উঁকি
জিভ

দুঃস্বপ্ন, প্ৰতিশ্ৰুতি, যুদ্ধপ্ৰস্তুতি

।। দুঃস্বপ্ন, প্ৰতিশ্ৰুতি, যুদ্ধপ্ৰস্তুতি ।।

নদীর চরের কাদায় বিশুর পা গেঁথে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও বিশু নড়তে পারছে না। ঘামে শরীর ভিজে জবজব করছে। শেষ বিকেলের লালচে আলোয় চরাচর ভেসে যাচ্ছে। অতিকষ্টে একটা পা তুলে সামনে ফেলল সে। আবার কাদাতে গেঁথে গেল। বিশু দেখল সামনে হাত পাঁচেকের দূরত্বে একটা শকুন বসে রয়েছে। ঘাড় বেঁকিয়ে টকটকে লাল চোখ বিশুর চোখে স্থির করে অবিকল পাপানের গলায় সেটা বলে উঠল,

“বোন ডেকেছিল। তোকে বলেছিলুম। তুই এলিনি আমার সঙ্গে। এবার দ্যাখ কী হয়…”

বিশু চেঁচিয়ে বলতে গেল, “সরি ভাই, আমি বুঝিনি ভাই,” কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। অবাক হয়ে সে দেখল শকুনটা আর নেই। তার জায়গায় বিশুর বাবা হাঁটু গেড়ে বসে আছে— উলঙ্গ এবং সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত।

একটা বীভৎস হাসি হেসে বাবা অবিকল পাপানের বোন তিতলির কচি গলায় বলে উঠল, “দেখবি আমার কী হাল?”

বাবা হাঁ করল। লাল টকটকে গোল হাঁ। মুখের ভেতরটা মসৃণ। জিভ নেই। বিশুর চারপাশ পাক খেতে লাগল। অনেকে হেসে উঠল। অট্টহাসির কোরাস। সে দেখল পাপান হাসছে, তিতলি হাসছে, নীলু হাসছে, মানসদা হাসছে। তাদের কারও মুখের মধ্যে জিভ নেই।

অন্ধকার মুখগহ্বর। উন্মাদ করা হাসির শব্দ।

চার হাতে পায়ে কাদার ওপর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে বিশুর চুলের মুঠি খামচে ধরল বাবা। বিশুর চোখের কোণ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। গোল অন্ধকার মুখছিদ্র থেকে ভেসে এল, “ওঠ, ওঠ বলছি। খজরা ছেলে সন্ধেবেলা পড়ে পড়ে ঘুমুচ্চে।”

ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বিশু দেখল সন্ধে হয়ে গেছে। গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে সপসপ করছে। জানলার বাইরের ল্যাম্পপোস্টটার আলো এসে ঘরের মেঝেতে পড়েছে। বিশুর ভাই তার পাশেই গায়ে বালাপোশ চাপিয়ে হাঁ করে ঘুমুচ্ছে। বেশ ঠান্ডা পড়েছে। তাও বিশু ঘেমে গেছে। শাঁখের শব্দ পেল সে। পাশের বাড়িতে সন্ধে দিচ্ছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল বাবা তার সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ভুরু কুঁচকে বাবা বলল, “আজগে দুপুরে বায়োলজি পড়া ছিল না? গেলিনি কেন?”

ঠোঁটের কোণ দিয়ে লাল গড়াচ্ছিল। হাতের উলটোপিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে বাবার দিকে আবার তাকাল সে।

বাবা তাহলে বেঁচে আছে। বিশু তাহলে ঘরেই আছে। বুকের ওপর বায়োলজি বইটা উপুড় করা ছিল। উঠে বসতে সেটা হড়কে পেটের ওপর নেমে গেছে। খেয়েদেয়ে উঠে পড়া মুখস্থ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। বাবা আবার বলে উঠল, “মাস গেলে মাইনেগুলো গুনেগেঁথে দিয়ে আসছি আর তুই পড়া কামাই করে পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছিস?”

বিশু দু’হাতে বাবার কোমর জাপটে ধরে ভুঁড়িতে মুখ গুঁজে দিল। বলল, “আমাকে ছেড়ে তোমরা কোত্থাও যেউনি, প্লিজ। প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আমিও যাবুনি। কেউ ডাকলে যাবুনি। কেউ ডাকলে না…”

বাবা ঘাবড়ে গিয়ে বেশ নরম গলায় বলে উঠল, “আহা! ছেড়ে যাওয়ার কথা আসছেই বা কেন? বলছি পড়তে গেলিনি কেন? পড়া কামাই করাটা কি ঠিক? তুই-ই বল।

বিশু পেটের ওপর থেকে বইটা তুলে বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “কী ধরবে ধরো। কোত্থেকে ধরবে ধরো। সব তৈরি।”

মা ঘরে এসে ঢুকল। মায়ের মুখ থমথমে।

“বাবু, তোকে ডাকছে…

“কে গো? আবির?”

বাবা আবার রেগে উঠে বলল, “একে পড়তে যাসনি। এখন যদি আবিরের সঙ্গে আড্ডা মারতে বেরুস কী করি দ্যাখ। একে আধঘণ্টা বাদেই সাইরেন দেবে…”

বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি নেমে হাওয়াই চটিটা পায়ে গলাতে গলাতে বিশু বলল, “না না, বোধহয় নোটস ফোটস দিতে এসেছে। ও মা, ওকে ঘরে ডাকলে না কেন? পিকু এসেছে না আবির একা?”

মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই বিশু ঘর থেকে বেরিয়ে তড়বড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে মাঝপথেই থমকে গেল। সিঁড়ির নীচেই প্রত্যয় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাদের একতলার দালানে। পেছনে বন্দুক কাঁধে দু’জন কনস্টেবল। শুকনো মুখে প্রত্যয় বলল, “বাবা একবার তোকে ডাকছে। দু’জনে যাতে একা না বেরোই তাই সঙ্গে গার্ড দিল।”

বিশুর পেছনে বাবা এসে দাঁড়িয়েছে। বাবা তার কাঁধে একটা হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “ও কোত্থাও যাবে না।”

প্রত্যয় বলল, “কাকু আপনিও চলুন। খুব দরকার। অনেকেই এসেছে। আবির…” প্রত্যয়ের গলা কেঁপে গেল। বিশুর হাত-পাও ততক্ষণে কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। বেশ উত্তেজিত হয়ে বিশু বলল, “আবির বলে থেমে গেলি কেন? কী হয়েছে আবিরের?”

বিশুর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল প্রত্যয়।

.

“গ্রামবাংলার লোকবিশ্বাস বিষয়ক এক সংক্ষিপ্ত সংকলনের পৃষ্ঠা, ১৯১৯ সংস্করণ—

নিম্নলিখিত বিবরণটির রচয়িতা অনিশ্চিত। হস্তলিপি লক্ষ করিলে প্রতীয়মান হয় যে ইহা সংকলক কর্তৃক রচিত নহে, বরং কোথাও হইতে নকল করিয়া লিপিবদ্ধ। বানান ও ব্যাকরণ অবিকৃত রাখা হইয়াছে।

পূর্ববঙ্গের বিস্মৃত আতঙ্কসমূহের মধ্যে একটির উল্লেখ পাওয়া যায়- যাহাকে নীরবতা-ভোজী (Silence-Eater) বলা হয়। ইহা প্রাকৃতিক নিয়মে জন্মগ্রহণকারী কোনো সত্তা নহে; অসম্পূর্ণরূপে আহূত এক বস্তু, যাহার প্রকৃত দেহ না মাংস, না আত্মা।

কথিত আছে, কোম্পানি শাসনের অন্তিম পর্বে এক ইংরাজ নীলকর, স্থানীয়ভাবে ‘মুডি সাহেব’ নামে পরিচিত, দানবতাত্ত্বিক পাণ্ডুলিপি বা গ্রিমোয়া হইতে সংগৃহীত এক প্রেত আমন্ত্রণমূলক আচার সম্পাদনের চেষ্টা করেন।

খণ্ডিত সূত্র অনুসারে, তাঁহার উদ্দেশ্য অমরত্ব নহে; উদ্দেশ্য ছিল আনুগত্য— ভূমি, শ্রম ও কণ্ঠস্বরের ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব।

আচারটি অভিপ্রায়ে ব্যর্থ হইয়াছিল, কিন্তু পরিণামে সফল।

যাহা সীমা অতিক্রম করিয়া আসিয়াছিল, তাহা কোনো নামযুক্ত দানব নহে, বরং একপ্রকার সেবক- এক ভাষিক পরজীবী, যাহাকে পরবর্তীকালে দানবরাজ পাইমনের সহিত সংশ্লিষ্ট শক্তির অধীন বলিয়া চিহ্নিত করা হয়।

এই সত্তা ধার করা বাক্য ব্যতীত অস্তিত্ব ধারণ করিতে পারে না। সে জিহ্বা চুরি করে— আপন বিকৃত অঙ্গে জুড়িয়া লহে এবং তার সাহায্যে কথা বলিতে পারে, আদেশ দিতে পারে এবং প্রলুব্ধ করিতে পারে।

তাহাদের মাধ্যমে সে শিশুর কণ্ঠে কাঁদিতে পারে, প্রেমিকের ন্যায় ফিসফিস করিতে পারে, অভিভাবকের ন্যায় আদেশ দেয়, অথবা মাতালের ন্যায় বিদ্রূপ করে। সে কেবল ক্ষুধার জন্য মাংস শিকার করে না; অস্তিত্বের ধারাবাহিকতার জন্য করে।

তবে এই সত্তা অনির্দিষ্টকাল বিচরণ করে না। নথিপত্রে একরূপ ধারা লক্ষ করা যায়।

তাহার সহিত সংযুক্ত নিখোঁজের ঘটনাসমূহ প্রায় ত্রিশ বৎসর অন্তর গুচ্ছাকারে সংঘটিত — ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইহার আবির্ভাব, অন্তিমাংশে পুনরায় প্রাদুর্ভাব। পুনরাগম আবার উনিশশো কুড়ি নাগাদ।

এই সময়সীমা সমূহের মধ্যবর্তী কালে সত্তাটি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য থাকে।

কেন? মুডি সাহেবের হস্তাক্ষরে প্রাপ্ত প্রান্তলেখ (যদি সত্য হয়) অনুসারে, এই সত্তা একই সঙ্গে অতিরিক্ত কণ্ঠ ধারণ করিতে পারে না। অতিরিক্ত উচ্চারণের ভারে ইহা অস্থিতিশীল হইয়া পড়ে। তখন ইহাকে সংগ্রহ করা পুরাতন জিহ্বাগুলি ঝরাইতে হয়, নিদ্রায় যাইতে হয়, এবং নিজেকে নীরব করিতে হয়।

অতএব ইহা এমন এক অবস্থায় প্রবেশ করে, যাহাকে সর্বাপেক্ষা উপযুক্তরূপে শীতনিদ্রা বলা যায়।

কোথায় ইহা নিদ্রা যায়, তাহা অজ্ঞাত। কেহ বলেন পুরাতন নদীবিলের তলদেশে। কেহ বলেন পরিত্যক্ত কূপে, ধসপ্রাপ্ত ভাণ্ডারে, অথবা দক্ষিণের জঙ্গলের গভীরে ক্ষয়প্রাপ্ত ভিত্তিমূলে। সত্তাটি মরে না; সে নিজেই নিজের মধ্যে ভাঁজ হইয়া যায়— জিহ্বাসমূহ প্রত্যাহার করিয়া, এমন স্থানে আত্মগোপন করে যেখানে কোনো শব্দ পৌঁছয় না।

ইহার জাগরণ কেবল ক্ষুধা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নহে; আকাশমণ্ডলও ইহার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। প্রাচীন জ্যোতিষগ্রন্থ— লাতিন, গ্রিক ও হিব্রু এক বিরল নক্ষত্রসমাবেশের উল্লেখ করে, যাহা প্রতি তিন দশকে একবার প্রত্যাবর্তিত হয়; যে সমাবেশ আদেশ ও আনুগত্য, শব্দ ও মাংসের মধ্যবর্তী আবরণকে ক্ষীণ করিয়া দেয় বলিয়া বিশ্বাস।

আমি জ্যোতিষী নই, না কোনো উপাসক; তাই সেই বিন্যাস আমি নির্দিষ্ট করিতে অক্ষম। আমি কেবল যাহা সংগ্রহ করিয়াছি, তাহাই লিপিবদ্ধ করিতেছি।

যখন সেই সমাবেশ পুনরায় উদিত হয়, নীরবতা-ভোজী জাগে।

যখন তাহা অপসৃত হয়, সত্তাটি পুনরায় অন্তর্লীন হয়।

ধারালো অস্ত্র বা গুলিতে ইহা বিনষ্ট হয় না; তবে তা ইহাকে আঘাত করিতে সক্ষম বলিয়া লক্ষ করা গিয়াছে। মূল শরীর থেকে প্রধান জিহ্বাটি

কর্তন করিয়া নিলে হয়তো ইহাকে বধ করা যাইলেও যাইতে পারে।

যদিও আমার আশঙ্কা, ইহাকে হত্যা করা অসম্ভব।

প্রাণকৃষ্ণ সমাদ্দার।”

ছেঁড়া পাতাটার পেছনে ফাউন্টেন পেনের কালো কালিতে টানা হাতে লেখা ক’টা নোট:

“কাছেই থাকে। ওঁত পেতে থাকে। আড়াল থেকে অবজার্ভ করে।”

“শিকারের ও তার কাছের মানুষদের গতিবিধি ও লক্ষ করে।”

“থাকে কোথায়? দক্ষিণের জঙ্গল?”

“জাগে কি সবসময়ই তিরিশ বছরের ব্যবধানে?”

“বিরল নক্ষত্র সমাবেশ— জুড় জাগে, কাটলে ঘুমোয়।”

বাবার ডায়রিটা নামিয়ে রাখলেন বড়োবাবু। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সাব ইনস্পেক্টর মণ্ডল এসে বলল, “স্যার, বাইরে সবাই জড়ো হয়েছে।”

বড়োবাবু ঘাড় নাড়তে বেরিয়ে গেল মণ্ডল।

.

বড়োবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন শিমুলগাছা ইউনাইটেড ক্লাবের চওড়া সিঁড়ির ওপর। সিঁড়ির ধাপগুলো জায়গায় জায়গায় ফাটা।

এই একই জায়গায় একসময় স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতাগুলোর রিহার্সাল হত— অর্ধেক মুখস্থ, অর্ধেক ভুলে যাওয়া। বলা হত আরও খারাপভাবে, আর তার চেয়েও খাপছাড়াভাবে হাততালি পড়ত।

আজ রাতে কোনো পতাকা নেই। কোনো ব্যানার নেই। কোনো স্লোগান নেই।

শুধু বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো কয়েকটা হ্যারিকেন। ম্লান হলুদ আলো ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা ছায়ামূর্তি। ছায়াগুলো দেয়ালের গায়ে লম্বা হয়ে উঠছে, আবার সঙ্কুচিত হচ্ছে। আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে ঠিক মানুষও মনে হচ্ছিল না।

শহরটা জড়ো হয়েছিল। লাঠি হাতে পুরুষেরা। খেঁটে বাঁশ, ভাঙা চেয়ার-পা, উইকেট, কারও কারও হাতে লোহার রড।

কোমরে ধারালো ছুরি গুঁজে বাগদিপাড়ার হারাধনদের গ্যাংটাও হাজির। কিশোরদের চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা, ভয় আর কিছু প্রমাণ করার জেদ একসঙ্গে মিশে আছে।

কারও গায়ে কোমরে বাঁধা গামছা, কারও গলায় পুরোনো তোয়ালে, কারও মুঠোতে জড়ানো সাইকেলের চেন।

বড়োবাবু গলা খাঁকারি দিলেন। হুইস্কির ঝাঁঝ এখনও তাঁর গলায় লেগে থাকলে কী হবে, কণ্ঠের দৃঢ়তা নষ্ট হয়নি।

বহু বছর ধরে এই কণ্ঠই এলাকার ঝুটঝামেলা থামিয়েছে, রংবাজকে সায়েস্তা করেছে, জমিবাড়ি নিয়ে মারামারিও সাল্টেছে– কিন্তু আজকের সমস্যা অন্যরকম।

“এবার আমরা জানি না…” বললেন, “আমরা ঠিক কীসের মুখোমুখি।” নীরবতা নেমে এল। সেই নীরবতা শুধু শব্দহীন নয়- ভারী, চাপা, অনুগত। শুনতে প্ৰস্তুত সবাই।

“এ কোনো ভূতপ্রেতের কানাঘুষো না,” বড়োবাবু বললেন, “ছেলেভুলানো গল্পও নয়। আমাদের চেনাজানা কোনো প্রাণীও না। এ সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত… পুরো ভুলভাল…”

ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়ল ভিড়ের মধ্যে। কেউ ঠোঁট কামড়াল, কেউ পাশের জনের দিকে তাকাল।

বড়োবাবু হাত তুললেন।

“সবাই মন দিয়ে শোনো। ভয় পেলেই মরবে।”

ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন গলা খাঁকড়ে বলল, “দোষ নেবেন না বড়োবাবু, আমরা কি তার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারব? সন্ধে নামলে ঘরে ঢুকে দোরে আগল তুলে দেওয়াই তো মনে হয় বুদ্ধিমানের কাজ।”

ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বড়োবাবু বললেন, “ও! তোমার ঘরের কাউকে সে নেয়নি বুঝি রাজু? তুমি বরং দোরে আগল তুলেই বসে থাকো গে যাও। বাকিটা এই বাচ্চা ছেলেগুলো বুঝে নেবে। উপদ্রব থামলে তুমি বরং মনে মনে এদের ধন্যবাদ দিও। ভুলভাল লোক যত …”

পরমুহূর্তেই চোখ চকচক করে উঠল তাঁর। ভারী গলায় হেঁকে বললেন, “যারা শিকারের দলে থাকতে না চায়, তারা আসতে পারে। কাপুরুষের কোনো স্থান এখানে নেই।”

ভিড় নিরুত্তর। দু-একজন সবার অলক্ষে মিশে যায় বাইরের অন্ধকারে। “প্রথম ধাপ,” বড়োবাবু বললেন, “টোপ।”

“আমাদের মধ্যে কেউ একজন ওটাকে টেনে বের করবে। একা।” বড়োবাবুর কণ্ঠ নির্লিপ্ত।

“আমরা কয়েকজন ছেলেকে বেছে নেব। তাদেরই আমরা বাছব যারা কাছের কাউকে হারিয়েছে। এটুকু আমরা বুঝতে পেরেছি যে ওই

দানব শিকার করার জন্য আমাদের ভালোবাসার মানুষের গলা নকল করে আমাদের প্রলুব্ধ করে। তাদের গলাই সে নকল করতে পারে যাদের জিভ সে নিয়েছে… ভুলভাল জিনিস একদম…”

গলা কেঁপে যায় তাঁর।

“বেছে নেওয়া ছেলেরা প্রতিদিন রাতে মনসাতলার ব্রিজ থেকে শুরু করে দক্ষিণের জঙ্গল অবধি হাঁটবে— একা। এক একজন বেছে নেবে এক একটা রুট। গা ঢাকা দিয়ে তাকে অনুসরণ করবে আমাদের হান্টিং পার্টি। শিকারের সন্ধানে সে বেরোলেই আমরা গুলি চালাব।”

“গুলিতে সে মরবে?”

“উঁহু। তবে পুরোনো কাগজপত্র ঘেঁটে যা পেয়েছি তাতে এটুকু বুঝতে পেরেছি যে তার যন্ত্রণার বোধ আছে। গুলি চালাব আমরা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য…”

“কোথায়?”

“দক্ষিণের মাঠে। সেখানে আমাদের হান্টিং পার্টিরা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলবে তাকে। এটাই দ্বিতীয় ধাপ।”

তিনি একে একে সবার দিকে তাকালেন।

“ওকে ঘিরে ফেললেই কাজ শেষ না। কেউ ওর মুখের দিকে তাকাবে না। ও কথা বললে শুনবে না।”

তাঁর কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।

“ও তোমাদের প্রিয় মানুষের গলা ব্যবহার করবে। হাসবে। মিনতি করবে। অনেক ভুলভাল জিনিস করবে। এভাবেই ও শিকার করে।”

ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন অজান্তেই চোখ বন্ধ করল। কেউ নিজের ছেলের মুখ মনে করে ফেলল, কেউ মৃত মায়ের গলা।

“সে শক্তিশালী,” বড়োবাবু বললেন, “একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে কাপড়ের পুতুলের মতো ছিঁড়ে ফেলতে পারে সে। থমকে গেলেই মরবে।”

একটু দম নিলেন বড়োবাবু।

“তৃতীয় ধাপ, সবচেয়ে ভুলভাল…” বড়োবাবু বললেন, “শিকারের কায়দা।”

তিনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। পায়ের কাছে রাখা বস্তা থেকে তুলে ধরলেন একটা শিকল। জং-ধরা। ভারী। শিকলের প্রান্তে ঝুলছে একটা বাঁকানো হুক।

“এই জিনিসটাকে দিয়ে তাকে শিকার করব আমরা। আমাদের কাজ ওর ওই জিভে এই হুকটা গেঁথে দেওয়া। তারপর সেটাকে টেনে ধরব আমরা। শেষ স্টেপ ওর শরীর থেকে জিভটাকে বিচ্ছিন্ন করা…”

ভিড়ের ভেতর থেকে একটা ভারী গলা বলে উঠল,

“যথেষ্ট হয়েছে। আর না!”

সবাই চমকে ঘুরে তাকাল।

অর্ক রায় ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন সামনে। মুখ লাল, চোখ জ্বলছে। বড়োবাবু কিছু বলার আগেই অর্ক রায় ভর্ৎসনার সুরে বললেন, “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে চান? আমরা এখনও জানিই না এই খুনগুলোর পেছনে ঠিক কে বা কারা রয়েছে। অথচ আপনি কিশোর ছেলেদের রাতের অন্ধকারে পাঠাতে চাইছেন অজানা কিছুর সঙ্গে লড়তে?”

ভিড় নিঃশব্দ।

“সাইকোপ্যাথ হতে পারে,” অর্ক বললেন। “হতে পারে মানুষখেকো কোনো জন্তু। হতে পারে সশস্ত্র অপরাধী দল। আমরা কিছুই কিন্তু এখনও জানি না। আর জানলেও সিভিলিয়ানদের নিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা বাঁধিয়ে হিরো সাজতে আমি আপনাকে দিচ্ছি না…”

সিঁড়ির ধাপে উঠে দাঁড়িয়ে ভিড়ের দিকে ফিরলেন অর্ক রায়। বললেন, “সরি! আমি এই প্ল্যান অ্যাপ্রুভ করছি না। আমার অনুমতি ছাড়া কোনো সিভিলিয়ান নাইট কার্ফিউ ভাঙলে তার এগেন্সটে আমি কড়া স্টেপ নেব…”

ভিড়ের মধ্যে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।

বড়োবাবু মুখ খুললেন। “কিন্তু…”

“না…” বড়োবাবুর দিকে না ফিরেই অর্ক রায় ধমকে উঠলেন, “কোনো কিন্তু না। এটাই শেষ কথা।”

বাঁশের খুঁটি থেকে হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন একটা হ্যারিকেনে সেই আলোয় ক্লাবের দেয়ালে অর্ক রায়ের ছায়াটা লম্বা হয়ে উঠল। শক্ত অবস্থান নিয়েছেন তিনি। পাতলা হতে শুরু করল ভিড়।

আর সেই মুহূর্তে, অন্ধকারটা যেন দক্ষিণের জঙ্গলের দিক থেকে শহরের আরও একটু কাছে সরে এল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *