।। টুপুর টাপুর বৃষ্টি ।।
ভোররাত থেকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। থামার নাম নেই মোটে। ধূসর আকাশ, কালচে মেঘ আর মরা আলোয় ঘ্যানঘ্যানিয়ে নাছোড়বান্দা টিপির টিপির। খাটের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে পিকু। গায়ে কম্বল। গায়ের রং কাগজের মতো ফ্যাকাশে, কোটরে বসা চোখের চারপাশে পুরু কালির ছোপ। শূন্য দৃষ্টিতে পিকু তাকিয়ে রয়েছে জানলার ঝাপসা কাচের দিকে।
সদর দরজার বাইরের সিঁড়িতে পাশাপাশি বসে আছে টুপুর আর বৃষ্টি। নীলচে কুয়াশা ভেদ করে মাঝেমধ্যে পিচ রাস্তা দিয়ে হুশ হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে একলা অটো বা ট্রেকার। টুপুরের হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। তার চোখে-মুখেও অনিদ্রার চিহ্ন স্পষ্ট।
বৃষ্টির হাতদু’টো তার কোলের ওপর জড়ো করে রাখা। তার শালের খুঁট আনমনে ভিজছে এই অকাল বর্ষার ছাঁটে।
টুপুর ফিসফিসিয়ে বলল, “জানি না রে বৃষ্টি ছেলেটার কী হবে… মাথা কাজ করছে না আমার। আমার ভাইয়ের লেখাগুলোও পড়লাম রে। সেই একই কথা লিখে গেছে— শোক তাকে পথ দেখায়। একাকিত্ব শক্তি দেয়। বিচ্ছেদ তাকে শরীর দেয়। ভয় দেয় পুষ্টি…
পিকুও ঘুমের ঘোরে বারবার আউড়ে চলেছে এই একই কথা। শরীর ভেঙে পড়ছে ছেলেটার…”
“টুপুরমাসি, এই কথাটা কিন্তু তোমাদের ভটচায ডাক্তারও শেষ বয়সে শিমুলগাছার পথে পথে বিড়বিড় করে বেড়াত… আমার মনে হয় পিকুর মন ভালো করা দরকার, ওকে বিশ্বাস জোগাতে হবে আমরা ওর সঙ্গেই আছি, আমরা ওকে ভালোবাসি… ও একা না…”
“কিন্তু জেগে থাকতে তো আমাকে ধারে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না ও… কী যে অভিমান ওর! আমি খুব খারাপ মা রে বৃষ্টি…”
মাথা নিচু করে বৃষ্টি বলে, “না টুপুরমাসি, আঘাত তো আমিও ওকে দিয়েছি। সেদিন আমার ওকে বলা উচিত হয়নি যে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। আমার চুপ করে থাকাই উচিত ছিল।”
উত্তেজিতভাবে ঘাড় নেড়ে টুপুর বলল, “না রে মা, তুই একদম ঠিক কাজ করেছিস। মিথ্যে কোনো সম্পর্কের ভিত হতে পারে না। তোর খুব সাহস বৃষ্টি। অকপটে সত্যি বলার সাহস সবার থাকে না। পিকুকে শিখতে
হবে কীভাবে সত্যিকে অ্যাকসেপ্ট করতে হয়… আর তুই তো পিকুর ভালো বন্ধু বৃষ্টি…”
“হ্যাঁ মাসি…”
“ভালো বন্ধুরা মিথ্যে বলে না। সত্যি যতই তেতো হোক, বলে দেওয়া উচিত। তুই সেদিন চুপ করে থাকলে ভবিষ্যতে আরও সমস্যা হতে পারত।”
কাষ্ঠ হেসে বৃষ্টি বলল, “জীবন কী জটিল না মাসি?”
টুপুর হাসল, “আমরাও কি কম যাই? জীবনের কী দোষ? পিকুর বাবা তো আমাকে সবসময় বলত— হ্যাঁ গো, গোমড়া হয়ে না থেকে ঝেড়ে কেশে পেটের কথাটা বলো না… মাইরি বলছি এত হেঁয়ালি ধরতে পারি না…”
ক্লান্তভাবে হাসল দু’জনেই।
বৃষ্টি একটু ইতস্তত করে বলল, “টুপুরমাসি, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কর।”
“তুমি অনুপম স্যারকে ভালোবাসো?”
“না, একদমই না। মানে তুই যা মিন করছিস, সেই হিসেবে একদমই না। হ্যাঁ, অনুপম আমার পুরোনো বন্ধু। ভালো বন্ধু। শিমুলগাছায় ফিরে এসে সেল হতে আমাকে অনেক হেল্প করেছে। আমি কৃতজ্ঞ তার জন্য। কিন্তু সেটা কখনোই অন্য কিছু না…
“অনুপম স্যার জানে সেটা?”
“হ্যা, মানে জানা তো উচিত…”
“আর যদি না জানে?”
“অনুপম জানে তো আমি বিবাহিত… ও তো জানে আমি… আমি… অন্য কাউকে ভালোবাসি…”
বৃষ্টি টুপুরের হাত ছুঁয়ে বলল, “তাহলে মাসি তুমি তাকে ফোন করছ না কেন? পিকুর এখন তাকে দরকার…”
টুপুর চুপ। শেডের ওপর চড়বড়িয়ে নাচছে বৃষ্টির ফোঁটা।
“ভেবেছিলাম সেই-ই বোধহয় ফোন করবে…কী করে বুঝব এখনও শিমুলগাছায় মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার বসেনি?”
বৃষ্টি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “মাসি, ছোটোগড়ের কাছে একটা ডোকোমোর টাওয়ার আছে। শিমুলগাছা লাইব্রেরির ছাদে উঠলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। যাবে?”
টুপুর উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির ভিতর মধ্যে থেকে ভেসে এল হাড় হিম করে দেওয়া আর্তনাদ।
“মাগোওওও…”
টুপুর আর বৃষ্টি ছুটল পড়ি কি মরি করে।
বিছানার ওপর বসে থরথর করে কাঁপছে পিকু। কম্বলটা পড়ে আছে মেঝের ওপর।
“উঁকি মারছিল… কম্বলের তলা থেকে… আ-আমাকে দেখছিল… আঁচড়ে দিয়েছে পায়ে…”
টুপুর দৌড়ে গিয়ে পিকুর মাথাটা পেটের মধ্যে টেনে নিয়ে বলল, “এই তো সোনা… এই তো মা এসে গেছে বাবা… কিচ্ছু হবে না… কেউ নেই…”
ফোঁপাতে লাগল পিকু।
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টির দিকে ফিরে টুপুর বলল, “কিচেনের ড্রয়ারে আমার মোবাইলটা আছে। নিয়ে যা। পারবি তো? টাচ-স্ক্রিন ফোন…”
“হ্যা মাসি, গোপাল স্যার নতুন কিনেছে… স্যার শিখিয়েছে…”
“তাড়াতাড়ি যা। কল লিস্টের শুরুতেই তার নাম্বার পাবি। সব কিছু খুলে বলবি। পিকুর কথা বলবি…
“সে আসবে?”
“হ্যাঁ… আমাদের জন্য সে যেভাবেই হোক আসবে…”
মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল বৃষ্টি।
হাঁপাতে থাকা পিকুর চুলে বিলি কাটতে থাকল টুপুর।
