উঁকি
জিভ

পুত্রস্নেহ বড়ো বিষম

।। পুত্রস্নেহ বড়ো বিষম ।।

“ডিসেম্বর, ১৯৮২, শিমুল গাছা।

স্নেহের প্রবীর,

এই লেখাটা আমি লিখছি সজ্ঞানেই। আমি জানি যে একদিন হয়তো এই পাতাগুলো আমি নিজে আর পড়ব না। পড়বে আমার ছেলে।

প্রবীর, আমাকে ক্ষমা করিস বাবা। এই ডায়রি তুই পড়ছিস মানে আমি যা শেষ করতে চেয়েছিলাম, তা পারিনি।

আমি এসব ব্যাপারে পুলিশের নথি ঘেঁটে প্রায় কিছুই জানতে পারিনি। যা জেনেছি তা সেসব বই থেকে, যেগুলোর গায়ে স্যাঁতসেঁতে সিন্দুক আর জমাট রক্তের গন্ধ লেগে ছিল। জেনেছি সেই সব পাণ্ডুলিপি থেকে, যেগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল প্রাচীন মন্দিরের চোরাকুঠুরি থেকে, আর কিছুটা ছিল ঔপনিবেশিক জরিপ-রেকর্ডে— যেগুলো ব্রিটিশরা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।

শিমুলগাছাতে যে জিনিসটা শিকার করে, তা মানুষ নয়। গ্রামবাসীরা যেমন ভাবে, তেমন কোনো দানবও নয়। ওটা আসলে এক ধরনের পরজীবী। অন্য এক সমান্তরাল জগতের বাসিন্দা। এক ব্যর্থ আচার থেকে জন্ম নেওয়া, আমাদের জগতে আটকে পড়া এক আদিম সত্তা। পুরোনো লেখাগুলোতে পাইমন নামের এক দানবরাজের কথা আছে। যারা জ্ঞান চায়, মানুষের আনুগত্য চায়, তারা পাইমনের উপাসনা করে। কিন্তু এই জিনিসটা পাইমন নয়। এটা তখনই এসে হাজির হয় যখন পাইমনকে করা আহ্বানে কিছু ভুলচুক হয়। এ হল এক ছায়া, যা আসে যখন উপাসনায় খুঁত থাকে।

ওর জিভ শুধুই একটা মাংসখণ্ড নয়। ওটা একটা বাঁধন। ওটাই সেই নোঙর, যা তাকে এই পৃথিবীর সঙ্গে বেঁধে রাখে।

ও জিভ নেয়, কারণ সেটা নেওয়া তার প্রয়োজন। নক্ষত্রের অবস্থান বদলালে সে যা হারায়, তা পূরণ করতেই ওকে নিতেই হয়। ও ঘুমোয় কখনও তিরিশ বছর, কখনও কম, কখনো বেশি। আর যখন জাগে, তখন সে ক্ষুধার্ত থাকে।

পদ্ধতিটা আমি পেয়েছিলাম এক প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথিতে, ১৮৯১ সালে এক উত্তর ভারতীয় পণ্ডিত ল্যাটিন থেকে সেটাকে নকল করেছিলেন। আরেকটা উল্লেখ পেয়েছি গোয়ায় বাজেয়াপ্ত হওয়া এক পর্তুগিজ ডেমনোলজি বইয়ে। দুটোই একই কথা বলে— এই সত্তাকে মুখোমুখি দ্বন্দ্বে থামানো যায় না। ওকে ভুল পথে চালনা করতে হয়। জিভে আঘাত পড়লেই সে দিশা হারায়। ঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

সেটাই মোক্ষম সময় তাকে আঘাত করার

আমি ওটাকে শেষ করতে চাই।

পরিকল্পনাটা সহজ। আমি নিজেই টোপ হব। দানবটা আক্রমণ করলেই লোহার হুক গিঁথে দেব ওর জিভের মাঝে

ওকে টানব দক্ষিণের জঙ্গলঘেঁষা ইটভাটার কাছে। যেখানে মাটি ভঙ্গুর, দুর্বল, আর নীচে থাকা সুড়ঙ্গগুলো সহজেই ধসে পড়ে। আমি ব্যর্থ হলে, মাটিই আমাদের দুজনকে গ্রাস করবে।

তোর বয়স এখন বেশি না। হ্যারিকেন জ্বেলে পড়তে বসে তুই সেদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলি— মানুষ হঠাৎ উধাও হয়ে যায় কেন? সেদিন আমি উত্তর দিতে পারিনি।

আমি তোকে এমন এক শহরে একা রেখে যেতে পারি না, যে শহর নিজের সন্তানদেরই খেয়ে ফেলে। তাই আমি অপেক্ষা করেছি। আজ রাতে একটা হেস্তনেস্ত হবেই।

আমি যদি ব্যর্থ হই, অনুরোধ— আমার ভুলটা তুই করিস না। দেরি করিস না। ক্ষতকে জয় ভেবে ভুল করিস না। ভুল আঘাত শুধু ওকে সাবধান করে দেয়।

আর যে সত্তা ব্যথা মনে রাখতে পারে, সে নতুনভাবে শিকার করতে শেখে।

আমার চেয়ে বুদ্ধিমান হও, আর এই বোঝাটা তোমার কাঁধে চাপিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে ক্ষমা কোরো।

–জয়রাম মুখার্জি।
সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ
(শিমুলগাছা)

পুনশ্চ: যদি কখনও শহর আর নিজের সন্তানের মধ্যে বেছে নিতে হয়— সন্তানকেই বেছে নিও। শহর আবার গড়ে তোলা সম্ভব। সন্তানকে দ্বিতীয়বার ফিরে পাওয়া যায় না।”

.

আজ পূর্ণিমার রাত। শিমুলগাছা ভেসে যাচ্ছে দুধসাদা জ্যোৎস্নায়। থমথম করছে শহরটা। রাত মোটে সাড়ে দশটা। কয়েকমাস আগেও বাজারের ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোতে ভিড় দেখা যেত।

মনসাতলা স্টেশনের শেষ লোকালে নেমে সাইকেল চালিয়ে খোশগল্পে মেতে বাড়ি ফিরত চাকুরের দল। কোচিঙের লাস্ট ব্যাচ ফেরত ছেলেমেয়েদের হাহা হিহি-তে গমগম করত গলিগুলো।

পাড়ার মোড়ে মোড়ে চলত বাল্ব ঝুলিয়ে ক্যারাম-তাসের আড্ডা। শিমুলগাছা এত তাড়াতাড়ি কক্ষনো ঘুমোয় না।

কিন্তু আজ শহরটা যেন শ্মশানপুরী। রাস্তায় একটা কুকুরেরও দেখা নেই। অন্ধকার বাড়িগুলো থমথমে হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সবাই যেন দোর এঁটে নিশ্বাস বন্ধ করে তার পায়ের শব্দ শোনার চেষ্টা করছে। প্রার্থনা করছে আরও একটা রাত যেন নিরাপদে কাটিয়ে দিতে পারে।

জানলার নীচে বা পাঁচিলের পেছনে সে যেন বিনবনিয়ে কেঁদে হারানো স্বজনের গলায় ডেকে না ওঠে— সে ডাক যে বড়ো ভয়ংকর। যাকে ডাকে সে উন্মাদের মতো ছোটে।

হারিয়ে ফেলা মানুষটাকে আরেকটিবার চোখের দেখা দেখবে বলে, তাকে ফিরে পাবে বলে। তারপর সেও হারিয়ে যায়। ক্রুর আততায়ীয়ের থাবার নাগাল এড়ানো যে বড়ো শক্ত।

কিন্তু একটা ছেলে আজ একাই হেঁটে চলেছে। বাজারের সীমানা পেরিয়ে, মেটেগির্জা, কালীতলা, দুলেপাড়া একে একে ছাড়িয়ে সে হেঁটে চলেছে। গুনগুনিয়ে গান ধরেছে সে।

ওই তো খালধার। ওপরে ইটের পোল। পেরোলেই বিশাল মাঠ, যার পেছনেই অপেক্ষা করে রয়েছে কালান্তক দক্ষিণের জঙ্গল।

বিশু না? হ্যাঁ, বিশুই তো। শিমুলগাছার প্রতিটা শিশুও জানে যে এখন রাতে বাড়ি থেকে বেরোনো আত্মহত্যার সামিল। তাও বিশু অবিচল। পোলের কাছে এসে দাঁড়াল সে। চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিল। খালের জল কলকলিয়ে বয়ে চলেছে।

মাথার ওপর দিয়ে ডানা ঝাপটে একটা বাদুড় বোধহয় উড়ে গেল। ঝিঁঝি ডাকছে। জ্যোৎস্নারাতে দক্ষিণের মাঠের মাঝেমধ্যে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে বিশালাকায় দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পোল পেরিয়ে মাঠের দিকে পা বাড়াল সে।

দক্ষিণের মাঠে যাওয়ার দু’টো রাস্তা আছে। একটা দুলেপাড়ার পর ইটের পোল পেরিয়ে, আর একটা প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে কাঠের পোল পেরিয়ে।

সে রাস্তাতেও একজন চলেছে। উত্তরের ব্রিজের মুখ থেকে হাঁটতে শুরু করে বাজার, ঘোষপুকুর, মুখার্জিপাড়া, পুরোনো রেলইয়ার্ড পেরিয়ে কাঠের পোলে পা রেখেছে সে।

সে হাঁটা শুরু করেছে সাড়ে দশটার পর। প্রায় আধা শহর অতিক্রম করে ফেলেছে সে। এখন ক’টা বাজে? বারোটা? সাড়ে বারোটা? একটা? অনেকটা হাঁটা হয়েছে। ক্লান্তিতে, ভয়ে শরীর ঘেমে নেয়ে গ্যাছে।

তাও সে থামেনি। অনেক হয়েছে। এর একটা বিহিত করতেই হবে। শিমুলগাছার মানুষ ভেড়ার পাল নয়। যখন খুশি নেকড়ে এসে চুঁটি ধরে তুলে নিয়ে যাবে? এ হতে দেওয়া যায় না। পাপানের জন্য, আবিরের জন্য এটুকু ঝুঁকি তাকে নিতেই হবে।

বুড়ো বটের ঝুরিগুলো হাতে করে সরিয়ে খানিকটা এগিয়ে গাবগাছের কাছে দাঁড়াল বিশু।

এখানেই পাপানকে পাওয়া গিয়েছিল। ভাবতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাত মুঠো। আর খানিক এগোলেই শুরু হয়েছে ঝোপঝাড়

তাদের পেছনেই মূর্তিমান বিভীষিকার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণের জঙ্গল। আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই ডান দিকের একটা ঝোপ থেকে খড়খড় শব্দ পেল সে।

বুকটা ধক করে উঠলেও সে জানে শেয়াল বা ভামের কমতি নেই এখানে। জুতোর ফিতেটা আলগা হয়ে গ্যাছে। বেঁধে নেওয়ার জন্য হাঁটু গেড়ে বসল সে।

বসতেই ডানদিকের সেই ঝোপের পেছন থেকে অবিকল আবিরের গলায় কেউ বলে উঠল, “জঙ্গলে এসো না, জঙ্গলে আসবে?”

বিশুর শরীর জমে গেছে। তার কান ভোঁ ভোঁ করছে। সত্যিই তো আবিরের গলা। বুদ্ধি লোপ পেল তার। তবে কি আবির বেঁচে আছে?

“এসো না…”

আবিরই তো। কিন্তু, কিন্তু আবিরের লাশ নিজের চোখে দেখেছে বিশু। “আসবে জঙ্গলে? আমার বড়ো বিপদ…” বিশুর ঘোর লেগে যায়। সে উঠে দাঁড়ায়…”

ঝিঁঝির ডাক থেমে গেছে। ডানদিকের ঝোপ থেকে সাঁৎ করে কী একটা কাছের ঝোপটার পেছনে এগিয়ে আসে। “বড়ো বিপদ গো আমার…”

মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঝোপের দিকে এগোয় বিশু। পাপানের বিপদ, সে না গিয়ে পারে? ঝোপের ভেতর দু’টো জ্বলজ্বলে চোখ অপেক্ষা করছে। শিকার নাগালের মধ্যে। চামড়া পচা গন্ধে তার ফুসফুস জ্বলে ওঠে।

একটা চাপা শিসের শব্দ।

ঘোর কাটে বিশুর। হে ভগবান! সে কী করছে? মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিতে চলেছে সে। বুড়ো বটের ওপর থেকে প্রত্যয় শিস না দিলে…

হাতের শিকার ফসকে ঝোপের মধ্যে থেকে একটা ক্রুদ্ধ চাপা গর্জন শোনা যায়। বিশু নড়ে না। সে জানে প্রত্যয়ের রাইফেলের রেঞ্জের মধ্যেই সে রয়েছে।

কিন্তু আক্রমণ আসে না। ঝোপগুলোতে আলোড়ন ওঠে। পরপর ঝোপগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে পশ্চিমের দিকে ছুটে চলেছে সেই অদৃশ্য বিভীষিকা।

সাক্ষাৎ যমের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে বুক থেকে একটা ভারী নিশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে বিশু।

বট গাছ থেকে লাফিয়ে নামে একজন কনস্টেবল। ভারী চেহারা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে গাছ থেকে নামতে বেশ বেগ পেতে হয় থানার মেজোবাবুকে। উর্দি ঘামে ভেজা। উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছেন।

ততক্ষণে পাশের ঝোপে শুইয়ে রাখা বাইকটা খাড়া করে ফেলে স্টার্ট মেরেছে কনস্টেবল। ঘড়ঘড় শব্দে স্টার্ট নিয়েছে সেটা। পোলের ধারের ইটের পাঁজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে আরও কয়েকজন পুলিশ।

নেমে এসেছে প্রত্যয়— বিশু জানে সে দুরন্ত শুটার। রাজ্যস্তরে বেশ কয়েকবার সোনা জিতেছে। অন্যের ছেলেকে টোপ করে পাঠিয়ে নিজের ছেলেকে ঘরে লুকিয়ে রাখার মতো মানুষ বড়োবাবু নন। তাই প্রত্যয়ও রাইফেল নিয়ে শিকারের সঙ্গী হয়েছে।

রাইফেলটা কাঁধে ঝুলিয়ে বিশুর হাত ধরে টেনে তোলে প্রত্যয়, “ওঠ বিশু। কুইক। বসে থাকার সময় নেই। পশ্চিমে ছুটেছে শয়তানটা। ওদিকে পিকু…”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *