।। পিকুর দুঃস্বপ্ন ।।
সেদিন রাতে একটা বড়ো অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল পিকু। পিকু দেখল সে বসে আছে চিলেকোঠার ঘরের ওই কাঠের বাক্সটার ওপর। টেবিলে একটা মাথাখোলা লন্ঠন জ্বলছে। তার শিখাটা স্থির। অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকাল সে। বাঁয়ে বইয়ের আলমারির কাচে নিজেকে দেখে চমকে উঠল পিকু। এ কী! তার মুখ, গা, হাত- পালটে গেল কীভাবে? এ যে নীলে মামা!
ভারী গলায় কেউ বলে উঠল, “তুই যা বলছিস সব সত্যি তো নীলে?”
পিকু দেখল তার উলটোদিকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছেন। বেশ ভারিক্কি চেহারা। মোটা কাচের চশমা। স্যার আশুতোষের মতোন গোঁফ। পিকু দেখল সে নিজের ইচ্ছেয় হাত-পা নাড়াতে পারছে না। নীলের চোখ দিয়ে সে সাক্ষী হচ্ছে অনেক বছর আগের এক অভিশপ্ত ইতিহাসের।
দাঁড়িয়ে ওঠে সে। বাঁ পা’টা তুলে ধরে আলোতে। তার বাঁ পায়ে বড়ো একটা ব্যান্ডেজ জড়ানো। এবার পেছন ফেরে সে। গেঞ্জিটা তুলে নিজের পিঠ দেখায় লোকটাকে।
ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “এ কী! এ তো বড়ো নড় নখের আঁচড়ের দাগ। কয়েকটা ক্ষত তো বেশ গভীর।”
“দ্যাখ নীলে, অলৌকিকে আমার বিশ্বাস নেই। আমি এটুকু জানি যে এই ক্ষত তুই নিজে করতে পারিস না। কিন্তু কেউ না কেউ তো অত্যাচার করছে তোর ওপর।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
তুই একটু বোস। তোর বাবাকে ডেকে পাঠাই। কথা আছে। কলকাতা যেতে হবে তোকে নিয়ে। এ চিকিৎসা এখানে হবে না…”
চিৎকার করে ওঠে পিকু। এ গলার স্বর তার না। নিশ্চয়ই নীলেমামার, “কো-কোথায় যাচ্ছেন জেঠু? আমাকে একা রেখে যাবেন না। ও মেরে ফেলবে। একা থাকলেই মেরে ফেলবে। ভটচায জেঠু…”
ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বলেন, “কিচ্ছু হবে না। তুই সেফ। চুপচাপ বোস। আমি নীচে যাচ্ছি। তোর বাবাকে খবর পাঠিয়েই এক্ষুনি আসছি। অনেক কথা আছে। দরজাটায় হুড়কো দিয়ে যাচ্ছি। কোনো ভয় নেই।”
পিকু মরিয়া হয়ে ছুটে যায় দরজার দিকে, নীলেই চালিয়ে নিয়ে যায় তাকে, “না জেঠু। না…”
বাইরে থেকে ভারী হুড়কো টানার শব্দ কানে আসে।
পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে। দেয়াল ঘড়ির টিক-টিক শব্দ তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনির সঙ্গে পাল্লা দেয়। পিছিয়ে আসে এক পা-এক পা করে।
তার আতঙ্কিত দৃষ্টি ঘরের আনাচ কানাচে কাকে যেন খোঁজে।
পিকু দেখে সেই কাঠের বাক্সটা একটা চেয়ার হয়ে গেছে। দু’পা ওপরে তুলে জড়োসড়ো হয়ে বসে সে। ঘরের বাতাস ভারী হচ্ছে। একটা ইঁদুর-পচা বোঁটকা গন্ধ তার পা বেড়ে সড়সড়িয়ে উঠতে শুরু করেছে।
খসখসে গলায় একটা চাপা হাসির শব্দ ভেসে আসে। চমকে তাকায় পিকু। তার ঠিক উলটোদিকের দেয়াল-আলমারির পাল্লা ঈষৎ ফাঁক। পাল্লায় খোদাই করা দু’টো মস্ত মস্ত চোখ। সে কী! এই আলমারিটা তো আগে এখানে ছিল না!
ভিতরে বোয়াল মাছের হাঁয়ের মতো অন্ধকার। বিস্ফারিত চোখে সেদিকে চেয়ে থাকে পিকু।
ঠিক তখনই তার কাঁধের ওপর দিয়ে এগিয়ে আসে একটা হাত। ব্যাঙের ছাতার মতো ফ্যাটফ্যাটে তার চামড়ার রঙ। বিকৃত লম্বাটে আঙুলে কালো কালো ধারালো নখ। আলতো করে লন্ঠনের চিমনিটা তুলে নেয় সেই হাত।
পিকু জমে বরফ। বাঁ কাধে আলতো স্পর্শ পেয়ে আড়চোখে পিকু দেখে একজোড়া কালচে ঠোঁট আর হলদে দাঁতের সারি। চওড়া হয় তার ক্রূর হাসি। এক ফুঁয়ে দপ করে নিভে যায় লন্ঠনের শিখা।
পিকুর চোখের সামনে আসে অন্ধকার।
সেই অন্ধকারে শোনা যায় নীলের বুক ফাটা আর্তনাদ। ঘসঘসে গলায় কে যেন প্রাণপণে হাসি চাপার চেষ্টা করে।
ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল পিকু। এই শীতেও তার জামা ঘামে ভিজে জবজব করছে। তার পাশেই মা ঘুমোচ্ছে। কাচের জানলার বাইরে বৃষ্টি নেমেছে মুষলধারে।
