8
মাংসের খিচুড়িটা জব্বর পরিপাক হয়েছে। গন্ধেই পেটের ভেতরের চনমনানি দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেড়ে গেছে। ভোর রাত কি তারও কিছু আগে থেকে বৃষ্টিটা জমিয়ে এসেছে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্বয়ম্ভুর মনে হয়েছে আজ সে নিজে হাতে মাংসের খিচুড়ি রাঁধবে। হাঁড়ির ওপর মুখটাকে ঝুঁকিয়ে চোখ বুজে আরাম করে একবার নাক টানল। তারপরেই পরম তৃপ্তি নিয়ে ‘আআআআআহ’ বলে জিভ দিয়ে ঠোঁটটা একবার চেটে নিল ।
কলিং বেল বাজল। দরজা খুলতেই আদ্যন্ত ভিজে সপসপে রেনকোট গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু অবাক হয়ে বলল, ‘এ কী! তুমি?’
-সরুন সরুন। আগে ঢুকতে দিন।
স্বয়ম্ভু সরে আসতেই শিবাঙ্গী তরতরিয়ে ঢুকে এল। দরজার একপাশে জুতো খুলল। তারপর রেনকোট খুলতেই খেয়াল করল স্বয়ম্ভু কেমন যেন ভ্যাবলার মতো চেয়ে আছে তার দিকে। ‘কী দেখছেন স্যার?’ বৃষ্টির ঝাপটায় মুখের দুপাশের কয়েকটা চুল গালে কপালে লেপ্টে আছে। গায়ে নীলের ওপর সাদা দিয়ে কাজ করা প্রিন্টেড টপ। নীচে কালো রঙের পালাজো। শিবাঙ্গীর প্রশ্নে হকচকিয়ে গেল স্বয়ম্ভ। বলল, ‘তুমি হঠাৎ?’
-বা রে! জেঠিমাই তো নেমন্তন্ন করলেন ।
-মা?
আকাশ থেকে পড়ল স্বয়ম্ভু।
-হ্যাঁ আমি ।
দুজনের কথার মাঝে ঢুকে পড়লেন সুচিত্রা। বিধবা মানুষ আটপৌরে সবুজ রঙের নকশা করা ঘিয়ে রঙের শাড়ি। মাথার কাচা চুলের মাঝে যেখানে সেখানে উঁকি দিয়েছে পক্ককেশের সারি। ‘তুই সকালে যখন মাংস আনতে গেলি তখনই শিবাঙ্গীকে বললাম, আজ তোমার স্যার মাংসের খিচুড়ি রাঁধবে। খাবে যদি চলে এসো।’ স্বয়ম্ভু হাত উলটে শিবাঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘বাহ! আর তুমিও অমনি ড্যাং ড্যাং করতে করতে খেতে চলে এলে?’ স্বয়ম্ভুর মুখে এমন চাঁচাছোলা কথা শুনতে শুনতে অভ্যেস হয়ে গেছে শিবাঙ্গীর। অন্য কেউ হলে পত্রপাঠ উল্টোমুখো হয়ে বিদেয় হত। কিন্তু শিবাঙ্গী এর ঠিক উল্টোটাই করল। রুমাল দিয়ে মুখের ওপর জমে থাকা বৃষ্টির জল মুছতে মুছতে বলল, ‘কী করব স্যার? এমন আদর করে নেমন্তন্ন করলে কী আর সেটা ফেলা যায়?’
-গালাগাল দিয়ে ডাকলেও তুমি আসতে শিবাঙ্গী ।
বলেই ঘরের দিকে হাঁটা দিল স্বয়ম্ভু। সুচিত্রা ভুরু দুটো এক জায়গায় জড়ো করে বলল, ‘জীবনে অনেক গোয়েন্দা দেখেছি ভোলা, তোর মত এমন অসভ্যতামি কাউকে করতে দেখিনি। অতিথিকে কেউ এইভাবে আপ্যায়ন করে?’ মায়ের ভোলা অমনি বিদ্যুতের ফলার মতো ঘুরে তাকাল। কড়কড় করে বলে উঠল, ‘আর কতবার বলব তোমায়, যেখানে সেখানে আমায় ভোলা বলে ডাকবে না?’
-নয় তো কী স্বয়ম্ভু সেন বলে ডাকব?
-হ্যাঁ তাই ডাকবে। আর শিবাঙ্গী আর অতিথি নেই মা। প্লিজ। এই আদিখ্যেতা করা বন্ধ কর। আর যেন কী বললে? তুমি অনেক গোয়েন্দা দেখেছ? তারা কারা?’ সুচিত্রা দেবীও কম যান না। শিবাঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘কেন? ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটি এরা কী গোয়েন্দা নয়?’
-এদের তুমি চর্মচক্ষে দেখেছ?
-ওই হল। পড়েছি। সিনেমাতেও দেখেছি। সত্যজিৎ রায় তো আর ঢপ দিয়ে গল্প লেখেননি। সিনেমাও বানাননি। বসো তো শিবাঙ্গী।
স্বয়ম্ভু যেতে গিয়েও থমকে বলে উঠল, ‘সেটা তুমি না বললেও ও বসবে । এরপর খানিকটা মুখ ভেংচিয়েই স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে বলল, ‘ভালো করে বোসো মা। আমি খাবার বেড়ে আনছি।’ বাধ সাধলেন সুচিত্রা দেবী। ‘দাঁড়া, আগেই খিচুড়ি দিবি কী? একটু জল মিষ্টি দিই আগে।’ গলাটা কার্টুনের মতো সরু করে চোখ কপালে তুলল স্বয়ম্ভু, ‘আবার জল মিষ্টিও? ভগবান!’ চোখ উল্টিয়ে মুখ ঘুরিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। শিবাঙ্গী ফিকফিক হাসছে।
মোবাইলটা বেজে উঠতেই শিবাঙ্গীকে বসতে বলে ঘরে চলে গেলেন সুচিত্রা। বিছানায় রেখে এসেছে বোধহয়। শিবাঙ্গী সোফায় বসেই আরও একটু ভালো করে ভেজা হাত, গলা, মুখ সব মুছল। হঠাৎ ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন সুচিত্রা দেবী। ‘ও ভোলাআআআআ, ভোলা রেএএএ সব্বোনাশ হয়ে গেছে।’ আচমকা পরিবেশটা পালটে যেতেই সটান সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শিবাঙ্গী। ‘কী হয়েছে জেঠিমা?’ হাতে ফোন ধরেই ছেলেকে ডেকে চলেছেন। ভোলাও দৌড়ে এল, ‘কী হল আবার?’ সুচিত্রা দেবী কাঁপছেন। স্বয়স্তু স্পষ্ট বুঝল। জিজ্ঞেস করল ‘কে ফোন করেছিল?’
– সুমিত্রা।
কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন সুচিত্রা। স্বয়ম্ভু বলল, ‘মেজ মাসির আবার কী হল?’
-অরুণাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
-উফফ মা! তুমি সামান্য ব্যাপারে এমন কর যে…!
নিজের মাসতুতো বোনের নিরুদ্দেশের খবর পেয়েও স্বয়ম্ভুর এমন নির্লিপ্ততা দেখে টলে গেলেন সুচিত্রা দেবী। ‘কী বলছিস ভোলা? ও তোর ছোট বোন। ওকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
-এটা কোনও নতুন ব্যাপার নয়। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েই তো তমালকে বিয়ে করেছিল, ভুলে গেলে?
শিবাঙ্গী এবার বেশ অস্বস্তিতে পড়ল। যতই হোক, তার সিনিয়রের ফ্যামিলির সিক্রেট এইভাবে তার সামনে বেরিয়ে আসাটা লজ্জাজনক।
-সে যাই হোক। ওর কোনও ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনটাও সুইচড অফ। তুই ওকে খুঁজে দে ভোলা। সুমিত্রা হাউহাউ করে কাঁদছে।
সুচিত্রা বাচ্চাদের মতো নাছোড়। ‘আশ্চর্য তো! এ কী গেরস্থের গোরু হারিয়ে গেছে নাকি? তুই খুঁজে দে ভোলা! একটা আদ্দামড়া বিবাহিতা মেয়ে স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছে। কিডন্যাপ তো হয়নি। সেটা হলে তাও খুঁজে দেখার ব্যবস্থা করা যেত।’
-কিডন্যাপ যে হয়নি সেটা কী শিওর হয়ে বলতে পারেন?.
শিবাঙ্গীর কথাটা মগজে গিয়ে ঘা দিল স্বয়ম্ভুর। তবু জুনিয়রের কাছে চট করে নরম হওয়া যাবে না। তাই কপট রাগেই বলে উঠল স্বয়ম্ভু, ‘তুমি আর সাঁকো নেড়ো না তো।’
-সরি।
চুপসে গেল শিবাঙ্গী। কিন্তু তেড়ে উঠলেন সুচিত্রা দেবী, ‘কেন বলবে না ও? শিবাঙ্গী তো ঠিক কথাই বলেছে। কত আশা নিয়ে তোর মাসি ফোন করল। কী লাভ হল তোকে আমার গোয়েন্দা বানিয়ে যদি ঘরের কাজেই না লাগবি? শিবাঙ্গী মা, তুমি অন্য গোয়েন্দা দেখো। আমি পয়সা দেব।’ শিবাঙ্গী বেচারি ভড়কে ভ। এমন একটা সিরিয়াস মুহূর্তেও হাসি পাচ্ছে, অথচ হাসতেও পারছে না। এদিকে স্বয়ম্ভু ব্যোমভোলে হয়ে শুধু মায়ের কীর্তি দেখতে থাকল। মা নাকি তাকে গোয়েন্দা বানিয়েছে বাড়ির বেয়াড়া মেয়ে হারিয়ে গেলে যাতে খুঁজে পায়, সেই আশায়! পৃথিবীটা এখনও যে কেন দুভাগ হয়ে গেল না!
মায়ের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কল করল স্বয়ম্ভু। উল্টোদিক থেকে এক মহিলার গলা। শুনেই বোঝা গেল কান্নাকাটি করছে। অত্যন্ত বিষন্ন সর্দি ধরা গলায় মহিলা বললেন, ‘হ্যাঁ দিদি বল।’
-আমি ইসে… ইয়ে বলছি।
আড়চোখে শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে নিজের নামটা উচ্চারণ করতে গিয়েও করল না। ‘ও ভোলা? বল বাবা। শুনেছিস তো সব। কিছু একটা কর বাবা।’ বলেই কাঁদতে শুরু করলেন সুমিত্রা।
-মাসি কান্নাকাটি কোরো না। ঠিক কী কী হয়েছে সব আমায় খুলে বলো। তোমরা কখন জানলে যে অরুণা মিসিং?
-সকাল থেকেই অরুণাকে ফোনে পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে তমালকে ফোন করলাম। দু-তিনবার বেজে গেল। তারপর যখন ধরল বুঝলাম যে তিনি ঘুমোচ্ছিলেন।
জামাইকে খামোকা ‘তিনি’ বলে সম্বোধন করাটা স্বয়ম্ভুর কানে বাজল। সুমিত্রা বলে চললেন, ‘জিজ্ঞেস করলাম অরুণা কোথায়? শুনে তিনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। বলল মানে? সে তো কাল রাতে আপনাদের কাছেই গেছে। আমি তো অবাক। আমাদের কাছে মেয়ে আসেনি। শুনে সে হাই তুলে বলল তাহলে দেখুন কোনও বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠেছে।’
-অদ্ভুত! তমালের বউ কোথায় গেছে সেটা ও জানে না?
-ওটাই তো কথা। আমিও এটাই বললাম। তার উত্তরে কী বলল জানিস?
-কী?
-বলল, কাল রাতে নাকি চুড়ান্ত ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে অরুণা নিজেই বেরিয়ে গেছে। তমাল ভেবেছে আমাদের কাছে এসেছে।
-পৌঁছল কিনা খোঁজ নেবে না?
-কেন নেবে বল? এখন তো আমার মেয়েটাকে ঘাড় থেকে নামাতে পারলেই বাঁচে।
-সে কী! কেন?
সুমিত্রা এবার একটু থিতিয়ে গেলেন। গলা নামিয়ে বললেন, “ওদের মধ্যে আজকাল ভীষণ অশান্তি চলছিল। অরুণা প্রথমে কিছু বলতে চায়নি আমায়। ফোন করলেই দেখি এড়িয়ে যায়। একদিন আমি জোর করে ওদের বাড়ি গিয়ে মেয়েকে চেপে ধরতেই বলে ফেলল। কোন একটা মেয়েকে জড়িয়ে ওদের মধ্যে অশান্তি চলছে। এই শেষ ছয় মাসে ওদের সম্পর্কটা তলানিতে এসে ঠেকেছে।’
-তমালকে থানায় মিসিং ডায়েরি করতে বলো।
-সে গুড়ে বালি। কথা শুনে তো মনে হল না বউকে খোঁজার কোনও ইচ্ছে আছে বলে। তোর মেসো গেছে।
-মেসোর মিসিং ডায়েরি করে কী হবে? যোধপুর পার্ক থেকে তো আর মিসিং হয়নি। হয়েছে তো শিয়ালদা থেকে। ওখানকার থানায় মিসিং ডায়েরি করতে হবে।
-তমাল তো করছে না। খালি বলছে নিজের ইচ্ছেয় গেছে, নিজের ইচ্ছেয় ফিরবে। তাই তোর মেসোকে পাঠালাম ।
-বেশ। চিন্তা কোরো না। আমি দেখছি।
ফোনটা কেটে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে স্বয়ম্ভু। একটু চিন্তিত দেখায় তাকে ।
-এনিথিং সিরিয়াস স্যার?
প্রশ্নটা শিবাঙ্গী করল।
-মাংসের খিচুড়িটা আমার আর খাওয়া হল না। এখুনি বেরোতে হবে। তুমি এক কাজ কর শিবাঙ্গী, তুমি এখানে থাকো। খিচুড়ি খাও। মায়ের সঙ্গে একটু গল্পটল্প করে ফিরে যেও।
-সরি স্যার, আমি যখন আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট তখন আপনাকে ছায়ার মতো ফলো করা আমার কর্তব্য। মাংসের খিচুড়িটা না হয় অন্যদিন হবে।
-না না শিবাঙ্গী। তোমার আজ ছুটি তো। তুমি বরং …
-আপনারও তো আজ ছুটি। তবে আপনি যদি এই কাজে আমার ভরসা না করেন তাহলে অন্য কথা।
স্বয়ম্ভুর উত্তর আসার আগেই সুচিত্রা বলে উঠলেন, ‘ইসস ছি ছি! মেয়েটাকে বড় মুখ করে খেতে ডাকলাম। এক কাজ কর না ভোলা, তোরা খেয়ে তারপর বেরো।’
-সময় নেই মা। তাছাড়া রাতে তো ফিরবই। তখন খাব। সঙ্গে করে শিৰাঙ্গীকেও নিয়ে আসব। তুমি খেয়ে ফ্রিজে তুলে রেখো।
শিৰাঙ্গীও সুচিত্রাকে দুঃখ করতে বারণ করল। সুচিত্রা বললেন, ‘কী হল না হল জানাস আমায় তোরা। আমি কিন্তু টেনশনে থাকব।’
