।। বিকেলের বন্ধুরা ।।
আজ পাপানের জন্মদিন।
এই জন্মদিনটা ঠিক সেই রকম যেগুলো অনুমতি না নিয়েই এসে পড়ে। কোনো প্রস্তুতি নেই, আনন্দের প্রতিশ্রুতি নেই, শুধু ক্যালেন্ডারের একগুঁয়ে একটা তারিখ।
দুপুরের রোদ মাঠের ধুলোকে সোনালি করে তোলে। বাতাসে শুকনো মাটির গন্ধ। মাঠের এক কোণে মরচে ধরা গোলপোস্টটা হেলে আছে একটা বুড়ো মাতালের মতো।
ওরা জড়ো হয়েছে দক্ষিণের মাঠের পেছনের সিমেন্টের পাইপগুলোর কাছে। ওদের রোজকার ঠিকানা। এখানে মায়ের উঁকি নেই। বাবার চোখরাঙানি নেই। নেই স্কুল মাস্টারের কাঠের স্কেল।
এই জায়গাটা যেন শিমুলগাছার বড়োদের মানচিত্রেই নেই।
ট্রেকারস্ট্যান্ডের পাশের বেকারি থেকে একটা সস্তা চৌকো কেক নিয়ে এসেছে বিশু। চকলেট ফ্লেভার— আদপে ময়দা, চিনি আর রং।
হাতখরচ আর মাস্টারের মেরে দেওয়া মাইনে দিয়ে দাম মেটানো কেকের বাক্সটা খুলতেই একটা নরম, কৃত্রিম মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
পাপান দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু। হাত পকেটে।
ঠোঁটে ঝুলছে একটা হাসি— কিন্তু সেই হাসি প্ৰাঞ্জল না।
দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরায় আবির। কাঠিটা নিভে যাওয়ার আগেই হাত দিয়ে আড়াল করে পিকু— কেকের ওপর জ্বলে ওঠে বয়সের ছাঁচে বানানো মোমবাতি।
আবিরের সিগারেট থেকে আগুন নিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে তেন্ডুয়া।
এক ফুঁয়ে মোমবাতি নেভায় পাপান। হাততালি দিয়ে ওঠে সবাই। খানিকটা তফাতে ভাঙা পাঁচিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রত্যয়। তার দু’হাত বুকের ওপর জড়ো করা। দুধে আলতা মোটা হাতে জ্বলজ্বল করে সোনালি ব্যান্ডের ঘড়ি। মোটা কাচের চশমায় ঢাকা চোখ দেখে বোঝা মুশকিল যে তার মনে কী চলছে।
সার্চ পার্টির আগে, সন্ধের সাইরেনের আগে, নাইট কার্ফিউর আগে বিকেলগুলো অন্যরকম ছিল।
পিকু বলল, “হ্যাপ্পি বার্থডে ভাই।”
পাপান মাথা নাড়ে। কিছু বলে না। পিতপিতে প্লাস্টিকের ছুরিটা দিয়ে কেক ভাগ করতে বসেছে তানিয়া।
পাপানের হাতে একটা গিফটের প্যাকেট ধরিয়ে দেয় পিকু।
কী দিয়েছে, কেউ হয়তো মনে রাখবে না— পিকুও না।
কোমরে হাত দিয়ে জঙ্গলের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় তেন্ডুয়া। সামনে দক্ষিণের মাঠ। তারপর শুরু হয়েছে বড়ো বড়ো গাছের দেয়াল। শুধু সামনেই নয়, জঙ্গলটা অর্ধ চক্রের মতো ঘিরে রেখেছে মাঠ সমেত পুরো শিমুলগাছাকেই। শেষ বিকেলের আলোতে ভেসে যাচ্ছে সামনের জমিটা। কয়েকটা ঝাড়ুদার পাখি পোকা খুঁটে খাচ্ছে এখানে সেখানে। বিকেলবেলাতেও দম বন্ধ করা পরিবেশ চারিদিকে।
পাপানের বোনে তিতলির এখানে থাকার কথা ছিল। প্রতিবারই থাকে। কেক কাটার সময় খুব জোরে হাততালি দেয়। পাপানের গালে ঘষে দেয় কেক। তার হাসি দেখে মনে হয় যেন পৃথিবীতে আর কিছুই দরকার নেই।
তার বদলে এখন সেখানে একটা ফাঁকা জায়গা। এমন একটা শূন্যতা, যেখানে শব্দ থাকার কথা ছিল।
আজ পাপনকে বড্ড বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। চোখের নীচে কালি। ঝুলে পড়া কাঁধ।
কাগজের প্লেটের একটা করে কেকের টুকরো বসিয়ে সবার হাতে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছিল বৃষ্টি আর তানিয়া বিশু আর আবির কাড়াকাড়ি করে। পিকু তাতে ধুনো দেয়।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে প্লেটটা ধরে প্রত্যয়। তানিয়ার আঙুলের স্পর্শে শিউরে ওঠে সকলের অলক্ষে।
মাথা নিচু করে বসে থাকে পাপান। সামনে সিমেন্টের পাইপের ওপর রাখা কাগজের প্লেট। কেকটা ছোঁয়নি সে।
আবির হাঁকে, “খাবিনি? নিয়ে নোব?”
বিশু বলে, “অমনি? না রে পাপান। ওকে দিসনি। আমি নোব…” পাপানের উলটোদিকে হাঁটু গেড়ে বসে তানিয়া
বাঁ হাতে স্পর্শ করে পাপানের থুতনি। এগিয়ে দেয় কেকের টুকরো। দাঁত দিয়ে আলতো করে ভেঙে নেয় পাপান।
চোখাচোখি। মিষ্টি হাসি। ঠোঁটজোড়া ছোঁয় চকিতেই।
গলা খাঁকরানি দেয় পিকু। বৃষ্টির গাল লাল। জঙ্গলের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তেন্ডুয়া। আবিরে পাঁজরায় বিশুর কনুইয়ের গুঁতো।
হাতে ধরা কেকের প্লেটটা ঘাসের ওপর ছুড়ে দেয় প্রত্যয়।
“গাঁড় মারা তোরা। আমি চললাম”
এগিয়ে যায় সাইকেলের দিকে।
পিকু ডাকে, “ভাই… কী হল…”
“কী হল তোরা জানিস না? ন্যাকা সাজছিস?” ফুঁসে ওঠে প্রত্যয়। “আজকের দিনে…”
“আজকের দিন? কীসের আজকের দিন? হোয়াটস সো স্পেশাল অ্যাবাউট আজকের দিন? আমি আসতে চেয়েছিলাম? তোরাই তো জোর করলি…”
আবির মাথা গরম করে বলে, “এই যা যা! বেশি তেল দেখাস না… বিশু বলে, “চল ফোট।”
“আবির! বিশু! ফালতু বকিস না…” দাবড়ে দেয় তেন্ডুয়া। প্রত্যয়ের দিকে এগিয়ে যায় সে।
“মাথা ঠান্ডা কর ভাই। চল আমিও বাজারের দিকেই যাব। একসঙ্গে যাই।”
“না!” প্রত্যয়ের ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। “আমি একাই ঠিক আছি।”
এবার মুখ খোলে পাপান— “যে আসতে চায়নি তাকে জোর করে এনেছিস কেন তোরা? যা প্রত্যয়, তুই যা…
দাঁত দাঁত প্রত্যয় বলে, “তোকে জিজ্ঞেস করেছি? ডিড আই আস্ক ইয়ু?”
কণ্ঠস্বর কাচের মতো ধারালো।
“ছাড় তো, মিশতে পারিস না কারও সঙ্গে। বন্ধুরা এই জন্যই তোকে এড়িয়ে চলে…”
“বন্ধুত্বের মানে আমাকে তোর থেকে শিখতে হবে? লজ্জা করে না বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড ভাগাতে?”
“এই…”
সটান দাঁড়িয়ে ওঠে পাপান। শক্ত করে পাপানের হাত চেপে ধরে তানিয়া।
এক মুহূর্তের জন্য সব্বাই স্থির হয়ে যায়।
তারপর প্রত্যয় বলে, “কী হল? গায়ে লাগল? সত্যি কথা বলে ফেলেছি না?”
বৃষ্টি বলে, “ এই, হচ্ছেটা কী? থামবি তোরা?”
ঝাঁঝিয়ে ওঠে পাপান, “আমি শুরু করেছি? আমি একটা কথাও বলেছিলাম?”
প্রত্যয় বলে, “বলার মতো মুখ আছে তোর? টুয়েলভের ফার্স্ট টার্মের সময় নোটস চাইবার জন্য আমার থেকে নম্বর নিলি তুই তানিয়ার। তুই কিন্তু জানতিস পাপান। তুই কিন্তু জানতিস আমি ওকে ভালোবাসি…”
“আর তানিয়া? তুই যে বলেছিলি এখন তুই রিলেশনশিপ নিয়ে ভাবতে চাস না! এখন তোর ব্রেক চাই… যা হবে এইচএস-এর পর…”
তানিয়া জমে যায়। কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে।
এক পা এগিয়ে আসে পাপান, “তানিয়াকে টানিস না প্রত্যয়… যা বলার আমাকে বল…”
প্রত্যয় বলে, “তোর সঙ্গে কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে…”
তাড়াতাড়ি করে দু’জনের মাঝে পাঁচিল হয়ে দাঁড়ায় পিকু। বিশু পাপানের হাত ধরে টানে। প্রত্যয়ের কাঁধে তেন্ডুয়ার শক্ত হাত।
কথা কাটাকাটি বাড়তে থাকে। শব্দগুলো ভারী হয়ে ওঠে। জমে থাকা অভিযোগ উপছে পড়ে। পুরোনো ক্ষোভগুলো— যেগুলো এতদিন চুপচাপ ছিল— এখন লুকোনো জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
গলা চড়ায় প্রত্যয়, “এখানে তো সবাই আছে। তুই সত্যিটা বল না… তুই বল না যে আমার বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে তুই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস আমার সঙ্গে…”
পাপানের ঠোঁট কাঁপতে থাকে— “আ-আমার বোন হারিয়ে গেছে… তার মধ্যে তুই আমাকে … “
“সব কথায় বোনকে শিখণ্ডী দাঁড় করাস না পাপান,” প্রত্যয় বলে, “বোন না থাকার অজুহাত দিয়ে ভেবেছিস যা খুশি বলে পার পেয়ে যাবি? বোনকে আর খুঁজেও পাবি না কখনও— কোনো সম্পর্কের দাম দিতে জানিস তুই?”
কথাটা ঠিক জায়গায় লাগে না। বরং খুব ভুল জায়গায় লাগে।
ঘুসি চালায় পাপান। জোরে নয়। কিন্তু যথেষ্ট জোরে।
ঘাসের ওপর ছিটকে পড়ে প্রত্যয়ের রিমলেস চশমা।
প্রত্যুত্তরে লাথি ছোড়ে প্রত্যয়। তার ভারী পায়ের লাথি পেটে এসে লাগতে গুটিয়ে যায় পাপান। পরমুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রত্যয়ের ওপর। ঘাসে গড়াগড়ি দিয়ে ওরা ধস্তাধস্তি করে। তেন্ডুয়া, বিশু আর পিকু টেনে
ছাড়িয়ে নেয় ওদের। বৃষ্টি চিৎকার করে। তানিয়া নিঃশব্দে কাঁদে। হতভম্ভ আবির দাঁড়িয়ে থাকে চোখ বড়ো বড়ো করে।
দাঁড়িয়ে ওঠে পাপান। ঘাসের ওপর পড়ে থাকা প্রত্যয়ের উদ্দেশে থুতু ছিটিয়ে বলে, “মর শালা… মর… তোরা সব্বাই মর…”
তারপর সে দৌড় দেয়। মাঠ পেরিয়ে সাইকেল। এক হ্যাঁচকায় সাইকেল তুলে নিয়ে চড়ে বসে। দাঁড়িয়ে উঠে প্যাডেল করতে থাকে দ্রুতবেগে। মুহূর্তে ইটের পোল পেরিয়ে অদৃশ্য হয় পাপান।
ওরা কেউ পিছু নেয় না।
নেওয়া উচিত ছিল।
.
পাপান সাইকেল চালাচ্ছিল শিমুলগাছার পরিত্যক্ত রেল কলোনির ভেতর দিয়ে।
শহরের সীমানা থেকে অন্তত মিনিট দশেক বাইরে আছে সে। রেল কলোনি খাঁ খাঁ করছে। এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ফাঁকা।
কালো পিচের ঢালাইতে মাঝেমধ্যে ছোটো বড়ো গর্ত। বহুবছর আর কেউ থাকে না এখানে। পথের পাশে অন্ধকার রেল কোয়ার্টারগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে দৈত্যের মতো।
বালি সিমেন্ট ঝরে ঝরে পড়ছে। কাঠের তৈরি দরজা জানলা খুলে নিয়ে গেছে চোরে। কোয়ার্টার সংলগ্ন ঘাসজমিগুলোতে নানারকম ঝোপঝাড় গজিয়েছে। হুটিপাহাড়ির শেয়ালগুলো দূরে থেকে ডেকে উঠছে। তার মাথায় এখনও ঘুরছে প্রত্যয়ের কথাগুলো।
মারামারি, গালাগালি, ধাক্কাধাক্কি। সেই ক্লাস থ্রি থেকে প্রত্যয় তার বেস্ট ফ্রেন্ড। এই ক’মাসে কী যে হল? পাপান তো জানত তানিয়ার সঙ্গে ব্রেক আপ হয়ে গেছে প্রত্যয়ের। তানিয়াকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে সে। তার কী দোষ? গলার কাছটা টনটন করতে থাকে তার।
বাইরের কুয়াশা এসে জমতে শুরু করেছে মাথার মধ্যেও।
চারপাশের জঙ্গল আর পুরোনো রেল-কোয়ার্টারগুলো ঢেকে আছে ধোঁয়াশায়।
আলোকে গিলে খায় শিমুলগাছার কুয়াশা, শব্দও পালাতে পারে না তার হাত এড়িয়ে।
কোয়ার্টারগুলোকে পরিত্যক্ত প্যান্ডেলের মতো দেখায়। হাঁ করা জানালা, ভাঙা বারান্দা— কোনোদিন মানুষ ছিল, তারপর হঠাৎই একদিন যেন সবাই পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেছে।
রাস্তার দু-পাশের ঝোপঝাড় কিছুক্ষণের মধ্যেই বদলে যেতে লাগল বড়ো বড়ো বড়ো গাছে।
ঘোড়ার গোবরের গন্ধ। পুরোনো সার্ভিস রোড আর নুড়ি বিছানো পথে লেগে থাকা সেই অসুস্থ, মিষ্টি-তেতো গন্ধ। এটা সে চেনে। এই গন্ধ মানেই শহরের শেষ প্রান্ত। আলো নেই। মানুষ নেই।
রাগটা গলে গিয়ে হঠাৎই একটা আদিম অস্বস্তি উঁকি মারতে শুরু করল পাপানের মনে। ঘাড়ের পেছনে একটা সুড়সুড়ির অনুভূতি— যেন কোনো পোকা ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে।
সাইকেল থামিয়ে ঘুরে তাকাল সে— কিছুই নেই।
তবু অনুভূতিটা গেল না।
কেউ দেখছে।
তারপর কারও হেঁটে আসার শব্দ।
খচ… খচ…
নুড়ি ভাঙার আওয়াজ। মানুষের মতো। খুব কাছেই।
কুয়াশার ভেতর থেকে একটা অবয়ব বেরিয়ে এল।
থমকে দাঁড়াল পাপান।
নীলচে কুয়াশা কেটে স্পষ্ট হল তার শরীর— দু’পায়ে সটান দাঁড়িয়ে গেল সে। শরীরের চামড়া সাদাটে। পেছন দিকে বেঁকে গেল তার মাথা, খুলে হাঁ হয়ে গেল মুখ। খোলা মুখ থেকে গ্যালগ্যালিয়ে বেরিয়ে এল অজগর সাপের মতো মোটা জিভখানা।
পাপান পিছোতে শুরু করল।
পেছনে একটা পুরোনো কংক্রিটের আউটহাউস। সে দৌড়ে দিল দরজার দিকে।
ঠিক তখনই কথা বলে উঠল ওটা।
কণ্ঠস্বরটা মেয়েলি। পরিচিত। বাচ্চা মেয়ের গলা।
“দাদা আমি একা… খুব ভয় করছে আমার…”
তিতলির গলা।
লকপকে জিভটা দুলিয়ে দুলিয়ে ব্যঙ্গ করছে সে তাকে। পাপানের মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
তিতলি নেই। সে জানে। বহুদিন ধরে জানে। আর এই জিনিসটা ইচ্ছে করেই ক্ষতটায় নুন ঘষছে।
এটা শুধু হিংস্র নয়। এটা নিষ্ঠুর। প্রাগৈতিহাসি অন্য কোনো জগতের এক স্যাডিস্ট।
পকেট থেকে ছুরিটা বের করল পাপান। কভারটা ছুড়ে ফেলল দূরে। পাপানকে লক্ষ করে দানবটা ঝাঁপাল— সিংহের মতো।
পাপনও ঝাঁপাল।
ছোটো ছোটো কোপ। দ্রুত। নিখুঁত। বহু বছরের প্রশিক্ষণ। ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট সে।
ছুরিটা মাংসে ঢুকছে— ঝাঁকুনি দিচ্ছে সেই দানবের শরীর। ছোটো বড়ো বিভিন্ন গলায় কাতর আর্তনাদ। শরীর ঝটকে সরানোর চেষ্টা করছে পাপানকে। পাপানের বুকে-পিঠে ধারালো নখের আঁচড়ও এসে লাগল বার কয়েক। কেটে গেছে, রক্ত ঝড়ছে। তাও প্রশিক্ষিত অ্যাথলিটের ক্ষিপ্রতায় খপাখপ ছুরি চালাতে লাগল পাপান।
কিন্তু শক্তিটা অসম। কয়েক সেকেন্ডেই শ্বাস ভারী হয়ে এল পাপানের। হাত কাঁপছে। অ্যাড্রিনালিন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে।
তার শরীর এবার নিজেই সিদ্ধান্ত নিল— পালাও।
পাপন দৌড়ে ঢুকে পড়ল একটা কোয়ার্টারের ভেতর। দরজাটা অক্ষত। এই একটা কোয়ার্টারেই দরজাটা অবশিষ্ট আছে। সে আর তানিয়া একদিন এখানে এসেছিল— হাসি, ধুলো, গরম নিশ্বাস, চুমু…
এখন সে দরজাটা ঠেসে বন্ধ করল। তুলে দিল জং-ধরা ছিটকিনি কাঠের পুরোনো পাল্লাটা কেঁপে উঠল সেই দানবের ভারী শরীরের ধাক্কায়
তারপর ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “দাদা…”
তিতলির গলা।
“বেরিয়ে আয় দাদা…সকাল হলে আমি যে থাকব না…”
থম মেরে অন্ধকারে বসে রইল পাপান। নড়তে পারছে না সে। বুঝে গেল ওটা শুধু তার শরীর চায় না। ওটা তার কণ্ঠও চায়। তার শব্দ। তার ভাষা।
তারপর তার স্বরকে ব্যবহার করবে খেলবে অন্যদের সঙ্গেও।
দরজায় ধাক্কা পড়ল। একটা। দুটো। তিনটে।
পুরোনো কাঠ ককিয়ে উঠতে লাগল। ফাটল ধরছে দরজায়। গলে যেতে লাগল পাপানের সাহস।
ছোটো শিশুর মতো ফুঁপিয়ে উঠল সে।
সে একা। সে অসহায়। সে অপেক্ষা করছে শিকার হওয়ার।
শিমুলগাছা বড়ো নিষ্ঠুর। সে কাউকে রেয়াত করে না।
