বিশেষ অভিযানকারীদের প্রথম কাজ শুরু
সেদিন অক্টোবরের শেষ অপরাহ্ণ। সকাল থেকে যে ঘন কুয়াশা সারা লন্ডন শহরটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, সে কুয়াশা তখনও কাটেনি। আর সেই কুয়াশার মধ্যে দিনের সব আলো একেবারে নিভে গিয়ে বিলীন হয়ে গেল নিঃশেষে।
প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের ফ্ল্যাটটা ছিল ভিক্টোরিয়া ওয়েস্ট গার্ডেন্স্ অঞ্চলের একটা বড় বাড়ির চারতলায়। তখনও কুয়াশা জমে ছিল ফ্ল্যাটটার ঘরগুলোর জানলার শার্সিতে। দিনের শেষে শহরের মানুষদের কলগুঞ্জনের শব্দ অনেকটা কমে গেলেও বড় রাস্তায় সামনে চলছিল যানবাহনের চলাচল। গাড়িগুলোর শব্দের সঙ্গে তাদের হেডলাইটের ছটা এসে প্রায়ই আছাড় খেয়ে পড়ছিল ফ্ল্যাটটার সামনে।
প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তখন তাঁর ঘরে আগুনের দিকে পা ছড়িয়ে বসে ছিলেন। আর তাঁর হাত দুটো পকেটের মধ্যে ঢোকানো ছিল। মি. চ্যালেঞ্জারের পোশাকের মধ্যে একজন প্রতিভাবান ব্যক্তির কোনও লক্ষণ ছিল না। তাঁর গলায় ছিল একটা খয়েরী রঙের টাই। কালো মখমলের পকেট ছিল শার্টের উপর। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি একজন ভবঘুরে শিল্পী। তার একপাশে বাইরে যাবার জন্য মেয়েদের এমন সব শৌখিন পোশাক রাখা যা পরে আজকালকার মেয়েরা এবং যা প্রকৃতিদত্ত রূপকে নষ্ট করে দেয়।
ম্যালন জানলার ধারে বসে ছিল। ম্যালন বলল, এখন সাতটা বাজে। আমাদের এখনি রওনা হওয়া উচিত।
ম্যালন ও এনিড লন্ডন শহরের ধর্মীয় ভাবধারার উপর যৌথভাবে লেখালেখির কাজে ব্যস্ত ছিল। প্রতি রবিবার তারা বেরিয়ে পড়ত তাদের কাগজের পরবর্তী সংখ্যার উপাদান জোগাড় করার জন্য।
মি. চ্যালেঞ্জার দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, এখনও সময় আছে। এরপর তিনি ম্যালনকে অধৈর্য হতে দেখে বললেন, বস বস স্যার। কোনও লোককে আমার পেছনে তাকাতে দেখে আমার যে বিরক্তি হয় আর কিছুতেই এত বিরক্তি হয় না। তুমি সবসময় এমন একটা ভাব দেখাও যাতে মনে হয় তুমি এখনি ট্রেন ধরতে যাচ্ছ।
ম্যালন বলল, এই হলো সাংবাদিকদের জীবন। যদি আমরা সেই ট্রেনটা ধরতে না পারি তাহলে আমাদের পড়ে থাকতে হবে। এমন কি এনিডও এই কথাটা বুঝতে শুরু করেছে। তবে আপনার কথামতো এখনও কিছুটা সময় আছে।
এবার চ্যালেঞ্জার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কাজ কতদূর এগলো?
এনিড বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের নোট-বইটার পাতা উলটে যেতে লাগল। আমরা এ পর্যন্ত মোট সাতটা কাজ করেছি। প্রথমে আমরা ছবির মতো সাজানো ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে গিয়েছিলাম। তারপর গিয়েছিলাম ক্যাথলিকদের বড় গির্জা ওয়েস্ট মিনিস্টার ক্যাথিড্রেল-এ আর এনডেল স্ট্রীটে অবস্থিত প্রেসব্রিটারিয়াদের চার্চেও গিয়েছিলাম। কিন্তু আজ রাত্রে আমরা কিছু বৈচিত্র্যের সন্ধান করতে চাই। আমরা এখন পরলোক-তত্ত্ববাদীদের নিয়ে কিছু কাজ করতে চাই।
ক্রুদ্ধ মহিষের মতো গর্জন করে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। আমার অনুমান পরের সপ্তায় তোমরা পাগলা গারদে যাবে। তুমি কি বলতে চাইছ ভূত-প্রেতের কারবারী এইসব লোকগুলোর একটা চার্চ আছে?
ম্যালন বলল, আমি তা অনুসন্ধান করে দেখছি। কোনও কাজ করার আগে আমি বাস্তব তথ্যগুলোকে ভাল করে যাচাই করে দেখি। সে তথ্য যত নিরসই হোক না কেন। গ্রেট ব্রিটেনে চার হাজারের বেশি রেজিস্ট্রিকৃত চার্চ আছে।
চ্যালেঞ্জারের গর্জন এবার একপাল মহিষের গর্জনের সমান হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন, মানবজাতির মধ্যে পাগলামি আর ভিত্তিহীন সস্তা বিশ্বাসপ্রবণতার সীমা-পরিসীমা নেই। হোমো স্যাপিয়েন্স ও হোমো ইডিওটিকাস জাতীয় লোকেরাই ভূত-প্রেতদের কাছে প্রার্থনা করে।
ম্যালন বলল, এই সব বিষয়ের উপরেই আমরা তথ্য চাই। আমরা ওদের কাছ থেকে হাতে লেখা কিছু কপি চাই। আমি বলতে চাই না যে আমি আপনার মতের সঙ্গে একমত। তবে সম্প্রতি সেন্টমেরী হাসপাতালের অ্যাটকিনসনের কাছে আমি আগ্রহজনক কিছু দেখেছি। আপনি জানেন তিনি একজন উদীয়মান সার্জেন।
চ্যালেঞ্জার বললেন, মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড নিয়েই তাঁর কারবার।
এই মাথামোটা লোকটাই না কি মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার এক প্রামাণ্য বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য হয়ে তাকে। লোকে আবার এই কাজটাকে এক নতুন বিজ্ঞান বলে থাকে—যে বিজ্ঞান পরলোক-তত্ত্বের এই সব বিষয় নিয়েও আলোচনা করে।
বিজ্ঞান তো অবশ্যই!
ম্যালন বলল, হ্যাঁ, লোকে তাই বলে। আর তিনি এইসব লোকের কথাগুলোকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে চলেন। কোনও জ্ঞাতব্য তথ্যের প্রয়োজন পড়লে আমি তাঁর সঙ্গে আলোচনা করি। বহু বইয়ের তিনি নাম জানেন। আর সেই সব বইগুলির বিষয়বস্তুগুলো তাঁর নখদর্পণে। মানবজাতির অগ্রদূত। বৰ্ণনায় একথা লেখা আছে।
চ্যালেঞ্জার বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে বললেন, হ্যাঁ, আসলে লোকটা মানবজাতিকে পাগলা গারদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার মানে ওকে পাগলা গারদের পথপ্রদর্শক বলা যায়। আর বইয়ের কথা? কী বই আছে তাঁর কাছে?
ম্যালন উত্তর করল, আর এটাই তো আর এক বিস্ময়ের কথা। মি. অ্যাটকিনসনের পাঁচ শ’ বই আছে। তবু তিনি অভিযোগ-অনুযোগ করে বলেন, তাঁর মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধীয় গ্রন্থাগারটি অসম্পূর্ণ। আপনি দেখবেন আমাদের গ্রন্থাগারের মতোই সেখানে ফরাসী, জার্মান, ইটালিয়ান ভাষার বহুরকম বই আছে।
চ্যালেঞ্জার বললেন, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। নির্বুদ্ধিতার ব্যাপারটা শুধু ইংল্যান্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মহামারীর সংক্রামকের মতো সব দেশে ছড়িয়ে গেছে।
এনিড জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি এইসব বই পড়েছ বাবা?
চ্যালেঞ্জার যেন চমকে উঠলেন, ওইসব বই পড়ে ফেলব আমি! আমার পড়ার আগ্রহ থাকলেও সময় কোথায়! যে পরিমাণ আগ্রহ আছে, তার অর্ধেক পরিমাণ সময় নেই। এনিড, তুমি বড় অবান্তর কথা বল।
দুঃখিত বাবা। তুমি কথাগুলো এত জোর দিয়ে বলছিলে যে, তা শুনে আমার মনে হলো তুমি বইগুলো পড়ে তার বিষয়বস্তুগুলো সব জেনেছ।
চ্যালেঞ্জারের বড় মাথাটা একদিক থেকে অন্য দিকে দুলতে লাগল। সিংহের মতো তাঁর তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল দৃষ্টি তাঁর মেয়ের উপর নিবদ্ধ হলো। তোমার কি ধারণা প্রথম স্তরের এক যুক্তিবাদী, বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে যে কোনও বই যত সব বাজে কথায় ভরা জেনেও তার পড়ার প্রয়োজন আছে। যদি কোনও লোক দুই আর দুই পাঁচ হয় বলে তবে তার মতকে খণ্ডন করার জন্য আমাকে কি গণিতশাস্ত্ৰ চর্চা করতে হবে। যদি কোনও বাজে বদমাস লোক বলে যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অগ্রাহ্য ও অতিক্রম করে একটা টেবিল শূন্যে উঠে যেতে পারে তবে তার কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য আমাকে কি আবার পদার্থবিজ্ঞান পড়তে হবে এবং তার থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যটি লিখে নিতে হবে? কোনও পুলিশ-আদালতে কোনও প্রতারকের অপরাধ প্রমাণিত হলে তখন সে বিচারের তত্ত্বটি জানানোর জন্য আমাদের কি পাঁচশ খণ্ডের বইয়ের দরকার আছে! এনিড সত্যিই আমি তোমার জন্য লজ্জিত।
তার মেয়ে এনিড উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তারপর বলল, তোমাকে আর গর্জন করতে হবে না বাবা, আমি হার মানছি। বস্তুত তোমার অনুভূতির সঙ্গে আমার কোনও অমিল নেই।
ম্যালন বলল, তুমি যাই বল এনিড বেশ কিছু ভাল ভাল লোক তাদের সমর্থন করে। তুমি এদেরকে কখনই অগ্রাহ্য করতে পার না।
আমি কখনই একথা মনে স্থান দিতে পারি না ম্যালন, যে তুমি অন্যান্যদের মতো অবান্তর কথা বল। প্রতিটি মহান মানুষের মনে একটা দুর্বলতা থাকে। এটা তাদের ভাল মনের প্রতিক্রিয়া। তুমি তোমার পথ চলতে চলতে যেন একটা বাজে জায়গায় এসে পড়েছ। তুমি যাদের কথা বললে তাদেরও একই অবস্থা। না এনিড, আমি তাদের যুক্তিগুলি পড়ে দেখিনি। কিছু একটা বিষয় অজানিত রয়ে গেছে। আমরা যদি পুরানো প্রশ্নগুলোকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে থাকি তাহলে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের পথে কীভাবে এগিয়ে যাব? সাধারণ মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি তাই বলে। শুধু ইংল্যান্ড নয়, ইউরোপের প্রতিটি বুদ্ধিমান মানুষ এই কথা বলবে।
এনিড বলল, তাই হবে।
চ্যালেঞ্জার আবার বলে যেতে লাগলেন, যাই হোক ব্যাপারটার উপর ভুল বোঝাবুঝির যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে।
মি. চ্যালেঞ্জারের কণ্ঠস্বরটা অনেকখানি নরম হয়ে গেল এবং তাঁর ধূসর রঙের বড় বড় চোখ দুটোর বিষণ্ণ দৃষ্টি সামনের দিকে প্রসারিত হয়ে রইল।
তিনি আবার বলতে লাগলেন, আমি এমন অনেক ঘটনার কথা জানি যেখানে স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ঠাণ্ডা মাথার লোকও কোনও এক সমস্যায় ঘাবড়ে যায়, তার স্থির বুদ্ধি কেঁপে উঠে। আমার নিজের বুদ্ধিরও মাঝে মাঝে সে অবস্থা হয়।
ম্যালন একটা কপি ধরে কি দেখতে লাগল। তারপর বলল, হ্যাঁ স্যার, এটা ঠিক। এটা হয়েই থাকে।
চ্যালেঞ্জার ইতস্তত করতে লাগলেন। মনে হলো তিনি যেন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। তিনি কথা বলতে চাইছেন, তিনি কিছু একটা বলতে চাইছেন। কিন্তু সে কথা বলাটা খুবই বেদনাদায়ক হয়ে উঠছে তাঁর কাছে। অবশেষে অকস্মাৎ এক অধৈর্যের ভঙ্গি প্রকাশ করে তিনি যেন অতীতের একটা কাহিনির মধ্যে ডুবে গেলেন। চ্যালেঞ্জার তাঁর মেয়েকে বলতে লাগলেন, আমি তোমাকে কখনও বলিনি এনিড। ব্যাপারটা একান্তভাবে ব্যক্তিগত, হয়ত খুবই অবান্তর। অবশ্য আমি সেই ঘটনাটায় বেশ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ার জন্য লজ্জিত। তবে জানবে খুব বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাও অজান্তে এইভাবে বিব্রত ও বিচলিত হয়ে পড়ে।
ম্যালন কথাটা স্বীকার করে নিয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার।
এবার তার কাহিনি শুরু করলেন চ্যালেঞ্জার, ঘটনাটা ঘটেছিল আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর। তুমি আমার স্ত্রীকে জানতে ম্যালন। আমি কি বলতে চাইছি তা হয়ত অনুমান করতে পেরেছ। আমার স্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরের দিন রাত্রিতে ঘটেছিল ঘটনাটা। সত্যি কি ভয়ঙ্কর ম্যালন। ভয়ঙ্কর।
তার বিশাল দেহটা কেঁপে উঠল এবং তার বড় বড় লোমশ হাত দুটো দিয়ে মুখ ঢাকলেন। জানি না কেন তোমাকে একথা বলছি। মনে হয় কথায় কথায় এসে গেল, এটা তোমাদের প্রতি একটা সতর্কবাণী হতে পারে।
সেটা ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরের দিন রাত্রি। ম্যালন তুমি আমাদের চসারফিল্ডের বাড়িটা দেখেছ। সেই রাত্রিতে আমি আমাদের বাড়ির বড় হলঘরটায় বসে ছিলাম। রাত্রি তখন একটা। এনিড তখনও সেই ঘরে ছিল। সে একটা চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি তাকে আগেই ঘুমোতে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু সে বিছানায় না গিয়ে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আমি তাকে জাগাতে চাইনি। আমি আগুনের ধারে বসেছিলাম। সমস্ত হলঘরখানা কালো ছায়ার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। আর সেই ছায়া আমার মনের উপরেও নেমে এসেছিল। আমার মনে আছে তখন আকাশে চাঁদ ছিল এবং সেই চাঁদের আলো জানলার কাঁচের সার্সির ভিতর দিয়ে ঘরে এসে পড়ছিল। আমি তখন বসে বসে ভাবছিলাম। আমার মনটা খুবই চিন্তান্বিত ছিল। সহসা একটা টিকটিক শব্দ শুনতে পেলাম।
ম্যালন সমর্থনের সুরে বলল, আচ্ছা?
চ্যালেঞ্জার আবার বলে যেতে লাগলেন, শব্দটা প্রথমে খুব কম ছিল। তারপর ক্রমশই জোর হয়ে উঠল। জোর ও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর সেই শব্দ শুনে এমন একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা মনে এল, যার থেকে অন্ধবিশ্বাসী লোকেরা নানা কাল্পনিক রূপকথা বানিয়ে তোলে। তুমি নিশ্চয় জান আমার স্ত্রীর দরজায় করাঘাত করার এক বিশিষ্ট রীতি ছিল। দরজায় করাঘাত করার সময় সে যেন তার ছোট ছোট আঙুলগুলি দিয়ে এক সুরেলা আওয়াজ করত। আমি তাই সে দরজায় করাঘাত করলেই বুঝতে পারতাম। তখন আমার মনের অবস্থাটা কেমন যেন অস্বাভাবিক ছিল। কিসের একটা অজানা চাপে মনটা আমার পীড়িত ছিল। তাই শব্দটা শুনে আমার মনে হলো, আমার স্ত্রী যেন দরজায় করাঘাত করছে এক ছন্দময় শব্দে। আগে যেমন করত। কিন্তু শব্দটা ঠিক কোথা থেকে আসছে সেই স্থানটা আমি নির্ণয় করতে পারলাম না। পরে বুঝলাম শব্দটা আসছে আমার মাথার উপর থেকে। ঘরের দেয়ালে ও সিলিঙের তলায় পালিশ করা যে সব কাঠের পাত ছিল শব্দটা হচ্ছে তারই ভিতরে। শব্দটা পর পর দশ-বারো বার হলো।
এনিড আশ্চর্য হয়ে বলল, ও বাবা, তুমি আগে একথা আমাকে কখনও বলনি। তোমাকে তা বলিনি, কারণ তুমি তখন ঘুমোচ্ছিলে। তখন আমি তোমাকে জাগিয়েছিলাম এবং তোমাকে আমার পাশে কিছুক্ষণ বসতে বলেছিলাম।
এনিড বরল, হ্যাঁ, আমার তা মনে আছে।
হ্যাঁ, তুমি আমার সামনে বসেছিলে। কিন্তু আর কিছু ঘটেনি। আর কোনও শব্দ শোনা যায়নি। আসলে এটা ছিল আমার ভ্রান্তিশ্রবণ। আইভি কাঠের উপর কোনও পোকা ঢুকে কাঠটা হয়ত কুরে কুরে খাচ্ছিল। আর তারই জন্য শব্দটা হচ্ছিল। আমার দুর্বল মস্তিষ্ক তার মধ্যে একটা ছন্দের কল্পনা করছিল। এইভাবে আমরা নিজেদের বোকা বানাই এবং শিশুর মতো হয়ে উঠি। আমি বুঝতে পারলাম কীভাবে বুদ্ধিমান মানুষেরাও অনেক সময় নিজেদের আবেগের দ্বারা প্রতারিত হয়।
ম্যালন বলল—কিন্তু স্যার, আপনি কেমন করে বুঝলেন যে সেটা আপনার স্ত্রীর করাঘাতের শব্দ নয়?
চ্যালেঞ্জার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, এটা অবান্তর কথা ম্যালন। একেবারে অবান্তর। আমার স্ত্রীকে আমি তার একদিন আগেই সমাহিত হতে দেখেছি। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একদিন পর আর কী অবশিষ্ট থাকতে পারে?
ম্যালন বলল, তার আত্মা, তার প্রেতাত্মা।
চ্যালেঞ্জার বিষাদের সঙ্গে ঘাড় নাড়লেন। তারপর বললেন, যখন তার প্রিয় দেহটা মাটির মধ্যে ধীরে ধীরে গলে গেল, যখন তার বায়বীয় পদার্থগুলো বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল, যখন তার দেহের কঠিন অংশগুলো ধূসর-ধুলোর মধ্যে মিলিয়ে গেল তখন তার সব শেষ হয়ে গেল। তার আর কিছুই নেই। সে তার জীবনের সব খেলা সাঙ্গ করে চিরদিনের মতো চলে গেছে। সে তার জীবনের ভূমিকা ভালভাবেই পালন করেছে। সব শেষ হয়ে গেছে ম্যালন। এই আত্মা হলো বর্বর মানুষদের কল্পনা। এটা হলো কুসংস্কার। শরীরতত্ত্ববিদ হিসাবে আমি পেশী নিয়ন্ত্রণ ও মস্তিষ্কের উদ্দীপনের দ্বারা মানুষের দোষ-গুণের পরিবর্তন করব। আমি জেকিলকে হাইডে পরিণত করব শল্যচিকিৎসার ও অস্ত্রোপচার দ্বারা। আবার অনেকে তা মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাজনিত পদ্ধতির ও পরামর্শের দ্বারাও করতে পারে। অ্যালকোহল ও ঔষধের দ্বারাও তা হতে পারে। যেমন গাছের পতন হয়, তেমনি মানুষেরও পতন হয়। কিন্তু কার কখন পত্তন হবে, কে কখন মরবে তা কেউ বলতে পারে না। মানুষের জীবনের কোনও নিশ্চয়তা নেই। আজকের পর কাল কি হবে তা কেউ জানে না। কালকের সকাল বা কালকের রাত্রি বলে কিছু নেই। কালকের রাত্রি হয়ত চিরস্তন রাত্রি হতে পারে সকল কর্মের শেষে চিরশান্তি নিয়ে আসতে পারে।
ম্যালন বলল, হ্যাঁ, ঠিক তাই। এটা সত্যি দুঃখের কথা। এ এক সকরুণ জীবনদর্শন।
চ্যালেঞ্জার বললেন, মিথ্যা দর্শনের চেয়ে দুঃখ বা বিষাদময় দৰ্শন ভাল।
ম্যালন বলল, হয়ত তাই। সব থেকে খারাপের সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে রীতিমতো এক সাহসিকতা ও পৌরুষের ব্যাপার আছে। আমি আপনার মতের বিরোধিতা করব না। আমার যুক্তি ও আপনার যুক্তি এক।
এনিড চিৎকার করে বলল, আমি কিন্তু অন্তর থেকে এটা মেনে নিতে পারছি না। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না।
এই বলে এনিড তার দু’হাত দিয়ে তার বাবার ষাঁড়ের মতো ঘাড়টা জড়িয়ে ধরে আবার বলল, একথা আমাকে কখনই বলবে না বাবা যে, তোমার এই জটিল ও সূক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন মস্তিষ্ক আর আশ্চর্য আত্মা সত্ত্বেও মৃত্যুর পর তোমার আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। একটা বড় ভাঙা ঘড়ির মতোই পড়ে থাকবে তুমি।
চ্যালেঞ্জার হাসিমুখে তার ঘাড় থেকে এনিডের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, শুধু চার বালতি জল আর এক বস্তা নুন। এই হচ্ছে তোমার পিতা। এই নিয়ে হচ্ছে তোমার পিতার দেহ। তুমি তোমার মনটাকে এর সঙ্গে মানিয়ে চললে ভাল করবে। এখন আটটা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি। এস ম্যালন, তোমার উন্মাদ আশ্ৰম অভিযানের পরিকল্পনার কথা শুনি।
