।। শিকার না শিকারি? ।।
পা ফেলতেই কাঠের পোলটা ক্যাচ করে উঠল। দীর্ঘদিনের অযত্নে পাটাতনগুলো জায়গায় জায়গায় আলগা হয়ে গ্যাছে। সাবধানে এগোতে লাগলাম। চাঁদের আলোয় দক্ষিণের মাঠ রহস্যময় মূর্তি ধরেছে। আমার হৃৎপিণ্ডটা ধকধক শব্দে তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
আমার পদচারণা দৃপ্ত নয়। হাতদু’টো বুকের কাছে জড়ো করা। আমার ঠোঁট কাঁপছে— ভগবানের নাম জপ করছি। শিয়ালের কোরাস শুনে চমকে উঠলেও দাঁতে দাঁত চেপে সে এগিয়ে চলেছি। আমার গন্তব্য দক্ষিণের জঙ্গল।
পায়ে আজ চটি না, জুতো পরে এসেছি— ছোটার জন্য।
যদিও তার হাত থেকে পালানো এত সহজ হবে বলে মনে হয় না। এত সহজ হলে কি পাপান পারত না? এতই সহজ হলে আবির কি পারত না পালাতে?
এদিকের মাঠটা অনেক বেশি জঙ্গুলে। এদিকে আগে পুরোনো গাড়ি, বাসের কাটাই ঘর ছিল। সে কারখানাটা পরিত্যক্ত হানাবাড়ির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
খানিক দূরেই জঙ্গলে ঢোকার আগে জং-ধরা গাড়ির লোহার লাশগুলো ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। মাঝেমধ্যে বড়ো গাছগুলো ডালপালা মেলে ঝাঁকড়া পাতার আলখাল্লায় ঢেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
প্রচণ্ড ভয় করছে আমার, তাও আমি এসেছি। কেউ জোর করেনি।
বাবা এসেছে কলকাতা থেকে। সব শুনেছে।
আমার জায়গা বাবা নেবে বলেছিল, কিন্তু আমি জানি যে সেই শয়তান আমাকেই ডাকবে। হয় পাপানের গলায়, নয় আবিরের— হয়তো বা নীলুর।
তাছাড়া বাড়িতে মা’কে একা রাখাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে হয় না।
আমি চাই না আমার মায়ের বা বৃষ্টির অবস্থাও বাকিদের মতোন হোক।
বৃষ্টির কাছেও আমার অনেক কিছু প্রমাণ করার আছে। সকাল- বিকেল তেন্ডুয়ার কোমর জড়িয়ে বাইকে চেপে ওকে ঘুরে বেড়াতে দেখলে আমার শরীর জ্বালা করে। কান্না পায়।
আমিও সাহসী। আমাকে প্রমাণ করতেই হবে।
আমার শক্ত চোয়াল আর ঠান্ডা চাহনি দেখে না করেনি বাবা। বলেছে, “কথা দে বেঁচে ফিরবি।”
মা’কে বলা হয়েছে আজ থানায় একটা মিটিং আছে।
শিমুলগাছার অনেকে সারা রাত ওখানেই থাকব।
তাও জানি যে মা আজ সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারবে না।
আজকে যদি আমাকে প্রাণও দিতে হয় দেব, আপত্তি নেই। কিন্তু আজই যেন শিমুলগাছায় ওই নরখাদকের শেষ রাত হয়।
আমি জানি ঠিক কোন রাস্তা ধরে আমাকে এগোতে হবে। বুক কাঁপছে। ঘেমে নেয়ে গেছি। ডানদিকের বড়ো ঝাঁকড়া গাছটায় সাব ইনস্পেক্টর মণ্ডলকাকু আছে— দুর্দান্ত টিপ।
আরও অনেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক-ওদিক রয়েছে। বাঁপাশের কারখানার ভাঙা পাঁচিলের আড়ালে আছেন অর্ক রায়। যদিও এই প্রস্তাবে উনি নিমরাজি ছিলেন।
কিন্তু আর উপায় ছিল না। প্রায় এক ডজন তাজা প্রাণকে কেড়ে নিয়েছে অজানা আততায়ী। এখন উনি বসে বসে কাগজ-কলম নিয়ে তদন্ত করবেন বললে শিমুলগাছার লোক ওঁকেই জ্যান্ত ছিঁড়ে খাবে।
আর আততায়ী যে মানুষ, ওঁর এই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে।
ওঁর ধারণা ছিল মৃত মানুষের ডাকের গুজব ভীতু মফস্সলি কুসংস্কারী মানুষই রটিয়েছে। তবে আজ দেখলাম উনি চুপ করে রইলেন।
বিশু আমার আমার কানে ফিসফিস করে বলল যে জিভখোরটা নাকি ক’দিন আগে ওঁকে অ্যাটাক করেছিল— কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছেন।
যেটাই হোক, আজ রাতেই যেন এর শেষ হয়। গত দু’রাত ধরে টোপের ছাগল হয়ে আমি আর তেন্ডুয়া সারারাত শিমুলগাছা চষে বেরিয়েছি— কিন্তু সে আসেনি। তবে বেশিদিন তার খিদের জ্বালাকে দমিয়ে রেখে নরখাদকটা লুকিয়ে থাকতে পারবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।
আমাকে শুধু বন্দুকের রেঞ্জের মধ্যে থাকতে হবে। একটু এদিক- ওদিক হলেই বিপদ। শয়তানটাকে ফাঁদে ফেলা তো যাবেই না, আমাকেও বেঘোরে প্রাণটা খোয়াতে হবে।
একটা প্যাঁচার ডাকে চমকে উঠেছিলাম। হঠাৎ পূর্বদিক থেকে ঝোপঝাড় ভেঙে ভারী কিছু একটা ছুটে আসার শব্দ পেলাম। কী আসছে? ওদিকে তো বিশুর থাকার কথা ছিল। বিশু ঠিক আছে তো?
আমার ডানদিকের বড়ো ঝাড়টা একবার নড়ে উঠেই থেমে গেল। আতঙ্কে আমার গলা বুজে এল। জানি যে আমি বন্দুকের রেঞ্জের মধ্যেই আছি।
অন্ধকার ঝোপের মধ্যে দু’টো জ্বলজ্বলে চোখ দেখতে পেলাম ঠিক অন্ধকারে কুকুর বেড়ালের চোখ যেমন জ্বলে। সে আমাকে দেখতে পেয়েছে। একটা তীব্র বুনো গন্ধ আমার নাকে এসে ধাক্কা মারল। চিৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছে।
ওরা গুলি চালাচ্ছে না কেন? ওরা কি বুঝতে পারছে না? নাকি আমাকে আক্রমণ করা অবধি অপেক্ষা করতে চাইছে?
ঝোপটা হালকা নড়ে উঠল— চোখজোড়া অদৃশ্য। কোথায় গেল? আমার কয়েকহাত সামনেই একটা বিশাল আমগাছের গোড়ার উঠে থাকা শিকড়ের পেছনে আবার ধক করে চোখদু’টো জ্বলে উঠল। মাপছে শিকারকে মাপছে— ফাঁদ কি না নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে না?
এবার কি তবে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর? আবার খসখস করে শুকনো পাতার শব্দ তুলে সে অদৃশ্য হল।
আমার হাঁটু কাঁপছে। দরকার নেই শিকারের-
যে যা পারে করুক। যে পারে মরুকগে যাক। আমি বাড়ি যেতে চাই। ঢের হয়েছে। আমি বাঁচতে চাই।
গত দু’দিনের মতো আজও যেন আক্রমণ না আসে। আমার কান্না পাচ্ছে। আজ যেন আমি বেঁচে যাই। কাল থেকে যে আসে আসুক, আমি আর নেই।
হঠাৎ বাঁদিকের একটা জং-ধরা গাড়ির আড়াল থেকে চাপা গলা ভেসে এল, “আমাকে দেখতে এলি?”
আবির! আবিরের গলা!
“আয় না, এগিয়ে আয়।”
আবির ডাকছে, আমার মাথা ঠান্ডা হয়ে এল। হাঁটু আর কাঁপছে না। আমি এগিয়ে গেলাম। গাড়ির আড়ালে কেউ নেই। কোথায় গেল আবির? সঙ্গে সঙ্গে হাতপাঁচেক দূরে একটা পোড়ো বাসের লতাপাতায় মোড়া জং-ধরা খাঁচার পেছন থেকে ডাক এল, “এগিয়ে আয়। আয় না।”
আমি নিশ্চিন্ত হলাম। এগিয়ে গেলাম। আমি জানি ওই বাসের পেছনে যাওয়া মানেই বন্দুকের নিশানা থেকে আড়াল হয়ে যাওয়া, কিন্তু আবির ডাকছে তো।
“আয় না…”
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে চললাম।
“আয় না…”
বাসের পেছনটা আলো আঁধারি।
“আয় না…” আর দু’পা এগোতেই ফটফটে জ্যোৎস্নার আলোয় তাকে দেখতে পেলাম। মানুষের মতোই দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছে সে, কিন্তু গোরিলার মতো বিশাল লম্বা দু’হাতে মাটিতে ভর দিয়ে রেখেছে সে।
গায়ের রং ধূসর। কাঁধের ওপর মাথাটায় দু’টো ভাঁটার মতো চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমার ঘোর লেগে গ্যাছে।
হালকা বাইকের গর্জন শুনতে পেলাম মনে হল। যেন বহুদুর থেকে কে আমায় ডাকছে। ডাকুক। এখন আসল ডাকে আমায় সাড়া দিতে হবে। তার ধারালো দাঁতে ঘেরা মুখগহ্বর থেকে জ্যান্ত সাপের মতো বেরিয়ে এসেছে একটা মোটা জিভ। ঝুলছে তার বুক অবধি। থেকে থেকে ময়াল সাপের মতো সেটা পাক খাচ্ছে।
সেই জিভের গায়ে অসংখ্য টিউমারের মতো কী সব ঝুলে রয়েছে।
তা মধ্যে একটা কেঁপে উঠল, “আয় না।” আবিরের গলা।
ঠিক তার ওপরেরটা কেঁপে উঠল, “আসবিনি ভাই?” পাপানের গলা!
ওগুলো জিভ। শিমুলগাছার হারিয়ে যাওয়া মানুষদের জিভ। আমি জানি যে আর দু’পা এগোলেই আমি বাসের আড়ালে— বন্দুকের নিশানার বাইরে।
কিন্তু ওরা ডাকছে যে। আমার বন্ধুরা ডাকছে যে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে এগিয়ে গেলেই ওদের সঙ্গে দেখা হবে। “আয় না ভাই…”
বিশাল জীবন্ত জিভটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।
“আবির! ভাই আসছি আমি…” বলে পা বাড়ানোর উপক্রম করতেই “ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ” শব্দে আমার গায়ে কাঁটা দিল।
চটকা ভাঙল।
পেছনের ঝোপের মধ্যে থেকে আবিরের অ্যালার্ম ঘড়ি বেজে উঠেছে।
সামনের বীভৎস মূর্তিটাকে দেখে আমি আঁতকে উঠে পিছিয়ে আসার উপক্রম করতেই প্রকাণ্ড ময়াল সাপের মতো জিভটা আমার ডান-পা’টা পেঁচিয়ে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মারল।
মারতেই আমি ধরাশায়ী হলাম। একই সঙ্গে গর্জে উঠল অনেকগুলো বন্দুক। নিশানা ফসকেছে।
আমাকে ঝোপঝাড় পাথরের ওপর দিয়ে সে টেনে নিয়ে যেতে লাগল দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে।
উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম, “বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও গো।”
কী ভয়ঙ্কর ক্ষমতা সেই কদাকার বিভীষিকার। অক্লেশে একটা গোটা মানুষকে টেনে নিয়ে চলেছে শুধু জিভের জোরে। পেছনে কোলাহল শুনতে পাচ্ছি।
কাটা ঝোপে আমার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। দক্ষিণের জঙ্গলে গিয়ে ঢুকলেই সব শেষ। মায়ের মুখটা মনে পড়ছে।
বাইকের গর্জনটা এগিয়ে আসছে— বুলেট। একটা কানফাটানো শব্দ। আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আমার পা মুক্ত। চারিদিক টলছে।
তাও কোনোমতে উঠে বসে দেখলাম যে সোজা একটা বাইক এসে ধাক্কা মেরেছে সেই বিভীষিকার পিঠে। ছিটকে একপাশে পড়ে রয়েছে তেভুয়া।
প্রচণ্ড অভিঘাতে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে হাতড়ে হাতড়ে ওঠার চেষ্টা করছে মূর্তিটা। অনেক মানুষের মিলিত গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে তার জিভ থেকে।
ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে গিয়ে জঙ্গলের পাখিগুলো প্রচণ্ড ওড়াউড়ি-ডাকাডাকি শুরু করেছে। কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। পেছনে বুটের শব্দ পাচ্ছি। প্রচণ্ড কোলাহল।
আমি কোনোমতে শরীরটাকে ঘেঁষটে টেনে নিয়ে চিত হয়ে পড়ে থাকা তেন্ডুয়ার কাছে এগিয়ে গেলাম। তেন্ডুয়ার দু’চোখ বন্ধ। নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। বুকে কান পাতলাম। স্পন্দন আছে। নিশ্বাস পড়ছে।
ঝোপঝাড় ভেঙে দুদ্দাড় করে ছুটে এলেন অর্ক রায়।
জিন্সের কোমর থেকে টর্চ বের করে ফেললেন মাটিতে। অন্য হাতে উঁচিয়ে রাখা পিস্তল।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। কিন্তু কোথায় কী? টর্চের আলোয় খানিকটা কালচে চটচটে রক্ত ছাড়া মাটিতে আর কিচ্ছু পড়ে নেই।
.
পুলিশ চিফ প্রবীর মুখার্জি ওরফে বড়োবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন দক্ষিণের জঙ্গলের কিনারায়।
বুটের অর্ধেকটা ডেবে গিয়েছে স্যাঁতসেঁতে মাটির ভেতর। বাতাসে পচা পাতার গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে বারুদ, কেরোসিন আর চর্বির একটা ভারী, গা-গোলানো ঘ্রাণ।
পেছনে দক্ষিণের জঙ্গল। স্তরে স্তরে ছায়া জমে আছে, যেন শ্বাস নিচ্ছে।
তাঁর পেছনে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কয়েকজন পুলিশ, আর তাদের সঙ্গে বাগদিপাড়ায় ডাকাবুকো কিছু ছেলে— যাদের সাধারণ অবস্থায় এখানে থাকার কথা নয়, কিন্তু থাকতে হয়েছে।
মুখগুলো ফ্যাকাশে, কিন্তু চোয়াল শক্ত। হাতে লোহার রড, পুরোনো গেট, রেলিং ভেঙে তুলে আনা শিক।
তখনই বড়োবাবুর কানে এল বাইকের গর্জন— একটা রক্ত জল করে দেওয়া চিৎকার।
চোখ সরু করে বড়োবাবু দেখলেন বাইকটা একটা বড়ো গাছের গায়ে ধাক্কা খেয়ে আটকে আছে। হেডলাইটটা একবার জ্বলে উঠল, আবার নিভে গেল। বড়োবাবুর বুকের ভেতরটা ধক উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল ছেলেটা বুঝি শেষ।
তারপরেই সামনের বনটা হঠাৎই হয়ে উঠল জীবন্ত।
ফড়ফড়িয়ে মোটা ত্রিপল ছেঁড়ার মতো শব্দ হল ঝোপঝাড় ভেদ করে কিছু একটা বেরিয়ে এল।
হেঁটে নয়— ছুটে। খুব দ্রুত। খুব বিকৃতভাবে।
একসঙ্গে সব টর্চ জ্বলে উঠল। আলোয় বনটা কুঁকড়ে গেল।
লম্বা অঙ্গগুলো মাটিতে পড়ছে বিক্ষিপ্তভাবে। কোনো ছন্দ নেই। আঙুলগুলো ছড়ানো, প্রতিটা আঙুলের ডগায় লম্বাটে নখ— টর্চের আলো পড়তেই ঝলসে উঠছে, যেন সুইচব্লেড খোলা হচ্ছে।
দেহটা মাঝপথেই ভাঁজ হচ্ছে, খুলছে। গাছের গুঁড়িকে হাতল বানিয়ে উঠে পড়ছে। ফের নেমে আসছে দ্রুততার সঙ্গে। তেন্ডুয়ার বাইকের ধাক্কায় সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
“সোজা আমাদের দিকেই আসছে,” কেউ একজন ফিসফিস করে বলল।
বড়োবাবু হাত তুললেন।
“লাইন ভাঙবি না,” গলা স্থির, বহু বছরের আদেশ দেওয়ার অভ্যেস।
“ভীষণ ফাস্ট…”
চারদিক থেকে ঘেরা পড়তেই প্রাণীটা ধীর হল। মাথা কাঁপছে। হঠাৎ এই সমান্তরাল আলোর দেয়াল দেখে সে বিভ্রান্ত।
“গরররর্!”
সামনে বড়োবাবু। সে ঝাঁপাল বড়োবাবুর দিকে। অনেকগুলো বন্দুকের গর্জনে রাতের নীরবতা চুরমার হয়ে গেল।
চারদিক থেকে গুলি ঢুকল ওর শরীরে। বধ করতে অক্ষম কিন্তু কাঁপিয়ে দিয়েছে— ঝাঝরা করে দিয়েছে শতাব্দী প্রাচীন লাশটাকে, ওই জিভের আশ্রয়কে।
দৌড়ের ছন্দ ভেঙে গেল। গলা থেকে বেরোল ভেজা, দমবন্ধ করা শব্দ।
শব্দের ভেতরে জড়ানো আরও শব্দ— বাচ্চাদের কান্না, পুরুষের হাসি, নারীর চিৎকার— সব একসঙ্গে, তালগোল পাকিয়ে।
হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল পিকু আর তেন্ডুয়া। পেছনে অর্ক রায়। তারা হাতে করে ভারী কিছু চাগিয়ে ধরে আছে।
প্রাণীটা পিছিয়ে গিয়ে একটা খাঁজকাটা পাথরের গায়ে সজোরে আছড়ে পড়ল। আর তখনই তার ব্যাপারটা সবার সামনে পরিষ্কার হল।
একটা বিশাল লোহার হুক গেঁথে আছে তার জিভের গভীরে। বঁড়শির মতো।
মোটা, কুৎসিত, চকচকে জিভের ঠিক মধ্যিখানে একদম কুঁড়ে ঢোকানো।
বাইক। গতি। ইচ্ছে করে করে ধাক্কা।
হুকের সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি এখন দানবের মুখ থেকে নোঙরের মতো ঝুলছে।
“টান!” গর্জে উঠল তেভুয়া।
পিকু আর প্রত্যয় দু’জন পা শক্ত করে দড়ি ধরে হ্যাঁচকা মারল।
জিভটা প্রসারিত হল, মোচড়াতে লাগল নিজেকে।
যেন সেই জিভের নিজের পেশি আছে, নিজের ইচ্ছা আছে। প্রাণীটা
চেঁচিয়ে উঠল— একটা কণ্ঠ নয়, বহু কণ্ঠ, একসঙ্গে।
বিশু হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ল বহু বছর ধরে পড়ে থাকা একখানা মরচে- খাওয়া গাড়িতে। তার ভেতর থেকে টেনে বের করল আগে থেকে লুকিয়ে রাখা মস্ত পিতলের বাটি।
ভেতরে জমাট বাঁধা পশুর চর্বি।
বড়োবাবু দেশলাই জ্বাললেন। জ্বলে উঠল। কাপল। তারপর জ্বলন্ত কাঠিটা তিনি ফেলে দিলেন চর্বির বাটিতে। ওপরে ছড়ানো ছিল কেরোসিন আর মোটা কাপড়ের সলতে।
চর্বি জ্বলে উঠল গভীর, হিংস্র শব্দে। আগুনটা ঠিকঠাক লেগেছে।
বাঁ দিক থেকে দৌড়ে এলেন অর্ক রায়। হাঁপাচ্ছেন।
দু’হাতে ধরা বিশাল খাঁড়া— বাজারের রক্ষাকালী মন্দির থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
এক মুহূর্তও থামলেন না তিনি। কোপ নামল।
খচাৎ!
কালচে রক্ত ছিটকে পড়ল পাথরের গায়ে। যে চিৎকারটা পাক খেয়ে দক্ষিণের মাঠের ওপর ভেসে উঠল তা সহ্য করার মতো নয়। হাজারটা চুরি করা কণ্ঠ যেন একসঙ্গে মুক্তি পেল।
তারপর কানে তালা ধরিয়ে দেওয়ার মতো নিস্তব্ধতা।
দেহটা সঙ্গে সঙ্গে ধসে পড়ল। কুঁকড়ে ছোট্ট হয়ে এল।
চামড়া ভেতরের দিকে কুঁকড়ে গেল ভিজে যাওয়া কাগজের মতো শতাব্দীপ্রাচীন মমির মতো লাশটা সকলের চোখের সামনে সেটা পচে, ফেটে, ধূসর ধুলো হয়ে মিশে গেল দক্ষিণের মাঠে।
কিন্তু জিভটা…
জিভটা বেঁচে রইল।
কাটা জিভটা মাটিতে পড়ে ছটকাতে লাগল কইমাছের মতো। মোটা, পেশিবহুল। অজগরের মতো আছড়াচ্ছে। লোকজন আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।
“ধর!” বড়োবাবু চেঁচালেন।
দু’টো মস্ত লোহার সাঁড়াশি দিয়ে তাকে চেপে ধরল পানু আর ভোলা। তারা ছোটোগড় ঢালাই কারখানায় কাজ করে। লোহার মতো হাত তাদের।
শক্ত প্যাঁচে আটকে গিয়ে জিভটা উন্মত্তভাবে ছটফট করতে থাকল। কালচে তরল ছিটকে পড়ল পুলিশের বুটে আর মাটিতে। সবাই মিলে তাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রকাণ্ড পেতলের পাত্রের আগুনের ভেতর ফেলে দিল।
আবার রক্ত জল করা চিৎকার।
আগুনের শিখা লাফিয়ে হল। মাংসখণ্ড ফাটতে লাগল। জিভটা ফুলে উঠল, ফোসকা পড়ল, কালো হয়ে গেল। গুটিয়ে আসতে লাগল কাঁচা কাঠের মতো।
প্রায় শেষ।
তখনই… ঠিক তখনই…
ছিটকে বেরোল একটা টুকরো।
ছোটো, ধোঁয়া ওঠা অংশটা আলগা হয়ে পড়ল মাটিতে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে গেল সেটা।
হইহই করে উঠল সবাই— “ধর রে! ওরে ধর রে! থেঁতলে দে…”
ঘাসের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে হেলে সাপের মতো চকিতে সে সেঁধিয়ে গেল দক্ষিণের জঙ্গলের অন্ধকারে।
সবাই স্থির। বড়োবাবুর চোখে হতাশা। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে। বুকের ভেতর তোলপাড়।
তেন্ডুয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল মাটিতে। অর্ক রায় হতাশভাবে শরীরটাকে ছেড়ে দিলেন একটা জং-ধরা গাড়ির বনেটে।
বিশু কেঁদে উঠল, “না না না না…”
হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে দক্ষিণের জঙ্গলের মধ্যে থেকে খলখলিয়ে অট্টহাসি উঠল একটা। শিকারিদের পাথরের মূর্তি বানিয়ে দিয়ে সে হাসি পাক খেতে লাগল শিমুলগাছার আকাশে বাতাসে।
