।। শূন্য পৰ্ব ।।
“তার চোখদু’টো ঠিক হাঁসের ডিমের মতোন। আ-আর তার চোখে কোনো মণি নেই। সাদা, ফ্যাটফ্যাটে সাদা…”
ঢোঁক গেলে নীলে। টেবিলের ওপর রাখা মস্ত লন্ঠনের লালচে শিখাটা কেঁপে ওঠে হঠাৎই। লোডশেডিং। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে। দূর থেকে ভেসে আসে শাঁখের ক্ষীণ শব্দ— কে যেন সন্ধে দিচ্ছে। ডাক্তারবাবু গমগমে গলায় বলেন, “ওভাবে না, গোড়া থেকে বল। কবে থেকে ঘটনার সূত্রপাত, কী কী ঘটেছে সব খুলে বল। গলা শুকিয়ে গেলে জল খেয়ে নে।”
টেবিলে রাখা কাচের গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে ঢকঢক করে গ্লাস খালি করে নীলে।
ভটচায ডাক্তার চশমার ওপর দিয়ে দেখেন ছেলেটার দু’চোখের কোলেই পুরু কালির ছোপ। চোখজোড়া কোটরে ঢুকে গিয়েছে। কণ্ঠাটা উঁচু হয়ে আছে।
ঠক করে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখে ছেলেটা। দেয়াল ঘড়ির পাশে সেঁটে থাকা থলথলে টিকটিকিটা একটা আরশোলা গিলেছে। ঠোঁটের কোণ দিয়ে একখানা কাঁটাওয়ালা ঠ্যাং বেরিয়ে রয়েছে। ঠ্যাংটা আবার হালকা হালকা নড়ছে। সেদিকে একবার আড়চোখে দেখে নিয়ে তলার ঠোঁটটা কামড়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে নীলে। তারপর ফ্যাসফ্যাসে গলায় শুরু করে, “ভচ্চায জেঠু, আপনি তো জানেনই আমি অঙ্কে কাঁচা। এবারে অ্যানুয়াল পরীক্ষা দিয়েই বুঝে গেসলাম যে পাশ আমি করবুনি। অঙ্ক পরীক্ষার আগেরদিন রাত্তির আড়াইটে অবধি বাবা ইম্পর্ট্যান্ট অঙ্কগুলো কষিয়েছিল। ঠিক সেগুলোই ভুল করে এসেছি। ফিরে বাবাকে বলেছিলাম যে পরীক্ষা ভালো হয়েছে। আমি জানতুম যে রেজাল্ট বেরুলে বাবা পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেবে। তাও একটা সাবজেক্টে ফেল হলেও নতুন কেলাসে তো উঠেই যাব। ক’দিন বইপত্তরও ছুঁইনি। সারাদিন মরেপিটে খেলেছি। মা চ্যাঁচালে বলেছি, কেলাস এইটে উঠে দিনরাত পড়ব; এখন ক’টা দিন খেলে নিই। রেজাল্টের দিন চান-টান করে ভাত খেয়ে ইস্কুলে যেতেই আমার মাথায় বাজ পড়ল। রেজাল্ট হাতে পেয়ে দেখি শুধু অঙ্ক না, চার-চারটে সাবজেক্টে ফেল করেছি।”
আঙুলের কর গোনে নীলে, “অঙ্ক, ইতিহাস, ভৌতবিজ্ঞান আর ভূগোল। রেজাল্টে লাল কালি দিয়ে হেডস্যার বড়ো বড়ো করে লিখেছেন, অনুত… অনুত্তি… অনুত্তি…”
গম্ভীর গলায় ডাক্তারবাবু বললেন, “অনুত্তীর্ণ।”
“হ্যাঁ জেঠু, ওই অনুত্তিন্ন। একশো আটষট্টি রোল ভোম্বলও পাশ করে গ্যাছে। সে আমাকে ভেঙচি কেটে গেল। আমি ঠিক করলাম আর বাড়ি ফিরব না। এই রেজাল্ট নিয়ে ঘরে ঢুকলে বাবা জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে। সারা দুপুর, বিকেল দক্ষিণের মাঠে বসে রইলাম। বাগদি পাড়ার ছেলেগুলোর সঙ্গে খানিকক্ষণ পাওয়ার-বলও খেললাম। তারা চলে যেতে ঘাসের ওপর শুয়ে শুয়ে অনেক ভেবেচিন্তে শেষে ঠিক করলাম যে কলকাতা যাব। মনসাতলা স্টেশনে কাল ভোরে পাঁচটা চোদ্দোর লোকালটা ধরতে পারলে বেলাবেলি কলকাতা। ট্রেন থেকে নেমে একটা বাস বদলাতে হবে শুধু। পকেটে দশ- বারো টাকা ছিল। অসুবিধে হত না। কলকাতায় আমার সেজোমাসির বাড়ি। চারবার গেছি। ঠিক চিনে চলে যেতে পারব। তারপর কাজ-কারবার করে অনেক টাকা কামিয়ে ফিরে আসব। বাবা তখন আর মারধর করবে বলে মনে হয় না। আমি বড়োলোক হয়ে ফিরে এসে বাবা-মায়ের ঝগড়াও বন্ধ করে দোব। মুশকিলটা হল সেই রাত্তিরটা কাটানো নিয়ে।
শিমুলগাছা আর মনসাতলায় বাবাকে সব্বাই চেনে। সন্ধে নামবে খানিক বাদেই। সেই সকাল দশটায় বেরিয়েছি। বাড়ি ফিরিনি দেখে এখনই বোধহয় চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গ্যাছে। সন্ধেবেলা কেউ যদি দেখে আমি শিমুলগাছা ব্রিজ বা মনসাতলা স্টেশনের আশেপাশে ঘুরঘুর করছি, হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাড়ি নিয়ে গিয়ে ফেলবে।
তখনই আমার মাথায় বুদ্ধিটা খেলল। আপনি তো জানেনই জেঠু যে দক্ষিণের জঙ্গলে অনেক পোড়ো বাড়ি-টাড়ি আছে। আমরা বন্ধুরা মিলে অনেকবার সেখানে ঢুকেওছি। কখনও খরগোশের বাচ্চা, কখনও বা পাখির ডিম খুঁজতে। বেশিরভাগই যেতুম অবশ্য লুকোচুরি খেলতে। যদিও নেকড়ে বা ভাল্লুকের ভয়ে খুব গভীরে কোনোদিনই যাইনি, তাও ভাঙাচোরা বেশ ক’টা বাড়িঘর চোখে পড়েছে। জঙ্গলে ঢুকে খানিকটা গেলেই বড়ো দিঘির পাড়ে একটা চওড়া দালানওয়ালা বাড়ি রয়েছে। সবাই বলে সেখানে নাকি এক নীলকর সাহেব থাকত; ক’টা ঘর এখনও আস্ত আছে। কলেজের ছেলেরা মাঝেমধ্যে সেখানে মাদুর পেতে তাস-টাস খেলে। একবার আমাদের পাড়ার বিল্টুদার সঙ্গে আমি গেসলাম। জানতে পেরে বাবা পিটিয়ে তক্তা করে দিয়েছিল। যাকগে, তো ভাবলুম সেই বাড়িটাতেই আজ রাত্তিরটা কোনোমতে কাঁটিয়ে দিই। মাদুর, মোমবাতি, দেশলাই সবই ওখানে পাওয়া যাবে।”
দম নেয় নীলে। লন্ঠনের আলোয় ভটচায ডাক্তারের বিশাল কালো ছায়ার মাথা কড়িকাঠ ছুঁয়েছে। স্যার আশুতোষের মতো পুরু গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে তিনি বললেন, “তারপর? গেলি সেই বাড়িতে?”
ফ্যাসফ্যাসে গলায় ফের শুরু করে নীলে, “দক্ষিণের জঙ্গলে ঢুকে বাঁয়ের পায়ে চলা রাস্তাটা ধরে খানিকটা এগুলেই বুড়ো বটের ভাঙা বেদি। সেই বটগাছ ছাড়িয়ে মিনিটপাঁচেক দক্ষিণমুখো হাঁটলেই বাড়িটা। একটা টোকো আম গাছের মোটা গুঁড়ির আড়াল টপকাতেই দেখি বিতিকিচ্ছিরি রাক্ষসের মতো বাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন ব্যাটা আমারই অপেক্ষায় ওঁত পেতে ছিল। চোরকাঁটার ঝোপ-টোপ পেরিয়ে বাড়ির উঠোনে নামলাম। বাঁদিকে বাবলা বন। ডানদিকে প্রকাণ্ড দীঘি। পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিরঝির করে উত্তুরে হাওয়া বইছিল। আমার বেশ শীত শীত করছিল। ভাগ্যিস ফুল-হাতা সোয়েটারখানা পরে বেরিয়েছিলুম। দিঘির কালো জলে কী একটা বড়ো মতোন ঘাই মারল। আলো প্রায় মরে এসেছিল। সেই চওড়া দালান, উঠোনে সেই ফণীমনসার ঝোপ… শুধু… শুধু একটা জিনিস দেখে অবাক হলাম…”
“কী জিনিস?”
“ছাদের ওপর একটা ঘর। আগে যতবারই এসেছি কখনও খেয়াল করিনি যে এই বাড়ির ছাদেও একটা ঘর রয়েছে। একতলা বাড়ি, ন্যাড়া ছাদ— এতদিন তাই-ই জানি। আজ দেখি ছাদের ওপর একটা বেশ বড়ো ঘর। দেয়ালগুলো কুচকুচে কালো। গতবছর মানু মশাটের আড়তে আগুন লেগে সব পুড়ে গেসল মনে আছে জেঠু? তারপর দেয়ালগুলো কীরম কালো মতোন হয়ে গেসল— ঠিক সেইরকম। তার মাথায় আবার গির্জের মতোন চুড়ো করা। আমি তো হাঁ…”
“তারপর?”
“খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা-টাথা চুলকে সেটাই ভাবলুম। তারপর মনে হল বনে জঙ্গলে আলো-আঁধারে কখন কী দেখেছি তার কি কোনো ঠিক আছে? হয়তো ঘরখানা বরাবরই ছিল। আগে খেয়াল করিনি। অন্ধকার হয়ে আসছিল। একতলার ঘরগুলোর দরজা-জানলার কোনো কপাট আর বাকি নেই। চোর-ছ্যাঁচোড়ে সব কবে খুলে নিয়ে গিয়ে বেচে দিয়েছে। থামগুলোর গা চটে পান-খাওয়া দাঁতের মতোন ইট বেরিয়ে রয়েছে। চারদিকে অশ্বত্থ চারা গজিয়েছে। দালানের কড়িকাঠ থেকে ক’টা বাদুড়ও হেঁটমুণ্ডু হয়ে ঝুলে আছে। কাছেপিঠেই কোথায় একটা খ্যাঁকশিয়াল ডেকে উঠল। আমার ভয় লাগছিল জেঠু। কিন্তু বাড়ি গেলেই দেখব বাবা পেয়ারা গাছের ডাল নিয়ে রেডি…”
লন্ঠনের হলদে আলোয় নীলের চোখ ছলছল করে।
স্নেহার্দ্র কণ্ঠে জেঠু বলেন, “জল খাবি?”
“না জেঠু, ঠিক আছে। সাহস করে পায়ে পায়ে এগিয়ে একতলার ধারের ঘরটায় ঢুকলাম। দেখি মেঝের কোণে গুটিয়ে রাখা মাদুর। এই ঘরটাতেই বিল্টুদারা তাস-টাস খেলে। দেয়ালের আংটায় একটা পেলাস্টিকের প্যাকেট ঝুলছে। প্যাকেটটা পাড়তেই দেখি দেশলাই, মোমবাতি, আর একটা ছোটো টর্চলাইট। বিল্টুদাদের বন্ধুদেরই জিনিস। একটা চিঁড়েভাজার প্যাকেটও জেঠু ছিল। সেই সকালে দু’টো ভাত খেয়ে বেরিয়েছি। খিদেও পেয়েছিল তেড়ে। প্যাকেটটা কেটে গালে ফেললাম। এক প্যাকেট চিঁড়েভাজা খেতে পেটের আগুন খানিকটা নিভল। বোতলের ছিপিটা খুলে একবার শুঁকে নিয়ে ঢকঢক করে আধ-বোতল জলও খেয়ে নিলুম। বাকিটা রাখলুম রাত্তিরের জন্য। ততক্ষণের ভালোই অন্ধকার নেমেছে। একটা মোমবাতি জ্বেলে মাদুর বগলে ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালুম। নীচের ঘরগুলোর একটা দরজা-জানলাও আস্ত নেই। রাত্তিরে যদি বুনো কুকুর বা খ্যাঁক শিয়াল ঢুকে আসে, কে বাঁচাবে? মেঝেতেও ফাটাফুটি বিস্তর— কেউটের লেজ না কী একটা যেন দেয়ালের ফাটলে সাঁৎ করে সেঁধিয়ে গেল। যদিও শীতকাল শুরু হয়েছে, সাপ বেরুনোর চান্সটা কম তাও আমি আর ঝুঁকি নিলাম না। উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম ছাদের ঘরের দরজা-জানলাগুলো এখনও আস্ত আছে। রাত্তিরে জন্তু জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচতে ওই ঘরটাই ভরসা।”
“তোর তো দেখি ব্যাটা সাহস ভালোই। তোর বাবা তাহলে আমার কাছে এসে হত্যে দিল কেন? ছেলে খায় না, ঘুমোয় না, একা শোয় না। দিনদিন শুকিয়ে আমসি হয়ে যাচ্ছে। খালি কী যেন দেখতে পায়…”
শিউরে ওঠে নীলে। ঘরের আনাচে কানাচে ভীতু চোখে কী যেন খোঁজে। দেয়ালের কোণায় জমে থাকা অন্ধকার হাতড়ায় তার সাবধানী দৃষ্টি। ফিসফিসিয়ে বলে, “ভয় যে তখন পেতুম না জেঠু। এখন পাই…”
শীতের শিমুলগাছা নিস্তব্ধ, থমথমে। সবাই যেন হঠাৎই কোন মন্ত্রবলে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেয়াল ঘড়ির টিক-টিক শব্দ ছুচের মতো কানের পর্দায় বিঁধতে থাকে।
নীলে ফের শুরু করে, “সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে ছাদে উঠে এলাম। ছাদময় যত রাজ্যের শুকনো পাতা, ডাল আর পাখির গু। এই প্রথম রাতের জঙ্গল দেখলাম আমি। দিঘির জলে ঠিকরে যাচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদের আলো। কী ভালোই যে লাগল জেঠু! কিছুক্ষণের জন্য যেন ভুলেই গেসলাম যে আমি আর বাড়ি ফিরব না। ছাদ পেরিয়েই সেই ঘরটা। হাওয়ার দমকে বাতিটা নিভে গেসল, কিন্তু চাঁদের আলোয় কোনো অসুবিধে হল না। ঘরের দরজাটা কাঠের। জ্যোৎস্নার আলোয় তার পালিশ ঝকমক করছিল। খুব অদ্ভুত নকশা কাটা— দু’টো পাল্লায় দু’টো চোখ। বড়ো বড়ো চোখ মেলে দরজাটা যেন আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি একটু ঘাবড়ে গেসলাম ঠিক কথা, কিন্তু বাবার লাল টকটকে চোখের কথা মনে পড়তেই তাড়াতাড়ি করে দরজা ঠেলে আমি সেই ঘরে ঢুকে পড়লাম… কেন যে ঢুকলাম…”
কেঁপে ওঠে নীলে। কাছে-দূরে শেয়ালদের কোরাস ওঠে— হুহুহুহু-
হুক-হুক-হুক-হুক-হুয়া!
ভটচায ডাক্তার বলেন, “কেন? কিছু দেখলি?”
“না জেঠু। তখনও কিচ্ছু দেখিনি। ফাঁকা ঘর। সাদা কালো খোপখোপ পাথরের মেঝে। একদিকে দরজা আর তিনদিকে তিনটে বড়ো বড়ো জানলা। ঘরের মাঝখানে পাথরের ওপর শুধু একটা নকশা কাটা। গোল আছে, ত্রিভুজ আছে, আবার অজানা ভাষায় কীসব যেন লেখাও আছে। আ-আর কোণের দিকে একটা বড়ো কাঠের আলমারি। পাল্লার হাতল টেনে দেখলাম খুব শক্ত করে আঁটা। চোর-ডাকাতদের নজর এড়িয়ে অ্যাদ্দিন কীভাবে টিকে আছে কে জানে।
উত্তরের জানলাটা খোলা ছিল। শনশন করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। চাঁদের আলো পড়ে পাথরের মেঝে ঝকঝক করছিল। মাদুরটা পাতলাম। জানলার গরাদ ধরে দাঁড়াতেই খুব কান্না পেল জেঠু। দিদির কথা মনে পড়ল। মায়ের কথাও। আমি যে ঠিক করেছি আর বাড়ি ফিরব না। এমনকী বাবার কথা মনে হতেও গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগল। মনে হল বাড়ি ফিরে যাই। একটু না হয় মারই খেলাম; ও আমার অভ্যেস আছে। কলকাতা যাওয়ার ইচ্ছেটা যেন হঠাৎই উবে গেল। মনটা ধীরে ধীরে নরম হতেই অন্য একটা ভয় বুকে চেপে বসতে শুরু করল। এই বাড়িতে গোটা রাত একা থাকব কীভাবে? গলা শুকিয়ে গেল। অন্ধকারটা আরও জাঁকিয়ে বসল। জানলার বাইরের গাছপালাগুলো যেন অন্ধকারে ড্যাবডেবিয়ে চেয়ে আছে আমার দিকে। জন্তু জানোয়ারের ডাক কানে আসা শুরু হতেই কেঁপে উঠলাম। হাত-পা জমে বরফ। এখন একা একা জঙ্গল ভেঙে বাইরে বেরুনোও তো খুব বিপজ্জনক। অন্ধকারে শেয়ালের গর্তে পড়ে ঠ্যাং ভাঙবে, নয়তো বুনো কুকুরের দল জ্যান্ত ছিঁড়ে খাবে। যেভাবেই হোক আজ রাতটা এ বাড়িতে কাটাতেই হবে। ভোরের আলো ফুটলেই সিধে বাড়ি।
তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা-জানলা সব বন্ধ করে ছিটকিনি আঁটলাম। মেঝেতে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে রেখে মাদুরের ওপর বাবু হয়ে বসলাম। বুক ঢিপঢিপ করছিল। বাইরে হাওয়ার শনশনানি, শেয়ালের হুক্কা হুয়া, বুনো কুকুরের খ্যাকখ্যাকানি সব কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম। শুনতে শুনতে ওই ঠান্ডা মেঝেতেই কখন যে ঢুলে পড়েছি মনে নেই…”
“এক ঘুমে সকাল?”
“তা হলে তো হয়েই যেত জেঠু। কখন যেন ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হল ঘুমের ঘোরে খুট করে একটা শব্দ শুনেছি। অন্ধকার ঘুটঘুট করছে ঘর। প্রথমে কিছুক্ষণ বুঝতে পারিনি আমি কোথায়। তারপর একটু একটু করে সবটা মনে পড়তেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। মোমবাতিটা নিভে গ্যাছে। চারপাশ বড্ড থমথমে। কোনো শব্দ নেই। পকেটে ছোটো টর্চটা ছিল।
সেইটে জ্বেলে নিয়ে চারদিকে ঘোরালাম। মেঝেতে আধপোড়া মোমবাতিটা চোখে পড়ল। দরজা-জানলা ভালোভাবেই আঁটা। টর্চের আলোটা ঘরের কোণে পৌঁছতেই বুঝতে পারলাম খুট শব্দটা কোথা থেকে এসেছে। কোণের সেই আলমারির দরজাটা হালকা ফাঁক হয়ে আছে। খুবই অল্প ফাঁক। টর্চের আলো ভেতর অবধি ঢুকতে পারেনি। ভেতরটা অন্ধকার।”
“হুম। হতেই পারে। পুরোনো কলকবজা তো। হাওয়ার চাপের তারতম্য হলে কখনও কখনও নিজে থেকেই এদিক ওদিক হয়…”
“না জেঠু, ওই আলমারির পাল্লা নিজে থেকে ফাঁক হয়নি। কেউ খুলেছে। বাইরে থেকে না; কেউ ভেতর থেকে খুলেছে। আমার মনে হল ওই ফাঁক দিয়ে কেউ আমাকে দেখছে। তার নিশ্বাসের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি। খানিকক্ষণ কাঠ হয়ে বসে থাকার পর আমি খাট থেকে নামলাম। আমাকে যেন ভূতে পেয়েছিল জেঠু। আমার পা-জোড়া আমাকে চালিয়ে নিয়ে গেল সেই আলমারির দিকে। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা টর্চ। নিজের বুকের ধুকপুকুনি নিজে শুনতে পাচ্ছি। আলমারির ঠিক সামনে এসে দাঁড়াতেই একটা পচা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারল। ইঁদুর পচলে যেমন গন্ধ হয়, সেরকম। স্পষ্ট শুনলাম আলমারির ভিতর থেকে একটা চাপা হাসির শব্দ। কেউ যেন অতি কষ্টে হাসি চাপছে। হাত কাঁপছিল। তাও একটা হাতল ধরে টান দিলাম। ফাঁকটা আর একটু চওড়া হল। টর্চের আলোয় দেখলাম…”
“কী দেখলি?”
“স-সত্যি বলছি জেঠু। বানিয়ে বলছি না…”
“বিশ্বাস করছি। কী দেখলি বল…”
“আ-আলমারির ভেতরে একটা লোক। লো-লোকটা অনেক লম্বা। আলমারিতে আঁটছে না পুরোটা। অনেকটা কুঁজো হয়ে আছে তাই। আমার টর্চের আলোটা সরাসরি তার মুখে পড়েছে। অমন মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি জেঠু। ব্যাঙের ছাতার মতো ফ্যাটফ্যাটে সাদা চামড়া। হা-হাসিটা চওড়া। এই কান থেকে ওই কান অবধি। কেউ যেন জোর করে চা-চামড়া কেটে ঠোঁট বানিয়েছে। লম্বাটে হলদে দাঁত। আর চোখদু’টো …”
“চোখদু’টো কী?”
“ফ্যাটফ্যাটে সাদা। পুরোটা সাদা।”
