।। গরিব মানুষের যা জিভ তাইই টুটি ।।
রাজুর গুমটির সামনে দাঁড়িয়ে খালি চায়ের ভাঁড়টা বালতিতে ফেলে হাত ঝাড়ল তেন্ডুয়া। রাজুকে বলল, “একটা সিল্কাট দাও।”
বিকেলের আলো মরে এসেছে। নীলচে সন্ধে নামব নামব করছে। শিমুলগাছার মাটি খুব উর্বর। আবহাওয়াও ভারী সতেজ। গাছপালার অভাব নেই এখানে। প্রতিটা পাড়াই ঘন গাছগাছালিতে ঘেরা।
গাছে-গাছে ঘরে ফেরা পাখিরা তাদের ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে। কিচিমিচিতে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। রাজুর গুমটিটাও একটা বিশাল প্রাচীন অশ্বত্থের ছায়ায়।
থুক করে মুখের দোক্তাটা মাটিতে রাখা টিনের ড্রামে ফেলে রাজু খানিক্ষণ এদিক ওদিক হাতড়াল। তারপর অন্যমনস্কভাবে বলল, “সিল্কাট নেই। গোল্ড ফেলেক আছে।”
“তাই-ই দাও।”
শরীরটাকে নিচু করে নারকেল দড়িতে বাঁধা প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার স্টিকার মারা লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরাল তেন্ডুয়া। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছেড়ে রাজুকে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের ছেলেগুলো কেউ আসেনি? আবির, পিকু?”
রাজু হাই তুলে বলল, “না না, আজকাল বাজার খারাপ। সকালের দিকে তাও ঠিকঠাক চলছে। দোকানপাট যেতে যেতে লোকজন চা-ফা খাচ্ছে। বিড়ি সিগারেট টুকটাক কিনছে। এবেলাটা পুরো মন্দা যাচ্ছে। দুপুরে লোক এমনিতেই হয় না। বিকেলে ওই দু-চারজন। শালা সন্ধেটাই ছিল আসল বাজার। এখন তো অন্ধকার নামতে না নামতেই দোকান গুটুতে হচ্ছে। কোথায় সেই হারামজাদা খুনিটা হানা দিয়ে টুটি-ফুটি ছিঁড়ে নেবে…”
তেন্ডুয়া বলল, “জিভ …”
“অ্যাঁ?”
“জিভ ছিঁড়ে নিচ্ছে। টুটি না।”
“ওই হল শালা। গরিব মানুষের যা জিভ তাইই টুটি। আমি ফেঁসে গেলে ছেলেপুলেগুলো না খেতে পেয়ে হাটে-বাজারে ভিক্ষে করবে। বউটা এখনও জোয়ান— আমার চেয়ে পঁচিশ বছরের ছোটো। অনেকের নজর আছে। ও আমি হতে দিচ্ছিনে…”
তেন্ডুয়া ভুরু কুঁচকে বলল, “আচ্ছা রাজুদা? তোমার জন্ম তো শিমুলগাছাতেই?”
“শুধু আমি কেন? আমার বাপ-ঠাকুরদা সবারই। ঠাকুরদা চাষবাস করত। আমার বাপ প্রথম জীবনে ছিল সায়েবদের রেলের ফ্যাক্টিরির মজুর। পরে সে কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে বাজারে আনাজ বিক্কিরি ধরল।”
“তোমার বয়স কত হল?”
“আমার জন্ম উনিশশো চুয়ান্নতে। এবার হিসেব লাগাও…”
শিমুলগাছায় রাজুদের সামাজিক অবস্থানের মানুষদের সাধারণত নিজের জন্মসাল মনে রাখতে দেখে কেষ্ট অভ্যস্ত না। একটু অবাক হল সে। মনে মনে হিসেব করে তেন্ডুয়া বলল, “আটান্ন।”
“হ্যাঁ, আমি তো এইট অবদি পড়িচি। তোমাদের এই নেতাজি বিদ্যাপীঠেই। তবে ওসব ভাল্লাগত না। বাপের চ্যাচানিতে আর মাস্টারের বেতের ভয়ে যেতুম। বাপটা এস্ট্রোক করে বিছানায় শুয়ে যেতে ধান্দায় লেগে গেছি। আর যাইনি।”
তেন্ডুয়া একটু ঘন হয়ে এল।
“আচ্ছা রাজুদা? এই যে মানুষ উধাও হচ্ছে, লাশ পাওয়া যাচ্ছে… আগে কখনও এমন ঘটেছে শিমুলগাছায়?”
“মার্ডার ফার্ডার তো এখেনে বরাবরই হয়। নতুন কী? জায়গা তো ভালো না। মেলা হারামি লোকের বাস।”
“না, আমি তা বলছি না। এবারে যেমন হচ্ছে তেমনটা হয়েছে কখনও? পরপর লোক উবে যাচ্ছে। খোবলানো লাশ পাওয়া যাচ্ছে। মুখের ভেতর জিভটা নেই। বোঝাই যাচ্ছে খুনগুলো খাপছাড়া না। সম্পর্ক তো আছেই…”
রাজুর মুখ ফ্যাকাশে। হাতের ছাঁকনিটা নামিয়ে রেখে সে তেন্ডুয়ার মুখের দিকে চেয়ে বলল, “জিভ নেই?”
তেন্ডুয়া বিরক্ত হল।
“দেড়মাস ধরে শিমুলগাছা জুড়ে পাগলামি চলছে। বাচ্চারাও জানে সব। এমন ভান করছ যেন তুমি কিচ্ছু শোনোনি। আবার চায়ের দোকান চালাও। তোমার দোকানে তো রাজ্যের লোক বসে গজালি করে।”
রাজু কণ্ঠায় একটা চিমটি কেটে বলল, “মাইরি বলচি, মাক্কালীর দিব্যি আমি লোকের কতায় অত কান দিই না। আমাকে তুমি কখনও বকবক করতে দেকেচ? আমি মাল দিই আর টাকা গুনে নিই। মার্ডার হচ্ছে কানে আসছে ঠিক কতা কিন্তু জিভের কেসটা অত মন দিয়ে শুনিনি— মাইরি বলচি। কী বলচ বলো? সবারই কি জিভ কেটে নিচ্চে?”
তেন্ডুয়া অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি এটা মানতে পারছি না রাজুদা। জানি না তুমি কেন ন্যাকা সাজছ। তবে লাশের মুখ থেকে খুনি যে জিভ ছিঁড়ে নিচ্ছে এটা তুমি জানো না বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আর একটু আগেই তো বললাম জিভ ছিঁড়ে নেওয়ার কথা।”
“বলেছ বুঝি? গরিব মানুষ… কখন যে কে কী বলে সব কি মাথায় থাকে? অত ধরিসনি বাপ… তবে এখন মাথায় আসছে… ঝাপসা ঝাপসা… বয়স হচ্ছে তো। বয়স হচ্ছে… সব মনে থাকে না…”
কদমছাঁট সাদা চুলে বিলি কাটতে কাটতে বিড়বিড় করতে থাকে রাজু।
কৌতূহলী তেন্ডুয়া চোখ কুঁচকে রাজুকে বলল, “কী মনে থাকে না?”
তেন্ডুয়া দিকে তাকাল রাজু। তার দৃষ্টিতে বিহ্বলতা।
“আগেও হয়েছিল। এই কেস আগেও হয়েছিল। এখানেই। শিমুলগাছায়। আগেও হয়েছিল…”
“কবে? কত সালে?”
“তা তো আমার মনে নেই। তবে অনেকদিন আগে। আমি তখন জোয়ান ছেলে। মনসাতলা স্টেশনে সকালে ভ্যান টানতুম। বিকেলে মোট বইতুম।”
উত্তেজিত তেন্ডুয়া বলে, “এ ব্যাপারে কে বলতে পারবে জানো? কিছু তো বলো…
“দ্যাকো, সেবারে এই ব্যাপারটা নিয়ে থানার বড়োবাবু খুব হুড়োহুড়ি করেছিলেন। মানে এখন যিনি বড়োবাবু, তাঁর বাবা। মজবুত লোক ছিলেন খুব। তাঁর দাপটে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত।
তো একদিন জিপগাড়ি সমেত খালের জলে পড়ে ফস করে মরে গেলেন। এই বড়োবাবু তো তার পরেই চাগরিটা পেল— বাপের চাগরি।”
মুখ বেঁকিয়ে হাসে রাজু।
“আবে রাজুদা!” বিরক্ত হয় তেন্ডুয়া।
“বলছি সেবার মার্ডারগুলো যে হচ্ছিল তার ব্যাপারে কে ঠিকঠাক খবর দিতে পারবে জানো? মানে যে বেঁচে আছে…”
ভুরু কুঁচকে রাজু বলে, “তা আছে বটে একটা লোক। সেবারে বড়োবাবুর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত। আগামীর সুজ্জো কাগজের আপিসে কাজ করত। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, অবিনাশবাবু। অবিনাশ সমাদ্দার। খুব শিক্ষিত লোক। এখনও বেঁচে আছেন। গেল হপ্তাতেই মনসাতলায় মাল আনতে গিয়ে দেখলুম রিস্কা চড়ে যাচ্ছেন। তবে একদম বুড়োহাবড়া হাল- চাকর-বাকর কেউ একটা চেপে ধরে বসে আছে দেখলাম।
আমার সাইকেলটাও বুঝলে সেই বছরই কেনা। মনে আছে। সেবার মনসাতলায় সানি কোম্পানি সাইকেলের কারখানা খুলল। আমারও নগদ কিছু জমেছিল। কিনে নিয়ে এলুম। একদম নতুন মডেল। নিজের হাতে ফিট করে দিল হেডমিস্তিরি। সেই কবেকার জিনিস। এখনও কী মজবুত!”
বিড়বিড় করতে থাকে রাজু।
গুমটির পেছন দিকে অশ্বত্থগাছের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা সাইকেলটার দিকে নজর পড়ে তেন্ডুয়ার–
“ওইটা? ওই সাইকেলটা?”
“হ্যাঁ…”
সাইকেলটার দিকে এগিয়ে যায় তেন্ডুয়া। সাইকেলটার তেল চকচকে অবস্থা দেখে মালুম হয় যে এটাকে রাজু খুবই যত্নে রাখে। একটু ঝুঁকে তেন্ডুয়া দেখে রডের সামনের দিকে একটা পেতকের ফলক মারা রয়েছে। নিয়মিত তারপিন তেলের স্পর্শে সেটা সোনার মতো চকচক করছে। তাতে লেখা— ‘দি সানি বাইসাইকেলস নাইন্টিন এইট্টি টু।”
সোজা হয়ে সিগারেটে একটা লম্বা টান দেয় তেন্ডুয়া। নিজের মনেই বলে, “হুম। তিরিশ বছর।”
শীতশীত করছে। একটা হাতকাটা সোয়েটারে শিমুলগাছার সন্ধে আর বাগ মানছে না। ঝোপেঝাড়ে ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছে। ফিকে নীল সন্ধে নামছে। পশ্চিম আকাশ যদিও এখনও লাল।
দোকানের সামনে এসে তেন্ডুয়া দেখল রাজু তখনও থম মেরে বসে রয়েছে। স্টোভ ধরায়নি। সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দু’হাত জিন্সের পেছনে ঘষতে ঘষতে তেন্ডুয়া বলল, “বন্ধ করে দিচ্ছ নাকি এক্ষুনি? একটু চা হবে না?”
কথাটা বলেই বাঁ দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল সে। দূরের গলির মুখটা ঝুপসি গাছগুলোর জন্য বড্ড অন্ধকার মতোন। কেউ একজন গলির মুখ থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এসেছে। দু’পা এগিয়ে বাঁদিকের ভাঙা পাঁচিলে একবার ধাক্কা খেয়ে আবার সোজা হল ছেলেটা। আবির না? টলছে কেন? আবিরের কয়েকহাত পেছনে আর একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পেল তেন্ডুয়া।
মানুষের মতোই অবয়ব কিন্তু গোরিলার মতো সামনের দু’টো অস্বাভাবিক লম্বা হাতে ভর দিয়ে ঝুঁকে রয়েছে সে। আবছায়াতে তার গায়ের রং ঠাহর হয় না। মুখটা অন্ধকারে ঢাকা হলেও হিসেবমতো যেখানে চোখ থাকার কথা সেখানে দু’টো জ্বলজ্বলে বিন্দু দেখতে পেল তেন্ডুয়া— অন্ধকারে বেড়ালের চোখ যেমন জ্বলে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই সেই মূর্তি অদৃশ্য হল।
হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই। টলতে থাকা ছেলেটা আবিরই বটে। ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সে, “আবির? এ আবির? ওরকম করছিস কেন? টলছিস কেন?”
গুমটি থেকে নিচু হয়ে রাজুও বেরিয়ে এসেছে। আবিরের দিকে ছুটে এগিয়ে গেল কেষ্ট। শিউরে উঠল সে। আবিরের চোখে শূন্যতা।
গোটা পেট জুড়ে গভীর ক্ষত— কেউ যেন হাত ঢুকিয়ে মুরগির নাড়িভুঁড়ি বের করার মতোন পেটের ভেতরটা সাফ করে দিয়েছে। কনুই থেকে বাঁ হাতটা নেই— বিরুতের নরম ডালের মতো ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। মুখটা হাঁ। হাঁয়ের চারপাশে তাজা রক্তের ছোপ। শিউরে উঠল তেন্ডুয়া।
আকাশ ফাটিয়ে হাঁক ছাড়ল রাজু, “কে আছিস রে? আয় রে। কী হয়ে গেল রে। ওরে, কে আছিস রে?”
তাদের পায়ের কাছে আবির হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল আবির। তারা কী করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবিরের প্রাণহীন দেহটা বালির বস্তার মতো ধপ করে ধুলোতে উপুড় হয়ে গেল।
