উঁকি
জিভ

আমি পিকু

।। আমি পিকু ।

চোরকাঁটার ঝোপে বডিটা পড়ে আছে। মাছি ভ্যানভ্যান করছে। অবশেষে পাপানকে খুঁজে পাওয়া গেছে।

দু’দিন ধরে সারা শহর চেলে ফেলেও যার টিকির ডগাটিও মেলেনি, তাকে শেষপর্যন্ত পাওয়া গেছে। মুখটা হাঁ; কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে।

ডান হাতটা বিচ্ছিরিভাবে মুচড়ে চলে গেছে পিঠের পেছনে। পেট আর বুকের মাংস খোবলানো। বেগুনি জার্সিটা ছিঁড়ে ফালাফালা- রক্তে ভিজে কালো। ওটা আমিই দিয়েছিলাম পাপানের জন্মদিনে— গতবছর।

বিস্ফারিত চোখ দু’টো ঘোলাটে, স্থির। ও দু’টোর সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। কে একটা কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “বিশ্বাস কর ভাই, সত্যি বলছি— আমাকে ডাকছিল।”

মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল। কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। তেন্ডুয়া শক্ত হাতে আমার কবজি চেপে ধরে বলল, “সামলে।”

পাপানের বাবা হাউমাউ করে কাঁদছে। ওর কাকা তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। দু-চারজন হেইহেই করতে পাশের গাবগাছটার ডালপালা এলোমেলো করে দিয়ে কী একটা বিশাল ডানা মেলে উড়ে গেল।

শকুন বোধহয়। দু’শো গজ দূরে দক্ষিণের জঙ্গলটা অন্ধকার পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। সন্ধে নামছে। হেমন্তের শুকনো বাতাসে মানুষ পচা গন্ধ আনতাবড়ি ছড়াচ্ছে। আমার মাথাটা ভারী হয়ে আসছে।

খানিক দূরে বড়োবাবু জিপের সামনেটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নাকে চাপা সাদা রুমাল।

রুমালটা সরিয়ে হাঁক পাড়লেন, “বডিটা তোল রে এবার। অন্ধকার হয়ে এল। আমার হয়েছে জ্বালা। যত ভুলভাল মালগুলোকে নিয়ে কাজ…” পুলিশের জিপের পাশে একটা রিকশাভ্যান দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওতে করে পাপানকে নিয়ে যাওয়া হবে।

হঠাৎ কৌতূহলী মানুষের ভিড় ঠেলে বেড়িয়ে এসে পাপান আমার মুখোমুখি দাড়াল। চোখদু’টো স্থির। কষের কালচে রক্তের দাগটা স্পষ্ট। একগাল হেসে বলল, “ভাই, বিশ্বাস করলিনি?”

পচা গন্ধটা হঠাৎই বড্ড বেড়ে গেল। চারদিক ঝাপসা হয়ে এল। শরীর অবশ। অন্ধকারে ডুব মারলাম।

চোখ খুলতেই জলের ঝাপটা এসে লাগল। হাবুচুবু খেয়ে হাঁপিয়ে উঠতেই আবিরের গলা কানে এল, “থাক, আর দিউনি। জ্ঞান ফিরেছে।”

খানিকক্ষণ কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। মাথার ওপর খোলা আকাশ। তারা ফুটেছে অনেক। তেন্ডুয়া আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, “একটু কষ্ট করে উঠে পড় পিকু। এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না।

আমার তখনও সব ধোঁয়া ধোঁয়া ঠেকছে। চারদিকে ভালো করে তাকিয়ে নিয়ে দেখলাম দক্ষিণের মাঠের বুড়ো বটের নীচে ভাঙা বেদিতে শুয়ে আছি। সব মনে পড়ে গেল। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বললাম, “পাপান?” আবির বলল, “নিয়ে গ্যাছে। এক ঘণ্টা হতে চলল। তুই তো ভিরমি খেয়ে পড়েছিলি। লোকজন সব পুলিশের গাড়ির পোঁদে পোঁদে কেটে পড়েছে।”

তেন্ডুয়া ধমকে উঠল, “আহ আবির! এই ক’দিনে ও যা ভেঙে পড়েছিল— ওই হালতে বডি দেখার পর মাথা ঘুরে যাওয়াটা নর্মাল ভাই। উঠতে পারবি তো রে?”

আমি ক্লান্তভাবে ঘাড় কাত করে জানালাম উঠতে পারব।

বিশু এতক্ষণে মুখ খুলল, “তেন্ডুয়া, সাতটা বাজতে চলল রে! এক্ষুনি সাইরেন দেবে।”

বিশুর গলা শুকনো। হাতে জলের বোতল। বুঝলাম বিশুই আমার মুখে জলের ঝাপটা মারছিল।

কয়েক হাত দূরেই তেন্ডুয়ার সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে রাখা— বুলেটটা ক’দিন বিগড়োতে একটা পুরোনো ঢ্যারট্যারে সাইকেল কোত্থেকে জোগাড় করেছে।

পাশেই ঘাসের ওপর আবিরেরটা শোয়ানো। শরীর চলছে না। পা কাঁপছে। আবিরের কাঁধে ভর দিয়ে এগোলাম। দুর্বল গলায় ডাকলাম, “তেন্ডুয়া…”

সাইকেলের স্ট্যান্ডটা খটাং করে এক লাথিতে তুলে তেন্ডুয়া আমার দিকে তাকাল।

“পাপান সত্যি বলছিল তেন্ডুয়া। সত্যিই ওকে ডেকেছিল…”

তেন্ডুয়া নিরুত্তর। বিশু চাপা গলায় বলল, “ভাই, ছাড় না। বাড়ি চ’।”

মাঠজুড়ে নীলচে অন্ধকার নেমেছে। অন্ধকারের কালো চাদরে মোড়া দক্ষিণের জঙ্গলকে বড়ো রহস্যময় দেখাচ্ছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। গা ছমছম করে।

শুকনো বাতাসে ঠোঁটজোড়া ফেটে জ্বালাজ্বালা করছে। ঠান্ডা একটু পড়তে শুরু করলেই বিশু সবসময় পকেটে বোরোলিনের টিউব রাখে। বিশুকে বললাম, “বোরোলিনটা দে তো। ঠোঁটটা চড়চড় করছে।”

বিশু পকেট হাতড়ে জিভ কেটে বলল, “ভুলে গেছি…”

সিটে বসে তেন্ডুয়া প্যাডেলে চাপ দিল। ক্যারিয়ারে বিশু। আমি উঠলাম আবিরের সাইকেলের সামনের রডে। ও আবার ক্যারিয়ারে বসিয়ে টানতে পারে না। ঝিঁঝি ডাকছে। দক্ষিণের জঙ্গলের দিক থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এল। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলেও অনেক্ষণ পর একটু আরাম বোধ হল। মাথাটা এতক্ষণে খানিকটা হালকা লাগছে।

গাছপালাগুলো শিরশিরানি শব্দ করছে। সামান্য এগিয়েই খালের ওপর ইটের পোল। জলের কলকল শব্দ আসছে। বাড়িতে মা নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে। ভাল্লাগছে না কিছু। একটু ধোঁয়া টানলে ভালো হত। আবিরকে জিজ্ঞেস করলাম, “বিড়ি-সিগারেট কিছু আছে?”

আবির বলল, “সিগারেট নেই। বিড়ি আছে।”

বললাম, “তাহলে একটু দাঁড়া না।”

“দেরি হয়ে যাবে ভাই। সাইরেন দিলে সব ঘরে ঢুকে যাবে। মা খুব ক্যা…”

“পাঁচ মিনিটও লাগবে না।”

একটু ইতস্তত করেও পোলটা পেরিয়েই আবির ব্রেক মারল। তেন্ডুয়াদের সাইকেলটা আমাদের খানিক আগে ছিল।

বিশু পেছন ফিরে আমাদের দাঁড়াতে দেখে তেন্ডুয়াকে কিছু একটা বলতে ওরাও দাঁড়িয়ে গেল। ক্যারিয়ার থেকে এক লাফে নেমে বিশু আমাদের দিকে দৌড়ে এল, “শালা তোরা এখন বিড়ি ধরালি! তেন্ডুয়া হেবি খচে গ্যাছে। তোদের না কোনো আক্কেল নেই। এই, আমাকেও একটা দে…”

তেন্ডুয়াও সাইকেলটা পিছিয়ে নিয়ে এসে আমাদের পাশে দাঁড়াল। বিড়ি দিলাম। নিল না।

হাত দু’টো বুকের ওপর জড়ো করে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল পেছনে ফেলে আসা দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে। বিড়িতে দু’টো লম্বা টান দিতে ঘোর লাগা ভাবটা কাটল।

আবিরের কাকা তার পুরোনো একটা ঘড়ি ক’দিন হল মালটাকে দিয়েছে। সেই থেকে ঘন ঘন ঘড়ি দেখে আবির। ডিজিটাল ঘড়ি। আলো জ্বলে। ট্যাঁ ট্যাঁ করে অ্যালার্মও বাজে। তাও শালা সবসময় দেরি করে আসে।

কবজি উলটে ঘড়ি দেখে আবির বলল, “এই এই! ছ’টা পঞ্চাশ। আর মোটে দশ মিনিট। সাইরেন বেজে গেলে বাড়িতে পিঠের চামড়া গুটিয়ে নেবে।”

বিড়িটা ফেলে সবে বলতে যাব “হ্যাঁ, চল”, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ার সঙ্গে দক্ষিণের জঙ্গল থেকে এক আর্ত চিৎকার ভেসে এল।

“বাঁচাও-ও- ও— ও — ও! মা-আ-আ-আ- গো- ও-ও –”

সে চিৎকারের তীব্রতায় আকাশ বাতাস ফালাফালা হয়ে গেল। আশেপাশের গাছগুলোর ঝুপসি অন্ধকারে ডানা ঝাপটে উঠল অগুনতি পাখি।

আমার হাত থেকে বিড়িটা আপনা আপনিই মাটিতে পড়ে গেল। সবাই হুড়মুড় করে সাইকেলে গিয়ে উঠল। আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা মেরে রডে বসিয়ে প্যাডেলে প্রাণপণ চাপ মারল আবির।

আমি বললাম, “শু-শুনলি? আবির, শুনতে পেলি?”

দাঁতে দাঁত চেপে আবির বলল, “না, কিচ্ছু শুনিনি।”

আমি চেঁচিয়ে বললাম, “ওই বিশু, শুনলি? তেন্ডুয়া?”

স্পষ্ট বুঝতে পারলাম তেন্ডুয়ার ক্যারিয়ারে বসে বিশু ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। তেন্ডুয়া এখনও নিরুত্তর।

কানের পাশ দিয়ে সোঁ সোঁ করে হাওয়া কাটছে। মাথার ওপর পাখিদের উদভ্রান্ত উড়োউড়ি।

চিৎকারটা আবার শোনা গেল, “আমাকে ফেলে যাসনি রে-এ-এ-এ-এ…”

আমি তেন্ডুয়ার সাইকেলের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, “হ্যাঁ গো, তোমরা কি কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছ না? পাপান চ্যাঁচাচ্ছে গো…”

প্রাণপণে প্যাডেল করতে করতেই তেন্ডুয়া গর্জে উঠল, “চোপ শালা, একদম চুপ! ভ্যানে করে পাপানের বডি নিয়ে গ্যাছে… তোর চোখের সামনে… বাজে বকা বন্ধ কর…”

“আবির? শুনতে পাচ্ছিস না? পাপানের গলা। দক্ষিণের জঙ্গল থেকে…”

আমার কানের পেছনে আবিরের কাঁপা কাঁপা গলা শোনা গেল, “না। কিচ্ছু শুনিনি, কিচ্ছু না।”

ততক্ষণে সেই চিৎকার থেমে গেছে। অনেক দূর থেকে হালকা হাওয়ায় উড়ে আসছে খলখলে হাসি। আমি জানি এ হাসি ওরাও শুনতে পাচ্ছে— সাইকেলের স্পিড অনেক বেড়ে গ্যাছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *