৯
-উফফফ যা খিদে পেয়েছিল না? চোখের সামনে থেকে তর্পণার দেওয়া কেক আর প্যাটিসগুলো ফেরাচ্ছি আর ওদিকে পেটের মধ্যে ছুঁচোটা কষে লাথি মারছে।
চপাত চপাত করে কচুরি আর ছোলার ডাল খেয়ে হাত ধুয়ে নিল স্বয়ম্ভু। সিনিয়ারের ছ’খানা কচুরি সাঁটানো দেখে শিবাঙ্গী হেসে মরে। যদিও মনে মনে, সামনাসামনি কি আর হাসা যায়? দোকানে আরেক খদ্দের বাইক ছুটিয়ে এসে কচুরি আর ছোলার ডালের অর্ডার দিল। এক গাল চাপা দাড়ি, মুখে নীল মাস্ক। চোখে সানগ্লাস। শিবাঙ্গী লোকটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বলল, ‘চাহিদা দেখেছেন?”
-তার চেয়েও দেখার বিষয় হল আমরা কেউ মাস্ক পরিনি। কিন্তু এই ছেলেটি এখনও সেটা মেইনটেইন করছে। গুড। ভেরি গুড।
শিবাঙ্গী এখনও কচুরি আর ছোলার ডালেই ডুবে আছে। ‘এদের রান্নাটা কিন্তু জবর।’ বলল শিবাঙ্গী ।
-এ দোকানের সন্ধান দিলে কে?
-এইখানেই তো আমার স্কুল ছিল। মায়ের সঙ্গে আসতাম। এ কি আজকের দোকান নাকি? বহুকাল!
-হ্যাঁ, মেঘে মেঘে বেলা তো আর কম হল না ।
শিবাঙ্গীর ভুরুতে ধনুকের টঙ্কার। মুখ ধুয়ে একটা সিগারেট ধরাল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বলল, ‘সেই। মেয়েদের বয়স ভোলাদার চেয়ে বেটার আর কে জানবে?’ এক মুখ ধোঁয়া নিয়ে হাসতে গিয়ে খকখক করে কেশে ফেলল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী পড়ল বেজায় অস্বস্তিতে। নিমেষের মধ্যে অন্তত বার দশেক ‘সরি’ বলা হয়ে গেল। সস্নেহে চাপড়ে দিল স্বয়ম্ভুর পিঠে। সেই দেখে স্বয়ম্ভুর হাসি থামার বদলে বেড়ে গেল আরও। ‘এত হাসির কী বললাম আপনাকে?’ শিবাঙ্গী কপট রাগ দেখাল। হাসতে হাসতে স্বয়ম্ভু বলল, ‘একে তো সিনিয়ারের ডাক নাম ধরে ফাজলামো মারছ। তার ওপর পিঠের ওপর চটাস চটাস করে খানকতক চাঁটিয়ে দিলে! এ কী মাংসের খিচুড়ি না খেতে পাওয়ার রাগ?’ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল শিবাঙ্গী। ‘এ বাবা! বেশি জোরে পড়ে গেছে?’ আবারও খানকতক ‘সরি’। হাসতে হাসতে স্বয়ম্ভু আবারও সিগারেটে একটা সুখটান দিল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎই একটি বিশেষ দিকে আটকে গেল চোখটা। সেই মাস্ক পরা ছেলেটির কচুরি খেতে গিয়ে বেশ গরম লেগেছে মুখে। হু হা করছে। কিন্তু চিবিয়ে যাচ্ছে। এক গাল ঠাস দাড়ি, গোঁফ। চোখে কালো চশমা। শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুকে খেয়াল করে বলে, ‘চেনেন না কি স্যার?”
-উঁ? নাহ!
অন্যমনস্ক লাগল স্বয়স্তুকে। ‘চলো, একটু অফিস যেতে হবে।’ শিবাঙ্গীকে নিয়ে গাড়িতে চেপে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। যেতে যেতে কী যেন মনে হওয়াতে স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা শিবাঙ্গী।’
-হ্যাঁ স্যার?
-তুমি কখনও ছদ্মবেশে রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটাচলা করেছ?
-ছদ্মবেশে! উমমম না, সেরকম প্রয়োজন তো কিছু হয়নি। কেন?
-মানুষ কখন ছদ্মবেশে রাস্তায় বেরোয়?
-মানে ছদ্মবেশটা কীরকম তার ওপর ডিপেন্ড করছে। কেউ ধরুন নাটকের শো করে বেরিয়েছে। মেক আপ তোলার সময় পায়নি। বা কেউ যদি নাচের মেক আপ করে রাস্তায় বেরোয়।
-না না, সেটা তো আর ছদ্মবেশ নয়। সেখানে মানুষটাকে স্পষ্ট দেখা যাবে। কিন্তু এমন সাজ যেখানে তোমায় চেনা যাবে না।
-তাহলে তো হয় নাটক বা অ্যাক্টিং রিলেটেড কিছু বা কোনও দুষ্কৃতি অন্য বেশ ধরে রাস্তায় বেরোয়। সাধারণ মানুষ খামোকা ছদ্মবেশ কেন নেবে?
-হুম ।
-কিন্তু কেন? হঠাৎ এই প্রশ্ন?
-ওই যে ছেলেটি কচুরি খাচ্ছিল, ওর দাড়িটা নকল ছিল।
-অ্যাঁ? তাই?
-সম্ভবত গোঁফটাও। গরম কচুরি খেয়ে হু হা করতে করতে পাশ থেকে একটু খুলে এসেছিল ।
শিবাঙ্গী ভাবল। ‘এত সকালে নাটকের শো!
-জীবনটাই তো একটা নাটক শিবাঙ্গী!
গাড়িটা লালবাজারের দিকে ছুটল।
সুস্মিতার বুটিক রবিবার বাদে সারাদিনই খোলা থাকে। দুপুরের দিকটা বেশিরভাগ সময়েই ফাঁকা থাকে। বুটিকের দুজন মহিলা কর্মচারী নিজেদের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরেই নানান বিষয় নিয়ে কলকল করছিল। কথায় কথায় সেটা কীভাবে যেন অরুণার খুনের বিষয়ে চলে আসে। মোবাইলেই হরবখত নিউজ ফিড আসছে। ওদের সব কথাই কানে যাচ্ছে সুস্মিতার। যত শুনছে বুকের ভেতর তত জাঁকিয়ে বসছে ভয়। কেন? উত্তর নেই সুস্মিতার কাছে। এই সময়ে এক লট নতুন শাড়ি ঢুকল দোকানে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সুস্মিতা । যাক, এখন আর এই বিচ্ছিরি বিষয়টা নিয়ে কেউ কথা বলবে না। সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল শাড়ির হিসেব মেলাতে। কিন্তু ঝামেলা কী আর পিছু ছাড়ে? বুটিকের মধ্যে যখন নিচু গলায় হিসেবের কড়ি গোনা চলছে, নতুন কাপড়ের বান্ডিলের ঝপ ঝপ শব্দ হচ্ছে, প্যাকেটের কচমচ আওয়াজ উঠছে ঠিক তখনই কাচের দরজা ঠেলে ঢুকে এলেন মহিলা। সুস্মিতার চোখ পড়তেই মহিলাটি হাসলেন। সুস্মিতা হালকা করে ভুরু কুঁচকে বড় একটা শ্বাস ছাড়ল।
-আমায় দেখেই ভুরুতে ভাঁজ পড়ে গেল তো?
হাসি আর মিছরির ছুরি একসঙ্গে কীভাবে ছড়াতে ও চালাতে হয় সেটা তৰ্পণা জানেন।
-আরে তর্পণা ম্যাডাম। আসুন আসুন। খুব ভালো সময়ে এসেছেন ।
দোকানের একটি মেয়ে বলে উঠল। পাল্টা আদরমাখা প্রশ্ন ছুড়ে দিল তৰ্পণা, ‘কেমন আছ মীনাক্ষী?’ মেয়েটি হাসিমুখে ঘাড় নাড়ল। গা জ্বলে উঠল সুস্মিতার। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। কাস্টমারের প্রতি মালিকের দরদের চেয়ে কর্মচারীর পিরিত বেশি।
-শাড়িগুলো গুণতে ভুল হয়ে যাবে মীনাক্ষী। কাজে মন দাও।
-হ্যাঁ ম্যাডাম ।
সুস্মিতার উম্মাকে পাত্তাও দিলেন না তর্পণা। বরং ইচ্ছে করেই প্রশ্ন করলেন মীনাক্ষীকে, ‘কীসের ভালো সময় বলছিলে মীনাক্ষী?’ মীনাক্ষী এবার একটু ইতস্তত করে বলল, ‘এই সবে নতুন লটের এতগুলো শাড়ি এল। আপনাকে কিন্তু দারুণ মানাবে ম্যাডাম। ‘
-উনি মনে হয় না শাড়ি নেবেন মীনাক্ষী। আগের দুবারে কিছু নিয়েছেন বলে তো মনে পড়ছে না।
মীনাক্ষী আর তর্পণার কথার মাঝে ইচ্ছে করেই নিজের কথাগুলোকে গুঁজে দিল সুস্মিতা।
-দেখেছ মীনাক্ষী, সুস্মিতা আমার ওপর কেমন রাগ করেছে। আচ্ছা বেশ, একটা কাজ কর তো তোমাদের যেটা ইচ্ছে, যেটা তোমাদের মনে হবে আমায় ভালো মানাবে সেরকম একটা শাড়ি আমার জন্য প্যাক করে রাখো।
-আচ্ছা ম্যাডাম।
সুস্মিতা আড়চোখে মীনাক্ষীর দিকে তাকাল। মীনাক্ষী আর কোনও কথা না বাড়িয়ে সরাসরি সুস্মিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমরা কি এবার ভেতরের ঘরে যেতে পারি সুস্মিতা?” সুস্মিতার সামনে খোলা হিসেবের খাতাটা মীনাক্ষীর হাতে ধরিয়ে চুপচাপ ভিতরের ঘরে ঢুকে গেল। মেয়েগুলোর দিকে ‘আসছি’ বলে তৰ্পণাও ভিতরে ঢুকে গেলেন ।
বুটিকের বড় ঘরটার পিছনে একদম ছোট্ট একটা ঘর আছে। দেয়ালে সার দিয়ে সাজানো হরেক রঙের শাড়ি ছোট্ট ঘরটাকে আলো করে রেখেছে।
-আমার কাছে কেন আসো তৰ্পণা?
-কোথায় যাব বলো? প্রিয়াংশুর অফিসে?
কিচ্ছুক্ষণ তর্পণার মুখের দিকে চুপ করে চেয়ে হেসে ফেলল সুস্মিতা। বলল, ‘ফুলের দোকানটা আসলে তোমার আই ওয়াশ। আসল ব্যবসা ব্ল্যাকমেল ।’
-চিৎ হয়ে শুয়ে ওপর দিকে থুতু ছুড়লে সেটা নিজের গায়েই পড়ে, জানো তো?
মুখটা শুকিয়ে গেল সুস্মিতার। তর্পণা আরও বললেন, ‘লাগামহীন জীবনের অন্ধকারগুলো সকলের সামনে এসে পড়লে কী খুব ভালো হবে সুস্মিতা? সদ্য সদ্য আবার অরুণা খুন হয়েছে।’ মুখের সামনে হাত ঝাঁকিয়ে সুস্মিতা বলে উঠল, ‘চুপ কর তর্পণা। অরুণার কথা তোমার মুখে মানায় না। আমরা কী আর জানি না অরুণাকে কে মেরেছে? তোমার ভাগ্য ভালো আমি মুখ খুলছি না।’ তর্পণার মুখ পাংশু বর্ণ। ‘কে মেরেছে? বলো । মুখ খোলো না সুস্মিতা। আমি কি বারণ করেছি?’ কোনও আঘাতই তর্পণার গায়ে লাগছে না। বরং সেটা ঘুরে সুস্মিতার দিকেই ফিরে আসছে। ‘আমি জানি সুস্মিতা, তোমার বুক ফাটলেও মুখ ফুটবে না। কারণ তুমি খুব ভালো করেই জানো সেটা হলে আরও অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। লোকে জেনে যাবে অরুণা কেন ফোনে বেড়ালের ডাক শুনেছে।’ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট বাঘিনীর মত চোখ তুলে তাকায় সুস্মিতা। তর্পণা চেয়ার ছেড়ে উঠে কাচের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। একটু থেমে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, ‘আজ আমার কাছে স্বয়ম্ভু সেন এসেছিলেন। গোয়েন্দা লালবাজার। অনেক প্রশ্ন করলেন। অনেক। সবকিছুর উত্তর দিয়েছি আমি। আবার আসবেন বলেছেন।’
হাসলেন তর্পণা। নাকি একটা ধারালো ছুরি সজোরে সুস্মিতার দিকে নিক্ষেপ করে পলকে বেরিয়ে গেলেন! বুকের ভেতর থেকে এক দলা কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। কাঁপা হাতে নিজের মোবাইলটা টেবিল থেকে তুলে নিল। নম্বর ডায়াল করল। উল্টোদিক থেকে ফোনটা রিসিভ হতেই চোখে মুখে অসম্ভব ক্রুরতা ঠিকরে বেরিয়ে এল সুস্মিতার।
-স্যার, অরুণার কল লিস্টে শেষ সাতদিনে আননোন নম্বর থেকে একটা করে কল এসেছে রাত এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে এবং এই সাতটি নম্বরই আলাদা আলাদা ।
-নম্বরগুলো চেক করেছ?
-হ্যাঁ স্যার। ডাজ নট এগজিস্ট।
লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে মুখোমুখি বসে স্বয়ম্ভুকে নম্বরের হালহদিশ দিচ্ছে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বেশ অবাক হল নম্বরগুলো অস্তিত্বহীন শুনে । শিবাঙ্গী জানাল, এই বিশেষ নম্বরগুলো থেকে মাত্র একবার করেই কল হয়েছে। তারপরে সেটা ডেস্ট্রয় করে দেওয়া হয়েছে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘সেটা তো কোনও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নম্বর থেকে হলে সেরকম হয়। এখনকার ওই- অনলাইন ডেলিভারি করে এরকম তো কত কোম্পানি আছে, তারা এমন নম্বর পায় ।’
-একদমই স্যার। তবে স্যার নম্বরের যা প্যাটার্ন দেখছি তাতে বোঝা যাচ্ছে এটা কোনও অ্যাপের মাধ্যমে করা হয়েছে। এবং ফোন করার পরেই হয়তো সেই অ্যাপ এবং অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিচ্ছে। তাই সেটা ডাজ নট এগজিস্ট বলছে।
-দেখি ।
হাত বাড়িয়ে কল লিস্টটা নিল স্বয়ম্ভু। ভালো করে দেখে বলল, ‘হুম। সাইবার ক্রাইমে দাও।’
-দিয়েছি স্যার। ওরা ওপর ওপর চেক করে বলল এটা কোনও একটা অ্যাপ নয়। অনেকরকমের অ্যাপ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ প্রত্যেকটার স্টার্টিং নম্বর আলাদা। কারও প্লাস ডবল সেভেন, আবার কারও প্লাস ডবল নাইন। তবে রিপিট আছে। অপরাধী আজকে যে অ্যাপ ব্যবহার করছে সেটা আবার চারদিন পরে গিয়ে ইউজ করছে।
-আইপিগুলো নিশ্চয়ই এক হবে।
-সেটা পরীক্ষাসাপেক্ষ।
-জায়গাগুলো ট্র্যাক করা যাবে নিশ্চয়ই? মানে কোথা থেকে ফোন এসেছে?
শিবাঙ্গী একটু ভেবে বলল, ‘সিম ইউজ করলে তো পাওয়া যেতই। কিন্তু এক্ষেত্রে ঠিক কতটা কী পাওয়া যাবে সেটা আইপি ট্র্যাক করলে বোঝা যাবে।
-শালা এই টেকনোলজি যত বাড়ছে আমাদের বাঁশও তত বাড়ছে। -স্যার, একবার তমালকে ফোন করে দেখবেন। অরুণা এরকম কোনও রহস্যময় ফোনের ব্যাপারে কিছু বলেছে কিনা ।
-কারেক্ট।
সঙ্গে সঙ্গে তমালকে ফোন করে স্বয়ম্ভু। ‘কী করছ?’ উল্টোদিক থেকে টিভির আওয়াজের সঙ্গে জবাব আসে, ‘নিউজ দেখছি। সবাই তো আমাকেই অপরাধী বানিয়ে ফেলেছে।’
-স্ত্রী মারা গেলে স্বামীকে আর স্বামী মারা গেলে স্ত্রীয়ের প্রেমিককেই প্রথম সন্দেহটা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর প্রেমিকাকেও সন্দেহ করা হয়। এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। তুমি আমায় একটা কথা বলো তো তমাল ।
-বলো।
-অরুণা কখনও তোমায় কোনও ফোন কলের কথা বলেছে? মানে আননোন নম্বর থেকে কোনও কল এসেছে বা কিছু?
-ওর সাথে শেষ পনেরো কুড়িদিন ধরে ঝগড়া ছাড়া কোনও নরমাল কথা হয়নি আমার ।
-বাহ! কী সুন্দর!
-কারও যদি আমায় দেখলেই মনে হয় আমি অফিস না করে ফষ্টিনষ্টি করে আসছি তাহলে নরমাল কথা হওয়ার জায়গা কি থাকে ভোলাদা?
ব্যস, দিল নরম জায়গায় খুঁচিয়ে। নিমেষের মধ্যে স্বয়ম্ভুর মুখ থেকে বুদ্ধিমত্তার সকল ছাপ সরে গেল। কে যেন করলা সেদ্ধ করে সারা মুখে মাখিয়ে দিল। স্বয়ম্ভুই কথাটা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা ঠিকাছে। তুমি এক কাজ কর অরুণার যত বন্ধুবান্ধবের নম্বর আছে তাদের নাম সমেত সেন্ড কর তো। সেটা আছে তো নাকি সেটাও…!’
-না। সেরকম কারও নম্বর আমার কাছে নেই। তবে যতদূর জানি, ওদের চারজন বন্ধুর একটা গ্রুপ ছিল।
-তাদের নাম কী? কারও ফোন নম্বর নেই তোমার কাছে?
-একজনের আছে। সুস্মিতা। গড়িয়াহাটে বুটিক আছে। আমি নম্বরটা পাঠাচ্ছি।
-আর বাকিরা?
-বাকিদের মধ্যে একজনের নাম দিয়া। দেশপ্রিয় পার্কে ক্যাফে আছে। আরেকজন স্বস্তিকা না মৃত্তিকা কী যেন নাম। ওর কোনও খোঁজ আমি জানি না।
-এদের মধ্যে কী গভীর বন্ধুত্ব ছিল?
-একসঙ্গে কলেজে পড়ত। ঘুরতে যেত। পার্টি করত। অরুণার বিয়ের পর কী একটা কারণে ওদের মধ্যে সম্পর্কটা একটু লুজ হয়ে যায় ৷
-কী কারণ?
-উম…আম… আমি ঠিক জানি না।
-বাবা! একটা না বলতে এত হোঁচট খেলে?
-আসলে ওদের ব্যাপারে আমি কোনওদিনই ঢুকিনি ।
-বেশ। তুমি অস্মিতার নম্বরটা পাঠাও।
-সুস্মিতা ।
-ওই হ্যাঁ, সুস্মিতা।
-ওকে।
ফোনটা রাখতে রাখতেই শিবাঙ্গীকে প্রশ্ন করে, ‘পাড়িয়া কি সিসিটিভি ফুটেজগুলো পাঠাল?’
-না। আমি একবার কল করছি।
-এখনও করনি? শিগগিরি কর।
নানারকম রাজনৈতিক খবরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে অরুণার খুনের খবর। শুধু একটা ব্যাপার জিইয়ে রেখেছে মিডিয়াগুলো। মাত্র একটা খুন হল আর সেটা নিয়েই গোয়েন্দা দপ্তর মাঠে নেমে পড়ল? যতই সেটা নৃশংস হোক না কেন, এমন তো রোজ কত হচ্ছে। যদিও এই খুনের ধরণ আর পাঁচটা খুনের থেকে অনেকটাই আলাদা। তাই কী গোয়েন্দাদের এত মাথা ব্যথা?
-ত্রিদিব, বিলটা কর।
পাশ থেকে আরেক কর্মচারী প্রায় খিঁচিয়ে উঠল। সম্বিত ফিরে সামনে তাকাতেই তিরু দেখল চারটে প্যাকেট হাতে কাস্টমার দাঁড়িয়ে। ত্রিদিব ওরফে তিরু হাত চালাল কাজে। অন্য কাস্টমারদের শাড়ি দেখাতে দেখাতে আরেক কর্মচারী টিপ্পনী কাটল, ‘ত্রিদিবের পাশের পাড়ায় খুন হয়েছে না। ওর ওপরেই লালবাজার দায়িত্ব দিয়েছে তো খুনিকে ধরার।’ ত্রিদিব বিলে মালপত্রের হিসেব লিখছিল। চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল। ত্রিদিব কাস্টমারের উদ্দেশে বলল, ‘চার হাজার ছশো সাতষট্টি টাকা।’ কাস্টমার বলল, ‘আবার সাতষট্টি কেন দাদা? ওটা বাদ দিন।’
-না দাদা, ফিক্সড প্রাইজ। কিছু করার নেই।
-কার্ডে হবে?
ত্রিদিবের কানে গেল না কথাটা। ওর চোখদুটো আবারও কোনও একটা দিকে আটকে গেছে। এদিকে সামনে দাঁড়ানো কাস্টমার তার প্রশ্নটা আবার রিপিট করতেই কার্ড মেশিনটা বাড়িয়ে দিল। টাকা মিটিয়ে চলে যেতেই আরেকজন মুখের সামনে এসে হাজির।
-কতবার করে বললাম গড়িয়াহাট চলো। তা নয়, সেই কলেজস্ট্রিট।
কথাগুলো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর উদ্দেশে বলে দোকানদারকে একটা বেগুনি রঙের জামদানি দেখিয়ে বলল, ‘ওইটা বেগুনিটা একটু দেখান না।’
গালের চাপ দাড়ির মধ্যে আঙুল চালিয়ে ঘষঘষ করে গালটা চুলকে নিয়ে দীপায়ন বলল, ‘মৃত্তিকা তুমি পারও। সেই থেকে একই কথা।’
আবারও গলা চেপে স্বামীকে উত্তর দিল মৃত্তিকা, ‘বলব না তো কী? একটা মাত্র মেয়ের অন্নপ্রাশন। এরপর তো আর এমন হবে না।’
দোকানের লোকটা বেগুনি রঙের শাড়িটা মুখের সামনে মেলে ধরল। ভ্যাপসা গরম। তার ওপরে এই শ্রাবণ মাসেও শাড়ির দোকানে লোকের অভাব নেই। রুমাল দিয়ে গলা আর কপালের ঘাম মুছে দীপায়ন বলল, ‘শুধুমাত্র কার্ড অর্ডার দিতে এইখানে আসার কোনও মানে আছে? তার চেয়ে শাড়ি-ফাড়িও কিনে নাও।’ বলেই চোখের রিমলেস চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে কাচটা মুছতে থাকল।
-এত তাড়াতাড়ি কার্ডটা অর্ডার দেবার তো কোনও দরকার ছিল না দীপায়ন।
-কী বলছ? আর দু’ সপ্তাহও নেই।
-বাড়ির কাছেই তো। যেকোনও দিন এসে অর্ডার দেওয়া যেত। তোমার বেশি তাড়া। উঠল বাই তো কলেজস্ট্রিট যাই। সত্যি করে বল না, তোমার বই কেনার ছিল তাই একেবারে কাজ সারছে।
বরবাবাজিকে ছোট্ট মত কামড় দিয়ে ঠোঁট কুঁচকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীটিকে বলল মৃত্তিকা, ‘না দাদা, খোলটা ভাল্লাগছে না। সুতোগুলো উঠে যাবে।’
-কী বলছেন বউদি? এমন সুক্ষ্ম কাজ। আপনি নিশ্চিন্তে নিয়ে যান।
-মটকা সিল্ক নেই আপনাদের?
লোকটা একটু গম্ভীর হয়ে উল্টোদিকের টেবিলটা দেখিয়ে দিল। গলা তুলে বলল, ‘এই ভজু, এনাদের মটকা দেখাত ।’
কাউন্টার একটু ফাঁকা হতেই মোবাইলে নিউজ পোর্টালগুলো ঘাঁটতে থাকে তিরু। পাশের লোকটি আড়চোখে দেখে আবার বলে ওঠে, ‘তোর কী হয়েছে বল তো ত্রিদিব? খালি খবর দেখছিস কেন? খুনটা কী তুই করেছিস নাকি?’ ত্রিদিব বিদ্যুৎ গতিতে চারপাশে চোখ চালিয়ে চাপাস্বরে বলে ওঠে, ‘আহ! সিধুদা। এসব কথা এইভাবে বোলো না। কে কোথা থেকে শুনে পক করে কাকে লাগিয়ে দেবে। এমনিতেই টেনশনে আছি আমি।’
-কেন? তোর পাশের পাড়ায় খুন হয়েছে বলে তোর টেনশনের কী আছে? খুনিকে দেখেছিস তুই?
-উফফফ! তা কেন? তবে যে খুন হয়েছে তাকে চিনি।
-সে তো হতেই পারে।
-চিন্তা আমার মামাকে নিয়ে। সারাদিন একলা থাকে। মামা যে মন্দিরে পুজো করে সেই মন্দিরে ওই অরুণা আসত ।
-কে অরুণা?
-যে খুন হয়েছে।
-অ।
-মামার সঙ্গে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল।
-তাতে কী? তোর মামা কি কিছু জানেন এ ব্যাপারে?
-না গো। তবে শুনছি নাকি অরুণার চেনাজানা সবাইকে পুলিশ জেরা করবে।
-সেটা তো স্বাভাবিক ।
-সেই জন্যেই তো ভয়। মামার যে খুব বেশি বয়স তা নয়। তবে এর মধ্যেই প্রেশার, সুগার সব ধরেছে। রাতে এমনিই ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম হয় না। তার ওপর দুদিন ধরে দিনরাত কানের কাছে গজগজ করছে, ও তিরু পুলিশ এলে কী হবে রে? আমি কী বলব? এত মন্দির থাকতে আমার মন্দিরেই আসতে হল মেয়েটাকে। খাচ্ছে না পর্যন্ত জানো।
লোকটি মুখটা নিচু করে বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়ল। ঠিক সেই সময়েই কাউন্টারে এল মৃত্তিকা আর দীপায়ন। তিরু হাত বাড়িয়ে পাঁচটা প্যাকেট নিল। বিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এদিকে দীপায়ন মৃত্তিকার কানে কানে বলল, ‘ওই তরকারি না ফুলকপি কী একটা শাড়ি নিলে সেটা সত্যিই পড়বে তুমি?’ ভুরু কুঁচকে মৃত্তিকা বলল, ‘ওটা ফুলকারি।’
-যথেষ্ট ভারী। তোমার মত ।
-শাট আপ।
-তুমি সত্যি পরবে?
-তা নয় তো কী অন্নপ্রাশনে মেয়েকে পরাব?
চোখ উলটে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল দীপায়ন। ‘কেন বলো তো?” মৃত্তিকা সন্দেহের চোখে প্রশ্ন করল।
-ওয়েটটা মেপেছ?
-উনসত্তর থেকে ছেষট্টিতে নামিয়েছি। মেয়ের অন্নপ্রাশনে আরও দুকেজি লস করব। এমনি এমনি ডায়েটেশিয়ানের কাছে যাচ্ছি নাকি?
-হলেই ভালো।
-আমাকে না দেখে নিজের ভুঁড়িটা দেখো।
দীপায়ন আর কোনও উত্তরই দিল না। ভুঁড়ি হয়েছে তো কী? দীপায়নকে বরাবরই দেখতে ভালো। কলেজে মহিলা প্রফেসররা সুযোগ পেলেই কথা বলতে আসে বলে অন্যান্য পুরুষ প্রফেসররা মাঝেমধ্যেই ঠারেঠোরে কথা শোনায়। মাথায় ঠাস চুল। তায় আবার ঢেউ খেলেছে। মুখটা কিঞ্চিৎ লম্বা ধাঁচের। ঠোঁটদুটো সরু। দেখলে মনে হয় ঠোঁট টিপে আদর করতে আসছে। বাঁ চোখের নীচের দিকে ছোট মত একটা আঁচিল। সরাসরি বিল কাউন্টারের ছেলেটিকে দীপায়ন বলল সে কার্ডে পে করবে। তিরু ঘাড় নাড়ল৷ কিন্তু কিছুতেই কার্ড কাজ করল না। ‘আপনি ইউপিআইতেও পে করতে পারেন স্যার।’ সেটাও নেটওয়ার্ক ফেল। বেশ ফাঁপরে পড়ল মৃত্তিকা আর দীপায়ন। একটু চড়া সুরেই দীপায়ন বলল, ‘আপনাদের কোনও কিছুই কাজ করে না?’ তিরু বলল, ‘স্যার এইমাত্র চারজন কার্ডে আর ইউপিআইতে পে করে গেলেন। কোনওভাবে হয়তো আপনারটা হচ্ছে না। ম্যাডামের ইউপিআই আছে কী?’ মৃত্তিকা দীপায়নকে বলল, ‘আমি পে করে দিচ্ছি। তুমি আমায় দিয়ে দেবে কিন্তু।’
-উফফফ মৃত্তিকা!
চোখ পাকিয়ে হাসল দীপায়ন। মৃত্তিকাও আহ্লাদি মুখে চাইল। এবার পেমেন্ট হল। ফোন নম্বরটা তিরু রিপিট করতেই মৃত্তিকা কনফার্ম করল। বিল কেটে প্যাকেটের মধ্যে দিয়ে হাসিমুখে তিরু বলল, ‘আবার আসবেন ম্যাডাম।’ প্রত্যুত্তরে মৃত্তিকাও হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ দীপায়ন ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা এখানে ভালো কার্ডের দোকান কোনটা বলতে পারেন? মানে এখানে আছে তো অনেকই। তবু বেটার কোনটা হবে…’।
-বিয়ের কার্ড ছাপাবেন?
তিরুর পাশে বসে থাকা লোকটি জিজ্ঞেস করল। দীপায়ন বলল, ‘না, অন্নপ্রাশনের।’
-এই দোকান থেকে বেরিয়ে ডানদিকে যান। চারটে দোকান পরেই দেখবেন একটা গলি। সারে সারে কার্ডের দোকান আছে। প্রথম থেকে দুটো ছেড়ে তিন নম্বর দোকানে যাবেন। ওরা খুব ভালো কোয়ালিটি দেয়, দামও রিজনেবল।
-থ্যাংক ইউ।
দীপায়ন দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ত্রিদিব পাশের লোকটিকে ডেকে বলল বিল কাউন্টারটা একটু সামলাতে। কেড়ে আঙুল তুলে দেখাল ৷ লোকটিও বলল, ‘একে তো এলি দেরি করে। তার ওপর ঘনঘন বাথরুম। যা, তাড়াতাড়ি আসবি।’ ত্রিদিবও তড়াক করে লাফ মেরে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। বাথরুমটা পাশের গলিতেই ।
