উঁকি
জিভ

বেঞ্জামিন মুডির রোজনামচা

।। বেঞ্জামিন মুডির রোজনামচা ।।

শিমুলগাছা গ্রামস্থিত সাবেক নীলকর সাহেব বেঞ্জামিন মুডি’র রোজনামচা হইতে উদ্ধৃত (১৮৬০)

“তাহারা আমাকে নিষ্ঠুর বলিয়া ডাকে, কারণ তাহারা দুর্বল।

আমি পথ দিয়া যাইলে গ্রামবাসীগণ নতশিরে ভূমিতে লুটাইয়া পড়ে। ধুলায় রগড়াইতে থাকে তাহাদের কপাল। তাহাদের ললাট লিখন আমার হাতে। তাহাদের পৃষ্ঠদেশ পরাজিত পশুর ন্যায় বাঁকা। তাহারা জানে আমার আদেশের ব্যত্যয় হইলেই রহিম তাহাদের ক্রূরতার সহিত দমন করিবে।

এই ভূমি এখনও বিদ্যমান কারণ আমি তাহা অনুমোদন করিয়াছি। তাহাদের সন্তানগণ অন্ন গ্রহণ করে কারণ আমি তাহার অনুমতি দিই।

তথাপি তাহারা ফিসফিস করে। তথাপি তাহারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। তাহারা মনেপ্রাণে আমার ক্ষতি চায় এবং তাহারা সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই রইয়াছে।

ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে অধিগ্রহণ করিতে হয়।

লাতিন ভাষায় আমি ইহা পাঠ করিয়াছি। হিব্রু ভাষায়ও। কলিকাতা হইতে নিষিদ্ধ গ্রিমোয়ার ছিন্ন পৃষ্ঠা যাহারা গোপনে বহন করিয়া আনিয়াছিল— সেই সকল ব্যক্তি আমার কর হইতে অর্থ গ্রহণ করিবার সময়ও ভয়ে কাঁপিতেছিল।

গ্রিমোয়াতে প্রাপ্ত লেখাতেও ইহাই লিখিত। ক্ষমতা কাহাকেও দান করা যায় না। ক্ষমতা আহ্বান করিতে হয়।

রহিম ইহা বুঝে। রহিমের জিহ্বা নাই। আমি নিজ হস্তে তাহা অপসারিত করিয়াছি।

শাস্তির নিমিত্ত নহে। সাবধানতার নিমিত্ত। সে অতিরিক্তই জানিয়া ফেলিয়াছে। অতিরিক্ত দেখিয়া ফেলিয়াছে।

কিন্তু তাহার ন্যায় আনুগত্য দুর্লভ। তাহার জিহ্বা কর্তনকালে সে চিৎকার করে নাই।

রক্তক্ষরণ বন্ধ করার কোনোরূপ প্রচেষ্টা করে নাই। সমগ্র প্রক্রিয়াকালে তাহার দৃষ্টি আমার চক্ষু ত্যাগ করে নাই।

কার্য সমাপ্ত হইলে কেবল সে ভূমিতে কপাল ঠেকাইয়া নিঃশব্দে ক্রন্দন করিয়াছিল।

ইহাই ভক্তি।

রহিমের সহায়তায় আমি জ্ঞানরাজ পাইমনের জন্য বৃত্ত প্রস্তুত করিয়াছিলাম। পাইমন, যাঁহার কণ্ঠ মানবমনকে চালনা করে। অতি যত্নসহকারে চিহ্নাঙ্কন করিতে করিতে আমার আঙুল অবশ হইয়া গিয়াছিল। আমার ভাণ্ডারের মেঝে পুরাতন রক্ত ও নূতন দ্রাক্ষারসে আঠালো হইয়া উঠিয়াছিল। মেষচর্বির প্রদীপ ছিল প্রস্তুত, পুস্তকসমূহ উন্মুক্ত।

সহসাই আজ বিপদ আসিয়া উপস্থিত হইল।

পশুর ন্যায় উন্মত্ত জনতা আজ সন্ধ্যায় সহসা পাথর ও ধারালো অস্ত্র লইয়া আক্রমণ করিয়া বসিল। নীলের ভাঁড়ারের নিকট তাহারা রহিমকে ঘিরিয়া ফেলিল।

অন্যান্য ভৃত্যরা যখন তাহাকে উদ্ধার করিয়া আমার দ্বারে আনিয়া ফেলিল, তাহার দেহ ভিজা মাংসের একখানি বস্তার ন্যায় হইয়া গিয়াছিল। শ্বাসপ্রশ্বাস ভগ্ন হাপরের ন্যায় শব্দ করিতেছিল।

তাহারা ভাবিয়াছিল, আমি তাহাকে মরিতে দিব।

তাহারা আমাকে চেনে না।

যে রহিম আমাকে নরকরাজ পাইমনের আরাধনায় সহযোগিতা করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল, গ্রামবাসীরা তাহাকে আমার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইবার চেষ্টা করিয়াছিল।

দেখিলাম রহিম মরিতে বসিয়াছিল। অতএব আমি সমীকরণ পরিবর্তন করিলাম।

আমি নিজ হস্তে তাহাকে বৃত্তের মধ্যে টানিয়া আনিলাম। তাহার রক্ত চিহ্নগুলিকে মলিন করিয়া দিল, ঝাপসা করিয়া দিল। প্রদীপগুলি যেন লজ্জাবশত একে একে নিভিয়া গেল।

আমি অগ্নি প্রজ্বালন করিলাম।

সেই অগ্নি অন্ধকার ছিল। কালো নহে— অন্ধকার। সে আলো উৎপন্ন করে নাই; বরং আলো গ্রাস করিয়াছিল। ছায়াসমূহ ভিতরের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িল। বায়ু ভারী হইয়া উঠিল। আমি লৌহ, পচন ও আরও প্রাচীন কিছুর গন্ধ পাইয়াছিলাম— মিষ্ট, অথচ বিকৃত— যেন গ্রীষ্মকালে দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত কসাইখানার মেঝে।

গ্রিমোয়া খুলিয়া মন্ত্রোচ্চারণ আরম্ভ করিলাম। মেঝে কাঁপিয়া উঠিল। উত্তর আসিল।

কোনো আকার নহে। কোনো দেহ নহে। অন্ধকার অগ্নি হইতে তাহা স্খলিত হইয়া আসিল — যেন মস্তিষ্ক হইতে পলায়নকারী একখানি চিন্তা। একখানি সাপের ন্যায় সর্পিল মাংসপিণ্ড। ভিজা। ভারী। জীবিত।

একখানি জিহ্বা।

আমার বাহুর চেয়েও দীর্ঘ। শিরায় ভরা। স্পন্দিত। অগ্রভাগ বিভক্ত হইয়া পুনরায় যুক্ত হইতেছিল, যেন বায়ুর স্বাদ গ্রহণ করিতেছে। তাহা কোনো বাক্য উচ্চারণ করে নাই, কোনো নিশ্বাসও নহে— তাহার শরীরে ছিল তীব্র ক্ষুধা।

রহিম খিঁচুনিতে আক্রান্ত হইল।

বস্তুটি লাফাইল।

সে রহিমের জিহবাহীন মুখগহ্বরের মধ্যে বলপূর্বক প্রবেশ করিল, যেখান হইতে মাংস অপসারিত ছিল সেখানেই গর্ত করিয়া বসিল।

তাহার চোয়াল চিরিয়া বিস্তৃত হইল। বৃত্ত জুড়িয়া রক্ত ছিটাইয়া পড়িল। সেই জিহ্বা তাহার অবশিষ্ট জিহ্বার সহিত সংযুক্ত হইয়া, একীভূত হইয়া উঠিল।

অতঃপর সে উঠিয়া দাঁড়াইল।

কাষ্ঠল শব্দে তাহার মেরুদণ্ড সোজা হইল। তাহার চক্ষু উন্মুক্ত হইল— কালো, প্রতিবিম্বিত, অনুগত।

আমি হাসিলাম। অট্টহাসি থামাইতে পারিলাম না

এখন তাহারা আমাকে মানিবে। রহিমের অন্তরে অবস্থিত বস্তুটি আমার কণ্ঠের স্বাদ গ্রহণ করিল এবং তাহা স্মরণে রাখিল।”

ফাইলটা বন্ধ করল বৃষ্টি।

শিমুলগাছা লাইব্রেরির পুরোনো কাঠের টেবিলে ঘুণ ধরেছে। খোলা জানলা দিয়ে অনাহূত অতিথির মতো উত্তুরে শুকনো হাওয়া এসে এলোমেলো করে দেয় জমে থাকা ধুলো, পুরোনো ছেঁড়া পাতা।

বিকেলের আলোয় ধুলোর কণা ভাসছিল মরা পোকামাকড়ের শুকনো দেহাবশেষের মতো।

“খানিকটা পড়ে শোনালাম… আরও ডিটেইলে আছে…” বৃষ্টি শান্ত গলায় বলল।

একটু দূরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তেন্ডুয়া। এই ছ্যাঁকছ্যাকে ঠান্ডাতেও তার গায়ে একটা হাতাকাটা সাদা গেঞ্জি– নরম আলোতে চওড়া কাধ আর গোল ডেল্টয়েড স্পষ্ট।

পিকু বসে রয়েছে বৃষ্টির গা ঘেঁষে— তার চোখ আবদ্ধ বইয়ের পাতাতে।

আবির আর বিশু বসে আছে গলা জড়াজড়ি করে। আবিরের গায়ে হাতকাটা সোয়েটার। বিশুর মাথায় গুটিয়ে পরা হনুমান টুপি।

তানিয়ার মাথা পাপানের কাঁধে। তানিয়ার কাঁধের পাশ দিয়ে নেমে এসে বুকের ওপর ছড়িয়ে আছে লম্বা চুলের গোছা।

পাপানের চোখ দুটো কোটরে বসে গেছে। একবারও কথা বলেনি সে। টেবিলের কানা চেপে ধরা আঙুলগুলো ফ্যাকাশে, দুর্বল।

“এগুলো আগামীর সূর্যতে প্রকাশিত একটা ধারাবাহিকের অংশ— একশো বছরেরও বেশি আগে লেখা। লিখেছিলেন এক স্থানীয় ইতিহাসবিদ প্রাণকৃষ্ণ সমাদ্দার। বেঞ্জামিন মুডির ভিটে ভেঙে পড়ার পর তিনি মুডির ব্যক্তিগত কাগজপত্রের টুকরো-টাকরা খুঁজে পান।”

হলদে পাতাগুলোর ওপর টোকা দিল সে।

“এর কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে তিনি ‘আগামীর সূর্য’ পত্রিকায় ছাপেন।”

বিশু ফস করে বলে বসল, “রূপকথা…”

আবির তাল দিল, “পক্ষীরাজ…”

“ঘ্যাঁঘাসুর…”

দলে পড়ে চ্যাংড়ামি মারার লোভ সামলাতে পারল না পিকুও। ফিক করে হেসে ফেলে বলল, “কী জানি বোধহয় স্যান্টাক্লজও…”

“না,” বৃষ্টির কণ্ঠে দৃঢ়তা।

“সমাদ্দার এটা লিখেছিলেন কারণ তখনও একই জিনিস ঘটছিল শিমুলগাছায়। মানুষ উধাও হচ্ছিল। মানুষ মেরে জিভ উপড়ে নিচ্ছিল কেউ একটা। পুরোনো কাগজের আর্কাইভ ঘেঁটে আমি দেখেছি।”

নীরবতা নেমে এল কড়িকাঠ বেয়ে।

“পুরোনো বই, কাগজ, দস্তাবেজ ঘেঁটে প্রথম ঘটনাটার সূত্র তিনি খুঁজে পান ১৮৬২ সালে। সাহেবের মৃত্যুর কয়েক বছর পরে। প্রায় ত্রিশ জন মানুষ নিহত। তাদের কারও মুখে জিভ ছিল না।”

ঢোক গিলল পিকু। বলল, “সেই প্রথম?”

“হুঁ,” বলে চলল বৃষ্টি, “পরের ওয়েভ শুরু হয় ১৮৯২ সালে।” আবির সোজা হয়ে বসে বলল, “তিরিশ বছর…”

“বাহ! কী ফাটাফাটি বুদ্ধি রে তোর আবির!” বেঁকিয়ে হাসল তানিয়া। “সমাদ্দার ঘটনাটা লিখেছিলেন ১৯২২ সালে…” বৃষ্টি বলল।

“তারপর?” ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল তানিয়া।

বৃষ্টি তাকাল পিকুর দিকে। বলল, “তারপর ১৯৫২…” পিকু বলল, “তারপর ১৯৮২…”

“তারপর এখন…” অস্ফুটে বলে উঠল পাপান।

খানিকক্ষণ সবাই থম মেরে বসে রইল। বাইরে একটা দাঁড়কাক ডেকে উঠল।

নীরবতা ভাঙল তেন্ডুয়া— “সবই বুঝলাম। কিন্তু এর সলিউশনটা কী?”

ঠোঁট উলটে দু’দিকে মাথা নাড়ল বৃষ্টি।

“জানি না। আরও পড়তে হবে। লাইব্রেরিতে আরও অনেক পুরোনো নথি আছে। ব্রিটিশ আমলের মামলার নথি। পুরোনো খবরের কাগজ। চিঠিপত্র।”

হঠাৎ বিকট শব্দে চেয়ারটা পিছিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল পাপান।

“ও আমাকে ডাকছে… রোজ রাত্তিরে ডাকে। তিতলি নয়। অন্য কেউ। অন্য কিছু।”

হাতের মুঠো শক্ত হল পাপানের। দাঁতে দাঁত চিপে সে বলল, “ও শালাকে মারব আমি…”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *