পাপানকে বোকা বললে অর্ধেক বলা হয়

।। পাপানকে বোকা বললে অর্ধেক বলা হয় ।।

শুকনো শ্যাওলার ভেলভেটে নরম হাতের ভর দিয়ে পা উঁচু করে ছাদের আলসে থেকে উঁকি মারল তিতলি।

তাদের দোতলা বাড়িটার সামনেই একটা গোলাকার ফাঁকা জমি। তার চারপাশের বড়ো বড়ো গাছ। হেমন্ত বিকেলের নরম রোদ খেলা করছে ফাঁকা জমিটাতে। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া। তার মুখোমুখি জং-ধরা লোহার গেটের কাছে তিতলির দাদা পাপান। ঝাঁকড়া চুলো মাথাটা নড়ছে।

হাত-পা নাড়িয়ে খুব বকবক করছে পাপান। মশা তাড়াতে ঠ্যাং ঝাঁকাচ্ছে মাঝেমধ্যেই।

বই-খাতা বুকে চেপে ধরে অকারণে জোরে জোরে হাসছে তানিয়া আঙুল দিয়ে চুলের গুছি পাকাচ্ছে। গা জ্বলে গেল তিতলির। তানিয়াকে ওর ভাল্লাগে না।

মানসদার কোচিঙে তানিয়ার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকেই পাপান বদলে গেছে।

এমনিতেই পাপান বড্ড আনমনা ছেলে। হোমওয়ার্ক ভুলে যায়, বাজারের ফর্দ ভুলে যায়, ইস্কুলের পরীক্ষার তারিখ ভুলে যায়।

মাধ্যমিকের সময় তো ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষার দিন ইতিহাস পড়ে চলে গিয়েছিল— কোয়েশ্চেন হাতে পেয়ে দাঁতকপাটি লেগে কেলেঙ্কারি কাণ্ড।

তার ওপর ইদানীং তানিয়ার খপ্পরে পড়ে পাপান যা হয়ে গেছে তাতে তাকে বোকা বললেও অর্ধেক বলা হয়— কথাটা তিতলি নতুন শিখেছে। মানসদাদের একতলার ঘরে অঙ্ক কষতে কষতে তিতলির কানে কানে প্রিয়াঙ্কাই প্রথমবার কথাটা বলেছিল। চমকে গিয়ে বিষম টিষম খেয়ে একাক্কার কাণ্ড করেছিল তিতলি।

গেট খুলে বেরিয়ে তানিয়ার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে পাপান। কিছু একটা চালিয়াতির কথা বলেছে নির্ঘাত। হাসতে হাসতে পাপানের গায়ে ঢলে পড়ছে তানিয়া। দেখেশুনে আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল তিতলির।

তিতলি পইপই করে পাপানকে বলেছিল— “দাদা, কাল কিন্তু কর্মশিক্ষা পরীক্ষা। আইসক্রিম কাঠির বাড়িটা তুই না বানিয়ে দিলে কিন্তু আমি ফেঁসে যাব। আমাদের অতসী দিদিমণি খুব খিটকেল। নম্বর দেয় না মোটে। তুই সন্ধেবেলা পড়তে যাওয়ার আগে আমাকে হেল্প করে দিস…”

পাপান ঘাড় টাড় নাড়িয়ে বলেছিল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ও তুই ভাবিসনি। আমি করে দোব…”

পাপান সবেতেই হ্যাঁ বলে। পরে ভুলে মেরে দেয়।

“দাঁত ক্যালানে…” নিজের মনে গজগজ করে তিতলি। এই কথাটাও সে নতুন শিখেছে। প্রিয়াঙ্কাই শিখিয়েছে।

বোনের জন্মদিনটাই পাপান শুধু ভোলে না। সাইকেল চালিয়ে কেক নিয়ে আসে মনসাতলা থেকে।

আকাশ কালচে ছোপ ধরতে শুরু করেছে। দূরে দক্ষিণের মাঠ থেকে ছেলেদের চিৎকার চেঁচামিচির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছাদ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে আসে তিতলি। পড়ার টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্কেচপেনগুলোকে জড়ো করে গার্ডার দিয়ে গোছ করে। জলরঙের বাটির বেগনে জলে দু’টো মশা ভাসছে।

একমনে আইসক্রিমের কাঠিগুলো আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতে শুরু করে সে। আঙুল চটচট করে।

আঠার গন্ধ বড্ড ভাল্লাগে তার।

আরও ভাল্লাগে বিকেলের গন্ধ। ফুলের গন্ধ।

বিকেলবেলা ঘরবন্দি থাকা তিতলির ঘোর না-পসন্দ। কিন্তু কয়েক দিন ধরেই বাইরে যাওয়া বারণ— বাবা-মায়ের ধমক, দরজায় অসময়ে খিল। ফিসফিস শব্দ ঘরের আনাচে-কানাচে বাদলা পোকা হয়ে উড়ে বেড়ায়।

শিমুলগাছায় ইদানীং মানুষ মরছে। তিতলি শুনেছে।

প্রতিদিন বিকেলে সে ফুলদিদার বাড়ি যেত। ফুলদিদাকে সবাই ভালোবাসে। সারাবছর তার বাগানে ফুল ফোটে। লাল ইটের দেওয়াল বেয়ে নেমে আসে সবুজ লতার ঝাড়।

দিনপাঁচেক আগের এক বিকেলে তিতলি যেমন যায় তেমনই গিয়েছিল ফুলদিদার বাড়ি। অবাক হয়ে দেখেছিল বাগানের দরজা হাট করে খোলা। মাছি ভ্যানভ্যান করছিল।

সুরকি ফেলা রাস্তাটা দিয়ে কয়েক পা এগোতেই গাঁদা গাছের ঝোপ থেকে বেরিয়ে থাকা এক জোড়া পা দেখতে পেয়েছিল তিতলি।

রক্তাক্ত। নিথর।

চিৎকার করার আগেই কোত্থেকে এসে হাজির হয়েছিল কেষ্টকাকা। ফুলদিদার বাগানের জন্য ভ্যানে চাপিয়ে মাঝেমধ্যে টব এনে দেয় সে।

তিতলির হাত চেপে ধরে হিড়হিড়িয়ে টানতে টানতে গেটের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল কাকা। হাঁইমাঁই করে চেঁচিয়ে এমন সব কথা বলছিল যা বুঝতে পারেনি ঘোরগ্রস্ত তিতলি।

বাবা-মা বলেছে ফুলদিদা অসুস্থ। ক’দিন কারও সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। সে নাকি হাসপাতালে।

তিতলি জানে কথাটা মিথ্যে। সে বড়ো হয়ে গেছে। মৃত্যুর গন্ধ সে এখন চেনে।

আলো কমে এসেছে। ঘরের কোণে, টেবিলের তলায়, খাটের পেছনে হামাগুড়ি দেয় অন্ধকার। সুইচ টিপে আলো জ্বালায় তিতলি। জানলা দিয়ে আর একবার তাকায় গেটের দিকে।

পাপান নেই। গেটের সামনেটা ফাঁকা।

তখনই সে শুনতে পায় –

“তিতলি……..”

ফুলদিদার গলা।

নরম। চেনা। হাসিমাখা।

ঢিপঢিপিয়ে ওঠে তিতলির বুক।

হঠাৎই জমে যায় সে।

তবে পরমুহূর্তেই ভয় কেটে যায় তার।

হতেও পারে ফুলদিদা বেঁচে আছে। বড়োদের কথাই হয়তো ঠিক। হয়তো হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ঠাম্মির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।

ফুলদিদা সন্ধের দিকে প্রায়ই পেছনের বাগানের দরজা দিয়ে তিতলি- পাপানের ঠাম্মির সঙ্গে দেখা করতে আসে।

দুই সখীতে মিলে একতলার টিভির ঘরে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে মুড়ি খায়, সিরিয়াল দেখে। একটু একটু পিএনপিসিও করে।

সিঁড়ির দিকে দৌড় লাগায় তিতলি।

মা রান্নাঘরে। থালাবাটি ধোওয়ার শব্দ কানে আসে। রান্নাঘরের সিঙ্কে চড়বড়িয়ে জল পড়ছে।

পেছনের দরজার খিল নামিয়ে বাগানে বেরিয়ে আসে সে।

মস্ত বড়ো বাগান। বড়ো বড়ো ঝাঁকড়া গাছে ভর্তি। তিতলির দাদু বেঁচে থাকতে দেখভাল করতেন। এখন অযত্নেই পড়ে থাকে। বাগানটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে বাসা বেঁধে আছে অন্ধকার। শীত করে তিতলির। বড্ড ঠান্ডা।

উত্তরের অর্জুন গাছখানার দিক থেকে ভেসে আসে একটা প্যাঁচার আর্তচিৎকার। পাতার ভিতর খানিকটা ঝটপটানি। তারপর আবার সব স্থির। সাপে ধরেছে বোধহয়— শীতঘুমে যাওয়ার আগে শেষ ভোজ।

পেছনের জং-ধরা গেটটা খোলা— পায়ে চলা একটা মাটির রাস্তা চলে গেছে দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে। তিতলি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের পোড়ো জমিটা ভালো করে দেখল। কই? কেউ নেই তো! সে কি ভুল শুনেছে?

“তিতলি… এদিকে…”

গলাটা ভেসে আসে পাঁচিলের বাইরের নয়নতারার ঝোপের দিক থেকে। ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ ঠাহর করার চেষ্টা করে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় তিতলি।

কিছু একটা নড়ে ওঠে।

সন্ধে শুরুর নীলচে আলোয় প্রথমে মনে হয় মানুষ।

নগ্ন। ফ্যাকাশে। কুঁজো।

তারপর সেটা সোজা হয়। সোজা হতেই থাকে— অস্বাভাবিক লম্বা। দাঁড়িয়ে উঠতে হাতজোড়া তার মাটিতে ঠেকেছে।

দু’হাত মাটিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে সে এগিয়ে আসে তিতলির দিকে। লম্বাটে আঙুল, নখগুলো কালো-কালো আর ফাটা।

হাড়ের জয়েন্টগুলো অদ্ভুতভাবে ভাঁজ হতে থাকে। গায়ের চামড়া সেদ্ধ মাংসের মতো ফ্যাটফ্যাটে সাদা।

তিতলির পায়ে যেন শিকড় গজিয়েছে। মাটিতে সেঁটে গেছে সে।

হাঁ করে সেই প্রাণী।

লকলকিয়ে বেরিয়ে আসে জিভ।

একটা নয়। অনেকগুলো।

বিশাল মোটা থলথলে একটা প্রকাণ্ড সাপের মতো জিভের গায়ে শাখাপ্রশাখার মতো অসংখ্য ছোটো ছোটো জিভ গজিয়েছে।

তারা একে অপরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে কাঁপছে, ফিসফিসাচ্ছে…

“তিতলি…” নড়ে ওঠে একটা জিভ…

ফুলদিদার গলা।

“তিতলি… আয়…”

অন্য একটা শাখা-জিভ তিরতিরিয়ে কাঁপতে থাকে। এবার অন্য গলা। কমবয়সি পুরুষ। তার দাদার মতোন।

জিনিসটা ধেয়ে আসে তার দিকে।

সম্বিৎ ফিরে পেতেই দৌড় লাগায় তিতলি।

ঝাঁপ মেরে তিতলির ঘাড়ে এসে পড়ে সেটা।

দড়াম করে আছড়ে পড়ে সে। মাটি কেঁপে ওঠে। ঘাড়ের কাছে ভেজা, ঠান্ডা নিশ্বাস।

কেউ তার বিনুনি ধরে টান দিয়েছে— পড়পড় করে উপড়ে নেয় চুলের গোড়া। ছিঁড়ে যায় মাথার চামড়া সমেত।

প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠতে গিয়েও সুযোগ পায় না তিতলি। তার হাঁ মুখের মধ্যে প্রবেশ করেছে প্রকাণ্ড সাপের মতো হিলহিলে এক অস্তিত্ব। হ্যাঁচকা টানে নতুন একটা জিভ ছিঁড়ে নিয়ে বেরিয়ে আসে সে।

চিৎকারটা দমে যায়।

মটমট করে হাড় ভাঙার শব্দ।

রক্তে ভেসে যায় মাটি।

যন্ত্রণায় চেতনা হারানোর আগে তিতলি বুঝতে পারে কিছু একটা চেপে ধরেছে তার পায়ের গোছ।

ঠান্ডা। ভিজে। শক্ত।

সেটা পেছন থেকে হিড়হিড়িয়ে টানতে থাকে তাকে। তিতলির মুখে মাটি ঢুকে যায়, উপড়ে যায় নখ, ছিঁড়ে যায় চামড়া

নয়নতারার ঝোপের অন্ধকারে ছোট্ট শরীরটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে দোতলার ঘরে থেকে ভেসে আসে তিতলির দাদার গলা, “বোন? কই রে?”

পাপান ফিরে এসেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *