উঁকি
জিভ

হিংসুটে, স্বার্থপর, শুয়োরের বাচ্চা

।। হিংসুটে, স্বার্থপর, শুয়োরের বাচ্চা ।।

ছেলেগুলো ঘুরেফিরে সেই দক্ষিণের মাঠে এসেই জড়ো হয়— কারণ আর কোথায় যাবে, তা ওদের কারও জানা নেই।

বৃষ্টি গেছে তানিয়াদের বাড়ি। গতকাল থেকে চিলেকোঠার পড়ার ঘর ছেড়ে বেরোয়নি তানিয়া। কিচ্ছুটি দাঁতে কাটেনি।

মাঠের মাঝখানে পড়ে থাকে বলটা। কেউ তাকে ছোঁয়নি।

চামড়াটা জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে, সেলাইয়ে বিস্তর ফাঁক। কসকো মিলানো বলের নীল রংটা চটে আজ ধূসর।

বিকেলের রোদটা নিচু হয়ে ঝুলে থাকে, বহুজনের হাত ঘোরা কোনো পুরোনো কয়েনের মতো— ঔজ্জ্বল্য নেই, শুধু ওজন আছে।

কারও দৌড়তে ইচ্ছে করে না। খালি পায়ে ঘাসে নামতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে না স্লাইড মারতে বা “গোল” বলে চেঁচাতে। মাঠটা আজ খেলাধুলোর নয়, অপেক্ষার জায়গা।

পাপান নেই। জন্মদিনের বিকেলের পর পাপান বাড়ি ফেরেনি। রাতেও ফেরেনি। পরের দিন সকালেও না।

হাফওয়ে লাইনের কাছে তেন্ডুয়া বসে আছে— পেশিবহুল হাতে দুই হাঁটু জড়িয়ে, চোখ তার মাটিতে। এই ভঙ্গিটা ওরা চেনে, বহুদিনের চেনা। সে গভীরভাবে কিছু ভাবছে।

বিশু কোমরে হাত দিয়ে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে, “শালা কী যে হচ্ছে? পাপানটা যে কোথায় গেল? বেঁচে আছে না মরে গেছে কে জানে! দু’রাত্তির ঘুমুতে পারিনি আমি। পাগলা পাগলা লাগছে।”

শান্ত গলায় তেন্ডুয়া বলে, “এত অস্থির হচ্ছিস কেন? পুলিশ খুঁজছে। আজ সকালেই বড়োবাবু সার্চপার্টি পাঠিয়েছেন দক্ষিণের জঙ্গলে।”

আবির হেসে ওঠে। হাসিটা ঠিক হাসি নয়— কেটে-কেটে বেরিয়ে আসে তিক্ততার আঁচ।

“বড়োবাবু?” সে বলে। “ওই মালখোর বুড়োটা? চুরি-ছিনতাই সামাল দিতে পারে না। সে আবার পাপানকে খুঁজে বের করবে ভাবছ?”

প্রত্যয় তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে— শরীরটা শক্ত, যেন কেউ ভেতর থেকে টেনে ধরে রেখেছে। খানিক পরে ধীরে ধীরে সে বলে, “ওটা আমার বাবা আবির। এ ধরনের কথা বলিস না।”

আবির সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে আগুন নয়, বরং একটা ঠান্ডা হিসেব।

“তাহলে তুইও এমন ভান করিস না যেন তুই কিছুই করিসনি। পাপানের সঙ্গে তোর বাওয়ালটা সবার সামনেই হয়েছিল। ছেলেটা সবে জন্মদিনের কেক কেটেছিল। তুই-ই কিন্তু গায়ে পড়ে ওকে অপমান করলি। তোর জন্যই পাপান আজ নেই …”

প্রত্যয়ের মুখটা ফের লাল হয়ে ওঠে, গলার কাছটা টনটন করে।

“আচ্ছা? আর ও যে তানিয়াকে কেড়ে নিল, তার বেলা? সাতখুন মাফ?”

এক মুহূর্তে নীরবতা নেমে আসে মাঠের ওপর— ভারী, চাপা।

পায়চারি থামিয়ে তড়বড়িয়ে এগিয়ে আসে বিশু, “ধুর বাল, খালি তানিয়া তানিয়া আর তানিয়া… বন্ধু বেঁচে আছে না মরে গেছে তার খোঁজ নেই, শালা খালি মেয়ে আর মেয়ে…”

“তানিয়া আমারও বন্ধু ছিল। পাপানের জন্য ও আর কথাও বলে না আমার সঙ্গে… আমি ওকে…” বুজে আসে প্রত্যয়ের গলা।

পিকু আর থামাতে পারে না নিজেকে।

“প্রত্যয়, একটা কথা বলি… তুই এবার এটা থেকে বেরিয়ে আয় ভাই… তোর আর তানিয়ার তো আগেই ব্রেকআপ হয়ে গিয়েছিল… পাপানের সঙ্গে তো তার পর…”

প্রত্যয় ফিরে তাকায় পিকুর দিকে। চোখ দুটো সরু হয়ে আসে, “তাই নাকি? তোকে কে বলল?”

“তানিয়াই বলেছে। মানে তানিয়া বৃষ্টিকে বলেছে। আমাকে বলেছে বৃষ্টি…”

“ও!” প্রত্যয় বলে, “সব জেনে গেছিস তাই না? স্পেকুলেট করছিসই যখন আমিও করি? আমি যদি বলি বৃষ্টিই তানিয়ার মাথা খেয়েছে? আমি যদি বলি বৃষ্টি একই সঙ্গে ডাবল গেম খেলছে? একদিকে তুই আর একদিনে তেন্ডুয়া। গাছেরও খাচ্ছে তলারও কুড়োচ্ছে…”

মাটি ছেড়ে ওঠে না তেন্ডুয়া। ঠান্ডা গলায় বলে, “ব্রেক মার ভাই। এখানেই ব্রেক মার।”

তার চোখ এখনও ঘাসের দিকে।

কথাগুলো পিকুর গায়ে লাগে। চোরকাঁটার মতো। ছোটো কিন্তু তীক্ষ্ণ।

সে বলে, “মোটেও না। তোর নিজের লাইফে কোনো ভালো বন্ধু নেই, আর তুই তাই কারও ভালো বন্ধুত্ব সহ্যও করতে পারিস না। তুই হিংসুটে প্রত্যয়।”

বিশু এগিয়ে যায় জঙ্গলের দিকে। বলে, “ধুর, ভাল্লাগছে না। একটু মুতে আসি। তোরা ছেঁড়া…”

মাঠের ধারের ঝোপঝাড়ের দিকে চলে যায় সে। পুরোনো বাবলা গাছটার কাছে, যেখানে বছরের পর বছর আবর্জনা ডাঁই হয়ে থাকে। বেড়াল মড়া, কুকুর মড়া নিয়ে এসে ফেলে লোকে।

এদিকে উত্তপ্ত পরিবেশ গলিয়ে বের করে আনে বুকের মধ্যে জমে থাকা পুরোনো অভিমান। আবির বলে, “কথাটা ভুল বলিসনি পিকু। ইলেভেনের অ্যানুয়ালে ওর পেছনে বসে এত করে বললাম, ভাই একটু দ্যাখা, ফেল করে যাব ভাই। শালা একটুও দেখাল না! অঙ্কটায় ফেল করিয়েই ছাড়ল! তুই ফার্স্টবয় হতে পারিস প্রত্যয়, কিন্তু তুই স্বার্থপর।”

একটা করুণার হাসি আবিরের উদ্দেশে ছুড়ে দিয়ে প্রত্যয় বলে, “কোত্থেকে কোথায় চলে গেলি… এই জন্যই বলি গ্রো আপ…

আবির ফুঁসে ওঠে। বলে, “গ্রো আপ? মাথার ওপর বাপ আছে বলে এত বড়ো বড়ো কথা তাই না? লোকের বাড়ি বাড়ি জল তুলে দিই, সাইকেল চালিয়ে মুদিখানার মাল দিয়ে বেড়াই গোটা শিমুলগাছা, বিয়েবাড়ির সার্ভিসে যাই। কেন বল তো? মা’কে সাপোর্ট দিতে। আমাকে শেখাচ্ছে গ্রো আপ। শালা শুয়োরের বাচ্চা…”

“কী বললি?” তেড়ে আসে প্রত্যয়। স্প্রিঙের মতো দাঁড়িয়ে উঠে তার বুকে হাত রাখে তেন্ডুয়া।

পিকু মুখ খুলেও আবার বন্ধ করে। বলার মতো কিছু কি আছে?

চারপাশের হাওয়া ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে। পুরোনো ঈর্ষা, গুমরে থাকা অভিমান, জমে থাকা রাগ— সব যেন মাটি ফুঁড়ে মাথা তোলে।

পিকু পাপানকে মিস করে খুব।

ও থাকলে একটা উদ্ভট মন্তব্য, বিড়ির ধোঁয়ার একটা রিং দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিত সব।

“ওরেএএএএএ… কই রেএএএএএ…

বিশুর চিৎকার।

চমকে ওঠে সবাই।

ঝোপঝাড় ভেঙে, শুকনো পাতা মচমচিয়ে জঙ্গলের দিক থেকে ছুটে আসছে বিশু।

চোখ বড়ো বড়ো, মুখের চামড়া রক্তশূন্য।

আমরাও দৌড়ে যাই ওর দিকে। মাঝপথে ধরি বিশুকে।

হাঁটুতে হাত দিয়ে হাঁপাতে থাকে সে।

“ও-ওখানে… বাবলা গাছের গোড়ায়…

“কী হল রে? কী দেখলি?”

বিশুর মুখ থেকে কেউ যেন সব রক্ত টেনে নিয়েছে। কাগজের মতো

ফ্যাটফ্যাটে সাদা তার মুখ।

“ঝোপের ভেতরে…”

“কী?” আবির জিজ্ঞেস করে, “দেখলিটা কী?”

পিকু, প্রত্যয়, তেন্ডুয়া এগোতে থাকে সেদিকে।

পচা একটা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারে। কোত্থেকে একটা প্রকাণ্ড

শকুন এসে বসে বাবলা গাছের ডালে।

একলা ফুটবলটা পড়ে থাকে মাঠের মাঝখানে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *