উঁকি
জিভ

প্ৰত্যয় তখন ছোটো ছিল

।। প্ৰত্যয় তখন ছোটো ছিল ।।

“কড়্যাক!”

দূরে গাছের গুঁড়ির ওপর রাখা বিয়ারের বোতল ঝনঝনিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ঘাসের ওপর। কেঁপে ওঠে জঙ্গল। ক্যাকক্যাক শব্দ করে উড়ে পালাতে থাকে বুনো হাঁসের দল। বিকেল নামছে।

এগিয়ে এসে ছেলের পিঠ চাপড়ে শাবাশি দেন প্রদীপ ব্যানার্জি, শিমুলগাছা থানার বড়োবাবু, “শাব্বাশ! জিও মেরে শের।”

ছোট্ট প্রত্যয় বাবার দিকে মুখ তুলে তাকায়। বাবা খুশি। তাহলে সেও খুশি। গিটারের শখ ছিল তার। বাবা ধরিয়েছে রাইফেল।

তাঁবুর সামনে ক্যাম্পফায়ারের নিভু নিভু আগুনে দু’টো কাঠ গুঁজে দিতেই একটা লাল শিখা আবার লকলকিয়ে ওঠে। জ্যাকেটের সামনের চেন খানিকটা নামিয়ে দেয় প্রত্যয়। এক হাতে ধরা শিকে গাঁথা চিকেন বার্বিকিউ। উলটোদিকেই গাছের গুঁড়ির ওপর বসা বড়োবাবু বিয়ারের বোতলে একটা লম্বা চুমুক মেরে বলেন, “আহ! পারফেক্ট! ফাদার-সন আউটিং। কী ওসব ভুলভাল বন্ধুদের সঙ্গে মিশিস। বলেছিলুম বন্দুক চালানোটা ভালো করে শেখ। ব্রাইট ফিউচার তোর রে বাবু। ব্রাইট ফিউচার।”

প্রত্যয় মুখ খোলে, “বাবা?”

“উঁ”

“গিটারটা কিন্তু আমার সত্যিই খুব ভাল্লাগত।”

বিয়ারের বোতলে আরেকটা চুমুক মেরে বড়োবাবু বলেন, “শিমুলগাছায় থাকতে গেলে গিটার না, বন্দুক ধরতে হবে।”

মৃদু প্রতিবাদের সুরে প্রত্যয় বলে, “কিন্তু আমাদের এখানে কী হয় বলো? এখানে তো সবাই বন্ধু।”

“না, সবাই বন্ধু না,” গর্জে ওঠেন বড়োবাবু, “শিমুলগাছায় যা আছে… যা আমার বাবাকে কেড়েছে…” আগুনের আঁচ ধিকধিকিয়ে ওঠে বড়োবাবুর চোখে।

প্রত্যয় ভীতু ভীতু গলায় বলে, “বাবা, রাগ কোরো না। আমার টিপ বেশ ভালো।”

খানিকটা শান্ত হন বড়োবাবু, “তোকে বলিনি না? দাদু কীভাবে চলে গেল…”

প্রত্যয় বলে, “অ্যাক্সিডেন্ট তো। দাদুর গাড়ি খালে পড়ে গিয়েছিল।”

“হুঁ! সেটা তো অফিশিয়াল রিপোর্ট। বাবাকে যখন পাওয়া যায়, তখন একটা জিনিস মিসিং ছিল। জানিস কী?”

“কী?”

“বাবার জিভ।”

শিউরে ওঠে প্রত্যয়। বড়োবাবু বলে চলেন, “বড়ো হয়েছিস। জানা দরকার, তাই বললাম। আমি তোকে এখানে রাখব না। বাপের চাকরি আমি পেয়েছি। শহরের মায়া ছাড়তে পারিনি তাই রয়ে গেছি। তোকে এখানে রাখব না। যদ্দিন আছিস লড়ে বাঁচতে হবে।”

ছোট্ট প্রত্যয়ের মন সায় দেয় না। তাকে চলে যেতে হবে! শিমুলগাছা ছেড়ে চলে যেতে হবে! বাবাকে ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে, মায়ের গন্ধমাখা ঘর, উঠোন, কৃষ্ণচূড়া ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে? সে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাব বাবা?”

বড়োবাবু ঘোরের মধ্যে বলে যেতে থাকেন, “আর মোটে সাত বছর। দু’হাজার বারো। বারোতে আবার সে আসবে। তৈরি হতে হবে বাবু। তোকে লড়তে হবে।”

একটা প্যাঁচা ডেকে ওঠে। বনফায়ারের ঝাঁঝ কমে এসেছে। বাবার সামনে কাগজের প্লেটে রাখা মাংস এতক্ষণে ঠান্ডা। প্রত্যয় আগুনে একটা কাঠ গুঁজে দিয়ে বলে, “সাত বছর পর কী হবে বাবা?”

ঠান্ডা চোখে ছেলের দিকে তাকান বড়োবাবু, “আমি এতদিন কেন এখানেই থেকে গেছি জানিস বাবু? ট্রান্সফার নিইনি কেন? লোকে বাপের চাকরি বলে অনেক খোঁটা দেয়। মুখ বুজে সয়ে যাই। কেন জানিস?”

নিজের বাবাকেই বড়ো অচেনা ঠেকে প্রত্যয়ের। ভয়ে ভয়ে সে শুধোয়, “কেন বাবা?”

“প্রতিশোধ,” বড়োবাবুর চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, “বিরাশি সালে পনেরো জনকে নিয়েছিল। আমার বাপকেও নিয়েছিল।”

ঠান্ডা লাগে প্রত্যয়ের। মাথার ওপর আকাশগঙ্গা ঝকঝক করছে। হরিণের ভয়ার্ত ডাক কানে আসে। ক’দিন বাদে ঠান্ডা আরও বাড়বে। অদ্ভুত জায়গা শিমুলগাছা। প্রতিটা ঋতুই চড়াও হয়ে অত্যাচার করে যায়। গ্রীষ্ম ঝলসায়, বর্ষা নাকানিচোবানি খাওয়ায় আর শীত হাড় কাঁপিয়ে তবে ছাড়ে।

বাবা বিড়বিড় করতে থাকে, “আ-আমাকে সবাই পাগল ভেবেছিল। বাবা মরে যেতে আমি সব ঘেঁটে দেখেছি। লাইব্রেরি, খবরের কাগজের আর্কাইভ— সব। এই ভুলভাল চাকরি নইলে নেব কেন? আমিও চলে যেতে পারতাম কলকাতায়। চাকরি পাওয়ার পর পুলিশের সব ক্লাসিফায়েড ফাইল ঘেঁটেছি— সেই শালা ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত। তিরিশ বছরের গ্যাপ, তিরিশ বছরের গ্যাপে শয়তানটা আসে। জিভখোর শয়তানটা। আঠেরশো বিরানব্বুই, উনিশশো বাইশ, উনিশশো বাহান্ন, তারপর বিরাশি— আমার বাপকে নিল।”

চোখের কোণ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে বড়োবাবুর। টলতে টলতে দাঁড়িয়ে উঠে দক্ষিণের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন, “আমার ছেলেকে নিবি? আয় দেখি কত দম, শুয়োরের বাচ্চা…”

হাত থেকে বিয়ারের বোতলটা মাটিতে আছড়ে পড়ে। প্রত্যয় ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। নিভে আসা বনফায়ারের কুণ্ড থেকে পাক খেয়ে খেয়ে ওঠে ধোঁয়া। তাঁবুর ভেতর অচেতন বড়োবাবু ঘড়ঘড়িয়ে নাক ডাকেন। বন্দুক কোলে বাবাকে পাহারা দেয় ছোট্ট প্রত্যয়। দু’চোখ ঘুমে ঢুলে আসে, কিন্তু শুকনো পাতা ঝরার শব্দেও আবার নড়েচড়ে বসে সে। তাকে সজাগ থাকতে হবে। তার মনে শঙ্কা ঢুকিয়ে দিয়েছে বাবা। রাত ঘন হয় দক্ষিণের জঙ্গলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *