তিনজন তদন্তকারীর আবির্ভাব

তিনজন তদন্তকারীর আবির্ভাব

মধ্য আফ্রিকায় বড় রকমের এক শিকারে যোগাদান করার পর লর্ড রক্সটন দেশে ফিরে এসেছে। সে শিকারের সময় পর পর অনেকবার আলপাইন পর্বতে উঠেছে। সে দেশে ফিরে এসে বলেছে, পর্বতারোহণ ব্যাপারটা এখন আর তেমন দুঃসাধ্য নয় মানুষের পক্ষে। এখন আল্পস পর্বতের চূড়ায় একটা ভাল বাগান বানানো যায়। এভারেস্টের চূড়াটাও এখন আর গোপন ব্যাপার নয়।

লর্ড রক্সটন দেশে ফিরে এলে লন্ডনের হেভী গেম সোসাইটি ‘ট্যাভলার্স’ হোটেলে তার সম্মানার্থে এক বিরাট ভোজ সভার আয়োজন করে। ওই সভায় শহরের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগদান করে। কিন্তু কোনও রিপোর্টার বা সাংবাদিক ছিল না সেখানে। তবে লর্ড রক্সটন সেই সভায় যে বক্তৃতা দিয়েছিল সেই বক্তৃতার কথাগুলো ঘরভর্তি শ্রোতাদের মনে অক্ষয়ভাবে গাঁথা আছে। এই সভায় বহু ফুলের মালার ভারে সে বিব্রত বোধ করতে থাকে। সভায় সভাপতি আবেগের সঙ্গে তার গৌরব গান করতে থাকে।

লর্ড রক্সটনের দেশে ফিরে আসার ব্যাপারটা ম্যালন প্রথম জানতে পারে ম্যাআর্ডল-এর মাধ্যামে। ম্যাকআর্ডল ছিলেন একজন নিউজ এডিটর বা সংবাদ সম্পাদক। তিনি যখন একমনে টেবিলে বসে একরাশ কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেন তখন তাঁর টাক মাথাটা লাল গম্বুজের মতো চকচক করতো। তিনি আজ সকালে ম্যালনকে ডেকে পাঠান। ম্যালন তাঁর কাছে যেতেই তিনি বলেন, তুমি কি জান রক্সটন দেশে ফিরে এসেছে?

ম্যালন বলল, আমি তো সে কথা শুনিনি।

ম্যালনের কথায় আশ্চর্য হয়ে সংবাদ সম্পাদক ম্যাআর্ডল বললেন, তুমি হয়ত শুনেছ গত যুদ্ধের সময় তিনি মধ্য আফ্রিকায় এক সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছিলেন। তখন সহসা একটা বড় বুলেট এসে তাঁর বুকে লাগে। তিনি তাতে আহত হন। কিন্তু পরে সেরে ওঠেন। এখন আবার তিনি কত পাহাড়ে উঠছেন। তিনি সবসময় নতুন একটা কিছু করে উত্তেজনার সৃষ্টি করতে চান।

ম্যালন সম্পাদকের হাতে কাগজের একটা টুকরো দেখে জিজ্ঞাসা করল, তার সবশেষ কাজটা কি?

আমি সে কথাই তোমায় বলে দিতে চাই। সান্ধ্য কাগজ ‘ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড’ এ একটা সম্পাদকীয় বেরিয়েছে।

সম্পাদক ম্যালনের হাতে কাগজটা দিয়ে বললেন, ঘটনাটা এখানে দেওয়া আছে :

পত্রিকার শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে যে পমফ্রেটের ডিউকের তৃতীয় পুত্র খ্যাতনামা জন রক্সটন এই পৃথিবীর অন্য এক প্রান্তে নানা দুঃসাহিসক অভিযানে যোগদান করার পর ক্লান্ত ও অবসন্ন দেহে আবার এক নতুন ভাগ্য জয় করতে চাইছেন। তিনি এবার পরলোক-গবেষণার অন্ধকার অস্পষ্ট সংশয়াচ্ছন্ন বিষয়গুলির দিকে মন দিয়েছেন। এখন মনে হচ্ছে তিনি যেন ভূতুড়ে বাড়ির একটা প্রতীক। তিনি বলে দিয়েছেন, যে কোনও বাড়িতে কোনও ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক ভৌতিক ক্রিয়াকাণ্ডের খবর পেলে তার তদন্ত করবেন। জন লর্ড রক্সটন দৃঢ়সংকল্প ও দৃঢ় চরিত্রের লোক। সারা ইংল্যান্ডে রিভলবার চালনায় তাঁর জুড়ি নেই। তাঁর লক্ষ্য অব্যর্থ। সুতরাং কেউ যেন তাঁর ব্যাপারে নাক গলানোর দুঃসাহস না দেখায়।

সংবাদ সম্পাদক ম্যাকআর্ডল মুচকি হেসে ম্যালনকে বললেন, এখন কি করবে দেখ। এ বিষয়ে তোমার মতামত কি?

আমি যে কোনও দিন লর্ড রক্সটনের সঙ্গে দেখা করতে পারি। মনে হয় তিনি এখন আলবেনির পুরনো বাড়িতেই আছেন। আমি সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করব।

সেদিন বিকালে ম্যালন ভিগো স্ট্রীট দিয়ে যেতে যেতে একটি পুরোন আমলের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলে লর্ড রক্সটনের বসার ঘরে চলে গেল। লর্ড রক্সটন সেই ঘরেই ছিলেন। তাঁর কাছে এক ভদ্রলোক ছিল। ম্যালন প্রথমে একটা কার্ড যোগাড় করল। যদিও তার আগে একজন ভদ্রলোকের আসার কথা ছিল তবু লর্ড তার সঙ্গে আগে দেখা করবেন বলে জানিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে একটি বিলাসবহুল ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেই ঘরে যুদ্ধে ও শিকার কার্যের স্মারক হিসাবে কতকগুলি ট্রফি সাজান ছিল। এই সব ট্রফির অধিকারী লর্ড রক্সটন তখন সেই ঘরের দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চেহারাটা লম্বা কিন্তু তেমন মোটাসোটা নয়। তাঁর মুখটা প্রাচীন কালের ডন কুইকজোটের মতো এবং তার মধ্যে একটা খামখেয়ালীর ভাব ছিল। তার নাকটা ছিল খাড়া আর অশান্ত চোখ দুটোর উপর ভ্রূ দুটো ছিল ঘনসংবদ্ধ।

ম্যালনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে লর্ড রক্সটন বলে উঠলেন, কি হে ছোকরা, আমি অফিসে আসার সময় তোমাকে দেখেছিলাম। এসো, ভিতরে এস। তোমার সঙ্গে এই ভদ্রলোকের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। ইনি হচ্ছেন রেভারেন্ড চার্লস ম্যাসন।

সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারে দেহটাকে গুটিয়ে কুঁকড়ে বসে থাকা লম্বা ও রোগা চেহারার একজন পাদ্রী ভাল করে উঠে বসে তার ডান হাতটা নবাগত ম্যালনের দিকে বাড়িয়ে দিল। ম্যালন বুঝতে পারল ধূসর রঙের একজোড়া তীক্ষ্ণদৃষ্টি তাকে খুঁটিয়ে দেখছে। সেই সঙ্গে দু’পাটী দাঁতের মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসা একমুখ প্রশান্ত হাসি তাকে নীরব অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। লর্ডের মুখ দেখলে বোঝা যায় সে মুখের উপর দিয়ে অনেক সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার ঝড় বয়ে গেছে। সে মুখে আজও লেগে আছে এক নিবিড় ক্লান্তির ছাপ। মনে হয় তিনি একজন আত্মিক যোদ্ধা। যিনি বহু আত্মার সঙ্গে লড়াই করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তবে সে মুখে আবার দেখা যায় সঙ্গীপ্রিয়তার একটা ভাবও ফুটে আছে। ম্যালন অনেক আগেই শুনেছিল যে এই মানুষটি একজন গ্রাম্য জমিদার হিসাবে খ্রীস্ট-ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গে পরলোকবাদ প্রচারের একটি চার্চ নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন, আজ স্বেচ্ছায় সেই সব ফেলে এসেছেন। তিনি চেয়েছিলেন খ্রীস্টধর্ম তারই এক অঙ্গ হিসাবে পরলোক-তত্ত্বকে মেনে নেবে।

ম্যালন বলল, আমি তো কখনও পরলোকবাদ হতে দূরে চলে আসিনি।

পাদ্রী সাহেব মুচকি হেসে বললেন, আপনি কখনই তা পারবেন না মি. ম্যালন। যতদিন না জগতে মানুষ ঈশ্বরপ্রেরিত এই জ্ঞানকে নিজেদের মধ্যে আত্মসাৎ করে নিতে পারছে ততদিন জগতের মুক্তি নেই। এটা এতই বড় ব্যাপার যে আপনি এটা কখনই অস্বীকার করতে পারবেন না। আজ এই মুহূর্তে এই বিশাল শহরে এমন কোন স্থান নেই যেখানে নর-নারী মিলিত হয়ে এই কথা আলোচনা করছে না। তবু একথা আপনি কোন খবরের কাগজ থেকে জানতে পারবেন না।

ম্যালন বলল, আপনি অন্য কোন কাগজের অপদার্থতা আমাদের ‘ডেইলি গেজেট’-এর উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। সম্ভবত আপনি সম্প্রতি প্রকাশিত আমার বর্ণনামূলক লেখা পড়েছেন।

পাদ্রী সাহেব উত্তর করলেন, হ্যাঁ পড়েছি। মাঝে মাঝে লন্ডনের সংবাদ- পত্রগুলো যতসব আজেবাজে কথা লিখে এক ভয়ঙ্কর উত্তেজনা ছড়ায়। তার থেকে আপনার লেখা ভাল। “দি টাইমস” পড়লে আপনার মনে হবে এই পরলোকবাদীদের নিয়ে কোন আন্দোলনই হয়নি। এক সম্পাদকীয় মন্তব্যের কথা মনে পড়ছে যাতে বলা হয়েছে ওরা এই পরলোকবাদে তখনই বিশ্বাস করবে যখন বিশ্বাস করার মতো ভিত্তি খুঁজে পাবে।

লর্ড রক্সটন বললেন, আমিও এই কথাই বলতে যাচ্ছিলাম।

পাদ্রী সাহেবের মুখখানা গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি বললেন, এটাই হলো আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য। এই বলে তিনি ম্যালনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, আমি একটা বিজ্ঞাপন দেখে লর্ড রক্সটনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। উনি এখন পরলোক-তত্ত্বের অনুসন্ধান করতে চান। তাঁর এই অভিপ্রায় খুবই ভাল এবং এর থেকে ভাল কাজ জগতে আর থাকতে পারে না। আগে তিনি কোন পশু শিকার করতে গিয়ে যেমন সাদা গণ্ডারের পিছনে ছুটতেন তেমনি খেলার ছলে কোন মৃত আত্মার পেছনে ছুটলে সেটা আগুন নিয়ে খেলা হয়ে যাবে।

লর্ড রক্সটন বললেন, ঠিক আছে পাদ্রী সাহেব, আমি তো সারাজীবন ধরেই আগুনের সঙ্গে খেলা করে আসছি। সুতরাং এটা নতুন কিছু নয়। ধর্ম নিয়ে কারবারের বিষয়ে যদি জানতে চান তাহলে আমি এই কথাই বলব যে, আমি ইংলণ্ডের চার্চের অধীনে মানুষ হয়েছি। এখন আমি এই তত্ত্বানুসন্ধানের একটা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। আপনি বললেন এর মধ্যে আছে বিপদের ঝুঁকি। তা যদি থাকে তো ভালই হবে।

পাদ্রী রেভারেন্ড চার্লস দাঁত বের করে নীরবে একটু মৃদু হাসি হাসলেন। তারপর ম্যালনকে বললেন, ওর মতে চলতে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। ওর মতের বিরুদ্ধে কোন কাজ ওকে দিয়ে করানো যাবে না। তাই নয় কি? এই বলে তিনি লর্ডকে বললেন, যাই হোক ব্যাপারটা আমি সম্পূর্ণরূপে বুঝলাম।

লর্ড রক্সটন ব্যস্তভাবে পাদ্রীকে বললেন, একটু অপেক্ষা করুন পাদ্রী সাহেব। আমি যখন কোন অভিযান শুরু করি তখন আমি কোন বন্ধুভাবাপন্ন ব্যক্তির উপর নির্ভর করি। আমার মনে হচ্ছে এক্ষেত্রে আপনি আমার সেই আকাঙ্ক্ষিত মানুষ। যিনি ঘটনাক্রমে আমার কাছে এসে পড়েছেন। কি এই অভিযানে আমার সঙ্গে যাবেন?

পাদ্রী সাহেব বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যেতে হবে?

লর্ড বললেন, বসুন বলছি। একগোছা চিঠি নাড়াচাড়া করে কি খুঁজতে লাগলেন, তারপর একটা চিঠি হাতে নিয়ে বললেন, আপনি এটা পড়ে দেখুন—”নিশীথ রাত্রি। সবাই ঘরে খিল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। একজন এক ভয়ঙ্কর ভূত দেখল পাগলা হয়ে গেল। এবার বলুন ব্যাপারটা কি?

পাদ্রী চিঠিটা পড়ে ভুরু কোঁচকালেন। তারপর বললেন, ব্যাপারটা খারাপ বলে মনে হচ্ছে।

লর্ড বললেন, আপনি হয়তো একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন।

পাদ্রী সাহেব তাঁর পকেট থেকে একটা ছোট ক্যালেন্ডার বার করে বললেন, বুধবার সামরিক বিভাগের ভূতপূর্ব-অফিসারের জন্য একটি কাজ এবং ওই দিন সন্ধ্যায় আমার একটা বক্তৃতা আছে।

কিন্তু আমরা আমাদের কাজ আজই শুরু করতে পারি। জায়গাটা হলো ডস্টেশায়ার, তিন ঘণ্টার পথ।

আপনার পরিকল্পনাটা কি?

একটা নির্জন ভূতুড়ে বাড়িতে একরাত্রি থাকতে হবে।

পাদ্রী সাহেব বললেন, যদি হতভাগ্য আত্মা বিপদে পড়ে তবে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা উচিৎ। ঠিক আছে আমি আসব।

ম্যালন অনুনয়ের সুরে বলল, নিশ্চয় সেখানে আমার একটা জায়গা হবে।

লর্ড রক্সটন বললেন, অবশ্যই হবে যুবক। তোমাদের অফিসের লাল মাথাওয়ালা লোকটা তোমাকে তো এই জন্যই পাঠিয়েছে। তুমি এই অভিযানের কথা লিখবে। ভিক্টোরিয়া স্টেশনে একটা ট্রেন আছে। সেখানেই আমাদের দেখা হবে।

ওরা তিনজনে রওনা হলো। ট্রেনে প্রথম শ্রেণীর একটা কামরায় উঠে তিনজন ডিনার করল। লর্ড রক্সটন একটা চুরুট ধরালেন। তিনি চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারের কথা বলছিলেন।

তিনি বললেন, বয়োপ্রবীণ ভদ্রলোক ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। আগের মতোই তাঁর স্বাভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় দু’-তিনবার আমার মাথাটা চিবিয়ে খেলেন। তিনি ওসব ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করেন না। ভূতের সঙ্গে লড়াই করার জন্য তিনি এক বোতল ক্লোরিন দিতে চাইছিলেন আমাকে। আমি বললাম, ভূত যত ভয়ঙ্করই হোক তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য আমার অটোমেটিক রিভলবারটাই যথেষ্ট বলুন পাদ্রী সাহেব, এই ধরনের অভিযান এটাই কি আপনার প্রথম?

পাদ্রী সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন, আপনি কিন্তু ব্যাপারটাকে খুব হাল্কাভাবে দেখছেন। এ ব্যাপারে আপনার কোন পরিষ্কার অভিজ্ঞতা নেই। আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি জানাচ্ছি যে, আমি কয়েকবার এই ধরনের ঘটনায় মানুষকে সাহায্য করতে গেছি।

ম্যালন তার রচনার জন্য তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো লিখে রাখছিল। সে পাদ্রীকে বলল, আপনি তাহলে ব্যাপারটাকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি।

এই সব ভূত-প্রেতের প্রভাব সম্বন্ধে আপনি কি মনে করেন?

পাদ্রী সাহেব বললেন, এ বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার আমার নেই। তুমি নিশ্চয় ব্যারিস্টার ওলগারনন মেইলিকে চেন। তিনি তোমাকে এ বিষয়ে বেশকিছু তথ্য প্রমাণ দিতে পারবেন। আমি ব্যাপারটাকে মানব-মনের গূঢ় প্রবৃত্তি ও আবেগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। মেইলির একটা বক্তৃতার কথা মনে আছে, মেইলি অধ্যাপক বেড়ানোর ভূত-প্রেতের উপর লেখা একটা বই সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন। তার বক্তৃতায় সেই বইয়েতে পাঁচশোরও বেশি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সহ ভৌতিক ঘটনার উল্লেখ আছে। এই সব ঘটনা মানুষকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত করতে সাহায্য করে। এই সব বইতে যে সব সাক্ষ্য ও তথ্য প্রমাণ দেওয়া আছে তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ম্যালন বলল, আমি বোজানি ও ফ্ল্যামারিয়নের লেখা পড়েছি। আমি শুধু এ বিষয়ে আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত জানতে চাই।

আমাকে বলতে বলছ বটে, কিন্তু আমি নিজেকে এ বিষয়ে খুব একটা অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী বলে মনে করি না। পরলোকতত্ত্ব বিষয়ে আমার থেকে আরও জ্ঞানী লোক আছেন যাঁরা অনেক ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তবু আমি যা দেখেছি আমার সেই অভিজ্ঞতা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। তার মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত এই যে, পরলোকতত্ত্ববাদীদের মৃত্যু সম্বন্ধে আত্মা ও দেহের ধারণাটির মধ্যে সত্য আছে। তাদের মতে মৃত ব্যক্তির আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যায়। মৃত্যুতে দেহের সঙ্গে আত্মার বিনাশ হয় না। অনেকে মনে করে এগুলো সব বাজে কথা কারণ এগুলো জ্ঞানী বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের কথা নয়। তবে এই কথাটাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই সব কথা যারা বলে তাদের জ্ঞানবুদ্ধির খুব বেশি নেই এবং মনে হয় তারা শুধু তাদের ধারণার কথাটাই বলে। কিন্তু এই ধারণাটা কোন পরীক্ষিত সত্য নয়।

কিন্তু এই ধারণাটাই বা হবে কেন?

হ্যাঁ, সেটাই হলো প্রশ্ন। সাধারণ এটাই মনে করা হয় যে, আমাদের এই প্রাকৃতিক দেহ মৃত্যুতে বিনষ্ট হয়ে মাটিতে মিশে যায় কিন্তু আত্মিক দেহটা নিরাকার অবস্থায় বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। তার বায়বীয় সত্ত্বাটা শূন্যে থেকে কাজ- কর্ম করে চলে। এই ব্যাপারটার মধ্যে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। আমাদের দেহটাকে তিনভাগে ভাগ করে দেখা হয়—প্রাকৃতিক দেহ, মানসিক দেহ ও আত্মিক দেহ। পেঁয়াজের খোলার মতো এগুলো পরপর সাজান থাকে। মানুষ যখন বেঁচে থাকে তখন তার দেহ, মন দুটোই কাজ করে। চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতি প্রভৃতি মনের কাজ। মানুষের মৃত্যুর পর একমাত্র তার আত্মিক দেহ কাজ করে। মৃত্যুর পর আত্মিক দেহের মধ্যে মনের চিন্তা ধারণা প্রভৃতি সঞ্চারিত হয় না। মানুষের আত্মা দেহ-মনের অতীত।

ম্যালন বলল, তাহলে তো একটা সমস্যার সমাধান হয়েই গেল। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ইহ জীবনের সবকিছু ভুলে যায় আর এটাই স্বাভাবিক। মৃত্যুর পর কোন অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে যাবে এটা কখনও হতে পারে না।

ঠিক বলেছ যুবক। আর্কি সোমস্ নামে এক ভদ্রলোকের বার্কশায়ারে একটি বাড়ি আছে। নেল গিয়ানি নামে আর এক মহিলা সেখানে বাস করত। আর্কি শপথ করে বলত, রাত্রির অন্ধকার গলিপথে সে বহুবার পরলোকগত নেলের প্রেতকে দেখেছে।

পাদ্রী সাহেব বললেন, কিন্তু নেল-এর মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহিলার প্রেতাত্মা মৃত্যুর পর এক শ’ বছর ধরে অন্ধকার গলিপথে ঘুরে বেড়াবে এটা কল্পনা করতে পারা যায় না। তবে ঘটনাক্রমে যদি এটা হয়ে থাকে যে নেল-এর জীবিতকালে কোন দুশ্চিন্তা বা বিষাদের উত্তাপ তার অন্তরটাকে কুরে কুরে খেয়েছিল তাহলে অবশ্য মৃত্যুর পর সে তার একটা সত্ত্বাকে ত্যাগ করে গেছে এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে।

ম্যালন বলল, আপনি বলেছেন আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে।

পাদ্রী বললেন, পরলোকতত্ত্ব সম্বন্ধে কিছু জানার আগেই আমার একটা অভিজ্ঞতা ছিল। আমি আশা করতে পারি না যে তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে। কিন্তু ঘটনাটা যে সত্যি একথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। বহুদিন আগে উত্তর অঞ্চলে একটি গ্রাম্য চার্চে আমি এক তরুণ কিউরেট হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। সেই গ্রামে এক বাড়িতে এক প্রেত থাকত। সেই প্রেতটি অনেক ক্ষতিকারক কাজকর্ম করে অনেককে নানাভাবে জ্বালাতন করত। কিউরেট বা ওঝার কাজে নিযুক্ত ছিলাম বলে আমি তখন নিজে থেকে সেই বাড়িতে ভূত ছাড়াতে গেলাম। চার্চ থেকে আমার একজন সহকারী আমার সঙ্গে গিয়েছিল। সুতরাং বুঝতেই পারছেন আমি একা ছিলাম না। আমরা দু’জনে ভালভাবে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা সেই ভূতুড়ে বাড়িটার বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওই ঘরটাই ছিল সবচেয়ে উপদ্রুত জায়গা। ভূতের যতকিছু উপদ্রব ও অত্যাচারের কেন্দ্রস্থল ছিল ওই ঘরটা। আমি সেই ঘরে যেতে আমার চারদিকে বাড়ির লোকেরা নতজানু হয়ে বসল। আমি মন্ত্র পড়তে লাগলাম। তারপরে কি হলো বল তো?

একটু হেসে নিজেই বলে যেতে লাগলেন পাদ্রী সাহেব, আমি সমস্ত ক্রিয়াকাণ্ডের পর যেই ‘আমেন’ কথাটি উচ্চারণ করলাম তখন ভূতুড়ে জন্তুটা দূরে চলে যাওয়ার বদলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আজ একথা বলতে লজ্জা করছে যে আমি তখন দুই লাফে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটতে লাগলাম আর বুঝতে পারলাম যে কোন ধর্মীয় ক্রিয়াকাণ্ড বা মন্ত্রপাঠ ভূত-প্রেতের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

তাহলে কি প্রভাব বিস্তার করতে পারে?

দয়া এবং যুক্তিবোধ কিছুটা করতে পারে। দেখবেন এর একটা বিশেষ প্রভাব আছে। এই পৃথিবীতে কিছু পার্থিব বস্তুর প্রতি আসক্ত ব্যক্তি থাকা স্বাভাবিক যাদের মন কখনও মাটির পৃথিবী ছেড়ে ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। কিন্তু সবাই পার্থিব মনোভাবাপন্ন নয়। এ ছাড়া অনেক স্বভাবত ভাল ও ঊর্ধ্বগতি সম্পন্ন মানুষ আছে। যেমন ধর গ্লাস্টনবেরীর সন্ন্যাসীরা। যাঁরা গত কয়েক বছর ধরে অনেক অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক কাজ করেছেন এবং যাঁদের কথা ব্লাউবন্ড নথিভুক্ত করে রেখেছেন। তাঁরা পৃথিবীতে সব সময় এক ধর্মভাবে বিভোর হয়ে থাকেন। আবার এমন দুষ্ট প্রকৃতির লোক আছে যারা এই পৃথিবীতে সব সময় নানা পার্থিব লাভের তাড়নায় চারদিকে ছুটে চলে এবং দরকার বুঝলে পরের অপকার করে। তাদের মন কখনও পার্থিব স্তরের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। বস্তুর ভারে ও চাপে তাদের মন এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে যে তাদের আত্মার সূক্ষ্ম কাজকর্ম কারও চোখে ধরা পড়ে না। তার প্রকৃতি নিষ্ঠুর ও চতুর এবং পরকে আঘাত করার ক্ষমতাই তার বেশি। এই সব দানবিক ও অশুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষগুলির সৃষ্টি হয় আমাদের শিরশ্ছেদমূলক দণ্ডদানের ব্যবস্থা থেকে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যে সব ব্যক্তির অকালে মাথা কাটা যায়, তাদের অব্যবহৃত ও অকালে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রাণশক্তি পরজন্মে প্রসারিত হয়ে এক ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ বাসনায় পরিণত হয়।

লর্ড রক্সটন বললেন, হ্যাঁ ব্যাপারটা খুবই খারাপ।

পাদ্রী সাহেব বললেন, তাই আমি এই ধরনের লোকদের কোনরূপ প্রশ্রয় দানের পক্ষপাতী নই। এই ধরনের লোকেরা সেই অক্টোপাসের মতো যা সমুদ্রের গভীরে কোন এক গুহার মধ্যে থাকে এবং এক-এক সময় হঠাৎ বেরিয়ে এসে জলের উপর ভাসতে ভাসতে কোন সাঁতার কাটতে থাকা মানুষকে আক্রমণ করে। এই সব প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রেতাত্মারা শূন্যে ওঁত পেতে বসে থাকে এবং সুযোগ পেলেই জীবিত মানুষের ক্ষতি করে।

ম্যালন তার হাঁ করা চোয়াল দুটো বন্ধ করে আশ্চর্য হয়ে বলল, তাহলে এইসব ক্ষতিকারক অশুভ প্রেতাত্মাদের হাত থেকে পরিত্রাণের কি কোন উপায় নেই?

পাদ্রী সাহেব বললেন, হ্যাঁ নিশ্চয়ই আছে। তা যদি না থাকত তাহলে এইসব অশুভ আত্মারা পৃথিবীকে একেবারে ধ্বংস করে দিত। আমাদের রক্ষার উপায় এই যে, কৃষ্ণকুটিল অশুভ আত্মাদের মতো শুচিশুভ্র অনেক শুভ আত্মাও আছে। আমরা ক্যাথলিকবাদের মতো বলতে পারি ‘রক্ষাকারী দেবদূত’ আমাদের রক্ষা করে চলে। তাদের যে নামেই ডাকি না কেন তাদের অস্তিত্ব আছে এবং যতসব অশুভ শক্তির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করে চলেছে। ঊর্ধ্বে এক আধ্যাত্মিক স্তরে তারা থাকে।

আচ্ছা পাদ্রী সাহেব, প্রেতাত্মা যখন আপনার উপর চাপল তখন আপনাদের গাইড কোথায় ছিল?

গাইডের ক্ষমতা আমাদের যোগ্যতার উপর নির্ভর করে। মন্দ প্রেতাত্মারা জীবিত মানুষদের উপর সাময়িক প্রভুত্ব দেখায় ঠিকই কিন্তু তাদের এই প্রভুত্ব বেশিক্ষণ খাটে না। শেষের দিকে ভালরই জয় হয়। এটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা।

লর্ড রক্সটন মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, যদি শেষ কালে ভালর জয় হয় তাহলে সে-জয় দেখার জন্য আমাদের অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে। ততদিনে হয়ত আমাদের জীবনেরও শেষ হয়ে যাবে। পুটোমায়ো নদীর ধারে যে শয়তানগুলোর সঙ্গে আমার মারামারি হয়েছিল তারা এখন কোথায়? তারা হয়ত এখন প্যারিসে আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। আর যে হতভাগ্য নিগ্রোদের তারা বধ করেছিল তাদের খবর কি?

পাদ্রী সাহেব বললেন, আমাদের কিছুটা বিশ্বাস দরকার। আমাদের এ কথা মনে রাখতে হবে যে আমরা কোন জীবনেই শেষ দেখতে পাই না। এই জীবনের পর আর-এক জন্ম ও জীবন আছে। তারপর আর এক। এটাই হলো সব জীবনের সিদ্ধান্ত। সব জীবনের শেষ যেখানে সেখান থেকে শুরু হবে আর এক জীবন। আর এই জন্যই পরলোকের বৃত্তান্ত জানার জন্য মানুষের এত আগ্রহ। পরলোকের মূল্যই এখানে। পরলোক-চর্চার দ্বারা আমরা অন্তত মৃত্যুর পর জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ের কথা জানতে পারি।

ম্যালন জিজ্ঞাসা করল, সে অধ্যায় আমরা কোথায় পাব?

পাদ্রী সাহেব বললেন, পৃথিবীতে অনেক আশ্চর্যজনক বই আছে, যদিও ইহজগতের লোকেরা সেই সব বই পড়তে শেখেনি আর তা বোঝার ক্ষমতাও তাদের নেই। এই সব বইয়ে আছে পরলোকের বৃত্তান্ত আর পরলোকবাসীদের জীবনের বিবরণ। একটি বিশেষ ঘটনার কথা আমার মনে আছে। তুমি এটা ইচ্ছা করলে এক ধর্মীয় কথামৃত বলে মনে করতে পার। কিন্তু আসলে এটা তার থেকে আরও কিছু এক বাস্তব ঘটনা। এক মৃত ধনী ব্যক্তির আত্মা একটি সুন্দর বাসভবনের সামনে এসে দাঁড়াল। তার গাইড এসে তাকে সরিয়ে নিয়ে গেল। তাকে বলল, ‘এ বাড়ি তোমার জন্য নয়। এটা তোমার বাগানের মালীর জন্য।’ এরপর গাইড সে আত্মাকে একটা বালির বস্তা দেখিয়ে বলল, ‘তুমি বাড়ি তৈরি করার জন্য এছাড়া আর কোন ব্যবস্থা করে যাওনি। আমাদের পক্ষে এর থেকে ভাল কিছু করার ছিল না। যা পেরেছি তাই করেছি। এটা কোন ধনী ব্যবসায়ীর জীবনের পরের অধ্যায় হতে পারে।

লর্ড রক্সটন বিষাদের হাসি হাসলেন। তিনি বললেন, আমি কিন্তু আমার প্রতিবেশীদের নিজের মতন করে ভালবাসি না এবং তা পারবও না। আমি তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু লোককে বিষের মতো ঘৃণা করি।

আমাদের পাপকে ঘৃণা করা উচিৎ। আমার কিন্তু পাপী আর পাপকে পৃথক করার ক্ষমতা নেই কারণ আমি নিজে একজন রক্তমাংসের মানুষ। আর পাঁচ জনের মতোই দুর্বল, তাই আমি কি করে ধর্মকথা প্রচার করব?

লর্ড রক্সটন বললেন, এই ধরনের প্রচারই আমি শুনতে চাই। চার্চের মঞ্চ থেকে যারা প্রচার করে আমাদের মনে হয় তারা আমার মাথার উপর থাকে। যদি তারা মাথার উপর থেকে আমাদের স্তরে নেমে আসে তাহলে তাদের কথা আমাদের কাজে লাগবে। আমার মনে হয় আজকে রাতে আমাদের ঘুম হবে না। সেখানে পৌঁছতে আমাদের আরও একঘণ্টা লাগবে। সুতরাং এই সময়টাকে কাজে লাগান উচিৎ।

সেদিন ছিল তুষারে আচ্ছন্ন এক শীতের রাত। ওরা যখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছল তখন রাত এগারটা বেজে গেছে। তখন স্টেশনটা প্রায় ফাঁকা। সহসা বেঁটেখাটো চেহারার লোমের ওভারকোট পরা এক মোটা ভদ্রলোক ওদের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওরা ট্রেন থেকে নামতেই ওদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন।

ভদ্রলোক বললন, আমি হচ্ছি বাড়ির মালিক মি. বেলচেম্বার। আমি আপনাদের তার পেয়েছি। ভদ্রমহোদয়গণ, কেমন আছেন? লর্ড রক্সটন, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনি দয়া করে আমার কষ্ট লাঘব করার জন্য এসেছেন এজন্য আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।

মি. বেলচেম্বার অতিথিদের সঙ্গে করে ছোট স্টেশনটার লাগোয়া একটা হোটেলে উঠলেন। সকরের জন্য স্যান্ডউইচ ও কফির অর্ডার দিলেন।

পরে তিনি বলতে লাগলেন, আমাকে লোকে ধনী বলেই মনে করে, তাই নয় কি? আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী। আমার যা কিছু সঞ্চয় তিনটে বাড়ির পিছনে খরচ করেছি। আজ যে বাড়িতে যাচ্ছি সেটি হলো আমার তিনটে বাড়ির একটি। বাড়িটির নাম হলো ভিলা ম্যাজিওর। বাড়িটা আমি কিনেছি ঠিকই কিন্তু এর সঙ্গে যে একটা পাগলা ডাক্তারের কাহিনি জড়িয়ে আছে তা কি করে জানব বলতে পারেন?

লর্ড রক্সটন একটা স্যান্ডউইচ চিবোতে চিবোতে বললেন, সেটাই তো আমরা জানতে চাই।

বেলচেম্বার বললেন, ওই পাগলা ডাক্তারটা রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে ওই বাড়িতেই থাকত। আমি নিজে তাকে দেখেছি। লম্বা ও রোগা-রোগা চেহারার গোমড়া মুখ ভদ্রলোকের। তার পিঠটা ছিল একটু কুঁজো এবং চলার গতিটা ছিল বড় অদ্ভুত মন্থর। লোকে বলত ওই ডাক্তার ভদ্রলোক সারাজীবন ভারতে কাটিয়ে শেষে দেশে ফিরে আসে। কেউ কেউ ভাবত লোকটা কোন অপরাধ করে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ সারা গ্রামের মধ্যে কেউ তার মুখ দেখতে পারত না। রাত্রির অন্ধকার ঘন না হয়ে ওঠা পর্যন্ত সে বাড়ি থেকে বেরোত না। একবার সে পাথর দিয়ে একটা কুকুরের পা ভেঙে দেয়। যাই হোক লোকটাকে সবাই ভয় করত। এবং তাকে এড়িয়ে চলত। সে শুধু তার বাড়ির জানলার ধারে একা-একা চুপচাপ বিষাদগম্ভীর মুখে বসে থাকত। তার চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করে জ্বলত। গ্রামের ছেলেরা তাকে দেখলেই পালিয়ে যেত। প্রতিদিন একজন তার বাড়িতে দুধ দিয়ে যেত। একদিন সে দুধ নেবার জন্য দরজা খোলেনি। পরদিনও লোকটা এলে সে দরজা খুলে দুধ নেয়নি। তখন পাড়ার লোকেরা দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢোকে। অবশেষে তার স্নানের ঘরে ঢুকে তারা দেখে সেই পাগলা ডাক্তারের দেহটা রক্তস্নাত অবস্থায় পড়ে আছে। সে তার হাতের শিরা কেটে দিয়ে আত্মহত্যা করে। লোকে তার কথা ভুলবে না।

লর্ড রক্সটন বেলচেম্বারকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি তাহলে বাড়িটা কিনেছিলেন?

হ্যাঁ, আমি কিনেছিলাম। কিন্তু বাড়িটা মেরামত ও রং করে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। যদি তখন দেখতেন তাহলে বলতেন এটা নতুন বাড়ি। তারপর আমি এক মদের দোকানের মালিক মি. জেনকিনসকে ভাড়া দিই। তিনি মাত্র তিনদিন ও বাড়িতে ছিলেন, এর বেশি টিকতে পারেননি। এরপর আমি ও- বাড়ির ভাড়া কমিয়ে দিয়ে বীল নামে এক ভদ্রলোককে ভাড়া দিই। বীল ছিল এক অবসরপ্রাপ্ত মুদী। সে এক সপ্তাহ কোনরকমে ওই বাড়িটাতে কাটিয়ে শেষে পাগল হয়ে যায়। একেবারে বদ্ধ পাগল। এরপর থেকে বাড়িটাকে আমি নিজের হেপাজতেই রেখেছি। বাড়িটা থেকে এখন কোন আয় হয় না। এর ট্যাক্স বিল প্রভৃতি যাবতীয় খরচ আমার নিজস্ব আয় থেকে খরচ করতে হয়। এখন হে ভদ্রমহোদয়গণ, দেখুন যদি কিছু আপনারা করতে পারেন।

শহরের ধারে ছোট পাহাড়টার ঢাল থেকে আধ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল ভিলা ম্যাজুয়োর নামে সেই অভিশপ্ত বাড়িটা।

মি. বেলচেম্বার ওদের পথ দেখিয়ে সেই বাড়িটার হলঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। আকাশে ছিল আধখানা চাঁদ। সেই চাঁদের আলোয় ওরা দেখতে পেল বাড়ির বাগানটা শীতের নানা সবজিতে ভরে গেছে। সেই সব সবজির লতা- পাতায় পথটা ঢেকে গেছে। চারদিক ছায়া-নিবিড় অন্ধকারে ভরা। এক গভীর নিস্ত ব্ধতা বিরাজ করছিল গোটা বাগানটায়। তার কাছে গেলেই এক অজানা আশংকায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল সকলের মন।

বাড়ির মালিক বেলচেম্বার বললেন, বাড়ির দরজায় তালা নেই। সামনের বসার ঘরে চেয়ার ও টেবিল পাতা আছে। ডানদিকে হল ঘর। আমি আগুন জ্বেলে রেখে দিয়েছি, এছাড়া এক বালতি কয়লাও রেখে দিয়েছি। আপনারা বেশ আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করবেন। ব্যবস্থার কোন ত্রুটি নেই। আমি থাকতে না পারার জন্য কিছু মনে করবেন না। আমার মাথার স্নায়ুগুলোর উত্তাপ এখনও কাটেনি।

এই বলে বাড়ির মালিক চলে গেলে ওরা তিনজন বসার ঘরে বসে কাজের কথা ভাবতে লাগল।

লর্ড রক্সটন একটা ইলেকট্রিক টর্চ এনেছিলেন। বাড়ির দরজা খুলেই একটা অন্ধকার গলিপথের উপর সেই টর্চের আলো ফেললেন তিনি। গলিপথে কোন কার্পেট পাতা ছিল না। সেই পথ দিয়ে কিছুটা গিয়ে কাঠের সিঁড়ি পাওয়া গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ওরা কতকগুলো ঘর দেখতে পেল। একটা পথ ধরে অল্প কিছুটা যেতেই ওরা একটা হলঘর আর তার পাশে একটা বসার ঘর দেখতে পেল। চুল্লীতে আগুন জ্বলছিল। তার পাশে এক বালতি কয়লা ছিল। পাদ্রী সাহেব ও ম্যালন আগুনটা জোর করে দিলেন, কারণ তখন দারুণ ঠাণ্ডা পড়েছিল। লর্ড রক্সটন তাঁর ব্যাগ খুলে অটোমেটিক রিভলবারটা বার করে টেবিলের উপর রাখলেন। একতাল তার বার করে ঘরের দু’ধারে কিছুদূর পর্যন্ত বিছিয়ে রাখলেন। ঘরের মধ্যে একটা তেলের বাতি জ্বলছিল। একদিকে কিছু বইপত্র স্তূপাকৃত করা ছিল। লর্ড রক্সটন তাঁর ব্যাগ থেকে মোমবাতি বার করলেন। তারপর বললেন, আমাদের মধ্যে একজনকে সজাগ দৃষ্টি দিয়ে চারদিকে নজর রাখতে হবে। আর দু’জনকে ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে কী হয় অর্থাৎ যে-কোন ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ওরা সিঁড়িটার কাছে এল। সিঁড়ির মাথার দু’দিকে দুটো ঘর দেখতে পেল। অব্যবহৃত ঘর দুটো ধুলোয় ভরা। দেওয়ালে কতগুলো কাগজ আঁটা ছিল। একটা ঘরের পাশেই ছিল সেই অভিশপ্ত স্নানের ঘর যেখানে একদিন পাগলা ডাক্তারের রক্তাক্ত মৃতদেহ পাওয়া যায়। দেওয়ালে দু’-এক জায়গায় এখনও রক্তের ছাপ দেখা যায়।

ম্যালন দেখল ঘরে ঢুকেই পাদ্রী সাহেব হঠাৎ টলতে টলতে দরজাটা ধরে ফেললেন। তাঁর মুখখানাকে ভয়ঙ্করভাবে সাদা দেখাচ্ছিল। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ছিল। বাকি দু’জন পাদ্রীকে ধরে ধরে চেয়ারওয়ালা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।

ম্যালন তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি ভয়ের কিছু অনুভব করছেন?

পাদ্রী সাহেব বললেন, আমি মাঝে মাঝে প্রেতচর্চার জন্য মিডিয়ামের কাজও করি। পরলোক থেকে আসা যে কোন প্রেতকে আমি দেখতে পাই। কিন্তু এখন যা দেখলাম তা এতই ভয়ঙ্কর যে ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

কী দেখলেন পাদ্রী সাহেব?

আমি যা দেখলাম তা বর্ণনা করা খুবই দুঃসাধ্য। আমার হৃৎস্পন্দন থেমে আসছিল। এক অসহায় একাকীত্বের বিপন্ন অনুভূতিতে তোলপাড় হচ্ছিল আমার মনটা। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়ানুভূতি বিকল হয়ে আসছিল। আমার চোখের দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে গেল। আমি নাকে কিসের একটা গন্ধ পেলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমার দেহের সব শক্তি যেন বেরিয়ে গেছে। আমার কথা বিশ্বাস করুন লর্ড রক্সটন, আজ রাতে যে বস্তুর সম্মুখীন হতে যাচ্ছি আমরা, সেটাকে মোটেই হালকা ভাববেন না।

শিকারী লর্ড অস্বাভাবিকভাবে গম্ভীর হয়ে উঠলেন। হ্যাঁ আপনার কথাগুলো ভেবে দেখছি পাদ্রী সাহেব। আপনি কি মনে করেন যে আপনি একাজের উপযুক্ত?

পাদ্রী সাহেব বললেন, আমার এই দুর্বলতার জন্য আমি দুঃখিত। যে-কোন বস্তুর ভিতরটা বা স্বরূপটা আমি দেখতে পাই। তবে ঘটনাটা যতই খারাপ হবে ততই আমার সাহায্যের দরকার হবে। এখন আমি সুস্থ আছি। এই বলে পকেট থেকে আধপোড়া কাঠ বার করে বললেন, এটা হলো স্নায়ুকম্পন সারাবার সবচেয়ে ভাল ডাক্তার। আমি এখানে বসেই ধূমপান করব। আমাকে কোন প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত আমি এখানে থাকব।

ম্যালন লর্ড রক্সটনকে জিজ্ঞাসা করল, প্রেতটা কি ধরনের রূপ ধারণ করবে বলে আপনি আশা করছেন?

এমন একটা কিছু যা অবশ্যই তোমার চোখে ধরা পড়বে।

চোখে ধরা পড়লেও এবং খুঁটিয়ে দেখেও আমি ঠিক বুঝতে পারি না। চোখে ধরা প্রেততত্ত্বের যারা চর্চা করে তারা সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, সব প্রেতমূর্তির একটা বাস্তব ভিত্তি আছে। আর এই বাস্তব ভিত্তিটা মানুষের দেহ থেকে নেওয়া হয়। আপনি এটাকে এক্টোপ্লাজম বা যে কোন নাম দিতে পারেন। আসলে যে কোন প্রেতমূর্তি এক জীবিত মানব-দেহেরই দান। তাই নয় কি?

লর্ড উত্তর করলেন, নিশ্চয়।

তাহলে আমরা কি মনে করব ডা. নিমানির প্রেতটা আমার ও আপনার দেহ থেকে উপাদান সংগ্রহ করে মূর্তি ধারণ করবে?

পাদ্রী ম্যাসন উত্তর করলেন, আমি যতদূর বুঝি সব প্রেতাত্মারাই তাই করে। কোন দর্শক যখন ভূত দেখে অনুভব করে যে তার শরীর হিম হয়ে আসছে, তার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠেছে, তখন সে বুঝতে পারে প্রেত প্রাণশক্তিটা তার থেকে টেনে নিয়েছে আর এই প্রাণশক্তি হরণের জন্য সেই ব্যক্তি মূর্ছিত হয়ে পড়ে, আবার কোনও কোনও সময় মৃত্যুও ঘটে। আমার মনে হয় এই ভাবে প্ৰেতটা যখন আমার প্রাণশক্তিটা টেনে নিচ্ছিল তখনই আমি দুর্বল হয়ে পড়ি।

মনে করুন আমরা মিডিয়ামের ভূমিকায় কাউকে চাই না। অর্থাৎ মিডিয়াম ছাড়াই কাজ করতে চাই। মনে করুন আমরা কিছুই প্রকাশ করতে চাই না।

এ বিষয়ে পুরো ঘটনা আমি বইয়ে পড়েছি। আইসল্যান্ডের প্রফেসার মি. নেলশন ঘটনাটা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করে ব্যক্ত করে। সে ক্ষেত্রে অশুভ প্রেতাত্মাটা শহরের এক ফটোগ্রাফারের ক্যামেরাতে ধরা পড়ে। এবং তার থেকেই তার মূর্তির উপাদানটা টেনে নেয়। এবং সেখান থেকে ফিরে সেই উপাদানটা কাজে লাগিয়ে একটা রূপ ধারণ করে। প্রেতটা তখন খোলাখুলি বলেছিল, আমাকে নেমে যাওয়ার সময় দাও। তারপর আমি দেখাব কী করতে পারি। প্রেতাত্মাটা ছিল বড়ই ভয়ঙ্কর এবং তাকে বশীভূত করতে ওদের খুবই বেগ পেতে হয়।

লর্ড রক্সটন বললেন, তুমি জান না কত বড় কাজের ঝুঁকি তুমি নিয়েছ।

ম্যালন বলল, আমরা যা করেছি তা পারব বলেই করেছি। যাই হোক আমাদের সামনের পথটা ভালভাবেই আলোকিত আছে। দরজা ভেঙে সিঁড়ি দিয়ে উঠে কেউ আসতে পারবে না। এখন আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।

সুতরাং ওরা অপেক্ষা করে যেতে লাগল। প্রতিটা মুহূর্ত ক্লান্তিকর বলে মনে হচ্ছিল ওদের। একটা বড় ঘড়ি রঙচটা দেরাজের উপর রাখা ছিল। তার কাঁটা দুটো সমানে টিকটিক করে যাচ্ছিল। পাদ্রী সাহেব তখন চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিলেন। ম্যালন একটানা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিল। লর্ড রক্সটন একটা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে যাচ্ছিলেন। নিশুতি নির্জন রাত্রি। কোথাও কোন শব্দ নেই। কেবল একটা পেঁচা ভয়ঙ্করভাবে ডাকছিল। যে ছোট গ্রামের রাস্তাটার ধারে বাড়িটা অবস্থিত ছিল সে রাস্তা একেবারে জনমানবশূন্য। মাঝে মাঝে অদ্ভুত একটা ক্যাচক্যাচ শব্দ চারদিকে নৈশ নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে ওদের কানে এসে বাজছিল।

কে যেন একজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।

এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ প্রতিটা পদক্ষেপ ছিল স্পষ্ট এবং প্রতিটা পদক্ষেপেই জুতোর একটা ক্যাচক্যাচ শব্দ হচ্ছিল। কে যেন সিঁড়ি থেকে নেমে সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। এই ঘটনায় সকলেই সচকিত হয়ে উঠল। লর্ড রক্সটন তাঁর অটোমেটিক রিভলবারটা শক্ত করে ধরলেন। ম্যালনের শরীরটা যেন আরও হীন হয়ে পড়ল। সে কাঁপছিল। পাদ্রী তাঁর চেয়ারে খাড়া হয়ে বসে রইলেন। ওরা সহসা বুঝতে পারল এই বাড়িতে ওরা একা নেই। ওদের অলক্ষ্যে কে বা কারা যেন ওদের উপর নজর রেখে চলেছে।

ওরা তিনজন নীরবে বসে থেকে একে অন্যের উপর তাকাতে লাগল। লর্ড রক্সটন বললেন, হা ভগবান! তাঁর মুখটা ম্লান হয়ে গেলেও দৃঢ়তার ভাব ছিল। ম্যালন একটা কাগজ বার করে সময়টা লিখে রাখল। পাদ্রী সাহেব চেয়ারে বসে প্রার্থনা করতে লাগলেন।

লর্ড রক্সটন বলতে লাগলেন, আমরা এ ব্যাপারটার শেষ দেখে ছাড়ব। আমরা কখনই এটাকে ছেড়ে চলে যাব না। আপনাকে এটা না বলে পারছি না পাদ্রী সাহেব যে, আমি একবার এক গভীর জঙ্গলে একটা আহত বাঘের অনুসন্ধান করেছিলাম কিন্তু তখন আমার মধ্যে এ ধরনের কোন অনুভূতি জাগেনি। তবু যতক্ষণ আমার মধ্যে চেতনা থাকবে আমি ওদের খুঁজে বার করবই। আমি যাচ্ছি।

সঙ্গে সঙ্গে তার দু’জন সঙ্গীও চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, আমরাও যাব। লর্ড বললেন, না, আপনারা থাকুন। তিনজন হলে বেশি শব্দ হবে। আমি একা গিয়ে ব্যাপারটা দেখব। যদি প্রয়োজন বুঝি তাহলে আপনাদের ডাকব। আমি নিঃশব্দে ওঁত পেতে থেকে অপেক্ষা করে যাব।

ওরা তিনজন দু’পাশের ঘরের মাঝখানে যে সরু পথটা ছিল সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। সেখান থেকে সিঁড়িটা শুরু হয়েছে। দুটো বাতির আলো সিঁড়ির উপর ছড়িয়ে পড়েছিল। রক্সটন সিঁড়ির মাঝখানে গিয়ে বসে পড়লেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের ঘরে গিয়ে বসতে বললেন। তারা তখন ঘরে গিয়ে আগুনের ধারে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল।

আধ ঘণ্টা কি পৌনে এক ঘণ্টা কেটে গেল। একজনের উপরে ওঠার পদশব্দ শোনা গেল! পিস্তল থেকে গুলি করার শব্দ হলো। তারপরই দু’জনের মধ্যে জোর ধ্বস্তাধ্বস্তি এবং এরপরে পড়ে যাবার শব্দ এবং সঙ্গে সঙ্গে সাহায্যের জন্য আর্ত চিৎকার। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ওরা দু’জন হল ঘরে ছুটে গেল। কারণ ওখান থেকেই শব্দ আসছিল। গিয়ে দেখল লর্ড রক্সটন নোংরা ধূলোবালিতে ভরা মেঝের উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ওরা দু’জনে তাকে ধরে তুলল। দেখল তাঁর মুখ ও হাতের দু’জায়গা ছিঁড়ে গেছে ও চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত পড়ছে।

লর্ড রক্সটন হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমি এখন ঠিক আছি।

ওরা উপর দিকে তাকিয়ে দেখল একটা কালো ছায়া ছাদের কাছে ঘন হয়ে জমে আছে।

ওরা লর্ড রক্সটনকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।

লর্ড বললেন, আমি আবার ওর সঙ্গে লড়াই করব। ও যদি শয়তান না হয় তা হলে আর কোন শয়তান পৃথিবীতে আসেনি কোনদিন।

ম্যালন বলল, এবার কিন্তু আপনি একা যাবেন না।

পাদ্রী সাহেব বললেন, হ্যাঁ। একা কখনই যাবেন না। আগে কী ঘটেছে বলুন।

লর্ড রক্সটন বললেন, আমি এই ঘটনার বিশেষ কিছু জানি না। আমি যখন একা বসেছিলাম তখন আমার ডান দিকে মাথার উপর একরাশ অন্ধকারকে জমাট বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়ে গুলি করি। তারপর কারা যেন আমাকে শিশুর মতো হল ঘরে বয়ে নিয়ে মেঝের উপর ফেলে দেয়। আমি মুখ থুবড়ে উপুড় হয়ে পড়ে থাকি। তোমরা সেই অবস্থায় আমাকে দেখতে পাও। এর বেশিকিছু আমি জানি না।

ম্যালন বলল, আপনি যখন বুঝতে পারছেন এটা কোন মানুষের কাজ নয়, অতিপ্রাকৃত অলৌকিক ঘটনা, কেন তবে এ বিষয়ে আরও অগ্রসর হতে চাইছেন?

এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

ম্যালন বলল, আপনি অভিজ্ঞতায় যা লাভ করার তা তো করেছেন। তবে আর কী চান?

ঠিক আছে, আমি আর একটা জিনিস চাই।

ম্যালন বলল, কিন্তু তা যদি চান তাহলে আমাদের সাহায্য দরকার হবে।

লর্ড রক্সটন তাঁর হাঁটুটা ঘষে বললেন, মনে হচ্ছে সাহায্যের দরকার হবে। তবে তার আগে ডাক্তারকে দেখতে হবে। অবশ্য পাদ্রী আপনি যখন রয়েছেন তখন যা হোক করে চালিয়ে নেব। তুমি কী বল যুবক?

একটার পর একটা বিপদের আভাস ম্যালনের আইরিশ রক্তের উপর চাপ সৃষ্টি করছিল।

লর্ড রক্সটন বললেন, আমি একাই যাব। এই বলে তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। পাদ্রী সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে বললেন, না, না আমিও আপনার সঙ্গে যাব।

লর্ড রক্সটন চিৎকার করে বললেন, না, আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে না।

তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

পাদ্রী সাহেব বললেন, আমি ছাড়া আপনি যেতে পারবেন না। যাওয়া উচিৎ হবে না। দুটো ঘরের মাঝখানে সরু পথটার উপর ওরা দাঁড়িয়ে ছিল। ম্যালন দেওয়ালের উপর হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

ওরা দেখল সিঁড়ির উপরে একটা কালো ছায়া ঘন হয়ে চাপ বেঁধে আছে। এটা কীভাবে কোথা থেকে এল তা কেউ বুঝতে পারল না। পরে দেখল ছায়াটা একটা বাদুড়ের রূপ নিয়েছে। ওরা তখন সিঁড়ি বেয়ে বেগে নীচের তলায় ছুটে গেল।

হা ভগবান! অন্ধকার রাত্রির মতো কালো। কিছুই বোঝা যায় না। কিছুটা মানুষের মতো, কিছুটা শয়তানের মতো। কী জঘন্য মূর্তি। ওরা তিনজন ভয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে এল। লর্ড রক্সটন সদর দরজাটা খোলার জন্য হাতল ধরে টান দিলেন। কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে। হঠাৎ সেই কিম্ভুতকিমাকার কালো ছায়া-মূর্তিটা ওদের উপর এসে পড়ল। ওরা সেই মূর্তিটার স্পর্শ পেল। একটা বিশ্রী গন্ধ ওদের নাকে এসে লাগল। কিন্তু সেই মূর্তিটা মানুষের না জন্তুর ওরা তা বুঝতে পারল না। মুখখানা অর্ধেকটা মানুষের মতো কিন্তু হাত-পাগুলো জন্তুর মতো। ওরা ভাল করে কিছু বোঝার আগেই ওদের অর্ধচেতন দেহগুলো কারা যেন সদর দরজার বাইরের পথের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সশব্দে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ওরা তিনজন পূর্ণচেতনা ফিরে পেয়ে একে-একে উঠে দাঁড়াল। ম্যালন ও লর্ড রক্সটন রাগে গজগজ করতে লাগলেন। কিন্তু পাদ্রী সাহেব চুপ করে রইলেন। তারা তিনজনে অম্লান চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। বন্ধ দরজাটার উপর চারকোণা এক চাপ অন্ধকার জমাট বেঁধে ছিল। ওদের দেহগুলো তখনও ভয়ে কাঁপছিল। দেহগুলোর কয়েক জায়গায় ছিঁড়েখুঁড়ে গিয়েছিল। দেহের কোন ক্ষত বা জ্বালা যন্ত্রণাতে ওরা তেমন বিচলিত না হয়ে শুধু ভাবছিল ওদের উদ্দেশ্যের ব্যর্থতার কথা

লর্ড রক্সটন বলে উঠলেন, যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।

ম্যালন বলল, যথেষ্ট মানে তার থেকেও বেশি। ফ্লীট স্ট্রীট আমাকে যাই দিক বা যাই বলুক কোন কিছুর বিনিময়ে আমি আর ওই বাড়িতে ঢুকবো না।

লর্ড রক্সটন জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আহত?

না, আহত নয় অবশানিত হয়েছি। দেহটা অশুদ্ধ ও অপবিত্র হয়েছে। ওহঃ কী ঘৃণ্য ব্যাপার।

লর্ড রক্সটন জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সেই বিশ্রী গন্ধজাত উষ্ণ স্পর্শটা পেয়েছিলে?

বিতৃষ্ণার সঙ্গে এক অস্ফুট চিৎকার করে ম্যালন বলল, এক ভয়ঙ্কর চোখমুখ থাকলেও প্রেতটা কোন স্পষ্ট আকার ধারণ করতে পারেনি। যেটা পেরেছে সব মিলিয়ে সেটা ভয়ঙ্কর।

কিন্তু আলো তো নেভেনি। এখনও বোধহয় জ্বলছে।

রেখে দিন আলোর কথা। আলো জ্বলে জ্বলুক। আমি আর ও বাড়িতে যাব না।

বাড়ির মালিক বেলচেম্বার বোধহয় হোটেলেই আছেন। তিনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

হ্যাঁ সেখানেই ফিরে যাওয়া যাক। মানুষের সংস্পর্শে ফিরে যাওয়াই ভাল।

ম্যালন ও লর্ড রক্সটন দু’জনে চলে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু পাদ্রী সাহেব সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি পকেট থেকে ছোট ক্রসটা বার করে বললেন, তোমরা যাও। আমি ওই বাড়ির ভিতরেই যাব।

লর্ড রক্সটন বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন, কি? বাড়ির ভিতরে?

হ্যাঁ, বাড়ির ভিতরে।

পাদ্রী সাহেব, এটা হচ্ছে পাগলামি। আপনার ঘাড় ভেঙে দেবে। ওর হাতে আমরা একটা খেলার পুতুল মাত্র।

পাদ্রী দৃঢ়ভাবে বললেন, আমার ঘাড় ভাঙে ভাঙুক। আমি ওই বাড়ির ভিতরে যাচ্ছি।

লর্ড চিৎকার করে ম্যালনকে বললেন, শোন ম্যালন, ওকে ধর।

কিন্তু দেরী হয়ে গেল ম্যালনের। পাদ্রী সোজা দরজা খুলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লেন। পরমুহূর্তে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিলেন। দরজার কপাটের উপর লেটার বাক্সটার পাশে একটা ফাঁক ছিল। লর্ড রক্সটন সেখানে মুখ লাগিয়ে পাদ্রীকে ফিরে আসার জন্য বারবার অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন। পাদ্রী বাড়িতে ঢুকেই দরজায় খিল দিয়ে দিল

পাদ্রী সাহেব ভিতর থেকে কড়াভাবে বললেন, তোমরা ওখানেই থাক। আমাকে আমার কাজ করতে হবে। কাজ হয়ে গেলেই আমি চলে যাব।

এক মুহূর্ত পরেই বাইরে থেকে শোনা গেল পাদ্রী সাহেব যেন কার সঙ্গে মধুর ও স্নেহশীল কণ্ঠে ঘরোয়াভাবে কথা বলছেন। আর তাঁর সেই কথাগুলো হলঘরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

ম্যালন দরজার সেই ফুটো দিয়ে দেখল সিঁড়ির উপর কালো চাপ অন্ধকারের মতো অদ্ভুত আকারের সেই প্রেতটার দিকে নির্ভীকভাবে তাকিয়ে পাদ্রী সাহেব সেই ছোট ক্রস সহ তাঁর ডানহাতটা উপরে তুলে ধরেছেন।

এরপরই দেখা গেল পাদ্রীর কথা আর শোনা যাচ্ছে না। সব চুপচাপ। এরপরই যা ঘটল তা হচ্ছে, সেই রাত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও ঐন্দ্রজালিক ঘটনা।

ম্যালন ও লর্ড রক্সটন দু’জনে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে শুনতে পেলেন, বাড়ির ভিতরে কার এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর পাদ্রীর কথার উত্তর দিচ্ছে। সে কণ্ঠস্বর এমনি ভয়ঙ্কর ও অদ্ভুত যে তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর সংক্ষেপে কী বলল তা বোঝা গেল না। তবে পাদ্রী সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর দিল। আবেগে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল তাঁর কণ্ঠস্বর।

পাদ্রী সাহেব যা বলছিলেন তা হচ্ছে নীতি উপদেশের কথা। আর তাঁর সেই সব কথার উত্তর দিচ্ছিল সেই অদৃশ্য অশরীরী কণ্ঠস্বর। বারবার পাদ্রীর সঙ্গে সেই কণ্ঠস্বরের কথাবার্তা হচ্ছিল। সে কথা কখনও সংক্ষিপ্ত আবার কখনও দীর্ঘায়িত হচ্ছিল। সেই সব কথাবার্তার মধ্যে কখনও ছিল অনুরোধের সুর, কখনও তর্ক- বিতর্কের সুর, কখনও সান্ত্বনার সুর, আবার কখনও-বা প্রার্থনার সুর। কিন্তু কখনও কোন ভর্ৎসনার সুর ছিল না। সেই অকল্পনীয় কথাবার্তা শোনার জন্য ম্যালন ও লর্ড রক্সটন দরজার কপাটের উপর জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সেই সব কথাবার্তা পুরো শুনতে না পারলেও তার কিছু কিছু টুকরো কথা শুনতে পাচ্ছিল। প্রায় একটা ঘণ্টা কেটে গেল।

তারপর পাদ্রী উচ্চকণ্ঠে বিশেষ আনন্দের সঙ্গে বারবার “আমাদের পরম পিতা” বলতে লাগলেন। অন্ধকারে তাঁর এই কথার প্রতিধ্বনি হলো কিনা ওরা তা বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পরেই জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসা আলোর ছটাটা বন্ধ হয়ে গেল। পাদ্রী সাহেব দরজার খিল খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে লর্ড রক্সটনকে ডাকলেন। তিনি বাইরে এসে দাঁড়াতেই চাঁদের আলোয় তাঁর মুখখানা দেখা গেল। তাঁর মুখখানা গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তাঁর মধ্যে একটা ব্যস্ততা ও কর্ম-তৎপরতার ভাব ছিল। তবে দেখে মনে হলো তিনি তাঁর কাজে খুশী।

এরপর পাদ্রী সাহেব লর্ড-এর হাতে একটা ব্যাগ তুলে দিয়ে বললেন, এর মধ্যে সবকিছু পাবেন। ম্যালন ও লর্ড রক্সটন দু’জনে তাঁর হাত ধরে তাঁকে রাস্তায় নিয়ে গেল।

লর্ড বললেন, পাদ্রী সাহেব, আপনি আর আমাদের হাত থেকে পালাতে পারবেন না।

আপনার অনেকগুলো সম্মানজনক বিজয়ী ক্রস পাওয়া উচিৎ।

পাদ্রী বললেন, না, না, এটা আমার কর্তব্য। বেচারার সাহায্যের দরকার ছিল। যদিও আমি নিজেও পাপী ছাড়া কিছুই না। তবু তাকে আমি সাহায্য করেছি।

লর্ড জিজ্ঞাসা করলেন, এতে কি তার ভাল হবে?

পাদ্রী বললেন, আমি বিনয়ের সঙ্গে শুধু এইটুকু বলতে পারি যে আমি সেই আশাই করি। আমার কোন শক্তি নেই। আমি শুধু ঊর্ধ্বতন এক শক্তির যন্ত্র বিশেষ। বাড়িটাতে আর কোন ভূত-প্রেতের আনাগোনা হবে না। যদিও আমি এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না। কিছুদিনের মধ্যেই তা দেখা যাবে।

ওরা তিনজন যখন সশরীরে ও সুস্থভাবে সেই হোটেলে পৌঁছল তখন বাড়ির মালিক ও তার নারী ভৃত্য ওদের দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তারা ওদের মুখপানে তাকাল। ওদের তিনজনকে দেখেই মনে হচ্ছিল এক রাতের মধ্যেই ওদের বয়স পাঁচ বছর করে বেড়ে গেছে। পাদ্রী ম্যাসন রাত্রিতে ভূত ছাড়াবার জন্য যে পরিশ্রম করেছিলেন তার জন্য তিনি বিশেষভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই সে কফিরুমের মধ্যে ঘোড়ার চুল দিয়ে বানানো একটা নরম সোফার উপর সটান শুয়ে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ম্যালন বলল, আহা বেচারা! ওঁর মুখখানা বিকৃত ও একেবারে সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ওঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো মৃত লোকের মতো দেখাচ্ছে।

লর্ড রক্সটন ঘরের মধ্যে জ্বলন্ত আগুনে হাতটা গরম করতে করতে বললেন, ওকে এখন গরম চা খাওয়াতে হবে। আমাদের নিজেদের অবস্থাও কম খারাপ হয়নি। যুবক ম্যালন, আমাদের উদ্দেশ্য একরকম সিদ্ধ। তুমি তোমার লেখার খোরাক পেয়ে গেছ আর আমিও এক নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।

আমাদের কাজের তুলনায় পাদ্রীর কাজ আরও বড়, কারণ উনি একটি বিপন্ন আত্মাকে উদ্ধার করেছেন।

ওরা লন্ডন যাবার জন্য সকালের ট্রেনটা ধরল। পথে পাদ্রী ম্যাসন কোন কথাই বললেন না। তিনি সব সময় এক গভীর চিন্তায় ডুবে থাকলেন। হঠাৎ পাদ্রী সাহেব তাঁর সঙ্গীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে উঠলেন, আপনারা কি আমার সঙ্গে প্রার্থনায় যোগদান করবেন?

লর্ড রক্সটন মুখ ভার করে বললেন, কিন্তু পাদ্রী সাহেব, প্রার্থনা করার অভ্যাস আমার নেই।

তবু আপনারা আমার মতো নতজানু হয়ে বসুন। আমি আপনাদের সাহায্য চাই।

ওরা তিনজন পাশাপাশি নতজানু হয়ে বসল। পাদ্রী মাঝখানে বসলেন। ম্যালন প্রার্থনার কথাগুলো মনে মনে মুখস্থ করে নিল।

“হে পরম পিতা, আমরা তোমার সন্তান, অসহায়, হতভাগ্য ও দুর্বল প্রাণী। আমরা সকলে সময় ও ভাগ্য দ্বারা চালিত। আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি, রুপার্ট ট্রমেন নামক লোকটির আত্মার উপর তোমার করুণার দৃষ্টি নিক্ষেপ কর। এই লোকটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। সে এখন অন্ধকারের গভীরে ডুবে আছে। তার অন্তরটা ছিল অহঙ্কারে ভরা। আর মনটা ছিল নিষ্ঠুর এবং মানুষের প্রতি অহেতুক ঘৃণায় পরিপূর্ণ। তার কঠিন অন্তর কিছুতেই নরম হতে চায় না। এখন সে অন্ধকার হতে মুক্ত হয়ে আলোর দিকে উঠে যেতে চায়। আমি তার জন্য তোমার সাহায্য চাই। এম্মা নামে এক মহিলার জন্যই তোমার সাহায্য চাই। এই মহিলাটি ভালবাসার খাতিরে ওই লোটাকে বিয়ে করে তার সঙ্গে অন্ধকারে নেমে যায়। মহিলাটি অতীতে একদিন তার স্বামীকে সমস্ত নীচতা থেকে উপরে তোলার চেষ্টা করে। আজ যেন সে এই কাজে সফল হয়। যে অশুভ স্বশক্তির বন্ধন মৃত্যুর পরও তাদের মনকে এই পৃথিবী ও এই পার্থিব বস্তুর সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে সেই স্বশক্তির বন্ধন ছিন্ন করে তারা যেন এক আলোক-উজ্জ্বল গৌরবময় ঊর্দ্ধলোকে উঠে যেতে পারে। যে পবিত্র আলো ঊর্দ্ধলোক হতে নেমে এসে প্রতিটি অন্ধকার বস্তুকে আলোকিত করে, সেই আলো আজ ওদের উপরেও যেন ঝরে পড়ে।”

প্রার্থনার শেষে সবাই উঠে দাঁড়াল।

পাদ্রী সাহেব বুক চাপড়ে এবং দাঁত বের করে মুচুকি হেসে বললেন, প্ৰাৰ্থনাটা ভালই হলো। হে ভগবান কি ভয়ঙ্কর রাত্রি!