।। মা পিকুকে ভালোবাসে না ।।
চিলেকোঠাটার এক দিকে দেওয়ালের খানিকটা অংশ ধসে যেতে একটা নকল জানালার সৃষ্টি হয়েছে। সেই জানলা দিয়ে বাইরের ঝকঝকে নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, দক্ষিণের জঙ্গল— সবই দেখা যাচ্ছে। সারা বাড়ির মধ্যে এই ঘরটার অবস্থাই সবচেয়ে শোচনীয়। মেঝেয় চতুর্দিকে খড়কুটো আর পায়রার গু। এ ছাড়া এক কোণে আছে একটা ভাঙা চেয়ার, একটা তোবড়ানো ফুটবল পাম্পার আর একটা কাঠের বাক্স।
পিকু মাঝেমধ্যে এই ঘরটায় বিকেলের দিকে এসে বসে। এই ঘরটা একসময় নাকি বেশ সাজানো গোছানো ছিল। বহুবছর ঝড়জল খেয়ে খেয়ে আর দেখভালের অভাবে মানুষ থাকার অযোগ্য হয়ে উঠেছে। কাঠের বাক্সটার ওপর বাবু হয়ে বসে ‘ভোম্বল সর্দার’ পড়ছিল পিকু।
বেশ ভালো শীত পড়ে এখানে। ক’দিন বাদে নাকি দশের নীচে নেমে যাবে।
কিছুটা পড়ার পর পিকু দেখল বইয়ের মধ্যিখানে দু’টো সিপিয়া টোনের পুরোনো ছবি। পিকুরই বয়সি একটা ছেলে। ছোটো করে ছাঁটা চুল, গোঁফের রেখা উঠেছে। হাফ প্যান্ট, চেক জামার ওপর হাফ সোয়েটার। সরু সরু পায়ে সাদা কেডস। একটা ছবিতে সে ঝুঁকে ব্যাট করছে, আর অন্য ছবিটায় দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে— ডান হাতে একটা ক্রিকেট ব্যাট আর বাঁ হাতটা কোমরে। হাসিটা অবিকল পিকুর মায়ের মতো। পিকুর গায়ে কাঁটা দিল— তার মামার ছবি। নীলের ছবি।
প্রথম ছবিটা ওলটাতে পিকু দেখল গুঁড়ি গুঁড়ি অক্ষরে পেনসিল দিয়ে লেখা আছে –
“গেল হপ্তায় ইস্কুল থেকে জীবনবিজ্ঞানের স্যার বিল্টুবাবু আমাদের পোড়ামুখির হাওরে নিয়ে গেসল। নিজে থেকে নিয়ে যায়নি অবশ্য। নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেও খুব একটা ছিল না। হেডস্যারের হুকুম। হেডস্যারের সামনে প্যাচে পড়ে বিল্টুবাবু খুব জাঁক করে বলেছিল ছেলেদের গাছপালা চেনাবে, পাখি চেনাবে। এদিকে ওখানে পৌঁছতে না পৌঁছতেই মিনিবাসটাকে ভাঙা মাইলস্টোনের ধারে দাঁড় করিয়ে স্যার বসে গেল ড্রাইভারের সঙ্গে তাস পিটতে। আমাদের বলল, এক ঘণ্টা দিলুম। ঘুরে আয়। দেরি করবিনি, আজ বাড়িতে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা হওয়ার কথা আছে। বেশি দেরি হলে আবার সব সেঁতিয়ে যাবে। এই শুনে ছেলেপুলে তো সব দল বেঁধে এদিক ওদিক সাইড হয়ে গেল। আমি কী করি? দিনের বেলা। ঠা ঠা রোদ্দুর। আমি অগত্যা গিয়ে ঢুকলুম জঙ্গলে।”
বাকিটা লেখা ছিল অন্য ছবিটার পেছনে—
“ব্যাগে ভাগ্যিস একটা গল্পের বই ছিল। ভাবলুম একটু নিরিবিলি ছায়া মতোন জায়গা দেখে জুত করে বসে বইটাই পড়া যাক। জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা ঢুকতেই একটা পুরোনো মন্দির চোখে পড়ল। বেশি বড়ো না। উঁকি মেরে দেখলুম তার ভেতর কোনো মূর্তি টুর্তি নেই। কবেকার কে জানে। ইটগুলো দাঁত ছ্যাড়কানো কঙ্কালের মতোন চেয়ে আছে। আর মন্দিরের মাথা ফুঁড়ে উঠেছে একটা বিশাল বটগাছ। তারই ডালপালা, পাতা চারদিকে ছড়িয়ে গিয়ে মাথার ওপর প্রকাণ্ড এক ছাতা বানিয়ে দিয়েছে। অত বড়ো বটগাছ আমি জীবনে দেখিনি। সে গাছের গোড়াতেই আমি ঠেস দিয়ে বইটা খুলে বসলুম। আর ঠিক তখনই আমি তাকে দেখলাম। আমার ঘাড়ে চটচটে কী যেন পড়তে আমি ওপর দিকে চাইলাম। দেখলাম বটের মোটা ডাল আর ঘন পাতার আঁধারে দু’টো চোখ। সেগুলো বন বেড়ালের চোখের মতো জ্বলছে। ভেবেছিলুম ভাম-টাম হবে, কিন্তু না, আমি স্পষ্ট শুনলাম কে যেন ভসভসিয়ে হাসি চাপছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে সে আমাকে এখানেও ধাওয়া করেছে।”
লেখাটা পড়ে ব্যোমকে গেল পিকু। নীলেমামার লেখাগুলো পড়ে তাকে গুলবাজই মনে হয়। তাও এটা পড়ে বড়ো অস্বস্তি হল পিকুর।
আলো পড়ে এসেছে।
চিলেকোঠার আনাচে কানাচে আঁধার জমছে। একটা অজানা ভয় জমাট বাঁধতে থাকে পিকুর মনে। এই চিলেকোঠা যেন অনেক পুরোনো কোনো অভিশপ্ত ঘটনার সাক্ষী।
.
বছরের এই সময়টা বিকেল সাড়ে চারটেয় সূর্য ডোবে শিমুলগাছায়। অনেক তাড়াতাড়ি রাত হয় এখানে। অন্ধকারে কান পাতলে শোনা যায় ঝিঁঝি বা প্যাঁচার ডাক। জঙ্গল থেকে খ্যাঁকশিয়ালের হুউউ-হুউউ চিৎকার। শুনে বড্ড গা ছমছম করে পিকুর।
আটটা নাগাদ পড়ে টড়ে উঠে মা’কে পিকু বলল, “খেতে দিয়ে দাও।”
ড্রয়িংরুমের সোফায় আধশোয়া হয়ে একটা বই পড়ছিল টুপুর। পিকু দেখল বইটার নাম প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস— কতবার যে মা আর বইটা পড়বে কে জানে!
টুপুর অবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “সবে তো আটটা বাজে রে। তুই এত তাড়াতাড়ি খাবি?”
“হ্যাঁ, খিদে পেয়েছে।”
আলুর পরোটার লেচি কাটাই ছিল। চট করে বেলে দিয়ে ভেজে নিয়ে এসে টুপুর দেখল পিকু পায়ে স্নিকার আর গায়ে উইন্ডচিটার পরে টেবিলে এসে বসেছে।
মুচমুচে পরোটা ছিঁড়ে মুখে পুরতেই আলুমাখার পুরটা গলে গেল। দারুণ বানায় মা।
খেতে খেতে মা’কে পিকু বলল, “খেয়ে নিয়ে আমি একটু বেরোব।”
“বেরোবি? এখন? সাড়ে আটটা বাজে।”
“হ্যা, একটু বাজারের দিকে যাব। দশটার মধ্যে ফিরে আসছি।”
“মানে? কেন?”
“বৃষ্টির থেকে ইতিহাস খাতাটা নেব।”
মা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “ইয়ার্কি মারছিস পিকু? সবে ক্লাস নাইনে উঠেছিস তুই। কলেজে পড়িস না। এত রাতে একা একা বাড়ির বাইরে বেরোনো চলবে না।”
“আগেও তো যেতাম। খাতা-পেন কেনার দরকার পড়লে বেরোতাম না?”
“ওটা ভবানীপুর পিকু। এটা শিমুলগাছা। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। চারদিকে শেয়াল-কুকুর ভর্তি। তার ওপর মাঝেমধ্যে লেপার্ডও হানা দেয়। বদ লোকের কথা তো ছেড়েই দিলাম। যা দরকার সব সকালে মেটাবি।”
পিকু গোঁজ হয়ে বলল, “তাহলে আমাকে এখানে নিয়ে এলে কেন?” কী?”
“আমাকে এই জঘন্য জায়গায় তুমি নিয়ে এলে কেন? কেন আমার বাবার থেকে দূরে সরিয়ে দিলে আমাকে?”
“পিকু! তুই সব জানিস। তুই জানিস আমার পরিস্থিতি। তুই জানিস তোর বাবা ইদানীং আমার সঙ্গে কী ব্যবহার করতে শুরু করেছিল…”
“কেন? তুমি কি কম যাও? ব্যবহার তো আমি তোমারও দেখেছি। আমি বেরোচ্ছি… ব্যাস!”
“পিকু, তুই যদি বাড়ির বাইরে এক পাও বেরোস খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু…”
“কী করবে? মারবে? তোমার বাবা যেমন নীলে মামাকে বেল্ট দিয়ে মারত সেরকম? তোমাকেও তো মারত…”
“পিকু!”
“তোমার মা যেমন উঠতে বসতে কথা শোনাত মামাকে, তুমিও তো আমাকে তেমনটাই করো গো। মামা বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে সব লিখে গেছে। তোমার বাবা-মা এমন চুলোচুলি করত যে তোমরা দু’ভাই-বোন রাতের পর রাত ঘুমোতে পারতে না। তেজ দেখিয়ে একদিন দাদু বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেত, তো অন্যদিন দিদা ঘরের দরজা এঁটে ইঁদুর মারা বিষ খেত। তুমি আর মামা পাগলের মতো একদিন বাবাকে খুঁজে বেড়াতে লাইন ধারে, পুকুর-পারে-জঙ্গলে, কখনও কখনও কাঁদতে কাঁদতে দরজা ধাক্কিয়ে মা’কে ডাকতে।
আমি সব পড়েছি। তুমি তোমার বাবা-মায়ের থেকেই শিখেছ না এমনভাবে ঝগড়া করতে? তুমি নিজে ছোটোবেলায় জ্বলেছ বলে আমাকেও জ্বলতে হবে?”
টুপুরের চোখে জল। সে দাঁতে দাঁত চিপে বলল, “নীলের আলমারিতে হাত দেওয়া আজ থেকে তোর বন্ধ। কাল সকালেই আমি অনুপমকে বলে ওই আলমারিতে তালা লাগানোর ব্যবস্থা করব।”
প্লেটটা সামনে ঠেলে দিয়ে ফুঁসে উঠল পিকু, “অনুপম কি আমার বাপ? ও কেন ঢুকবে আমাদের লাইফে? তুমি কি ওই শালার সঙ্গে ঢলাবে বলে আমাকে শিমুলগাছা নিয়ে এসেছ?”
চড়টা বেশ জোরেই মেরেছিল মা। গালটা এখনও জ্বালা করছে পিকুর। তার চেয়ে বেশি জ্বালা তার মনে। রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে অনেকটা দূর চলে এসেছে সে। পিচরাস্তার দু’পাশে কিচ্ছুটি ঠাহর হচ্ছে না এখন।
শেয়াল ডাকছে দূরের বন থেকে। আকাশ দিয়ে যে কালো জিনিসটা উড়ে গেল সেটা নির্ঘাত প্যাঁচা। হাতকাটা সোয়েটারের ওপর একটা উইন্ডচিটার চাপিয়েছে পিকু। তাতেও শীতটা বাগে আসছে না মোটে।
অনেক দূর থেকে ঘণ্টা বাজার শব্দ ভেসে আসছে— গির্জার ঘড়ির শব্দ। দশটা বেজে গেছে নির্ঘাত।
দাঁড়িয়ে পড়ল পিকু। চারপাশের অন্ধকারটা যেন ডেলা পাকিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
চাঁদটাও উধাও হয়েছে। আকাশে একটা তারাও নেই। অবাক কাণ্ড! একটু আগেও তো ছিল! সে যেন হঠাৎ অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করেছে। নিকষ অন্ধকারে নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে না সে। অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে খানিকটা এগোতে পিকু বুঝল তার পায়ের তলায় আর পিচ রাস্তা নেই।
এখানে জমিটা স্যাঁতসেঁতে। সে বোধহয় মাঠে নেমে পড়েছে। পেছন ঘুরে কয়েক কদম এগোতেও পিচ রাস্তা পেল না সে।
হঠাৎই পিকুর সামনে ভুস করে একটা নীলচে আলো লাফিয়ে উঠল।
আলেয়া! হাত দশেক দূরেই সেই আলেয়ার আলোর মধ্যেই পিকু দেখতে পেল লোকটাকে।
পিকু হাঁ। ট্রেনে দেখা সেই বুড়োটা।
“আরে! খোকাবাবু যে! এখানে কেন? পথ ভুল করে বুঝি?” গ্যালগেলিয়ে হাসল সে।
“আ-আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম… হঠাৎ আর রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না।”
দু’পাশে ঘাড় নেড়ে চুকচুক শব্দ করে লোকটা বলল, “অমনটা মাঝেসাঝে এখেনে হয়েই থাকে। ভয় নেই খোকাবাবু। এক্কেবারে নাক বরাবর আমার দিকে এগিয়ে এসো দিকিনি।”
“কিন্তু কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না…”
“আমাকে দেখতে পাচ্ছ তো খোকা? ওই ওতেই হবে। এসো এসো। এদিকে শক্ত জমি আছে।”
কয়েক পা এগোতেই ভচ করে পিকুর পায়ের গোছ অবধি ডুবে গেল কাদায়। তার ওপর হাঁটু অবধি কনকনে ঠান্ডা জল।
আলোটাও নিভে গেল। আতঙ্কিত পিকু চেঁচিয়ে উঠল, “জেঠু ও জেঠু… কোথায় গেলেন? আমি যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না… জলে নেমে গেছি… ও জেঠু…”
একটু দূরে আবার একটা আলো দপ করে জ্বলে উঠল। সেই খ্যানখ্যানে কণ্ঠস্বর ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “এগোতে থাকো খোকাবাবু… এগোতে থাকো… পথ পাবে… এগোতে থাকো…”
না এগিয়ে আর উপায়ও নেই। পিকু জল ঠেলে ঠেলে এগোতে শুরু করল।
পিকু যখন কোমর জলে নেমে পড়েছে সে আর এগোতে ভরসা পেল না।
“জেঠু! আমি সাঁতার জানি না…”
অন্ধকারে খ্যারখ্যারে কণ্ঠস্বর বলে উঠল,
“এহেহে! সাঁতার জিনিস খুব কাজের। শিখে নেওয়াটা ভারী জরুরি। অবিশ্যি পাঁকে পুঁতে গেলে সাঁতার টাতার খুব একটা কাজে লাগে না। এগিয়ে এসো খোকাবাবু, তিনি যে অপেক্ষা করছেন…”
“কে? কে অপেক্ষা করছে?”
পিকুর কথা শেষ হতে না হতে দপ করে খানিক দূরেই জ্বলে উঠল আর একটা আলেয়া। সেই আলোয় পিকু দেখল জলায় অর্ধেক ডোবা অবস্থায় একটা কাঠের আলমারি কাত হয়ে রয়েছে।
খ্যানখ্যানে গলা অন্ধকার থেকে বলে উঠল, “আলমারিটা দেখতে পাচ্ছ খোকাবাবু?”
“হ্যাঁ…”
“কী বলেছিলাম মনে আছে তো? এটা কোথাকার দরজা?”
“আ-আমি বাড়ি যাব… বাঁচাও বাঁচাও…”
অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল খ্যানখ্যানে কণ্ঠস্বর, “আমন! আমন! আমন! শোক তাকে পথ দেখায়। একাকিত্ব শক্তি দেয়। বিচ্ছেদ তাকে শরীর দেয়। ভয় দেয় পুষ্টি…”
আলমারির দরজাটা ফাক হল। আলেয়ার আলোয় পিকু দেখল দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একজোড়া হাত। লম্বা লম্বা কালচে নখ। সেই দুই হাতের মধ্যিখান দিয়ে একটা লম্বাটে মাথা উঁকি দিল।
ফ্যাকাশে চামড়া, সাদা মার্বেলের মতো চোখ। চামড়া কেটে বানানো হাসি।
ঘুপ করে জলে ডুবে গেল সেই মাথা। হকচকিয়ে গেল আতঙ্কিত পিকু পরমুহূর্তেই ঠিক তার মুখের সামনে ভুস করে ভেসে উঠল আবার।
আলেয়ার আলোটা দপদপাচ্ছে। তার অবয়বটা মানুষের মতো হলেও গায়ের রং কালচে ধূসর। ভেজা শরীরে পিছলে যাচ্ছে নীলচে আলো। পিকুর মুখ দিয়ে অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল।
হঠাৎ বাইকের গর্জনে চমকে উঠল পিকু— বুলেট। হেডলাইটের জোরালো আলোয় কালো জল ঝলমলিয়ে উঠল।
মুহূর্তে উধাও সেই আলমারি, সেই বিভীষিকা। পিকু দেখল তার কোমরের নীচ অবধি পাঁকে গেঁথে গেছে। বুকজলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে।
বাইকের হেডলাইটের ওপার থেকে ভাঙা গলায় একটা ছেলে চেঁচিয়ে বলল, “এই! কী করছিস ওখানে? মরবি নাকি?”
তার পরেই রিনরিনে কণ্ঠস্বর, “পিকু! ভয় পাস না… আমি বৃষ্টি…”
কাতর কণ্ঠে পিকু চেঁচিয়ে বলল, “বাঁচা আমাকে… বাঁচা…”
“তেন্ডুয়া দড়ি ছুড়ছে… শক্ত করে ধরবি…”
তেন্ডুয়া কোত্থেকে এল? পিকুর মাথা কাজ করছিল না, সে এখন বাঁচার চেষ্টায় মরিয়া।
পিকুর গায়ের কাছেই ঝলাত করে আছড়ে পড়ল কিছু একটা। হাতড়ে হাতড়ে পিকু ধরে ফেলল মোষ বাঁধার মোটা দড়িটা। শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সে।
নিজের দু’হাতে দড়িটা পেঁচিয়ে নিয়ে অতি কষ্টে কাদা থেকে একটা পা তুলল পিকু। তারপর আর একটা। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে সে এগিয়ে চলল পাড়ের দিকে।
আকাশের দিকে চেয়ে পিকু দেখল তারা দেখা যাচ্ছে আবার। ওই তো চাঁদ উঠেছে।
জলা পেরোতে বেশ খানিকটা সময় নিল পিকু। পিচ রাস্তায় উঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। হাঁপাতে লাগল মুখ হাঁ করে। ভেজা জামা, সোয়েটার, জিন্স তার গায়ের সঙ্গে এঁটে বসেছে। জুতোজোড়া রয়ে গেছে কাদাতেই।
তেন্ডুয়া বলল, “এই জলায় লেপার্ড আসে জল খেতে। বুনো কুকুরের দলও আসে।”
চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে তেন্ডুয়ার বুলেটখানা।
বৃষ্টি বলল, “প্রচুর জোঁকও আছে… এখানে নেমেছিলি কী করতে?”
পিকু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “বুড়োটা… ট্রেনের বুড়োটা… আমাকে ডাকছিল… তারপর আলমারি… কী বীভৎস মুখ… আমাকে দেখছে…”
হি-হি করে কাঁপছে পিকু। দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার জোগাড়।
তেন্ডুয়া নিজের জ্যাকেটটা খুলে পিকুর গায়ে চড়িয়ে দিল। বুলেট স্টার্ট দিল সে। বৃষ্টি পিকুকে ধরে ধরে তেন্ডুয়ার পেছনে বসাল। নিজে বসল সবার শেষে।
ভুটভুট শব্দে অন্ধকার চিরে এগিয়ে এলল তেন্ডুয়ার বুলেট। পিকুর কানের পেছনে ফিসফিস করে বৃষ্টি বলল, “মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে পালিয়েছিলি? পাগল নাকি তুই? ভাগ্যিস আমি এসেছিলাম ইতিহাস খাতা দিতে। দেখি টুপুরমাসি অন্ধকারে বাড়ির সামনে অসহায়ের মতো ছুটোছুটি করছে…”
পিকু উত্তর দিতে পারল না। ভয়ে, ঠান্ডায় সে আধমরা।
বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল টুপুর। পিকুকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। তেন্ডুয়া বলল, “কাকিমা, একে ঘরে নিয়ে যাও… হাল খারাপ…”
চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসার আগে পিকু শুনতে পেল অনুপমের স্কুটারের শব্দ।
“টুপুর? কী হয়েছে? পিকু … পিকু …”
তারপর সব অন্ধকার।
