।। শিমুলগাছা হেরে যায়নি ।।
শহরটা পুরোপুরি গুটিয়ে যাওয়ার অনেক পরেও গ্যারাজের শেডের ভেতর বসে থাকে তেন্ডুয়া। চারপাশে পরিবেশ স্তব্ধ গেছে অনেক আগেই।
গ্যারেজের শাটার নামানো, কাচের সার্সিতে ধুলো জমে পুরু স্তর তৈরি হয়েছে। রাস্তায় আর কোনো আলো জ্বলছে না।
বিদ্যুতের লাইনগুলো মৃত সাপের মতো ঝুলে আছে। কুকুরের ডাকও বহুদিন শোনা যায় না। যেন শহরটা নিজেও দম আটকে কোনো অনিষ্টের অপেক্ষায়।
তেন্ডুয়ার বাবা অনেক দিন হল নেই— কিন্তু এই শেডটা রয়ে গেছে। বড্ড জেদি, ঠিক ওর বাবার মতো। যেন এখনও মানতে চায় না যে সব শেষ।
শেডের ভেতরে ঢুকলেই নাকে লাগে মরচে, গ্রিজ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। দেয়ালের গায়ে কালচে দাগ, বহু বছরের ধোঁয়া আর হাতের ছাপ জমে তৈরি হয়েছে অচেনা সব আকার। ছাদের এক কোণ থেকে নিয়ম মেনে জল চুঁইয়ে পড়ে— টুপ! টাপ! টুপ! টাপ! জলের লাইনটা ইচ্ছে করেই সারায় না তেন্ডুয়া। ঠিক এই একই পরিবেশটা ধরে রাখতে চায় সে।
শেডছাড়া খোলা বাল্ব ঝুলে আছে তারে, হালকা হালকা দুলছে। স্প্যানার, প্লাস, চ্যাপ্টা কেরোসিনের ক্যান আর স্পোকহীন সাইকেলের রিমের ওপর বাঁকা ছায়া ফেলে সেই আলো।
সবকিছুই তার বাবার। সে তো আর নেই— আছে শুধু এগুলোই।
ওয়ার্কবেঞ্চের ওপর পড়ে আছে কার্তুজটা। তেন্ডুয়া সেটা আঙুলের মধ্যে নিয়ে ঘোরায়। ধাতব ঠান্ডা স্পর্শে তার ত্বক শিউরে ওঠে। এটা কখনও ছোড়া হয়নি।
কার্গিলের দিনগুলোর স্মৃতি। বাবা এটা নিয়ে ফিরেছিল। স্মারক, হেসে বলেছিল সে। প্রমাণ যে ভাগ্যেরও ওজন আছে।
তেন্ডুয়ার মনে পড়ে, ছোটোবেলায় সে এই গুলিটা পালিশ করত। বাবা বারবার বলত, “ফেলে দিসনি রে, হারিয়ে ফেলিসনি রে। তখন গুলিটা চকচক করত। এখন সেটা মলিন, কালচে। একটা বালিকাগজ তুলে নেয় তেন্ডুয়া। ধীরে ধীরে ঘষতে শুরু করে। ধৈর্য ধরে। মনে হয়, যেন ঘুমিয়ে থাকা কিছু একটা জাগিয়ে তুলছে। আলাদিন যেভাবে ঘষত তার আশ্চর্য প্রদীপ।
হঠাৎই মনে পড়ে যায় সেই সকালটার কথা। ইউনিফর্মে স্টার্চের তীব্র গন্ধ। বাবার বুটগুলো অস্বাভাবিক রকমের পরিষ্কার। মায়ের চোখ ছলছল। সিঁড়িতে বসে জুতোর ফিতে বাঁধছিল বাবা। তেন্ডুয়া দাঁড়িয়েছিল মায়ের আঁচল ধরে।
ফিতে বাঁধা শেষ করে ছেলের দিকে ফিরেছিল বাবা। কোনো বীরত্বপূর্ণ কথা বলেনি। কোনো দেশপ্রেমের ভাষণ দেয়নি।
শুধু বলেছিল, “মায়ের খেয়াল রাখিস।”
সেই শেষবার মায়ের সিঁথিতে কমলা সিঁদুর দেখেছিল সে। মায়েরও খেয়াল রাখতে পেরেছে কোথায় তেন্ডুয়া? যক্ষ্মায় ভুগে ভুগে শরীরটা মিশে গেছে বিছানায়।
কথা বলতে গেলেই ভলকে ভলকে রক্ত উঠছে মুখ দিয়ে। মা’কে খাইয়ে, ঘরের সব কাজকম্ম সেরে, সদর দরজায় ভারী তালা দিয়ে গ্যারেজে এসে বসে তেন্ডুয়া।
হঠাৎ একটা খচমচ শব্দে চটকা ভাঙে তেন্ডুয়া। শেডের বাইরে শুকনো ঘাসে পায়ের শব্দ।
দাঁড়িয়ে ওঠে তেন্ডুয়া। শব্দটা এগিয়ে আসে দরজার দিকে। ভেতর থেকে শিকল দেয়নি সে। ঠেললেই খুলে যাবে। শরীরটা হালকা ঝুঁকিয়ে সন্তর্পণে ওয়ার্কবেঞ্চ থেকে বড়ো মোটা রেঞ্চটা তুলে নেয় সে।
পোজিশন নেয় দাঁতে দাঁত চেপে। বিনা লড়াইতে মাটি সে নেবে না। ক্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঁচ শব্দে খুলে গেল দরজা।
দরজা দিয়ে যে ঢুকে এল তাকে দেখে বুক খালি করে শ্বাস ছাড়ল তেভুয়া। পরমুহূর্তেই ভারী অবাক হয়ে বলে উঠল, “এত রাত্তিরে একা একা কোত্থেকে এলে?”
একগাল হেসে বৃষ্টি বলল, “আরে শোনো না, আমি তো গিয়েছিলাম তানিয়ার বাড়ি। বেচারি খুব ভেঙে পড়েছে। চিলেকোঠার ঘরের দরজা জানলা বন্ধ ছিল। কথা বলতে বলতে বুঝতেই পারিনি কখন অন্ধকার হয়ে
গেছে। সাইরেন দিতে চমকে উঠলাম। তানিয়া আর ওর বাবা-মা আসতেই দিচ্ছিল না কিছুতে। বলে, থেকে যা রাতটা…”
“ঠিকই তো বলেছিল…”
“আমি না ফিরলে মা ঠিক থাকবে? চিন্তায় পাগল হয়ে মা-ই বেরিয়ে পড়বে রাস্তায়।”
“আমাকে ফোন করলে না কেন?”
“করেছিলাম। রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল।”
জিন্সের পকেট হাতড়ে জিভ কাটে তেন্ডুয়া। মা’কে খাওয়ানোর সময় ও ঘরের টেবিলে রেখেছিল স্যামসাং গুরুটা। এখনও সেখানেই রয়ে গেছে।
“খুব বাজে রিস্ক নিলে তুমি। কিছু ভাবে মা’কে খবর পাঠিয়ে দিতে পারতে…”
“ধুর, না বেরোলে তোমার সঙ্গে দেখা হত কীভাবে? হাঁটতে হাঁটতে অ্যাদূর চলে এসে দেখি গ্যারেজে আলো জ্বলছে।”
তেন্ডুয়ার কড়া পড়া চেটোয় বৃষ্টির নরম তেলোর স্পর্শ।
“মেয়ে বটে তুমি! যদি সেই রাক্ষসটা তাড়া করত?”
“তেন্ডুয়ার গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে পাঙ্গা নেবে? ধুর, অত দম রাক্ষসেরও নেই…”
তেভুয়া হাসে। ওয়ার্কবেঞ্চ থেকে কালো চামড়ার জ্যাকেটটা তুলে নেয় সে। বলে, “চলো, এগিয়ে দিয়ে আসি…”
“বাইকটা সারালে?”
“হ্যাঁ, আজ বিকেলেই ক্লাচের তারটা পালটালাম। বাইরেই স্ট্যান্ড করে রেখেছি।”
“ইয়ে, বলছি…”
“কী?”
“আমি না একা একা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসার সময় অদ্ভুত কিছু ফিল করেছি…”
“কী?”
“কেউ যেন আমাকে আড়াল থেকে দেখছিল… আর একটা বোঁটকা গন্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল… তারপর তো আমি তাড়াতাড়ি করে গ্যারেজে ঢুকে পড়লাম…”
ভুরু কুঁচকে তেন্ডুয়া বলল, “তাই? মনের ভুলও হতে পারে…”
কথাটা সে শেষ করার আগেই খোলা দরজা দিয়ে হিমেল বাতাস ঢুকে এলোমেলো করে দিল সবকিছু। ধড়ফড়িয়ে উড়ে গেল টেবিলে পেতে রাখা পুরোনো খবরের কাগজ, এলোমেলো হয়ে গেল বৃষ্টির চুল। ঠং ঠং ঠকাং করে গড়িয়ে গেল খালি টিনের ক্যান।
তেভুয়া আর বৃষ্টি দু’জনেই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল দরজার দিকে। দরজার ঠিক বাইরে জ্বলে উঠেছে হিংস্রে একজোড়া চোখ। বোঁটকা গন্ধে ভরে গেছে গ্যারেজ
ফ্যাকাশে চামড়া টানটান, প্রায় স্বচ্ছ। বরফে ফাটলের মতো শিরা ছড়িয়ে আছে সারা শরীরে। অঙ্গগুলো অস্বাভাবিক লম্বা।
লকলকিয়ে বেরিয়ে এসেছে লাল কাঁচা মাংস রঙের বিশাল জিভখানা। “আয় না… আয় না…”
আবিরের কণ্ঠস্বর। পরমুহূর্তেই খলখলে হাসি। রক্ত জল হয়ে যায় তাদের।
পেছনের পা মাটিতে আঁচড়ায় সেই দানব। ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি।
তেন্ডুয়ার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে যায়। দানবটা ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করতেই চোখের পলকে বৃষ্টিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় তেন্ডুয়া। ছিটকে পড়ে নিজেও।
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে তার। ঝাঁপিয়ে পড়েছে পুরোনো কাঠের টেবিলটার ওপর। চুরমার হয়ে যায় ঘুণ ধরা কাঠ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে যন্ত্রপাতি।
জিভখোরের ঘাড়টা বেঁকে যায় পেছন দিকে। কাঠের গাঁট ফাটার মতো শব্দ করে শরীরটাকে ঘোরাতে থাকে সে। জয়েন্টগুলো অদ্ভুতভাবে বাঁকছে, যেন হাত-পা ঠিকমতো ব্যবহার করতে শেখেনি সে।
তারপর মুখ খুলে যায় আবার। বেরিয়ে পড়ে জিভ। একটা নয়। অনেকগুলো।
স্তরে স্তরে জোড়া। পুরোনো আর নতুন। কিছু শুকনো, ফাটা কয়েকটা গোলাপি আর টাটকা। প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা ছন্দে কেঁপে ওঠে। বাতাসের স্বাদ নেয়।
তার দৃষ্টি তেন্ডুয়ার দিকে
ঘষটে ঘষটে পিছিয়ে এসে ওয়ার্কবেঞ্চে পিঠ ঠেকে যায় তেন্ডুয়ার। না তাকিয়েই তেন্ডুয়া জানে যে এই বেঞ্চের ওপরেই রাখা আছে মোক্ষম অস্ত্র।
আবার ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করতেই তেন্ডুয়া তুলে নেয় পেট্রোলের ব্যারেলটা। ছিপিটা খুলে নিয়ে পোজিশন নেয় সে।
থমকে যায় সেই দানব— বিপদের আঁচ পেয়েছে সে। জিভটাকে হাওয়ায় উঁচিয়ে তুলে হাওয়া মাপে যেন…
বৃষ্টি চটপটে মেয়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলেও পাশের র্যাক থেকে তুলে নেয় লাইটার।
ঘড়ঘড়ে গলায় গর্জে ওঠে সেই অস্তিত্ব। ফের ঝাঁপ মারার উপক্রম করে সে।
ব্যারেলটা তুলে পেট্রোল ছুড়ে মারে তেন্ডুয়া। তীব্র গন্ধে হকচকিয়ে যায় সে- এ গন্ধ রক্তের না, বিপদের। মাঝপথেই ব্রেক কষে সে। মুহূর্তে লাইটারটা ছুড়ে দেয় বৃষ্টি। লাইটারটা জ্বালিয়ে মেঝের পেট্রোলে ছুঁইয়ে দেয় তেন্ডুয়া।
দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুনের নদী। সেই আগুন স্পর্শ করেছে তাকেও। চাপা গর্জনে গুটিয়ে নেয় জিভ। জ্বলে উঠেছে তার একটা হাত, কাঁধ আর পিঠ।
তেন্ডুয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ে মেঝেতে। দুলতে থাকে বাল্বটা।
গায়ে আগুন ধরে যেতে সে এলোমেলোভাবে শেডের ভেতর ছুটে বেড়ায়। বিকট আর্তনাদে কেঁপে ওঠে বাতাস।
টিনের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দম বন্ধ করে এই ভয়ানক দৃশ্যের সাক্ষী হয় একজোড়া ছেলেমেয়ে।
উন্মাদ রাগে সব এলোমেলো করে দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় সে। পেছন পেছন দৌড়ে বেরিয়ে আসে তেন্ডুয়া আর বৃষ্টি
রাতের অন্ধকারে জ্বলন্ত শরীরটা তেজি ঘোড়ার মতো চার হাতে পায়ে দৌড়তে থাকে। গাছপালার আড়ালে সে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরের বেশ খানিক্ষণ চোখে পড়ে আগুনের আভা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী।
একে অপরের হাত ধরে সেদিকে তাকিয়ে থাকে তেন্ডুয়া আর বৃষ্টি। তাদের পেছনে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে তেন্ডুয়ার গ্যারেজ।
চোয়াল শক্ত হয় তেন্তুয়ার। শিমুলগাছা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সে এখনও রুখে দাঁড়াতে পারে— আঘাত হানতে পারে।
