নতুন ঠিকানা

।। নতুন ঠিকানা ।।

মনসাতলা স্টেশনে নেমেও লোকটাকে দেখতে পেল না সে। ঝলমলে রোদ উঠেছে। লাল ইটের তৈরি প্ল্যাটফর্ম, টিকিটঘর। রেল কোম্পানির রং করা সবুজ রঙের লোহার বেড়াকে বেষ্টন করে উঠেছে গোলাপি বুগেনভিলিয়ার ঝাড়।

পিকু আর টুপুর তাদের লাগেজ নিয়ে নেমে যেতেই ভস শব্দে ট্রেনটা নড়ে উঠল ফের। তারা দু’জন ছাড়া আর বিশেষ কেউ ট্রেন থেকে নামেনি।

চায়ের দোকানে ক’টা লোক বসে খবরের কাগজ পড়ছে। তাদের পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে দু-তিনটে কুকুর।

উঁচু মাটির পাড়ের ওপর তৈরি স্টেশন। মনসাতলা বাজারের দিকে নেমে গেছে একটা সিঁড়ি।

মনসাতলা ঠিক শহর নয়, ছোটো একখানা মফস্সল। আশেপাশের আরও বেশ কিছু গাঁ-গঞ্জ আর মফস্সলের মানুষের ভরসা এই ছোট্ট স্টেশনটাই।

চারদিকের গাঁ-গঞ্জগামী বাস, অটো, ট্রেকার সব এখান থেকেই ছাড়ে। স্টেশন চত্বর বেশ জমজমাট।

রবিবারের বাজার জমে উঠেছে। বেশ ভিড় রয়েছে। গাঁদা ফুলের দরাদরি, অটোওয়ালাদের হাঁকডাক, খাসির দোকানে লাইন, কাগজওয়ালাদের ব্যস্ত ক্রিং ক্রিং।

ট্রেকারে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হচ্ছিল পিকু। টুপুর জিজ্ঞেস বলল, “পিকু দ্যাখ, পাশের দোকানটায় কচুরি ভাজছে। খাবি?”

হিঙের কচুরির গন্ধে খিদে পেয়ে গিয়েছিল পিকুর। তবু ঘাড় নেড়ে জানাল সে খাবে না। কচুরি আর জিলিপি কিনে ঠোঙায় ভরিয়ে নিল টুপুর।

“জানিস পিকু? ছোটোবেলায় যখন মাসির বাড়ি যেতাম তখন ট্রেন ধরার আগে বাবা আমাকে আর ভাইকে এই দোকানে নিয়ে আসত। এই কচুরির স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে…”

পিকু উত্তর না দিয়ে গতকালের পত্রিকাটা খুলে বসল। ট্রেনের ওঠার আগে কিনেছিল কাগজখানা— পড়া হয়নি। পিকু দেখল, হাফ ব্লাড প্রিন্স সিনেমার রিভিউ বেরিয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেল তার। কলকাতায় থাকলে বাবা তাকে নন্দন বা আইনক্সে নিয়ে যেত— যেতই যেত। আগে তো মা-ও যেত। পিকুর মনে পড়ে গেল সেই চমৎকার রবিবারগুলো কথা।

ট্রেকার ভর্তি হতেই ঘটাংঘট শব্দে স্টার্ট দিল ড্রাইভার। থরথরিয়ে কেঁপে উঠল অটো। ছুটতে শুরু করল গোঁ গোঁ করে। প্রবল ঝাঁকুনিতে কাগজ পড়া পিকুর মাথায় উঠল। পাশের বউটা কোলে একটা বাচ্চা ছাগল নিয়ে বসেছিল। তার লেজখানা মাঝেমধ্যেই পিকুর নাকে এসে খোঁচা মারতে লাগল। সিঁটিয়ে বসে রইল সে।

মনসাতলা বাজার থেকে বেরোতেই দু’পাশের দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল পিকুর। পিচরাস্তার দু’পাশেই টলটলে নয়ানজুলি আর নারকেল গাছের সারি। দিগন্তবিস্তৃত চাষের জমি। জায়গায় জায়গায় তাদের নানান রং। কোথাও কাঁচা সোনার মতো হলদে, কোথাও বা লাল, কোথাও বেগুনি তো কোথাও কচি সবুজ। উত্তরে অনেক দূরে নীল পাহাড়ের সারি।

প্রাণপণ চেষ্টা করেও জায়গাটাকে অপছন্দ করতে পারল না পিকু খানিক বাদেই ট্রেকারটা তাদের পিচরাস্তার ওপর নামিয়ে দিয়ে নীলচে ধোঁয়া ছেড়ে ঘটাং ঘটাং করে হাওয়া হয়ে গেল। পিচরাস্তা থেকে ডাইনে দু’দিকে দু’টো প্ৰকাণ্ড পানাপুকুরের ঠিক মধ্যিখানে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা।

পিকু দেখল গেটের সামনে একটা স্কুটার দাঁড় করানো রয়েছে। কোমরে হাত দিয়ে হাসি-হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। পিকুদের দেখেই লোকটা এগিয়ে এল।

বয়স মোটামুটি মায়ের মতোই হবে। ফরসা টুকটুকে চেহারা। পাট করে আঁচড়ানো চুল। পরনে ফেব্রিক কালারের কাজ করা একটা পাঞ্জাবি আর জিন্স। পিকু দেখল লোকটার চেহারা এমনিতে রোগাটে হলেও বাতাবি লেবুর মতোন ভুঁড়ি আছে একটা।

একগাল হেসে লোকটা বলল, “ওয়েলকাম ব্যাক টু শিমুলগাছা টুপুর সেই একই রকম আছিস। পালটাসনি একটুও।”

দু’হাতে দু’টো ভারী সুটকেস নিয়ে এগোতে এগোতে টুপুর মিষ্টি হেসে বলল, “উফ! এত সকাল সকাল তোর আসার কোনো দরকার ছিল না। আমি তো বলেছিলাম তোর বাড়ি গিয়ে চাবিটা নিয়ে নেব। তুইও আর পালটালি না। এনিওয়ে… থ্যাঙ্কস রে…”

ঘাড় কাত করে, চোখ মেরে লোকটা বলল, “দোস্তি মে নো সরি, নো থ্যাঙ্ক ইয়ু, মনে নেই? শেফালি হলে দেখেছিলাম— ম্যায়নে পেয়ার কিয়া। দারুণ ছবি। উফ! গায়ে কাঁটা দেয়…

তারপর পিকুর দিকে ফিরল সে।

“ততদিনে তোমার মা কলকাতায় চলে গিয়েছিল। আমি একাই গিয়েছিলাম দেখতে। তার আগে তোমার মা-ই ছিল আমার সিনেমা দেখার পার্টনার। বাড়িতে লুকিয়ে কত সিনেমা যে আমরা দেখেছি তার কোনো হিসেব নেই।”

পিকুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে।

“তুমি হলে মিস্টার পিকু, তাই তো? আমি অনুপম। তোমার মায়ের ওল্ড ফ্রেন্ড।”

হাতের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে রেখে ভারী অনিচ্ছায় হ্যান্ডশেক করল পিকু।

“তাহলে পিকুবাবু? কোন ক্লাস হল?”

নিরুত্তাপ কণ্ঠে পিকু বলল, “জানি না। মনে নেই।”

“পিকু!” টুপুর ধমক দিল, “কী ধরনের অসভ্যতা এটা?”

অনুপম হাসিহাসি মুখেই হাত তুলে টুপুরকে নিরস্ত করে বলল “আরে ঠিক আছে। কোনো ব্যাপার না। এতটা জার্নি করে এসেছে। তার ওপর নতুন জায়গা। মানিয়ে নিতে তো একটু সময় লাগবেই। তারপর আমি আর মিস্টার পিকু হব বেস্ট ফ্রেন্ডস। কী? তাই তো পিকুবাবু?”

পিতৃ উত্তর দিল না। একটা মাছরাঙা পাশের গাবগাছটা থেকে হুশ করে নেমে ছোঁ মেরে একটা মাছ তুলে নিল বায়ের পুকুরটা থেকে। সবুজ পানার ফাকে নীল বিদ্যুতের ঝলক দেখল পিকু।

একটা চাবির গোছা টুপুরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অনুপম বলল, “ওয়েলকাম হোম। লোক লাগিয়ে সব সাফ-সাফাই করিয়ে রেখেছি। ঘরদোর ঝকঝক করছে। রান্নাঘরের জিনিসপত্রও নিয়ে এসে রেখেছি।”

টুপুর কৃতজ্ঞ চোখে অনুপমের দিকে তাকাল।

মরচে পড়া লোহার গেটের ওপারে আগাছায় ভর্তি বাগান। দোতলা বাড়িখানা থমথম করছে। কোনো এক সময় লাল রং ছিল – যত্নের অভাবে রং চটে গেছে। দেয়ালজুড়ে শ্যাওলা। কার্নিশ ফাটিয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে বট, অশ্বত্থ। বাগানে লম্বা লম্বা ঘাস। জং-ধরা তালাটা খুলে বাড়িতে পা রাখল তারা। টুপুর কাষ্ঠ হেসে বলল, “আগে খুব সুন্দর ছিল রে।”

পিকু নিরুত্তর।

শিমুলগাছায় এমনিতেই আসার মোটে ইচ্ছে ছিল না পিকুর। তার ওপর বাড়িটা দেখেই তার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল।

বাগানে পেয়ারা, জাম, বেল, কুল, সবেদা, কোনো গাছেরই অভাব নেই। ফুলগাছও গোটাকয়েক চোখে পড়ল। তবে দেখভালের অভাবে ঝামড়ে পড়েছে।

পিকুর মনে হল চিলেকোঠার ঘর থেকে কে যেন তাকে দেখছে। ওপর তাকিয়ে সে কাউকে দেখতে পেল না বটে, কিন্তু মনের খচখচানি ভাবটা তার গেল না।

বাড়িটা যেন দম বন্ধ করে এতদিন বসেছিল তাদেরই অপেক্ষায়।

দোতলার দক্ষিণের ঘরে ঠাঁই হল পিকুর। তার মামা নাকি ছেলেবেলায় এই ঘরেই থাকত।

এক কোণে একটা তক্তপোশ আছে। বইয়ে ঠাসা বেশ বড়ো একটা কাচের আলমারি – দারুণ দারুণ বইপত্রে ঠাসা। দক্ষিণের জানলা লাগোয়া একটা পড়ার টেবিল আর চেয়ার। দেওয়ালে গোটাকয়েক পুরোনো পোস্টার- বল হাতে কপিল দেব আর আকাশের দিকে দু’হাত তুলে জিশুকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে মারাদোনা। একটা ফ্রেমে বাঁধানো মোহনবাগানের জার্সি।

ঘরখানা কিন্তু বেশ সুন্দর। ভালোই খোলামেলা। জানলার বাইরে সবুজ গাছপালা আর বাগান। গ্রিল ধরে দাঁড়ালেই দূরে ঘন সবুজ জঙ্গল। জানলা বেয়ে উঠেছে মাধবীতলার ডালপালা।

এত মনোরম পরিবেশে পিকু সত্যিই কখনও থাকেনি। কলকাতায় জানলা খুললেই স্রেফ গোলমাল, ধুলো-ধোঁয়া আর কংক্রিটের দেয়াল।

ব্যাগপত্র রেখে নীচের তলায় নেমে পিকু দেখল মা আর অনুপম চা খেতে খেতে খোশগল্পে ব্যস্ত।

গেটের বাইরে এসে পিকু আশপাশটা ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগল। এই বেলা দশটাতেও রাস্তা নির্জন। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সব গাছপালা। আশেপাশে কোথাও মানুষ তো থাকে বলেও তো মনে হল না। মাঝেমধ্যে পিচরাস্তা দিয়ে হুশ হুশ শব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে বাস বা ঢ্যারট্যারে ট্রেকার। রাস্তার দু’ধারে জলা জমি আর উলু ঘাসের বন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিকু ফের বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *