দিদিকে লেখা নীলের চিঠি

।। দিদিকে লেখা নীলের চিঠি ।।

জলার পাঁক থেকে পিকুকে তেন্ডুয়া উদ্ধার করার পর সপ্তাহখানেক কেটে গেছে। ছেলেটা ভালো করে খাচ্ছে না। একা থাকতে চাইছে না। ঘুমোতে ঘুমোতে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে মাঝেমধ্যেই। প্রচণ্ড আতঙ্কে হাঁপাতে থাকে। চেহারাটা শুকিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। টুপুরের এখন নিজেকেই দায়ী মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতির জন্য। ঘুমন্ত পিকুর কপালে একটা হাত রাখে সে। পাশে উলটে রাখা প্রফেসর শঙ্কুর বইটা থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ উঁকি মারছে। কাগজের ভাঁজটা খুলতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে টুপুরের। এই হাতের লেখা সে চেনে। এই হাতের লেখার জন্য নীলে কম বকুনি খেয়েছে টুপুরের কাছে? পড়তে শুরু করে টুপুর –

“দিদি, সত্যি বলছি— দক্ষিণের জঙ্গল থেকে বাড়ি ফেরার কথা আমার মনে নেই। ওই লোকটাকে দেখার পর খুব জোর চিল্লে উঠেছিলাম মনে আছে। টর্চটাও হাত থেকে পড়ে গেসল। কোনোমতে দরজার ছিটকিনি খুলে ছাদ পেরিয়ে ছুট লাগিয়েছিলাম। তারপর আর কিচ্ছু মনে নেই। সব অন্ধকার। তারপর তোরা তো বললি ছোটোগড় থানার দু’জন কনস্টেবল সাইকেল নিয়ে টহল দিতে বেরিয়ে আমাকে খুঁজে পায়। তারপর তো ফের সেভেনেই ভর্তি হয়ে স্কুলও যেতে শুরু করেছি। এখন সবাই বলে আমি শান্ত হয়ে গেছি। কেলাসে লাস্ট বেঞ্চে একা একা চুপচাপ বসে থাকি। কারও সঙ্গে মিশি না। আসলে দিদি আমি শান্ত হইনি। আমি বড্ড ভয় পেয়ে গেছি রে। সেই রাত্তিরের কথা, আলমারির সেই ফাঁক, সেই হাসির শব্দ, সেই চোখ, সেই পচা গন্ধ আমি মোটে ভুলতে পারছি না। নিজের মনকে অনেক বুঝিয়েছি। তাও আমার মনে হয় কেউ যেন আমাকে দেখছে। অন্ধকার খাটের তলায়, ঝোপের ধারে, ডোবার জলে কে যেন ঘাপটি মেরে আছে। দরজার কোণ থেকে কেউ যেন আমাকে মাপছে। সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। ডাক্তার জেঠু সেদিন বাবাকে বললেন ‘পিটিএসডি’। আমি জানি না এর মানে কী।

গেল হপ্তায় লাস্ট পিরিয়ডে বকুলবাবু ইতিহাস পড়াচ্ছিলেন। আমি জানলা দিয়ে বাইরে চেয়েছিলুম। কেলাসঘরে বেশি আলো আসে না। একে শীতকাল তার ওপর মেঘলা দিন। ক’দিন ধরেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। জানলার বাইরে যদ্দূর চোখ যায় ঘন সবুজ পাটের খেত। মাঝেমধ্যে বড়ো বড়ো গাছ। কেউ কোত্থাও নেই। মাঝেমধ্যেই কালো মেঘের পেট চিরে নীলচে বিদ্যুৎ ছুরি চালাচ্ছে। ঠিক তখনই আমি তাকে দেখলাম। হাত দশেক দূরের বড়ো সবেদা গাছটার ভেজা গুঁড়ির আড়াল থেকে সে আমার দিকে চেয়ে আছে। তার চোখদু’টো ফ্যাটফ্যাটে সাদা— মণি নেই। মুখে সেই অদ্ভুত নিষ্ঠুর হাসি। আমার গলা বুজে এল দিদি। হাত-পা অবশ হয়ে গেসল। কতক্ষণ যে ওভাবে বসেছিলাম জানি না। ছুটির ঘণ্টা কখন পড়ে গ্যাছে তাও জানি না। একটা ছেলে আমাকে ঝাঁকুনি দিতে তবে ঘোর কাটল। দেখি সবাই হুড়োহুড়ি করে কেলাস থেকে বেরুচ্ছে। জানলার বাইরে চেয়ে দেখি ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। সে নেই। সবেদা গাছের গোড়াতেও নেই। গোটা পাটখেতে কোত্থাও নেই।

তার পরেও অনেকবার তাকে দেখেছি। দূর থেকে সে আমাকে মাপে নাকে হালকা একটা পচা গন্ধ এলেই বুঝে যাই সে এসেছে। কখনও বিকেলবেলা মাঠে ফুটবল খেলতে খেলতে থমকে দেখি দূরে ভাঙা মাইলস্টোনের পাশে গুঁড়ি মেরে সে বসে আছে। এত দূর থেকেও তার ওই ভয়ানক হাসি আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। ভরদুপুরে পুকুরে বল কুড়ুতে গিয়েও তাকে দেখেছি। ঘাট থেকে খানিক দূরেই তার মাথাটা ভেসে আছে জলের ওপর। ফ্যাটফ্যাটে সাদা চোখ আমাকে আগাগোড়া মাপছে। জলে নামতে পারি না— যদি ঠ্যাং ধরে টেনে নেয়।

বাবা-মা তো কেউ পাত্তাই দিচ্ছে মা। বলে আমি নাকি পড়াশুনো ফাঁকি দেওয়ার জন্য নতুন নতুন ফন্দি আঁটছি। এ আবার কেমন কথা রে দিদি? ইদানীং গন্ধটা জোরালো হয়ে উঠেছে দিদি। সে আরও কাছে এগিয়ে এল।

ক’দিন আগে তুই গোপাল স্যারের কাছে পড়তে গেছিস। আমি ঘরে পড়তে বসেছি। মা রান্নাঘরে রুটি বেলছিল। ঘটর-ঘটর আওয়াজ আসছিল। বেগুনপোড়ার গন্ধ নাকে আসছিল। আমি ভাবছিলাম কাঁচালঙ্কা আর টমেটো দিয়ে বেগুনপোড়া মাখলে কী চমৎকারই না লাগবে! গোটাচারেক গরম রুটি তো সাবড়ে দেবই। এসব ভাবতে ভাবতে আমি দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছিলাম। ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। হঠাৎ একটা বোঁটকা গন্ধ পেলাম। এই গন্ধ আমি চিনি। ঘরের দরজার দিকে তাকাতেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। দরজাটা হালকা ফাঁক করা। টিউবলাইটটা একবার দপদপিয়ে উঠল। স্পষ্ট শুনলাম কারও চাপা হাসির শব্দ। যেন আমাকে চমকে দিয়ে খুব মজা পেয়েছে সে। আমি জানি দরজার ওই ফাঁক দিয়েই সে ফ্যাটফ্যাটে সাদা চোখে মাপছে আমাকে। গলা শুকিয়ে কাঠ। তবু ডাকলাম, মা। ও মা। কোনো সাড়া নেই। রুটি বেলার শব্দটাও আর আসছে না। মায়ের কোনো বিপদ হল না তো? হাতের কাছে কিছু না পেয়ে কাঠের স্কেলটা তুলে নিয়ে এগোলাম দরজার দিকে। বুক ঢিপঢিপ করছে। দরজার ওপারেই ঘসঘসে গলায় চাপা হাসির শব্দ। এক লাথিতে হাট করে খুলে দিলাম দরজা। একটা বোঁটকা গন্ধের দমকা হাওয়া এসে ঘেঁটে দিল আমার চুল। কেউ নেই, কেউ কোত্থাও নেই। আবার মা বলে হাঁক পাড়তে বাইরের কলতলা থেকে মা সাড়া দিল, কী হল বাবু? ডাকচিস? আমি হাঁপ ছেড়ে বললাম, না না ঠিক আছে। দরজাটা ফের ভেজিয়ে ফিরে এলাম পড়ার টেবিলে। চেয়ারটা টেনে নিয়ে টেবিলে বসতে যাব, ঠিক তক্ষুনি আবার তাকে দেখতে পেলাম দিদি।

আমার পড়ার টেবিলের তলায় গুঁড়ি মেরে সে বসে আছে। যেন লুকোচুরি খেলছে। কদাকার দু’হাতে বিকট মুখটা চেপে ধরে হাসি চাপছে সে। ফ্যাটফ্যাটে চোখজোড়া সরাসরি আমার চোখে। আমার দম আটকে এল। ছুটে বেরোলাম ঘর থেকে। উঠোনে লুটিয়ে পড়লাম। পরে তোরা তো বললি সেই রাতে নাকি আমার খুব জ্বর এসেছিল। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠেছিল।

এসব কথা শুনে ডাক্তার জেঠু সেদিন বলল হ্যালুজেন না হ্যালুনিসিনি কী একটা।

তারপর থেকে সে আর পিছু ছাড়ছেই না। একা থাকতে পারি না মোটে। তোর ওড়না ধরে ধরে ঘুরি। সবাই ভাবছে আমি বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছি। একা থাকলেই পর্দার আড়াল থেকে সে উঁকি মারে। জল গড়াতে গিয়ে কুঁজোর পেছন থেকে চাপা হাসির শব্দ শুনতে পাই। খাওয়ার জলে পচা দুর্গন্ধ। একা বাথরুমে যেতে ভয় লাগে। চৌবাচ্চার জলে বুড়বুড়ি কাটে সে। মগে করে জল তুলতে গেলে হাত চেপে ধরে। রাত্তিরে দু’চোখের পাতা এক করতে পারি না। ঘুম এলেই কানের কাছে ঘসঘসে গলায় হাসি চাপার শব্দ। চোখ খুললেই বিছানার তলা থেকে সেই বীভৎস উঁকি। আমি আর পারছি না।

জানিস তো দিদি? ক’দিন হল বড্ড ক্ষতি করছে— খামচাচ্ছে, আঁচড়াচ্ছে, কামড়াচ্ছে। একটু আনমনা হলেই চামড়ায় নখ বসাচ্ছে। সেদিন না ঘুমনোর অনেক চেষ্টা করেও ঢুলে পড়েছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড যন্ত্রণায় লাফিয়ে উঠেছি। দেখি বাঁ পায়ের ডিম থেকে অনেকটা মাংস খোবলানো। তোর কেউ বিশ্বাস করছিস না কেন দিদি? আমি সত্যি বলছি।”

পড়া শেষ করে ফোপাতে থাকে টুপুর। ঘুমন্ত পিকুকে আঁকড়ে টেনে নেয় কোলের কাছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *