উঁকি
জিভ

অর্ক বাড়ি আছ?

।। অর্ক বাড়ি আছ? ।।

কালো ব্যাকেলাইটের রিসিভারটা কানে ধরে ছিলেন অর্ক রায়।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সব আন্ডার কন্ট্রোল স্যার।”

গম্ভীর কণ্ঠ সামান্য মার্জিত। পরিমিত ডিপ্লোমেসি। দু’আঙুলে নাইটগাউনের সিল্ক ল্যাপেলটা মসৃণ করতে করতে জানলার কাচের দিকে তাকালেন।

উঁচু খিলানওয়ালা জানালার বাইরে দেবদারু আর নিমগাছগুলো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলো তাদের ছায়াগুলোকে মাটিতে পেরেক মেরে আটকে রেখেছে। নড়াচড়ার কোনো অনুমতি নেই।

“হ্যাঁ স্যার, ছোটো শহরের যত হুজুগ। এই সব জায়গা তো আপনি জানেনই…”

ওপাশে কলকাতা। শিমুলগাছার সঙ্গে তার দূরত্ব শুধু শব্দের না— পরিবেশের, সংস্কৃতির। কলকাতা বরাবরই ছোটো শহরের প্রতি উদাসীন।

“না স্যার, না। আপনাকে কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না।”

অর্কর স্বরে আমলাতন্ত্রের অভ্যাসগত ক্লান্তি।

“আমি আপনাকে অ্যাস্যুরেন্স দিচ্ছি স্যার।”

গলায় পালিশ করা ভদ্রতা।

“না না, প্যাটার্নের কথাটা বাইরে আসবে না। আমার তো মনে হয় কোনো লোকাল পারভার্ট। জন্তু জানোয়ারও হতে পারে। হ্যাঁ স্যার, থানা আমার কন্ট্রোলেই আছে। অফিসারটা একটু ওস্তাদি করছিল, এখন ধাতানি খেয়ে চুপসে গেছে। হ্যাঁ, গ্রামগঞ্জে কাজ করে লাইম লাইটে আসার সুযোগ পায় না তো খুব একটা। ওকে স্যার, ওকে। আপনি চিন্তা করবেন না। গুড নাইট স্যার।”

রিসিভারটা ক্রেডলে নামিয়ে রেখে হাইবল গ্লাসে আরেক ইঞ্চি স্কচ ঢাললেন অর্ক। বরফের টুংটাং শব্দটা রাতের নিস্তব্ধতায় অস্বস্তিকরভাবে পরিষ্কার শোনাল।

ধারালো, অথচ অদ্ভুত স্বস্তিদায়ক। শিমুলগাছার সার্কিট হাউসটা তাঁর বেশ পছন্দ হয়েছে। এই বিশাল ঔপনিবেশিক বাংলোটা যেন এখনও কর্তৃত্বের চিহ্ন বহন করছে। বয়সের ছাপে হলদে হয়ে যাওয়া উঁচু ছাদ, না-নড়া পাখা, সাম্রাজ্যের ভূতছাপ লাগা ভারী কাঠের আসবাব, মোটা দেওয়াল, গভীর বারান্দা, আর অখণ্ড এক নীরবতা— পারমিশন ছাড়া চৌকাঠ পেরোনোর সাধ্যি নেই কারও।

এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন অর্ক।

তাঁর হয়েছে যত জ্বালা। কলকাতায় পরপর পলিটিক্যাল র‍্যালি আছে, আইপিএল জেতার মিছিল আছে— হাই প্রোফাইল ব্যস্ততা। বড়োকর্তারা দিনরাত দৌড়দৌড়ি করছেন নেতা-মন্ত্রীদের পেছনে। তার মধ্যে এখন যদি অজ পাড়া গাঁয়ে ভ্যানওয়ালা বা বখাটে ছেলে খুনের মোকাবিলা করতে ফোর্স চেয়ে পাঠান তাহলে তাঁর পক্ষে চাকরি টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়।

হ্যাঁ, তিনিও বুঝতে পারছেন যে শিমুলগাছায় পরপর ঘটতে থাকা খুনগুলো নেহাতই মামুলি ঘটনা না। একটা পরিষ্কার প্যাটার্ন আছে— কোনো বিশেষ মোটিভও আছে।

কিন্তু ওপর থেকে কড়া নির্দেশ— কলকাতাকে এখন ঘাঁটানো যাবে না। অর্ক ভালো ভাবেই জানেন তাঁকে এখানে পাঠানোর উদ্দেশ্য খুনের কিনারা করা নয়, বরং বিষয়টাকে ধামাচাপা দিয়ে সাইড করে রাখা।

শীতটাও পড়েছে জম্পেশ।

শীতকাল অর্কর বেশ ভাল্লাগে। এই সময়টা কখনও ফাঁক পেলেই চলে যান দার্জিলিং। সন্ধের পর অবজার্ভেটরি হিলের রাস্তাটা ফাঁকা হয়ে এলে হেঁটে বেড়ান তিনি। হার্মিটেজ রোড ধরে নেমে অনেক নীচে লেবঙের দিকে নেমে যান হাঁটতে হাঁটতে। নিস্তব্ধতা তাঁর সঙ্গী হয়।

তবে এবার কপালের ফেরে তাঁকে আটকা পড়তে হয়েছে শিমুলগাছায়। খানিকক্ষণ আগে থানায় ক’টা ফর্মালিটি সেরে সার্কিট হাউজে ফিরেছেন তিনি।

বড়োবাবু জিপ দিতে চাইছিলেন— নেননি।

সেন্ট্রি দিচ্ছিলেন— অর্ক রায় ধমক দিয়েছেন।

পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। রাতের প্রকৃতিতে মিশে মিশে থাকার সুযোগ তো কলকাতায় হয় না।

কুয়াশা নেমে এসেছিল চাদরের মতো। শিমুলগাছা সার্কিট হাউস আর তার চারপাশের বিশাল এলাকা নিঃশব্দে চেপে ধরেছিল তাঁকে। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি গ্রাস করছিল অর্ককে।

তাঁর মনে হচ্ছিল একটু তফাতে কেউ যেন তাঁকে অনুসরণ করছে। একটা বোঁটকা চামড়া পচা গন্ধে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে।

বুকের মধ্যে কাঁপুনি ধরেছিল তাঁর। এমনটা আগে কখনও হয়নি। শেষের দিকটা খুব দ্রুত পা চালিয়েছিল অর্ক।

কোনোমতে দরজার চাবি খুলেছিলেন তিনি। লোহা, প্লাস্টার আর কাঠের তৈরি নিজের দুর্গে দাঁড়িয়ে অবশ্য অর্ক নিজেকে নিরাপদই মনে করেছিলেন।

আধুনিক তালা। মোটা দরজা। উঁচু ছাদ। সব কিছু পারফেক্ট।

কিন্তু তবুও শিমুলগাছায় কিছু একটা গন্ডগোল তো আছেই।

এই ভাবনাটাকে প্রথম থেকেই প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন না অর্ক। মস্তিষ্কে জায়গা করার অনুমোদন দিচ্ছিলেন না তিনি। ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিলেন যুক্তি দিয়ে।

আজ হঠাৎ নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা টের পাচ্ছিল অর্ক এই টেলিফোন কলের পর বহুদিন চেপে রাখা প্রশ্নটা আবার মাথা তুলল, “আমি কি সত্যিই ক্ষমতাবান, নাকি শুধুই ক্ষমতার প্রতীক?”

কলকাতা তাঁকে পাঠিয়েছে এই ছোটো শহরটার ঘ্যানঘ্যানানি থামাতে। অনবরত অনুরোধ, চিঠি, ফোন।

তবু অলিখিত আদেশ ছিল স্পষ্ট— এখন কিছু করবে না।

আসল খেলা তো চলছে ইডেনে। শিমুলগাছা? স্রেফ ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ।

ঠিক তখনই আকাশ ফেটে পড়ল। দড়াম শব্দে চমকে উঠলেন অর্ক। উঁচু খিলানওয়ালা ছাদ উঠল কেঁপে। ছাদ থেকে ঝরে পড়ল ধুলো।

ড্রয়িংরুমের চালের প্রচণ্ড ভারী কিছু আছড়ে পড়েছে।

শুধু আছড়ে পড়েই সে স্থির থাকেনি। খচমচ শব্দ করে এক প্ৰান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলেছে। স্থির হয়ে গেলেন অর্ক।

লাফিয়ে উঠলেন তিনি। সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা পিস্তল চলে এল তাঁর হাতে।

ঠিক তখনই কিছু একটা ছাদ থেকে লাফিয়ে নামল সামনের লনে — ধপাস!

তারপর বাগানের ঘাসের ওপর দৌড়নোর শব্দ।

পিস্তলের সেফটি অফ করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে জানলার কাচ দিয়ে আড়াআড়ি তাকালেন তিনি। কিছু বোঝা গেল না।

কিচ্ছু নেই।

লন ফাঁকা। ঝোপঝাড় অন্ধকার।

এই বড়োবাবু আর তার সাগরেদরা কলকাঠি নাড়ছে না তো? মাথা গরম হয়ে গেল অর্কর। দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন তিনি।

দরজার সামনের আলোটা অন করলেন তিনি।

বাঁ হাতে দরজাটা আনলক করে বেরিয়ে এলেন। ডান হাতে উদ্যত নাইন এমএম পিস্তল।

কিছুটা আলোকিত হল লন। তবে ঠিক আলোর বৃত্তের বাইরেই অন্ধকারের পাঁচিল। সেখানে খানিকক্ষণ ঠাহর হল না কিছুই।

তারপর তিনি তাকে দেখলেন।

প্রথমে একজোড়া চোখ— জ্বলন্ত চোখ। অন্ধকারে ভেতর জ্বলছে। মাটি থেকে খানিকটাই ওপর। স্থির। তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। শরীর তার অন্ধকারে লনের ওপারে গাছের ছায়ায়।

তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই জিনিসটা হুড়মুড়িয়ে ছুটে এল তাঁর দিকেই।

প্রকাণ্ড একটা লোমহীন ভাল্লুকের মতো শরীর।

গুলি ছুড়লেন তিনি।

ক্র্যাক! ক্র্যাক! ক্র্যাক!

থামল না সে। গতি কমল কিছুটা— যেন তার শরীরটা বুঝতে সময় নিচ্ছে। কিন্তু সে থামল না। অর্ক রায় স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন একটা বিশালাকার জিভ বেরিয়ে এসেছে তার মুখগহ্বর থেকে

দৌড়তে দৌড়তে বিভিন্ন কণ্ঠে উচ্চারণ করছে তাঁর নাম।

“অর্ক… অর্ক… অৰ্ক…”

মাথা ঘেঁটে গেলেও ইন্দ্রিয় সচল ছিল অর্কর। ঠিক সময়ে দরজা বন্ধ করল সে।

দড়াম করে ধাক্কা লাগল সঙ্গে সঙ্গে। দরজা কাঁপছে। বার্মাটিকের ভারী দেরাজটা গায়ের জোরে ঠেলে ঠেলে দরজার সামনে লাগিয়ে দিলেন তিনি।

থানা খুব দূরে নয়। গুলির শব্দ তারা শুনেছে।

দমাদ্দম ধাক্কা দরজায়। মড়মড় শব্দে ফাটছে কাঠ।

বহু বছরের অব্যবহৃত ফায়ার প্লেস থেকে অর্ক জং-ধরা লোহার পোকারটা তুলে নিলেন।

তিনি নিশ্চিত যে গুলি কাজ করবে না— এটা তাও ফাইটিং চান্স দেবে।

ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতা। জিউজুতসু ট্রেনিং শরীর এখনও ভোলেনি। শেষ ভরসা।

হঠাৎ থেমে গেল আঘাত। ঘাসের ওপর খচমচিয়ে ছুটে পালাল ভারী কিছু।

জিপের ইঞ্জিনের শব্দ অর্ক পেয়েছেন। ভারী বুট। চিৎকার। জানালার কাচে টর্চের আলো।

কাঁধের জোর লাগিয়ে টেবিল সরিয়ে দিলেন তিনি। মুহূর্তে খুলে গেল দরজা।

হুড়মুড়িয়ে ঢুকলেন বড়োবাবু, পেছনে এসআই মণ্ডল।

অর্ক রায়ের সুঠাম ঋজু দেহটা হাঁপাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হল বড়োবাবুর।

বিস্ময়। উপলব্ধি। সম্মতি।

কিছু বলার দরকার হল না।

এখন শুধু বড়োবাবু না, তাঁরা দু’জনেই জানেন পরের ধাপটা।

অর্ক রায় জানেন কলকাতাকে কী কী মিথ্যে বলতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *