।। হ্যাপি এন্ডিং ।।
“তারপর?”
“তারপর আর কী? সেই নাইট কার্ফিউ আরও মাস দুয়েক চলেছিল। ধীরে ধীরে লোকজন ভুলতে শুরু করে। আবার রাতে রাস্তায় লোক চলাচল শুরু হয়। মানুষ বড়ো তাড়াতাড়ি ভুলে যায় রে। যাদের কাছের মানুষ হারায়, তারাই শুধু ভুলতে পারে না।”
“তারপর আর কেউ হারিয়ে যায়নি পিকুমামা?”
“হ্যাঁ, তা গ্যাছে। নিরুদ্দেশ কি লোকে হয়নি? কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর প্রাণী আর ফিরে আসেনি। আর কোনো জিভছাড়া লাশও পাওয়া যায়নি।”
“আর তেন্ডুয়া কাকুর কী হল?”
“কিছু বছর পর তেন্ডুয়া কোথায় যেন চলে যায় রে। বাপ-মরা ছেলে। মা ছাড়া আর কেউ ছিল না। মা’টা মারা যেতে ভবঘুরের মতো উদাস হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত। কত চেষ্টা করেছি আমরা কাজকম্ম জুটিয়ে দেওয়ার। সেই রাতের ঘটনার পর থেকে লোকে তেন্ডুয়াকে শিমুলগাছার হিরো বলে মানত। কিন্তু ওর যেন কিছুতেই মন ছিল না। তারপর একদিন
কোথায় যে হারিয়ে গেল!”
“আচ্ছা মামা?”
“বল।”
“ওই ট্যা ট্যা করে আলাম না বেজে উঠলে রাক্ষসটা তোমাকে মেরে দিত তো?”
“সে আর বলতে?”
“আবিরমামার ঘড়িটা ওখানে কোত্থেকে এল?”
“আবিরের বাঁ-হাতটা তো প্রথমে পাওয়া যায়নি। সেদিন রাতে খানাতল্লাশি হতে ওই ঝোপে আবিরের ঘড়িপরা বাঁ হাতটা পাওয়া যায়।”
“আইশাব্বাশ।”
চোখ পাকাল পিকু, “কীসের আইশাব্বাশ! তোর মা’কে যদি বলেছিস যে আমি তোকে এসব বলি, তবে তোরই একদিন কি আমারই একদিন।”
ফিক করে হেসে পুঁচকে ছেলে বিজ্ঞের মতো ঘাড় নেড়ে বলল, “তোমারও তো একটা বাচ্চা ছেলেকে এসব বলা উচিত না।”
“তবে রে…” বলে পিকু লাফিয়ে উঠতেই ঘরে ঢুকল বৃষ্টি আর তানিয়া।
বৃষ্টি বলল, “তোমরা মামা-ভাগনে মিলে ওই করো। শোনো, আমি খাবার টেবিলে সব চাপা দিয়ে রেখে যাচ্ছি। তুমি গরম করে নিও। চল তানিয়া। ছেলেকে নে। দেরি হয়ে যাবে। ন’টা বাজে। বাজারের জ্যামটায় আটকালে পুবপাড়া পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে ন’টা বেজে যাবে। আমরা না পৌঁছনো অবধি মা আবার আবার না খেয়ে বসে থাকবে।”
ভুরু কুঁচকে সে পিকলুর দিকে তাকায় তানিয়া, “কী বলছিল রে পিকুমামা? নির্ঘাত ভয়ের গল্প?”
“না গো মা! ওই ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির গল্প…”
সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে পিকুর দিকে তাকায় তানিয়া। পিকুর চোখ এখন ল্যাপটপের স্ক্রিনে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে খাবার টেবিলে ভাজা মাছটাও সে বৃষ্টিকে উলটে দিতে বলে।
বৃষ্টি হাসে। তানিয়াকে বলে, “উফ! চল…”
আজ বৃষ্টির মায়ের বাড়ি গার্লস ওনলি পিকনিক। পিকুর মা আগেই রওনা হয়ে গেছে। তানিয়ার মা-ও আসবেন।
সামনের রাস্তায় রিকশা দাঁড়িয়েছিল। পিকলু, বৃষ্টি আর তানিয়াকে হাত নেড়ে সদর দরজায় ছিটকিনি তুলে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে পিকু।
খানিক বাদেই বিশু একটা হুইস্কির পাঁইট নিয়ে আসবে। ঝালঝাল কষা মাংস রেঁধে দিয়ে গেছে বৃষ্টি।
উঠোনের কোণের টিনের দরজাওয়ালা বাথরুমটায় ঢুকে হিসি করে পিকু। পাশের বাড়ি থেকে সিরিয়ালের গান ভেসে আসে। হালকা হালকা হাওয়া দিচ্ছে।
বাগানের সুপুরিগাছগুলো ঝিরঝিরিয়ে শব্দ করে। জল দিয়ে বেরিয়ে আসতেই থমকে যায় সে। কে ডাকল? বিশু না? ডাকটা এসেছে বাগানের পেছন দিক থেকে।
চাপা গলায় বিশু আবার ডাকল, “পিকু?”
বিশুরই তো আসার কথা, কিন্তু ও তো সামনের দরজায় কড়া নাড়বে। বাগানের পেছনে কী করছে?
“আয় না…”
বিশুর গলা। কোনো সন্দেহ নেই তাতে। পিকুর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।
“আসছি ভাই…” বলে বাগানের দিকে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে যায় পিকু।
তার ঘোর কেটে গ্যাছে। পকেটে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠেছে। ‘টিং’ শব্দে সেটা পিকুকে সতর্ক করছে। বারণ করছে বাগানে যেতে।
পিকুর শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক মুহূর্তও দেরি না করে একলাফে বাড়িতে ঢুকে খিল তোলে পিকু। দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফ ছাড়ে সে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখে হোয়াটস্যাপে একটা মেসেজ ঢুকেছে— অচেনা নাম্বার।
কোনো ছবিও দেওয়া নেই।
ইংরেজিতে লেখা দু-তিনটে ছোটো ছোটো বাক্য।
মেসেজটা পড়ে পিকুর চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে।
দরজার বাইরে বিশু তাকে বিদ্রূপ করে চাপা গলায় হেসে ওঠে।
পিকুর বুকের ভেতর কে যেন দমাদ্দম হাতুড়ি পিটছে।
ফোনের স্ক্রিনটা আবার চোখের সামনে তুলে ধরে পিকু, “বিশু আর নেই, বিশুর জিভটাও নেই। সে ফিরে এসেছে। তেন্ডুয়া…”
***
