উঁকি
জিভ

শিমুলগাছা জায়গা মোটে সুবিধের না

।। শিমুলগাছা জায়গা মোটে সুবিধের না ।।

শিমুলগাছা থানার বড়োবাবুর ঘরের টিউবটা ম্রিয়মাণ হয়ে জ্বলতে জ্বলতে মাঝেমধ্যে দপদপিয়ে উঠছিল।

চায়ের কাপটা প্লেটে নামিয়ে রেখে দেঁতো হাসি হেসে বড়োবাবু বললেন, “লো ভোল্টেজ স্যার। কারেনও যায় প্রায়ই। আপনি চা’টা খান স্যার। ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

তাঁর উলটোদিকে থমথমে মুখ করে বসে থাকা মানুষটা ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললেন, “কন্টিনিউ করুন।”

“হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম। শিমুলগাছা বড্ড ভুলভাল জায়গা স্যার। প্রচুর ভুলভাল ঘটনা আগেও ঢের ঢের ঘটেছে। এখেনেই আমার জন্ম। ডিউটিতেও বিশ বচ্ছর হয়ে গেল। আগে অবাক হতুম। অনেক ঘটনা দেখে, শুনে মাথাফাথা ঘুরে যেত। এখন অবশ্য এসব সয়ে গেছে। কত লোকজন যে নিরুদ্দেশ হয়েছে তার কোনো কুলকিনারা নেই।

যেগুলো ম্যানমেড ইয়ে, মানে ধরুন ইলোপমেন্ট, তুলে নিয়ে গিয়ে রেপ, মার্ডার বা আরও যা ছোটোখাটো ভুলভাল ঘটনা ঘটে, তার বেশিরভাগেরই কিনারা হয়ে যায়। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন সব ঘটনা ঘটে যায়, যা স্বাভাবিক যুক্তিবুদ্ধিতে এঁটে ওঠে না।”

অর্ক রায় বিরক্ত হলেন। বললেন, “কলকাতা থেকে এখানে আসতে আমার কত সময় লেগেছে জানেন তো? আট ঘন্টা— এইট ফাকিং আওয়ার্স অফ ড্রাইভিং। তারপরেও আপনার মনে হচ্ছে আপনি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে, সাহিত্যরসে জারিয়ে আমাকে গল্প পরিবেশন করবেন আর আমি কচি খোকার মতো হাততালি দেব। তাই তো?”

“সরি স্যার, ভেরি সরি। লাস্ট দেড় মাসে মোট …”

হাত তুলে বড়োবাবুকে থামালেন অর্ক।

“গত দেড় মাসে মোট ন’জন মিসিং। তার মধ্যে সাতটা বডি পাওয়া গেছে— মিউটিলেটেড, ক্ষতবিক্ষত। এতদূর আমি জানি। এবার বলুন।”

গোলাপি ফুল আঁকা চিনেমাটির চায়ের কাপে সশব্দে সুড়ুৎ করে একটা চুমুক দিয়ে গলাটা একবার খাঁকড়ে নিয়ে বড়োবাবু আবার শুরু করলেন, “প্রথম মিসিং রিপোর্টটা আসে মার্চের দশ তারিখ। বিমল দুলে— ভ্যান চালাত। মিসিং হওয়ার দু’দিন বাদে তার বউ এসে রিপোর্ট করে।

পাক্কা মাতাল, ভুলভাল লোক। এর আগেও অনেকবার মাল-ফাল খেয়ে বাড়ি ফেরেনি। তাই বাড়ি না ফিরতে প্রথমদিন বউ-ছেলে মাথা ঘামায়নি। ভেবেছে কোথাও পড়ে টড়ে আছে। ওরা ভুলভাল কাজকাম করে— চট করে থানায় ফানায় আসে না। দু’দিন কেটে যাওয়ার পরেও দুলেপাড়ার লোকজন খুঁজে টুজে না পেয়ে তখন থানায় আসে।

প্রথমে গুরুত্ব দিইনি কিন্তু বিমলের বউ বলল যে দু’দিন তো মাল না খেয়ে থাকার লোক বিমল না। মাল খাওয়ার পয়সা নিতে ঠিক ঘরে আসার কথা। বিমলের ভ্যানও বাজারধারে পড়ে আছে— নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। বেশি খুঁজতে হয়নি। বড়ো রাস্তার ধারে একটা কালভার্টের নীচে বডিটা আটকে ছিল। শরীর ক্ষতবিক্ষত— মুখটা ইনট্যাক্ট কিন্তু জিভটা নেই। বডি তো মর্গে চালান যায়।

মাতাল ভ্যানওয়ালা মরেছে; বুঝছি মার্ডার, কিন্তু কে মাথা ঘামাবে স্যার? যত ভুলভাল। যাই হোক, দিন তিনেক পর দ্বিতীয় ঘটনা। বিমলেরই ছেলে নীলু; বছর পনেরোর ছেলে। এবার আর মিসিং ফিসিং না। সন্ধেবেলা মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল। ঘরে ফেরেনি। পরেরদিন ভোরবেলা দক্ষিণের জঙ্গলের সামনের পোড়ো মাঠটায়, মানে আজকের বডিটা যেখেনে পাওয়া গ্যাছে, সেখেনে পড়েছিল। সেম— বাপের মতোই ক্ষতবিক্ষত বডি আর মুখের ভেতর জিভটা নেই।”

“স্ট্রেঞ্জ! কারও সঙ্গে বিমলের শত্রুতা ছিল?”

“ছিল স্যার। মানু মন্ডলের সঙ্গে কয়েকবছর আগে প্রচণ্ড ঝামেলা হয়েছিল। মানু ওদের বস্তিতেই থাকে। কাচকলে কাজ করে। বিমলের বউয়ের সঙ্গে মানুর মাঝখানে ইয়ে— বুঝতেই পারছেন ভুলভাল কেস।

বিমল মেরে মানুর মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল। মাতাল হলে কী হবে, গায়ে জোর ছিল মালটার। তারপর নিজেদের মধ্যেই মিটমাট করে নেয়। বিমল আর ওর ছেলের পরপর মার্ডারটা হতে সন্দেহের তির তো ওর দিকেই যাবে। তুলে আনলাম।

গিয়ে দেখি বস্তির লোকজনও ওকেই ঘিরছিল। বহুত বাটাম দিলাম স্যার কিন্তু স্বীকার করল না। এক সপ্তাহ ধরে লকআপে ফেলে রেখেছিলাম স্যার। আমারও রোখ চেপে গিয়েছিল যে শালাকে দিয়ে বলিয়েই ছাড়ব। তারপর বুঝলাম কেসটা ভুলভাল করে ফেলেছি। মার্ডার দু’টো ও করেনি।”

“কীভাবে বুঝলেন?”

“বিমলের ছেলে নীলুর লাশটা পাওয়ার তিন-চারদিন পর থেকে বিমলের বউটাকে কেউ দেখেনি। কয়েকবাড়ি কাজ করত। তারাও পরে বলেছে স্বামীর কেসটার পরেও নাকি কাজে এসেছিল, কিন্তু ছেলেটার লাশ পাওয়ার পর থেকে সে কাজেই আসেনি। ছেলের লাশটা পাওয়ার এক সপ্তাহ বাদেই বিমলের বউকেও পেলাম।

দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে যেতে একটা খাল পড়ে। সেখানেই ইটের পোলের নীচে উলুখাগড়ার জঙ্গলে বডিটা আটকে ছিল। ক’জন ভোরবেলা মাঠে যাচ্ছিল। তারাই এসে খবর দেয়। খোবলানো শরীর, জিভটা নেই। হাঁটুর নীচ থেকে বাঁ-পা’টাও পাইনি। সেটা আবার দু’দিন বাদে শহরের পশ্চিমপ্রান্তের একটা ডোবা থেকে উদ্ধার হয়। তার একদিন বাদেই মানুকে ছেড়ে দিই। মানুকে তুলে আনার পরের দু’দিনও বিমলের বউকে অনেক লোকে দেখেছে। ওকে আর রেখে কী করব?”

“ছেড়ে দিলেন কেন? ও লকআপে থাকাকালীন ওর অ্যাসোসিয়েটসও তো কাজটা করতে পারে।”

“না স্যার। বিমলের থেকে রিভেঞ্জ নেওয়ার ব্যাপারটা তাও দাঁড়াচ্ছিল, কিন্তু মানু গুন্ডা-বদমাইস না। দুলেপাড়াতেও একঘরে। সঙ্গীসাথি নেই। তাছাড়া—”

“কী?”

“তাছাড়া স্যার বিমলের বউয়ের লাশটা যেদিন পাওয়া গেল, সেদিন বিকেলেই –”

“সেদিন বিকেলেই কী?”

“সেদিন বিকেলেই আরেকটা লাশ পাওয়া যায়। অসীমা সান্যাল। বয়স পঁয়ষট্টি। বিধবা মানুষ। একাই থাকেন। স্বামী কিছু বছর আগে মারা গেছে। ছেলে থাকে কলকাতায়।

আগে শিমুলগাছা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিচার ছিলেন। একতলা বাড়িটা শহরের একদম পশ্চিমে। ধারেকাছে বাড়িঘরও আর তেমন নেই। ছোটোছোটো ছেলেমেয়েরা ভারী ভালোবাসত স্যার— ফুলদিদা বলে ডাকত। বাড়ির সামনে একটা ফুলের বাগান আছে। বাচ্চাদের ফুলটুল দিতেন।

তারাই বিকেলবেলা গিয়ে প্রথম বডিটা দ্যাখে। বাচ্চাগুলো একদম শকে চলে গ্যাছে স্যার। বাড়ির দরজা হাট করে খোলা— ঘরে চুরিটুরির কোনো চিহ্ন নেই। বডিটা বাগানে পড়েছিল। পেট-বুক খোবলানো। জিভটা মিসিং। পুরো ভুলভাল কেস।”

“ওহ গড!”

“তবে আর বলছি কী স্যার; আর বিমলের বউ স্যার……” একবার গলা খাঁকড়ে নিয়ে বড়োবাবু বললেন, “বিমলের বউ স্যার অসীমাদেবীর বাড়িতে ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজার কাজ করত। দু’দিন বাদে ওই বাড়ির পেছনের ডোবাটা থেকেই বিমলের বউয়ের কাটা-পা উদ্ধার হয়।”

“এক-দুই-তিন-চারটে হল,” আঙুলের কর গুনলেন অর্ক, “একই ফ্যামিলির তিনজন। পরের জন তাদেরই পরিচিতা। লিঙ্ক তো আছেই। তারপর?”

“তারপরের কেসটা স্যার হয়েছে কি না জানি না—”

“মানে?”

“মানে মার্ডার হয়েছে কি না কনফার্ম না। স্টিল মিসিং। বছর দশেকের একটা মেয়ে–তিতলি পাল। অসীমা সান্যালের ঘটনার পাঁচ দিন পর নিখোঁজ হয়। তবে একটা কাটা হাত পাওয়া গ্যাছে স্যার। ভ্যানওয়ালা বিমলের বডিটা যেখানে পাওয়া গেছিল, তার কাছেই। হাতে একটা রুপোর বালা ছিল। সেটা দেখেই ফ্যামিলি আইডেন্টিফাই করেছে। একদম ভুলভাল অবস্থা। ও আর বেঁচে নেই বলেই আমার ধারণা।”

অর্ক রায় অস্ফুটে বললেন, “তারপর?”

“তারপর যা হয় স্যার। ছোটো মফস্সল শহর। বাইরের জগৎ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। তিনদিকে চওড়া নদী দিয়ে ঘেরা আর একদিকে ঘন জঙ্গল, পাহাড়। এটা তো পরিষ্কার যে খুনি বাইরের কেউ না।

বাইরের জগতের সঙ্গে উত্তরের ব্রিজ দিয়ে ছাড়া স্থলপথে যোগাযোগও সম্ভব না— ওই যেইটে দিয়ে আপনি এলেন। সেখেনের চেকপোস্টে ইদানীং চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা থাকে। বাইরে থেকে কেউ এলে জানতে ঠিকই পারতুম।

এখেনে সবাই সবাইকে মোটামুটি চেনে। এসব জায়গায় আতঙ্ক ছড়াতে বেশি সময় লাগে না। লোকে বুঝে গেল খুনি তাহলে শহরেরই কেউ। তার পরের বাচ্চা মেয়েটা যখন দিনদশেক বাদে মিসিং হল তখন তো পাবলিক রেগে আগুন।

লোকাল কাগজ ‘আগামীর সূর্য’ তো আমাকে অপদার্থ-টপদার্থ বলে যাচ্ছেতাই করে লিখল – নতুন কিছু না, আগেও লিখেছে। লোকজন থানা ঘেরাও করে ফেলেছিল। ভুলভাল কন্ডিশন। অনেক কষ্টে তাদের ঠান্ডা করে, সদর থেকে ফোর্স এনে এক্কেবারে চিরুনি তল্লাশি চালালুম। কোথাও কিস্যু নেই।

তারপর বডিটা পাওয়া গেল দক্ষিণের জঙ্গলের একটা একতলা পোড়ো বাড়ি থেকে— একটা লোকাল ছিঁচকে চোর ডিসকভার করে। এরকম বাড়ি শিমুলগাছাতে প্রচুর রয়েছে। খুনি যদি প্রতিদিন একটা করে পোড়ো বাড়িতেও ঘাপটি মেরে থাকে তবে বাপের জন্মেও কেউ তাকে খুঁজে পাবে না।

যাই হোক, এই মেয়েটার বয়স বারো- সেভেনে পড়ত। নাম প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী। এবারেও জিভ নেই আর পেটের নীচ থেকে পা পর্যন্ত পুরোটাই খাওয়া। একদম হাড় বের করে দিয়েছে—

“এক মিনিট। খাওয়া মানে?”

“আপনি পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট পড়েননি স্যার? দেহগুলোতে কোনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মাংস ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে দাঁত দিয়ে। রিপোর্ট বলছে সে দাঁতের দাগ কুকুর বা শেয়ালের না। তার চেয়েও সাংঘাতিক কামড়। শিমুলগাছাতে তো আর বাঘ-সিংহ নেই— হেঁ হেঁ।”

“মানে?”

“মানে স্যার, যে মারছে সে সোনারুপো-টাকাকড়ির লোভে মারছে না। কারও শরীরে মলেস্টেশনেরও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সে মাংস খাওয়ার জন্য মারছে— মানুষের মাংস। ভুলভাল পুরো। ও হ্যাঁ, এই দু’টো মেয়ের মাঝে আরও একজন মিসিং হয়েছিল।

মানস দাস, বছর বাইশের ছেলে। পুবপাড়ায় বাড়ি। এই মেয়ে দু’টো তার কাছে আবার অঙ্ক কষতে যেত। মানসের বডিটা পেয়েছি নদীর ধারে— এই দিনচারেক আগে। জিভ মিসিং, বডির এইট্টি পার্সেন্ট খাওয়া।

যা বলছিলাম, দ্বিতীয় মেয়েটার বডিটা পাওয়া যেতেই শহরে রটে গেল যে আততায়ী আর যাই হোক, মানুষ না। পাবলিক বুঝে গেল যে বাঁচতে গেলে তাদের লুকোতে হবে। সন্ধে সাড়ে সাতটার পর টোটাল নাইট কার্ফু জারি করে দেওয়া হয়েছে স্যার।

কাচকলে বলা আছে। সাইরেন বাজিয়ে দেয়। সব্বাই দোকান-পাট বন্ধ করে, কোচিং ফোচিং ছুটি দিয়ে যে যার বাড়িতে ঢুকে কাঠ হয়ে বসে থাকে। সকালের আলো ফুটলে আবার বেরোয়। আমি নিজে রাত্তিরে জিপ নিয়ে, সেন্ট্রি ফেন্ট্রি নিয়ে গোটা শহর তিন-চারবার টহল মারি। তবে এই সেপাইগুলোও ভীতু। যেতে চায় না মোটে।”

“কাজ হয়েছে?”

“অ্যাঁ?”

“নাইট কার্ফিউতে কাজ হয়েছে?”

এই প্রথম বড়োবাবুর মুখটা থমথম করে উঠল। কপালে চিন্তার ভাঁজ। “কাজ আর হল কই স্যার? তার পরেও তো দু’টো কেস। প্ৰসুন সরকার, কলকাতায় চাকরি করে। সে এসব জানত না। মাস দুয়েক বাড়ি ফেরেনি। গত সপ্তাহে শনিবার ফিরছিল। শেষবার তাকে দেখা গ্যাছে ব্রিজের চেকপোস্টে রাত বারোটা কুড়ি নাগাদ। মনসাতলা স্টেশনে নেমে সাইকেল চালিয়ে ব্রিজ পেরিয়ে শিমুলগাছাতে ঢুকেছে, কিন্তু বাড়ি ফেরেনি। পরেরদিন সকালে সাইকেল আর ব্যাগটা পাওয়া যায়। প্রসূনের বডি এখনও পাইনি— কিছু মনে করবেন না স্যার, ধরেই নিচ্ছি আর বেঁচে নেই।”

“হুম।”

“ঠিক তার পরের দিন” গলা একটু কেঁপে উঠল বড়োবাবুর, “পাপান নিখোঁজ হয়; ভালো নাম প্রদীপ্ত পাল। তিতলি পাল বলে যে বাচ্চা মেয়েটা মিসিং আছে, তারই দাদা। আমার ছেলের বন্ধু স্যার। শিমুলগাছা নেতাজি বিদ্যাপীঠে ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। সবাইকে স্ট্রিক্টলি বলা ছিল সন্ধের পর বাড়ি থেকে না বেরোতে। তাও কী করতে বেরিয়েছিল কে জানে! আজকে ওরই বডিটা পাওয়া গ্যাছে। জিভটা…”

“প্রতিটা কেসেই জিভের ব্যাপারটা কমন দেখছি।”

“আরও একটা ব্যাপার আছে স্যার। নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রত্যেকেই কিছু অদ্ভুত কথাবার্তা বলতে শুরু করেছিল। অন্তত তাদের পরিচিতরা সেরকমই জানিয়েছে।”

“কীরকম?”

“তারা নাকি তাদের আগে খুন বা নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের ডাক শুনতে পাচ্ছিল। তাদের ডাকছিল। যেমন, মানস বলে ছেলেটার বাড়ির লোক বলছে মানস নাকি তার মিসিং দুই ছাত্রীর গলা শুনতে পেয়েছিল নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে। তাকে নাকি জানলা দিয়ে ডাকছিল।

বিমলের বউও নাকি পড়শিদের বলেছে সে তার ছেলে আর স্বামীর ডাক শুনেছিল। প্রিয়াঙ্কার বাড়ির লোকের বক্তব্য তাদের মেয়েকে তিতলি রোজ রাতে এসে ডাকত।

তারা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ঠকঠকিয়ে কাঁপত। একদিন তার মধ্যেই কীভাবে যে মেয়েটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল!

আর তিতলির দাদা, মানে পাপানও তার বোন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই এই ধরনের কথা বলতে শুরু করে। আমার ছেলেকে আর বাকি বন্ধুদেরও বলেছে। ইনফ্যাক্ট আমাকেও পাপান এসে বলেছে স্যার।”

“কী বলেছে?”

“বোন আসে। রোজ রাতে জানলার বাইরে কাঁদে। বলে, দাদা আমাকে নিয়ে যা, আমার খুব ভয় করছে। ওর বাপ-কাকারা ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে থাকত। বোনকে খুব ভালোবাসত ছেলেটা। আমিও বুঝিয়ে বললাম যে বোনকে আমরা ঠিক খুঁজে বের করব। তুই বাবা এখন কোনো পাকামি করে বাপ-মায়ের বিপদ আর বাড়াস না।

এর মাঝে একদিন বিকেলের পর দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে হাঁ করে হেঁটে যাচ্ছিল। বন্ধুবান্ধবরা ফুটবল খেলে ফিরছিল। তারা দেখতে পেয়ে পাপানকে জোর করে ধরে আনে। বাড়ি ফিরে এসেও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল শুধু। একটাই কথা, বোন ডাকছে। বোনকে বাঁচাতে হবে।

শেষরক্ষা হল না স্যার। ওই ছেলেটাকেও নিয়ে নিল। আমরা যেসব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজেও লাশ পাইনি, ঠিক তার একদিন বাদেই ম্যাজিকের মতো লাশ হাজির।

সকালেই ওধারে খুঁজেছি— কিচ্ছু নেই। বিকেলে হঠাৎ লাশ হাজির। আমাদের নিয়ে যেন আততায়ী ছেলেখেলা করছে। ইচ্ছেমতো লাশ এদিক ওদিক করছে। যখন ইচ্ছে লুকোচ্ছে, যখন ইচ্ছে হানা দিচ্ছে আর আমাদেরকে উত্যক্ত করার জন্যই যেন আধখাওয়া লাশ ফেলে যাচ্ছে।

সেম কেস বছর তিরিশেক আগেও হয়েছিল স্যার। সেই ফাইল এখনও থানায় আছে। আমি স্টাডি করেছি। সেবারেও কোনো কিনারা হয়নি। তিন মাসের স্প্যানে পনেরোজনকে খেয়ে তবে থেমেছিল।”

অর্কর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সামনে রাখা কাপের চা’টা এখন ঠান্ডা জল— তাতে একটা মশা ভাসছে। অর্ক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। সাইরেনের শব্দে হঠাৎ চমকে উঠলেন।

শিমুলগাছার নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে ভোঁ-ও-ও-ও-ও-ও শব্দে সাইরেন বেজে উঠেছে। যেন বলছে, পালাও, যে যেখানে আছ প্ৰাণ হাতে নিয়ে পালাও। লুকিয়ে পড়ো। সূর্যদেব জাগার আগে কেউ বেরিও না। সাবধান! সে শিকারের খোঁজে বেরিয়েছে। শুনতে পাচ্ছ দক্ষিণের জঙ্গলের শুকনো পাতায় তার পায়ের শব্দ? ঝোপেঝাড়ে তার ক্ষুধার্ত চোখ জ্বলছে। খালে-ডোবায় তার আঁশটে উপস্থিতি। সাবধান!

বড়োবাবু দেঁতো হেসে বললেন, “আততায়ী মানুষ হলে, বাঘ-ভাল্লুক হলে লড়া যায় স্যার। কিন্তু কাঁচাখেকো অপদেবতা হলে কি তা সম্ভব? তাই একটু গা বাঁচিয়ে থাকা আর কী। ওঁর খিদে মিটলে আপনিই চলে যাবেন।”

পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে অর্ক বললেন, “বুলশিট।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *