।। বিউটি আর কেষ্ট এক মাদুরে ।।
কেষ্ট মণ্ডল বড়ো দুখী প্রাণী। কেষ্টর ধারণা, এই ইহজগতে তার মতো গোবেচারা আদমি খুব কমই আছে।
হাটেবাজারে লোকজন তাকে উঠতে বসতে বড়ো হেনস্থা করে। আলফাল খিস্তিখেউর করে। এমনকী তার বাপ-মা’র সাধ করে রাখা নামটাও লোকে বিকৃত করে ডাকে— মালকেষ্ট।
দোষের মধ্যে সে একটু মাল খায়।
আর একটু চুরি করে। দু-একবার ছোটোখাটো ছিনতাইও সে করেছে। এই যৎসামান্য চারিত্রিক স্খলনের জন্য এভাবে লাঞ্ছনা করার কোনো মানে হয় না। নাক অবধি চুন্নু টেনে এসব দুঃখের কথা ভাবতে বসলেই কেষ্ট ভারী উদাস হয়ে যায়। ছলছলে চোখে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “এ দুনিয়া বড়ো বেইমান রে কেষ্ট। সব্বাই উঠতে বসতে স্রেফ গরিবকে থ্যাতলাচ্ছে। এই যো শেখ হাসিবুদ্দিন মল্লিক যে গতবার রেশনের লাখ লাখ টাকার গম সক্কলের নাকের ডগা দিয়ে বেমালুম হজম করে ফেলল, তাকে কেউ কিছু বলেছে? বলেনি। তার টাটা সুমো গাড়িখানা দেখলে রাস্তাঘাটে লোকে মাথা নুইয়ে সেলাম ঠোকে।
আর কেষ্ট একটা ঢ্যারট্যারে সাইকেলও কাউকে না বলে ধার নিলে কপালে জোটে দমাদ্দম হাটুরে কিল। লোকে বলে সে নাকি চুরি করেছে।
কোনো মানে হয়? ছ্যাঃ!
এইসব ছোটোখাটো পাঁচরকম ঝুটঝামেলা নিয়েও পেছন ঘষটে ঘষটে দিন কেটে যাচ্ছিল কেষ্টর।
গন্ডগোলটা বাঁধল স্বপন বাউরির ডবকা বউটার মন চুরি করে ফেলতেই।
অমন আগুনে মেয়ে যে কেষ্টর দড়ি পাকানো শরীর আর তোবড়ানো গালে কী জাদু খুঁজে পেল তা ভেবে ভেবে থই পায় না কেষ্ট।
মাসছয়েক আগে এক চটচটে সন্ধেবেলা দু-একটা হাঁড়ি-কলসি হাত সাফাই করার তালে স্বপন বাউরির পাকঘরের দরমাটা ফাঁক করেছিল কেষ্ট।
ঠিক সেই সময়েই গা-টা ধুয়ে ও-ঘরে শাড়ি-বেলাউজ ছাড়তে ঢুকেছিল স্বপনের বউ বিউটি।
দরমার ফাঁক দিয়ে মাথাটা গলাতেই কেষ্টর চোখজোড়া আটকে গিয়েছিল বিউটির সুডৌল স্তনজোড়ায়।
মাজা ত্বকে পিছলে যাচ্ছিল কেরোসিন কুপির লালচে আলো।
কেষ্টকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুকে কাপড় চাপা দেয়নি বিউটি— বরং আলগা করে দিয়েছিল শায়ার দড়ি।
সেদিনের ওই ঠোঁট-বেঁকানো হাসি আজও কেষ্ট চোখ বুজলেই স্পষ্ট দেখতে পায়।
তার পর থেকে আর কেষ্টকে দরমা ফাঁক করতে হয়নি। সিঁদ কাটতেও হয়নি।
স্বপন বাড়িতে না থাকলেই কেষ্টকে ডেকে নেয় বিউটি।
স্বপন যে কী জিনিস তা শিমুলগাছার সব্বাই জানে। সে জানতে পারলে তার কী হাল হবে তাও কেষ্ট ভালো করেই জানে। স্বপনের হাতের ক্ষুর চলে মুখের আগে।
কেষ্ট বাপের জন্মে যত না পকেট মেরেছে, তার চেয়ে ঢের বেশি লাশ নামিয়েছে স্বপন।
বারকয়েক জেল খেটে এসে সে আরও ট্যাটা হয়ে গেছে। মাথার ওপর লোকাল নেতাদের হাত। হ্যাঁ, স্বপন জানতে পারলে কেষ্ট শেষ— ব্যাপারে সে নিশ্চিত।
তবে সে ভোজালি দিয়ে কুপিয়ে মারবে না পেট্রোল ঢেলে জ্যান্ত জ্বালাবে সেটা এখনও কেষ্ট ভেঁটে বলতে পারে না।
তার হয়েছে যত জ্বালা। দিনেমানে আর কাজেকামে মন লাগে না তার। থেকে থেকে বুক ঢিপঢিপ আর গা ছমছম— এই বুঝি স্বপন জেনে গেল, এই বুঝি তাকে পিটিয়ে মারল।
রাত্তিরেও চুরি করতে বেরোনো ইদানীং লাটে উঠেছে। গোটা সন্ধে কচুবনে ওঁত পেতে মশার কামড় খায় কেষ্ট।
স্বপন তার সাগরেদ ছোটুকে এমএইট্টি-তে চাপিয়ে ঢ্যাকঢ্যাক করতে করতে বেরিয়ে গেলেই কচুবনের আড়াল থেকে উঁকি মারে সে।
বিউটির হাতের গেঁড়ির ঝাল দিয়ে একথালা গরম ভাত সাবড়ে ঢেঁকুর তোলে— হেউউউ।
ততক্ষণে মাদুর পেতে ব্রায়ের হুক আলগা করে অপেক্ষা করে বিউটি। তার গলায় ঘাড়ে মাতাল করা কিউটিকুরা পাওডার মেশানো ঘামের গন্ধ। নির্লোম ডিমি, রূপোর মল পরা গোল গোল পায়ের গোছ পাগল করে তোলে কেষ্টকে।
বিউটির সঙ্গে কি কেষ্টর প্রেম? তা কেষ্ট জানে না। তবে নেশা যে কাকে বলে তা কেষ্ট হাড়েহাড়ে জানে।
তাকে বিউটির নেশায় ধরেছে।
তবে কেলোটা বাঁধল আজকে রাতেই।
ঠান্ডা পড়েছে তেড়ে। আজ কেষ্ট দিশি ছোঁয়নি। আঁচলের খুঁট খুলে পঞ্চাশ টাকার নোটটা বের করে দিয়েছিল বিউটিই।
ওল্ড মঙ্ক টেনে গা গরম করেছিল দু’জনে। কামনার তোড়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল মাদুর, বালিশ, বালাপোশ।
তারা আজ এমনই পাগল হয়ে উঠেছিল যে বাইরে স্বপনের এমএইট্টি এসে থামার শব্দটা তাদের কানে পৌঁছয়নি।
স্বপন ঘরে ঢুকতেই হুঁশ ফিরেছিল কেষ্টর। তখনও সে বিউটির ভেতরে আধখানা।
কেষ্টর চোখজোড়া বিস্ফারিত। বিউটির শীৎকার। স্বপন হাঁ।
মুহূর্তে বিউটির পায়ের বাঁধন থেকে শরীর ছাড়িয়েছিল কেষ্ট। নিজেকে টেনে বের করে নিয়ে স্বপন ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই কেষ্ট গলে গেল তার বগলের তলা দিয়ে।
জামা প্যান্টুলের গোছটা তুলে নিয়েই দে দৌড়।
দৌড়তে দৌড়তে সে ঢুকে পড়েছিল দক্ষিণের জঙ্গলে। গভীরে না পৌঁছে থামেনি সে।
খালি পা এখন টনটন করছে। বুক ফেটে হৃৎপিণ্ডটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। পুবদিক ধীরে ধীরে ধূসর হচ্ছে।
.
কেষ্ট জানে স্বপন আর তার লোকেরা শিমুলগাছা তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। শিকার শুরু হয়ে গেছে। তারা থামবে না।
দক্ষিণের জঙ্গলের অনেক ঘোঁতঘাঁত কেষ্টর জানা আছে। চুরি ছিনতাই করে গণপিটুনির হাত থেকে বাঁচতে অনেকবার সে গা ঢাকা দিয়েছে এই জঙ্গলে। দিনটা যদি কোনোমতে পার হয়ে যায়, অন্ধকার নামলেই সে মনসাতলা পালাবে। তারপর ট্রেন ধরে সিধে কলকাতা।
এ জঙ্গল অনেক অনেক প্রাচীন। বহুকাল আগে জঙ্গলের কিনারায় বিরাট বিরাট বাড়ি-টাড়ি ছিল। এখন জঙ্গল তাদের গ্রাস করেছে।
হাঁটতে হাঁটতে কেষ্ট ঢুকে পড়ল একটা পুরোনো বাড়িতে। ভাঙা দেয়াল, ধসে পড়া পিলারের ভেতর ছোট্ট একটাই ঘর কোনোমতে টিকে আছে।
একটা প্রকাণ্ড বটগাছই সেটাকে কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছে। একটা-দুটো পাখি ডাকতে শুরু করেছে। আকাশ ধীরে ধীরে ফরসা হচ্ছে।
জরাজীর্ণ দালানটা বরাবর পরপর অসংখ্য ঘর। সবার শেষেরটাতে কেষ্ট অনেকবার রাত কাটিয়েছে। চুরির মালটাল আগে সে ওই ঘরে এনেই ডাঁই করত। এটা তার কাছে খুবই নিরাপদ আস্তানা। দু-চারটে ছোটোখাটো কাজের জিনিসও সে এখানে এনে রেখেছে।
দরজাটা হাঁ করে খোলা। একটু এগোতেই একটা পচা গন্ধ এসে কেষ্টর নাকে ধাক্কা মারল।
শেয়াল টেয়াল পচল নাকি? দরজার ভেতরে অন্ধকারে কে যেন শুয়ে আছে। সামনের মেঝেতে চিৎ হয়ে আছে সাদা মতোন কে একটা।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে।
ঠিকই ধরেছে কেষ্ট। মেঝেতে শুয়ে আছে ফ্রক পরা একটা মেয়ে। হাতড়ে হাতড়ে ডানদিকের কুলুঙ্গিতে রাখা একটা ছোটো টর্চ পেড়ে নিল কেষ্ট।
মেয়ে। বাচ্চা মেয়ে। সে আর বেঁচে নেই। শরীরের অর্ধেকটা খাওয়া। মুখেরও অবস্থা ভালো না। চোয়াল ওপর-নীচে টেনে মুখটা ছিঁড়ে ফাঁক করা হয়েছে।
আর আর… তার জিভটা নেই।
মেয়েটাকে কেষ্ট চেনে।
ওদের বাড়ির সরস্বতী ঠাকুর বিসর্জনের দিন সে মাঝেমধ্যে ভ্যান টেনেছে সে। পোস্টমাস্টার শঙ্কর চক্রবর্তীর মেয়ে— প্রিয়াঙ্কা।
ভারী মিষ্টি বাচ্চা। তাকে কাকু কাকু বলে ডাকে।
হাঁউমাউ করে চিৎকার ছাড়ল কেষ্ট। তারপর সে দৌড় দিল জঙ্গলের কিনারার দিকে।
স্বপনরা কেষ্টকে কবজা করে ফেলার আগেই শিমুলগাছা থানায় তাকে পৌঁছতে হবে।
