।। শিমুলগাছাকে ঘেন্না করেন বড়োবাবু।।
প্রাচীন কলোনিয়াল ম্যানসনটার ড্রয়িংরুমে বিশাল কাচের জানলার সামনে বসে ছিলেন বড়োবাবু।
প্রায় গোটা বাড়িটাই অন্ধকারে ডুবে। দেওয়ালের জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে পলেস্তারা। ফাটল থেকে বট-অশ্বত্থের ঝুড়ি বেরিয়েছে। কাঠের ভারী জানলাগুলো সব পাটাতন মেরে বাইরে থেকে বন্ধ। সন্ধে নামলে এই থমথমে বিশাল বাড়িটায় আর কেউ আলো জ্বালে না।
মানুষ চলে যায়। বাড়ি টিকে যায়।
উঁচু সিলিং। জায়গায় জায়গায় দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। মাথার ওপর বিশাল টানা-পাখা— দড়িটা বহু বছর আগে কেটে গেছে। ভারী সেগুনের আসবাবগুলোর আড়ালে আঁধার জমেছে।
কাচের আলমারিতে ঠাসা ফাইল আর হলদে কাগজগুলোয় ব্যর্থতার গন্ধ। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে বড়ো গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটায় আর চাবি পড়েনি। থেকে আছে আড়াইটেতেই।
পেটমোটা কাচের গ্লাসে আবার একটু হুইস্কি ঢালেন বড়োবাবু।
একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েন বড়োবাবু। এক টোকে গিলে ফেলেন ঝাঁঝালো তরল।
তাঁর হাতে ধরা একটা পাতা। তাঁর বাবার ডায়রি থেকে আলগা হয়ে আসা পাতা।
“নভেম্বর, ১৯৯২
আবার সেই স্বপ্নটা দেখলাম। দু’চোখের পাতা এক করতে পারছি না। সামান্য তন্দ্রা এলেই সেই স্বপ্নটা হানা দিচ্ছে।
পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে কখন না জানি চোখ লেগে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল আস্তে আস্তে খুব গভীর কোনো অন্ধকার কুয়োয় আমি পড়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ দেখলাম আলো-আঁধারি একটা গোলাকার ঘরে আমি দাঁড়িয়ে আছি। মেঝেতে বিভিন্ন জায়গায় জ্বলছে বড়োবড়ো মোমবাতি আর ধাতুর প্রদীপ।
কোমর সমান লম্বা ধাতব স্ট্যান্ডে খুলে রাখা চামড়ায় বাঁধানো একটা মোটা বই। চারপাশ ধোঁয়াটে ঠেকছিল।
কোনোমতে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম প্রথম পাতায় অচেনা ভাষায় অনেক কিছু লেখা— সঙ্গে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা।
পাশের পাতায় কয়েকটা গোল বৃত্ত— তাদের প্রতিটার ভেতরেই ছয়কোনা তারা। এক একটা তারার মাঝে এক একটা বীভৎস সব প্রাণীর ছবি।
স্বপ্নে কি গন্ধ পাওয়া যায়? জানি না। তবে আমি পেলাম। হয়তো বা আমার মনের ভুল।
সেই হলঘর জুড়ে উগ্র ধূপ আর পোড়া চর্বির গন্ধ— যেমনটা মড়া পোড়ানোর সময় অনেকবার পেয়েছি। ওপরে তাকিয়ে দেখলাম ঘরের ছাদটা উঁচু, লম্বাটে গম্বুজের মতো। দেয়ালের এদিকে ওদিকে লোহার আংটায় অনেকগুলো জ্বলন্ত মশাল।
ঘরের মেঝের ওপর দেখলাম বইতে দেখা সেই গোল বৃত্তের ভেতর ছয়কোনা একটা তারা আঁকা।
হাঁপানির শব্দ পেয়ে চমকে পিছন ফিরে দেখলাম অন্ধকাদের বুক চিরে একটা রক্তাক্ত জোয়ান পুরুষের মৃতদেহকে দু’পা ধরে হেঁচড়ে হেঁচড়ে আলোর মধ্যে টেনে নিয়ে আসছে কেউ একজন।
মেঝে রক্তের লম্বা ছেঁচড়ানো আলপনা এঁকে সেই ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশকে নিয়ে এসে সে রাখল মেঝেতে আঁকা সেই ছ’কোণা তারার মাঝে। কোমরে হাত দিয়ে হাঁপাতে লাগল সে।
দেখলাম সেই ব্যক্তি ভারতীয় না। পোশাক ও চুলের রং দেখে মনে হল সে ব্রিটিশ। পরনে ভিক্টোরীয় যুগের পোশাক।
খোলা বইখানার সামনে দাঁড়িয়ে বিচিত্র ভাষায় সুর করে মন্ত্র পাঠ করতে শুরু করল সে।
কেঁপে উঠল মশালের শিখা। দপদপিয়ে উঠল মোমবাতি।
হা হা করে শ্বাস টানতে শুরু করল মাটিতে শুইয়ে রাখা সেই লাশ বুঝলাম সে লাশ না, শরীরে এখনও প্রাণ আছে।
কষ্টিপাথর কুঁদে বানানো তার শরীর। বড়ো বড়ো করে মেলে রাখা চোখজোড়ার দৃষ্টি সিলিঙে নিবদ্ধ। আধমরা হলে কী হবে— তার দু’চোখে অসম্ভব ক্রূরতা। ত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করছি। সাইকোপ্যাথ চিনতে ভুল হয় না আমার।
সে শ্বাস টানতে মুখটা হাঁ করছে। চমকে দেখলাম সেই হায়ের মধ্যে জিভটা নেই। গা গুলিয়ে উঠল আমার।
আচমকা মন্ত্রপাঠের আওয়াজ বন্ধ হতে দেখি সেই ব্রিটিশ সাহেব ঘুরে তাকিয়েছে আমার দিকে। দপদপিয়ে জ্বলতে থাকা তার সবুজ চোখে তীব্র ঘেন্না।
ঘড়ঘড় শব্দে চমকে উঠে আবার সেই আধমরা লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সোজা হয়ে উঠে বসেছে সে। আমার দিকে ফিরে হাঁ করল লোকটা— তার জিভহীন হাঁ থেকে গলগলিয়ে বেরিয়ে এল অন্ধকার।
জট পাকাতে পাকাতে আমাকে গ্রাস করল সেই অন্ধকার। মনে হল আমার মন থেকে জীবনের সমস্ত আনন্দ, সুখ, শান্তি কেউ শুষে নিচ্ছে। হাঁকপাঁক করতে করতে জেগে উঠে দেখি বসে রয়েছি আমার স্টাডিতে। সামনে নাইটল্যাম্পটা দপদপাচ্ছে।
ভয়ানক স্বপ্ন। ক’দিন বড্ড বেঞ্জামিন মুডি আর তার কাল্ট নিয়ে অবসেসড হয়ে পড়েছি। এ তারই এফেক্ট। আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।
লিখে রাখলাম। পরে ভুলে যেতে পারি।”
বড়োবাবুর হাত কাঁপতে থাকে। হুইস্কি তাঁর নার্ভকে শান্ত করতে পারছে না। এই একই স্বপ্ন ক’দিন হল তাঁর কাছেও ফিরে ফিরে আসছে।
মানসের লাশটা পাওয়া গিয়েছিল তিন দিন আগে নদীর ধারে। জলে ভিজে ভিজে ফ্যাটফ্যাটে ভিজে কাগজের মতো চামড়ার হাল। অর্ধেকটা খাওয়া। পেট নেই। এক হাতের মাংস পুরো খুবলে নিয়েছে। শুধু হাড় ঝুলে আছে।
মুখটা হাঁ করা ছিল। ছেঁড়া। ফাঁকা। জিভ নেই, যেন যত্ন করে কেউ বের করে নিয়েছে।
মানসকে বড়োবাবু চেনেন অনেক বছর। মানস তখন ছোটো ছিল।
প্রতি বছর নেতাজি বিদ্যাপীঠের স্পোর্টস ডে-তে জিমনাস্টিকের জন্য মেডেল পেত মানস। বড়োবাবু নিজের হাতে মেডেল পরিয়েছেন অনেকবার।
লাজুকভাবে হাসত ছেলেটা।
ফের গ্লাসে হুইস্কি ঢালেন বড়োবাবু।
দশ দিন আগে প্রিয়াঙ্কা নিখোঁজ হয়েছিল। পরে জঙ্গলের ভেতর এক পরিত্যক্ত বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়। দেওয়ালে রক্তের ছিটে, মেঝেতে শুকনো কালচে দাগ।
কিছু একটা তাকে খেয়েছে। জন্তু নয়। জন্তু হলে শিকারের একটা নির্দিষ্ট ছক থাকে। অন্য কিছু।
লোকাল খবরের কাগজ ‘আগামীর সূর্য’ ছিঁড়ে খাচ্ছে তাঁকে। “খুনের পর খুন।”
.
“শিমুলগাছা কি নিরাপদ?”
“নীরব দর্শক পুলিশ।”
“বড়োবাবু কি ফুঁটো?”
কলকাতায় খবর পাঠিয়েছেন তিনি। কলকাতা পাত্তা দেয়নি। ছোটো
শহর খবরে আসে না।
যতক্ষণ না কলকাতার গায়ে আঁচ পড়ে, কলকাতা পাত্তা দেয় না। আজকে থেকে তাই নাইট কার্ফুর সিদ্ধান্তে এসেছেন তিনি।
যতগুলো মার্ডার হয়েছে তার সবই ঘটেছে সূর্য ডোবার পর। যতক্ষণ না পর্যন্ত খুনি ধরা পড়ছে আপাতত নাইট কাফুই শিমুলগাছাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র পথ।
গ্লাসটা শেষ করে করিডরে বেরিয়ে আসেন তিনি।
থামেন একটা ঘরের ভেজিয়ে রাখা পাল্লার সামনে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেন পড়ার টেবিলে বসে আছে প্রত্যয়।
মাথা নিচু, হাতে পেন, লিখে চলেছে একনাগাড়ে। ছেলেটাকে ইদানীং রোগা দেখাচ্ছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকে খানিকক্ষণ দেখেন বড়োবাবু।
প্রত্যয় তাঁর কাছে খুব দামি।
জীবন তাঁর থেকে সব নিয়েছে। তিনি যা যা চেয়েছেন, যাকে যাকে ভালোবেসেছেন— জীবন থাবা মেরে ছিনিয়ে নিয়েছে। প্রত্যয়কে তিনি দিতে পারবেন না। কিছুতেই না।
আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হঠাৎই বেজে ওঠে সাইরেন— দীর্ঘ, সাবধানী, শীতল। চমকে উঠে প্রত্যয় তাকায় জানলার দিকে।
দরজার সামনে থেকে সরে আসেন বড়োবাবু। শিরদাঁড়া সোজা। পিস্তলটা হোলস্টারে ভরেন।
পা বাড়ান সদর দরজার দিকে। টহলের সময় হয়ে গেছে।
