পিকু উধাও

।। পিকু উধাও ।।

পুরু কুয়াশার কম্বলে মুখ লুকিয়েছে সূর্য। দিনদুয়েক রোদ্দুরের মুখ দেখেনি শিমুলগাছা। বেলা এগারোটা বাজতে চলল, তবুও রোদ্দুর উঠল না। খেলার মাঠও আজ ফাঁকা। হাটে-বাজারে লোকও বিশেষ নেই।

সোফায় বসা টুপুরের হাত ধরে টান দিল অনুপম, “চল। একবার তোর যাওয়া দরকার।”

চোখ পিটপিট করে টুপুর বলল, “কোথায়?”

“চিলেকোঠায়— শিমুলগাছায় এসে অবধি তুই যে জায়গাটাকে এড়িয়ে চলছিস। যেখানে তোর ভাইকে শেষ দেখা গিয়েছিল।”

“কোনো ইচ্ছা নেই। ফালতু বকিস না অনু…”

উত্তেজিত অনুপম বলল, “নীলের ওই চিঠিগুলো তোর মাথা ঘেঁটে দিয়েছে টুপুর। পিকুর আজ এই মানসিক অবস্থার জন্যও ওই চিঠিগুলোই দায়ী। তোরা এমন কিছুকে ভয় পাচ্ছিস যার কোনো অস্তিত্বই নেই। বাস্তবে ফিরে আয় টুপুর। রিয়েলিটিকে ফেস কর। ট্রমা এভাবেই আমাদের প্যারালাইজড করে রাখে। চিলেকোঠায় গেলেই দেখবি সব নর্মাল। তখন তুই রিয়েলাইজ করবি অলৌকিক কিছুর অস্তিত্ব যদি থেকে থাকে তবে তা স্রেফ তোর আর তোর ছেলের মনে।”

সোফায় ঘুমন্ত পিকুর মুখের দিকে তাকিয়ে টুপুর ইতস্তত করল, “পিকু একা থাকবে?”

“পিকু ক্লাস নাইনের একটা ছেলে টুপুর। নিজের বাড়িতে ঘুমিয়ে আছে। কিচ্ছু হবে না। নীলে হাওয়ায় উবে যায়নি, পালিয়েছিল। পিকুও হাওয়া উবে যাবে না।”

খাঁ খাঁ করছে প্রকাণ্ড ছাদ। কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝিমধরা গাছগুলো। বহু বছর পর এই চিলেকোঠায় পা দিল টুপুর। দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে। ধুলো, রাবিশ, ভাঙাচোরা ফার্নিচার। সাধারণ ঘর একটা।

অনুপম নরম গলায় বলল, “দেখেছিস? কিচ্ছু নেই। খুব সাধারণ ঘর একটা। সেটাকে তুই নিজের মনেই একটা যন্ত্রণাময় স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে রাক্ষসের রূপ দিয়েছিস। পিকুকেও এটা বোঝাতে হবে। দিনকয়েক অপেক্ষা কর। ক্রিসমাসের ছুটিতে আমরা পিকুকে কলকাতায় নিয়ে যাব। আমার মামার ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট জানা আছে…”

ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলতে গিয়েও থেমে গেল টুপুর। তার চোখ পড়েছে কাঠের প্যাকিং বাক্সটায়।

হাঁটু গেড়ে বসে বাক্সটার ঢাকনা সরাল সে। ভেতরে ঠাসা হাবিজাবি জিনিস— কাঠের লাটাই, ঘুণ ধরা ক্রিকেট ব্যাট, রংচটা জার্সি, উইয়ে খাওয়া ইন্দ্রজাল কমিক্স।

জার্সির তলা থেকে উঁকি মারছিল একটা ছবি। কাঁপা হাতে সেটাকে টেনে বের করল টুপুর। সাদাকালো একটা ছবি— গলা জড়াজড়ি করে দু’টো ছেলেমেয়ে। মেয়েটার মুখে নিষ্পাপ হাসি। ছেলেটার মুখ অস্পষ্ট— জায়গাটা ড্যাম্প ধরে কালো ছোপে ঢেকে গেছে।

ছবিটা উলটে টুপুর দেখল আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা— আমার দিদি, আমার সব।

টুপুরের বুক টনটন করে উঠল। দু’চোখ জলে ভরে উঠল তার।

সজোরে মাথা নেড়ে সে বলল, “না না না না, নীলে আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমাকে ছেড়ে ও কক্ষনো পালাবে না। ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে… পিকু! পিকু!”

সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল টুপুর।

ড্রয়িং রুমের সোফাটা খালি। সদর দরজা হাট করে খোলা। পিকু নেই। “পিকু?”

দৌড়ে বাইরে গেল টুপুর। সাইকেলটাও নেই।

অনুপমের হাতে একটা কাগজের টুকরো।

“টুপুর?”

কাগজটা নিয়ে টুপুর পড়ল—

“মা, আমি কলকাতায় যাচ্ছি। বাবাকে খুব মিস করছি। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি বাবাকে নিয়ে ফিরব। আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে। তোমার ছেলে বড়ো হয়ে গেছে। ভয় নেই।— পিকু।”

বাজারের ব্যাগ হাতে সদর দরজা দিয়ে ঢুকে এল বৃষ্টি। বাইরে শুরু হয়েছে ইলশেগুঁড়ি।

“টুপুর মাসি? কী হয়েছে? পিকু কই?”

বৃষ্টির হাতে চিরকুটটা ধরিয়ে দিল টুপুর। মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল বৃষ্টির মুখ।

টুপুর বলল, “বেরোতে হবে এক্ষুনি। মনসাতলা স্টেশনের দিকে…”

“বড়ো রাস্তা দিয়ে গেলে ওকে পাবে না মাসি। পিকুকে আমি একটা শর্টকাট দেখিয়েছিলাম। আমরা ওই রাস্তাটা দিয়েই মনসাতলায় ঘুরতে যেতাম। শেফালি সিনেমার পাশের গলি দিয়ে। আমি চিনি, চলো…”

টুপুর তাড়াহুড়ো করে গায়ে উইন্ডচিটারটা গলাতে গলাতে অনুপমকে বলল, “অনু, তাড়াতাড়ি চল। স্কুটারে গেলে আমরা এক্ষুনি ধরে ফেলব ওকে। খুব দুর্বল ও। শীতকালের এই বৃষ্টিতে ভিজলে ও আর বাঁচবে না।

অনুপম আমতা আমতা করে বলল, “বৃষ্টিটা থামুক না টুপুর। এখন স্কুটার চালালে ভিজে যাব। ঠান্ডা-ফান্ডা লেগে যাবে। পিকু বুদ্ধিমান ছেলে। ও নিশ্চয়ই বৃষ্টি হচ্ছে দেখে কোনো শেডের নীচে দাঁড়িয়ে গেছে…”

“কী বলছিস অনু? আমার ছেলেটা মরে যাবে…”

লজ্জা পেয়ে অনুপম বলল, “বৃষ্টিটা থামলেই বেরিয়ে যাব। ও ট্রেনে ওঠার আগেই ধরে ফেলব…”

অনুপমকে কথা শেষ না করতে দিয়েই টুপুর আর বৃষ্টি বাইরের দিকে দৌড় লাগাল।

পিচরাস্তা খাঁ খাঁ করছে। কেউ কোত্থাও নেই। ট্রেকার, অটো কিচ্ছুটি নেই। অসহায়ের মতো দু’জন দাঁড়িয়ে রইল বৃষ্টি মাথায় করে।

ছাতা মাথায় বেরিয়ে এসে অনুপম বলল, “প্লিজ টুপুর, একটু বোঝ। বৃষ্টিতে আমি কোনোদিনও স্কুটার চালাইনি। রাস্তা ভিজে থাকে। বড্ড স্লিপারি। আমার মা জানতে পারলে খুব বকবে…”

বৃষ্টি টুপুরকে বলল, “টুপুরমাসি, আমি দৌড় লাগাচ্ছি মাঠের দিকে। যদি তেন্ডুয়া থাকে ওর বাইকে চেপে বেরিয়ে যাব স্টেশনের দিকে। তুমি ট্রেকার পেলে এসো… টেনশন কোরো না… পিকুকে আমরা ফিরিয়ে আনবই আনব…”

বৃষ্টির কথা শেষ হওয়া আগেই দূর থেকে শোনা গেল একটা চাপা যান্ত্রিক গর্জন— ইঞ্জিনের গুবগুব শব্দ। ভিজে কালো পিচরাস্তা ধরে দূর থেকে তাদের দিকে এগিয়ে একটা হলদে আলোর বিন্দু।

তিন জনেই স্থির হয়ে চেয়ে রইল সেদিকে।

অনুপম নাক কুঁচকে বলল, “নির্ঘাত ওই রাসকেল তেন্ডুয়াটা বুলেটে চড়ে আসছে…”

বৃষ্টি ঠান্ডা গলায় বলল, “মুখ সামলে স্যার, নইলে আমি ভুলে যাব আপনি কে…”

বড়ো হতে থাকা আলোর বিন্দুটার দিকে চোখ ছোটো করে তাকিয়ে থাকা টুপুর ফিসফিসিয়ে বলল, “ওটা তেন্ডুয়া না অনুপম… আর বাইকটা বুলেটও না…”

অনুপম অবাক হয়ে দেখল দেখল উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে টুপুরের চোখজোড়া। টুপুর বলল, “ওটা ক্লাসিক…”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *