১৮
ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ঝট করে বন্ধ করে দিল স্বয়ম্ভু। ভিডিয়োটাও নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। মৃত্তিকার বাড়িতে পুলিশ এসেছে। সারা ঘর থমথম করছে। মৃত্তিকার ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে নাক টানার শব্দ ছাড়া ঘরের মধ্যে আর কোনও শব্দ নেই। তবে বাইরে থেকে একটানা চ্যাঁঅ্যাঅ্যা করে শব্দ আসছে যেটা স্বয়ম্ভুর কানে মাঝেমধ্যেই করাত চালিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ডাইনিং থেকে চেয়ার সরানোর শব্দ হল দুবার। কাজের লোকটা ঝাঁট দিচ্ছে। চোয়াল শক্ত করে বসে আছে স্বয়ম্ভু। দীপায়ন প্রশ্নটা করল, ‘কী হবে মিস্টার সেন? এগুলো আমাদের কেন পাঠাল?’
-দিয়া মিথ্যে বলেছিল আমাদের।
চাপা স্বরে বলে উঠল স্বয়ম্ভু। ‘উনি নিশ্চয়ই এরকম কোনও হুমকি পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের জানাননি। জাস্ট চেপে গেছেন। এই খুনি লুকিয়ে থাকার লোক নয়। আমাদের চোখের সামনেই আছে। কিন্তু আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি না। এ যাকে মারে তাকে সংকেত পাঠিয়ে তবে মারে। অরুণাকে যেমন….। কিন্তু দিয়া বারবার বলেছে ও কিচ্ছু পায়নি।’
-তার মানে এবার আমার পালা?
গলা শুকিয়ে এল মৃত্তিকার। গালদুটো লাল হয়ে গেছে চোখ থেকে ঝরে পড়া জল মুছে মুছে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘সুস্মিতাও আছেন লাইনে। ওনার কাছে অলরেডি অরুণার পায়ের আঙুল পৌঁছে গিয়েছিল। এবার শুধু দেখার বিষয় দিয়ার পায়ের আঙুল কার কাছে যায়?’
-আমাকেও কি খুন হয়ে যেতে হবে স্বয়ম্ভুবাবু?
প্রচণ্ড ভয়ে প্রশ্নটা করল মৃত্তিকা। স্বয়ম্ভু বলল, ‘সেটা আপনাদের ওপরেই নির্ভর করছে মৃত্তিকা ম্যাডাম। আপনারা কেউ সরাসরি সোজাসুজি বলছেন না যে অতীতে আপনাদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল? নাকি আপনারাই কিছু ঘটিয়েছিলেন! যাতে এমন সাংঘাতিক কোনও শত্রুতা তৈরি হতে পারে! দিয়া লুকিয়ে গিয়েছিল তাই আজ তার এমন পরিণতি। কিন্তু আপনারা কিচ্ছু না লুকিয়ে বলুন। আর এই যে গান, আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দম দমা দম। এর মানেটাই বা কী? আপনাদের সঙ্গে বেড়ালের ডাকের সম্পর্ক কী? খুনি কেন বারবার এই ম্যাও ডাকটাকে ব্যবহার করছে? প্লিজ বলুন।’
-আমি জানি না, কিচ্ছু জানি না। যা বলার আগেরদিন শিবাঙ্গী ম্যাডামকেই বলে দিয়েছি।
-সেটাও পুরোটা বলেননি। জাস্ট ওপর-ওপর বলে গেছেন। শ্রীদেবীর ভাই শ্রীকুমার আপনাদের নামে কমপ্লেন করেছিল যে আপনারা নাকি জোর করে তার দিদিকে প্রিয়াংশুর কাছে যেতে বাধ্য করেছিলেন। তাই আপনারাই আসল কালপ্রিট।
-এক সেকেন্ড মিস্টার সেন। শ্রীদেবী, শ্রীকুমার, কালপ্রিট এসব কী? কারা কাকে যেতে বাধ্য করেছে?
স্বয়ম্ভু আকাশ থেকে পড়ল। মৃত্তিকা মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে কাঁদছে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘দীপায়নবাবুকে কিছু বলেননি আপনি? মৃত্তিকা ম্যাডাম!’ মৃত্তিকা মুখ ঢেকে নীরবে দুপাশে ঘাড় নাড়ল। তারপরেই মুখ তুলে বলল, ‘স্বয়ম্ভুবাবু, শ্রীদেবী কি কচিখুকি ছিল? আমরা জোর করলাম আর ও চলে গেল?’
-র্যাগিংয়ে কী না হয়? শ্রীদেবী শহরে একা থাকত । সুবিধে তো আপনাদের সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া আমি নিজে খবর নিয়েছি আপনারা চারবন্ধু একেকটা মাসে একেকজন জুনিয়রের পিছনে লাগতেন। বুলি করতেন। কিন্তু সেই বুলি করাটার মাত্রাজ্ঞান আপনাদের অনেক সময়েই থাকত না।
তুতলে ওঠে মৃত্তিকা, ‘আ..আমাদের তখন বয়স কম। এরকম অ… অনেক জায়গাতেই হয়। তাই বলে শ্রীকুমারের অভিযোগ একদম মিথ্যে। তাছাড়া সেই ছেলেটাকে তো আমি দেখিওনি। প্রফেসররাও তো স্টেপ নিতে পারতেন আমাদের বিরুদ্ধে। কই? কেউ তো নেননি।’
-কী করে নেবেন? শ্রীদেবী তো সবার সামনে কারও নাম করেনি। কারণ তাকে আগেভাগেই ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া শ্রীদেবী যখন ফার্স্ট ইয়ার আপনারা তখন থার্ড ইয়ার। আপনাদের ফাইনাল এক্সাম হয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ আপনাদের কলেজের পার্ট শেষ।
মৃত্তিকা বেশ জোরে বলে ওঠে, ‘ও তো বলেইছিল ওর সর্বনাশের জন্য অন্য লোকে দায়ী। আমরা কেউ নই। কলেজে সবাই জানত আমরা জুনিয়রদের নিয়ে বুলি করতাম তাই আমাদের নামে বলাটা সহজ। শ্রীদেবী আসল অপরাধীকে বাঁচাতে চেয়েছে আমাদের নামে বলে। আর বাঁচাতে চেয়েছিল নিজেকে। আমাদের অপরাধ প্রমাণ হলে, বাজে মেয়ে বলে ওকে কলেজ থেকে রাস্টিকেট কেউ করতে পারত না। কিন্তু শেষমেশ সেটা হয়নি। ওর ভাইও তো আর কিছু করেনি।
-সময়ের অপেক্ষা করছিল। সুযোগ খুঁজছিল। এখন হয়তো সেই সময়… স্বয়ম্ভুর কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই বেয়াক্কেলে কাজের মেয়েটি ঘরে ঢুকে এল ৷
-ও বৌদি, এই সিলিপগুলো কী ফেলে দোবো একবার দেকে নাও।
সকলেই ভীষণ বিরক্ত হল। দীপায়ন বলেই ফেলল, ‘ওহ বীণা, দেখছ তো সবাই জরুরি কথা বলছি!’ বীণা বেশ ঘাবড়ে গিয়ে তুতলে উঠল। ‘আ… আমি কী করব? আমায় তো আরেক বাড়ি যেতে হবে নাকি? তারপরে এগুলো ফেলে দিলে বৌদি আমার উপ্রে হাইমাই করবে।’
-বিলগুলো একবার দেখতে পারি?
বীণা প্রায় সকলের মাঝে এসে দাঁড়িয়ে হাতে ধরা বিলগুলো মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেদিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে ছিল স্বয়ম্ভ। বলা ভালো বিলগুলোই তার চোখ টেনে ধরেছিল। দীপায়ন বিস্মিত হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ শিওর।’
পাঁচ-ছয়টা বিল একসঙ্গে করা ছিল। মোট তিনটে দোকানের নাম। ভুরু দুটোকে মাঝে টেনে এনে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্বয়ম্ভু। তারপরে বলল, ‘আপনাদের আপত্তি না থাকলে এই বিলগুলো আমি নিতে চাই।’ নিয়ে আপনি কী করবেন?
-শাড়ি জামাকাপড়ের বিল। ওগুলো
স্বয়ম্ভু হাসল। ‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্যরতন! এগুলো রাখলাম কেমন?’ শার্টের পকেটে বিলগুলো পুরতে পুরতে কাজের মেয়েটিকে হাসিমুখে বলল, ‘ধন্যবাদ । আপনি আসতে পারেন।’ কাজের মেয়ে বীণা লেবড়ে ঘেবড়ে এর মুখ ওর মুখ দেখে স্বয়ম্ভুর মুখের হাসিটি ডিটো নকল করে বলে উঠল, “থাঙ্কু । তরতরিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেল। ধন্যবাদের বদলে থাঙ্কু! শিবাঙ্গী থাকলে স্বয়ম্ভুর মুখটা দেখে নির্ঘাত হেসে ফেলত।
-আপনাদের মাথায় খাঁড়া ঝুলছে দীপায়নবাবু। আশা করি বুঝতে পেরেছেন।
স্বয়ম্ভুর কথা শুনে দীপায়ন আর মৃত্তিকার মুখ নতুন করে শুকিয়ে এল। -আচ্ছা, এরকম কান জ্বালানো আওয়াজটা কী সারাদিন হয়?
অনেকক্ষণ সহ্য করার পর ব্যাজার মুখে প্রশ্নটা করেই ফেলল স্বয়ম্ভু। দীপায়ন বলল, ‘প্রায় দিনই হয়। তবে সব সময় নয়। সামনেই একটা কামারশালা আছে। আওয়াজটা সেখান থেকেই আসছে।’
-মাথাটা জাস্ট ধরে গেল। যাই হোক, আপনার বাড়িটা আমরা একবার সার্চ করব।
-কেন স্যার? হঠাৎ কী হল?
-হঠাৎ কোথায়? খুনি আপনাদের বাড়ি চিনে এমন একটা ভিডিয়ো পাঠিয়ে হুমকি দিয়ে গেল। কে বলতে পারে আপনার বাড়ির আরও অন্য কোথাও কেউ কিছু রাখেনি। আপনাদের ওপর নজর রাখার জন্য নিশ্চয়ই কোথাও ক্যামেরা ফিট করে রাখা আছে। কিম্বা সুস্মিতা ম্যাডামের মতো আপনাদের বাড়ির কোথাও থেকে হয়তো দিয়ার পায়ের কাটা আঙুল পাওয়া গেল!
শুনেই মৃত্তিকার ওয়াক উঠে এল। দীপায়ন বলল, ‘প্লিজ আপনারা দেখুন। আমি তো কলেজে বেরিয়ে যাই। সারাদিন বাচ্চা নিয়ে একা থাকে মৃত্তিকা। আপনি যা শোনালেন তারপর তো…।’
দলবল নিয়ে বাড়ির মধ্যে সেঁধিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। বসার ঘর পেরিয়ে ডাইনিং। খাবার টেবিল চেয়ার পাতা। টেবিলের তলায় উঁকি মারল স্বয়ম্ভু । মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে টেবিলের নীচের দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, ‘আপনাদের এই স্মার্ট কাজের মেয়েটি কদ্দিন কাজ করছে?’ মৃত্তিকা জবাব দিল, ‘আট মাস।’
টেবিলের তলা থেকে চোখ সরে গেল দেয়ালে সাজানো কাচের গ্লাসের সেট, ফুলদানির দিকে। হাত দিয়ে নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় থাকে?”
-ফুলবাগানেই। পাশেই একটা বস্তি আছে। ওখানে।
দলবলসমেত শোবার ঘরে ঢুকে গেল স্বয়ম্ভু। বাচ্চা মেয়েটি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। পাশে শুয়েছিল আয়া দীপা। কতগুলো মদ্দা জোয়ান গটগট করে ঢুকে আসাতে একটু অস্বস্তি হল। বিছানায় এলোমেলো রাখা বাচ্চার কাচা কাঁথা আর জামাকাপড়। সেগুলো ভাঁজ না করে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। তাই লজ্জাটা একটু বেশিই পেল। মৃত্তিকা ছাড়ল না। সবার সামনেই প্রশ্ন করে ফেলল, ‘তুমি ঘুমোচ্ছ দীপা? এদিকে জামাকাপড়, কাঁথা সব পড়ে!’
-আসলে ওকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে কখন যে চোখটা লেগে গেছে! এখুনি করে দিচ্ছি।
-আপনার নাম দীপা ?
হচ্ছিল কথা মালকিনের সঙ্গে। হঠাৎ করে গম্ভীর গলায় গোয়েন্দা নাম জিজ্ঞেস করাতে ঘাবড়ে গেল দীপা। শুধু ঘাড় নাড়ল। স্বয়ম্ভূ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘দীপা কী?’
-দেবনাথ।
-কোথায় থাকা হয়?
-শিয়ালদা ।
-শিয়ালদার কোথায়?
-ওই জগত সিনেমা আছে। ওটার পাশের গলি দিয়ে ঢুকে ডানদিকে । -সেন্টার থেকে?
-হ্যাঁ।
দীপার দিক থেকে চোখটা সরে ঘরের মধ্যে বনবন করে ঘুরতে থাকল স্বয়ম্ভুর। ঘরের দেয়ালে দুর্গা ঠাকুরের ছবি। ঠিক তার উলটো দিকে দীপায়ন আর মৃত্তিকার বিয়ের বেশে যুগলের ছবি। একটা আলমারি, ড্রেসিং টেবিল এবং তাতে লম্বা আয়না। সব দেখে মুখে একটা ‘হুম’ শব্দ করে স্বয়ম্ভু বলল, ‘চলুন পাশের ঘরে যাই।’
-ওটা আমার স্টাডি রুম।
দীপায়ন বলল। -সেটাই তো একবার স্টাডি করব। চলুন । হাসিমুখে দীপায়নের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলল স্বয়ম্ভু।
স্টাডি রুমে ঢুকতেই এক ঝলক ভালো লাগার ঝাপটা লাগে স্বয়ম্ভুর চোখে। ওয়াল পেপারে মোড়া এই ঘরটায় অসীম যত্নের ছাপ। প্রফেসরের সাধনাকক্ষ এমনই হওয়া উচিত। ক্যাবিনেটে সাজানো হরেক বইয়ের নানান রং, ওয়াল পেপারের রং, ঝাঁ চকচকে উডেন পালিশ করা চেয়ার-টেবিল। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ। স্বয়ম্ভ টেবিলের ড্রয়ার দুটো টেনে ভিতরে চোখ চালিয়ে দিল। কয়েকটা খাতা, পেন, পেনসিল আর চারটে পেনড্রাইভ। ভিতরের দিকে দুটো হার্ড ডিস্ক রাখা। ড্রয়ার বন্ধ করে দেয়ালজোড়া বইয়ের ক্যাবিনেটের দিকে চোখ ফেরাল স্বয়ম্ভু। ‘আপনি কলেজে কী পড়ান ? -ইতিহাস ।
-বাবা! তার মানে তো অতীতের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখতে হয় আপনাকে!
দীপায়ন একটু লাজুক হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ তা তো হয়ই।’
-ক’বছর হল চাকরি?
-এই তো ছয় হবে এই নভেম্বরে।
-আচ্ছা। আপনি কী কম্পিউটারও শেখান-টেখান নাকি?
-না না। অত বই দেখে বলছেন?
স্বয়ম্ভু দীপায়নের দিকে সরাসরি তাকাল। দীপায়ন বলল, ‘ওগুলো মেনলি মৃত্তিকার জন্য কিনেছিলাম। ও কম্পিউটার নিয়ে স্পেশ্যাল কোর্স করছিল।’ -কমপ্লিট?
-না সে আর হল কই? মেয়ে হবার পর থেকে আর কন্টিনিউ করেনি। -কী কোর্স করছিল?
-ওই সফটওয়্যার নিয়ে। আপনি কি এ ব্যাপারে ডিটেলস কিছু জানতে চান তাহলে মৃত্তিকাকে ডাকছি। কারণ আমি খুব একটা এসব জানি না । -না না দরকার নেই ।
চারপাশে মুখ ঘোরাতে ঘোরাতেই বইয়ের টেবিলে চোখটা আটকে যায়। দেখে আসা টেবিলটাই আরেকবার দেখার জন্য এগিয়ে যায়। দীপায়নের একটু সন্দেহ হল। ‘স্যার, কিছু কী পেলেন?’
-উঁ? না সেরকম তো কিছু পাইনি ।
কথাটা বলতে বলতেই মোবাইলে কীসব যেন টাইপ করল স্বয়ম্ভু । তারপর স্ক্রিন লক করে পকেটে পুরে রাখল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির উদ্দেশে বলল, ‘অভিনব, হোয়াটস্যাপ চেক কর। তোমার জন্য লালবাজার থেকে নোটিস আছে। এখানে দাঁড়িয়ে চেক করে নাও। আমরা বাইরেটা দেখছি।’ হঠাৎ লালবাজার থেকে নোটিস আসায় ছেলেটি বেশ ঘাবড়ে গিয়ে ঘাড় নাড়ল, ‘ওকে স্যার।’ অভিনব মোবাইল চেক করতে থাকে। স্বয়ম্ভু বাইরের দিকে আঙুল দেখিয়ে দীপায়নকে বলে ওঠে, ‘ওইদিকটা কী আছে দীপায়নবাবু?”
-ওদিকে কলতলা। এ বাড়ির পিছনের একটা এন্ট্রেন্স বলতে পারেন। দীপায়ন আর স্থানীয় পুলিশ অফিসারকে নিয়ে কলতলার দিকে চলে গেল স্বয়ম্ভু।
বারান্দা দিয়ে রাস্তায় বেরোতে হলে চারটে সিঁড়ি নামতে হয়। সেই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একপাশে তাকিয়ে কী যেন দেখল। নাকি ভাবল! তারপর নেমে গাড়ির কাছে চলে গেল স্বয়ম্ভু। স্থানীয় অফিসারকে বলল, ‘এদের ওপর একটু নজর রাখবেন। যেকোনও মুহূর্তে এদের ওপর বিপদ নেমে আসতে পারে। এখন আর কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না । ‘
-শিওর স্যার। চলি তাহলে?
-আসুন ।
স্থানীয় অফিসারকে বিদায় করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভিনবকে স্বয়ম্ভূ বলল, ‘তুমি লালবাজারে গিয়ে এই পেনড্রাইভটা প্রাঞ্জলের হাতে দেবে। বলবে এই ভিডিয়োটার মেটাডেটাগুলো বের করতে। আর আরও একটা জিনিস… আর নয় থাক। যা বলার আমি বলে দিচ্ছি। তুমি এটা প্রাঞ্জলের হাতে পৌঁছে দাও। আর ওই জিনিসটা দাও।’ অভিনব এগিয়ে এসে স্বয়ম্ভুকে জড়িয়ে ধরল। স্বয়ম্ভুও স্মার্টলি অভিনবকে হালকা হেসে জড়িয়ে ধরে। অভিনব ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ অত্যন্ত গোপনভাবে স্বয়ম্ভুর পকেটে পুরে দেয়। তারপর দুজন দুজনকে আলিঙ্গনমুক্ত করে। অভিনব বলল, ‘আপনি যাবেন না স্যার?”
-না, আমার কয়েকটা কাজ আছে। তুমি বেরিয়ে যাও। আমি ক্যাবট্যাব কিছু করে নিচ্ছি।
-ওকে স্যার।
সবেমাত্র ক্যাব বুক করতে যাবে অমনি সুচিত্রা হাঁকডাক শুরু করলেন। ‘হ্যাঁ মা বলো’ স্বয়ম্ভূ ফোন ধরল। উল্টোদিক থেকে হাইপার হয়ে সুচিত্রা বললেন, ‘হ্যাঁ রে ভোলা, শিবাঙ্গীর বাড়ির সামনে লাশ পড়েছে, অ্যাঁ?’
-তোমায় আবার কে বলল?
-টিভিতে দেখাচ্ছে তো। কী অবস্থা রে মেয়েটার?
-মেয়েটার কিছু হয়নি। ওর মায়ের খুব শরীর খারাপ করেছে। আর বাবাও ট্রমাটাইজড হয়ে আছে।
-সে তো হবেই। স্বাভাবিক। শোন ভোলা, তুই সাতদিন মেয়েটাকে ছুটি দে। ওকে একদম কাজে ডাকবি না ।
-ওফফফ মা, তুমি এমন করে বলছ যেন লালবাজারটা আমার বাবার। সাতদিন হবে না মা। আজকে ছুটি দিয়েছি।
-উদ্ধার করেছ। একটা মেয়ের বাড়িতে এরকম একটা অবস্থা আর তুই সেই মেয়েটাকে গুণ্ডাদের পেছনে লেলিয়ে দিবি? ছিঃ ভোলা!
স্বয়ম্ভু মাকে যথেষ্ট সমীহ করে। দাঁত খিঁচিয়ে কোনওদিনই কিছু বলেনি। মায়ের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত বা রাগ হলে এক্কেবারে নীরব হয়ে যায়। এখনও সেই রাস্তাই ধরল মায়ের ভোলা। হাজারটা ক্যাঁচরকোচরের মাঝে ব্যোমভোলা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ‘এই ভোলা কী রে?’
-কী আবার হবে? তুমি যা বলছ তাতে আমার চাকরিটাই চলে যাবে। -কিচ্ছু করতে হবে না তোকে। যা করার আমি করব।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে রীতিমতো লাফিয়ে উঠল স্বয়ম্ভু। ‘তুমি আবার কী করবে? মা, এই সময় উল্টোপাল্টা কিচ্ছু করবে না বলে দিলাম। চারপাশের অবস্থা খুব খারাপ কিন্তু।’
-আচ্ছা। তুই বললি আর আমিও শুনলাম। রাখছি। আর এদিকে কাজ হয়ে গেছে। তমালেরও কাজ করেছে ঠাকুরমশাই ।
-সে ঠিকাছে। কিন্তু তুমি মা কিছু….
ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল। অসহায়ের মত হাত ঝেড়ে মাটিতে পা ঠুকল স্বয়ম্ভু। মনে মনে বলল, ‘ধুস, যা পারে করুক। এই ট্যাক্সিইইইই….।’
