ম্যাও – ৩০

৩০

দিব্যি সিনেমাটা জমে উঠেছিল। মুখপোড়া কারেন্টটা দিল সব বিগড়ে। এই সময়েই যেতে হল। সুচিত্রা যেখানে বসে টিভি দেখছিলেন সেখান থেকে মোমবাতিটা অনেকটাই দূরে। মোবাইলটাও হাতের কাছে রাখেন না। এই নিয়ে ছেলে কম মুখ করেছে তাকে। অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন সুচিত্রা। কিন্তু রান্নাঘরে ঢুকতেই খটকা লাগল। জানলা দিয়ে দিব্যি তো রাস্তার আলো ঘরে ঢুকছে। এই রে! নির্ঘাত এই ফেজটা গেছে। নিজের মনেই মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে রান্নাঘরে তাকের ওপরে হাত বুলিয়ে মোমবাতি খুঁজতে লাগলেন। ঠিক সেই সময় কী একটা যেন শব্দ হল। দরজা খোলার শব্দ কী? ‘কে রে ভোলা এলি?’ গলা ‘তুললেন সুচিত্রা। উত্তর এল না। কোনওরকমে মোমবাতি খুঁজে পেলেন। কিন্তু দেশলাই! সেটা যে কোথায় রেখেছেন! অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একটু মনে করতে চেষ্টা করলেন। শেষ উনি কী কাজের জন্য দেশলাই ব্যবহার করেছেন! মনে পড়েছে, ধূপ জ্বালিয়েছিলেন। তার মানে টিভির টেবিলেই আছে। রান্নাঘর থকে বেরিয়ে এলেন সুচিত্রা। বসার ঘরে টিভি। তাই সেদিকেই এগোলেন । সামনে আসতেই আধো আঁধারে একটা অবয়ব যেন বসে আছে বসার ঘরের চেয়ারে। প্রথমে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলেও সামলে নিলেন। এর আগে তার ভোলা এরকম কম শয়তানি করেনি। মা যখন প্রায় ভিরমি খায়-খায় অবস্থা ঠিক তখনই দাঁতকপাটি বের করে আবির্ভূত হতেন। আবার শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে বলত, ‘দেখছিলাম ভাবী গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেনের মা কেমন সাহসী!’

-ভোলা তুই আর বড় হবি না, না? মায়ের সাথে এখনও শয়তানি করবি? কিন্তু তুই যে বললি রাত হবে ফিরতে। ঢুকলিই বা কোথা থেকে? ভোলা…

ভোলার মুখে কুলুপ। ছায়াটাও নড়ছে না। একটা বিচ্ছিরি পচা গন্ধ এসে নাকে লাগে সুচিত্রার। নাক কুঁচকে অন্ধকারে দেশলাই খুঁজতে খুঁজতেই বলে ওঠেন, ‘ইসস ভোলা, তোর মোজা দিয়ে কী বিচ্ছিরি গন্ধ বেরচ্ছে রে। আগে কাচতে দে। উমহ! কতবার বলেছি একদিন অন্তর মোজা কাচবি। কীরকম চুপ করে বসে পচা গন্ধ শোঁকাচ্ছে দেখো। দাঁড়া বাতিটা জ্বালি তারপর দেখাচ্ছি।’ ছেলে একদিন বাড়ি না থাকেলেই অনেক কথা জমে থাকে সুচিত্রার। তাই বাড়ি ফিরলে একভাবে বলে চলেন। সে ছেলের কানে ঢুকুক আর না ঢুকুক। ‘এই তো পেয়েছি।’ বাক্স থেকে দেশলাই জ্বেলে ঘুরতেই আঁতকে উঠলেন সুচিত্রা। তারপরেই গলা চিরে খানিকটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলেও বাকিটা গোঙানি হয়ে মিলিয়ে গেল। কালো অবয়বটা সজোরে আঘাত করল সুচিত্রার মাথায়। ধাতব শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে সব অন্ধকার।

রাত একটা বেজে গেছে। ড্রাইভার কৃষ্ণ স্বয়ম্ভুকে বাড়ির সামনে নামিয়ে বেরিয়ে গেল গাড়ি নিয়ে। লোহার ছোট গেটটা খুলে দরজার কাছে এসে কলিং বেল বাজাল স্বয়ম্ভু। একবার, দুবার, তিনবার। স্বয়ম্ভুর সন্দেহ হল। ছেলে ফেরেনি অথচ মা ঘুমিয়ে পড়েছে। এ অসম্ভব। কিন্তু আজ কী হল? শরীর খারাপ করল না তো? পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মায়ের ফোনে ফোন করল। ঘর থেকে ফোন বাজার শব্দ নিস্তব্ধ রাত্রিতে সহজেই বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে। ‘মা নীচে! অথচ ফোন তুলছে না। দরজাও খুলছে না!’ আপন মনে বিড়বিড় করে বারকয়েক ডাকল। কোথাও থেকে কোনও উত্তর নেই। বাধ্য হয়ে দরজার লকে চাপ দিতে সহজেই খুলে গেল। তার মানে ভেতর থেকে দরজাটা খোলাই ছিল। বাড়িতে ঢুকতেই প্রথমে যেটা খটকা লাগে সেটা হল গোটা বাড়িটাই এত অন্ধকার কেন? কারেন্ট তো আছে। দরজা দিয়ে ঢুকতেই সিঁড়ির তলা। সেখানেই মেন সুইচ। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে সেখানে আলো ফেলতেই দেখল মেন সুইচ অফ। স্বয়ম্ভুর চট করে কখনও ভয় করে না। কিন্তু এখন করল। ঝপ করে ভয়দানবটা যেন ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সঙ্গে একটা পচা গন্ধ। এই গন্ধটাই আরও যেন বেশি করে কোনও সর্বনাশের বার্তা বয়ে আনছে। মেন সুইচটা তুলে দিতেই সারা বাড়িতে আলো জ্বলে উঠল। বসার ঘর থেকে ভেসে এল টিভির সাউন্ড। ‘মা মা’ বলে চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে বসার ঘরে ঢুকতেই থমকে গেল । টিভির সামনের মাটি থেকে একটা রক্তের মোটা দাগ বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেছে। চমকে ওঠে স্বয়ম্ভু। রক্তের দাগ লক্ষ্য করে এগোতে থাকে সে। রক্তটা বসার ঘর পেরিয়ে ডাইনিং হয়ে নীচের শোবার ঘরে ঢুকে গেছে।

-মাআআআআআআ…।

প্রচণ্ড চিৎকার করে ঘরে ঢোকে স্বয়ম্ভু। কাছে যেতেই আরও ভয়ানক কিছু দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে ওঠে। বমি উঠে আসে। সুচিত্রার গলায় কারও পায়ের আটটা আঙুল মালার মতো গেঁথে পরিয়ে দেওয়া। আঙুলগুলো পচে গেছে। পোকা ঘুরছে সুচিত্রার মুখের পাশে। সুচিত্রার হাত-পা বাঁধা। মুখে কাপড়ের বাঁধন। মাথা দিয়ে রক্তের ধারা মাটি লাল করে দিয়েছে। স্বয়ম্ভু ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের মুখের বাঁধন সবার আগে খোলে। তারপর মালাটা গলা থেকে খুলে ফেলে দেয়। অনেকবার ডাকে ভোলা। কিন্তু সুচিত্রা সাড়া দেয় না। এক মুহূর্ত দেরি না করে কৃষ্ণকে ফোন করে। ‘কৃষ্ণ এখুনি গাড়ি ঘুরিয়ে আনো। হসপিটাল যেতে হবে। মায়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।’ ফোনটা রেখেই মায়ের হাত-পায়ের বাঁধন খোলে। নাড়ি টিপে দেখবে বলে সুচিত্রার ডানহাতটা তুলে ধরতে যায়। একটা চিরকুট। ভাঁজ খুলে দেখে সেখানে নীল কালিতে লেখা fuck you.

-বাস্টার্ড।

স্বয়ম্ভুর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কথাটা।

হাসপাতালের সব ঝামেলা মিটিয়ে একটু বেলা করেই লালবাজারে ঢুকছে স্বয়ম্ভু। ঢোকার মুখেই ছুটে এল তপন। দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। ‘এ কী তপন! তুমি সুস্থ হয়ে গেছ?”

-হ্যাঁ স্যার। আজ থেকে জয়েন করছি।

-বাহ!

-বলছি স্যার, মাসিমার খবরটা শুনলাম। আমি তো ভাবতেই পারছি না। -আমিও না।

-স্যার, আমাকে যদি কোনও কাজে লাগে প্লিজ বলবেন। আসলে স্যার, মাসিমা আমায় খুব ভালোবাসেন। আপনাকে আনতে গেলে আলাদা করে আমার জন্য খাবার দিয়ে যায় গাড়িতে। সবাই তো আমায় ড্রাইভারই ভাবে। কেবল মাসিমা ছাড়া। তাই বলছি স্যার, যদি কোনও কাজে লাগে…

-যদি নয় তপন। তোমাকেই লাগবে। আর আজ থেকে তুমি আমার ডিউটি করবে।

এক গাল হেসে সহজ মানুষটা কৃতজ্ঞতা জানাল। চলে যেতে গিয়েও ঘাড় ঘুরিয়ে তপনকে ডাকল, ‘একটা হেল্প করবে?’

-হ্যাঁ স্যার বলুন না ৷

-সঙ্গে কাগজ পেন আছে?

-হ্যাঁ স্যার।

বলেই জামার পকেট থেকে একটা ছোট নোটবুক আর একটা পেন বের করল। ড্রাইভারদের কাছে এগুলো থাকেই। ফোন নম্বর লিখে রাখে। কখন মোবাইল যন্ত্রটি খারাপ হয়ে যায় বা চার্জ চলে যায় তখন ফোন নম্বর পেতে সাহায্য করে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘একটা নম্বর লেখো। ইংলিশে লিখবে। ডব্লিউ বি জিরো এইট এ নাইন থ্রি ফাইভ এইট। লিখেছ?’

-হ্যাঁ স্যার।

-এবার লেখো ফুলবাগান টু ফালাকাটা। এটাও ইংলিশে। এফ ডাবল ও এল বি এ জি এ এন । এইভাবেই বাকিটা লিখে কাগজটা ছিড়ে আমায় দাও । তপন চট করে পুরোটা লিখে কাগজটা ছিড়ে স্বয়ম্ভুকে দিল। স্বয়ম্ভূ একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর তপনকে শুকনো ধন্যবাদ জানিয়ে লেখাটা পকেটে পুরে লালবাড়িটার অন্দরে হাঁটা দিল।

দৃপ্ত পায়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে বেশ কয়েকজনকে হাঁক পাড়ল স্বয়ম্ভু। ‘অভিনব…

-ইয়েস স্যার।

-প্রাঞ্জল, রঞ্জিত, বিকাশ আর সোহম মানে আর্টিস্ট সোহম সবাইকে নিয়ে আমার কেবিনে এস। ফাস্ট। -শিওর

স্যার।

ঘরের দিকে এগোতে গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়তে হল স্বয়স্তুকে। উল্টোদিক থেকে হেঁটে আসছেন জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘মর্নিং স্যার।’

-আমি তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম। এসব কী হচ্ছে? তোমার মাকে মারতে চাইছে খুনি?

-না স্যার। মারতে চাইলে মারতেই পারত। কিন্তু সেটা সে করেনি। আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছে। আর সেইজন্যেই মায়ের জন্য কষ্টের সঙ্গে ভেতর ভেতর একটা আনন্দও হচ্ছে।

শুভঙ্কর হতবাক! প্রশ্ন করার আগেই আনন্দের কারণটা বলল স্বয়ম্ভু নিজেই। ‘আমার মনে ভীষণ সংশয় ছিল কাল সন্ধে পর্যন্ত। কিন্তু রাতে বাড়ি ফেরার পর বুঝতে পারলাম আমি একদম ঠিক রাস্তায় আছি। সেটা আততায়ীই কনফার্ম করে দিল।’

-বেস্ট অফ লাক, এ ছাড়া কিছুই বলার নেই ।

-থ্যাংক ইউ স্যার।

-কিন্তু তোমার মা আছেন কেমন?

-কপালে চারটে স্টিচ পড়েছে। কারণ ওই পেস্টিংয়ে হবে না। ডিপলি ফেটেছে।

-কী দিয়ে মেরেছে?

-পেতলের ফুলদানি। জ্ঞান ফিরেছে। ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। প্রচণ্ড পেইন হচ্ছে।

-স্বাভাবিক। না না আর আটকাব না, তুমি কাজে যাও।

-ওকে স্যার।

নিজের কেবিনে আসতেই শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘একটা কথা তো আপনাকে জিজ্ঞেসই করা হয়নি। আততায়ী ঢুকল কীভাবে?”

-ছাদের দরজা দিয়ে ।

-ভেঙে?

-উঁহু। আমার বীরাঙ্গনা মা ওটা খুলেই রাখেন। রাতে শোবার আগে বন্ধ করেন। আসলে অনেক সময়ে মা ছাদে পায়চারি করে সন্ধেবেলায় ।

-কী অবস্থা। এই সময় জেঠিমার মোটেও দরজা খুলে রাখা ঠিক হয়নি।

-বহুবার বলেছি। বললেই লেকচার। স্বয়ম্ভূ সেনের মায়ের গায়ে হাত দেবে এমন বান্দা জন্মেছে নাকি?

শিবাঙ্গী হেসে ফেলল। বলল, ‘তবে স্যার আপনি আর আমি যা যা এভিডেন্স পেয়েছি বা পাস্ট হিস্ট্রি জেনেছি তার সঙ্গে কোত্থাও, কোত্থাও বেড়াল নেই। অথচ এই বেড়ালের ডাক আর ওই গান, আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দম দমাদম, এসবের তো কোনও লিঙ্কই নেই। এগুলো তাহলে কী? কেন?’

-স্যার আসব?

স্বয়ম্ভু যাঁদের ডেকেছিল তাঁরা সবাই হাজির।

-এসো। ছবি এঁকেছ সোহম?

কাঁধের ঝোলা থেকে দুখানা ছবি বের করতে করতে ঘাড় নাড়ল। ‘এই যে স্যার।’ ছবি দুটো দেখে স্বয়স্তু হাসল। শিবাঙ্গী উশখুশ করছিল দেখার জন্য। কিন্তু স্যার না দিলে তো আর দেখা যায় না। স্বয়ম্ভু ছবি দুটো দুহাতে ধরে আওড়াল, ‘ওহে দয়াময়, নিশ্চিন্ত আশ্রয়, বুঝি ঘুচে যায়!’

-স্যার ওটা নিখিল আশ্রয়। তারপর এ ধরা পানে চাও।

শিবাঙ্গী শুধরে দিল। মুখের সামনে থেকে ছবি সরিয়ে স্বয়ম্ভু উত্তর দিল, ‘এটা স্বরচিত রবীন্দ্রসংগীত। নাও দেখো।’ শিবাঙ্গী হাতে ছবি দুটো নিয়েই চমকে উঠল ৷

-বাওয়া! একেবারে মাধুরী দীক্ষিতের মতো ভুরু নাচালে তো।

শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলল স্বয়ম্ভু । এই লোকটা এইরকম পরিস্থিতিতেও কী করে যে রসিকতা করে কে জানে? শিবাঙ্গী এদিকে হাইপার, ‘স্যার এটা তো… ।’

-ধৈর্যং রহু ধৈর্যং।

শিবাঙ্গীকে চুপ করিয়ে দিয়েই প্রাঞ্জলের দিকে ছুড়ে দিল প্রশ্ন, ‘ভিডিয়োটা উদ্ধার করা গেছে প্রাঞ্জল?’

-দুবার করেছিলাম স্যার। কিন্তু চালানো যাচ্ছে না কিছুতেই। কোরাপ্ট করছে।

ঠোঁটদুটোকে চিপে চিন্তায় মগ্ন হল স্বয়ম্ভু। তাও বলল, ‘যেভাবে হোক ভিডিয়োটা আমার চাই প্রাঞ্জল।’

-আমি আবারও ট্রাই করছি স্যার।

-বিকাশ তোমার জন্য আরেকটা কাজ আছে।

বলে একটা চিরকুট বাড়িয়ে দিল স্বয়ম্ভু। বিকাশ দেখেই বলল, ‘এটা?’

-আততায়ীর প্রেম নিবেদন, আমার প্রতি।

-এটা তো স্যার আগেরগুলোর মত নয়। আমি দেখছি। বাট আমি শিওর এ লোক আলাদা ।

-কারেক্ট।

-কিন্তু কে?

-ধৈর্যং রহু ধৈর্যং।

এবার শিবাঙ্গী হালকা করে ঠেস দিল, ‘স্যারকে কী আজ চণ্ডীদাসে পেয়েছে?”

-এটা গোকুলচন্দ্ৰ। নট চণ্ডীদাস I

বাকিদের দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘অভিনব, আগামীকাল আমাদের মহাসংগ্রাম। মৃত্তিকা ও দীপায়ন চ্যাটার্জির মেয়ের অন্নপ্রাশন। আর সেখানেই আততায়ী খেলবে তার মোক্ষম খেলা।’ কাল সকাল থেকে ওদের বাড়ি এবং ভাড়াবাড়ি মানে যেটা ওরা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া করেছে সেটার ওপর নজর রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, শিবাঙ্গী, বিকেল হলেই আমরা কয়েকজন হাতে উপহার নিয়ে অতিথি হয়ে পৌঁছে যাব দীপায়নবাবুর বাড়ি। যেটা দীপায়ন, মৃত্তিকা কেউ জানবে না। একেবারে সারপ্রাইজ ভিজিট।’

-না স্যার। আমরা সেখানে কেউ যাব না ।

স্বয়ম্ভু সমেত সবাইকে চমকে দিয়ে কথাটা বলে উঠল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভুর মুখের ওপর ‘না’ আজ পর্যন্ত শিবাঙ্গী বলেনি কোনওদিন। কিন্তু আজ হল কী? স্বয়ম্ভু অবাক।

-মানে?

-বউদি, ঠাকুরের থালাবাসন, কোশাকুশি যা আছে সব তেঁতুল দিয়ে ভালো করে মেজে উপুড় করে রেখেছি। কাল সকালে এসে গুছিয়ে তুলে দেব কেমন?

মৃত্তিকা আগামিকালের জন্য শাড়ি-ব্লাউজ সব গুছিয়ে রাখছিল। সকালে জলসইতে যাওয়ার একখানা, দুপুরে মেয়েকে ভাত খাওয়াবার সময় একটা আর সন্ধেবেলা রিসেপশনের জন্য আরেকটা। গুনগুন করে গান গাইছিল কালকের আনন্দের কথা চিন্তা করে। তখনই দীপা এসে বলল কথাগুলো । “থ্যাংক ইউ দীপা। তুমি আজ অনেক বড় উপকার করলে গো।’

-ধুস, কী যে বলো। বাড়িতে এত বড় একটা কাজ।

-শোনো দীপা, কাল কিন্তু পারলে একটু তাড়াতাড়ি এসো। -হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি সাতটার মধ্যে চলে আসব।

মৃত্তিকার মুখে হাসি। ‘যাবেও কিন্তু দেরিতে।’ দীপা হেসে ঘাড় নাড়ল। ‘তুমি অত টেনশন কোরো না তো। সব হয়ে যাবে। আসি এখন।’ -এসো। ও দাদা কোথায় গো?

-ঘরে তো। ডেকরেটার্সের লিস্ট মেলাচ্ছে বোধহয়। ডেকে দেব? -না না থাক।

দীপা চলে গেল। শাড়িগুলো ওয়্যারড্রবের একটা তাকে গুছিয়ে রাখল । সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটা বেজে উঠল। আননোন নম্বর। কাজ করতে করতেই ফোনটা তুলে ‘হ্যালো’ বলল মৃত্তিকা। ওপারে নীরবতা। সারাদিন আজ যা ফোন আসছে তাতে সকলের পাগল হবার জোগাড়। ‘হ্যালো কে বলছেন?’ মৃত্তিকা আবার প্রশ্ন করল ।

-ম্যাওওওও!

ওপার থেকে খুব মিহি গলায় একটা বেড়ালের কান্না। চমকে উঠল মৃত্তিকা। আবার ‘ম্যাও’। এবার কান থেকে ঠকাস করে পড়ে গেল ফোনটা । কে কেঁপে উঠল। ফোনটা তখনও কাটেনি। ওপার থেকে হঠাৎ একটা গান। স্পিকার দিয়ে খুব অল্প হলেও মৃত্তিকার কানে ভেসে আসছে গানটা। সহ্য করতে পারছে না। এক ঝটকায় ফোনটা তুলে কেটে দিল। বিছানায় বসে পড়ল। বিভীষিকার স্মৃতি খুব চেষ্টা করেছিল ভুলে থাকবার। মৃত্তিকা ভেবেছিল অন্তত মেয়ের অন্নপ্রাশনে সব ভুলে খুব আনন্দ করবে। কিন্তু এই ফোনটা সেটা হতে দিল না। আবার ফোনে টকাস করে একটা পয়সা পড়ল। হোয়াটসঅ্যাপ এল। কাঁপা হাতে লক খুলে দেখল একটা অচেনা নম্বর থেকে ভিডিয়ো এসেছে। না না না, কিছুতেই না। ও আর কোনও ভিডিয়োতে ক্লিক করার সাহস পাচ্ছে না। চোখ ফেটে জল আসছে। মাথা ঘুরছে। আবার যদি সেই বীভৎস নারকীয় দৃশ্য সে দেখে তাহলে হার্ট ফেল করে মরেই যাবে। কিন্তু বেশিক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারল না মৃত্তিকা। পাশের দোলনায় শুয়ে মেয়েটা ঘুমোচ্ছে। তবু সে ভিডিয়োতে ক্লিক করল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল সেই গান, ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দমদমাদম।’ বাঁহাতে মোবাইল ধরে ডানহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। এ কী! এই ভিডিয়ো কে করল? কীভাবে পেল? চোখ সরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে মৃত্তিকার। কিন্তু পারছে না । বেড়ালটা কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করে উঠছে। কাঁপতে কাঁপতে হাত থেকে মোবাইলটা আবারও পড়ে যাচ্ছিল। মৃত্তিকা ফোনের ওপর কোনওরকমে একের পর এক ট্যাপ করে বন্ধ করে বিছানায় ফেলে দেয়। গা গুলিয়ে বমি উঠে এল মৃত্তিকার। দৌড়ে গেল বেসিনের দিকে। কল খোলার সময়ও পেল না। তার আগেই পেটের ভেতর থেকে গুলিয়ে উঠে এল। বমির আওয়াজ পেয়ে ছুটে এল দীপায়ন। ‘কী হল মৃত্তিকা? এই…।’

ঘরে এসে হাপুস নয়নে কেঁদেই চলেছে মৃত্তিকা। পাশে দীপায়ন অধৈর্য। ‘কী হয়েছে কী বলবে তো? কালকে বাড়িতে এত বড় একটা কাজ আর আজ তুমি এইভাবে কাঁদছ। বমি করছ! কেন?’ পাল্টা ঝাঁঝ দেখাল মৃত্তিকা, ‘তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ? সারাদিনে একটু সময় হয় না আমার পাশে থাকার! এত কাজ তোমার?”

-বোকার মত কথা বোলো না। ঘটা করে মেয়ের অন্নপ্রাশন হচ্ছে আর মেয়ের বাপ বউয়ের পাশে বসে বসে তার মুখ দেখবে সারাদিন? কাজগুলো কী ও পাড়ার রামধন এসে করে দেবে?

-হ্যাঁ কথা তো শোনাবেই আমাকে। তোমার তো ইচ্ছেই ছিল না লোকজন আসুক। আনন্দ হোক

-বাজে কথা কেন বলছ বলো তো? কী হয়েছে সেটা তো বলবে!

-কিচ্ছু হয়নি।

ঝাঁঝের পরিমাণটা কমে এল মৃত্তিকার গলায়। ‘কিচ্ছু যদি না হবে তাহলে কাঁদছ কেন?”

-আচ্ছা দীপায়ন, আমরা স্বয়ম্ভুবাবু, শিবাঙ্গী আর কিছু পুলিশকে নিমন্ত্রণ করতে পারি না? ওদেরকে বলতে পারি না যে কাল সকাল থেকে আমাদের যেন পুলিশী পাহারা দেওয়া হয়?

মুহূর্তে মুখ পালটে গেল দীপায়নের। মৃত্তিকার পাশ থেকে উঠে পড়ল। গম্ভীর গলায় বলল, ‘না, এ হয় না।’ -কেন হয় না?

-ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। আমরা কোনও সেলিব্রেটি নই যে ওরা আমাদের অনুষ্ঠানে পুলিশি পাহারা বসাবে।

-কোনও সাধারণ মানুষ বিপদে পরলে পুলিশ প্রোটেকশন চাইতে পারে না?

-বিপদ মানে? আবার নতুন করে কী হল?

-কিচ্ছু হয়নি?

-ওই তোমার বন্ধু খুন হল যে তার জন্য বলছ?

-কাল তো আমিও খুন হতে পারি দীপায়ন।

দীপায়ন এবার মৃত্তিকাকে জড়িয়ে ধরল। ‘এসব কী আবোল তাবোল বলছ? তোমার মাথাটা কী পুরো গেল?’

-না দীপায়ন। আমার মনে ভীষণ কু ডাকছে। কাল কিছু একটা হবেই। -তোমার মুণ্ডু। বাড়ি ভর্তি লোক। আত্মীয় স্বজন। তার ওপর পায়েল চক্রবর্তী আসছে গান গাইতে। নিশ্চয়ই তার বডিগার্ড-ফার্ড থাকবে। এর মধ্যে কে তোমার ক্ষতি করবে? আর কেনই বা করবে?

-তুমি প্লিজ ওদের আসতে বলো।

-না মৃত্তিকা। বাজে আবদার কোরো না। তাছাড়া তুমি তো মিশ্রঠাকুরকে দিয়ে বিপদভঞ্জন পুজো করালে। তাতেও এত ভয়? চলো, খেয়ে শুয়ে পড়ি । কাল ভোর-ভোর উঠে অনেক কাজ।

-আমার আজকাল খালি মনে হয় এই বাড়িতে আমরা ছাড়াও আরও কেউ আছে জানো? আমাদের ফলো করছে। কিন্তু আমরা তাকে দেখেও দেখতে পাচ্ছি না।

দীপায়নের বুকটা শুকিয়ে গেলেও মুখ ফুটল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *