ঋগ্বেদ ০৯।০৬৬

ঋগ্বেদ ০৯।০৬৬
ঋগ্বেদ সংহিতা ।। ৯ম মণ্ডল সূক্ত ৬৬
অগ্নি ও পবমান সোম দেবতা। শত সংখ্যক বৈখানশ ঋষি।

১। হে সোম! তুমি সকল দিক দর্শন কর, তুমি সখা, তুমি মান্য, আমরা তোমার বন্ধু, আমাদিগের এই সমস্ত কবিতা শ্রবণপূর্বক তুমি ক্ষরিত হও।

২। হে সোম! তোমার যে দুইটি পত্ৰ বক্রভাবে অবস্থিত ছিল, তা দ্বারা তোমার সর্বাপেক্ষা চমৎকার শোভা হইয়াছিল।

৩। হে সোম! তোমার চতুর্দিকে লতা অবস্থায় যে সকল পত্র বিদ্যমান ছিল, তা দ্বারা তুমি তাবৎ ঋতুতে সুশোভিত ছিলে।

৪। হে সোম! তুমি আমাদিগের সখা, আমরা তোমার সখা, আমাদিগের রক্ষার জন্য উত্তম উত্তম নানাবিধ আহার সামগ্রী উৎপাদন করিতে করিতে ক্ষরিত হও।

৫। হে সোম! তোমার যে শুভ্রবর্ণ কিরণসমূহ, তাহারা আপন তেজঃ বিস্তার করিতে করিতে পৃথিবীর উপর জল বর্ষণ করিয়া থাক্র।

৬। এই যে সপ্তনদী(১), ইহারা তোমারই আদেশে বহমান হইতেছে, এই সকল গাভী তোমারই দিকে ধাবমান হইতেছে।

৭। হে সোম! তোমাকে নিস্পীড়ন করা হইয়াছে, তুমি আনন্দ বিধান করিতে করিতে ধারারূপে ইন্দ্রের দিকে যাও এবং অক্ষয় আহার বিতরণ কর।

৮। সাতটি স্ত্রীলোক অঙ্গুলিদ্বারা তোমাকে চালনা করিতে করিতে এক স্বরে তোমার বিষয়ে গান করিল, তাহারা কহিল, যে তুমি যজ্ঞকর্তা ব্যক্তির যজ্ঞস্থলে সকল কাৰ্য্য স্মরণ করাইয়া দাও।

৯। যখন তুমি শব্দ করিতে করিতে জলের সহিত মিশ্রিত হও, তখন কয়েকটি অঙ্গুলি একত্র হইয়া মেষলোমের উপর তোমাকে শোধন করিতে থাকে, তৎকালে তোমার কণা নিক্ষিপ্ত হইতে থাকে এবং মেষলোম হইতে শব্দ উঠিতে থাকে।

১০। হে সৎকর্মশীল বলশালী সোম! যখন তুমি ক্ষরিত হও, তখন তোমার ধারাগুলি এরূপভাবে বহিতে থাকে, যেরূপ ঘোটকগণ অন্ন আহরণ করিবার অভিপ্রায়ে ধাবিত হইয়া থাকে।

১১। কলসের উপর মেষলোম সংস্থাপনপূর্বক অঙ্গুলিবর্ণ সুমধুর রসের ক্ষরণকারী সোমকে পুনঃ পুনঃ চালিত করিতে লাগিল।

১২। সোমারসগুলি কলসের মধ্যে সেইরূপে অন্তর্ধান হইয়া গেল, যেরূপ নবপ্রসূত গাভীগণ গৃহের মধ্যে প্রবেশ করে।

১৩। হে সোম! যখন তুমি ক্ষীরপ্রভৃতি বস্তুর সহিত মিশ্রিত হও, তৎকালে জল প্রবাহিত হইয়া বিলক্ষণ শব্দ করিতে করিতে তোমার দিকে যাইয়া থাকে।

১৪। হে সোম! তোমার বন্ধুত্ব আমরা প্রার্থনা করি, তুমি আমাদের রক্ষাকর্তা, তোমার বন্ধুত্ব উপলক্ষে এই যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিতে ইচ্ছা করিয়াছি।

১৫। হে সোম! যিনি গোধন অন্বেষণ করেন, যিনি মহা্ন, যিনি মনুষ্য মাত্রেরই তত্ত্বাবধান করেন, তুমি তাহার জন্য ক্ষরিত হও। তুমি ইন্দ্রের উদরে প্রবেশ কর।

১৬। হে সোম! তুমি অতি প্রধান, তুমি বলশালীদিগের অগ্রগণ্য, তুমি সর্বাপেক্ষা অধিক তেজস্বী, তুমি যখনই যুদ্ধ করিয়াছ, তখনই জয়ী হইয়াছ।

১৭। সেই সোম সকল বলশালী অপেক্ষা অধিক তেজস্বী, তিনি সকল বীর অপেক্ষা অধিক বীর, তিনি সকল বদান্য অপেক্ষা অধিক দাতা।

১৮। হে সোম! তুমি খাদ্যদ্রব্য প্রেরণ কর, বংশ বৃদ্ধি কর; আমরা তোমার বন্ধুত্ব প্রার্থনা করি, তোমার সহায়তা অভিলাষ করি।

১৯। হে অগ্নি! তুমি আমাদিগের প্রাণরক্ষা কর, বল এবং খাদ্যদ্রব্য বিতরণ কর এবং দূর হইতে রাক্ষসদিগকে পরাভব কর।

২০। অগ্নি ঋষি, তিনি পবিত্র, তিনি পঞ্চ জনের হিতকারী, তিনি পুরোহিত। সেই অতি যশস্বী অগ্নিকে আমরা আশ্রয়রূপে গ্রহণ করি।

২১। হে অগ্নি! তোমার কাৰ্য্য অতি সুন্দর, তুমি আমাদিগকে তেজস্বী ও বীৰ্য্যবান্ কর। তুমি আমাকে হৃষ্টপুষ্ট গোধন বিতরণ কর।

২২। এই যে সোমরস ক্ষরিত হইতেছেন, ইনি সূর্যের ন্যায় ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করেন। ইনি শত্রুবর্গকে পরাভব করেন, ইনি আমাদিগের স্তুতি বাক্য গ্রহণ করিতে উপস্থিত হইতেছেন।

২৩। এই যে সোমরস, যাহাকে মনুষ্যেরা শোধন করেন, ইহার বিস্তর খাদ্যদ্রব্য আছে, ইনি সুন্দর আহার বিতরণ করেন, দেবতাদিগের দিকেই ইহার গতি।

২৪। এই যে ক্ষরণশীল সোমরস, ইনি এক প্রকাণ্ড শুভ্রবর্ণ জ্যোতির্ময় পদার্থ উৎপাদন করিলেন, সেই জ্যোতিঃ যথার্থ, তাহা কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকারসমূহকে নষ্ট করিল।

২৫। এই যে ক্ষরণশীল সোমরস, যাঁহার তেজ সর্বব্যাপী হইয়া থাকে, তিনি অন্ধকার নষ্ট করিতেছেন, আহ্লাদকর ধারা সমস্ত তাঁহার হরিতবর্ণ মূর্তি হইতে নির্গত হইতেছে।

২৬। এই যে ক্ষরণশীল সোমরস, ইহার তুল্য রথী নাই, যত শুভ্রবর্ণ বস্তু আছে, ইনিই সর্বাপেক্ষা অধিক নির্মল, ইহার ধারা হরিতবর্ণ, দেবতারা ইহার সহায়, ইনি তাহাদিগকে আহ্লাদিত করেন।

২৭। এই যে ক্ষরণশীল সোম, ইহার তুল্য অন্নদাতা কেহ নাই, ইহারা গুণকীর্তনকারী ব্যক্তিকে বিশিষ্ট বল প্রদান করেন। প্রার্থনা করি, ইনি আপন তেজে সর্বব্যাপী হউন।

২৮। এই যে সোমরস, ইনি নিষ্পীড়িত হইতে হইতে মেষলোমনির্মিত পবিত্রকে অতিক্রমপূর্বক ক্ষরিত হইলেন। ইনি ক্ষরিত হইয়া ইন্দ্রের শরীরে প্রবেশ করিলেন।

২৯। এই যে সোমরস, ইনি গোচর্মের উপর প্রস্তরের সহিত ক্রীড়া করিতেছেন, ইনি আনন্দ লাভের জন্য ইন্দ্রকে আহ্বান করিতেছেন (২)।

৩০। হে ক্ষরণশীল সোম! তোমার যে অতি চমৎকার রস, যাহা স্বর্গ হইতে আহরণ করা হইয়াছিল, তা দ্বারা আমাদিগের প্রাণ দান কর এবং আমাদিগকে আনন্দিত কর।

————

(১) সপ্তনদীর উল্লেখ।

(২) সোমরস প্রস্তুত করিবার সমস্ত পদ্ধতিই এই সূক্ত হইতে উপলব্ধি হয়, প্রথমে সোম লতারূপে থাকে, তাঁহার দুইটি করিয়া পত্র বক্রভাবে অবস্থিত থাকে(২ ঋক)। প্রস্তর দ্বারা সেই লতা নিষ্পীড়িত হইলে(৭ ঋক) পরে রমণীগণ অঙ্গুলীদ্বারা তাহা চটকাইয়া রস বাহির করে(৮ ঋক)। পরে সেই রস জলের সহিত মিশ্রিত হইয়া মেষলোমনির্মিত পবিত্র অর্থাৎ ছাঁকনি দ্বারা ছাঁকা হয়(৯ ঋক)। সে ছাঁকনি কলসের মুখে স্থাপিত হয়, অঙ্গুলীদ্বারা উপরের রস সঞ্চালিত করা হয়, সুতরাং ছাঁকা শোধিত রস কলসের ভিতর পড়ে (১০, ১১, ১২ ঋক)। সেই শোধিত ছাঁকা রস ক্ষীর বা দধির সহিত মিশ্রিত করিয়া পান করা হয়(১৩ ঋক)। ক্ষরণশীল সোমরস শুভ্রবর্ণ(২৪ ঋক)। অথবা ঈষৎ হরিতবর্ণ বা পিঙ্গল বর্ণ বলিয়াও কোন কোন স্থানে বর্ণিত হইয়াছে। গোচর্মের পাত্রে এই সোমরস স্থাপিত হয়(২৯ ঋক)।