উঁকি
জিভ

টেস্টের আগে ঠান্ডা লাগাস না

।। টেস্টের আগে ঠান্ডা লাগাস না।।

শুকনো বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে সবজে পাতার গায়ে বাদামি ছোপ ধরেছে। বেনেবউয়ের হলুদ ডানায় ভর করে মন পাড়ি দেয় দিকশূন্যপুর। ছাদের মাদুরে আড়ামোড়া ভাঙে ন্যাপথলিনের গন্ধ মাখা গরম জামা। গা-হাত-পা খসখস করে। নখ দিয়ে টানলে খড়ি ফোটে।

জবাগাছটার ডালে দোল খাওয়া পালাই পালাই রোদ্দুরের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে বসে ছিল আবির। সামনে মাদুরের ওপর খোলা টেস্ট পেপার, লাল সুতো দিয়ে গুন ছুচ ফুঁড়ে সেলাই করা দিস্তা কাগজের খাতা। পাতাগুলো ফড়ফড়াচ্ছে। শমীকদা জ্যামিতি বক্সটা তুলে খাতার ওপর চাপা দিল।

পিকু অনেকক্ষণ ধরে পেন চিবোতে চিবোতে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আজ আর ভাল্লাগছে না শমীকদা। আজ পালাই, বাকিগুলো বাড়ি থেকে করে আনব…”

হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের বেশ খানিকটা বাকি থাকতে থাকতেই চায়ের ভাঁড়ের অ্যাশট্রেতে সেটা গুঁজে দিয়ে শমীকদা বলল, “হুম।”

ব্যাগে খাতা-বই পুরতে পুরতে আবিরের দিকে তাকিয়ে পিকু বলল, “আমি উঠলাম রে।”

আবির ঘাড় নাড়ল।

শমীকদা জিজ্ঞেস করল, “বিশুটা ডুব মারল কেন রে?”

পিকু বলল, “কী জানি! ফোন করেছিলাম। সুইচ অফ। দু’দিন অন্তর তো সিম পালটায় ব্যাটা। ডোকোমোটা ছেড়ে নতুন ইউনিনর নেবে বলছিল ক’দিন আগে।”

আবির বলল, “সকালে মাঠ থেকে ফেরার সময় বলছিল দোকানে যাব। ওর বাবাকে নইলে একা ফিরতে হবে। সাইরেন দেওয়ার আগে দু’জনে হাত লাগালে ঝপঝপ দোকান গুটোতে পারবে।”

উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্ট থেকে মাদুরের কাঠির টুকরো ঝাড়তে ঝাড়তে পিকু আবিরকে বলল, “একটা সোয়েটার গায়ে দিবি তো। ঠান্ডা পড়ছে ভালোই। একবার ধরে গেলে আর দেখতে হবে না। টেস্ট গাদায়।”

আবির নাক কোঁচকাল, “ধুউউর। কোথায় ঠান্ডা? আমি তোর মতো অত শীতকাতুরে না…”

শমীকদা চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে নিয়ে বলল, “আর ওস্তাদি করিস না। দু’হপ্তা অন্তর জ্বরসর্দি বাঁধিয়ে পড়া কামাই করে যে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘরে শুয়ে থাকে তার অত বড়ো বড়ো কথা বলা মানায় না।”

আবির প্রতিবাদ করল, “কই? সে তো মাসছয়েক আগে লাস্ট …”

পিকু বলল, “হ্যাঁ, মাসছয়েক আগে লাস্ট সুস্থ ছিলি। তার পর থেকে তো দু’দিন ছাড়া ছাড়াই জ্বরে কোঁ কোঁ করিস।”

শমীকদা গম্ভীর হয়ে বলল, “যা পারিস করগে যা, কিন্তু ঠান্ডা ফান্ডা লাগিয়ে যদি টেস্টে বায়োলজিতে বদখত নাম্বার এনেছিস রে, গাঁট্টা একটাও বাইরে পড়বে না। আর এই যো পিকু, আজ যাচ্ছিস যা। পরের দিন যদি গোটা পেপারটা সলভ না করে আনিস, তোর মা’কে স্কুলে গিয়ে গিয়ে সবার সামনে তোর পড়াশুনোর রিপোর্ট দিয়ে আসব। ক’দিন আগে বিশুর বাপের দোকানেও গেসলাম। কখন গেসলাম বল তো? যখন খদ্দের ফদ্দের ছিল বেশ। সবার সামনে যা তা বলে মাথা গরম করিয়ে দিয়ে এসেছিলাম না। বাড়ি গিয়ে বিশুকে তুলে আছাড় মেরেছিল…”

পিকু তড়বড়িয়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে ছুটতে ছুটতে বলল, “করে আনব গো… ওহ! সবেতে আবার মা’কে বলা কেন?”

পিকু চলে যেতে আবির দাঁত বের করে বলল, “একদম ঠিক জায়গায় ধরেছ শমীকদা। মালটা মা’কে হেবি ভয় পায়।”

ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি গোঁফে আঙুল বুলোতে বুলোতে শমীকদা বলল, “আচ্ছা? তোর মায়ের সঙ্গেও কিন্তু আমার প্রায়ই বাজারে দেখা হয়। গতমাসেই তোর মা বলছিল বাড়িতে বইপত্তর খুলেও দেখিস না। সারাদিন মাঠে ফুটবল-ক্রিকেট। কী হবি? ধোনি? না রোনাল্ডো? উঁহু! তোর খেলাও আমি দেখে নিয়েছি, কিস্যু হতে পারবি না।”

আবির প্রতিবাদ করে উঠল, “কই? না তো। ক’দিন তো মাঠে যাইইনি। সেই লাস্ট গেছি যখন পাপান…”

আবির থমকাল। শমীকদা মুখ ফেরাল অন্যদিকে। আলো নরম হয়ে আসছে। শীত শীত করছে। কাছেই একটা পাখি ছুঁই ছুঁই করে ডাকছে। আবিরের মাথা নিচু। শমীকদা জবাগাছটার দিকে চোখ ফেরাল।

কয়েকমিনিট দু’জনের মুখেই কোনো কথা নেই। তারপর শমীকদাই বরফ ভাঙল। আরও একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “ওরিওলাস জ্যানথর্নাস।”

আবির মাথা তুলল, “উঁ?”

“ওরিওলাস জ্যানথর্নার্স। বাংলায় যাকে আমরা বলি বেনেবউ। ওই যো ডাকছে। কাছেপিঠেই কোথাও বাসা করেছে। ডিম ফিম পাড়বে হয়তো, বা পেড়েছে। যাক গে, গুছিয়ে নে। সন্ধে হয়ে আসছে।”

“আলো আছে তো ভালোই…”

“উঁহু। ডিসেম্বরের বিকেল। কোনো ভরসা নেই। এই দেখলি রোদ্দুর, পাঁচ মিনিটে সূর্য ফূর্য ডুবে দেখলি ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল।”

বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে আবির সিঁড়ির দরজার দিকে এগোতেই শমীকদা পিছু ডাকল, “আবির?”

“হ্যাঁ দাদা?”

“অত ভাবিস না। আমার ভাইটাকে তো হারালাম। তোরটাকে সামলে রাখ। যে গেছে সে তো আর ফিরে আসবে না। যারা আছে তাদের আগলে রাখ। আমাদের হাতে এখন এটুকুই…”

আবির ঘাড় নেড়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। শমীকদাদের গোটা বাড়িটা থমথম করছে। এতগুলো লোক থাকে কে বলবে? একতলায় মানসদার ঘরে হুড়কো টানা। ক’দিন আগেও এই ঘরে বসে বসে অঙ্ক কষতে কষতে কত হুল্লোড়, কত হাসাহাসি।

মানসদা গিটার বাজিয়ে মাঝেমধ্যে গানও শোনাত। প্রত্যয় তো অঙ্ক কষা হয়ে গেলে মানসদার কাছে গিটার নিয়েও বসত। আবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাইকেল নিয়ে গেট দিয়ে বেরোতে আবার বেনেবউয়ের ডাকটা কানে এল আবিরের। ভারী মিষ্টি তো! তাদের মফস্সলে গাছপালার অভাব নেই। সারাদিনই হাজার পাখির কিচিমিচি শোনা যায়। তবে আগে কখনও মন দেয়নি আবির। আজ শুনে বেশ লাগল। মনের গুমোট ভাব খানিকটা কাটল।

পুবপাড়া থেকে সাইকেল নিয়ে বড়ো রাস্তা হয়ে ঘোষপুকুর আসতে সময় লাগে মিনিট পনেরো। বাজারের জ্যামটা সময় খেয়ে নেয়। পারতপক্ষে তাই ওধার দিয়ে আসে না আবির। ভেতর দিয়ে এলে ছ’ থেকে সাত মিনিট।

“ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ”— হাতঘড়ির অ্যালার্মটা বন্ধ করল আবির।

এই হয়েছে সমস্যা। ঘড়িটার সবই ঠিক আছে, শুধু মাঝেমধ্যে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। অনেক চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারেনি সে। অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘড়িতে দেখল সবে সওয়া পাঁচটা বাজে। এখনও খানিকটা আলো রয়েছে। অন্ধকার হয়ে গেলে এই রাস্তা নেওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠত না। চাপ নেই; সূর্য ডোবার আগেই সে বাড়ি ঢুকে যাবে।

বিশু হতভাগা বাজারে বাপের দোকানে যাবে বলে ডুব মারল— ঘরে পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে কি না কে জানে! পিকুটাও সুড়সুড় করে কেটে পড়ল। নির্ঘাত বৃষ্টির পোঁদে পোঁদে লাইব্রেরিতে গিয়ে জুটবে।

সেদিন পাপানের বডিটা দেখার পর থেকে বাকিরাও অনেকে ঘরবন্দি। গায়ে আবার কাঁটা দিল আবিরের। কী যে হল তাদের শিমুলগাছার! সব তো ঠিকঠাকই চলছিল। এমন সুন্দর বিকেলে কোচিং-ফেরত সোজা ঘরে ঢুকে যেতে হবে ভাবতেই বুকটা মুচড়ে ওঠে আবিরের। ঝিরঝির করে হাওয়া দিচ্ছে। রাস্তার দু’পাশে সবুজের ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের নরম রোদের হাতছানি।

ডান হাতে ঘোষেদের বড়োপুকুরের জল ঝিলমিল করছে। শাপলা ফুটেছে। কোথায় যেন একটা ডাহুক তার সঙ্গিনীর উদ্দেশে মনকেমনিয়া ডাক দিচ্ছে।

ধীর গতিতে প্যাডেল করছিল আবির। দক্ষিণের মাঠে খেলাধুলোও বন্ধ। যদি আলো থাকে তবে বাড়ি গিয়ে ছাদে উঠে ঘুড়ি বাড়বে ভাবল সে। পুকুরটাকে ডানদিকে রেখে বাঁদিকের ইট পাতা রাস্তাটা ধরল আবির। কিছুটা গেলেই ঘোষপাড়া— পেরোলেই ওদের বাড়ি।

তবে এই রাস্তাটায় ঢুকতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল আবিরের। সরু রাস্তার দু’পাশেই বিশাল বড়ো বড়ো গাছ জড়ামড়ি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গোটা রাস্তাটার দু’ধার মিলিয়ে মোট পাঁচটা পোড়ো বাড়ি রয়েছে। বিরাট বিরাট সব বাড়ি। একসময়ে ঘোষেদের ছিল— এখন কেউ থাকে না। বনজঙ্গল হয়ে ইটের খাঁচাগুলো দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিঁ ডাকে এখানে। আজ ডাকছে না কেন? এখন তো বিকেলবেলা। ব্যাপারটা কীরম অদ্ভুত ঠেকল আবিরের। পাখি-টাখিও ডাকছে না তেমন। পাখির ডাক যা ভেসে আসছে তা সবই দূর থেকে।

গা ছমছম করে উঠল তার। ঘাড় গুঁজে দুরুদুরু বুকে প্যাডেল করতে শুরু করল সে।

সামনে রাস্তার ওপর কী পড়ে আছে? কালো, গোল মতোন…

আচমকা বাঁদিক থেকে ডাক এল, “দাঁড়া না… অত তাড়া কীসের?”

চমকে পা ফেলে দাঁড়াল আবির। বাঁদিকের পোড়ো বাড়িটার সামনে সন্ধ্যামালতীর ঝাঁকড়া ঝাড়। কেউ কোত্থাও নেই। ডাকল কে?

ঝাড়টার পেছন থেকে আবার শোনা যায়, “অত তাড়া কীসের?”

ওহ! প্রসূনকাকার গলা। নির্ঘাত প্রজাপতি ধরতে ঢুকেছে। প্রসূনকাকা ডাকছে। প্রসূনকাকা তার বাবার পাড়াতুতো ভাই— বাবার সঙ্গে খুব ভাব ছিল। প্রসূনকাকা কলকাতায় চাকরি করে। বিয়ে-টিয়ে করেনি। শিমুলগাছার বাড়িতাও তালাবন্ধ হয়েই পড়ে থাকে। মাসে দু-একবার শিমুলগাছা ফেরে। থাকে তাদের বাড়িতেই। খুব মজার মানুষ। পাখি আর প্রজাপতি খোঁজা তার নেশা। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আবির আর তার ভাইয়ের পড়াশোনার ভারও প্রসূনকাকাই নিয়েছে।

সেই প্রসূনকাকাই আবিরকে ডাকছে। সাইকেল থেকে নামে আবির। কাকা তাকে খুব ভালোবাসে। শেষবার কলকাতা যাওয়ার আগে নিজের পুরোনো ডিজিটাল ঘড়িটাও আবিরকে দিয়ে গেছে। সাইকেলটা মাটিতে ফেলে দিয়ে সন্ধ্যামালতীর ঘন ঝাড়টার দিকে এগোয় সে।

“আয় না। অত তাড়া কীসের?”

প্রসূনকাকা ডাকছে আর আবির যাবে না? হয় কখনও? আবির মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেল ঝাড়টার দিকে।

দু’পা এগোতেই পাশের জারুল গাছটার মাথা থেকে ক’টা কাক কর্কশভাবে ডেকে উড়ে গেল। চমকে উঠল আবির। ঘোরটা কাটতেই আবির বুঝতে পারল তার শিরায় শিরায় বরফ ছুটতে শুরু করেছে। কপাল-গলা ঘামছে।

প্রসুন কাকা তো নিখোঁজ; শিমুলগাছার আট নম্বর নিখোঁজ ব্যক্তি। পা কাঁপছে। পিছিয়ে এসে কোনোমতে সাইকেলটা খাড়া করল সে। প্যাডেলে চাপ দিতে গিয়ে ফল্স খেল সে— মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল আবির। সে ভয় পেয়েছে। প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে তাকাল আবার।

ঝোপের পেছনে প্রসূনকাকার কণ্ঠস্বর ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছে, “তাড়া কীসের? তাড়া কীসের? তাড়া কীসের? তাড়া কীসে…”

আবিরের পায়ে ঠোক্কর খেয়ে গড়িয়ে যায় রাস্তার ওপরের গোল বস্তুটা। আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে সে। বস্তুটা আর কিছু না, মানুষের মাথা— প্রসূনকাকার মাথা চিনতে ভুল হয় না আবিরের।

ফ্যাকাশে হয়ে আসা চামড়ায় কালচে রক্তের দাগ। ওলটানো চোখটার মণিদু’টো কপালের দিকে স্থির। অন্ধকার হাঁ। আবির জানে এই হাঁয়ের ভেতর জিভটা নেই। আবিরের মনে হল তার হাত-পা যেন কেউ মাটির সঙ্গে গেঁথে দিয়েছে। আর খানিকটা এগোলেই তার পাড়া, তার বাড়ি। মা জলখাবারের পরোটা করছে।

ভাই ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে এতক্ষণে ছাদে চলে গেছে। আর একটু এগোতে পারলেই পাড়ায় গিয়ে পড়বে— রাজুকাকার দোকান …

ভারী হয়ে আসা শরীরটাকে চাগিয়ে কোনোমতে উঠে দাঁড়ায় সে। ঠিক তখনই তার কানের পেছনে একটা ঠান্ডা নিশ্বাস আর খলখলে হাসি- সন্ধ্যামালতীর ঝাড়টা মৃদু বাতাসে তিরতিরিয়ে কাঁপতে থাকে। স্তব্ধ হয়ে থাকা ঝিঁঝিরা আবার ডাকতে শুরু করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *