হারানো জগৎ – ৮

অধ্যায় ৮

স্বদেশে আমার বন্ধুরা আমাদের সঙ্গে আনন্দ করতে পারেন, কারণ আমরা লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে গেছি, এবং অন্তত কিছুদূর পর্যন্ত প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কথাগুলি যে প্রমাণ করা যাবে তা বুঝতে পেরেছি। এ কথা সত্য যে সেই উপত্যকায় আমরা উঠতে পারিনি, কিন্তু সে উপত্যকা আমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে; এমন কি প্রফেসর সামারলীর মেজাজও অনেকটা ঠাণ্ডা হয়েছে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কথাই যে সত্য তা তিনি একবারও বলেননি, তবে তাঁর সেই অনবরত আপত্তি করার ভাবটা আর নেই; এখন তিনি বেশির ভাগ সময়ই চুপচাপ থেকে সব কিছু দেখে যাচ্ছেন। যাই হোক, পিছনে ফিরে গিয়ে যেখানে ছেড়ে দিয়েছিলাম আবার সেখান থেকেই আমার কাহিনি শুরু করছি। একটি স্থানীয় ইন্ডিয়ান আহত হওয়ায় তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর এই চিঠিটা তার হাত দিয়েই পাঠাচ্ছি; তাই এ চিঠি যথাস্থানে পৌঁছবে কি না সে বিষয়ে আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

খারাপ খবর দিয়েই আমার প্রতিবেদন শুরু করতে হচ্ছে, কারণ (দুই অধ্যাপকের খেয়োখেয়ির কথা ছেড়ে দিলেও) আজ সন্ধ্যায় এমন একটা গুরুতর ব্যক্তিগত গোলমাল ঘটেছে যার ফল খুবই শোচনীয় হতে পারত। ইংরেজি-জানা দো-আঁসলা গোমেজের কথা আগেই বলেছি। লোকটি খুব কাজের, কিন্তু একটা দোষ তার আছে—বড় বেশি কৌতূহলী। কাল সন্ধ্যায় আমরা যখন বসে কাজের কথা আলোচনা করছিলাম তখন সে কাছেই কোথাও লুকিয়ে ছিল। আমাদের বিরাট-বপু নিগ্রো জাম্বো তাকে দেখতে পেয়ে টানতে টানতে আমাদের সামনে নিয়ে এল। গোমেজ ছুরি বের করল; অবশ্য প্রচণ্ড শক্তিশালী জাম্বো একহাতেই তাকে কাবু করে না ফেললে সে নির্ঘাৎ তাকে ছুরি মারত। যথেষ্ট বকুনি দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন করতেও বাধ্য করা হয়েছে; আশা করছি সব ঠিক হয়ে গেছে। দুই পণ্ডিতের লড়াই কিন্তু সমানেই চলেছে। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কথাবার্তা খুবই আপত্তিকর তা মানতেই হবে, কিন্তু সামারলীর জিহ্বার ঝালও তো কম নয়।

যাই হোক, পরদিনই আমাদের অভিযান শুরু হলো। দুই ডিঙিতে জিনিসপত্র বোঝাই করে তাতে ভাগাভাগি করে উঠে পড়লাম, প্রতিটি ডিঙিতে ছ’জন করে; অবশ্য প্রতি ডিঙিতে একজন করে অধ্যাপককে নেওয়া হলো। আমি রইলাম চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে।

পুরো দুটো দিন একটা বড় রকমের নদী দিয়ে চলতে লাগলাম। নদীটা কয়েক শ’ গজ চওড়া, কালো জল, কিন্তু এত স্বচ্ছ যে তলাটা পর্যন্ত দেখা যায়। আমাজনের অর্ধেক উপনদীই এই রকম, বাকি অর্ধেক সাদাটে ও ঘোলা। যে ধরনের জমির ভিতর দিয়ে নদী প্রবাহিত হয় তার উপরেই এই পার্থক্য নির্ভর করে। কালো জল মানেই গাছ-পাতা পচেছে জলের তলায়, আর সাদাটে মানেই জলের নিচে কাদাটে মাটি আছে। নদীর দুই তীরে আদিম জঙ্গল। তার গভীর রহস্য কি কোনও দিন ভুলতে পারব? পুরনো ঘাস-পাতার নরম কার্পেটের উপর দিয়ে নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের অন্তরের মধ্যে এমন একটা নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে পড়ত যাকে আমরা অনুভব করে থাকি গোধূলির অন্ধকারে কোনও ভজনালয়ের ভিতরে। এমন কি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের বুক-ফাটানো গানও যেন একসময় অস্পষ্ট ফিস্ ফিস্ শব্দে পরিণতি লাভ করত। আমি একাকী হলে এই সব মহীরুহের নাম জানতে পারতাম না, কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানীরা আমাদের সব চিনিয়ে দিলেন। ঊষাকালে ও সন্ধ্যায় বাঁদররা দল বেঁধে কিচির-মিচির করে; শুক পাখিরা কর্কশ স্বরে চিৎকার করে; কিন্তু দুপুর বেলা দূরাগত ঢেউয়ের শব্দের মতো শুধু কানে আসে কীট-পতঙ্গের একটানা সুর। একদিন মাত্র একটা পিপীলিকা-খাদক বা ভালুক জাতীয় জীবকে গাছের ছায়ায় লুকিয়ে থাকতে দেখেছিলাম। আমজনের এই বিরাট অরণ্যে পৃথিবীর বুকে সেটাই ছিল জীবনের একমাত্র সাথী।

অথচ বুঝতে পারছি যে আমাদের অদূরে এই সব রহস্যময় ফাঁক-ফোঁকরের মধ্যে কোথাও কোথাও মানুষের জীবনযাত্রাও চলেছে। তৃতীয় দিনে বাতাসে একটা গভীর আলোড়ন শুনতে পেলাম—যেমন গম্ভীর, তেমনই সুরেলা। সারাটা সকাল সে শব্দ এই ভেসে এল, আবার মিলিয়ে গেল। দুটো নৌকোই মাত্র গজ কয়েক দূরে থেকে দাঁড় টেনে চলছিল। তখনই প্রথম শব্দটা কানে এল। আমাদের ইন্ডিয়ান সঙ্গীরা হঠাৎ নিথর হয়ে গেল, তারা যেন ব্রোঞ্জের মূর্তি; শব্দটা শুনতে শুনতে তাদের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

শুধালাম, “ওটা কি?”

লর্ড জন নিস্পৃহভাবে বললেন, “ভেরী; রণভেরী। আগেও শুনেছি।”

গোমেজ বলল, “হ্যাঁ স্যার, রণভেরী। বুনো ইণ্ডিয়ানরা খুব সাহসী, আমাদের মতো নয়; প্রতি মাইলে মাইলে তারা আমাদের উপর নজর রাখে; পারলে আমাদের মেরে ফেলে।”

নিশ্চল, অন্ধকার মহাশূন্যের দিকে তাকিয়ে শুধালাম, “কেমন করে নজর রাখে?” (সেটা ইণ্ডিয়ানরা জানে। তাদের নানারকম ফন্দি-ফিকির আছে। আমাদের উপর নজর রাখে। ভেরীর শব্দে কথা বলে। পারলে আমাদের মেরেও ফেলে।”

সেদিন বিকেল নাগাদ—আমার পকেট-দিনপঞ্জীতে দেখছি দিনটা ছিল মঙ্গলবার ১৮ই অগাস্ট—অন্তত ছ’সাতটা ভেরী নানা দিক থেকে বাজতে লাগল। কখনও দ্রুত তালে, কখনও ধীরে ধীরে, কখনও যেন প্রশ্নোত্তরের আকারে। সেই অবিরাম শব্দের ভিতর দিয়ে যেন দো-আঁসলা গোমেজের কথাগুলিই বার বার ধ্বনিত হতে লাগল : “পারলে আমরা তোমাদের মেরে ফেলব।” পুবের লোকরা বলছে, “পারলে আমরা তোমাদের মেরে ফেলব।” উত্তরের লোকরা বলছে,

পারলে আমরা তোমাদের মেরে ফেলব।

সেই ভেরীর নিনাদ চলল সারাটা দিন। আমাদের কালো সঙ্গীদের মুখে পড়ল আতঙ্কের ছায়া। অবশ্য সেই একটি দিনেই আমি চিরকালের জন্য জানলাম যে সামারলী ও চ্যালেঞ্জার দু’জনই সেই মহত্তম সাহসের অধিকারী যে সাহসিকতা বৈজ্ঞানিক মনের অন্যতম অধিকার। যে মানসিকতা ডারুইনকে শিখিয়েছিল আর্জেন্টিনের “গচো”দের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে, ওয়ালেসকে শিখিয়েছিল মালয়ের নরমুণ্ড-শিকারীদের মুখোমুখি হতে। সারা দিন তাঁরা ঐ রহস্যময় শব্দ নিয়েই মেতে রইলেন।

সেদিন রাতে ভারী পাথরের সাহায্যে আমরা মাঝ-নদীতে ডিঙির নোঙর ফেললাম; সম্ভাবিত আক্রমণ প্রতিরোধের সব রকম প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু কিছুই ঘটল না। ভোর হতেই আবার আমরা এগিয়ে চললাম; ভেরীর আওয়াজ আমাদের পিছনে মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যা নাগাদ মোহনা থেকে প্রায় একশো মাইল পার হয়ে তবে রাতের জন্য নোঙর ফেলা হলো।

পরদিন সকাল থেকেই প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে খুবই বিচলিত মনে হতে লাগল; তিনি অনবরত নদীর এ-তীর ও-তীর খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছেন। হঠাৎ খুশিতে চেঁচিয়ে উঠে একটা গাছের দিকে আঙুল বাড়ালেন। একটা অদ্ভুত কোণ সৃষ্টি করে গাছটা নদীর উপর ঝুঁকে আছে।

“ওটাকে কী মনে হচ্ছে?” তিনি শুধালেন।

“ওটা নিশ্চয় আসাই তালগাছ”, সামারলী বললেন।

“ঠিক তাই। এই আসাই তালগাছাটাই আমার চিহ্ন। নদীর অপর তীর ধরে আধ মাইল গেলেই গুপ্ত দ্বার। গাছগুলি সব সোজা উঠে গেছে। সেটাই এখানকার বিস্ময় ও রহস্য। গাঢ়-সবুজ শেওলার পরিবর্তে যেখানে হাল্কা-সবুজ নলবন দেখা যাচ্ছে সেখানে বড় বড় গাছের ফাঁকেই আছে অজ্ঞাত জগতে ঢুকবার গুপ্ত দরজা। সামনে এগিয়ে গেলেই বুঝতে পারবেন।”

আশ্চর্য জায়গা! হাল্কা-সবুজ নলবনের কাছে পৌঁছে লগি ঠেলে ডিঙি দুটোকে কয়েক শ’ গজ ঠেলে নেবার পরেই আমরা একটা শান্ত অগভীর নদীতে পড়লাম; বালুকাময় নদীর বুকে পরিষ্কার স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে চলেছে। যে কখনও চোখে দেখেনি সে এই নদীর অস্তিত্ব বা তার ওপারের রূপকথার দেশের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।

সত্যি, এক রূপকথার দেশ—মানব-কল্পনার এক আশ্চর্য জগৎ। মাথার উপরে ঘন গাছপালা পরস্পরকে জড়িয়ে যেন তোরণ তৈরি করেছে; সেই সবুজ গুহার ভিতর দিয়ে গোধূলির সোনার আলো গায়ে মেখে বয়ে চলেছে সবুজ শান্ত নদীটি। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, কাঁচের মতো নিশ্চল, ভাসমান বরফের কোণার মতো সবুজ নদীটি পাতার তোরণের ভিতর দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত; আমাদের বৈঠার প্রতিটি আঘাতে হাজার ঢেউ ভেঙে পড়ছে তার ঝলমলে বুকে। আশ্চর্য দেশে যাবার উপযুক্ত পথই বটে। ইন্ডিয়ানদের জীবনযাত্রার সব চিহ্ন মিলিয়ে গেছে; ক্রমেই বেশি করে চোখে পড়ছে জন্তু-জীবনের আভাস; সে সব প্রাণীর পোষ-মানা ভাব দেখে মনে হয় শিকারী কাকে বলে তা তারা জানে না। পাখ-পাখালিরও অন্ত নেই; গাছের ডালে ডালে পাখিদের মেলা। পায়ের নিচের স্ফটিকস্বচ্ছ জলে খেলা করছে নানা আকার ও বর্ণের কত রকম মাছ।

তিন দিন আমরা সেই আবছা সবুজ রোদে ঘেরা সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললাম। এই আশ্চর্য জলপথের গভীর শান্তি কোনও মানুষের উপস্থিতির দ্বারা বিঘ্নিত হয়নি।

“এখানে কোনও ইন্ডিয়ান থাকে না। খুব ভয় পায়। কুরুপুরি”, গোমেজ বলল।

লর্ড জন বুঝিয়ে দিলেন, “কুরুপুরি হচ্ছে অরণ্যের দেবতা। এটা যে কোনও শয়তানের নামই হতে পারে। গরীব ভিখারিরা মনে করে এই দিকে ভয়ঙ্কর কিছু আছে, তাই তারা এদিকে আসে না।”

তৃতীয় দিনে পরিষ্কার বোঝা গেল আমাদের ডিঙির যাত্রা আর বেশিদূর চলবে না। নদীর জল দ্রুত কমে আসছিল। দু’ঘণ্টায় দু’বার ডিঙি চরে আটকে গেল। শেষ পর্যন্ত নৌকো দুটোকে ঠেলে ডাঙায় তুলে নদীতীরেই রাতটা কাটালাম। সকালে লর্ড জন ও আমি নদীর তীর বরাবর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কয়েক মাইল হেঁটে গেলাম। নদীর জল ক্রমাগতই কমে যাচ্ছে। ফিরে এসে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে সে-কথা জানালে ডিঙি দুটোকে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রেখে কুড়ুল দিয়ে একটা গাছ কেটে সেই ডালপালা দিয়ে ডিঙি দুটোকে ঢেকে রাখা হলো। তারপর সব জিনিসপত্র—বন্দুক, বারুদ, খাবার-দাবার, তাঁবু, কম্বল প্রভৃতি— নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে কাঁধে নিয়ে অধিকতর শ্রমসাধ্য পথে যাত্রা শুরু করলাম।

শুরুতেই আমাদের দুই উগ্রচণ্ডীর মধ্যে লড়াই বেধে গেল। আমাদের সঙ্গে যোগ দেবার পর থেকেই চ্যালেঞ্জার দলটাকে পরিচালিত করছিলেন। এবার সহযোগী- অধ্যাপকটি তাতে আপত্তি করে বসলেন। তাঁকে একটা কাজের ভার (একটা ব্যারোমিটার বয়ে নিয়ে যাওয়া) দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ অথচ শান্ত গলায় বললেন, “কোন ক্ষমতাবলে আপনি এই হুকুম জারি করছেন সেটা জানতে পারি কি স্যার?”

চ্যালেঞ্জার দাঁত বের করে বললেন, “দেখুন প্রফেসর সামারলী, অভিযানের দলপতি হিসাবেই আমি এটা করছি।”

“আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি স্যার যে আপনার এই পদাধিকারকে আমি স্বীকার করি না।”

“তাই নাকি!” বিদ্রূপের ভঙ্গিতে অভিবাদন জানিয়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, “তাহলে আমার সঠিক পরিচয়টা বলে দিন।”

“বলছি স্যার। আপনি সেই লোক যার কথার সত্যতা বিচারাধীন, আর এই কমিটিই তার বিচার করবে। আপনি হেঁটে চলেছেন আপনার বিচারকদের সঙ্গে।”

ডিঙিটার এক কোণে বসে পড়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, “আহা রে! তাই যদি হয় তাহলে আপনারা পথ দেখুন, আমি সুবিধামতো আপনাদের পিছু-পিছু যাব। আমি দলপতি না হয়েও আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব সেটা আপনারা আশা করতে পারেন না।”

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দুটি সুস্থ মাথার লোক সেখানে ছিলেন—লর্ড জন রক্সটন ও আমি—যাদের হস্তক্ষেপের ফলেই সব্বাইকে শূন্য হাতে লন্ডনে ফিরে যেতে হয়নি। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরে তাদের ঝগড়া মিটল। শেষ পর্যন্ত স্থির হলো, সামারলী বাঁকা ঠোঁটে পাইপ গুঁজে আগে আগে যাবেন, আর চ্যালেঞ্জার বকবক করতে করতে যাবেন তাঁর পিছনে পিছনে।

একজন একজন করে সার বেঁধে আমরা নদীর তীর ধরে এগোতে লাগলাম। নদীটা ছোট হতে হতে এক সময় একটা ঝর্ণার রূপ নিল। তাও এক সময় হারিয়ে গেল স্পঞ্জের মতো শেওলায় ঢাকা একটা জলাভূমির মধ্যে। সেখানে মাত্র হাঁটু- জল। জায়গাটায় ঝাঁক-ঝাঁক মশা ও কীট-পতঙ্গের বাসা। অগত্যা সেটাকে পাশ কাটিয়ে আমরা জঙ্গলের পথে ঘুরে গেলাম। অর্গ্যানের দূরাগত বাজনার মতো কীট-পতঙ্গের গুঞ্জনধ্বনি কানে বাজতে লাগল।

ডিঙি ফেলে আসার দু’দিন পরে চারদিককার চেহারাই পাল্টে গেল। রাস্তাটা ক্রমাগতই উপরে উঠে যাচ্ছে; গাছপালা ফাঁকা হয়ে আসছে। আমাজন-অঞ্চলের বড় বড় গাছের বদলে দেখা দিল ফিনিস্ক ও কোকো গাছের ঝোপ; মাঝে মাঝে লতাপাতার জঙ্গল। এগিয়ে চলেছি সম্পূর্ণভাবে কম্পাসের উপর নির্ভর করে। মাঝে মাঝেই চ্যালেঞ্জার ও দুই ইন্ডিয়ানের মধ্যে মতভেদ হচ্ছে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত “আধুনিক ইওরোপীয় সভ্যতার প্রতিনিধির পরিবর্তে অনগ্রসর বর্বরদের সহজাত প্রবৃত্তি”র নির্দেশ মেনে চলতেই আমরা রাজী হলাম। আমরা যে ভুল করিনি, তৃতীয় দিনেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। চ্যালেঞ্জার নিজেই স্বীকার করলেন যে পূর্ববর্তী অভিযানের কিছু কিছু চিহ্ন তাঁর চোখে পড়ছে। এক জায়গায় সত্যি সত্যি চারটে আগুনে-পোড়া পাথর দেখতে পেলাম; সেখানে নিশ্চয় একদা কোনও শিবির ফেলা হয়েছিল।

রাস্তা ক্রমেই উপরে উঠছে; একটা পাথুরে চড়াই পার হতে দু’দিন লেগে গেল। গাছপালার চেহারা বদলে গেল; শুধু গজদন্ত-গাছ আর প্রচুর অর্কিড; তার মধ্যে ছিল বিরল জাতের নুটোনিয়া ভেক্সিলারিয়া, কালেয়ার লাল-গোলাপী ফুল আর অডটোগ্লোসাম। পাথরভর্তি জলাশয়ের বুকে ট্রাউট মাছের মতো একরকম নীলাভ মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেগুলো ধরে রাতের আহার বেশ ভালভাবেই সমাধা হলো।

এই ভাবে প্রায় একশ’ বিশ মাইল পথ পার হবার পরে নবম দিবসে আমরা গাছপালার ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তার বদলে দেখা দিল ঘন- সন্নিবিষ্ট বাঁশবন। সে বন এতই ঘন যে ইন্ডিয়ানদের টাঙি ও কাটারির সাহায্যে সেগুলো কেটে তবে আমাদের পথ করে নিতে হয়েছিল। দু’বার মাত্র এক ঘণ্টা করে বিশ্রাম নিয়ে সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত একটানা হেঁটেছিলাম। এর চাইতে ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে কিছু কল্পনাই করা যায় না। যে জায়গাটা সব চাইতে বেশি ফাঁকা সেখানেও দশ-বারো গজের বেশি দৃষ্টি চলে না। বেশির ভাগ সময়ই সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম শুধু লর্ড জনের সুতীর কুর্তার পিছনটা, আর দু’পাশে এক ফুটের মধ্যে দুটো হলুদ দেয়াল। মাথার প্রায় পনেরো ফুট উপরে নলবনের মাথাগুলো দুলছে গাঢ় নীল আকাশের বুকে।

সেখানেই তাঁবু ফেলে রাতটা কাটিয়ে আবার পায়ে চলা শুরু হলো। পিছনে বাঁশবনের দেয়াল, সামনে কিছুটা খোলা জায়গা একটু একটু করে উপরে উঠে গেছে। আর সেখানেই একটা ঘটনা ঘটল।

দুটি স্থানীয় ইন্ডিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার চলছিলেন আগে আগে। হঠাৎ থেমে গিয়ে তিনি উত্তেজিতভাবে ডানদিকে কী যেন দেখালেন। দেখলাম, মাইলখানেক দূরে মস্ত বড় ধূসর পাখির মতো দেখতে একটা প্রাণী ধীরে ধীরে পাখা ঝাপটে মাটির উপর থেকে আকাশে উড়তে উড়তে গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

উচ্ছ্বসিত গলায় চ্যালেঞ্জার বলে উঠলেন, “আপনারা দেখেছেন? “আপনারা দেখেছেন? সামারলী, আপনি দেখেছেন?”

সহকর্মীটি আকাশের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। শুধালেন, “ওটা কি বলে আপনি মনে করেন?”

“আমার বিশ্বাস ওটা টেরোড্যাক্টিল।”

সামারলী হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “টেরোকিড্‌লস্টিক! ওটা তো একটা বক।

চ্যালেঞ্জার তো রেগে আগুন। কোনও কথা না বলে ঝোলাটা কাঁধের উপর ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন। লর্ড জন আমার পাশে এলেন। তাঁর মুখটা গম্ভীর, হাতে একটা ‘জেইস’ দূরবীন!

তিনি বললেন, “গাছের আড়ালে মিলিয়ে যাবার আগেই আমি দূরবীনটা ওর উপর ফেলেছিলাম। ওটা কী তা আমি বলতে পারব না, তবে একথা বাজি রেখে বলতে পারি যে ও রকম কোনও পাখি আজ পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি।”

ঘটনাটা এই পর্যন্তই। আমরা কি পৌঁছে গেছি অজ্ঞাত জগতের প্রান্তে? আমাদের দলপতি যে লুপ্ত জগতের কথা বলে থাকেন তার সীমান্ত-রক্ষীদের কি আমরা দেখতে পেয়েছি? ঘটনাটি যেমন ঘটেছিল তেমনটিই বললাম। এবার আপনারা যা বুঝবার বুঝে নিন। তবে ঘটনা এই একটিমাত্র, কারণ উল্লেখযোগ্য আর কিছুই আমরা দেখতে পাইনি।

প্রিয় পাঠকগণ, আপনাদের নিয়ে অনেক পথ পার হয়ে এসেছি। প্রশান্ত নদী, নলবনের যবনিকা, সবুজ সুড়ঙ্গ, তালগাছের সারি, বাঁশবনের বাধা ও সরল বৃক্ষশ্রেণী। সব কিছু পেরিয়ে অবশেষে আমাদের গন্তব্য লক্ষ্যস্থলটি দেখা দিয়েছে। ঐ তো আমাদের চোখের সামনে সে দেশ। কোনও সন্দেহ নেই। আমাদের বর্তমান শিবির থেকে প্রায় সাত মাইল দূর থেকে সে দেশের শুরু। চ্যালেঞ্জার ময়ূরের মতো নাচতে শুরু করলেন। সামারলী চুপ করে গেলেন। আর একটা দিন পরেই আমাদের অনেক সন্দেহের অবসান হবে। ইতিমধ্যে একটা ভাঙা বাঁশে হাতটা ছড়ে যাওয়ায় জোস্ ফিরে যেতে চাইল। তার হাত দিয়েই এই চিঠি পাঠালাম। আশা করি একদিন চিঠিটা সঠিক হাতে পৌঁছে যাবে। এই সঙ্গে আমাদের ভ্রমণের একটা মোটামুটি চার্ট পাঠালাম। এটা দেখলে ভ্রমণ-বৃত্তান্তটি বোঝা কিছুটা সহজ হতে পারে।