চ্যালেঞ্জার এক অদ্ভুত সহকর্মীর সাক্ষাৎ পেলেন
চ্যালেঞ্জার এমনি একজন মানুষ যিনি সহজে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন না। কেউ যদি তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় তাহলে আগে তাকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতে হবে। তিনি কোনও সম্পর্ককে স্বীকার করতে পারেন না। তবে কারও পৃষ্ঠপোষক হিসাবে তাঁর তুলনা হয় না। তিনি যখন দেবরাজ জোভের মতো কাউকে সাহায্য করতে নেমে আসেন তখন তাঁর মুখে লেগে থাকে এক কৌতুকের হাসি। তখন তাঁর বিরাট ব্যক্তিত্বে অনুগৃহীত ব্যক্তিত্ব সহজেই বশীভূত হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব যাই হোক তাঁর কতকগুলো মানবিক গুণের দরকার ছিল। কারও নির্বুদ্ধিতা দেখলেই তিনি বিরক্ত হয়ে উঠতেন। কারও দেহটা কুৎসিত বা খারাপ দেখলেই তিনি বিরূপ হয়ে উঠতেন তার প্রতি। জগতের যে লোককে সবাই প্রশংসা করত সেই ব্যক্তির সঙ্গ লাভের জন্য মনে মনে লালায়িত হতেন তিনি। তবে সেই ব্যক্তি যদি তাঁর মধ্যে যে অতিমানব আছে বলে তাঁর প্রশংসা না করত তাহলে সে ব্যক্তির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতেন না তিনি। অর্থাৎ যিনি যত বড় ব্যক্তিই হোন না কেন তাকে অবশ্যই
চ্যালেঞ্জারকে প্রশংসা করতে হবে। তা না করলে চ্যালেঞ্জার তাকে কখনও খাতির করবেন না। এইসব দিক থেকে ড. রস স্কটন ছিলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের অন্যতম প্রিয় ব্যক্তি।
ড. রস স্কটন দীর্ঘদিন রোগে ভুগে ভুগে মরণাপন্ন হয়ে উঠেছেন। সেন্ট মেরী হাসপাতালে ডা. অ্যাটকিনসন তাঁর চিকিৎসা করে আসছেন। ডা. অ্যাটকিনসন ও পরলোকতত্ত্বের ব্যাপারে কিছু কাজ করেছেন। তিনি চিকিৎসক হিসাবে ড. রসের অবস্থা সম্বন্ধে যা বলেছেন তা মোটেই আশাপ্রদ নয়। চ্যালেঞ্জার জানেন ডা. অ্যাটকিনসন অহেতুক ভয় দেখাননি। রোগীর আরোগ্যলাভের আশা খুবই কম। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার একটা কথা ভেবে আশ্চর্য হয়ে যান যে, ড. রসের মতো কৃতী যুবক যিনি এরই মধ্যে ‘দি এমবিওলজি অফ্ দি সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ ও ‘দি ফ্যালাসি অফ্ দি অবসনিক ইনডেক্স’ এই দুটি মূল্যবান গ্রন্থ লিখে নাম করেছেন, তাঁর জীবন এখনই শেষ হতে চলেছে। তাঁর সমস্ত প্রাণশক্তি তাঁর দেহগত রসায়নের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং তাঁর ব্যক্তিগত দেহ ও আত্মা কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এটা খুবই দুঃখের বিষয়। তথাপি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তাঁর কাঁধ দুটোকে ঝাঁকিয়ে ও ভারী মাথাটা নেড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অমোঘ অপরিহার্যকে মেনে নিলেন।
প্রতিদিনই যে খবর আসতে থাকে সে খবর আগের খবরের থেকেও খারাপ। অর্থাৎ রোগীর অবস্থা খারাপ থেকে আরও বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখা গেল আর কোনও খবর নেই। কুলক্ষণা কিন্তু এক দীর্ঘ নীরবতা। অবশেষে একদিন আর থাকতে না পেরে তিনি গাওয়ার স্ট্রীটে তাঁর প্রিয় যুবক বন্ধুর বাড়িতে চলে গেলেন। সে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। সে কথা বলা তো দূরের কথা তা মনে করতেও খারাপ লাগে চ্যালেঞ্জারের। তিনি বুঝতে পারলেন রোগীর দেহে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে অথচ রোগী কোনওরূপ চিৎকার বা আর্তনাদ করতে পারছে না। আর্তনাদ করতে পারলে যন্ত্রণা কিছুটা উপশম হত। কিন্তু রোগী তা করছে না, কারণ তাতে তার পৌরুষে বাধছে। সে ঠোঁট দুটো কামড়ে আর্তনাদ চেপে রাখছে। জলে ডুবে যেতে থাকা কোনও ব্যক্তি যেমন সামান্য এক কাঠের টুকরোকেও জড়িয়ে ধরে, রোগী তেমনি বিছানার একটা বালিশকে বারবার জড়িয়ে ধরছিল।
অবশেষে রোগী চ্যালেঞ্জারকে বললেন, আপনি সত্যি কি কোনও উপায় দেখছেন না। আমাকে কি দীর্ঘকাল ধরে এই অসহনীয় যন্ত্রণার পীড়ন সহ্য করতে হবে? আসন্ন মৃত্যুর ঘনায়মান অন্ধকারে আপনি কি কোনও আলো দেখতে পাচ্ছে না?
ঘটনা যতই দুর্বিষহ হোক না কেন তার সম্মুখীন হতে হবে বাছা। হালকা কল্পনার সুড়সুড়ি দিয়ে নিজেকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার থেকে বাস্তব ঘটনার সম্মুখীন হওয়া অনেক ভাল।
অবশেষে রোগীর চেপে রাখা ঠোঁট দুটো হঠাৎ খুলে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভেতর থেকে এক গভীর চাপা অন্ধকার ফেটে বেরিয়ে এল। চ্যালেঞ্জার রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সেদিন সকালে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। ঘটনার সূত্রপাত হলো মিস ডেলিসিয়া ফ্রিম্যান নামে এক মহিলার আবির্ভাবে। একদিন সকালে ভিক্টোরিয়া ফ্ল্যাটের দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। অস্টিন নীচে চোখ নামিয়ে দেখল দরজার সামনে এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। মহিলার চেহারাটা ছোটখাটো। তার মুখটা রোগা-রোগা, কিন্তু চোখ দুটো তীক্ষ্ণ। সে তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে উপরের ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে আছে।
মহিলা বলল, আমি প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করতে চাই। উপর থেকে কে বলল, তিনি এখন দেখা করতে পারবেন না। মহিলা এই ভেবে এখানে এসেছে যে এই বাড়িতে প্রফেসরের সান্নিধ্যে এসে সে কিছু কাজ করতে পাবে।
“আমাকে অবশ্যই দেখা করতে হবে।” এই বলে সে ফ্যিম্যান চাকরের বাধা ঠেলে ফ্ল্যাটে গিয়ে এক অভ্রান্ত অনুমানের উপর ভিত্তি করে একটি গোপন পড়ার ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় একবার করাঘাত করে ভিতরে ঢুকে পড়ল।
ছড়ানো কাগজপত্রে ভরা একটা টেবিলের পাশ থেকে সিংহের মতো গম্ভীরভাবে মাথা তুলে তীক্ষ্ণ ও জ্বলজ্বলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মহিলার দিকে তাকালেন প্রফেসর।
প্রফেসর সিংহের মতোই গর্জন করে উঠলেন, বিনা অনুমতিতে এখানে প্রবেশের অর্থ কি?
কিন্তু মহিলা এই কথায় কোনওরূপ লজ্জা বা ভয় পেল না। সে মুখে একফালি মিষ্টি হাসি নিয়ে প্রফেসরের জ্বলন্ত চোখ দুটোর পানে তাকাল। তারপর মহিলা শান্তকণ্ঠে বলল, আমি আপনার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করতে চাই। আমার নাম ডেলিসিয়া ফ্রিম্যান।
প্রফেসর চিৎকার করে ভৃত্য অস্টিন-এর নাম ধরে ডাকলেন। দরজার কোণে ভৃত্য
অস্টিন-এর মুখ দেখা গেল। প্রফেসর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, এই মহিলা কীভাবে এখানে এল?
অস্টিন আর্তনাদের সুরে বলল, উনি আমার বাধা মানেননি।
এবার মহিলা প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে নির্ভীকভাবে বলল, আপনি ক্রুদ্ধ হবেন না স্যার। আমি লোকমুখে শুনেছি আপনি নাকি এক ভয়ঙ্কর ব্যক্তি। সিংহের মতোই ভয়ঙ্কর। কিন্তু আমি মনে করি আপনি হরিণের মতো শান্ত।
প্রফেসর মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি? কি চাও? তুমি কি জান না আমি লন্ডনের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষ।
মিস ফ্রিম্যান কোন কথা না বলে তার ব্যাগটার মধ্যে কী খুঁজতে লাগল। তার ব্যাগে নানা ধরনের পুস্তিকা, প্রচারপত্র ও পরলোকতত্ত্বের ইস্তাহার ছিল। সে একটা হিজিবিজি হাতে লেখা কাগজ বের করল। কাগজটা বের করে বলল, এটা ড. রস স্কটন পাঠিয়েছেন।
লেখাটা এত খারাপ যে বোঝাই যায় না। তাছাড়া কাগজটা ব্যস্ততার সঙ্গে ভাঁজ করা হয়েছে।
হে আমার বন্ধু ও পরিচালক, দয়া করে শুনবেন কি এই মহিলা কী বলে? আমি জানি তার কথা হবে আপনার মতের সম্পূর্ণ বিরোধী, তাই মোটেই আপনার তাকে ভাল লাগবে না। আপনি নিজেই বলেছিলেন আমার বাঁচার কোনও আশা নেই। কিন্তু আমি পরীক্ষা করে দেখেছি এবং কিছুটা আশা পেয়েছি। আমি জানি আশার কথাগুলো উন্মাদের মতো মনে হবে আপনার কাছে। কিন্তু কোনও আশা না থাকার চেয়ে যেকোনও ভাবে পাওয়া একটা আশা থাকা ভাল। আমার অবস্থায় পড়লে আপনিও তাই করতেন। আপনি কি আপনার সমস্ত বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলে সাদা মন নিয়ে একবার দেখতে আসবেন না? ড. ফেলকন তিনটের সময় আসবেন। রস স্কটন।
চ্যালেঞ্জার রস স্কটনের চিঠিটা দু’বার পড়লেন। চিঠির বিষয়বস্তুর উপর তাঁর মাথাটা গুলিয়ে গেল। তিনি মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপারটা বলত, তুমি বল আমি শুনব। তবে যথাসম্ভব সংক্ষেপে বল।
মহিলা বলল, আমি বলছি এক প্রেত ডাক্তারের কথা।
চ্যালেঞ্জার তাঁর চেয়ারে বসে চমকে উঠলেন। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, হা ভগবান! এইসব বাজে ব্যাপারগুলো থেকে আমি কি কখনও নিষ্কৃতি লাভ করতে পারব না? ওরা কি লোকটাকে মৃত্যুশয্যায় শান্তিতে শুয়ে থাকতে দেবে না? যতসব ভূতপ্রেতদের টেনে এনে ওর উপর ছলচাতুরি করবে।
এই কথা শুনে মিস ডেলিসিয়া আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চোখমুখ।
মিস ডেলিসিয়া বলল, তিনি কিন্তু আর মৃত্যুশয্যায় নেই, তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
কে একথা বলেছে?
ড. ফেলকিন বলেছেন, তিনি কখনও ভুল করেন না।
চ্যালেঞ্জার কোনও কথা না বলে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলেন।
ডেলিসিয়া তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি সম্প্রতি রোগীকে দেখেছেন?
কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখিনি।
আপনি এখন তাকে দেখলে চিনতেই পারবেন না। তার সব রোগ প্রায় সেরে গেছে।
সেরে গেছে মানে? কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেক্লরোসিস রোগ থেকে সেরে উঠেছে?
আপনি গিয়ে দেখুন।
তুমি আমাকে নরকে গিয়ে অনুসন্ধান করতে বলছ? ওইসব বাজে লোকগুলো তাদের প্রমাণপত্রে আমার নামটাও যুক্ত করে দেবে। আমি ওদের চিনি। যদি আমি সেখানে যাই তাহলে রোগীটার গলা ধরে তাকে উপর থেকে সিঁড়ির নিচে ফেলে দেব।
মহিলা প্রাণখুলে হাসতে লাগল। তারপর বলল, রোগী তাহলে আপনাকে বলবে আমাকে আঘাত করার আগে আমার কথা শুনুন। আগে আপনি তার কথা শুনবেন। আপনার ছাত্ররা আপনারই প্রকৃত প্রতিরূপ। আপনার ছাত্র বলেই এইভাবে এক যুক্তিহীন উপায়ে আরোগ্যলাভ করায় তিনি লজ্জিত। আমি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ড. ফেলকিনের কাছে গিয়েছিলাম।
ও, তুমি তাহলে নিজের ইচ্ছায় গিয়েছিলে। তুমি কিন্তু একটা বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলে।
আমি যতক্ষণ বুঝব আমি ঠিক করছি ততক্ষণ যেকোনও দায়িত্বভার নেবার জন্য আমি প্রস্তুত আছি। আমি ডা. অ্যাটকিনসনের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধেও কিছু জানেন। আপনাদের মতো বিজ্ঞানীদের থেকে তিনি অনেক কম বিদ্বেষভাবাপন্ন। তিনি আমাকে বললেন, একটা মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাবার জন্য যেকোন কিছুর আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। ড. ফেলকিন এসেছিলেন।
আচ্ছা বলত কীভাবে হাতুড়ে ডাক্তারটা রোগের চিকিৎসা করতে লাগল?
এই জন্যই তো ড. রস স্কটন আপনাকে ডেকেছেন।
এই বলে মহিলা তার ব্যাগের ভিতর থেকে একটা হাতঘড়ি বার করে সময় দেখতে লাগল। আমি আপনার বন্ধুকে বলেছিলাম আপনি একঘণ্টার মধ্যে তার কাছে যাবেন। আপনি অবশ্যই যাবেন স্যার। আপনি তাকে নিরাশ করবেন না। এই বলে মিস ডেলিসিয়া তার ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সেটা দিয়ে বলল, বেসারাবিয়ান প্রশ্নের উপর সম্প্রতি একটা সেট বেরিয়েছে। এটা কত গুরুত্বপূর্ণ লোকে তা ভাবতেই পারে না। আপনি আমাদের ওখানে যাবার আগে এটা পড়ে নেবেন। বিদায় প্রফেসর, এই বলে মহিলা গর্জনরত সিংহস্বরূপ প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মিস ডেলিসিয়া যে কাজের জন্য এসেছিল সে কাজ সফল করে গেল। তার মুখে এমন একটা ভাব ছিল যা দেখ যে কেউ বশীভূত হতে পারত। মনে হয় যেকোনও দস্যু বা বয়ঃপ্রবীণ ব্যক্তিকেও বশে আনতে পারার শক্তি তার আছে। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারও মহিলার এই ঘায়ে আবিষ্ট হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরেই তিনি সোজা রস স্কটনের বাড়িতে চলে গেলেন। তিনি তার শোবার ঘরে ঢুকেই দেখলেন তাঁর প্রিয় ছাত্র রস স্কটন বিছানায় লাল ড্রেসিং গাড়ন পরে পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। ছাত্রের মুখপানে তাকিয়েই বিস্ময়ে ও আনন্দে চমকে উঠলেন প্রফেসর। তিনি দেখলেন আগে একদিন যে মুখে হতাশা আর মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে উঠেছিল আজ সে মুখে আলো ও প্রাণচঞ্চলতার ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
ড. রস বললেন, ব্যাপারটা আমি বলছি শুনুন, যে মুহূর্তে ড. ফেলকিন ডা. অ্যাটকিনসনের সঙ্গে প্রথম আর ব্যাপারে আলোচনা করেন সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করি আমার প্রাণশক্তি ফিরে আসছে আমার মধ্যে। রস বললেন, রাত্রিতে যখন রোগজীবাণুগুলো দেহের ভিতরটাকে কুরে কুরে খায় তখন সারা রাত বিছানায় শুয়ে থাকা কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। আমি যেন রোগজীবাণুগুলোর শব্দ শুনতে পেতাম। তাদের কামড়ানিতে আমার ক্রমাগত কঙ্কালের মতো চেহারাটা মুচড়ে উঠত। এখন সেই প্রিয়বন্ধু ফেলকিনের সহায়তায় সেই সব যন্ত্রণা থেকে আমি মুক্ত। এখন অল্পকিছু পেটের অসুখ ছাড়া তো আমার আর কোনও রোগই নেই।
এই বলে রস হাত দিয়ে কাকে যেন দেখাতে চাইলেন। চ্যালেঞ্জার ভাবলেন রস হয়ত কোনও ডাক্তারকে দেখাতে চাইছেন কিন্তু সেখানে কোনও ডাক্তার নেই। কেবল শীর্ণ দেহ এক মহিলা আছে। দেখে নার্স বলে মনে হয়। একমাথা বাদামী চুল নিয়ে ঘরের এককোণে ঝিমোচ্ছিল। মিস ডেলিসিয়া হাসিমুখে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল।
চ্যালেঞ্জার বললেন, তুমি ভাল হয়ে উঠেছ দেখে আমি আনন্দিত। তবে যুক্তিবোধকে বিসর্জন দিও না। এই সব রোগ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে-কমে।
রুক্ষ রস বললেন, ড. ফেলকিন আপনি ওর সঙ্গে কথা বলুন। ওর মন থেকে সংশয় দূর করুন।
চ্যালেঞ্জার দেখলেন তাঁর ছাত্র কোনও ডাক্তারকে সম্বোধন করে কথা বলছে। অথচ সেখানে কোনও ডাক্তারকে দেখা যাচ্ছে না।
চ্যালেঞ্জার তখন ভাবলেন বাতাসে ভেসে বেড়ান কোনও অদৃশ্য প্রেত হয়ত তার ছাত্রের রোগ সারাচ্ছে। দুষ্টু হাসি হেসে মিস ডেলিসিয়া চ্যালেঞ্জারকে বলল, এবার আমি ড. ফেলকিনের সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
“কি পাগলামির ব্যাপার!” এই বলে চিৎকার করে উঠলেন চ্যালেঞ্জার।
সেই নার্স এবার ঘরের কোণ থেকে উঠে তার পোশাকের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে কী যেন বলল, তারপর অধৈর্যভাবে হাত দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করল।
এরপর নার্স বলে যেতে লাগল, আমি ল্যানেক-এর আগের যুগের। আমি একটা নস্যির বাক্স নিয়ে চিকিৎসা করে বেড়াতাম। তখন স্টেথোস্কোপ ছিল না। তবে রোগ নির্ণয়ের একটা ব্যাটারি ছিল। আর যা কিছু ওষুধপত্র সেই নস্যির বাক্সটার মধ্যেই থাকত। তাতেই রোগীর শান্তি হত। আমি তোমাকে সেই সর্বরোগহর ওষুধ দিয়েছি।
এই সব কথা যখন বলা হচ্ছিল তখন চ্যালেঞ্জার স্থির দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়েছিলেন, তাঁর নাসারন্ধ্র দুটো ফুলে উঠেছিল। এক অপার বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে ছিলেন তিনি। এরপর তিনি মুখ ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকালেন। তারপর রসকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি বলতে চাও—এই তোমার ডাক্তার আর এরই পরামর্শ তুমি গ্রহণ কর?
নার্সটি ঘাড় শক্ত করে বলল, আমি আপনার সঙ্গে উত্তপ্ত কথা বলতে চাই না। আমি স্পষ্ট লক্ষ্য করছি আপনি পার্থিব বিষয় ও বাস্তবজ্ঞানের মধ্যে এমনভাবে ডুবে আছেন যে, আত্মার ক্রিয়াকর্ম জানার ব্যাপারে কোনও সময় দিতে পারেন না।
চ্যালেঞ্জার বললেন, বাজে কাজে মন দেবার মতো সময় আমার নেই।
বিছানা থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে রোগী বলল, হে আমার গুরু, আমি আপনাকে একথা মনে করার জন্য অনুরোধ করছি যে ড. ফেলকিন আমার জন্য এরই মধ্যে অনেক কিছু করেছেন। ড. ফেলকিন আমার পরম বন্ধুরূপে আমার জন্য যা করেছেন তার তুলনা হয় না।
মিস ডেলিয়িসা বলল, আমাদের প্রিয় ড. ফেলকিনের কাছে আপনার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।
চ্যালেঞ্জার গর্জন করে বলে উঠলেন, এটা হচ্ছে একটা পাগলাগারদ।
চ্যালেঞ্জার এবার চিন্তান্বিত অবস্থায় শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বসে রইল। কোনও বিক্ষুব্ধ ছাত্র তাঁর কথা না শুনলে এই রকমই ভাব দেখান তিনি।
রোগী এবার বিছানায় উঠে বসে কাঁধ দুটো কানের কাছে এনে বলল, হে পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক, আপনি অনুগ্রহ করে আপনার এই অধম ছাত্রকে বিনীতভাবে বসে কিছু শিক্ষা ও উপদেশের কথা শুনতে অনুমতি দিন।
নার্স বলল, ঠিক বলেছ, যাও ঘরের এক কোণে গিয়ে বস। এখন সব কথা বন্ধ কর। আমাকে এই কাজ করার সময় সমস্ত মন-প্রাণকে সংযত করতে হয়।
এবার তার রোগীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, ঠিক আছে। তুমি সুস্থ হয়ে আবার ক্লাসে যোগদান করবে।
রস স্কটন কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল, না না, তা অসম্ভব।
তুমি যা ভাবছ তা নয়, আমি জোর দিয়ে বলছি। আমি কখনও কাউকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিই না।
এরপর ডেলিসিয়া অদৃশ্য কোনও প্রেতকে সম্বোধন করে বলল, হে আমাদের প্রিয় ডাক্তার, আপনি যখন জীবিত ছিলেন তখন আপনি কী করতেন?
অদৃশ্য প্রেত মিডিয়াম নার্সের মুখ দিয়ে বলতে লাগল, আমার কথা লোকে আগেও বলাবলি করত, এখনও করে। না না, এখন ওসব কথা থাক। এখন আমাকে এই যুবক বন্ধুকে দেখতে হবে। এখন রোগীর নাড়ী ঠিকই আছে। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রোগীর দেহের তাপ স্বাভাবিক, রক্তের চাপ আমি যা চাই তার থেকে কিছুটা উচ্চ। হজমশক্তি কিছুটা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ এখন উপবাস করা অসঙ্গত হবে না। আধুনিক কালে মানুষেরা যাকে বলে ক্ষুধার ধর্মঘট। রোগীর সাধারণ অবস্থা চলনসই, তবে কোথা থেকে রোগীর ক্ষতি হচ্ছে সেটা দেখতে হবে। তোমার গায়ের শাটটা নামিয়ে দাও। তারপর বিছানায় উপুড় হয়ে শোও।
এরপর সে রোগীর মেরুদণ্ডের উপর দিকটায় তার নিজের আঙুল দিয়ে এমনভাবে চাপ দিল যে রোগী চিৎকার করে উঠল।
মেরুদণ্ডের অবস্থা কিছুটা ভাল। স্নায়ুকেন্দ্রের অবস্থা এখনও কিছুটা খারাপ আছে। যেহেতু এই কেন্দ্রেয় স্নায়ুগুলো প্রাণশক্তি পরিবহণ করে, এইজন্য এই কেন্দ্রে কিছু গোলমাল থাকলে অন্যান্য চেতনাবাহী স্নায়ুগুলোর উপর চাপ পড়ে। আর তার ফলে শরীরের অন্যান্য অংশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আমার চোখের দৃষ্টি দিয়ে এক্সরের মতো তোমার দেহের ভিতরকার সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি রোগীর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে এবং মারাত্মক যন্ত্রণাবোধটা কেটে গেছে।
এরপর সে চ্যালেঞ্জারকে লক্ষ্য করে বলল, আমি আশা করি স্যার রোগীর অবস্থা আপনি এখন বুঝতে পারছেন।
চ্যালেঞ্জার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রূঢ় ভঙ্গিমায় তাঁর বিরোধিতা ও অসম্মতি প্রকাশ করলেন।
তোমার শরীরের ছোটখাট অসুবিধাও আমি নিরসন করব। হে আমার প্রিয় যুবক, এখন তুমি আমার কৃতিত্বের সাক্ষ্য বহন করছ এবং তোমার উন্নতিতে আমি আনন্দবোধ করছি। তুমি আমার পক্ষ থেকে আমার এই মর্ত্যের সহকর্মী ডা. অ্যাটকিনসনকে অভিনন্দন জানাবে। আমার মিডিয়াম এক বালিকা, সুতরাং আজ আর তাকে কষ্ট দেব না।
আপনি কিন্তু বলেছিলেন আপনি কে তা বলবেন।
এ বিষয়ে বলার আমার বিশেষ কিছু নেই। আমি ছিলাম এক অখ্যাত চিকিৎসক। আমি যৌবনে অ্যাবারনেথির অধীনে চিকিৎসার কাজ শিখতাম। এবং তাঁর চিকিৎসা-পদ্ধতির কিছুটা রপ্ত করেছি। এরপর ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে গিয়েও আমি পড়াশুনা করতে থাকি এবং উপযুক্ত মাধ্যম পেলে মানবজাতির কিছু উপকার করতে পারি। এ বিষয়ে আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তুমি নিশ্চয়ই জানো একমাত্র সেবা এবং আত্মত্যাগের দ্বারাই আমরা ঊর্ধ্বলোকে যেতে পারি। এই হচ্ছে আমার সেবা। আমার ভাগ্যকে ধন্যবাদ যে আমি এই বালিকার মধ্যে এমন একজনকে পেয়েছি যার কম্পাঙ্ক আমার কম্পাঙ্কের সমধর্মী। তাই আমি সহজেই তার দেহটাকে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
রোগী তখন জিজ্ঞাসা করল, তাহলে সে এখন কোথায়?
সে আমার পাশেই আছে এবং এখনই সে তার নিজের দেহে আবার প্রবেশ করবে।
এরপর সেই অদৃশ্য প্রেত চ্যালেঞ্জারকে বলল, আপনি স্যার সচ্চরিত্র ও বিদ্বান। কিন্তু আপনি এমনই এক বস্তুবাদী ভাবধারার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছেন যা আপনার বয়সের একটা ধর্ম। আমি একটা কথা বলতে পারি, স্যার, কিছু নিঃস্বার্থ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তির জন্য চিকিৎসাবিদ্যা এ জগতে বিশেষ উন্নতি লাভ করলেও আপনাদের মতো বস্তুবাদীরা মানুষের আত্মিক দিকটা দেখেন না এবং পরলোকগামী আত্মাদের কাজকর্মে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু জানবেন আত্মিক ক্রিয়াকর্ম ওষুধের যে কোনও দামী উপাদানের থেকে অনেক বড়। প্রাণের একটা শক্তি আছে স্যার এবং এই প্রাণশক্তির নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে ভবিষ্যতের ঔষধ। আপনারা যদি এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখেন তাহলে জনগণের বিশ্বাস সেই সব মানুষদের উপর পড়বেই যারা যেকোনও উপায়ে রোগ সারাবার চেষ্টা করে।
যুবক রস স্কটন এই দৃশ্যটা জীবনে কখনও ভুলতে পারেনি। রস স্কটন দেখল তার গুরু ও অধ্যাপক তার সামনে আধখোলা মুখে এবং স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে আছেন। তিনি যখন এইভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে চেয়ারে বসে ছিলেন তখন তাঁর সামনে এক বেঁটেখাটো রোগা-রোগা চেহারার এক যুবতী তার একরাশ বাদামী চুল সহ মাথাটা নাড়াচ্ছে আর তাঁর দিকে তর্জনী নির্দেশ করে কী যেন বলছে, ঠিক যেমন কোনো পিতা তার বিক্ষুব্ধ পুত্রকে বোঝায়।
ঐ যুবতীর শক্তি এত বেশি যে সেই মুহূর্তে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো ব্যক্তি সেই বাস্তব অবস্থার সত্যকে মেনে নিতে বাধ্য হলেন। তিনি হাঁপাতে লাগলেন, অসন্তোষ প্রকাশ করতে লাগলেন। কিন্তু কোনো স্পষ্ট প্রত্যুত্তর তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল না। মেয়েটি উঠে একটি চেয়ারে বসল।
মিস্ ডেলিসিয়া বলল, উনি চলে যাচ্ছেন।
ড. ফেলকিন নামে সেই প্রেতাত্মা বলল, হ্যাঁ আমাকে যেতেই হবে, কারণ আমার অনেক কাজ করার আছে। এই মেয়েটি আমার আত্মপ্রকাশের একমাত্র মাধ্যমও নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাকে এডিনবরা যেতে হবে। কিন্তু হে যুবক, মনটাকে ভালো করে তোলো। অন্তর থেকে সব দুশ্চিন্তা দূর করে দাও। আমি আরও দুটি ব্যাটারির সাহায্যে তোমার প্রাণশক্তি বাড়াবার চেষ্টা করে যাব। অবশ্য তোমার শরীর যতটা সহ্য করতে পারে।
এইবার চ্যালেঞ্জারকে লক্ষ্য করে ফেলকিন বলল, আমি আপনাকে বলছি স্যার, আপনি আপনার মস্তিষ্কপ্রসূত আত্মঅহংকার ও বুদ্ধির আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতি সতর্ক হন। অতীতের যা কিছু ভাল তা সঞ্চয় করুন তবে যা কিছু নূতন তাকে বরণ করে নিন। কোনও বস্তুকে আপনার ইচ্ছার মাপকাঠিকে দিয়ে বিচার করবেন না, বিচার করবেন ঈশ্বরের ইচ্ছার মাপকাঠি দিয়ে।
এই বলে মিডিয়াম মেয়েটি একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। সে চেয়ারের উপর মাথাটা তার বুকের উপর নামিয়ে বসে রইল। সমস্ত ঘরখানা একেবারে মৃত্যুর মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতবুদ্ধির মতো তার নীল চোখ দুটি মেলে ধরল। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এরপর শান্ত নারীসুলভ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ড. ফেলকিন কি চলে গেছে?
হ্যাঁ, চলে গেছেন। তিনি সত্যিই মহৎ। তিনি আমাকে বলেছেন, আমি দুই মাসের মধ্যে একেবারে সুস্থ হয়ে ক্লাসে যোগদান করতে পারব।
মিডিয়াম বলল, চমৎকার! তিনি কি আমার জন্য কোনও খবর রেখে গেছেন?
না, বিশেষ কিছু নয়। তিনি আমার জন্য নতুন স্পিরিট ব্যাটারির প্রয়োগের ব্যবস্থা করছেন। অবশ্য, যদি আমি তা সহ্য করতে পারি।
তিনি নিশ্চয় বেশি বিলম্ব করবেন না।
হঠাৎ ডেলিসিয়ার চোখের দৃষ্টি চ্যালেঞ্জারের উপর পড়ল। সে কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। তারপর বলল, এ হলো নার্স আরসুলা। আরসুলা, এক বিখ্যাত অধ্যাপক চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।
চ্যালেঞ্জার মেয়েদের সম্পর্কে বিশেষ করে সে মেয়ে যদি সুন্দরী যুবতী হয় তাহলে বেশ কিছুটা উদারতা দেখান। তিনি আরসুলার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। তারপর তিনি আরসুলার একটা হাত ধরে তার মাথার চুলের উপর পিতৃসুলভ ভঙ্গিতে হাত বোলাতে লাগলেন। তারপর বললেন, তোমার দেখছি বয়স খুবই কম এবং দেখতেও সুন্দরী। এইসব লোক ঠকানো কাজ তোমার দ্বারা ভালই হবে। আর তুমি হয়ত এইসব কাজ ভালই করে আসছ। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে একজন ভাল নার্স, হয়ে তোমার যৌবন ও সৌন্দর্যের সৎ ব্যবহার কর এবং ভবিষ্যতে একজন ভাল ডাক্তার হওয়ার জন্য সচেষ্ট হও। আচ্ছা তুমি কি নার্সের সব কাজ ঠিক মতো শিখেছ?
নার্স অসহায়ভাবে চারদিকে তাকাতে লাগল। তার মনে হলো হঠাৎ কোন এক গরিলা এসে তার হাত ধরেছে।
রোগী রক্সটন বিছানা থেকে চ্যালেঞ্জারকে বলল, আপনার কথা ও একটা শব্দও ও বুঝতে পারল না। হে আমার গুরু, আমার অনুরোধ আপনি প্রকৃত অবস্থার সম্মুখীন হোন। আমার এক-এক সময় মনে হয় আমার ক্ষুদ্র চেষ্টায় এই দুই জগতের মিলন ঘটাই। আমার মনে হয় যত দিন না আপনি আত্মা বা পরলোকের ব্যাপারটা ভাল করে না দেখছেন না বুঝছেন, ততদিন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ণতা লাভ করবে না।
চ্যালেঞ্জারের মনোযোগ তখনও নার্সের উপরে নিবদ্ধ ছিল। যদিও আরসুলা নিজের হাতটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে সরে যেতে চাইল। চ্যালেঞ্জার এবার বললেন, শোন শোন মেয়ে, আমার কথার উত্তর দাও। যে চতুর ডাক্তারের অধীনে তুমি কাজ কর সে তোমাকে কী শিখয়েছে? আমার কাছে সব কথা খুলে বল। আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না।
সহসা অপ্রত্যাশিত বাধা এসে উপস্থিত হলো চ্যালেঞ্জারের কাছে। তিনি যখন আরসুলার কাছ থেকে তার জীবনের কথা জানতে চাইছিলেন, হঠাৎ তখন রোগী তার বিছানার উপর উঠে বসল। তারা সারা মুখে একটা লাল আভা দেখা যাচ্ছিল। সে এমন উদ্যমের সঙ্গে কথা বলতে লাগল যাতে বেশ বোঝা গেল তার রোগ অনেকটা সেরে গেছে।
রোগী এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আপনি কিন্তু আমার বিশেষ অন্তরঙ্গ বান্ধবীকে অপমান করছেন। আমি চাই, সে অনন্তকাল এই ঘরে আপনাদের মতো বিজ্ঞানীদের ঘৃণা ও বিদ্রূপের আক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকবে। যদি আপনি আরসুলার সঙ্গে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে কথা বলতে না পারেন তাহলে এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন।
চ্যালেঞ্জারের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করতে লাগল। এমন সময় ডেলিসিয়া শান্তির জন্য এগিয়ে এল।
সে রোগীকে বলল, তুমি অনেক হঠকারিতার পরিচয় দিচ্ছ। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ব্যাপারটা বোঝাবার মতো সময় পাননি। তুমি কেন তাঁকে দোষ দিচ্ছ?
ড. রস স্কটন বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছ! আমার মনে হয় এ বিষয়ে ওরা শত প্রশ্ন করলেও ওদের প্রশ্ন শেষ হবে না।
ডেলিসিয়া বলল, একটা জিনিস আমি ভালোই জানি যে এতদিন যদিও আমি অন্ধ ছিলাম তথাপি আজ আমি সব দেখতে পাচ্ছি। হে প্রফেসর, আপনি ভ্রূযুগল তুলে, আপনার কাঁধ দুটো বাঁকিয়ে আমাদের তুচ্ছজ্ঞান করতে পারেন তথাপি আজ দুপুরে আপনার মনে এমন একটা প্রশ্নের দাগ পড়ল যার শেষ না দেখে আপনি থাকতে পারবেন না। এই বলে সে তার ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা কাগজ বার করে চ্যালেঞ্জারের হাতে দিয়ে বলল, হে প্রিয় প্রফেসর, “মস্তিষ্ক বনাম আত্মা” এই লেখাটা পড়ে দেখবেন।
