।। ডালহৌসি, লোকাল ট্রেন, ঝাল লজেন ।।
প্রায় দু’মাস বাড়ি ফেরেনি প্রসূন। বড্ড কাজের চাপ ছিল অফিসে। পিচের ঢালু রাস্তাটা দিয়ে মনসাতলা ব্রিজ থেকে শিমুলগাছার দিকে সাইকেল গড়িয়ে নেমে আসে আসে সে। সকাল থেকে অনেক ভোগান্তি গিয়েছে। এ বছর এখনও কলকাতায় ঠান্ডা পড়েনি মোটে। বেলঘরিয়ার মেস থেকে ডালহৌসিতে অফিস যাওয়ার সময় দরদরিয়ে ঘেমেছে প্রসূন।
সাধের চামড়ার চটিটার স্ট্র্যাপ ছিঁড়েছে। সেটা মুচির কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য অফিস থেকে বেরোতে গিয়ে ম্যানেজারের ধাঁতানি খেয়েছে। টিফিনবাক্স ফেলে এসেছে আর ডালহৌসি থেকে বাসে ঝুলতে ঝুলতে হাওড়া স্টেশন আসতে হয়েছে তাকে।
স্রেফ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ট্রেনটা মিস হয়নি তার। যদিও সিট না পেয়ে বাথরুমের কাছে খবরের কাগজ পেতে বসে ঝিমোতে ঝিমোতে এসেছে সে।
একটাই ভালো জিনিস যে ট্রেনটা একদমই লেট করেনি। বারোটা পনেরো বাজতে না বাজতেই নামিয়ে দিয়েছে মনসাতলা স্টেশনে।
আজ শিমুলগাছায় ঢুকতেই চারপাশটা একটু অন্যরকম লাগে প্রসুনের। রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে। রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেলেও একদম ফাঁকা রাস্তা কোনোদিনই দেখেনি সে।
বাজারওয়ালা তাদের জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করে। ব্রিজের কাছের পাইস হোটেলের ছেলেগুলো বড়ো বড়ো হাঁড়ি ডেকচি নিয়ে রাস্তার কলে মাজতে বসে। শীতকাল হলে কী হবে? রাস্তার ধারে ধারে আগুন জ্বেলে তাস পিটতে বসে কারখানার লেবাররা।
আজ রাস্তায় একটা কুকুর পর্যন্ত নেই!
প্রসুনের কাঁধে লম্বা ফিতের কালো অফিস ব্যাগ, সাইকেলের হ্যান্ডেলে প্লাস্টিকের প্যাকেটে আবিরের জ্যাকেট, আবিরের মায়ের একজোড়া ছাপাশাড়ি— কপালজোরে ধর্মতলায় সস্তায় ভালো জিনিস পেয়ে গিয়েছে যা হোক।
খাঁ খাঁ করতে থাকা ট্রেকার স্ট্যান্ডটা পেরিয়ে একটা বাঁক নিলেই শেফালি সিনেমা হল।
আগে এই হলে কম বই দেখেছে প্রসূন? বছর দশেক আগে পাকাপাকিভাবে তালা পড়েছে এই হলের গেটে।
একদিন নাইট শো চলাকালীন প্রোজেকশনিস্ট বাবুলাল গুঁই হলের সব দরজা এঁটে দিয়ে কলেজে পড়া কিছু ছেলেমেয়েকে কুপিয়ে মারল। তার পর থেকেই লাটে উঠল শেফালি হল।
ঘটনার কথা চাউর হতে না হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে লোক এসে জুটেছিল তামাশা দেখতে। প্রসূনও এসেছিল বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। পুলিশের ব্যারিকেডে আটকা পড়া ভিড়ের ফাঁকফোঁকর দিয়ে সে দেখেছিল ম্যাটাডোর গাড়িতে একে একে তোলা হচ্ছিল বস্তায় মোড়া লাশগুলো। বস্তাগুলো রক্তে ভিজে চুপচুপে।
পুলিশ এসে নাকি দেখেছিল সিনেমার পর্দার দিকে ফিরে হলের ঠিক মধ্যিখানে একটা চেয়ারে দু’পা তুলে বসে ছিল বাবুলাল। মুখে তৃপ্তির হাসি। মুখে জোরালো টর্চের আলো পড়তে দেখা গিয়েছিল তার দু’চোখ খুবলে তুলে নেওয়া হয়েছে— নিয়েছে সে নিজেই। চোখদু’টো রাখা তারই দুই হাতের চেটোর ওপর।
অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় মুখে গ্যাজলা তুলে চিৎকার করতে করতে নাকি বাবুলাল বলছিল, “দেখুনি গো, কেউ দেখুনি। বাঁচতে চাইলে ও বই কেউ দেখুনি। উপড়ে নাও গো, চোখ উপড়ে নাও। ও বই দেখুনি গো…”
ঠিক কী বই যে সেই সময় হলে বাবুলাল চালিয়েছিল সে ব্যাপারে মুখ খোলেনি পুলিশ। বাতাসে অনেক কানাঘুষো ওড়ে। অনেকে বলে সেই ছবির রিল নাকি এখনও শিমুলগাছায় আছে— কেউ দেখে ফেললেই রাতারাতি উজাড় হবে শহর।
ঘটনাটা মনে পড়তেই গায়ে কাঁটা দেয় প্রসূনের। সত্যিই শিমুলগাছা জায়গা মোটে সুবিধের না। তাদের ইংরেজি মাস্টার কমলাকান্ত জোয়ারদার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রাশভারী ভঙ্গিতে মজা করে কলকাতার কলিগদের বলতেন, “দেয়ার আর মোর থিংস ইন শিমুলগাছা দ্যান আর ড্রেমট অফ ইন ইয়োর কলিকাতা… বুঝলে হে?”
সত্যিই তাই। প্রসূনের যত বয়স বেড়েছে এই সত্যিটা সে হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করেছে। বড়ো সৃষ্টিছাড়া জায়গা এই শিমুলগাছা। চেনা ছকে তাকে বাঁধা ভারী মুশকিল।
আজ ঠান্ডাটাও বেশ কড়া। ট্রেন থেকে নেমে একট ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে চড়িয়েছে সে। তাতেও আটকাচ্ছে না হিমেল বাতাস। সে এমনিতেই শীতকাতুরে— তায় শিমুলগাছার ঠান্ডা মোটা পোশাকেও বাগ মানে না মোটে।
খিদেটাও বেশ চাগাড় দিয়ে উঠেছে। আবিরের মা নিশ্চয়ই জেগে বসে আছে। পৌঁছেই কষকষে গরম জলে স্নান করে কলকাতার ধুলো, ধোঁয়া, ক্লান্তি আর হতাশা ধুয়ে ফেলবে সে। গায়ে মোটা আলোয়ান জড়িয়ে উলের আসনে বাবু হয়ে বসবে প্রসূন।
বেলে রাখা রুটিগুলো ঝটাঝট সেঁকে নিয়ে ঘি মাখিয়ে পাতে নামিয়ে দেবে পূর্ণিমা। লঙ্কা, পেঁয়াজ, টমেটোকুচি আর ধনেপাতা দিয়ে মেখে রাখা গরম গরম বেগুনপোড়া আর হাঁসের ডিমের কষার কথা মনে পড়তেই জিভে জল এসে গেল তার।
আবির আর আবিরের ভাই ঘুমিয়ে পড়লেই শিমুলগাছার শীতকে ফাঁকি দিয়ে পূর্ণিমার নরম বুকের উত্তাপে ডুব গালবে প্ৰসুন।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শেফালি সিনেমার সামনে চলে আসে সে। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। সামনে একটাই চায়ের দোকান— বন্ধ। কোনো মাতাল নেই। কুকুর নেই। মাটির কাছাকাছি কুয়াশার আস্তরণ।
শেফালি হলের ডান কোণের দিকে একটা ঝাঁকড়া জামরুল গাছের তলায় থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরোনো অ্যাম্বাসাডার গাড়ির কঙ্কাল— জন্মাবধি ওটাকে এই হালেই দেখে আসছে প্রসূন। তার ওপর পোস্টের বাতিটা বোধহয় কাটা; জ্বলছে না।
কুঁজকো আঁধারে লোহার খাঁচাটার ভেতর নড়ে ওঠে কী একটা। খুব সামান্য নড়াচড়া। চোখ কুঁচকে তাকায় প্রসূন। ভেতরে কিছু একটা আছে।
সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিন্ন হয় নীরবতা। ঘটাং করে লোহার দরজাটা ছিটকে যায়… একটা দীর্ঘকায় ছায়ামূর্তি…
কুয়াশার বুক চিরে বেরিয়ে আসে একটা মানুষের মতো আকৃতি— কিন্তু মানুষ নয়।
চামড়াহীন, চুলহীন শরীর, ফোলা আর বিকৃত। মাংসের ওপর অস্বাভাবিক গাঁট, ফোসকা— যেন শরীরটাকে ভেতর থেকে কিছু ঠেলে বাইরে বেরোতে চাইছে।
প্রসূন দেখতে পায় বাতাসে দোল খাচ্ছে একটা অস্বাভাবিক বড়ো জিভ। সাপের মতো মোটা, লম্বা— ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ঝুলে আছে।
আতঙ্কিত প্রসূন কোনো রকমে পাশ কাটিয়ে যায়। প্রাণপণে প্যাডেল করতে শুরু করে সে।
পেছনে ভিজে, ভারী পায়ের শব্দ।
থপ… থপ… থপ…
কেউ দৌড়ে আসছে। খুব দ্রুত।
পা কাঁপছে, হাঁটু কাজ করছে না, কিন্তু শরীর ছুটছে। এখন ভয় তার শরীরের মালিক।
গাঢ় ধোঁয়াশায় চারিদিক আচ্ছন্ন।
আতঙ্কিত প্রসূন দেখে কিছু একটা তার পাশে পাশে দৌড়চ্ছে— চার হাতে পায়ে। চাইলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে প্রসূনের ওপর। কিন্তু সে তা করছে না। শিকারকে না খেলালে মজা কই?
হু হু করে প্যাডেল চেপে ডান দিকের ইটভাটার রাস্তাটা ধরল প্রসূন। এটাই তার বাড়ির শর্টকাট। ইটভাটা পেরোলেই খাইখাই ক্যাটারারের অফিস। অনুষ্ঠান থাকলে সব সেরে এসে অনেক রাত্তির অবধি মালপত্র তোলাতুলি করে তাদের কর্মচারীরা।
কী সর্বনাশ! আজকে সেই অফিসেও শাটার নামানো। কোত্থাও কেউ নেই! আজ যেন সবাইকে কোনো মন্ত্রবলে হাপিশ করে দেওয়া হয়েছে।
সরু পায়ে চলা রাস্তাটার দু’ধারে ঝাঁকড়া চুলো দানবের মতো প্রাচীন বড়ো বড়ো গাছের পাঁচিল। আজ ঝিঁঝিও ডাকছে না— অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে শিমুলগাছাকে।
পুরোনো ইটভাটার পাঁচিলের কাছে পৌঁছতেই সর্বনাশটা হয়ে গেল।
রাস্তায় জমে থাকা পিচ্ছিল আবর্জনায় পিছলে গেল চাকা। সাইকেলটা নিয়ে ছিটকে পড়ল সে— মাথা, কাঁধ, হাঁটু— সব ঝনঝন করছে।
মাথার ওপর বটগাছ। তলায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।
পেছনে সেই জিনিসটা এগিয়ে আসছে। ঘন কুয়াশা ভেদ করে প্রসূনের কাছে এসে পৌঁছচ্ছে তার পদশব্দ।
থপ… থপ … থপ …
অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকায় প্রসূন। রাস্তার একপাশে উঁচু পাঁচিল, অন্যপাশে পুকুর। কোনোমতে উঠে দাঁড়াতেই প্রসূনের চোখে পড়ল একটা খোলা নর্দমার ঢাকনা।
আর ভাবার সময় নেই। হাত বাড়াতেই লোহার মই পেয়ে গেল সে। মই বেয়ে প্রসূন নেমে পড়ল শিমুলগাছার নর্দমায়। চারপাশ অস্বাভাবিক রকমের থমথমে; জগৎ থেকে যেন প্রাণের স্পন্দন আচমকাই হারিয়ে গেল। অন্ধকার পাতালপুরীতে প্রবেশ করল সে।
ভেতরটা বিশাল। অস্বাভাবিক রকমের বিশাল। এই শহরের জন্য এত বড়ো, এত গভীর নর্দমার কোনো দরকারই নেই। বানিয়েছিল ব্রিটিশরা।
ব্যবহারও হয় না এখন।
পাথরের সুড়ঙ্গ, শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে আছে শিমুলগাছার গভীরে। এটা একটা গোলকধাঁধা। বহু পুরোনো। এ শহরের থেকেও পুরোনো। শিমুলগাছার নীচে আর একটা শিমুলগাছা।
নোংরা জল ছপছপিয়ে এগিয়ে যায় প্রসূন। দুর্গন্ধে বমি উঠে আসে। প্রতিটা শব্দ— পায়ের ছপছপানি, হাঁপানোর আওয়াজ পাথরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে হাজার গুণ হয়ে ফিরে আসছে।
এই জায়গাটা বড়ো কুখ্যাত— এই নর্দমায় মানুষ হারিয়েছে প্রচুর। লোকে বলে এখানে ঢুকলে অনেকে আর ফেরে না। এখানে নাকি অনেক আজব জিনিসের বাস।
এছাড়া গোলকধাঁধায় পথ হারালে কেউ কেউ খিদেতে মরে, কেউ মরে দীর্ঘকাল ভূগর্ভে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে।
হাঁপাতে হাঁপাতে আরও গভীরে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল প্রসূন। তার মনে পড়ে গেছে। বছর তিরিশের আগে ক্লাস ফাইভের প্রসূন ওপরতলার জানালা থেকে দেখেছিল তার বাবাকে। নীচে নামতে পারেনি সে। নিশুতি রাত। তার গলা গিয়ে চিৎকারও বেরোয়নি।
বিকট এক দানব তার পাইথনের মতো জিভটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল বাবার হাঁ মুখে— ছিঁড়ে বের করে এনেছিল বাবার জিভটা। আতঙ্কের সেই রাত প্রসূনের মস্তিষ্ক হয়তো ইচ্ছাকৃতই ঠেলে দিয়েছিল বিস্মৃতির অতলে।
তারপর বড়ো হয়ে সে এই শহর এড়িয়ে চলেছে। যতটা এড়িয়ে চলা সম্ভব। কিন্তু তবু সে ফিরে ফিরে আসে— ভালোবাসার টানে।
দরদরিয়ে ঘামতে থাকে প্রসূন। পকেট থেকে বের করে ছোটো টর্চটা। কাঁপতে কাঁপতে জ্বলে ওঠে সেই টর্চ। টর্চের আলো ভেদ করতে পারে না এই আদিম অন্ধকার। এই অন্ধকার শুধু আলোর অনুপস্থিতি না- এ অন্ধকার ভারী কম্বলের মতো পুরু হয়ে প্রসূনের গায়ে চেপে বসতে শুরু করে। দম আটকে আসে তার।
জলের ওপর দিয়ে ভারী পায়ে এগিয়ে আসার শব্দ পায় প্রসূন — ছপাৎ ছপাৎ ছপাৎ! সঙ্গে টক-টক-টক করে একটা অদ্ভুত আওয়াজ। কেউ যেন জিভ দিয়ে টাকরায় শব্দ তুলছে।
প্রসূন আরও জোরে ছুটতে থাকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে হাঁটুজলে। কোনোমতে বাঁচাতে পারে টর্চটাকে।
জামা, প্যান্ট, সোয়েটার, জুতো সব ভিজে জবজব করছে।
জোলো ঠান্ডা সোয়েটার ভেদ করে জমিয়ে দিচ্ছে মজ্জা। তাও এগিয়ে চলে সে। অসংখ্যা শাখাগলি ছড়িয়ে গিয়েছে চারদিকে— টানেলগুলোয় জমে আছে অদ্ভুত সোঁদাটে শতাব্দী প্রাচীন অন্ধকার।
.
নখ দিয়ে পাথরের গায়ে আঁচড় টানছে সে। খুন্তি দিয়ে কড়াই থেকে দুধের চাঁছি ঘষায় মতো কিড়কিড়ে শব্দে শিরশিরিয়ে ওঠে প্রসূনের চামড়া।
“দৌড়িও না,” কচি গলায় গুনগুনিয়ে ওঠে কেউ।
নর্দমার ভেতরে শিকার শুরু হয়েছে।
শিমুলগাছায় শিকার হওয়ার অর্থ নিজের ছায়াকে ছাড়িয়ে পালাতে চাওয়া। অসম্ভব।
আর এখান থেকে পালানোর রাস্তা খুব কম মানুষই খুঁজে পায়।
দুর্গন্ধময় নর্দমার গলিঘুঁজি হাতড়ে হাতড়ে এগোতে থাকে প্রসূন। টানেলটা সরু হতে থাকে ক্রমশই। খানিকটা যেতেই টর্চের আলো বাধা পায় নিরেট দেয়ালে। প্রসূন দেখে সে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে এগোনোর আর কোনো পথ নেই— ডেড এন্ড।
দু’দিকে লাল-ইট বের করা দেয়াল। এখানে দেয়াল ফাটিয়ে প্ৰকাণ্ড প্রকাণ্ড বট-অশ্বত্থের শিকড় বেরিয়েছে।
সামনে পাথরের দেয়াল। পেছনে ঘড়ঘড়ে শ্বাসের শব্দ- ভেজা, ক্ষুধার্ত।
দেয়ালে পিঠে ঠেকিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় প্রসূন।
টর্চের আলোর বৃত্তের ঠিক মাঝে একটা অবয়ব নিজেকে মেলে ধরে।
চামড়া ফ্যাকাশে। খুব লম্বা। হাতে পায়ের ভাঁজগুলো ভুল জায়গায়। জায়গায় জায়গায় ভ্যাদভ্যাদে চামড়া ঝুলে আছে, প্রতিটা মুভমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে জয়েন্টগুলো ফাটছে কটকট শব্দে। মাথাটা কাত করে সে প্রসূনের দিকে দেখে— কৌতূহলী দৃষ্টি।
কলে পড়া ইঁদুরের মতো কাঁপতে থাকে প্রসূন।
মুখটা খুলে যায় তার। জিভটা বেরিয়ে আসে। মোটা, স্তরীভূত, জীবন্ত। তার গায়ে আরও ছোটো ছোটো জিভ। তিরতিরিয়ে কাঁপছে।
অট্টহাসি করে ওঠে সেই দানব। অসংখ্য ভিন্ন বয়সি মানুষ যেন বিভিন্ন স্কেলে হেসে উঠেছে একই সঙ্গে। টানেলের গায়ে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে ফিরে ফিরে আসতে থাকে সেই হাসি।
জিনিসটা মুহূর্তেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠান্ডা ওজন। চাপ জিভটা তার গলায় পেঁচিয়ে বসে— স্বাদ নেয়, গন্ধ নেয়। কামড় বসে। চামড়া ভেদ করে হাড়ে গিঁথে যায় ধারালো দাঁত।
প্রসূনের চিৎকার গিলে ফেলে আদিম নৈঃশব্দ্য।
