।। প্রেম, পাইমন, পরজীবী ।।
“শিমুলগাছায় চারটে খুন।”
বেতের চেয়ারের ওপর বাবু হয়ে বসে আছে মানস। পরনে পাজামা, শার্ট আর হাফহাতা সোয়েটার। হাতে ভাঁজ করা “আগামীর সূর্য।”
চোখ কুঁচকে সস্তা কালিতে ছাপা লাইনগুলো পড়ে শোনাচ্ছিল সে। সুরটা বিদ্রুপের।
“এক ভ্যানচালক, তার স্ত্রী, তার কিশোর ছেলে, এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা। প্রতি ক্ষেত্রেই জিভ উধাও। এলাকার মানুষের সন্দেহ নব্বব্বইয়ের দশকের সিরিয়াল কিলার টিকটিকি রাজু ফিরে এসেছে। যদিও পুলিশ তা অস্বীকার করছে। ইতিমধ্যে নিখোঁজ হয়েছে এক স্কুলছাত্রীও। আশঙ্কা করা হচ্ছে…”
নাক সিঁটকে কাগজটা মুড়ে নিয়ে মেঝের ওপর ছুড়ে দেয় মানস। চাপদাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, “ফালতু কথা। গারবেজ।”
সিলিং ফ্যানটা ঘটাং ঘটাং করে ঘুরছে।
জ্যাকেটের চেনটা বিশু গলা অবধি টেনে দিয়ে একবার অসহায়ভাবে সেদিকে চেয়ে বলল, “ও মানসদা, পাখাটা অফ করো দিকিনি। ঠান্ডায় জমে গেলুম।”
চাপা গলায় ফুট কাটে আবির, “ঘরে চলে যা বিশু। হুনুমান টুপি পরে বাপের লুঙ্গির তলায় ঢুকে বোস থাক….”
মানসদের বাড়ির একতলার ঘরে সাদাকালো খোপ খোপ মেঝেতে কাগজ বিছিয়ে মুড়ি মাখছিল বৃষ্টি আর তানিয়া।
ছেলেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। সামনে খোলা খাতার পাতা ফড়ফড়াচ্ছে। সিলেবাসে মন নেই কারও।
জানলা দিয়ে উঁকি মারছে হেমন্তের সোনালি রোদ্দুর।
পিকু বলল, “পুলিশ তো খুঁজছে। আমারও মনে হয় কোনো সিরিয়াল কিলার টিলারই হবে…”
“পুলিশ কিছুই করবে না,” পাপান বলল, “বালের পুলিশ।”
প্রত্যয় ঘাড় গোঁজ করে ক্যালকুলাস কষছিল। মাথা তুলল না সে। শিমুলগাছা থানার বড়োবাবুর ছেলে প্রত্যয়।
সে ভালো করেই জানে তার বাবাকে নিয়ে শিমুলগাছার লোকজন আড়ালে আবডালে কী ধারণা পোষণ করে। ইদানীং তো রাখঢাকও কেউ করছে না।
“পাপান! কোথায় কী বলছিস বুঝে বল… ব্যাগপত্তর ছুড়ে বাইরে করে দোব…” ধমক দেয় মানস।
ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকে নিরুত্তর পাপান।
পাঁচ দিন। তিতলি নিখোঁজ হওয়ার পর আজ পাঁচ নম্বর দিন।
পাপানের মুখটা শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছ। যেন কেউ ছেলেটার ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে শাঁসটা বের করে নিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু চামড়া আর হাড়।
চোখের তলায় ঘন কালির পোঁচ। ক’দিন হল সে ঘুমায়নি।
সবাই খুঁজেছে— পুকুর, কালভার্ট, মাঠ, এমনকী দক্ষিণের জঙ্গলও। মানস নিজেও গিয়েছিল সার্চপার্টির সঙ্গে। এক হাতে টর্চ, আর এক হাতে লাঠি। ঝোপঝাড় পিটিয়ে, পুকুরে জাল ফেলে তন্নতন্ন করে ফেলা হয়েছে শিমুলগাছা।
পাওয়া যায়নি তিতলিকে। বেমালুম হাওয়ায় উবে গেছে যেন সে।
একটু নরম হয়ে মানস বলল, “ভেঙে পড়িস না ভাই। এখনও কিছুই শেষ হয়নি। আমরা খুঁজছি। ওকে পাবই। তোর বোনকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবই আমরা। দয়া করে এমন কিছু করিস না যাতে তোর বাবা-মা’র দুশ্চিন্তা বাড়ে।”
চোখের পলক ফেলে না পাপান।
“তোর বাবা বলছিল গতকাল মাঝরাত্তিরে নাকি খিল খুলে বেরিয়ে যাচ্ছিলি …”
“হ্যাঁ,” পাপান বলল, “আবার যাব।”
মানসের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ— “কেন?”
“বোন ডাকছিল আমাকে।”
“পাপান—”
পিকুকে হাত তুলে থামায় মানস। বলে, “কী বলছিল?”
“ও আমাকে ডাকছে,” শুকনো গলায় বলল পাপান। “বাকিরা কেউ শুনতে পাচ্ছে না মানসদা। আমি পাচ্ছি। রাত্তির হলেই ও আসে। বলে, দাদা আয়। দক্ষিণের জঙ্গলে আয়। ও ওখানেই আছে, মানসদা। ও মরে যায়নি।”
মানসের পিঠ বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
নিজেকে যথাসম্ভব ঠান্ডা রেখে সে বলল, “একে বলে ট্রমা পাপান। আমরা জানি তুই বোনকে কতটা ভালোবাসতিস… বাসিস…
মুঠো করে এক খাবলা মুড়ি তুলে নিল আবির। কচরমচর করে চিবুতে চিবুতে মানসদার দিকে ঘুরে বসল সে। মুড়ি শেষ করে ঢোক গিলে বলল, “আমার তো মনে হয় মানসদা ওই জিভখোর দানবটা আবার ফিরে এয়েচে। জানো না বুঝি?”
চমকে ওঠে পাপান। চোখ গোল গোল করে তাকায় মানসদার দিকে। খেঁকিয়ে ওঠে মানস, “এইসব আলবাল কথা কে শেখায় তোকে? পাগলা নাকি?”
এবার মুখ খোলে বৃষ্টি। নিচু গলায় বলে, “কথাটা কিন্তু ভুল না দাদা। আমি পড়েছি। শিমুলগাছায় বেঞ্জামিন মুডি নামে এক ব্রিটিশ সাহেব থাকত। নীলকর সাহেব। লোকটা প্রেতচর্চা করত। শিমুলগাছায় সে নরকের দরজা খুলেছিল মানসদা। তারপর থেকেই শিমুলগাছায়…”
সরু চোখে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মানস বলে, “তুই কেন বারবার ফেল করিস জানিস বৃষ্টি? পড়ার বই না পড়ে এইসব গাঁজাখুরি গল্প গিলিস বলে।”
জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল বৃষ্টি।
“পাপান,” মানসের সুর আবার নরম, “তোর বোনকে ফিরিয়ে আনব আমরা। কথা দিচ্ছি।”
পাপানের কাধে হাত রাখল পিকু। বিশু বলল, “চিন্তা করিসনি ভাই। আমার বাপি বলছিল, মেলা ছেলেমেয়ে এই শিমুলগাছায় নিখোঁজ হয়েছে। অনেকে বহাল তবিয়তে ফিরেও এসেছে।”
আশা বড়ো ভয়ংকর জিনিস। পাপানের কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখে তারই ক্ষীণ আভা ফুটে উঠেছে।
মানসদার চোখ এড়িয়ে পাপানের আঙুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দিল তানিয়া। পাপান দুর্বলভাবে চেপে ধরল তার হাত।
“মানসদা আসছি…”
উত্তরের অপেক্ষা না করেই ব্যাগটা কাঁধে ফেলে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রত্যয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটের বাক্সটার দিকে হাত বাড়াল মানস।
.
মানসদার কোচিং থেকে বেরিয়ে পাশাপাশি হাঁটছিল পিকু আর বৃষ্টি। গলিপথ নির্জন।
পাশেই বড়োপুকুর। টলটলে জল। রবিবারের বেলায় ঝপাঝপ ডুব গালছে বুড়োহাবড়ার দল। কাদের বাড়ি থেকে খাসি কষানোর মনকাড়া গন্ধ ভেসে আসেছে। গোটাকয়েক কালো কালো হাড় জিরজিরে ছেলে প্রকাণ্ড আম গাছটার ডাল থেকে ঝুপ ঝুপ গুব্বুস গুব্বুস করে ঝাঁপ মারল জলে। তাদের গোলমালের চোটে পাতার ফাঁক থেকে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক টিয়া।
কোচিং থেকে বেরিয়ে কোনোদিনই সাইকেলে ওঠে না ওরা। বলতে গেলে এক রকম হেঁটেই মেরে দেয় পুরোটা রাস্তা। বড়ো রাস্তায় পৌঁছে আরও মিনিট দশেক হাঁটলে বৃষ্টিদের বাড়ি। মিষ্টি রোদ্দুরে হাঁটতে বেশ আরামই বোধ হচ্ছিল পিকুর।
“বেঞ্জামিন মুডি লোকটা খুব নিষ্ঠুর ছিল,” হাঁটতে হাঁটতে বলল বৃষ্টি। “সেই লেভেলের অত্যাচারী। বাঁশডলা দিয়ে নীলচাষ করাত গ্রামবাসীদের। তার প্রচণ্ড বিশ্বস্ত এক অনুচর ছিল— রহিম। সে ব্যাটা ছিল বোবা। বুঝলি?”
পিকু বলল, “শুনছি। বল।
রাস্তা সরু হয়ে আসে। সামনের টিউবওয়েল চেপে চেপে অ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে জল ভরছে একটা বুড়ি। ওপাশে মোষের খাটাল। বাঁয়ে শানবাঁধানো বটগাছের বেদিতে ন্যাকড়ার ওপর মশলা মাখানো কাঁচা আমলকি শুকোচ্ছে। চারদিকে শুনশান আলস্য। বৃষ্টির গালের গোলাপিতে চোখ আটকায় পিকুর
“শোনা যায়, মুডি রহিমের জিভ কেটে নিয়েছিল,” নির্বিকারভাবে বলল বৃষ্টি।
“শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। আনুগত্যের জন্য। সাহেবের প্রেতচর্চার ব্যাপারে রহিম সব জানত। এসব আচার অনুষ্ঠানে সেই-ই ছিল সাহেবের একান্ত অনুগত সহকারী। মুডি সাহেবের নাকি এসব ব্যাপারে ছিল দুর্দান্ত নলেজ। সাহেব চায়নি এই বিদ্যে কখনও কোনোভাবে অন্য কেউ জেনে ফেলুক। তাই রহিমের থেকে তার জিভ সাহেব চেয়ে নেয়। লোকে বলে, সে নাকি নির্দ্বিধায় তা সাহেবকে দিয়েও দেয়।”
“পাগলা নাকি রে?”
“শোন না… মুডি তো দানববিদ্যায় এক্কেবারে বুঁদ হয়ে ছিল… আমনের উপাসনা… পাইমনের উপাসনা… কিচ্ছু বাদ দিত না সে। ক্ষমতার প্রতি সাহেবের ছিল অমোঘ আকর্ষণ…”
হাঁটার গতি কমায় পিকু।
“এক মিনিট। এক মিনিট। আমনের ব্যাপারটা তো আমি হাড়ে হাড়ে জানি। অন্যটা আবার কে? এর নাম তো বাপের জন্মে শুনিনি।”
হাঁটতে হাঁটতে শিমুলগাছা মেন রোডের ওপর বেরিয়ে এসেছে পিকু আর বৃষ্টি। পুবে ট্রেকার স্ট্যান্ডের কাছে দু’টো লোক মারামারি করছে। তামাশা দেখতে ভিড় জমে গেছে।
রাস্তাটা পেরিয়ে উলটোদিকের গলিতে ঢুকে বৃষ্টি বলল, “অনেক খ্রিশ্চানরা বিশ্বাস করে, নরকের অষ্টম রাজা হল পাইমন। সে হল লুসিফার বা সাক্ষাৎ শয়তানের অত্যন্ত কাছের অনুচর। অনেকে বিশ্বাস করে, যদি কেউ পাইমনের আরাধনা করে তাকে খুশি করতে পারে বা নিজের বশে আনতে পারে সে অমিত ক্ষমতার অধিকারী হবে। আর মুডি সাহেব ছিল চূড়ান্ত ক্ষমতালোভী মানুষ। শুধু এই শিমুলগাছা দাপিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার লোক সে ছিল না। তাই তো পাইমনের আরাধনা। কিন্তু পাইমনকে বশে আনা অত সহজ না। মায়ার জালে ফাঁসিয়ে উপাসককেই উলটে বশ করে ফেলে সে— তাকে অবলম্বন করেই নরকের ফুটন্ত পুতিগন্ধময় পাঁক থেকে উঠে আসার চেষ্টা করে পাইমন।
‘লেসার কি অব সলোমন’ বইতে বর্ণিত আছে যে পাইমন কখনও তাড়াহুড়ো করে না। সে মানুষকে ঠিক সেভাবে দেখে যেভাবে পোকামাকড় দেখে আলোকে। সেই আলোর রশ্মি বেয়ে সে উঠে আসতে চায় নরকের অন্ধকার থেকে।
কে ধীরে ধীরে ভাঙবে, আর কে এক মুহূর্তেই চূর্ণ হবে— তা সে খুব ভালোভাবে জানে। পাইমন শাসন করে কণ্ঠস্বরের ওপর— কৰ্তৃত্ব, গোপন কথা, আদেশ— এসব হল পাইমনের ফান্ডা।
তাই জিভ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ, বুঝলি?”
পিকু বলল, “হ্যাঁ, মানে বুঝলাম, কিন্তু আবার বুঝলাম নাও বলা চলে। তুই খামোখা এই মুডি সাহেব আর পাইমনকে নিয়ে পড়লি কেন?”
বৃষ্টি গম্ভীর হয়ে বলল, “কারণ আছে তাই… না শুনলে বলে দে, ঝাঁট জ্বালাব না।”
পিকু তাড়াতাড়ি করে বলল, “আরে! আমি কি তা বললাম? আমি আসলে কানেক্ট করতে পারছি না ব্যাপারটা।”
“শোন আগে পুরোটা। ব্যাপারটা নিয়ে আগে পড়েছিলাম কোনো একটা ম্যাগাজিনে। ঝাপসা ঝাপসা মনে ছিল। শিমুলগাছায় খুন হওয়া লাশেদের মুখ থেকে জিভ উপড়ে নেওয়ার ঘটনা শুরু হতেই ঢুঁ মারলাম লাইব্রেরিতে। ক’দিন ধরে এই নিয়ে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করেছি।
হুঁ যা বলছিলাম, আমাদের জগতে প্রবেশ করার জন্য পাইমন সাধারণত পুরুষ দেহ খোঁজে— রাগে অন্ধ পুরুষ, ভয়ে ফাঁপা হয়ে যাওয়া পুরুষ— এসবই তার টার্গেট। সে জোর করে ভেতরে ঢোকে না। পাইমন অপেক্ষা করে— যতক্ষণ না তুমি নিজেই দরজা খুলে দাও। আর সেই দরজার চাবি হল ভয়, যন্ত্রণা, ঘৃণা। সেই দরজাই এক রাতে খুলে দিয়েছিল বেঞ্জামিন মুডি… এল কে? পাইমন? উঁহু, এল অন্য একটা পরজীবী… ডিমন না, নিম্নস্তরের নারকীয় অস্তিত্ব কোনো…”
কথাটা শেষ করতে পারে না বৃষ্টি। বাঁক ঘুরতেই দুলেপাড়া প্রাইমারি স্কুল। খাটো পাঁচিল দিয়ে ঘেরা স্কুলের বারান্দায় খালি গায়ে একটা বোতাম খোলা জিন্সের জ্যাকেট পরে বসে ছিল তেন্ডুয়া।
বৃষ্টিকে দেখে ম্লান হাসল সে। বলল, “এক ঘণ্টার ওপর হয়ে গেল বসে আছি। কখন ছেড়েছে মানসদা?”
বৃষ্টি তাড়াতাড়ি করে বলল, “সরি সরি! খুব সরি! ছেড়েছে অনেকক্ষণ পিকুকে সেই বেঞ্জামিন সাহেবের ঘটনাটা বলতে বলতে আসছিলাম তো, তাই দেরি হয়ে গেল…”
“সিনেমাটা দেখতে যাবি কি যাবি না? তুই বললি বলেই টিকিট কেটেছি। নইলে কাটতাম না।”
“যাব তো? সাইকেলটা?”
“এখানেই লক করে রেখে দে। সবাই জানে এটা তোর সাইকেল। ছোঁয়ার দম আছে কারও?”
নিজের সাইকেলে চাবি দিয়ে প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় তুলে দিল বৃষ্টি। তেন্ডুয়ার সাইকেলের রডে পা ঝুলিয়ে বসে পিকুর দিকে ফিরে বলল, “বাকিটা তোকে পরে বলব পিকু। অনেকদিন হল ‘বরফি’টা দেখব দেখব করছি। অনেক দেরি হয়ে গেছে। চললাম রে। আর শোন…”
“কী?”
“মা যদি পরে দেখা হলে জিজ্ঞেস করে কোথায় ছিলাম, বলবি তোদের বাড়ি প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখতে গিয়েছিলাম। তোর মা না খাইয়ে ছাড়ল না।”
তেন্ডুয়ার সাইকেলটা বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পরেও মিনিটখানেক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল পিকু।
.
মানসদের বাড়িটা শহরের এক প্রান্তে। একটেরে। আশেপাশে বাড়িঘর খুব একটা নেই। বনেদি বাড়ি। এককালে টাকাকড়ি ছিল ভালোই। সেকেলে বড়োলোকরা নতুন বাড়ি করলে পাঁচটা ছোটোলোক মহল্লা থেকে একটু তফাত বজায় রেখেই করতেন।
এখন বাড়িটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা প্রাগৈতিহাসিক জীবন্ত জীবাশ্ম। দেওয়াল ফাটিয়ে উঠেছে বট-অশ্বত্থ। সামনে-পেছনে বেশ কিছুটা বাগান। বিশাল ছাদের আলসেতেও জায়গায় জায়গায় ভাঙন ধরেছে।
সেই আলসেরই একটা মজবুত অংশের ওপর পা ঝুলিয়ে বসেছিল মানস। রাত্তির দেড়টা বাজতে চলল। চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে শিমুলগাছা।
আঙুলগুলো খেলা করছে গিটারের তারের ওপর। ঠোঁটে ঝুলছে জ্বলন্ত সিগারেট। পুরোনো অভ্যেস।
“মন গোধুলি… নীল ডেনিমে…
লাল পলাশের… বন আগুনে …
পিয়ালির কথা বড্ড মনে পড়ছে মানসের। মাসছয়েক হয়ে গেল পিয়ালিকে দেখেনি সে। কলকাতায় মাস্টার্স করতে গেছে পিয়ালি। সে যাক, কিন্তু মানসের সঙ্গে ব্রেকআপ করে যাওয়ার কি খুব দরকার ছিল?
পিয়ালির কথা ভাবলেই বুকের কাছটা টনটন করে ওঠে তার। গলার কাছে দলা পাকায় কান্না।
“জ্বলে পুড়ে হায়… তাকে ছুঁতে চায়…”
গিটারের মূর্ছনায় মত্ত মানসের হঠাৎ মনে হল তাকে যেন কেউ দেখছে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে টের পাইয়েছে এক অচেনা অদ্ভুত উপস্থিতির।
বাজনা থামিয়ে উৎকর্ণ হল মানস।
চারপাশ আশ্চর্য রকমের নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিরাও যেন ডাকতে ভুলেছে।
এই অদ্ভুত নীরবতায় মানসের কান ভোঁ ভোঁ করে উঠল।
তেরছা হয়ে পড়া চাঁদের আলোয় মানস দেখল কেউ একজন নীচের উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ মনে হলেও দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা বেশ অন্যরকমের। ডিসকভারি চ্যানেলে যেভাবে শ্বেতভাল্লুককে পেছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠতে দেখা যায়, কতকটা সেরমই।
ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল মানস। তারপর হাঁক পাড়ল, “কে বে? কে?”
সেই মূর্তির দিক থেকে কচি গলায় ভেসে এল, “আমি… এসো… আমি… এসো…”
এই গলা মানস চেনে। এটা তিতলির গলা। যে তিতলি গত পাঁচদিন ধরে নিখোঁজ।
আড়ষ্ট হয়ে গেল মানস। সাবধানে গিটারটাকে ছাদের দিকে নামিয়ে রাখল সে। আলসে টপকে ছাদে নেমে পড়ে আবার ওপর থেকে মুখ বাড়াল সে।
উঠোন ফাঁকা। কেউ নেই।
খচমচ একটা শব্দ পেয়ে মানস চমকে দেখল সেই অচেনা অস্তিত্ব হঠাৎই বাড়ির দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল— উল্লম্বভাবে, অসম্ভব গতিতে।
মানস কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই মানবসদৃশ দানব পৌঁছে গেল ছাদের কিনারায়। মানস দৌড় দিল ছাদের দরজার উদ্দেশে।
প্রচণ্ড গতিতে হুড়মুড়িয়ে মানসকে পেরিয়ে গেল সে। হড়কে গিয়ে ব্রেক কষে দাঁড়াল ছাদের দরজার সামনে। একমাত্র ভেতরে ঢোকার পথটুকুও বন্ধ হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে।
সেই দানবের দিকে তাকাতেই রক্ত জল হয়ে গেল মানসের। বিশাল হাঁ করা মুখগহ্বরের শূন্যতার মাঝখান থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসেছে প্ৰকাণ্ড একটা জিভ। লকপকাচ্ছে রাবারের মতো— ঘৃণ্য, জীবন্ত।
ছোটোবেলায় আলিপুর চিড়িয়াখানায় দেখা বিশাল কালচে অজগরের কথা মনে পড়ে গেল তার।
লম্বা, ভেজা, হিলহিলিয়ে বাতাস চিরে বেরিয়ে এসেছে সেই ঘৃণ্য অস্তিত্ব।
ছোবল মারার জন্য তৈরি সে।
প্রচণ্ড ভয়ে মানসের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল।
চিন্তা নয়, কেবল প্রবৃত্তি— ফাইট অর ফ্লাইট।
ছাদের একপাশে ঝুঁকে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছটার দিকে দৌড় লাগাল সে। গাছটার একটা ডাল ছাদের ঠিক গায়ে ঠেকে রয়েছে। একটাই সুযোগ।
স্কুল লেভেলে দুর্দান্ত জিমন্যাস্ট ছিল সে। নিজের দক্ষতায় ভরসা আছে তার।
লাফ দিল মানস।
সেকেন্ডের জন্য মনে হল, ডালটা সে ধরে ফেলেছে।
পরের সেকেন্ডেই হাত ফসকে গেল।
মটমটিয়ে ভাঙতে লাগল ডালপালা। শুকনো ডাল আর পাতার ঘষা খেয়ে হুড়মুড়িয়ে নীচের দিকে পড়তে লাগল সে।
মাটিতে পড়ার সময় তার ডান পা মুচড়ে গেল। না মুচড়ে যায়নি। তীব্র যন্ত্রণা আর মট শব্দে মানস বুঝল পায়ের হাড় ভেঙেছে।
ব্যথা এমন তীব্র যে মানস শ্বাস নিতে ভুলে গেল। চিৎকার বেরোল না। গলার ভেতরেই আটকে গেল যন্ত্রণা।
গলগলিয়ে বেরিয়ে আসার রক্তের ধারার সঙ্গে শরীরের ভেতর থেকে শক্তি যেন টেনে বের করে নেওয়া হচ্ছে, ধীরে ধীরে।
মাটিতে পড়ে রইল সে। অচল, ক্ষতবিক্ষত।
তখনই প্রাণীটা নামতে শুরু করল দেয়াল বেয়ে।
কিন্তু আগের মতো তাড়া নেই। এবার সে চার হাত-পায়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
জ্বলজ্বলে চোখজোড়া দেখতে পেল মানস।
ছোটো ছোটো পুঁতির মতো, নিস্পৃহ।
সেই চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে নিশ্চিন্ত- শিকার আর পালাতে পারবে না।
সে আর কোনো উন্মত্ত দানব নয়। ঠান্ডা মাথার নিখুঁত হত্যাযন্ত্র।
সে এখন একটা মাকড়সা, নিজের জালে কম্পন টের পেয়েছে। শিকার এসে ফেঁসেছে তার জালে, আহত
মাটিতে নেমে পড়েছে সে— এখন আর ছুটছে না। চার হাতে পায়ে প্রদক্ষিণ করছে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মানসকে। সে জানে এই খাবার পালাবে না।
মানসের গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে চাপা গোঙানির শব্দ।
চেতনা লোপ পেতে থাকে তার। জ্ঞান হারানোর আগে মানস বুঝতে পারে তার মুখের মধ্যে প্রবেশ করেছে নরম হিলহিলে দুর্গন্ধময় একটা অস্তিত্ব।
