কিছু অবয়বধারী প্রেতের ঘটনাবলি

কিছু অবয়বধারী প্রেতের ঘটনাবলি

ম্যালন লিনডেনের কথাটা না ভেবে পারে না। লিনডেনের অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনটাকে কেমন যেন জড়িয়ে ফেলেছে ওতপ্রোতভাবে। সে জানত লিনডেন জেলে যাবার আগে সে তার দুর্জন ভাই-এর সঙ্গে এক অবাঞ্ছিত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।

সেদিন সকালে ম্যালনের ঘরে হঠাৎ টেলিফোন বেজে ওঠে। ম্যালন ফোন ধরে মেইলির গলা শুনতে পেল।

মেইলি জিজ্ঞাসা করল, বিকালে তোমার সময় হবে? হাতে কোন কাজ নেই তো?

না, তুমি যা বলবে তাই করব।

মেইলি আবার বলল, ম্যালন তুমি বড় হঠকারী। তুমি আয়ারল্যান্ডের লোকদের মতো যখন তখন যেকোনও বিপদের ঝুঁকি নাও।

ম্যালন টেলিফোন ধরে মুচকি হাসল। বলল, তা অবশ্য বলতে পার। মেইলি বলল, এটা কিন্তু ভয়ের ব্যাপার। তুমি পুরস্কারের জন্য যে-কোনও প্রতিযোগিতায় নেমে যেতে পার।

ম্যালন আনন্দের সঙ্গে বলল, ঠিকই বলেছ।

মেইলি বলল, আমাদের কাজের জন্য একটা লোকের দরকার। তুমি কি এমন কোন লোককে জান যে, যে কোন দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য এগিয়ে আসবে। তবে পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে তার জ্ঞান থাকলে ভাল হয়।

ম্যালন প্রথমে কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। পরে ভাবতে ভাবতে একটা কথা মনে এল। সে বলল, হ্যাঁ রক্সটন এ ব্যাপারে যোগ্য লোক। তাঁর প্রকৃতিটা মুরগীর ছানার মতো নয়। যে কোন প্রতিকূল ঘটনার মুখোমুখি হবার সাহস তাঁর আছে। মনে হয় তাঁকে পেয়ে যাব। ডসেটশায়ারের অভিজ্ঞতার পর থেকে তিনি তোমার এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

মেইলি উৎসাহিত হয়ে বলল, ঠিক আছে তাঁকে নিয়ে এস। যদি তিনি আসতে না পারেন তাহলে কাজটা আমাদেরই করতে হবে। ৪১ বেলশ গার্ডেন্স, এস, ডব্লু। আলস্ কোর্টের নিকটে। বেলা তিনটের সময় যেতে হবে।

ম্যালন সেই মুহূর্তে লর্ড রক্সটনকে ফোন করল। সেই সঙ্গে তার পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

লর্ড রক্সটন বললেন, কি ব্যাপার যুবক বন্ধু!

ম্যালন ফোনে তাঁকে সব কথা জানালে তিনি বললেন, আজ বিকালে রিচমন্ডে ডিয়ারি পার্কে আমার একটা গল্ফ ম্যাচ ছিল। তবে তোমার ব্যাপারটাকে আরও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানে তোমার সঙ্গে দেখা করব।

অবশেষে বেলা ঠিক তিনটের সময় নির্দিষ্ট স্থানে ওরা মিলিত হলো। মেইলি, রক্সটন ও ম্যালন বসার ঘরে আগুনের ধারে বসে কথা বলতে লাগল। এইটা হলো ব্যারিস্টার মেইলির বাড়ি। তার সুন্দরী স্ত্রী রক্সটন ও ম্যালনকে অভ্যর্থনা জানাল। তার ব্যাবহারটা ছিল বেশ মিষ্টি। মেইলির স্ত্রী ছিল তার সত্যিকারের সহধর্মিণী। সে ছিল একাধারে তার জীবনসাথী আর পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সকল বিষয়েই সাহায্যকারী বন্ধু।

মেইলি তার স্ত্রীকে বলল, কিছু মনে কর না প্রিয়তমা, এসব কাজ তোমার নয়। আমরা অভিযানে গেলে তুমি ঘরে ডানা গুটিয়ে বসে থাকবে। ওসব ঝামেলা সহ্য করতে পারবে না।

তার স্ত্রী বলল, তবু আমার চিন্তা হয়। তোমার আঘাত লাগতে পারে।

মেইলি জোরে হেসে উঠল, বলল, তোমার ভয়ের কিছু নেই। উদ্দেশ্য যদি ভাল হয় তাহলে কাজ সফল হবেই।

তার স্ত্রী বিতৃষ্ণার সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মেইলি হাসতে হাসতে বলল, আমার স্ত্রী হয়ত পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে জানতে গেছে। যাইহোক এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। এখন আমাদের অন্য কথা ভাবতে হবে। এখন আমার স্ত্রীর কথা ছেড়ে এবার এক ভয়ঙ্কর ও দুষ্ট প্রকৃতির লোকের কথা ভাবতে হবে। সেটা হলো লিনডেনের ভাইয়ের কথা।

ম্যালন বলল, আমি লোকটার কথা শুনেছি। সাইলাস লিনডেন ওয়েলটার-এর প্রায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠেছিল।

এই সেই লোক। সে তার কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ে। তখন সে মিডিয়ামের কাজ শিখে এই কাজকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে চায়। আমি ও অন্যান্য পরলোকতত্ত্ববাদীরা তার কথাটাকে গুরুত্ব দিই। কারণ আমরা প্রত্যেকেই তার ভাই লিনডেনকে ভালবাসি। লিনডেনের পেশাগত বুদ্ধি ও ক্ষমতা তার পরিবারের লোকদের মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে এই ভেবে সাইলাসের দাবিকে যুক্তিপূর্ণ বলে বিবেচনা করি। এই জন্যই গতরাতে তাকে একটা পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিই।

ম্যাল জিজ্ঞাসা করল, কী বুঝলে?

আমি প্রথমে থেকেই লোকটাকে সন্দেহ করেছিলাম। তুমি হয়ত জান কোন এক অভিজ্ঞ পরলোকবাদীকে ঠকানো কোন মিডিয়ামের পক্ষে সম্ভব নয়। মিডিয়াম যদি প্রতারণা করতে চায় তাহলে সে বাইরের লোকদের সঙ্গেই প্রতারণা করে। আমি প্রথম থেকেই তার উপর কড়া নজর রেখেছিলাম। আমি মিডিয়ামের পর্দা ঘেরা ঘরের পাশেই বসেছিলাম। হঠাৎ সে সাদা পোশাক পরা অবস্থায় ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আমার স্ত্রীও আমার পাশে বসে ছিল। সাইলাস যখন সাদা পোশাকে গা মুখ ঢেকে প্রেত সেজে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় তখন সে আমাকে দেখতে পায়নি। আমার পকেটে একটা কাঁচি ছিল। সে যখন আমার পাশ দিয়ে দর্শকদের সামনে যেতে থাকে তখন আমি কাঁচি দিয়ে তার পোশাকের একটা অংশ কেটে নিয়ে রেখে দিই।

মেইলি তার পকেট থেকে একটুকরো তিনকোণা কাপড় বার করে তা দেখিয়ে বলল, এই সে কাপড়। আমার মনে হয় লোকটা নাইটগাউন বা রাত্রিপোশাক পরে ছিল।

লর্ড রক্সটন জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপারটা সবাইকে তখন জানালেন না কেন?

মেইলি বলল, ঘরেতে শুধু কতকগুলো মহিলা ছিল। আমি ছিলাম একমাত্র শক্তসমর্থ পুরুষ।

তুমি কী করতে চাও এখন?

আমি তাকে সাড়ে তিনটের সময় এখানে আসতে বলেছি। এখনি সে এসে পড়বে। সে এই কাপড়ের টুকরোটা দেখা না পর্যন্ত সন্দেহ করবে না। আমি কেন তাকে ডেকেছি তো সে বুঝতে পারবে না।

কি করবে তাকে নিয়ে?

মেইলি বলল, সেটা নির্ভর করছে তার উপর। তাকে যেমন করে হোক থামাতে হবে। এ কাজ তার দ্বারা হবে না। এই সব লোকের জন্য আমাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। কতগুলো দুষ্ট প্রকৃতির শয়তান লোক টাকার জন্য মিডিয়ামের কাজটাকে ব্যবসা হিসাবে গ্রহণ করে অথচ তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। এই সব শয়তানদের জন্য সৎ ও দক্ষ লোকেদের সব কাজ বিনষ্ট হয় এবং তারা যথাযোগ্য মূল্য পায় না। জনগণ অবশ্য ওইসব অযোগ্য অসৎ মিডিয়ামদের চিনে রাখে। আমি তোমাদের সাহায্যে লোকটা সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে চাই। আমার একার দ্বারা এটা সম্ভব হত না। এই যে ও এসে গেছে।

ঘরের বাইরে ভারী জুতোর শব্দ হলো। ভণ্ড মিডিয়াম সাইলাস লিনডেন ঘরে ঢুকেই কুটীল দৃষ্টিতে সন্দিগ্ধভাবে সকলের দিকে তাকিয়ে মেইলির সামনে মাথা নত করে তাকে অভিবাদন জানাল। সে মেইলিকে বলল, মি. মেইলি, গতকাল সন্ধ্যাটা আমাদের ভালই কেটেছে, তাই নয় কি?

মেইলি একটা চেয়ার দেখিয়ে সাইলাসকে বলল, বস লিনডেন। গতরাতের কথাটা বলব বলেই আজ আমি তোমাকে ডেকেছি। তুমি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছ।

সাইলাস লিনডেনের ভারী মুখখানা রাগের আগুনে জ্বলে উঠল।

সাইলাস তীক্ষ্ণভাবে চিৎকার করে বলে উঠল, প্রতারণা! তার মানে?

তুমি নিজে প্রেত সেজে প্রেতাত্মার ভান করে আমাদের ঠকিয়েছ।

সাইলাস বলল, তুমি হচ্ছ চরম মিথ্যাবাদী। আমি এ ধরনের কোন কাজ করিনি।

মেইলি তার পকেট থেকে লিনেন কাপড়ের একটা টুকরো বার করে হাঁটুর উপর রাখল। তারপর বলল, এটা তোমার পোশাক থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। এবার কি বলবে?

সাইলাস বলল, তাতে কি হয়েছে?

মেইলি বলল, গত রাতে তোমার যে সাদা গাউনটা থেকে এটাকে কেটে নেওয়া হয়েছে তুমি সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারবে। যাইহোক তার আর দরকার নেই। তোমার সঙ্গে আমার সম্বন্ধের এখানেই শেষ। এটা তুমি অস্বীকার করতে পার না।

প্রথমে সাইলাস বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। তারপর এক ভয়ঙ্কর রাগে ফেটে পড়ল। তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলতে লাগল। সেই চোখ মেলে চারদিকে তাকিয়ে বলল, কিসের কথা বলছ? তুমি একটা বাজে লোকের উপর আমার পরীক্ষার ভার দিয়েছ। এটা সাজানো ব্যাপার।

মেইলি শান্তভাবে বলল, গোলমাল বা চিৎকার চেঁচামিচির কোন প্রয়োজন নেই। আমি আগামী কালই তোমাকে পুলিশ কোর্টে তুলতে পারি। তোমার ভাইয়ের খাতিরে আমি তার মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু তুমি এই কাগজটায় সই না করে ঘর থেকে যাবে না।

সাইলাস বলল, কে আমাকে আটকাবে?

মেইলি বলল, আমরা।

ওরা তিনজন অর্থাৎ মেইলি, ম্যালন ও রক্সটন দরজার কাছে গিয়ে সাইলাসের পথ আটকে দাঁড়াল। সাইলাস তখন ছিল ঘরের মাঝখানে। সে ঘুষি পাকিয়ে চোখদুটো বড় বড় করে বলল, তোমরা আমাকে আটকাবে? ঠিক আছে, দেখ তবে।

ওরা কোন উত্তর দিল না। কিন্তু তিনজনে মিলে এমনভাবে যুদ্ধের গর্জন করে উঠল যা আগে কেউ কোথাও শোনেনি।

পরমুহূর্তেই সাইলাস ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং দু’-হাতে ঘুষি পাকিয়ে মেইলিকে আক্রমণ করল। যৌবনে মেইলি বক্সিং করত। সে হাত দিয়ে সাইলাসের একটা ঘুষিকে আটকাল। কিন্তু অন্য ঘুষিটা তার উপর পড়তেই সে মাটিতে পড়ে গেল। লর্ড রক্সটন একটা দিকে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল। ম্যালন ফুটবল খেলোয়াড়ের তৎপরতার সঙ্গে মাথা নীচু করে সাইলাসের দুটো জানুর মাঝখানে মাথাটা ঢুকিয়ে দিয়ে তুলে ফেলল। তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সাইলাস। একটা হাঁটু তখনও ধরে ছিল ম্যালন। সাইলাস একটা চেয়ার ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ম্যালন তাকে আবার ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে লর্ড রক্সটন শক্ত দুটো হাত দিয়ে সাইলাসের গলাটা জড়িয়ে ধরলেন। এবার নিস্তেজ হয়ে পড়ল সাইলাস। লর্ড রক্সটন বললেন, এবার ওকে তোল। যথেষ্ট হয়েছে।

সাইলাস তখনও পড়ে ছিল। রক্সটন তার গলাটা ছেড়ে দিলেন। মেইলি এবার উঠে গা হাত পা ঝেড়ে বলল, আমি ঠিক আছি।

দরজার বাইরে একজন স্ত্রীলোকের শব্দ শোনা গেল। মেইলির স্ত্রী বলল, না না, ঠিক নেই, পরে তোমাকে দেখতে হবে।

মেইলি এবার সাইলাসকে বলল, তোমাকে এখন উঠতে হবে না। তুমি শুয়ে শুয়েই কথা বলতে পারবে। তুমি এই কাগজটাতে সই না করে ঘর থেকে যেতে পারবে না।

সাইলাস গম্ভীরভাবে বলল, কি কাগজ?

মেইলি একটা কাগজ ডেস্ক থেকে তুলে নিয়ে বলল, কাগজটা আমি তোমাকে পড়ে শোনাব।

মেইলি পড়তে লাগল, “আমি সাইলাস লিনডেন, এতদ্বারা স্বীকার করছি যে আমি মিডিয়ামের কাজ করতে গিয়ে নকল প্রেত সেজে দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছি। আমার এই কাজ দুর্বৃত্তজনোচিত ও কাপুরুষোচিত। আমি শপথ করে বলছি যে আমি আমার জীবনে কখনও মিডিয়ামের কাজ করার কোন চেষ্টা করব না। যদি আমি এই শপথ ভঙ্গ করি তাহলে আমার এই স্বাক্ষরযুক্ত স্বীকারোক্তি প্রকাশ্য আদালতে আমাকে দণ্ডদানের জন্য ব্যবহৃত হবে।”

কাগজটা পড়া শেষ হলে মেইলি সাইলাসকে বলল, এবার তুমি সই করবে?

সাইলাস বলল, না আমি সই করব না। সই করলে আমার খারাপ হবে। আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে।

লর্ড রক্সটন মেইলিকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি আর একবার ওর গলাটা চেপে ধরব। মনে হয় ওর শ্বাসরোধ না হলে চৈতন্য হবে না।

মেইলি বলল, না, মোটেই নয়। আমার মনে হয় পুলিশ কোর্টের এই কেসটা তোলাই ভাল। তাহলে জনগণ জানতে পারবে ভণ্ড ও প্রতারক মিডিয়ামদের তাড়িয়ে পরলোকচর্চার আসরগুলোকে পরিষ্কার করে তুলতে চাইছি আমি।

এরপর মেইলি সাইলাসের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তোমাকে বিবেচনার জন্য এক মিনিট সময় দিচ্ছি, লিনডেন। তারপর পুলিশকে ফোন করব।

কিন্তু ভণ্ড প্রতারক সাইলাসের মনস্থির করতে এক মিনিটও লাগল না। সে বলল, ঠিক আছে আমি সই করব।

সাইলাসকে এবার উঠে দাঁড়াতে অনুমতি দেওয়া হলো। তবে সাবধান করে দেওয়া হলো সে যদি কোন চাতুরী খেলে তাহলে তাকে সহজে ছেড়ে দেওয়া হবে না।

সাইলাস নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে কাগজে সই করল। তারপর ওরা তিনজন সাক্ষী হিসাবে সই করল।

মেইলি এরপর সাইলাসকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, বেরিয়ে যাও। ভবিষ্যতে কোন সাধু ব্যবসা অবলম্বন করে সৎভাবে জীবন যাপন করার চেষ্টা কর।

সাইলাস বলল যে সে এ বিষয়ে কোনও কথা বাইরে প্রকাশ করবে না। এই বলে রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

বাইরে তখন অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে। সাইলাস চলে যেতেই মেইলির স্ত্রী এসে ঘরে ঢুকে ভাঙা চেয়ারটার জন্য কিছু দুঃখ প্রকাশ করে পরক্ষণেই আত্মস্থ হলো।

মেইলি তার স্ত্রীকে বলল, দুঃখ কর না প্রিয়তমা। শয়তানটাকে তাড়াতে পেরেছি এই যথেষ্ট। তার তুলনায় এই অল্প ক্ষতিটা কিছুই নয়। যেও না, তোমার সঙ্গে কথা আছে।

মেইলির স্ত্রী বলল, চা আসছে।

মেইলি বলল, এখন কিন্তু কড়া মদ হলে ভাল হত।

ওরা তিনজনই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। মেইলি কোনওরকমে জোর আঘাত থেকে বেঁচে গেছে। ধ্বস্তাধ্বস্তিতে ম্যালন বেশ কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একমাত্র রক্সটন শিকার অভিযানের মতো সমস্ত ব্যাপারটাকে উপভোগ করছিলেন। একমাত্র তিনি তখনও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছিলেন। এরপর ওরা সবাই মিলে আগুনের ধারে গিয়ে বসল।

মেইলি বলল, আমি দুঃখিত। ওই শয়তানটা টম লিনডেনের কাছ থেকে তার কত কষ্টের পয়সা বছরের পর বছর আদায় করেছে। শয়তানটা টম লিনডেনকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে এই কাজ করেছে।

এবার মেইলি টম লিনডেনের উপর পুলিশি আক্রমণের ব্যাপারটা উল্লেখ করল। শহরে এত মিডিয়াম থাকতে শুধু লিনডেনকে পুলিশ ধরল কেন?

আমি শুনেছি টম লিনডেনকে সাইলাস মিডিয়ামের কাজ শেখাতে বলেছিল। টম লিনডেন তাতে রাজি হয়নি।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, টম লিনডেন কি তার ভাইকে একাজ শেখাতে পারতো?

মেইলি এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করতে লাগল। তারপর বলল, হয়ত সে পারতো। কিন্তু ভণ্ড মিডিয়াম সাইলাস সত্যিকারের মিডিয়াম হলেও কম বিপজ্জনক হত না।

আমি তোমার কথা বুঝতে পারলাম না।

মিসেস মেইলি বলল, মিডিয়ামের কাজে আরও উন্নতি ঘটানো যেতে পারে। অনেকে এটাকে পেশা হিসাবে লোভনীয় মনে করে।

মেইলি বলল, ইচ্ছা করলেই আমরা একাজে উন্নতি করতে পারি না। এর জন্যে চাই নিষ্ঠা। কোন পুরুষ বা নারী যদি একজন প্রকৃত মিডিয়ামের কাছে বসে প্রেত আবাহনের শক্তির কথা ভাবতে থাকে তাহলে পরলোক থেকে একটা শক্তি আসবেই।

এরপর ম্যালন আবার জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু একথা তুমি কেন বললে যে প্রকৃত মিডিয়াম ও সৎ মিডিয়াম ভণ্ড—অসৎ মিডিয়ামের থেকে অনেক খারাপ

মেইলি বলল, কারণ প্রকৃত ও সৎ মিডিয়ামদের লোকে কু উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার করে। ব্ল্যাক ম্যাজিকও এই জাতীয় নানা অলৌকিক ঘটনার থেকেই উদ্ভব হয়। এগুলো শত্রুদের রটনা নয়। তবে সাধারণত এই সব ঘটনা দুষ্ট মিডিয়ামদের ঘিরেই ঘটে থাকে। এর থেকেই ডাইনিগিরিরও উদ্ভব হয়। তবে সৎ ও প্রকৃত মিডিয়ামরা সজ্ঞানে এসব কাজ করে না। শুধু খারাপ স্বার্থপর লোকেরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাদের ব্যবহার করে। তাদের দিয়ে লোক ঠকিয়ে টাকা রোজগার করে।

মিসেস মেইলি বলল, খারাপ খারাপকেই আকর্ষণ করে। যে যার যোগ্য সে তাই পায়। এর একটা বিপজ্জনক দিকও আছে।

মেইলি বলল, জগতে এমন কোন জিনিস আছে কি যার কোন বিপজ্জনক দিক নেই। আসলে কোন জিনিস ঠিক মতো ব্যবহার করার ওপর তার গুণাগুণ নির্ভর করে। কোনও জিনিস খারাপভাবে করলে বা তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তার ফল খারাপ হয়। প্রাচীন গোঁড়া পরলোকবাদের মধ্যেও একটা বিপজ্জনক দিক আছে। আমাদের জ্ঞান ও যুক্তির দ্বারা এই সব ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে।

লর্ড রক্সটন কথার মাঝখানে বললেন, আমি বিশ্বাস করি মধ্যযুগের ডাইনিদের ব্যাপারটা ও তাদের কলাকৌশল প্রকৃত ঘটনা। এই ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ডাইনিদের কাজের সময় পরোলোকের প্রেতদের শক্তিকে আহ্বান করা।

গতবছর আমি যখন প্যারিসে গিয়েছিলাম তখন একটি লোককে দেখেছিলাম। তার নাম লা পে। সে ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে কারবার করত। সে একটা ঘরে বসে তার কিছু পরিচিত লোক নিয়ে কাজ করত। তা হলেও তার কাজকর্মের মধ্যে ক্ষতিকারক কিছু দেখিনি। তবে বলতে পার তার কাজের মধ্যে পরলোকতত্ত্ব বলে কিছু ছিল না।

ম্যালন বলল, আমি হচ্ছি একজন সাংবাদিক, তাই কোন ঘটনার বিবরণ দিতে হলে আমাকে নিরপেক্ষভাবে দেখতে হবে।

ঠিক বলেছ, টেবিলের সব তাসগুলোই আমাদের পেতে হবে।

রক্সটন এবার ম্যালনকে বললেন, হে আমার যুবকবন্ধু, যদি তুমি একটা সপ্তাহের মতো সময় করে নিতে পার তাহলে আমি তোমাকে প্যারিসে নিয়ে গিয়ে লা পের সাথে দেখা করিয়ে দিতে পারি।

মেইলি বলল, ব্যাপারটা সত্যিই বড় অদ্ভুত। তাছাড়া প্যারিসে যাবার ইচ্ছাটা আমার আগেই ছিল, কারণ সেখানে আমার কিছু বন্ধু আছে। সেখানে মেটাসাইকিক (পরলোকতত্ত্ব ও প্রেততত্ত্ব) ইনস্টিটিউটের প্রধান মপুই আমাকে তাঁর কাজকর্ম দেখার জন্য আমাকে যেতে বলেছেন। তিনি গ্যালিসির একজন মিডিয়ামকে নিয়ে প্রেততত্ত্ব নিয়ে কিছু গবেষণার কাজ করেছেন। এই ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা ধর্মের দিক আছে সেই ধর্মগত দিকটার প্রতি আমার একটা আগ্রহ আছে। এই মহাদেশে বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের মধ্যে এই ধর্মের দিকটারই অভাব আছে। পরলোকতত্ত্বের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যাপারে এই পরলোকবাদীরা বেলফাস্টের ক্রফর্ড ছাড়া আর সবাইয়ের থেকে এগিয়ে আছে। আমি ড. মপুইকে তার কাছে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমার মনে হয় তিনি তাঁর গবেষণার কাজে বেশ কিছু ভয়াবহ তথ্য নিয়ে আমার প্রতীক্ষায় আছেন।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, ভয়াবহ কেন?

মেইলি বলল, কারণ, সম্প্রতি তিনি প্রেতদের ছায়াকে যে মূর্তিদান করেন তা কোন মানুষের মূর্তি নয়। ক্যামেরার ছবিতে তা ধরা আছে। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলব না। যদি তুমি সেখানে খোলা মন নিয়ে যাও তাহলে সব কিছু দেখতে পাবে।

আমি অবশ্যই যাব। আমার অফিসের প্রধান নিশ্চয় এটা চাইবে। এমন সময় চা আসায় ওদের আলোচনা বাধা পেল। এইভাবে আমাদের দেহগত প্রয়োজন অনেক সময় আমাদের উচ্চচিন্তা ও কর্মের মাঝে বাধা সৃষ্টি করে।

কিন্তু ম্যালন তার কাজের কথা ছাড়ল না। সে মেইলিকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি অশুভ আত্মাদের কথা বললে, তুমি কি কখনও তাদের দেখেছ?

মেইলি তার স্ত্রীর মুখপানে তাকিয়ে মৃদু হাসল। আগের কথার জের টেনে বলল, এটা আমাদের কাজের একটা অংশ। আমরা এতে অভিজ্ঞ।

ম্যালন বলল, আমি এটা আগেই বুঝেছিলাম। দেখেছিলাম যখন কোন নিচু স্তরের প্রেতাত্মাদের আবির্ভাব হয় তখন তুমি কীভাবে তার সঙ্গে মোকাবিলা কর।

মেইলি বলল, যদি আমরা পারি তো কোন নিচু স্তরের প্রেতাত্মাকে সাহায্য করি। তাকে তার কষ্ট বা সমস্যার কথা খুলে বলার উৎসাহ দিই। তারা সবাই দুষ্ট প্রকৃতির নয়। তারা অজ্ঞ। অসহায় জীব যারা এই জগতের পূর্বজন্মে যে সব দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছে এবং একটা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করেছে এখন তার ফল ভোগ করছে। আমরা তাদের মনকে উন্নত করে তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি।

কি করে তাদের সাহায্য কর? আর কি করেই বা তা জানতে পার?

জানতে পারি যখন তারা আমাদের সাহায্যের ফলে তাদের কতখানি উন্নতি হচ্ছে তা আমাদের কাছে এসে ব্যক্ত করে। আমাদের যেসব লোকেরা এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে তাদের বলে ‘রেসকিউ সার্কেল’ বা ‘উদ্ধার চক্র’।

ম্যালন বলল, আমি এই উদ্ধারচক্রের কথা শুনেছি, কিন্তু দেখিনি। কোথায় তা দেখতে পাব বলতে পার? এই ব্যাপারটা আমাকে খুবই আকর্ষণ করে। নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। তুমি যদি এই চক্রের অনুষ্ঠান দেখাতে পার তাহলে সেটাকে বিশেষ অনুগ্রহ বলে মনে করব।

মেইলি কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বলল, আমরা কিন্তু সেই সব অসহায় জীবদের নিয়ে প্রদর্শনী করতে চাই না। যদিও আমরা তোমাকে প্রকৃতপক্ষে পরলোকতত্ত্ববাদী বলে স্বীকার করতে পারি না তথাপি তুমি আমাদের কাজগুলোকে সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করেছ।

এই বলে মেইলি তার স্ত্রীর মুখপানে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল এবং তার স্ত্রী সমর্থনসূচক ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল। তারপর ম্যালনকে বলল, আপনাকে অনুমতি দেওয়া হলো। আমাদের একটি রেসকিউ সার্কেল আছে। আজই বেলা পাঁচটার সময় আমাদের বাড়িতে এই চক্রের অনুষ্ঠান হবে। মি. টার্বেন আমাদের মিডিয়াম। আমরা সাধারণত পাদ্রী চার্লস ম্যাসন ছাড়া আর কাউকে এই অনুষ্ঠানে আসতে বলি না। কিন্তু আপনারা দুজন এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করতে চান তাই আপনারা থেকে যান। আপনারা থাকলে আমি খুশী হব। মি. টার্বেন কিছুক্ষণ পরেই এসে পড়বে। সে একজন রেলের কুলী। তার কাজ সেরেই চলে আসবে। প্রেতচর্চা বা মিডিয়ামগিরি ক্ষমতা নিম্নশ্রেণীর লোকদের মধ্যেই দেখা যায়। তারা নিম্নশ্রেণীর হলেও প্রথম থেকেই এ বিষয়ে একটা প্রবণতার লক্ষণ দেখা যায়। তাদের মনটা সেইভাবে প্রথম থেকে গড়ে ওঠে। প্রেতচর্চার ইতিহাস এই কথাই বলে। জেলে, কাঠের মিস্ত্রী, উট চালক প্রভৃতি শ্রেণীর অনেক লোক অতীতে ভবিষ্যৎ বক্তা ও প্রেতচর্চার ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। শেষে মিডিয়াম হিসাবে টম লিনডেনও নাম করেছে।