অধ্যায় ১০
অতি আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটেছে এবং অনবরত ঘটে চলেছে। কাগজ বলতে আমার সঙ্গে আছে পাঁচখানি পুরনো নোট-বই ও কিছু টুকরো কাগজ, আর একটিমাত্র স্টাইলো-পেন্সিল। কিন্তু যতদিন আমার হাত চলবে ততদিন আমাদের অভিজ্ঞতার কথা আমি লিখেই যাব, কারণ গোটা মানবসমাজে আমরাই একমাত্র লোক যারা এসব জিনিস দেখতে পাচ্ছি। আশা করছি, সত্যিকারের অভিযানের ধ্রুপদী সাহিত্য হিসাবে আমার এ লেখা অমর হয়ে থাকবে।
প্রথমেই আমাদের জিনিসপত্রের একটা তালিকা তৈরি করে ফেললাম। সঙ্গে আছে চারটে রাইফেল, একহাজার তিনশো রাউন্ড গুলি ও একটা শট-গান; কিন্তু মাঝারি আকারের কার্তুজ দেড়শ’র বেশি নেই। রসদ যা আছে তাতে কয়েক সপ্তাহ চলে যাবে। তামাক আছে প্রচুর; আর আছে কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, একটা বড় টেলিস্কোপ ও একটা ভাল ফিল্ড-গ্লাস। জিনিসগুলো সব এক জায়গায় জড় করলাম; তারপর কুড়ুল ও ছুরি দিয়ে অনেক কাঁটা গাছ কেটে প্রায় পনেরো গজ ব্যাসের একটা বৃত্তাকার জায়গাকে ঘিরে ফেললাম। আপাতত সেটাই আমাদের হেডকোয়ার্টার—আকস্মিক বিপদের হাত থেকে বাঁচবার আশ্রয়স্থল, আবার জিনিসপত্র রাখার সুরক্ষিত গুদামও। সেটার নাম দিলাম “চ্যালেঞ্জার দুর্গ”।
আলোচনা প্রসঙ্গে লর্ড জন একদিন বললেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও মানুষ বা জন্তু আমাদের না দেখছে বা আমাদের কথা শুনতে ততক্ষণ আমরা নিরাপদ। যেই তারা জানতে পারবে আমরা এখানে আছি তখনই বিপদ শুরু হবে। কাজেই আমাদের প্রথম কাজ হবে চুপচাপ থেকে চারদিকে ভাল করে নজর রাখা।”
“কিন্তু আমাদের তো এগিয়ে যেতেই হবে”, আমি বললাম।
“নিশ্চয় যেতে হবে। কিন্তু এগোতে হবে সাধারণ বুদ্ধিমতে। এমন দূরত্বে যাওয়া কখনও ঠিক হবে না যেখান থেকে আমরা ফিরে আসতে পারব না। তাছাড়া, জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন দেখা না দিলে কখনও বন্দুক ছুঁড়ব না।”
একটু পরে তিনি আবার বললেন, “ভাল কথা, এ জায়গাটার একটা নাম দেওয়া দরকার। কি নাম দেওয়া যায়?”
চ্যালেঞ্জার বললেন, “একটিমাত্র নামই হতে পারে। যে পথিকৃৎ এটাকে আবিষ্কার করেছে তার নামেই হোক এ জায়গাটার নাম। ম্যাল্ হোয়াইট ল্যাণ্ড।
তাই হলো। যে নক্সা আমি তৈরি করছিলাম তাতে এই নামই লেখা হলো। ভবিষ্যতে মানচিত্রেও এই নামই লেখা হবে।
আমাদের ঝর্ণা থেকে যে ছোট নদীটা বেরিয়েছে তার তীর বরাবর আমরা অজানার পথে যাত্রা শুরু করলাম, যাতে সেই পথ ধরেই ফিরে আসতে পারি।
কয়েক শ’ গজ ঘন জঙ্গল পার হবার পরে নদীটা চওড়া হয়ে একসময় একটা বড় জলাভূমির রূপ ধারণ করল।
সকলের আগে লর্ড জন। হঠাৎ তিনি হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
বললেন, “ওই দেখুন! জর্জের নামে বলছি, ওটা নিশ্চয় সব পাখিকুলের বাবার পায়ের ছাপ!”
আমাদের সামনেই নরম কাদার উপর তিন-আঙুলের একটা প্রকাণ্ড পায়ের ছাপ পড়ে ছিল। জীবটি জলাভূমি পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছে। সেই দানবীয় পায়ের ছাপটা পরীক্ষা করতে আমরা সকলেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। এটা যদি পাখি হয় আর কিই বা হতে পারে—তাহলে তো এর পা হবে উটপাখির চাইতেও বড়, আর সেই মাপে দেহটা হবে প্রকাণ্ড। লর্ড জন চারদিকে তাকিয়ে বন্দুকে দুটো কার্তুজ ভরলেন।
বললেন, “শিকারী হিসাবে যেটুকু সুনাম আমার আছে তার দোহাই দিয়ে বলছি, পায়ের ছাপটা সদ্য পড়েছে। দশ মিনিটও হয়নি। দেখছেন না, এখনও জল চুঁইয়ে পড়ছে! হায় জোভ! দেখুন, এখানে আর একটা ছোট পায়ের ছাপ!”
সত্যি তো, বড় ছাপের সঙ্গে সমান্তরালে কয়েকটা ছোট পায়ের ছাপও এগিয়ে গেছে।
“এটা কি হতে পারে?” অধ্যাপক সামারলী শুধালেন।
চ্যালেঞ্জার উৎসাহে চেঁচিয়ে বললেন, “উইল্ডেন-এর মাটিতে আমি এ রকমই ছাপ দেখেছি। প্রিয় রক্সটন, এটা কোনও পাখি নয়।”
“কোনও জন্তু?”
“না; একটা সরীসৃপ—ডাইনোসর। আর কারও পায়ের ছাপ এ রকম হতে পারে না। আহা রে! এ রকম একটা দৃশ্য দেখতে পাব তা কে আশা করেছিল?”
তার কথাগুলি শেষের দিকে অস্পষ্ট হয়ে এল। সকলেই বিস্ময়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছু দূরেই খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানেই দেখলাম পাঁচ- পাঁচটা অসাধারণ জীবকে। এ রকম জীব আর কখনও দেখিনি। ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আমরা তাদের দেখতে লাগলাম।
মোট পাঁচটি; দুটো বড় তিনটে বাচ্চা। বিরাট আকার। বাচ্চাগুলোই এক- একটা হাতির মতো, আর বড় দুটোর মতো প্রাণী কখনও দেখিনি। স্লেট-রং চামড়া গিরগিটির মতো আঁশে ঢাকা; রোদ পড়ে চিকচিক করছে। তাদের আকৃতি যে কি করে আপনাদের বোঝাব তা জানি না; বলতে পারেন দেখতে অনেকটা বিরাটকায় ক্যাঙারুর মতো ল্যাণ্ড লম্বায় বিশ ফুট, কালো কুমীরের মতো চামড়া।
কতক্ষণ চুপচাপ লুকিয়ে থেকে সেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখেছিলাম জানি না। ধীরে ধীরে তারা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। গাছের ফাঁকে ফাঁকে তাদের চামড়ার স্লেট- রংয়ের ঝিলিক ও ঝোপঝাড়ের অনেক উপরে তাদের আন্দোলিত মাথাগুলি দেখতে পেলাম।
সামারলী হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “Nunc dimittis! ইংল্যান্ডের লোকরা এ সম্পর্কে কী বলবে?”
জবাব দিলেন চ্যালেঞ্জার, “প্রিয় সামারলী, ইংলন্ডের লোকরা কি বলবে সেটা আমিই সঠিক বাতলে দিতে পারি। তারা বলবে, আপনি একটি ডাহা মিথ্যুক, একটি বৈজ্ঞানিক ধাপ্পাবাজ, ঠিক আপনারা আমাকে যা বলেছেন।
‘আর এই ফটোগ্রাফগুলো?”
“জাল সামারলী, জাল!”
“কিন্তু আমরা তো চোখে দেখলাম।”
“এটা একটা কথা বটে! ম্যালোন ও তার ফ্লিট স্ট্রীটের স্যাঙাত্রা হয়তো উচ্চকণ্ঠে আমাদের জয়গান করবেন। ২৮শে অগাস্ট—এই দিনে ম্যাল্ হোয়াইট ল্যান্ডের খোলা জায়গা আমরা পাঁচটি ইগুয়ানোডনকে দেখেছি। তরুণ বন্ধু হে, কথাটা আপনার দিনপঞ্জীতে লিখে রাখুন আর পরে পাঠিয়ে দিন আপনার কর্তাকে।”
লর্ড জন বললেন, “আর সেই সঙ্গে একটা সম্পাদকীয় জুতোর ঠোক্করের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। দেখ ইয়াং-ফেলা-মাই-ল্যাড, লন্ডনের আবহাওয়ায় সব কিছুই অন্যরকম দেখায়। লোকে বিশ্বাস করবে না এই ভয়েই অনেকে তাদের অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলে না। তাদেরই বা দোষ দেব কেমন করে? দু’-এক মাস পর আজকের অভিজ্ঞতাই তো আমাদের কাছে স্বপ্ন বলে মনে হতেও পারে। ওগুলোকে কি বললেন যেন?”
সামারলী বললেন, “ইগুয়ানোডন। হেস্টিংসের বালুকাময় প্রান্তরে, কেণ্টে, সাসেক্সে সর্বত্র তাদের পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া যেত। সেখানকার পরিবেশ এখন বদলে গেছে, তাই সে সব জন্তুও মরে গেছে। এখানে হয়তো পরিবেশ বদলায়নি, তাই তারা বেঁচে আছে।”
প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর কিছুই আমি জানি না; কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে একটা বইতে এমন সব প্রাণীর কথা পড়েছি যারা সিংহ ও বাঘ খেয়ে বেঁচে থাকে, ঠিক যে রকম বিড়ালরা বেঁচে থাকে ইঁদুর খেয়ে। ম্যাল্ হোয়াইট ল্যান্ডের জঙ্গলে যদি তাদের দেখা মেলে তাহলে কী হবে!
এই একই সকালে—নতুন দেশে আমাদের প্রথম সকাল-বিচিত্র সব বিপদ চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে ধরবে, এটাই বোধ হয় ছিল আমাদের নিয়তি। লর্ড জনের মতে ইগুয়ানোডনের দল যদি থাকে আমাদের স্বপ্ন হয়ে, তাহলে টেরোড্যাক্টিলদের জলাভূমি হয়ে থাকবে আমাদের চিরদিনের দুঃস্বপ্ন। আসলে ঈ ঘটেছিল সেটাই আমাকে বলতে দিন।
নদীর তীর ধরে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দু’তিন মাইল যাবার পরেই পড়ল ছোট-বড় নানা পাথরে ঢাকা একটা উপত্যকা। আর একটু এগোতেই কানে এল একটা বিচিত্র প্যাক্ প্যাক্ ও শিসের শব্দ। তাকিয়ে দেখি, লর্ড জন ইঙ্গিতে আমাদের থামতে বলছেন। দেখলাম, তিনি যেন উঁকি দিয়ে কি দেখছেন। তারপরেই তার চোখে-মুখে ফুটো উঠল চরম বিস্ময়। হাত নেড়ে আমাদের ডাকলেন। একটা হাত তুলে সতর্কতার সংকেতও জানালেন।
হামাগুড়ি দিয়ে তার পাশে গিয়ে পাথরগুলোর উপর দিয়ে তাকালাম। সামনেই একটা গহ্বর। হয়তো কোনও এক সময় আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে উপত্যকার বুকে গহ্বরটার সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকটা বাটির মতো দেখতে; আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে প্রায় একশ’ গজ নিচে সবুজ সর-পড়া বদ্ধ জলের একটা হ্রদের মতো। এমনিতেই জায়গাটা অদ্ভুত, কিন্তু সেখানকার বাসিন্দাদের দেখে দান্তের “সপ্ত বৃত্তে”র একটা দৃশ্যের কথাই মনে পড়ে গেল। জায়গাটা টেরোড্যাক্টিলদের একটা
একটা আস্তানা। চোখের সামনে শত শত টেরোড্যাক্টিল। জলের তীর ঘেঁষে বাচ্চাদের মেলা। বীভৎসদর্শন মায়েরা ঘুরছে তাদের আশেপাশে। সেই অগুণতি বীভৎস সরীসৃপ জাতীয় শিশুদের পাখার ঝাপটে বাতাস ভরে গেছে; ভয়ংকর দুর্গন্ধ আমাদেরই অস্থির করে তুলেছে। কিন্তু উপরের দিকে প্রতিটি পাথরে বসে আছে ভয়ংকর পুরুষ টেরোড্যাক্টিলগুলো। লম্বা ধূসর শুঁটকো চেহারা; দেখলে জীবিত প্রাণীর বদলে মৃত শুকনো প্রাণী বলেই মনে হয়। একেবারে চুপচাপ বসে আছে; শুধু লাল চোখগুলো ঘুরছে, কখনও বা ইঁদুর- ধরা ফাঁদের মতো ঠোঁট দুটো ফাঁক করছে। প্রকাণ্ড ঝিল্লিময় ডানা গুটিয়ে বসে আছে; দেখে মনে হয় দীর্ঘদেহ বুড়িরা সব মাকড়সার জালের মতো রঙের শাল গায়ে জড়িয়ে বসে আছে, আর তাদের হিংস্র মাথাগুলো উপরে ঠেলে উঠছে। আমাদের সামনের গহ্বরে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত হাজারখানেক নোংরা জীব এসে বাসা বেঁধেছে।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবনকে পর্যবেক্ষণ করার এই সুযোগ পেয়ে আমাদের অধ্যাপকদ্বয় এতই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লেন যে তাঁরা হয়তো সারাটা দিনই সেখানে সানন্দে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু কি একটা বিষয় নিয়ে বিতর্কে মেতে উঠে চ্যালেঞ্জার হঠাৎ পাথরের উপর দিয়ে মাথাটা বাড়াতেই আমাদের সকলেরই দফা প্রায় রফা হবার যোগাড় হলো। মুহূর্তের মধ্যে নিকটতম পুরুষ টেরোড্যাক্টিলটি একটা কর্কশ শিসের মতো শব্দ করে বিশ ফুট চওড়া চামড়ার ডানা ঝাপটিয়ে আকাশে উড়ে গেল। মেয়ে পাখিটা এবং বাচ্চারা জলের ধারে এক জায়গায় জড়ো হলো, আর রক্ষীপুরুষ-পাখিরা একের পর এক আকাশে পাড়ি জমাল। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। প্রকাণ্ড চেহারার বীভৎসদর্শন অন্তত শ’খানেক প্রাণী দ্রুতবেগে পাখার ঝাপট মেরে চাতক পাখির মতো মাথার উপর ঘুরতে লাগল। প্রথমে তারা ঘুরতে লাগল একটা বড় বৃত্তের আকারে। তারপর সেই বৃত্ত ছোট হতে হতে ক্রমেই নিচে নামতে লাগল। তাদের ডানার শোঁ-শোঁ হুস্-হুস্ আওয়াজ শুনে হেন্ডন বিমানঘাঁটির কথাই আমার মনে পড়ে গেল।
হাতের রাইফেল ঘোরাতে ঘোরাতে লর্ড জন বলতে লাগলেন, “জঙ্গলে ঢুকে পড়ুন, সকলে দল বেঁধে একত্র থাকুন। শয়তানদের মনে কুমতলব আছে।”
যেই আমরা সেখান থেকে সরে যেতে চেষ্টা করলাম অমনি বৃত্তটা আরও ছোট হয়ে নিচে নেমে এল; অনেকগুলি পাখার ডগা আমাদের মুখ ছুঁয়েও গেল। বন্দুকের কুঁদো ঘুরিয়ে আমরা আঘাত হানলাম, কিন্তু ওদের কিছুই হলো না। হঠাৎ সেই স্লেট-রঙা বৃত্তের শোঁ-শোঁ শব্দের ভিতর থেকে একটা লম্বা গলা বেরিয়ে এল, একটা হিংস্র ঠোঁট সোজা এগিয়ে এল আমাদের দিকে। আর একটা, তারপর আরও একটা। সামারলী চিৎকার করে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন, তাঁর মুখ থেকে তখন রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। আমার ঘাড়ে একটা খোঁচা লাগল; যন্ত্রণায় মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। চ্যালেঞ্জার পড়ে গেলেন; আমি ঝুঁকে পড়ে তাঁকে তুলতে যেতেই আর একটা খোঁচা খেয়ে তার উপরেই উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে লর্ড জনের বড় বন্দুকটা গর্জে উঠল; তাকিয়ে দেখলাম, ভগ্নপাখা একটা টেরোড্যাক্টিল মাটিতে পড়ে ছটফট করছে, ঠোঁট দুটো ফাঁক করে গরগর শব্দ করছে, গোল-গোল রক্ত-লাল চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। ঠিক যেন মধ্যযুগীয় ছবির শয়তান একটা। সেই আকস্মিক শব্দ শুনে অন্যরা সবাই উপরে উঠে গিয়ে আমাদের মাথার উপরে পাক খেতে লাগল।
লর্ড জন চেঁচিয়ে বললেন, “এই সুযোগ! প্রাণ বাঁচান!”
টলতে টলতে আমরা জঙ্গলে ঢুকে গেলাম। দানব-পক্ষিগুলো তখনই আবার তেড়ে এল। সামারলী ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন। তাঁকে টানতে টানতে আমরা বড় বড় গাছগুলোর তলায় পৌঁছে গেলাম। এবার অনেকটা নিশ্চিন্ত, কারণ ওদের মস্ত বড় পাখা গাছের ডালের নিচে পৌঁছতে পারছিল না। আহত অবস্থায় খুঁড়িয়ে- খুঁড়িয়ে ফিরবার পথে তাকিয়ে দেখলাম, ওরা তখনও আমাদের মাথার উপরে অনেক উঁচুতে গাঢ় নীল আকাশের বুকে বৃত্তাকারে উড়ছে; ওদের চোখ তখনও আমাদের দিকে। শেষ পর্যন্ত আমরা যখন আরও গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম তখন ওরা রণে ক্ষান্ত দিল; তারপরে আর কাউকে দেখতে পেলাম না।
একটা ছোট জলার ধারে থেমে ফুলে-ওঠা হাঁটুটা ভেজাতে ভেজাতে চ্যালেঞ্জার বললেন, “খুব একটা অভিজ্ঞতা হলো বটে।”
সামারলী কপালের কাটা জায়গার রক্ত মুছে ফেলতে লাগলেন। আমি ঘাড়ে একটা নোংরা ব্যান্ডেজ বাঁধতে ব্যস্ত। লর্ড জনের কোটের কলারটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে; দাঁতের ঘষায় শুধু চামড়া ছড়ে গেছে।
চ্যালেঞ্জার আবার বললেন, “এটা কিন্তু লিখে রাখার মতো। আমার তরুণ বন্ধুটি চঞ্চুবিদ্ধ হয়েছে, লর্ড জনের কোট কামড়ে তুলে নিয়েছে, আমার মাথায় লেগেছে ডানার ঝাপটা। ওরা যে কত রকমভাবে আক্রমণ করতে পারে তার একটা নমুনা পাওয়া গেল।”
লর্ড জন গম্ভীর হয়ে বললেন, “রাইফেল থেকে গুলি করার জন্য আমি দুঃখিত, কিন্তু জোভের দোহাই। আর কিছু করার ছিল না।”
আমি বললাম, “আপনি বন্দুক না ছুঁড়লে আমরা কেউ বেঁচে থাকতাম না।”
এমন একটা বিচিত্র দিন আজ পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনও মানুষ কাটায়নি। বিস্ময়ের পর বিস্ময় যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল। নদীর তীর বরাবর হেঁটে খোলা জায়গায় আমাদের কাঁটায় ঘেরা আশ্রয়-শিবিরে পৌঁছে ভাবলাম, এবার সব আপদের শান্তি। কিন্তু তখনও কিছু বাকি ছিল। চ্যালেঞ্জার দুর্গের ফটক কেউ স্পর্শ করেনি, বেড়া ভাঙেনি, তবু আমাদের অনুপস্থিতিতে কোনও বিচিত্র শক্তিশালী প্রাণী নিশ্চয় এখানে হানা দিয়েছিল। কোনও রকম পায়ের ছাপও নেই, কেবলমাত্র পাশের প্রকাণ্ড জিংকো গাছের নোয়ানো শাখাটা দেখেই বোঝা গেল সেটা কীভাবে এসেছিল ও চলে গেছে। কিন্তু তার ক্ষতি করার ক্ষমতা যে অসাধারণ তার অনেক পরিচয় সে রেখে গেছে আমাদের খাদ্য-ভাণ্ডারে। সব কিছু মাটিতে ছড়িয়ে আছে; একটা টিনের ভিতরকার মাংস তুলে নিতে সেটাকে টুকরো- টুকরো করেছে; কার্তুজের বাক্সটা গুঁড়ো করে ফেলেছে; একটা পেতলের শেলেরও সেই অবস্থা করেছে। আতঙ্ক আবার আমাদের পেয়ে বসল; ভীত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে লাগলাম; না জানি কোন ছায়াটা কখন মূর্তিমান হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে। এমন সময় ভেসে এল জাম্বোর কণ্ঠস্বর। উপত্যকার এক প্রান্তে এগিয়ে গিয়ে দেখি, বিপরীত দিকের শিখর-চূড়ায় বসে সে দাঁত বের করে হাসছে।
সেখান থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “সব ভাল তো মাস্সা চ্যালেঞ্জার, সব ভাল! আমি এখানেই আছি। ভয় নেই। যখনই দরকার হবে আমাকে এখানেই পাবেন। “ সেই বিস্ময়কর দিনটির আরও একটা স্মৃতি মনে আছে। সেটা দিয়েই এ- চিঠি শেষ করব। আঘাত পেয়ে দুই অধ্যাপকেরই মন-মেজাজ খিঁচড়ে গিয়েছিল। দু’জনের মধ্যে আবার ঝগড়া শুরু হয়ে গেল—আমাদের আক্রমণকারীরা টেরোড্যাক্টিলাস গ্রুপের, না ডাইমরফডন গ্রুপের তাই নিয়ে তাদের তর্কের আর শেষ ছিল না। কিছুটা দূরে সরে গিয়ে একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসে পাইপ ধরালাম। লর্ড জনও এক সময় এসে হাজির হলেন।
বললেন, “আচ্ছা ম্যালোন, যেখানে জন্তুগুলো ছিল সে জায়গাটা আপনার মনে আছে?”
“স্পষ্টই মনে আছে।”
“গহ্বরটা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফল, তাই না?”
“ঠিক।”
“মাটিটা খেয়াল করেছেন?”
“পাথুরে।”
“কিন্তু জলের চারধারে—যেখানে নলবন ছিল?”
“সেখানকার মাটি নীলাভ। কাদার মতো দেখতে।”
“ঠিক। নীল কাদায় ভর্তি আগ্নেয়গিরির একটা খোল।”
“তাতে কি হলো?” আমি শুধালাম।
“অ্যাঁ! না, কিছু না”, বলে তিনি আবার দুই পণ্ডিতের তর্ক শুনতে চলে গেলেন। লর্ড জনের কথাগুলি আমি হয়তো ভুলেই যেতাম; কিন্তু সেই রাতেই আবার কানে এল তিনি বিড়বিড় করে বলছেন : “নীল কাদা—আগ্নেয়গিরির খোলের মধ্যে কাদা!” এই কথা ক’টি শুনতে শুনতেই আমি ক্লান্ত দেহে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
