প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের রণক্ষেত্রে গমন

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের রণক্ষেত্রে গমন

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মন মেজাজ যখন খুবই খারাপ থাকে তখন ভয়ে কেউ তাঁর কাছে যেতে সাহস পায় না। তাঁর এই মেজাজের উগ্রতা ও উত্তাপটা কেবল বাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাকে না। বিরুদ্ধ-মতবাদীদের আক্রমণ করে লেখা তাঁর অনেক উত্তপ্ত চিঠি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। দেবরাজ জোভ যেমন স্বর্গের সিংহাসনে বসে বজ্রনিক্ষেপ করেন মাঝে মাঝে, তেমনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারও ভিক্টোরিয়ার এক উঁচু ফ্ল্যাটে আপন আসনে বসে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে বজ্র নিক্ষেপ করেন। চ্যালেঞ্জার যখন তাঁর ঘরের টেবিলে বসে কাগজপত্র পড়তেন তখন কেউ ঘরে ঢুকতে পারত না। তাঁকে দেখে মনে হতো কোনও ক্ষুধার্ত সিংহ সামনে পড়ে থাকা হাড়-কঙ্কালের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রক্ত-মাংসের খোঁজ করছে। একমাত্র এনিডই সাহস করে ঘরে ঢুকতে পারত। তবু ঘরে ঢোকার সময় তার হৃৎপিণ্ডটা কেঁপে উঠত। ঠিক যেমন সবচেয়ে সাহসী পশুপালক কোনও হিংস্র জন্তুর খাঁচা খোলার সময় হৃৎপিণ্ডের মধ্যে একটা ভয়ের কম্পন অনুভব করে। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের দন্ত-জিহ্বার তীক্ষ্ণ আক্রমণ তাকে মাঝে মাঝে সহ্য করতে হত। তবে তার হাতে মার খাবার ভয় ছিল না—যে-ভয়টা অন্যদের ছিল।

চ্যালেঞ্জার পরলোকতত্ত্বের ব্যাপারটাকে অভিশপ্ত কুসংস্কার বলে মনে করতেন, তথাপি তিনি এটাকে কিছুতেই মন থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলে তার থেকে দূরে থাকতে পারতেন না। তিনি অনেক সময় পরলোকের বিষয়টাকে ছি ছি করে তুচ্ছজ্ঞান করতেন। তবু আবার অনেক সময় এই বিষয়টা কোথা থেকে এসে তাঁর মন জুড়ে বসত।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার শনিবার এ বিষয়ে তাঁর যে সব বই আছে সেই সব বইয়ের উপর কিছু লিখবেন। তারপর রবিবার আবার এই নিয়ে বসবেন। তবে পরলোকতত্ত্বের সমস্ত ব্যাপারটাই তাঁর কাছে অবান্তর বলে মনে হয়। এ বিষয়ে কিছু লেখা বা চিন্তা করার কাজটাকে তাঁর মনে হয় যেন জগতের নানা সমস্যার কথা এড়িয়ে গিয়ে অনেক নীচে এক অন্ধকার লোকে নেমে গিয়ে যত সব ভূত- প্রেতের কাহিনি নিয়ে নাড়াচাড়া করা।

তাঁর মতে ব্যাপারটা ক্রমশ খারাপ হয়ে উঠছে। যে ম্যালন একদিন ঠাণ্ডা মাথা ও পরিষ্কার যুক্তিবুদ্ধি-সম্পন্ন লোক ছিল, আজ সে ওই সব পরলোকবাদীদের শয়তানিতে প্রভাবিত হয়ে তাদের ভুল মতবাদের কবলে পড়ে গেছে। তারপর তাঁর মেয়ে যে এনিড বাইরের মানবসমাজের সঙ্গে তাঁর একমাত্র যোগসূত্র সেই এনিডও ওদের মতবাদের উপর কলুষিত হয়ে পড়েছে। সে ম্যালনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছে এবং সে নিজে এ বিষয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে। তিনি একটা বিষয়ে তদন্ত করে সংশয়াতীতভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সে ক্ষেত্রে মিডিয়াম সুপরিকল্পিতভাবে শয়তানী করে এক বিধবার মৃত স্বামীর বাণী এনে সেই বিধবাকে তার আয়ত্তাধীনে আনে। কিন্তু তার এই প্রমাণকার্যে কোনও ফল হয়নি। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও এই একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টা বিচার করতে নারাজ হয়। এনিড বা ম্যালন তাদের মতে জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রতারক আছে। যারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে বর্তমানের লাভ- লোকসান দিয়ে বিচার করে।

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা তখন ঘটল যখন পরলোকবাদীরা প্রকাশ্যে প্রফেসরের নামে অপমানজনক কথা বলতে শুরু করল। এই ব্যাপারে যে পরলোকবাদীদের নেতৃত্ব দিল সে এমনই একজন যার ন্যূনতম শিক্ষা-দীক্ষা নেই।

অবশেষে চ্যালেঞ্জার বিরোধীদের উচিত শিক্ষা দান করার জন্য বিষয়টা সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান সংগ্রহ না করেই অলিম্পাস-এর চূড়া থেকে নেমে এক বিতর্কসভায় যোগ দিতে চাইলেন, যেখানে তিনি বিরোধী দলের মনোনীত প্রতিনিধিদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন। তিনি লিখেছেন—আমি এ বিষয়ে সচেতন যে আমি অন্যান্য সমপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের মতো আমার আসন থেকে নেমে গিয়ে এই বিতর্কে যোগ দিয়ে একটা অবান্তর ও অদ্ভুত বিষয়কেই মর্যাদা দান করতে চলেছি। এতে আমাদের মস্তিষ্কেরই শক্তির যে অপচয় হয় তা আর কিছুতে হতে পারে না। কিন্তু কাজটা যতই নোংরা হোক জনসাধারণকে প্রকৃত সত্য বোঝানোর জন্য এটা করতেই হচ্ছে। এই ভাবে মাঝে মাঝে হাতের যত সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে কুসংস্কারের ধুলোবালি থেকে জমে ওঠা মাকড়সার জালগুলোকে ঝাঁটা দিয়ে দূর করে দিতে হয়। কুসংস্কারের আবর্জনা একমাত্র বিজ্ঞানের হস্তক্ষেপ ছাড়া কখনও দূরীভূত হয় না। এইভাবে চ্যালেঞ্জার এক ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে গেলেন। পরলোক ও প্রেতাত্মাদের সম্বন্ধে তিনি কী বলেন তা শোনার জন্য সবাই অপেক্ষা করতে লাগল।

সেই বিতর্কসভায় যা যা ঘটেছে বা যে-সব কথা বলা হয়েছে তা সব গোপনে নথিভুক্ত করা হয়েছে। সব কথা বলা যাবে না। সে সব কথা বলার প্রয়োজন নেই। শুধু এইটুকু মনে রাখলেই চলবে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী চ্যালেঞ্জার তাঁর যুক্তিবাদী সমর্থকদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে কুইন্স হলে প্রবেশ করলেন। তিনি কীভাবে কল্পনাপ্রবণ পরলোকবাদীদেরকে আঘাতে আঘাতে ধরাশায়ী করে পেলেন তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠল সবাই। সভায় উপস্থিত লোকজন মতের দিক থেকে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। তারা সকলেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইল। মঞ্চে অনেক যুক্তিবাদী অজ্ঞেয়বাদী চ্যালেঞ্জারকে তাদের বিশ্বাসী মনের ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে লাগলেন। তাদের মধ্যে ‘লিট্যারেরি গিজেট’ ও ‘ফ্রী থিঙ্কার’ কাগজের পাঠকও ছিলেন।

ঘরের মধ্যে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন যোসেফ বমার যিনি ধর্মের অবান্তরতা সম্বন্ধে এক বিখ্যাত বক্তৃতা দেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এড্‌ওয়ার্ড মোল যিনি মানবজাতি সম্বন্ধে এক জোরালো বক্তৃতা দেন। অন্য দিকে মেইলি ও তার স্ত্রী বসেছিল। মেইলির হলুদ দাড়িটা আগুনের শিখার মতো জ্বলজ্বল করছিল। এছাড়া ছিলেন মর্ভেইন নামে এক সাংবাদিক আর কুইন্স স্কোয়ার-এর স্পিরিচুয়াল অ্যালায়েন্স নামক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা। তাছাড়া সাইকিক কলেজ, স্টেট ব্যুরো ও আউটলাইন চার্চের লোকজনও বক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য উপস্থিত ছিল। বলশোভার, যার বাড়িতে অনুষ্ঠানে বসত সেই বলশোভারের উৎফুল্ল মুখখানা দেখা যাচ্ছিল। তিনি তার হ্যামার স্মিথের বন্ধুদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। রেলকুলি মিডিয়াম টার্বেন ও তার স্ত্রী, পাদ্রী সাহেব রেভারেন্ড চার্লস ম্যাসন, লর্ড রক্সটন, ম্যালন, ড. অ্যাটকিনসন প্রভৃতি আরও অনেকে সেই সভায় চেনা-অচেনা ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।

দুই মতবাদে বিভক্ত দুটি দলের এই বিতর্কসভায় কুইন্স বেঞ্চ-এর বিচারপতি গেভারসন সভাপতিত্ব করতে সম্মত হয়েছেন। তিনি গম্ভীরভাবে তাঁর আসনে বসে ছিলেন। এই সমালোচনামূলক বিতর্কসভায় ধর্মের মূল প্রাণকেন্দ্রটি-ই যেন বিচার্য বিষয় ছিল। অথচ সুসংগঠিত চার্চ এ ব্যাপারে উদাসীন ছিল। চার্চের প্রতিনিধিরা অর্ধচেতন ও তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ঝিমোচ্ছিল। তারা এটা বুঝতে পারছিল না যে, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা এই সভায় উপস্থিত হয়ে সমগ্রভাবে চার্চ ও ধর্মবিশ্বাসের উপর তদন্ত চালিয়ে নির্ণয় করবেন চার্চের অস্তিত্ব থাকবে কিনা। ধর্মের প্রয়োজন আছে কিনা অথবা ধর্ম বা চার্চ অন্যরূপ পরিগ্রহ করে বেঁচে থাকবে কিনা।

প্রথম সারির বাঁদিকে শিষ্যগণসহ প্রফেসর চ্যালেঞ্জার বসে ছিলেন। তাঁর দাড়িটা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সামনের দিকে উঁচু করা ছিল। তাঁর মুখে ছিল আধফালি হাসি আর তাঁর ধূসর মুখে ফুটে উঠেছিল অসহিষ্ণুতার ভাব। তাঁর পাশে বিনীতভাবে বসে থাকা এক ভদ্রলোকের মাথার উপর চ্যালেঞ্জারের টুপিটা প্রায়ই ঠেকছিল। সেই ভদ্রলোক প্রায়ই ভয়ে ভয়ে ক্ষমা-প্রার্থনার ভঙ্গিতে তার দক্ষ শক্তিমান বিরোধীর দিকে তাকাচ্ছিল। আতঙ্কে তার মুখখানা ম্লান হয়ে উঠেছিল। এই বিনয়ী ভদ্রলোকের নাম জেমস্ স্মিথ। যারা জেমস্ স্মিথকে চেনে তারা জানে এই সরল সাদাসিধে মানুষটির বৈশিষ্ট্যহীন সাধারণ চেহারার অন্ধকারে আজকের সভার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তত্ত্বমূলক জ্ঞান তার যথেষ্ট আছে—যে জ্ঞান খুব কম লোকেরই আছে। সাইকিক্যাল রিসার্চ সোসাইটির বিজ্ঞ ব্যক্তিরা জেমসের মতো যাঁরা হাতে-কলমে প্রেতচর্চা করেন তাদের তুলনায় শিশুমাত্র। অদৃশ্য অশরীরী আত্মাদের সঙ্গেই অতিবাহিত হয় জেমসের সময়। জেমসের মতো লোকেরা যে-জগতে বাস করে সেই জগতের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না এবং দৈনন্দিক বাস্তব জগতে তারা কোনও কাজে লাগে না। তবু কিছু সংবাদপত্রের সম্পাদক ইতস্তত ও বিক্ষিপ্ত এক বিরাট জনমতের দ্বারা স্মিথের পা দুটিকে এক দৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর স্থাপন করেছে। স্মিথের সহজাত বুদ্ধিবৃত্তি বহুমুখী শিক্ষার দ্বারা কলুষিত হয়নি। আর তার ফলে তিনি সহজেই জ্ঞানের একটি বিশেষ ক্ষেত্রে মনসংযোগ করতে পেরেছেন। কোনও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর মনসংযোগের নিবিড়তা মানুষকে এক বিশেষ বুদ্ধি দান করে। চ্যালেঞ্জার এটা বুঝতেই পারেননি যে আজকের বিতর্কটা হলো এক উজ্জ্বল বুদ্ধি ও বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন একদল শৌখিন গবেষক বা তাত্ত্বিক আর বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন একদল পেশাদারের মধ্যে।

সভার সকলেই এ কথা স্বীকার করে যে চ্যালেঞ্জার সভার উদ্বোধন করার পর থেকে আধঘণ্টা কেবল বাগ্মিতার আড়ম্বর ও যুক্তিজাল বিস্তারের মধ্যে দিয়ে কেটে যায়। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো গম্ভীর কণ্ঠস্বর একমাত্র পঞ্চাশ ইঞ্চি চওড়া বক্ষস্থল-বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষেই সম্ভব হতে পারে। তার এই কণ্ঠস্বর এক ছন্দোময় তালে ওঠানামা করে, যা শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তিনি যেন সমগ্র মানবজাতির এক নেতা এবং যে-কোনও জনসভাকে স্বমতে চালিত করার ক্ষমতা নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি বর্ণনাশক্তিরও অধিকারী এবং পরিহাসরসিক। মানুষকে বোঝানোর ক্ষমতা তাঁর অপরিসীম।

তিনি প্রথমে সভ্যতাবর্জিত বর্বর আদিবাসীদের জীবন নিয়ে বলতে শুরু করলেন। বললেন, এই সব আদিবাসীরা যারা মুক্ত আকাশের তলে পশুর মতো বাস করে তাদের মধ্যে প্রাণের বিকাশ স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠেছে। তারা বজ্ৰ ও বৃষ্টিটাতের কারণ কিছুই বোঝে না। এই সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনার পিছনে কোনও উপকারী অথবা হিংসা-ভাবাপন্ন শক্তি কাজ করছে কিনা তাও তারা জানে না। বিজ্ঞান প্রকৃতির এইসব প্রাকৃতিক ঘটনার শ্রেণীবিন্যাস করে তার ব্যাখ্যা করেছে।

সুতরাং আমাদের জগতে বাইরে কোনও আত্মা বা অদৃশ্য বস্তুতে বিশ্বাস এক মিথ্যা আশ্রয়ের উপর গড়ে উঠেছে। এই বিশ্বাসই বর্তমান সমাজে স্বল্পশিক্ষিত শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে পরলোকবাদ হিসাবে ফিরে এসে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞানের কাজ হলো এই ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল প্রবৃত্তির প্রতিরোধ করা। বিজ্ঞানের কর্তব্য মানেই বিজ্ঞানীরা কর্তব্য। আর এই কর্তব্যের খাতিরেই তিনি বিতৃষ্ণা সত্ত্বেও তাঁর পড়ার ঘর থেকে এই প্রকাশ্য জনসভার মঞ্চে এসে উপস্থিত হয়েছেন।

এরপর তিনি এমন এক গল্প বলতে শুরু করলেন যেটা খুব আস্বাদনীয় নয়। গল্পটা হচ্ছে একটা অদ্ভুত ভূতকে নিয়ে। তিনি এক দৃশ্যের কথা বললেন, যে দৃশ্যের একদিকে ছিল কোনও এক মৃতলোকের কিছু হাড়। অন্যদিকে এক বিধবা বসে বসে চোখের জল ফেলছিল। এই সব লোকগুলো মানবজাতির মতে হায়না জন্তুর মতো। যারা মৃতলোকদের কবরগুলো নিয়ে ছেঁড়া-খোঁড়া করে।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের এই কথায় যুক্তিবাদীরা হর্ষধ্বনি করে উঠল এবং পরলোকবাদীদের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল।

এই শ্রেণীর মানুষদের সকলেই কিন্তু দুর্বৃত্ত বা দুষ্ট প্রকৃতির নয়।

এই কথায় বিরোধীদের মধ্যে একজন বলে উঠল, ধন্যবাদ প্রফেসর।

প্রফেসর আবার বলতে লাগলেন, কিন্তু তারা নির্বোধ। যে লোক বিশ্বাস করে যে তার ঠাকুরমা খাবার টেবিলের তলা থেকে পরলোকের সংবাদ পেত! তাকে নির্বোধ বললে কি অত্যুক্তি করা হয়? কোন অসভ্য বর্বর উপজাতির লোক কি এই ধরনের অদ্ভুত কুসংস্কারের অন্ধকার গহ্বরে ভেসে এসেছে? কিন্তু এইসব লোকেরা মৃত্যুর মর্যাদা কেড়ে নিয়ে সমাধিস্তম্ভের মধ্যে প্রশান্ত বিস্তৃতির মধ্যে তাদের নোংরা কাজগুলোকে ঢুকিয়ে দেয়। এইসব কথা বলা একটা ঘৃণ্য কাজ। তবু আমাকে তা করতে হচ্ছে। কারণ একমাত্র ধারাল ছুরি ছাড়া ক্যান্সার নামক দূষিত ঘায়ের বৃদ্ধিকে রোধ করা যায় না। পরলোকে মৃত মানুষেরা যে-জীবন যাপন করে সেই জীবনের প্রকৃতি নিয়ে অদ্ভতু জল্পনা-কল্পনা করার কোনও প্রয়োজন নেই জীবিত মানুষদের। এ জগতে আমাদের অনেক কাজ করার আছে। এ জীবন বড় সুন্দর। যাদের জীবনের কর্তব্য ও সৌন্দর্য সম্বন্ধে বোধ আছে তারা কখনও এমন কোনও বিজ্ঞান নিয়ে ঘাঁটাখাটি করবে না যার উৎসাহ হচ্ছে প্রতারণা। এই প্রতারণার জাল শত শত বার ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, তবু এই প্রতারণামূলক কাজ নতুন করে বহু মানুষকে আকর্ষণ করে। বহু নির্বোধ মানুষকে আকর্ষণ করে। এই সব লোকদের উন্মাদসুলভ অন্ধ বিশ্বাস আর যুক্তিহীন সমস্যার জন্য অপরের কোনও যুক্তিকে তারা মানতেই চায় না।

এই হলো প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের শক্তিশালী মতবাদের আসল সংক্ষিপ্তসার। তাঁর এইসব কথা শুনে বস্তুবাদীরা জোর উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠল। পরলোকবাদীদের মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠল। অবশেষে তাদের এক মুখপাত্র উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখখানা ম্লান দেখালেও এক প্রবল বিরোধী আক্রমণের উত্তর দেবার জন্য সংকল্পে দৃঢ় হয়ে উঠেছিল সে মুখ।

এই মুখপাত্র ভদ্রলোকের চেহারা এবং কণ্ঠস্বরের মধ্যে এমন কোনও গুণ ছিল না যা চ্যালেঞ্জারকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু তাঁর কথা বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল এবং তিনি এমনভাবে যুক্তিগুলোকে উত্থাপন করছিলেন যাতে মনে হচ্ছিল তিনি এই কাজে দক্ষ। মনে হচ্ছিলে তিনি এমনই একজন সুদক্ষ কর্মী যাঁরা কোথায় কি যন্ত্রপাতি প্রয়োগ করতে হবে সে সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞান আছে। তাঁর কথা বলার ভঙ্গিমাটা এমন ভদ্র ও ক্ষমাপ্রার্থীর মতো বিনয়ী যা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন যুদ্ধের আগেই পরাজিত হয়ে পড়েছেন। মনে হচ্ছিল তিনি যেন এই অনুভব করছেন যে তিনি নিজের ক্ষমতার পরিমাপ না করেই এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে এসেছেন যাকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্রদ্ধা করেন। তিনি হয়ত ভাবছিলেন যে সব কৃতিত্বের জন্য প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের নাম সারা জগতে প্রতিটি ঘরে ঘরে উচ্চারিত হয়, সেই সব কৃতিত্বের দীর্ঘ তালিকায় একটি মাত্র অভাব আছে আর সেই অভাবটাকে তুলে ধরার জন্যই আজকের এই সভায় তাঁর বক্তব্য জানাতে এসেছেন।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের বক্তৃতা তিনি মন দিয়ে শুনেছেন। তাঁর বাগ্মিতা প্রশংসনীয়। তবে তাঁর বক্তৃতার কথাগুলো শুনে আশ্চর্য হয়ে গেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে একথা পরিষ্কার বোঝা যায় তিনি পরলোকবাদ-বিরোধীদের দ্বারা প্রদত্ত বিকৃত তথ্য থেকে তাঁর বক্তব্য খাড়া করেছেন। পরলোকবাদীদের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস সম্বন্ধীয় যে-সব তথ্য আছে সে-সব তথ্য তিনি পড়েননি অথবা পড়েও গ্রাহ্য করেননি।

মধ্য-ভিক্টোরিয় যুগে প্রতারণামূলক বিভিন্ন ছলচাতুরির উৎস ছিল অজ্ঞতা। চ্যালেঞ্জার টেবিলের পায়ায় হাত দিয়ে পরলোকবাসী যে-মহিলার প্রেতাত্মার কথা বলেছেন, সে-মহিলা পরলোকতত্ত্বের প্রবক্তা নয়। সুতরাং তার কথা এখানে উল্লেখ করা অবান্তর। এইসব কথা প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো ব্যক্তির মুখে শোভা পায় না। তাঁর এটা জানা উচিৎ, প্রতারক মিডিয়ামরা পরলোকবাদীদেরই সবচেয়ে বড় শত্রু। কোন এক মিডিয়ামের প্রতারণার কাজ ধরা পড়লে পরলোকবাদীদের পক্ষ থেকে তাকে ধিক্কার দেওয়া হয়। পরলোকবাদীদের দ্বারাই সে নিন্দিত হয়। প্রতারক মিডিয়ামের প্রতারণার কলা-কৌশল পরলোকবাদীরাই ধরে ফেলে এবং তারাই ঘৃণা ও ক্রোধের সঙ্গে ওই প্রতারকদের হায়নার সঙ্গে তুলনা করে। কেউ যদি স্বাক্ষর জাল করে ছলনার দ্বারা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করে তাহলে কেউ কি ব্যাঙ্ককে দোষ দেয়? এই ধরনের নির্বাচিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সভায় এই রকম নিম্নবর্ণের বিতর্কে নামা বৃথা সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যদি পরলোকবাদের সঙ্গে ধর্মের জটিল সম্পর্কটাকে অস্বীকার করতেন অর্থাৎ পরলোকবাদকে ধর্ম থেকে একদম বিচ্ছিন্ন করে দেখতেন তাহলে তার বক্তব্যের জবাব দেবার কাজটা আরো কটিন হত। কিন্তু তিনি বস্তুবাদী হিসাবে ধর্ম ও পরলোকতত্ত্ব দুটোকেই অস্বীকার করেছেন। ফলে নিজের অবস্থাকে হেয় করে তুলেছেন। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যে বিখ্যাত শরীরতত্ত্ববিদ প্রফেসর রিচেটের লেখা পড়েছেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। প্রফেসর রিচেটের কাজ তিরিশ বছর ধরে চলে আসছে। রিচেট পরলোকতত্ত্বের সব দিকগুলোকে পরীক্ষা করে দেখেছেন। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার হয়তো শ্রোতৃবৰ্গকে জানাবেন তাঁর কোন্ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জন্য তিনি রিচেট এবং কুককে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বর্বর বলার সাহাস পেলেন। তাঁর বিরোধীরা গোপনে যে সব গবেষণা করেছেন জনগণ সে সম্পর্কে কিছুই জানে না। সেই ক্ষেত্রে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নিজে এ বিষয়ে গবেষণা করে জগৎকে জানাতে পারতেন। তা না করে যারা এই বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বাইরের জগতে তা প্রকাশ করেছে তাদের উপহাস করা এক অবৈজ্ঞানিক ও অশোভন কাজ।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের বক্তৃতায় বাগ্মিতা যাই থাক, সে বক্তৃতায় এমন অনেক কথা বলেছেন যা উত্তরের অপেক্ষা রাখে। কিন্তু তাঁর কথা শুনে মনে হলো তার উত্তর তিনি নিজেই জানেন না। সে উত্তর দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর নেই। তিনি শুধু নিজের মতের কথাই বলেছেন। বিপক্ষদের মতামত গ্রাহ্য করেননি। মনে হয় তিনি শুধু সেই সব পরলোকবাদী ও অবিমৃষ্যকারী লেখকদের লেখাই পড়েছেন যারা কোনও বিষয়ে ভাল করে অনুসন্ধান না করে বা তার গভীরে না গিয়ে কেবল উপরিপৃষ্ঠে বিচরণ করেন।

চ্যালেঞ্জার উত্তর দান না করে রেগে ওঠেন। সিংহের মতো কেশর দুলিয়ে গর্জন করতে থাকেন। তাঁর চোখ দুটো জ্বলতে থাকে। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর সমস্ত হলঘরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তিনি বলে ওঠেন, কোন অধিকারে তারা আশা করে যে বিজ্ঞানের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের কাজকর্ম বন্ধ করে তাদের উন্মাদসুলভ অনুমানগুলোর সত্যতা যাচাই করার জন্য সময় নষ্ট করবে? কতকগুলো জিনিস স্বতঃপ্রমাণিত তা স্পষ্ট বোঝা যায়। তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। বক্তার উক্তির মধ্যে থাকে প্রমাণের বীজ। যদি কোন ভদ্রলোক—যার নাম জনসাধারণের কাছে পরিচিত নয়—দাবি করেন যে তিনি পরলোক থেকে প্রেতাত্মাদের আনতে পারবেন, তাহলে এই বিজ্ঞ ও সংস্কারমুক্ত দর্শকদের সামনে তাঁকে তা করতে দিন। যদি তিনি বলেন তিনি পরলোকের বাণী শুনতে পান তাহলে আমাদের সেই বাণী শোনাতে দিন।

পরলোকবাদীরা এই কাজ প্রায়ই করে থাকেন।

চ্যালেঞ্জার বললেন, আপনি তা বললেও আমি তা স্বীকার করব না। আমি আপনার দায়িত্বহীন মন্তব্যগুলো শুনতে এতই অভ্যস্ত যে সেগুলোকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে পারি না।

বক্তার এই কথায় সভায় এক সোরগোল উঠল। বিচারক গ্রেভারসন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

বক্তা আবার আগের কথার জের টেনে বলতে লাগলেন, যদি তিনি বলেন ঊর্ধ্বতন স্তর থেকে তাঁরা প্রেরণা পান তাহলে পেখহ্যাম রাই খুনের রহস্য উদঘাটন করুন। যদি স্বর্গের দেবদূতদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকে তাহলে তিনি আমাদের এমন দর্শনতত্ত্ব যা কোনও সত্যভাবের দ্বারা উদ্ভাবিত কোন তত্ত্ব থেকে অনেক উচ্চস্তরে। বিজ্ঞানের এই মিথ্যা আড়ম্বর অজ্ঞতারই এক ছদ্মরূপ। পরলোক সম্বন্ধীয় কল্পনাজনিত যতসব ভূতপ্রেত ও এক্টোপ্লাজম নিয়ে এইসব দুর্ভেদ্য কথার কচকচানি কু-সংস্কার ও অজ্ঞতার অন্ধকার দ্বারা সৃষ্ট এক অবৈধ সন্তান ছাড়া কিছুই নয়। যেখানে কোনও ঘটনার বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, সেখানে কোনও কোনও লোক দুর্নীতির কথা তুলেছে। প্রতিটি মিডিয়াম হলো প্রতারক।

এমন সময় মিডিয়াম লিনডেনের প্রতিবেশী এক মহিলার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। “আপনি মিথ্যাবাদী।”

সভাগৃহ পরলোকবাদের সমর্থকদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল।

বক্তৃতাটা ছিল খুবই জোরালো কিন্তু দর্শকদের উপর তার বিশেষ প্রভাবটা দেখা গেল না। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নামে মহান ব্যক্তিটি কিছুটা ঘা খেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার উপযুক্ত হাতিয়ার বা সাজ- সরঞ্জামের বস্তু সংগ্রহ করে আসা উচিৎ ছিল তাঁর। তা না থাকায় তিনি কতগুলো ক্রুদ্ধ বাক্যবিন্যাস আর কতকগুলো দায়িত্বহীন মন্তব্যের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্রুদ্ধ ও দায়িত্বহীন মন্তব্য একমাত্র সেখানেই করা যায় যেখানে এই সব কথার সুযোগ নেবার মতো বিপক্ষদলের কেউ নেই। পরলোকবাদীরা ক্রুদ্ধ না হয়ে আনন্দিতই হলো। বস্তুবাদীরা অস্বস্তিবোধ করতে লাগল।

এমন সময় জেমস স্মিথ তাঁর শেষ কথা বলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে ছিল দুষ্টু হাসি। তাঁর গোটা চেহারাটার মধ্যে ত্রাস সঞ্চারকারী একটা ভাব ছিল।

তিনি বললেন, আমরা এই সুযোগ্য বিরোধীর কাছ থেকে আরও বৈজ্ঞানিক মনোভাব আশা করেছিলাম। এটা আশ্চর্য ঘটনা যে যখন কোনও বিজ্ঞানী ক্রুদ্ধ ও বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন তখন তিনি তাঁর প্রতিপক্ষদের প্রতি হাস্যাস্পদ বিরোধিতায় ফেটে পড়েন। তাঁর মনে রাখা উচিৎ তাঁর প্রতিপক্ষরা কোনও বিষয়ে পরীক্ষা না করে সেটাকে বাজে বলে বাতিল করেন না। আমরা সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে বেতার দেখছি। এইভাবে কত অসম্ভব বস্তুকে সম্ভব হতে দেখেছি আমরা। আগে থেকে এ কথা বলা খুবই বিপজ্জনক যে কোন জিনিস অসম্ভব। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার এই ভুলের মধ্যে পড়ে গেছেন। তিনি তাঁর সেই জ্ঞানের উপর নির্ভর করেছেন যে জ্ঞান তিনি তাঁর নিজস্ব বিষয়ের বুৎপত্তি থেকে লাভ করেছেন। কিন্তু যে বিষয়ে তাঁর বুৎপত্তি নেই, সে বিষয়ে তাঁর নিন্দা করা উচিৎ নয়। আসল কথা এই যে তিনি একজন শরীরতত্ত্ববিদ, পদার্থবিদ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি পরলোকতত্ত্বের উপর ইচ্ছামতো মন্তব্য করবেন এবং তাকে নসাৎ করার চেষ্টা করবেন।

এটা এখন আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নিজেকে যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলে ভাব দেখাচ্ছেন সেই বিষয়ে লিখিত প্রামাণ্য লেখাগুলো পড়েননি। তিনি কি দর্শকদের বলতে পারেন স্কেনেক নটজি মিডিয়াম হিসাবে কেমন? তিনি কি বলতে পারেন লিপজিগে প্রফেসর জোলনার-এর পরীক্ষাকার্যের বিষয়বস্তু কী? তিনি কি এখনও নীরব? কিন্তু এগুলো হলো আলোচ্য বিষয়ের এক-একটি দিক। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ব্যক্তিগতভাবে সরল মন নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে চাননি। কিন্তু তাঁর দিক থেকে সরলতার প্রয়োজন ছিল। প্রফেসর কি জানেন, যে এক্টোপ্লাজামকে তিনি উপহাস করেছেন সেই এক্টোপ্লাজম-এর অস্তিত্ব কুড়িজন বিশিষ্ট জার্মান প্রফেসর স্বীকার করেছেন? এই সব ভদ্রমহোদয়গণ যা জোর দিয়ে বলেছেন এবং যে মত প্রকাশ করেছেন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার কেমন করে তা অস্বীকার করবেন? তিনি কি তাদের বিরোধিতা করে চলবেন, তারা অপরাধী অথবা নির্বোধ! আসল কথা এই যে, তিনি আলোচ্য বিষয়টা ভালভাবে না জেনে এই হলঘরে বক্তৃতা দিতে এসেছেন এবং এই প্রথম বিষয়টা শিখছেন। একটা কথা তাঁর জানা নেই যে পরলোকতত্ত্বের ব্যাপারটাকে এই আলোকিত হলঘরে সকলের সামনে প্রকাশিত করা যায় না। তিনি তা জানলে কখনই এই অসঙ্গত অনুরোধ করতেন না। পরলোকতত্ত্বের প্রতিটি শিক্ষার্থী একথা জানে যে পরলোক থেকে আগত কোনও প্রেত আলোর মধ্যে মিলিয়ে যায়। অশরীরী প্রেত কোনও প্রকারে শরীর ধারণ করলেও সে-শরীর আলো সহ্য করতে পারে না। যেমন পেকহাম রাই মার্ডার কেসের ক্ষেত্রে কেউ দাবি করে না যে দেবদূতদের জগৎ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সন্নিহিত কোনও স্থান। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো ব্যক্তির পক্ষে এইভাবে জনসাধারণের চোখে ধুলো দেওয়া উচিৎ কাজ হয়নি।

এমন সময় এক বিস্ফোরণ ঘটল। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তার চেয়ার ঘষতে লাগলেন। তিনি তাঁর দাড়িটা নিয়ে নিজেই টানাটানি করতে লাগলেন। তিনি চোখদুটো বড় বড় করে বক্তার দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর তিনি হঠাৎ আহত সিংহের মতো লাফ দিয়ে সভাপতির টেবিলের সামনে গিয়ে হাজির হলেন। সভাপতি ভদ্রলোক তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে অর্ধনিদ্রিত অবস্থায় ছিলেন। তার হাত দুটো কোলের উপর জড়ো করা ছিল। হঠাৎ এক প্রেতমূর্তির মতো চ্যালেঞ্জার তাঁর সামনে এসে পড়তেই তিনি ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। আর তার ফলেই তিনি অর্কেস্ট্রর উপর পড়ে গেলেন।

সভাপতি চ্যালেঞ্জারকে বললেন, বসুন স্যার, বসুন।

চ্যালেঞ্জার গর্জন করে বলে উঠলেন, না, আমি বসব না। সভাপতি হিসাবে আমি আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি এবং প্রশ্ন করছি, আমাকে কি এখানে অপমান করার জন্য আনা হয়েছে? সভার এইসব কাজকর্ম অসহ্য। আমি আর সহ্য করব না। আমার ব্যক্তিগত সম্মান নিয়ে যেখানে টানাটানি হয় সেখানে নিজের হাতে ব্যাপারটা তুলে নেওয়াই হবে আমার পক্ষে ন্যায়সঙ্গত কাজ।

যারা অপরের মতামত সহ্য করতে পারেন না চ্যালেঞ্জার তাঁদের অন্যতম। অপরের কেউ তাঁর মতের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করলেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এ বিষয়ে তিনি অতিমাত্রায় সচেতন। বিরোধী বক্তার আক্রমণাত্মক বাক্যগুলি কাঁটা তারের বেড়ার মধ্যে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের মতো ভয়ঙ্কর করে তুলেছে চ্যালেঞ্জারকে। তিনি সব কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে আর কোনও কথা না বলে সভাপতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে একটা ঘুষি তুললেন। তাঁর প্রতিপক্ষ বক্তার মুখে উপহাসের হাসি ফুটতেই তা দেখে চ্যালেঞ্জার আরও রেগে গিয়ে স্থূলদেহী সভাপতিকে মঞ্চের উপর টেনে আনলেন। সভায় তুমুল গণ্ডগোল শুরু হলো। যুক্তিবাদীদের অর্ধেক নিন্দায় মুখর হয়ে উঠল এবং বাকি অর্ধেক তাদের নেতার সমর্থনে ‘শেম্’ ‘শেম্’ বলে চিৎকার করতে লাগলেন। বস্তুবাদীদের অনেকে ধিক্কারসূচক চিৎকারে ফেটে পড়ল। এবং তাদের অনেকেই তাদের নেতাকে দৈহিক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মঞ্চের দিকে ছুটে গেল।

লর্ড রক্সটন ম্যালনকে বললেন, আমাদের প্রিয় বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি ওকে সরিয়ে নিয়ে না যাই তাহলে উনি কাউকে খুন করে বসবেন। বৃদ্ধ হলেও ওঁর কোনও দায়িত্ববোধ নেই। রাগের মাথায় হঠকারিতার সঙ্গে কোন কাজ করে ফেললে পরে ওকে দুঃখভোগ করতে হবে। গোটা মঞ্চটা ক্রুদ্ধ জনতার ভিড়ে ভরে উঠল। পরস্পরের মধ্যে বিরাট বাকযুদ্ধ চলতে লাগল। সে তুলনায় শ্রোতারা অনেকেই শান্ত ছিল। এই সময় লর্ড রক্সটন ও ম্যালন তাঁদের কনুই দিয়ে ভিড় ঠেলে মঞ্চের উপর চ্যালেঞ্জারের পাশে গেলেন। তারপর কিছুসংখ্যক ব্যক্তির সাহায্যে তাকে অনেক করে বুঝিয়ে সেখান থেকে ধরে নিয়ে এলেন। চ্যালেঞ্জার তখনও রাগে গর্জন করতে করতে তাঁর অভিযোগের কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন। তুমুল হট্টগোলের মধ্যে সভা ভঙ্গ হলো।

পরদিন সকালে ‘দি টাইমস্’ পত্রিকা এই ঘটনাটিকে সবচেয়ে শোচনীয় এক ঘটনা বলে মন্তব্য করল। এই ঘটনা বিতর্কসভার বিপদের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে দিল। এই সভায় এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় যা বক্তা অথবা শ্রোতাদের একটা বিদ্বেষের আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। একজন বিশ্ববিখ্যাত প্রফেসর তাঁর প্রতিপক্ষকে কদর্য ভাষায় গালি দেন। এর দ্বারা বোঝা যায় দুই পক্ষের বিতর্ক- বিবাদ বক্তাদের কত নীচে নিয়ে যেতে পারে।

এই ঘটনার পরদিন সকালে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তাঁর ঘরে বসে দি টাইমস পত্রিকাটি খুলে তাতে প্রকাশিত সেই অবাঞ্ছিত ঘটনার বিবরণ পড়লেন, তখন তাঁর মেজাজ রুক্ষ হয়ে উঠল এবং তাঁর ভ্রূ-দুটো কুঁচকে উঠল। কিন্তু ম্যালন তাঁর এই মন-মেজাজ অবস্থার কথা না জেনেই বা না ভেবেই নিতান্ত অন্তরঙ্গ হয়ে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য ঘরে ঢুকল। পরে বুঝল এই মুহূর্তে প্রফেসরের ঘরে ঢোকাটা তার পক্ষে বিচক্ষণতার কাজ হয়নি। তবে এই মুহূর্তটা বেছে নেবার একটা কারণও আছে। চ্যালেঞ্জার মানুষটা বদমেজাজী হলেও তাঁর প্রতি তার একটা গভীর শ্রদ্ধার ভাব আছে। আর এই জন্যই সে জানতে চায় গত রাতের জনসভায় ঘটে যাওয়া অবাঞ্ছিত ঘটনাটা কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তাঁর মনে।

ম্যালনকে ঘরে ঢুকতে দেখেই প্রফেসর চ্যালেঞ্জার “অসহ্য” বলে চিৎকার করে উঠলেন।

ম্যালনের মনে হলো তিনি সারা রাতই বারবার এ কথাটা গর্জন করেছেন।

তিনি আবার ম্যালনকে বললেন, তুমি তো সেখানে উপস্থিত ছিলে। ওইসব লোকগুলোর প্রতি তোমার তো আবার ঢালাও সহানুভূতি আছে। একথা তোমাকে স্বীকার করতেই হবে যে সভায় ওদের আচরণ একেবারে অসহ্য। সভার কাজকর্ম সবই আমার পক্ষে অপমানজনক। তাই আমার প্রতিবাদ যে অতি অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত হয়েছে সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না। অবশ্য আমি চেয়ারম্যান-এর সামনের টেবিলটা সাইকিক কলেজের প্রফেসরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে অশোভন কাজ করেছি। কিন্তু ওরা আমাকে অতিমাত্রায় উত্তেজিত করে তোলে বলে আমি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। তোমার হয়ত সে লোকটার বক্তৃতার কথা মনে আছে। লোকটার নাম স্মিথ বা ব্রাউন। যাই হোক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। লোকটার এতদূর স্পর্ধা যে বলে, আমি এ ব্যাপারে অন্ধ। আমি নাকি জনসাধারণের চোখে ধুলো দিচ্ছি।

ম্যালন বলল, সত্যিই তাই, আপনি দু’-একটা আঘাতও পেয়েছেন দেহে। চ্যালেঞ্জারের চেহারাটা একটু নত হলো। তিনি আনন্দের সঙ্গে হাত দুটো ঘষতে লাগলেন। তারপর বললেন, আমার কয়েকটা ঘাইও ওদের গায়ে লেগেছে ওরা তা ভুলতে পারবে না। তখন ওরা কুকুরছানার মতো চিৎকার করছিল। ওরা জানে না, আমার বিরুদ্ধে বই না পড়ার অভিযোগ কত বিপজ্জনক। সে যাই হোক তুমি আজ সকালে এসে ভালোই করেছ। এখন বল গতকাল আমি সভায় যা বলেছি তা তোমার উপর কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছে এবং ওদের বিষয়ে তোমার মতামত পুনঃর্বিবেচনা করতে রাজী আছ কি না? আমি মনে করি ওদের প্রতি তোমার সহানুভূতিসূচক অভিমত তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের উপর বড়ই চাপ সৃষ্টি করছে।

ম্যালন এবার সাহস করে একটা কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল। সে বলল, আজ আপনাকে অন্য একটা কথা বলব মনে করে ঘরে ঢুকেছিলাম। আপনি জানেন আপনার মেয়ে এনিডের সঙ্গে কিছুদিন ধরে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। আপনার মেয়ে এখন বিবাহযোগ্য বয়স প্রাপ্ত হয়েছে এবং আমি তাকে স্ত্রী হিসাবে না পাওয়া পর্যন্ত সুখী হতে পারব না। আমি ধনী নই, কিন্তু কোনও কাগজের সহ সম্পাদকের একটা চাকরির প্রস্তাব এসেছে আমার কাছে। এখন আমি অবশ্যই বিয়ে করতে পারি। আপনি আমাকে অনেকদিন ধরে চেনেন এবং আমার বিরুদ্ধে বলার কিছু নেই। সুতরাং আমি বিশ্বাস করি এ ব্যাপারে আপনার সমর্থন আমি পাব।

আমার দৃষ্টিশক্তি এত ক্ষীণ নয় যে আমার মেয়ের সঙ্গে তোমার যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা আমি দেখতে পাইনি। কিন্তু এই প্রসঙ্গটির সঙ্গে আমাদের বর্তমান আলোচিত প্রসঙ্গটি নিবিড়ভাবে জড়িত। তোমাদের এই সম্পর্কটা এমনই এক ভুল ও কুসংস্কারের মধ্যে গড়ে উঠেছে যার বিরুদ্ধে আমি সারাজীবন লড়াই করে চলেছি। এই দুর্বল ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা তোমাদের এই সম্পর্কটাকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পরি না। তাই আমি তোমার কাছে একটা নির্দিষ্ট মতবাদ চাই যে মতবাদে ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট যুক্তি আছে। আমি আমার মেয়ের কাছ থেকেও একই কথা জানতে চাইব।

সহসা ম্যালনের মনে হলো জগতের যতসব মহান শহীদ নামে তালিকায় তার নামটা অন্তর্ভুক্ত হলো। ব্যাপারটা খুবই সঙ্কটজনক, তবু সত্যিকারের পুরুষের মতে সেই সঙ্কটের সম্মুখীন হওয়ার জন্য সে প্রস্তুত হয়ে উঠল।

আমি আমার মতবাদের কথা প্রকাশ করলে আপনি নিশ্চয় আমাকে ভাল বলবেন না। তবে সে মতামত সত্যা মিথ্যা যাই হোক আমি তা পরিবর্তন করতে পারব না। আমার মনে হয় এনিডও এই মতই পোষণ করবে।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি মনে কর গত রাতে আমার বক্তৃতাটা ভাল হয়নি।

ম্যালন বলল, আপনার বক্তৃতাটা সত্যিই বাগ্মিতাপূর্ণ হয়েছিল বলেই মনে করি।

আমার কথা আমি তোমাদের ঠিক বোঝাতে পেরেছি তো?

আমার বুদ্ধি আপনার কথাগুলো ঠিক ধরতে পারেনি।

অথচ কোনও মায়াবী যাদুকর তোমার বুদ্ধিকে সহজেই প্রতারিত করতে পারে।

আমার মনে হয় স্যার আমি এ বিষয়ে মনস্থির করে ফেলেছি।

চ্যালেঞ্জার এবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ম্যালনের দিকে কটমট করে তাকিয়ে গর্জন করে বলে উঠলেন, তাহলে আমিও আমার মনস্থির করে ফেলেছি। তুমি এ বাড়িতে ঢুকবে না। একমাত্র যেদিন তুমি তোমার বুদ্ধি ফিরে পাবে সেই দিনই তুমি এ বাড়িতে ঢুকতে পারবে।

ম্যালন বলল, মুহূর্তের জন্য আমার একটা কথা শুনুন স্যার। আমার প্রার্থনা আপনি এতখানি কড়া হবেন না। আমি আপনার বন্ধুত্বকে এমনই মূল্যবান মনে করি যে এই বন্ধুত্ব হারানোর ব্যাপারটাকে পরিহার করতে চাই। আমার মনে হয় আপনি যদি বন্ধুভাবে আমাকে এ বিষয়ে পরিচালনা করেন তাহলে আমি এই সব বিষয়গুলোকে আরও ভাল করে বুঝতে পারব যে-সব বিষয় এখন আমাকে হতবুদ্ধি করে তুলেছে। যদি আমি আপনার গবেষণাগারে আপনার কাজ দেখার সুযোগ পাই তাহলে আপনার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি যথেষ্ট আলোকপাত করবে যে সব বিষয় আমি এখন বুঝতে পারছি না ঠিকমতো।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার এবার অনেকখানি নরম হয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় ম্যালন, আমি তোমাকে এ বিষয়ে অবশ্যই সাহায্য করতে পারি। আমরা পরলোকতত্ত্বের এই ব্যাপারটাকে কী বলব?—‘মাইক্রোবাস স্পিরিচুয়ালেনেসিস’। আমি তোমাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত। আমি আমার অবসর সময়ের কিছুটা সময় ব্যয় করে সেইসব বড় বড় ভুলগুলোকে ধরিয়ে দেব যে ভুলের শিকারে পরিণত হয়েছ তুমি অতি সহজেই। আমি বলছি না যে তোমার মস্তিষ্কে বুদ্ধিশুদ্ধি নেই। তবে তুমি সরল প্রকৃতির মানুষ হওয়ার জন্য যে কেউ তোমাকে বাজে কথা বুঝিয়ে দেয়। অর্থাৎ তোমার বিচারশক্তি নেই। আমি চাই তুমি আমার কাছ থেকে গবেষণাগারে ব্যবহৃত পদ্ধতি প্রয়োগ করে তদন্ত কার্য শুরু কর। এইক্ষেত্রে আমি আমার স্বভাবমতো বিশারদ হিসেবেই কাজ করতে চাই।

ম্যালন বলল, আমি এটাই চাই।

তাহলে তুমি এই ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা করলে আমি ঠিক সেখানে উপস্থিত থাকব। কিন্তু ইতিমধ্যে আমি তোমার কাছ থেকে একটা প্রতিশ্রুতি চাই যে, তুমি ও এনিড তোমাদের মধ্যেকার সম্পর্কটাকে আর টানবে না।

ম্যালন একটু ইতস্তত করে বলল, আমি ছ’মাসের জন্য কথা দিতে পারি।

ছ’মাস পরে তুমি কী করতে চাও?

সেটা আমি তখনই চিন্তা করব। এই বলে ম্যালন অতি সহজে কঠিন পরিস্থিতিটা এড়িয়ে গেল।

ম্যালন যখন বারান্দায় লিফটের জন্য দাঁড়াল, তখন বাজার করে ফিরে আসা এনিডকে লিফটের মধ্যে দেখতে পেল। সে এনিডকে তার সাথে নিচে নামতে বলল। ম্যালন এনিডকে নিয়ে লিফটে ঢুকে লিফট চালিয়ে দিল কিন্তু নিচের তলায় পৌঁছবার আগেই যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য লিফটটা আটকে গেল। প্রায় পনের মিনিট লিফটটা আটকে থাকার পর দু’জনে যখন আপন আপন গন্তব্যস্থলে চলে গেল তখন প্রেমিক প্রেমিকা দু’জনেই ছয় মাস অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তারা এই আশায় রইল যে তাদের পরীক্ষাকার্য সফল হবে।