয়ে যাবে, আমরাও বুদোয়ারের চেরিফুল-রঙের জাজিমের উপর হাঁস-ফাঁস করতে থাকব, এবং মানবজাতির ভাগ্য আর সমস্ত পার্থিব জীবনের অবসান হবে। একটা অবর্ণনীয় মানসিকতা নিয়ে আমরাও আরও দীর্ঘ সময় একটি শোচনীয় পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকব

শেষ পর্যন্ত গাছ-গাছালির উপর দিয়ে উঠে-আসা একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলির দিকে আঙুল বাড়িয়ে চ্যালেঞ্জার বলে উঠলেন, “একটা বাড়িতে আগুন লেগেছে। আমি আশা করছি এ রকম আরও অনেক বাড়িতেই ঘটবে—হয়তো সব শহরেই আগুন লাগবে। এই আগুন লাগাটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের অনুপাতটি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এবং এখন যা কিছু ঘটছে সেটা ইথারের দোষে। আহা, ক্রোবরো পাহাড়ের মাথায় আরও একটা অগ্নিকাণ্ড দেখতে পাচ্ছি। ওটাই তো গল্ফ ক্লাব-হাউস। ওই তো গির্জার ঘড়িটা ঢং ঢং করে বাজছে। আমাদের দার্শনিকরা জেনে খুশি হবেন—মানুষের হাতে তৈরি একটা যন্ত্র মানবজাতির মৃত্যুর পরেও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে।”

এমন সময় লর্ড জন খুবই উত্তেজিতভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “জর্জের দোহাই, ওটা কিসের ধোঁয়া? এ যে একটা ট্রেন।”

গর্জনটা আমাদের কানেও এল। অচিরেই সেটা আমাদের দৃষ্টিগোচরও হলো। ট্রেনটা খুবই বিস্ময়কর গতিতে ছুটছে। কোথা থেকে আসছে, কতদূর যাবে তা জানবার কোনও উপায় আমাদের ছিল না। কিন্তু তখনই আমাদের দেখতে হলো ট্রেনটির একটা ভয়ংকর অন্তিম দশা। লাইনের উপর অচল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কয়লাবাহী ট্রাকের একটা ট্রেন। সেই একই লাইন ধরে এক্সপ্রেস ট্রেনটাকে সগর্জনে ছুটে যেতে দেখে আমাদের দম আটকে গেল। ভয়ংকর একটা সংঘর্ষ ঘটল। ইঞ্জিন এবং গাড়িগুলো ভাঙাচোরা কাঠ ও মোচড়ানো লোহার একটা পাহাড়ে পরিণত হল। ধ্বংসস্তূপটা জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেল। সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে আমরা আধা ঘণ্টা সময় হতবাক হয়ে বসে ছিলাম।

একসময় মিসেস চ্যালেঞ্জার স্বামীর হাতটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন, “বেচারি, আহা বেচারি মানুষগুলো!”

স্ত্রীর হাতটা ধরে চ্যালেঞ্জার তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “ট্রেনটা ভিক্টোরিয়া থেকে যাত্রা করেছিল জীবন্ত মানুষদের নিয়েই, কিন্তু অন্তিম দশা ঘটবার অনেক আগেই সেটা মৃতদেহে বোঝাই হয়ে গিয়েছিল।”

তাঁর কথাগুলি শুনে আমার চোখের সামনে যে বিস্ময়কর ঘটনার ছবি ভেসে উঠল তা দেখে আমি বললাম, “সমুদ্রে ভাসমান জাহাজগুলির কথা একবার ভাবুন—বাষ্পের টানে চলতেই থাকবে যতক্ষণ না অগ্নিকুণ্ডগুলি নিভে যাবে, অথবা কোনও সৈকতে আছড়ে পড়বে। হয়তো আজ থেকে এক শতাব্দী পরে অতলান্তিকের বুকে ভেসে বেড়াবে শতধা বিভক্ত প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে।”

লর্ড জন মন্তব্য করলেন, “এসব কথা আমি ঠিক জানি না, কিন্তু আমার মনে হয় এই সব কাণ্ডকারখানার পরে পৃথিবীটাই ‘ভাড়া দেওয়া হবে, খালি আছে’ হয়ে যাবে। একবার যখন পৃথিবী থেকে মানুষের ভিড় মুছে যাবে, তারপরেও আবার সেখানে মানুষ আসবে কোথা থেকে?”

চ্যালেঞ্জার গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “জগৎটা তো আগেও খালি হয়েছে; কিন্তু কোন নিয়মে আবার নতুন মানুষরা এসেছে সেটা আমাদের ধারণার অতীত সেই একই পদ্ধতি আবার কেন ঘটবে না?”

“প্রিয় চ্যালেঞ্জার, এটা অবশ্যই আপনার মনের কথা নয়?”

“প্রফেসর সামারলী, যেটা আমি মানি না তেমন কথা বলার অভ্যাস আমার নেই। আপনার মন্তব্যটা অতি তুচ্ছ।” তারপরেই দাড়ি বিদায় হলো, আর চোখের পাতা নেমে এল।

সামারলী কটুকণ্ঠে বললেন, “আপনি স্বমতে দাম্ভিক হয়েই জীবনটা কাটালেন, আর সেইভাবেই মরতেও চান।”

“আর আপনি তো মশায় কল্পনাহীন বিরোধী হয়েই বেঁচে আছেন, আর সেই খোলসের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার আশাও আপনি করেন না।”

লর্ড জন বলে উঠলেন, “সত্যি বলছি! আপনারা দু’জন যদি পরস্পরকে গাল- মন্দ করতেই আমাদের অক্সিজেনের সবটাই ফুরিয়ে ফেলতেন তো সেটাই হত আপনাদের মনের মতো কাজ। মানুষ আবার ফিরে এল কি না-এল তাতে আমাদের কি যায়-আসে? সেটা তো আমাদের কালে ঘটছে না।”

দূরের গাছপালার পিছনে যে বাড়িটা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল এবার সেটা জ্বলে উঠল। আমাদের চোখের সামনে আগুনের শিখাগুলি লকলক করতে লাগল।

লর্ড জন বললেন, “খুবই দুঃখের বিষয়।”

আমি মন্তব্য করলাম,”তা ঠিক, তবে ওতে কি যায়-আসে? পৃথিবীটা তো মরে গেছে। দাহকৰ্মই তো শ্রেষ্ঠ শেষকৃত্য।”

আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চ্যালেঞ্জার বললেন, “এ সব কথা থাক। এদিকে ডিনারের সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে। যা হোক কিছু খাবার ব্যবস্থা তো করতেই হবে। আমার ভাঁড়ারে ঠাণ্ডা মাংস, রুটি আর চাটনি আছে; তার সঙ্গে দুই বোতল ক্লারেট যুক্ত হলে খানাটা মন্দ হবে না। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ প্রিয়তমা—তুমি তো চিরদিনের দ্রৌপদী।”

কী আশ্চর্য, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিসেস চ্যালেঞ্জার কেন্দ্রস্থিত টেবিলের উপর বরফ-সাদা চাদরটা পাতলেন, তার উপর সাজিয়ে রাখলেন তোয়ালেগুলো, মাঝখানে বসিয়ে দিলেন বৈদ্যুতিক বাতিদানটা, এবং সভ্য সমাজের রীতিমাফিক সাদাসিদে আহার্যগুলি পরিবেশন করলেন। আরও এক অবাক ব্যাপার যে আমাদের ক্ষিধেটাও ছিল সর্বগ্রাসী।

চ্যালেঞ্জার বললেন, “আমাদের মানসিক অবস্থাটা তো বোঝাই যাচ্ছে। একটা মস্তবড় সংকট আমরা পার হয়েছি। তার মানে আণবিক বিক্ষোভ। তার মানেই মেরামতের দরকার। বিরাট দুঃখ বা বিরাট আনন্দ—দুটোই তীব্র ক্ষুধার জনক—যদিও আমাদের উপন্যাসকারগণ উপবাসের কথাই বলে থাকেন।”

আমি অসংকোচেই বললাম, “সেই জন্যই তো গ্রামের মানুষরা শেষকৃত্যের সময় প্রচুর ভোজের আয়োজন করে থাকে।”

“ঠিক তাই। আমাদের যুবক বন্ধুটি চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। তোমাকে আরেক টুকরো জিভ দিচ্ছি।”

গো-মাংসের টুকরোটা কাটতে কাটতে লর্ড জন বললেন, “অসভ্য মানুষরাও ঐ কাজটাই করে। আরুউইমি নদীর উজানে এক প্রধানকে কবরস্থ করার ঘটনাটা আমি দেখেছি—একটা বৃহদাকার জলহস্তীকে তারা ভক্ষণ করেছিল। নিউগিনির উজান অঞ্চলে অনেকে তো প্রয়াত মানুষটাকেই খেয়ে ফেলে। তবে—পৃথিবীতে যত রকম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ভোজ হয় তার মধ্যে হয়তো আমাদের আজকের ভোজটাই অদ্ভুততম।”

সামারলী আপত্তিসূচক গলায় বললেন,”যাই বলেন না কেন, সর্বজনীন মৃত্যু কিন্তু ভয়াবহ।”

চ্যালেঞ্জারও পালটা জবাব দিলেন, “আমি কিন্তু আগেই বুঝিয়ে বলেছি, যে কোনও একক মৃত্যুর চাইতে সর্বজনীন মৃত্যুর ভয়াবহতা স্বল্পতর হতে বাধ্য।”

লর্ড জন মন্তব্য করলেন, “যুদ্ধের বেলাতেও ঠিক তাই। আপনি যদি দেখেন যে একটি মানুষ মেঝেতে পড়ে আছে, তার বুকটা ভেঙে গেছে, মুখে একটা গর্ত হয়েছে, তাহলেই আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। কিন্তু সৌদান-এ আমি নিজের চোখে দেখেছি দশ হাজার মানুষ মরে পড়ে আছে, কিন্তু তাতে আমার মনে সে রকম কোনও অনুভূতি জাগেনি, কারণ আপনি যখন একটা ইতিহাস সৃষ্টি করছেন, তখন যে কোনও একটি মানুষের জীবন এতই ক্ষুদ্র মনে হয় যে তা নিয়ে মনে ক্ষোভ জাগে না। যখন একসঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষ মরে, যেমন আজ ঘটেছে, তখন সেই অসংখ্য মানুষের ভিড়ে আপনার নিজের মানুষটিকে আপনি খুঁজে নিতেই পারেন না।”

মহিলাটি ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, “আমি চাই এ-প্রসঙ্গটা এখানেই শেষ হোক উঃ জর্জ, আমার বড় ভয় করছে।”

“আমার ছোট্ট লক্ষ্মীটি, সময় যখন আসবে তখন তুমিই হবে সকলের চাইতে বেশি সাহসী। এতকাল আমি ছিলাম তোমার এক তর্জন-গর্জন সার বৃদ্ধ স্বামী, কিন্তু তুমি শুধু এই কথাটা মনে রেখো যে জি. ই. সিকে যেমনটি তৈরি করা হয়েছে সে ঠিক তেমনটিই হয়েছে, এ ব্যাপারে তার কোনও হাত ছিল না। আর যাই হোক, তুমি কি অন্য কাউকে পেতে চাইতে?”

“এত বড় পৃথিবীর আর কাউকে নয় প্রিয়তম”, কথাগুলি বলে মহিলাটি মি. চ্যালেঞ্জারের বৃষস্কন্ধটিকে জড়িয়ে ধরলেন। আমরা তিনজন জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে যে দৃশ্যটি আমাদের চোখে পড়ল তাতে আমরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

অন্ধকার নেমে এসেছে। মৃত জগৎটা বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন। কিন্তু ঠিক দক্ষিণ দিগন্তব্যাপী একটা দীর্ঘ সুস্পষ্ট রক্তিম রেখা যেন জীবনের প্রত্যক্ষ স্পন্দনের মতো একবার বাড়ছে, একবার কমছে, হঠাৎ লাফিয়ে একটা গাঢ় লাল শীর্ষবিন্দুতে উঠছে এবং তারপরেই মৃতবৎ নেমে যাচ্ছে, একটা উজ্জ্বল অগ্নি-রেখার উপর।

“লিউয়েস জ্বলছে”, আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম।

এক পা এগিয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, “না, ব্রাইটন জ্বলছে। পটভূমিতে বালিয়াড়ির বাঁকানো পিঠটা তো সকলেই দেখতে পাচ্ছেন। অগ্নিকাণ্ডটা ঘটছে ওই বক্ররেখাটা থেকে কয়েক মাইল দূরে। গোটা শহরই আলোয় আলো হয়ে যাবে।”

বিভিন্ন বিন্দুতে বেশ কয়েকটা রক্তিম ঝলক চোখে পড়ছিল; ওদিকে রেল লাইনের উপরকার ধ্বংসস্তূপ তখনও ধিকিধিকি জ্বলছিল; কিন্তু পাহাড়ের ওপারে যে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড চলছে তার তুলনায় সে সবই তো আলোর সূচাগ্র বিন্দুমাত্র আহা, এ নিয়ে, ‘গেজেট’-এ কী চমৎকার কপিই না লেখা যাবে! কোনও সাংবাদিক কি কখনও এমন একটা সুযোগ পেয়েছে—সব স্কুপের সেরা স্কুপ, আর তার মূল্য বুঝবার মতো কেউ কি আছে?

আর তখনই হঠাৎ আমার মনের মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠল একটা রেকর্ড সৃষ্টি করার সহজাত জ্ঞান। এই সব বিজ্ঞানীরা যদি জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তাঁদের মহৎকর্মে অনুরক্ত থাকতে পারেন, আমিই বা নিজের কর্তব্যে অবিচল থাকতে পারব না কেন? আমি যা চোখে দেখেছি, কোনও মানুষের চোখ তো আজ পর্যন্ত তা দেখেনি। কিন্তু যে ভাবেই হোক একটা দীর্ঘ রাত তো কাটাতেই হবে, আর অন্তত আমার পক্ষে তো ঘুমের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। যে সমস্ত তথ্য ও বিবরণ আমি সংগ্রহ করেছি তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতেই রাতের ক্লান্ত ঘণ্টাগুলি কেটে যাবে।

তাই তো এই মুহূর্তে আমার নিজের হাতে লেখা টিকা-টিপ্পনিসহ অন্য সব বিবরণ যে নোট-বইটাতে লিখে রেখেছি, আমাদের একটিমাত্র বৈদ্যুতিক টর্চের ম্লান আলোয় সেটাকেই আমার হাঁটুর উপর রেখে বসে আছি। আমার হাতে যদি একটু সাহিত্যের ছোঁয়া থাকত, তাহলে এক্ষেত্রে সেটা খুব কাজে লাগত। তবু যা আছে, সেই ভয়ংকর রাতের দীর্ঘায়ত আবেগ ও কম্পনগুলিকে অন্য অনেকের মনে পৌঁছে দেবার কাজটা তাতেই চলে যাবে বলেই মনে হয়।