অনুপম বিয়ে করেনি

।। অনুপম বিয়ে করেনি ।।

অনুপমদের বাড়িটা শহরের ঠিক অন্যপ্রান্তে। পুরোনো দিনের বিশাল বাড়ি। অনুপমের দাদু একসময় হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। এখনও অনুপমদের পয়সাকড়ির অভাব না থাকলেও এত বড়ো বাড়ির দেখভাল করা সম্ভব হয় না। মানুষ থাকে মাত্র তিনজন। অনুপম, তার বাবা আর মা। তারা যে অংশটায় থাকে সেটা বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো। বাকিটার অবস্থা তথৈবচ। দেয়ালে ড্যাম্প ধরে চুনকাম খসে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় সিমেন্টের চাবড়া উঠে গেছে। বাড়ির একদিকের একটা দেয়াল জুড়ে গাঢ় সবুজ শ্যাওলা।

অনুপমের মা-বাবা দু’জনেই বড়ো পদে সরকারি চাকরি করতেন। এখন তাঁরা রিটায়ার করেছেন। টুপুরকে দেখে খুব খুশি হলেন। অনুপমের মা বললেন, “কত বছর পর এলি টুপুর। এখনও সেই একইরকম মিষ্টি… থাক থাক… পায়ে হাত দিস না… শিমুলগাছায় এসেছিস এক মাস হয়ে গেল, এতদিনে মনে পড়ল এই বুড়োবুড়ির কথা?”

“কোথায়? তোমার ছেলেরই তো সময় হয় না। আমি তো সেই এসে থেকে বলছি কাকিমার কাছে নিয়ে চল।”

“কেন? তুই একা আসতে পারিস না? যাই হোক, লুচি ভাজছি, না খেয়ে যাবি না। সঙ্গে ঝাল ঝাল আলু কষা। তোর ফেভারিট।”

টুপুর হেসে বলল, “তুমি মনে রেখেছ কাকিমা?”

অনুপমের বাবা টিভি দেখছিলেন। মিউট করে বললেন, “মনে তো রাখতেই হবে মা জননী। তবে শুধু কাকিমা না, কাকুও মনে রেখেছে। গোবিন্দ দাসের দোকান থেকে স্পেশাল সরভাজা নিয়ে এসেছি আমি। হাফ ডজন না খাইয়ে ছাড়ছি না।”

অনুপম বলল, “চ’ টুপুর। ছাদে যাই।”

ছাদে বেরিয়েই মনটা হু হু করে উঠল টুপুরের। বনেদি বাড়ি। ছাদের মেঝেতে একসময়ে কারুকাজ করা ছিল— কালচে-সবুজ শ্যাওলার পুরু আস্তরণে এখন তা ঢাকা পড়েছে। বিশাল ছাদের আনাচে কানাচে জমে রয়েছে শীতের মনকেমনিয়া বিকেল। অনুপমের মা মশলা মাখিয়ে আমলকি রোদে দিয়েছেন। একটা মাদুরের ওপর বিছিয়ে রাখা আছে সোয়েটার, কম্বল, তোষক, মাফলার।

সেগুলো তুলতে তুলতে টুপুর বলল, “তোর কী আক্কেল রে! কাকিমা এগুলো নিশ্চয়ই রোদে দিয়েছিলেন। রোদ পালিয়েছে সেই কখন, সব ঠান্ডা মেরে গেল। কাল আবার রোদে দিতে হবে।”

অনুপম বলল, “তুলিস না। ওগুলো আমাদের না। কাজের লোকের। থাক গে।”

একটু ইতস্তত করেও সেগুলো ফের মাদুরের ওপর রেখে দিল টুপুর।

ছাদের আলসে ধরে দাঁড়াল টুপুর। বাড়ির পেছনদিকের বাগানটা সবুজ গাছপালায় ভর্তি। অনুপমদের বাড়িটা একদম বাগানের মধ্যিখানে। খানিক দূরে চিকচিক করছে হাওরের জল— ভাঙা ঘাটে একটা ছোট্ট নৌকো বাঁধা— অল্প অল্প দুলছে।

বুক ভরে শ্বাস নিল টুপুর।

“কতদিন পর যে এমন তাজা বাতাসে শ্বাস নিলাম! আহা! ওটা পুরোনো সার কারখানার চিমনিটা না? শ্যাওলা ধরে বিকেলের আলোয় কী দারুণ দেখাচ্ছে!”

“এটাই তো শিমুলগাছার বিউটি … আমাদের শিমুলগাছা …

পশ্চিমে মাথার ওপর দিয়ে বকের ঝাঁক উড়ে যায়, ডাহুকের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে লাল কয়লার টুকরোটাকে গিলতে থাকে পোড়ামুখির হাওর। শেষ বিকেলের মায়াবী আলোয় কেউ কোত্থাও নেই।

টুপুর বলে, “পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্ত।”

অনুপম হঠাৎ বলে ওঠে, “তুই চলে গেলি কেন, টুপুর?”

একটু চুপ করে থেকে টুপুর বলল, “কী করতাম বল? তুই তো জানিস…”

“না, আমি জানি না। আমি সত্যিই জানি না। সবাই তো ছিল এখানে – বন্ধুরা, তোর বাবা মা… আর… আর আমি…”

অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে টুপুর বলল, “আমার বাবা-মায়ের কথা তুলিস না অনু। আমার ছোটোবেলাটা ছারখার করে দিয়েছিল ওই দু’জন। আমার ভাই… আমার নীলে… আমি পারলাম না ওকে বাঁচাতে…”

গলা বুজে আসে টুপুরের।

“দ্যাখ টুপুর, নিজেকে দোষ দিস না। নীলে ওই বয়সেই প্রচণ্ড লোফার হয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষায় ফেল করে সে বাড়ি থেকে পালাল আর তুই এখনও নিজেকে ব্লেম করে চলেছিস!

“না, না, না… কিছু তো একটা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল ওকে… বলত, কে যেন ওকে উঁকি মেরে দেখে… ও অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল আমাকে… আমরা কেউ বিশ্বাস করিনি ওর কথা… আমিও না…”

গলা কেঁপে ওঠে টুপুরের।

“নীলে আমাদের বাড়ির চিলেকোঠা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল অনুপম। নীচে আমরা সবাই ছিলাম। চিলেকোঠার ঘরে ডাক্তার জেঠু ওর সঙ্গে কথা বলছিল। ও যাতে আবার পালিয়ে না যায় তার জন্য জেঠু দরজাটায় বাইরে থেকে হুড়কো টেনে দিয়ে নীচে বাবার সঙ্গে কথা বলতে আসেন। খুব জোর পাঁচ মিনিট। তার পরেই বাবা আর জেঠু একসঙ্গে ওপরে গিয়ে দরজা খুলে দেখে নীলে নেই… উধাও…”

“টুপুর, কিছু না কিছু লজিক্যাল এক্সপ্ল্যানেশন তো আছেই। বাড়ি আর স্কুল পালাতে ওস্তাদ ছিল নীলে। মে বি এমন কোনো ট্রিক ইউজ করে পালিয়েছিল যেটা কেউ ধরতে পারেনি। তোকে বুঝতে হবে টুপুর…

“ভাল্লাগছে না অনু। এই ব্যাপারে আমি আর কথা বলতে চাই না।”

অন্ধকার নামছে। দূরে কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে। ভারী মনকেমনিয়া সুর।

টুপুরের দিকে একটু ঘন হয়ে আসে অনুপম। দু’জনেই চুপ।

খানিক বাদে টুপুর ফিসফিসিয়ে বলে, “পিকুটাকে নিয়ে বড্ড চিন্তা হয় রে। ওকে দেখে মাঝেমাঝে ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়…”

“পিকুকে তো কলকাতাতেই রেখে আসতে পারতিস।”

অবাক হয়ে টুপুর তাকাল অনুপমের দিকে।

“মানে ওখানে স্কুল-কলেজ অনেক বেটার আর তাছাড়া এতদিন কলকাতায় থাকার পর শিমুলগাছায় মানিয়ে নিতে ওকে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। মানছি, যদিও ওর বাবা একদমই ভালো মানুষ না…”

“অনু, প্লিজ যা জানিস না সে ব্যাপারে ফালতু বকিস না। পিকুর বাবার কেমন মানুষ সেটা তুই কীভাবে জাজ করতে পারিস? কতটা চিনিস তুই তাকে?”

“একটুও না। তুই তো কিছু বলিসই না আমাকে। বার বার জিজ্ঞেস করি। তোদের মধ্যে কী হয়েছে সে ব্যাপারেও তো কিছুই জানি না।”

“কী করবি জেনে?”

অনুপমের চোখ চিকচিক করে। ধরা গলায় সে বলে, “তুই তো আমাকে সব বলতিস টুপুর।”

টুপুর চুপ। টুপুরের ডান হাতটা তার দু’হাতের তালুতে আলতো করে ধরে অনুপম বলে, “টুপুর, আমি বিয়ে করিনি কেন জানিস? এত বছর আমি অপেক্ষায় ছিলাম…”

টুপুর কিছু বলার আগেই ছাদের দরজার কাছ থেকে অনুপমের মায়ের গলা শোনা গেল, “এই চল তোরা। লুচি ঠান্ডা হয়ে যাবে…”

অপ্রস্তুত হয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল টুপুর।

থমকে গিয়ে অনুপমের মা বলেন, “এই আমি ইন্টারাপ্ট করলাম… সরি সরি, তোরা কথা বল…”

চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে টুপুর বলে, “না কাকিমা, আমরা জাস্ট নীচেই নামতাম গো। চলো…”

“টুপুর, একবার শোন…” পিছু ডাকে অনুপম

অনুপমের মা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। ফিরে আসে টুপুর।

“কী?”

“একটা কথা রাখবি টুপুর? মা-বাবা’কে বলিস না যে তোর ছেলে আছে, বা তোর বিয়ে হয়েছিল…”

ভুরু কুঁচকে তাকায় টুপুর।

“প্লিজ টুপুর…” অনুপমের স্বরে আকুতি।

কোনো উত্তর না দিয়ে ফের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় সে।

“কাকিমা, কোথায় গেলে? দাঁড়াও গো…”

টুপুর নেমে যেতে জামার হাতায় চোখ মোছে অনুপম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *