।। শিমুলগাছা জায়গা বড়ো সুবিধের না ।।
কুয়াশা কাটতেই পিকু দেখতে পেল দূরে নীল পাহাড়ের সারি। দিগন্তরেখা জুড়ে জলরঙে আঁকা স্বপ্নপুরীর বরফের পাঁচিল যেন। ট্রেনটা অনেকক্ষণ ধরে একই গতিতে একই ছন্দে এগিয়ে চলেছে।
ঝং ঝং
ঝং ঝং
কামরাখানা ধীরে ধীরে ভরে উঠছে শরৎ শেষের সোনালি আভায়। উলটোদিকের লোয়ার বার্থে মা এখনও ঘুমোচ্ছে। অর্ধেক মুখ কম্বলে ঢাকা। কপালে এলোমেলো চুলের গুছি। ক্লান্ত মুখখানা। পিকুর মনে হল ঘুমিয়ে থাকলে মা’কে ছোট্ট মেয়ের মতো দেখায়।
বসে বসে পায়ে ঝিঁঝি ধরে গিয়েছিল। বার্থ থেকে নেমে পায়ে জুতোজোড়া গলিয়ে নিয়ে পিকু এগিয়ে গেল বেসিনের দিকে।
কামরার বেশিরভাগ যাত্রীই এখনও কম্বলমুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। খোলা দরজা দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। হাফ সোয়েটার পরে থাকা পিকুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। শীত আসছে।
তবে যত ঠান্ডাই পড়ুক না কেন, শীতের সকাল পিকুর বড্ড প্রিয়। যে কোনো সকালই পিকুর ভাল্লাগে— নতুন দিনের উদ্দীপনা, ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে মাঠে ছুটতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট। সকালের ব্যাপারটাই আলাদা।
ট্রেনের দরজার লোহার পাল্লায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পিকু দাঁত মাজতে লাগল। যদিও ব্যাপারটা বিপজ্জনক, তাও এমনটা করতে পারলে নিজেকে বেশ বড়ো বড়ো মনে হয়। মা দেখলে এক্ষুনি তেড়ে আসত। ভাগ্যিস এখনও ঘুম ভাঙেনি।
ট্রেন গতি বাড়াচ্ছিল। সর্ষেখেতের ওপর ভাসতে থাকা ছিটেফোঁটা কুয়াশার সর ছিঁড়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল শরৎ থেকে হেমন্তের দিকে রোগারোগা ইউক্যালিপটাস গাছের গায়ে শালের মতোন জড়িয়ে থাকা সোনালি রোদ্দুর, আলপথ ধরে সাইকেল নিয়ে হাটের পথে এগিয়ে চলা চাষি— সবকিছুই ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল।
কিন্তু পিকুর ভাল্লাগছিল না মোটে।
আজ রবিবার— ভবানীপুরে এতক্ষণে কচুরি, তেলেভাজার দোকানে লাইন পড়তে শুরু করেছে। তাদের পাড়ার ছেলেরা ব্যাট-উইকেট নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। পিকুকে ডাকতে এসে আজ কেউ সাড়া পাবে না।
বাবাটা কী করছে কে জানে! বাবার কথা মনে হতেই পিকুর গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করে উঠল। বাবার সঙ্গে ট্রেনজার্নিগুলো মনে পড়ে গেল পিকুর।
“ওই গাছটা দেখেছিস পিকু? ডালপালাগুলো কীরম ট্যারাব্যাকা! একে বলে উইচ ট্রি। রাত্তিরবেলা ডাইনিরা ওতে চড়ে শিকারে বেরোয়…”
“ধুর! কী যে বলো…”
“সে কী রে? তুই হ্যারি পটারে পড়িসনি?”
“সে অন্য জিনিস। এসব গালগল্প না।”
“তাই নাকি রে? রাওলিং লিখলে গোগ্রাসে গিলবি আর বাবা বললেই গালগপ্পো? হচ্ছে তোর…”
“এই দেখো কাতুকুতু দিচ্ছে… হাহাহাহা… ও মা বাঁচাও, বাবা কাতুকুতু দিচ্ছে… হাহাহাহাহা…”
তালুর উলটো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে নিয়ে বেসিনে গিয়ে কুলকুচি করল পিকু। ব্রাশটা ধুয়ে নিয়ে পকেটে পুরতেই হকচকিয়ে গেল সে। ট্রেনের মুখোমুখি দু’টো বাথরুমের একটার দরজা খানিকটা ফাঁক করা। সেই ফাঁক দিয়ে পিকুর দিকে চেয়ে আছে একজোড়া জ্বলন্ত চোখ।
অন্ধকার থেকে কে যেন তাকে মাপছে।
পিকুর বুক ঢিপঢিপিয়ে উঠল। সে দু’পা পিছিয়ে যেতেই খুলে গেল বাথরুমের দরজা।
দরজা খুলে যে বেরিয়ে এল তাকে দেখে ভয় পাওয়া তো দূর কী বাত, হেসেই ফেলল পিকু
হনুমান টুপি পরা এক বুড়ো মানুষ। মুখখানা ঠিক শুকনো কিশমিশের মতোন। রোগা ডিগডিগে চেহারা, গলাবন্ধ কোট, হাতে ধরা একটা ওয়াকিং স্টিক। কোটটা দেখে মনে হল যেন ভিজে সপসপ করছে।
রোঁয়াওঠা হনুমানটুপির ভেতর থেকে পিকুর দিকে চেয়ে গ্যালগ্যালিয়ে হাসল লোকটা। পিকুর মনে হল যেন একটা শিম্পাঞ্জি তাকে ভেঙচি কাটল। খসখসে গলায় লোকটা পিকুকে বলল, “সুপ্রভাত খোকাবাবু, আমাকে দেখে চমকে গেসলে বুঝি?”
“হুম! গুড মর্নিং। না না, খামোকা চমকে যাব কেন?”
পিকুর পিছুপিছু এসে তার বার্থের কাছে একটা ফাঁকা সাইড লোয়ারে বসে পড়ল লোকটা। পিকুকেও পাশে বসার জন্য ইশারা করে সে বলল, “বোসো খোকা, বোসো। কী সুন্দর সকাল, তাই না? আহা! মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। এবারে তেড়ে ঠান্ডা পড়বে বুঝলে খোকা? তবে তোমাদের এখন রক্ত গরম— তোমরা কী বুঝবে? যত কষ্ট বুড়োমানুষদের।”
পিকু একটু ইতস্তত করে মায়ের দিকে তাকাল। মা এখনও ঘুমোচ্ছে।
লোকটা পিকুর দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘুমন্ত টুপুরের দিকে এক ঝলক চেয়ে নিয়ে বলল, “মা বুঝি? না না খোকা, মা’কে জিজ্ঞেস না করে অচেনা অজানা লোকের পাশে বসাটা ঠিক উচিত কাজ হবে না। হাজার হোক, ছোটো ছেলে তো…”
কথাটা পিকুর গায়ে লাগল। লোকটার পাশে বসে পড়ল সে।
“আমি ছোটো ছেলে কে বলল? এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষা দিয়েছি ক’দিন হল।”
কোটরে বসা চোখগুলো গোলগোল করে অবাক হওয়া গলায় বুড়োটা বলে উঠল, “তা বটে, তা বটে। আমি তো তা জানতুম না। ফস করে একটা ভুল কথা কয়ে ফেলিচি। এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষা দেওয়া ছেলে কি আর হেলাফেলার লোক? হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ…”
“আমার ক্লাসের বেশ ক’জনের গোঁফ গজিয়েছে। চোদ্দো রোলের তো দাড়িও উঠেছে। আমারও হবে ক’দিন বাদে।” পিকু সাফাই দিল।
“ঠিক ঠিক। দাড়ি-গোঁফটা গজিয়ে গেলেই আর পায় কে? তখন খোকা সরিয়ে নিয়ে স্রেফ বাবু বলতে হবে। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ! তা খোকা, তোমরা যাচ্ছ কোথায়?”
“আপাতত মনসাতলা স্টেশনে আমরা নামব। সেখান থেকে শিমুলগাছা। “আহা হা হা! শিমুলগাছা!” চোখ বুজে ঘাড় নেড়ে বুড়োটা বলে উঠল, “আমার জন্মস্থান। আমার যৌবনের বেন্দাবন। বার্ধক্যের কাশী। এখেনেই হয়তো ক’দিন বাদে ঘাটে উঠব। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ…”
পিকুর হাসি পেল না। বুড়োটার মুখের অসংখ্য আঁজি আঁজি বলিরেখার দিকে সে চেয়ে রইল।
“তা খামোকা শিমুলগাছায় যাচ্ছ যে বড়ো? এ তো দার্জিলিং বা কার্শিয়াং না যে ফূর্তি করতে যাবে…”
“ধুর! ফূর্তি করতে যাচ্ছি কে বলল? শিমুলগাছার নেতাজি বিদ্যাপীঠে আমার মা চাকরি পেয়েছে। আমার মা ইংলিশের টিচার।”
“বুঝলুম। আর থাকবে কোথায়? সেখেনে তো কোনো হোটেল-টোটেল নেই। বাড়ি ভাড়া করেছ বুঝি?”
“নাহ! আমার মায়ের আসল বাড়ি এখানেই। মায়ের জন্ম, বড়ো হওয়া সবই এই শিমুলগাছায়। সেই বাড়িতেই আমরা উঠব।”
কথাটা বলেই পিকু ভাবল একটা অচেনা লোককে এত কথা বলা কি ঠিক হচ্ছে? অবশ্য অনেক সময় চেনার চেয়ে অচেনা মানুষকে মনের কথা বেশি ভালোভাবে খুলে বলা যায়।
“অ! তাই বুঝি? তা এখানে কে কে আছে তোমার?”
“এখন আর কেউ নেই। আমার মা স্কুল শেষ করেই কলকাতায় চলে গিয়েছিল। তারপর আর ফেরেনি। দাদু-দিদাও কিছু বছর আগে মারা যান। আমরা সে কথা চিঠিতে পড়েছিলাম। এখন ও বাড়ি ফাঁকা।”
“বেশ বেশ, হ্যাঁ, ভারী খাসা জায়গা এই শিমুলগাছা।”
পিকু ফস করে বলে বসল, “ধুর! খাসা জায়গা না হাতির মাথা। কোথায় কলকাতা আর কোথায় এই ধ্যাদধ্যাড়ে গোবিন্দপুর।”
বলে ফেলেই পিকু ভাবল, এই রে, এবার বুড়োটা চটে না যায়। লোকটা বিন্দুমাত্র চটে না গিয়ে চওড়া করে হেসে বলল, “ঠিকই বলেছ, শিমুলগাছা জায়গা হিসেবে খুব একটা সুবিধেরও না। অনেক দুর্নাম। একটু চোখ-কান খোলা রেখে হিসেব নিকেশ করে চলতে হয় আর কী। তা খোকাবাবু, তোমার বাবা আসেননি বুঝি? তাঁকে তো দেখছি না।”
পিকুর গলা বুজে এল।
“না, বাবা কলকাতায়।”
“কেন? মায়ের সঙ্গে বনিবনা নেই বুঝি?”
পিকুর মনে হল তার গালে সজোরে কেউ চড় মারল। মুখে কথা সরল না তার।
হাতের লাঠিটা বার দুয়েক মেঝেতে ঠুকে নিয়ে লোকটা বলল, “বাপেরা খুব একটা ভালো জিনিসও না বুঝলে? বড়ো গন্ডগোলের।”
ভুরু কুঁচকে লোকটার দিকে তাকাল পিকু। কোটরে বসা চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল।
“তুমি গপ্পো শুনতে ভালোবাসো খোকা? তোমাকে একটা গপ্পো বলি। এই শিমুলগাছারই গপ্পো। তবে গপ্পোই বা বলি কীভাবে? একদম নির্জলা সত্যি। বলি, অ্যাঁ?”
পিকুকে হ্যাঁ বা না বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা শুরু করল।
“অনেক অনেক বছর আগে শিমুলগাছায় এক সাহেব থাকতেন। গরিবগুর্বোকে বাঁশডলা দিয়ে টাকাকড়ি কামিয়েছিলেন প্রচুর। পাঁচটা গাঁয়ের লোক তার দাপটে থরথরিয়ে কাঁপত। ঘোড়ায় চড়ে যখন সাহেব বেরুতেন তখন রাস্তার দু’ধারে সব্বাইকে হেঁট হয়ে সেলাম দিতে হত। নইলে গর্দান যেত। সে যাক গে, সাহেবের এক ছেলে ছিল। বাচ্চা ছেলে, এই তোমারই মতোন বয়স হবে। তবে ছেলে ছিল বাপের স্বভাবের ঠিক উলটোটা। ভারী নরম মনের ছেলে। দুর্বলের ওপর অত্যাচার সে সইতে পারত না মোটে। বাপকে সে যত না ভালোবাসত, ভয় পেত তার চেয়ে ঢের বেশি।
সাহেব শুধু চাষি-মজুরদের ওপর অত্যাচার করেই ক্ষান্ত হতেন না, নিজের স্ত্রীকেও মদ্যপান করে এসে ভয়ানক মারধর করতেন। সাহেবের কোকানি খেয়ে খেয়ে মেমসাহেবও হয়ে উঠেছিল কাঠখোট্টা আর তিরিক্ষে। হতাশা আর যন্ত্রণা ভুলতে সে দিনভর নিজেকে ডুবিয়ে রাখত মদে। সাহেবের অত্যাচারের বদলা মেমসাহেব সুদে-আসলে তুলে নিত ছেলেটির ওপর নির্যাতন চালিয়ে।
সারাদিন মায়ের অত্যাচারের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত ছেলেটা। রাত্তিরে আবার তার মদ্যপ বাপ বাড়ি ফিরে শুরু করত মায়ের সঙ্গে লাঠালাঠি। ছেলেটা খাটের তলায় লুকিয়ে বসে কানে হাত চাপা দিয়ে কাঁদত। দিন দিন শুকিয়ে আমসি হয়ে যাচ্ছিল সে। চোখের তলায় কালি, কণ্ঠার হাড় উঁচু। মায়ের অত্যাচার আর বাপের অশান্তির চোটে সে বেচারার উন্মাদ হতে বসার জোগাড়।
তবু বাপের সামনে সে হাজির হত মুখে হাসি নিয়েই। কান এঁটো করা কাষ্ঠহাসি। সে জানত তার চণ্ডাল বাপ যদি জানতে পারে যে মা তার ওপর অত্যাচার করছে, তবে সংসারের অশান্তি কোন মাত্রা নেবে।
সাহেবের ব্যাপারে আরও একটা কথা বলা দরকার- সেটা হল সাহেব একটু অকাল্ট চর্চা করতেন, মানে অতিপ্রাকৃত সব বিষয়-টিষয় নিয়ে নাড়াঘাঁটা করতেন আর কী। সাহেবের বাড়িটা এমনিতেই ছিল গ্রাম থেকে
বাইরে, জঙ্গলের মধ্যে। সে বাড়ির ওপর তলায় ছিল তাঁর উপাসনাগৃহ— লোকে বলত শয়তানের চার্চ। সেখানে নাকি তিনি পিশাচ-টিশাচ নামাতেন। পূর্ণচন্দ্রের রাতে সেখানে দরজা এঁটে সাহেব কী করতেন কে জানে! তবে লোকে বলত সেই ঘর থেকে নাকি রক্ত জল করা চিৎকার শোনা যেত। সাহেব এই অশৈলী কাণ্ডকারখানা শুরু করার পর থেকে শিমুলগাছাতেও নাকি নানারকম ভয়ানক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল। এমনিতেই শিমুলগাছা জায়গা সুবিধের না।
এখেনের জলে-জঙ্গলে-আদাড়ে-বাদাড়ে-পোড়ো বাড়িতে গিজগিজ করছে হাড় হিম করা সব বিপদ। যে যাকগে, সে অন্য গপ্পো। দেখেছ বুড়ো মানুষের এই এক দোষ। কথা বলতে বলতে বেলাইনে চলে যাই।
তো একদিন হল কী, সাহেব তো মদ-টদ খেয়ে এসে বেদম চোটপাট শুরু করেছেন তাঁর মেমসাহেবের ওপর। মেমসাহেবও কম যান না— চোখা চোখা বাক্যবাণে তিনিও সাহেবকে নাকের জলে-চোখের জলে করছেন।
ছেলেটা জানত একটু পরেই তার ডাক পড়বে। বাবা-মা মিলে শুরু করবে তাকে নিয়ে টানাটানি। একটা বারো বছরের ছেলেকে তখন সালিশি করতে বসতে হবে— কে ঠিক বলছে? বাবা নাকি মা? এ ছিল তার কাছে বড়ো যন্ত্রণার।
তা সেদিন অশান্তি যখন তুঙ্গে তখন ভয়ের চোটে অভাগা ছেলেটা গিয়ে সেঁধুল সেই ওপর তলায় ঘরে— সেই শয়তানের চার্চে। বাপ-মায়ের হাত থেকে বাঁচতে সে আশ্রয় নিল একটা কাঠের আলমারিতে।
গল্প শুনতে শুনতে হাঁ হয়ে যাওয়া পিকুর দিকে ঝুঁকে আসে বুড়োটা। ফিসফিসিয়ে বলে, “কিন্তু ওটা তো নেহাতই কোনো সাদামাটা আলমারি ছিল না খোকাবাবু। ছেলেটা তো তা আর জানত না….”
“মানে? বুঝলাম না…”
“ওটা ছিল একটা দরজা।”
“কীসের দরজা?”
“অনেকে বলে নরকের। সাহেব নাকি ওই দরজা দিয়েই প্রেতলোকের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতেন। আমন নামে এক পিশাচের আরাধনা করতেন সাহেব, যাকে ইংরিজিতে বলে ডিমন।”
“ছে-ছেলেটার কী হল?”
“ভ্যানিশ! ছেলেটা রাতারাতি উবে গেল। অনেক খুঁজেছিলেন সাহেব। তন্নতন্ন করে চেলে ফেলেছিলেন জঙ্গল। বছর ঘুরে গেল, কিন্তু ছেলেকে সে আর খুঁজে পেল না।”
“সে আর কক্ষনো ফিরে আসেনি?”
পিকু দেখল প্রশ্নটা করার সঙ্গে সঙ্গেই বুড়োটার মুখের হাসি হুট করে মিলিয়ে গেল।
“ফেরেনি মানে? আলবাত ফিরেছিল। এক পূর্ণচন্দ্রের রাত্তিরে কাঠের আলমারি খুলে বেরিয়ে এসেছিল সে। তবে সে আর আগের মতোন ছিল না— তার চোখ, নাক, চামড়া, হাত-পা সব অন্যরকম। লোকে বলে ফিরে এসে সে প্রথমেই গিলে খেয়েছিল তার বাপ-মা কে। তবে তাদের খেয়েও তার খিদে মেটেনি। পেটে তখন তার আমনের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে।
তারপর থেকে মাঝেমধ্যে নিশুতি রাতে কাঠের আলমারি খুলে বেরিয়ে আসত সে। রাতের আঁধারে হানা দিত গ্রামে গ্রামে। কোনো ছোটো ছেলেপুলেকে একলা পেলেই…”
পিকু আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল। ফের কান এঁটো করা হাসিটা ফিরিয়ে এনে বুড়োটা বলল, “তবে তা খুব বেশিদিন চলেনি। গেরামের লোক একদিন গুঁড়িয়ে ফেলেছিল সেই পিশাচের মন্দির। পুড়িয়ে ফেলেছিল সেই অভিশপ্ত আলমারি। অবশেষে থেমেছিল উপদ্রব। হেঁ হেঁ…”
হাঁফ ছাড়ল পিকু, “যাক বাবা!”
“তবে ফিরে সে এখনও মাঝেমধ্যেই আসে। কোনো ছোটো ছেলে যখনই একলা বোধ করে, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে যখনই তার দূরত্ব বেড়ে যায়, বাপ-মায়ের অশান্তিতে জ্বলতে থাকে বেচারা, ঠিক তখনই সে আবার ফিরে আসে…”
পিকু দেখল বুড়োটার মুখখানা একটা নেকড়ে বাঘের মতো হিংস্র হয়ে এসেছে। কোটরে বসা চোখদু’টোর আলো হঠাৎই নিভে গেল দপ করে। পিকুর চোখে চোখ রেখে সাপখেলানো সুরে সে বলে চলল, “আমন! আমন! আমন!— শোক তাকে পথ দেখায়। একাকিত্ব শক্তি দেয়। বিচ্ছেদ তাকে শরীর দেয়। ভয় দেয় পুষ্টি।”
পিকুর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
“পিকু! ডাকিসনি কেন? স্টেশন চলে আসবে এক্ষুনি…”
পিকু দেখল ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছে মা। কামরার অনেকেই আড়ামোড়া ভাঙছে। মোটা গোঁফওয়ালা একটা লোক “চায়-গরম! চায়-গরম!” হাঁকতে হাঁকতে করিডর বরাবর এগোচ্ছে।
বুড়োটা নেই। পিকু হাঁ হয়ে গেল। এক্ষুনি তো তার পাশেই বসে ছিল। কখন স্যাট করে কেটে পড়েছে পিকু টেরও পায়নি! যেখানটায় লোকটা বসে ছিল সেখানটায় শুধু একটা গোল ভিজে দাগ— ভেজা কাপড়ে কেউ সিটে বসলে যেমনটা হয়, তেমনটা।
সে দৌড়ে গেল বাথরুমের দিকে। কেউ নেই। ট্রেন এগিয়ে চলেছে সমান গতিতে। হয়তো বা অন্য কামরায় চলে গেছে। অদ্ভুত লোক তো! কী ভয়ঙ্কর একটা গল্প শুনিয়ে গেল। ঢোক গিলল পিকু। তার গলা শুকিয়ে কাঠ।
