।। সমাদ্দার সব জানেন? ।
ছোটোগড় হাইওয়ে ধরে হু হু করে বাতাস কেটে এগোচ্ছিল তেন্ডুয়ার বুলেট। হেডলাইটের হলুদ শঙ্কু আলোয় ঝকঝক করছিল শিশিরভেজা কালো রাস্তা।
সকাল হচ্ছে। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে শহর। ফুটে উঠছে হর্ন, মানুষের গলা, দোকানের ঝাপ তোলার ধাতব আর্তনাদ।
তেভুয়া শক্ত করে হ্যান্ডেলে ধরে রেখেছে। শরীরটা সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে আছে। বাতাস কেটে এগোনোর ভঙ্গি।
ওর পেছনে গা ঘেঁষে বসে আছে বৃষ্টি।
দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে তেন্ডুয়াকে।
কপালটা আলতো করে ঠেকিয়ে রেখেছে ওর পিঠে। বাতাসে বৃষ্টির চুল উড়ছে— ভেজা, ভারী। ভেসে ভেসে আসছে পচা নর্দমার গন্ধ। পুরোনো শহরের সেই পরিচিত পচন।
দু’জনেই নিশ্চুপ।
“আচ্ছা,” হঠাৎই তেন্ডুয়া বলে ওঠে। “এই গ্রিমোয়া জিনিসটা ঠিক কী?”
ইঞ্জিনের শব্দ ছাপিয়ে কোনোমতে তার গলা পৌঁছয় বৃষ্টির কানে। সে ঝুঁকে আসে তেন্ডুয়ার কানের কাছে।
“গ্রিমোয়া একধরনের বই। মানে শুধু বই-ই না, এটা একটা ম্যানুয়াল। ডেমন বা অপদেবতাদের ডেকে নিয়ে আসার আচার-অনুষ্ঠানের পদ্ধতি। এমন সব নাম, যেগুলো উচ্চারণ করার কোনো দরকারই ছিল না; তবু করা হয়েছে। এমন সব নির্দেশ, যা ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসে।”
তেভুয়া হাসে, হালকা মুখ ঘুরিয়ে বলে, “মানে জীবন ধ্বংস করার ম্যানুয়াল। তাই তো?”
“বলতে পারো…
পুরোনো মনসাতলায় ঢুকতেই শহরটা ঘিঞ্জি হয়ে আসে। রাস্তাগুলো সরু সরু। লম্বা লম্বা বাতিস্তম্ভ। বাড়িগুলো পুরোনো— এমন পুরোনো, যেন নিজেরাই নিজেদের ওজন বইছে। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে ঔপনিবেশিক আমলের বিশাল বিশাল অট্টালিকা, চওড়া বারান্দা, ভাঙা করিন্থিয়ান স্তম্ভ।
গলিগুলো সরু সরু। স্যাঁতসেঁতে, বদ্ধ। যেন বাতাস এখানে দশকের পর দশক একইভাবে জমে থাকতে থাকতে নড়াচড়া ভুলেছে।
গতি কমায় তেন্ডুয়া।
বাইকটা একটা মোড় ঘোরে। একটা ফাঁকা পরিত্যক্ত পার্ক। দোলনাগুলো বাতাসে নড়ছে।
তেন্ডুয়া বলে, “যাচ্ছিটা কার কাছে আমরা?”
“ইনি একজন ক্রিপ্টোলজিস্ট, লোকসংস্কৃতি গবেষক। লোকে পাগল বলে। কিন্তু শিমুলগাছা লাইব্রেরিতে এই জিভখোর দানবের ব্যাপারে আমি যে তিনটে বই পড়েছি, সেগুলো ওঁরই লেখা। ১৯২২ সালে জিভ-গায়েব হওয়ার ঘটনাগুলো প্রথম যিনি রিপোর্ট করেছিলেন, তিনি এঁরই বাবা- প্রাণকৃষ্ণ সমাদ্দার। বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলে তাঁর অসমাপ্ত কাজ নিয়ে এগিয়েছিলেন। ইনি ১৯৫২ সালেও শিমুলগাছার কাগজে কাজ করেছেন, ১৯৮২-র ঘটনার সময়েও তিনি আগামীর সূর্যর সাংবাদিক। এখন বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই। এঁর নাম…”
“অবিনাশ সমাদ্দার।”
বৃষ্টি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুই কীভাবে জানলি?”
তেন্ডুয়া হেসে বলে, “লাইব্রেরিতে না গিয়েও জ্ঞান অর্জন করা যায় বুঝলি? আমার এই জ্ঞানের সোর্স চা গুমটির রাজুদা।”
“বলিসনি কেন?”
“আরে তখন ব্যাপারটা অতটা পাত্তা দিইনি। এখন তোর কথা শুনে কানেক্ট করলাম। কিন্তু উনিও যদি সেই একই বস্তাপচা ইতিহাস-ভূগোল শোনাতে থাকেন, তাহলে কিন্তু আমি সোজা বেরিয়ে আসব। আমাদের এখন একটাই প্রশ্ন। জিনিসটাকে মারব কীভাবে?”
“সেটার উত্তর খুঁজতেই অবিনাশ সমাদ্দারের কাছে যাওয়া।”
বিশাল বাড়িটার বয়স অন্তত শ-দেড়েক তো হবেই। প্রকাণ্ড সদর দরজাটা খুলল এক শীর্ণকায়, নির্বাক চাকর। সে যেন তাদেরই অপেক্ষায় ছিল।
লম্বা অন্ধকার করিডর পেরিয়ে তারা থামল বেশ বড়ো তেকোনা একটা ঘরে। বাতাসে পুরোনো কাগজ আর কর্পূরের গন্ধ।
দেওয়ালে ঝুলছে ফ্রেমে বাঁধানো খবরের কাগজের কাটিং- শিরোনামগুলো তাদের খুব চেনা।
ফের স্কুলছাত্র নিখোঁজ”, “শিমুলগাছায় অজানা আতঙ্ক”, “আক্রান্তের মুখে নেই জিভ!”
“খুনি কি সিরিয়াল কিলার?”
ঘরে জ্বলছে একটাই স্ট্যান্ড ল্যাম্প। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বই— মেঝেতে, চেয়ারে, টেবিলে বই। দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে স্তূপ করে রাখা বই। যেন আত্মরক্ষার ব্যারিকেড।
উঁচু পিঠের সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন অবিনাশ সমাদ্দার। তাঁর চামড়া পার্চমেন্টের মতো পাতলা কিন্তু হাড়ের ওপর বেশ টানটান। চোখ দুটো ঘোলা, কিন্তু তীক্ষ্ণ।
বৃষ্টি এগিয়ে যায়।
“আমি বৃষ্টি। আপনাকে ফোন করেছিলাম।”
মোটা কাচের চশমার ওপর দিয়ে শিবনেত্তর হয়ে মাপেন তিনি বৃষ্টি আর তেন্ডুয়াকে।
বলেন, “ওটি কে?”
“তেভুয়া। আমার বন্ধু।”
“বন্ধু? দেখে তো বয়সে বড়ো মনে হয় তোমার থেকে। বয়ফ্রেন্ড বলো।”
সলজ্জ হাসে বৃষ্টি।
“তেন্ডুয়া আবার কেমন নাম?”
“ছোটোবেলায় ও একবার একটা চিতাবাঘের বাচ্চাকে রেসকিউ করেছিল। তারপর থেকেই…”
হাত তুলে বৃষ্টিকে থামান বৃদ্ধ।
খসখসে পাতার ওলটানোর মতো গলায় বলেন, “বসো। ওসব গল্পো পরে হবে। এবার বলো। কী করতে এসেছ আমার কাছে?”
বৃষ্টি বলে, “শিমুলগাছায় গত কয়েকমাস যাবত কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। পরপর নিরুদ্দেশ হচ্ছে মানুষ। ক’দিন বাদে লাশ পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু…”
“তাদের কারও মুখে জিভ নেই। তাই তো?”
ক্লান্ত হাসি হাসেন সমাদ্দার। এ হাসি আনন্দের নয়, অবসাদের।
“নতুন কিছু বলো। এ জিনিস দেখে দেখে সয়ে গেছে আমার। ফিফটি টু, এইট্টি টু… ত্রিশ বছর কী তাড়াতাড়ি কেটে গেল… ভাবলেই অবাক লাগে…”
“আপনার সাহায্য চাইতেই ছুটে এসেছি আমরা…
“না, আমার সাহায্য করার কোটা ফুরিয়েছে। আমি প্রথম সাহায্য করেছিলাম ফিফটি টু’তে। বাবার নোট, গবেষণা সব ঘেঁটে ওদেরকে বলেছিলাম যে এটা কোনো পাগল খুনি বা বন্য জন্তু না। এটা একটা হেলিশ প্যারাসাইট।
ওরা বলল আমি পাগল। বসিয়ে দিল সাইডলাইনে। চাকরি খেয়ে নেওয়ার ভয় দেখাল। হাইবারনেশনে যাওয়ার আগে ওটা ডজনের পর ডজন মানুষ মেরেছিল…”
বৃষ্টি ঢোক গেলে, “বিরাশি সালেও তো…”
সমাদ্দার মাথা নাড়ে— যেন এতে শুধু পুরোনো কোনো সিদ্ধান্তই নিশ্চিত হল।
“এইট্টি টু’তে, আমি পুলিশ চিফকে বিশ্বাস করিয়েছিলাম। সেও আমাকে বিশ্বাস করেছিল। তবে সে ছিল একগুঁয়ে। ওস্তাদি করল। একাই বেরিয়ে পড়ল শিকারে। তার জন্যই তো সে মরল। কর্তৃপক্ষ সব জানে। সব ধামাচাপা দিয়েছে। এ তো বিউরোক্রেসির পুরোনো নিয়ম। যদি কিছুর সমাধান না করতে পারো তাকে চালান করে দাও কার্পেটের নীচে। আমার প্রকাশকও এসব ব্যাপারে বেশি কিছু ছাপতে দেয়নি কাগজে। পলিটিকাল প্রেশার। যদি শিমুলগাছার লোক জানতে পারে তাদের বাড়ির পাশেই একটা সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে, আর তার খিদে পেলেই উঠে পড়ে তাদের টপাটপ গিলে খাবে, তাহলে ঝামেলা হবে না? আউটরেজ হবে না? এ বিষয়ে বইও যা যা লিখেছি, সবই ছাপিয়েছি নিজের খরচে। খুব বেশি কপি তাই নেই। যারা যারা পড়েছে, তারা বলেছে গালগপ্পো- ফিকশন।”
“আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি স্যার। আপনার বই আমি সব পড়েছি। তাই তো ছুটে এসেছি আপমার কাছে। আপনি আমাদের সাহায্য না করলে…” বুজে আসে বৃষ্টির গলা।
দেয়ালজোড়া বিশালাকায় গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকেন বৃদ্ধ। খানিক পর মুখ খোলেন।
“ওটাকে মারা যায় না।”
শক্ত হয়ে যায় তেন্ডুয়ার শরীর। বৃষ্টির চোখে হতাশা।
“তবে এই বিষয়ে আমি যা যা বইপত্র পড়েছি তার মোটে একটাতেই সমাধান পদ্ধতি কথা লেখা আছে।”
পাশের তেপায়া টেবিলটা থেকে একটা বই টেনে নেন তিনি। পাতলা, ফাটা চামড়ার বাঁধাই। মলাটে প্রায় মুছে যাওয়া সোনার জল করা অক্ষর জ্বলজ্বল করছে: লিঙ্গুয়া নক্টিস।
“অন্ধকারের জিভ,” মলাটে দু’টো টোকা মেরে বৃদ্ধ বলেন, “এই হল একমাত্র টেক্সট যেখানে ওটার ব্যাপারে সরাসরি উল্লেখ আছে।”
বৃষ্টি উৎসুক হয়ে বলে, “কী লেখা আছে স্যার?”
“এই বইতে উনিশ শতকের কেনিয়ায় এক বেঁড়ে ওস্তাদ ফরাসি সাহেব মঁসিয়ে ব্যাবিনোর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই ব্যাবিনো সাহেব এই রিচুয়াল কনডাক্ট করেন— মানে যে আচার অনুষ্ঠান বেঞ্জামিন মুডি শিমুলগাছায় করেছিল। তুমি যদি আমার বই পড়ে থাকো তবে জানবে যে এই জিভটাই হচ্ছে এই রাক্ষসের আসল চেহারা— তার শরীর, মস্তিষ্ক সব। অন্য কোনো শরীরকে সে প্যারাসাইটের মতো অধিগ্রহণ করে, ব্যবহার করে।
ওই ব্যাবিনো সাহেব রিচুয়ালে ব্যবহার করেছিলেন এক সিংহের মৃতদেহ। জিভটা অবলম্বন করেছিল সেই সিংহের দেহকেই। শিমুলগাছার কাণ্ডকারখানা দেখে বুঝতেই পারছ যে কী ভয়ানক জিনিস এটা। বুঝতেই পারছ সিংহের শরীরে ভর করে সেটা হয়ে উঠেছিল একটা অপ্রতিরোধ্য খুনে যন্ত্র— কিলিং মেশিন। একশোর ওপর মানুষ মেরেছিল সে এক মাসের মধ্যেই। আফ্রিকান প্রজাদের দমন করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা এই রাক্ষসকে বাগে আনতে পারছিলেন না ব্যাবিনোও। তিনি বুঝতে পারছিলেন এই বিভীষিকার ওপর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন তিনিও।
অবশেষে তিনি দারস্থ হন মাসাইদের। এ এক অদ্ভুত জাত— এরা সাক্ষাৎ মৃত্যুকেও ভয় না। সিংহের মুখ থেকে শিকার ছিনিয়ে নিয়ে আসে মাসাইরা। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মাসাইদের যোদ্ধাদের সাহায্যে কোনোমতে কোণঠাসা করেন জন্তুটাকে।”
তেন্ডুয়া ফস করে বলে বসে, “জিভটাকে কেটে নেয়, তাই তো?”
বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধ তাকান তেন্ডুয়ার দিকে।
“সবই যখন বুঝে গেছ খোকা, তখন আর এই বুড়ো মানুষটাকে জ্বালাতন করা কেন?”
তেন্ডুয়ার হাতে একটা চিমটি কেটে বৃষ্টি ধমক দেয়, “চুপ!”
তারপর বৃদ্ধের দিকে ফিরে বলে, “আপনি প্লিজ কন্টিনিউ করুন স্যার। ভুল করে মাঝখানে কথা বলে ফেলেছে।”
তেন্ডুয়াকে জ্বলন্ত চোখে একবার মেপে নিয়ে তিনি বলতে থাকেন, “হ্যাঁ, ওরা জিভটা কেটে ফেলেছিল। কিন্তু ওখানেই কাজ শেষ নয়। জিভটাকে কেটে ফেলতে সিংহের দেহটা নিথর হয়ে গিয়েছিল ঠিক কথা, কিন্তু জিভটা তখনও ছটফট করছিল। মোচড় দিচ্ছিল নিজেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। গর্জনও নাকি ছাড়ছিল। তারপরেই আসল কাজ। ময়াল সাপের সাইজের জিভটাকে অতি কষ্টে পুড়িয়ে ফেলেন ব্যাবিনো। তবে হ্যাঁ, যে কোনো আগুনে পুড়ে এ জিভ ভস্ম হবে না।” তাঁর চোখ ঝিলমিল করে।
“পিতলের পাত্র চাই। সেই পাত্রে চাই পশুর চর্বি। চর্বি স্মৃতি বহন করে। পিতল নির্মমভাবে উত্তাপ ধরে রাখে। একমাত্র পিতলের পাত্রে পশুর চর্বিতে জ্বালা আগুনেই এর বিনাশ সম্ভব। মানে এই বইতে এমনটাই লেখা আছে।”
“কাজ হয়েছিল?” ফের মুখ খোলে তেন্ডুয়া।
সমাদ্দার ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন।
“জানি না। আমি পড়েছি। চোখের সামনে কখনও দেখিনি। চেষ্টা করার সুযোগই পাইনি। তার আগেই বড়োবাবু চলে গেলেন। জনা পনেরো মানুষ মেরে থামল সে।”
