ম্যাও – ২

আজকাল আর তমালকে একদম সহ্য করতে পারছে না অরুণা। প্রতিদিন প্রতি মূহুর্তে অশান্তি, মারপিট করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আজ তমাল রাস্তার জুতো খুলে ছুড়ে মেরেছে অরুণাকে। একদিন এই ছেলেটার গলায় মালা দেবার জন্যেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল সে। সবে তো চার বছর। এর মধ্যেই দাম্পত্যের তিক্ততা চরমে পৌঁছেছে। এখন আর এক ঘরেও থাকে না ওরা। বেডরুমে বেহেড মাতাল হয়ে এলোমেলো হাতপা মেলে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে তমাল। আর পাশের ঘরের সোফায় হাঁটু মুড়ে কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে অরুণা । ডিনারটাও করেনি। এমন সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে। খুব বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলে ফোনের দিকে তাকায়। এত রাতে আননোন নম্বর! মনের মধ্যে চেনা কু-ডাকটা ছলনার সুরে ডেকে ওঠে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা ধরে অরুণা। কিন্তু হ্যালো বলার পরেও যথারীতি উল্টোদিকে কারুর কোনও গলা নেই। গত সাতদিন ধরে আননোন নম্বরের ফোন এলেই এইভাবে শুরু হচ্ছে। এরপরে ও ঠিক কী শুনতে চলেছে সেটাও বুঝে ফেলে। অরুণার এমনিতেই মাথা গরম হয়ে আছে। তার মধ্যে এই ছেনালিপনা আর নিতে পারছে না। খেঁকিয়ে উঠল অরুণা, ‘কথা না বললেও আমি খুব ভালো করে জানি তুই কে। কেন এই অসভ্যতাগুলো করছিস সুস?’ পরক্ষণেই উলটোদিক থেকে একটা বেড়ালের ডাক ভেসে এল, ‘ম্যাও।’ এটাই হয়ে চলেছে গত সাতদিন ধরে। আরও ক্ষেপে গেল অরুণা, ‘জানোয়ারপনা করিস না সুস্মিতা।’ এরপরে ফোনের ওপারের বেড়ালটা আরও চড়া গলায় বিচ্ছিরিভাবে কেঁদে উঠল। কিন্তু কারও কোনও গলার আওয়াজ পাওয়া গেল না। ফোনটা কেটে গেল। আজকেও অরুণা রিং ব্যাক করে শুনল এক মহিলা সুরেলা গলায় বলছে, ‘দিজ নাম্বার ডাজ নট এগজিস্ট।’ এবারও অবাক হল না অরুণা। এটাই হচ্ছে। নাহ! ও যত চুপ করে থাকবে তত এই অসভ্যতামো বাড়তে থাকবে। কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে খুঁজে বের করল একটা নম্বর।

সবেমাত্র প্রিয়াংশুর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছিল সুস্মিতা। বিছানার পাশেই টেবিল ল্যাম্পের নিয়ন হলুদ আলোয় দুজনের অর্ধ উলঙ্গ শরীরে উষ্ণতার সঞ্চার হচ্ছিল তিরতির করে। ঠিক তখনই গোঁ গোঁ শব্দে মোবাইলটা টেবিল ল্যাম্পের পায়ের কাছে কেঁপে উঠল। এমন একান্ত নির্জন মুহূর্তে চুমুর শব্দ আর শীৎকারের ধ্বনি ছাড়া তৃতীয় কোনও শব্দ বড়ই বিরক্তিকর। তবু প্রিয়াংশুর ঠোঁট থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফোনটা তুলল সুস্মিতা। ‘হ্যালো’। ওপার থেকে সপাটে একটা চাবুক যেন আছড়ে পড়ল সুস্মিতার কানে। ‘এমন ন্যাকামো করছিস যেন বুঝতেই পারছিস না কে ফোন করেছে!” এবার প্রিয়াংশুর বাহুপাশ থেকে নিজেকে পুরোপুরি ছাড়িয়ে নিল সুস্মিতা। প্রিয়াংশুর বিরক্তই লাগল। সুস্মিতা ভুরু কুঁচকে বলে উঠল, ‘প্রথমে সত্যিই বুঝতে পারিনি। তবে গলাটা আর কথা বলার ধরণ শুনে বুঝতে পারলাম। এইরকম মাঝরাতে অসভ্যের মতো তুই ছাড়া আর কে কথা বলবে?”

-অসভ্যতামি তো তুই শুরু করেছিস লাস্ট সাতদিন ধরে।

-মানে?

-রাত হলেই নম্বর পালটে পালটে ফোন করছিস। কথাও বলছিস না। উলটে বেড়ালের ডাক শুনিয়ে রেখে দিচ্ছিস। ভেবেছিস এইভাবে আমাকে ব্ল্যাকমেল করবি।

-এই এই ওয়েট ওয়েট।

অরুণার কথা শুনে যতটা আশ্চর্য হল ঠিক ততটাই গলা চড়াল সুস্মিতা। ‘তুই কি এক্কেবারে উন্মাদ হয়ে গেলি? ক পেগ ঢেলেছিস পেটে?’

-ফালতু কথা বলবি না সুস।

–ফালতু আমি বলছি না তুই? মাঝরাতে ফোন করে কীসব আনশান বকছিস? এতকাল তো কোনও কন্ট্যাক্ট রাখিসনি। আজ হঠাৎ চুলকুনি জাগল কেন তোর?

পাশ থেকে প্রিয়াংশু ইশারায় জানতে চায় কে ফোন করেছে এত রাতে? উত্তর পায় না। অরুণা দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, ‘তুই চুলকোবি আর আমার চুলকুনি জাগলেই দোষ?”

-কী চুলকেছি তোকে?

-দিয়া আমায় সব বলেছে। তুই একটা বেড়াল পুষেছিস, তাই না?

-তো?

-প্রতিরাতে অন্য নম্বর থেকে ফোন করে কেন বেড়ালের ডাক শোনাস আমায় সেকি আমি জানি না ভেবেছিস? ভুলে যাস না সুস, চিৎ হয়ে শুয়ে ওপর দিকে থুতু ছুড়লে সেটা নিজের গায়ে এসেই পড়ে।

-অরুণা, তোকে একটা সাজেশন দিই? তুই প্লিজ একজন ভালো সাইকোলজিস্টকে দেখা। ইমিডিয়েটলি । কারণ তোর এখন যা মেন্টাল স্টেট তাতে এরকম পাগল-পাগল লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে…

-কী… কী মেন্টাল স্টেট আমার?

সুস্মিতাকে থামিয়ে দিয়েই অরুণা আবার তড়পে উঠল। সুস্মিতা ক্ষেপল না। ওদিকে অরুণার নাম শুনে প্রিয়াংশু আরও সজাগ হয়ে কান বাড়াল। শান্ত হয়ে সুস্মিতা বলল, ‘তর্পণার কথা জেনে ফেলেছিস তো? কে বলল, তোর বরই না অন্য কেউ?”

-মানে?

-তর্পণাকে এখনও চিনিস না তুই?

এবার অরুণার গলা গুমগুম করে বাজল, ‘তুই… তুই কী করে….?’

-আমার বুটিকে আসে। অনেকদিন ধরে। একদিন তর্পণা তার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে এসেছিল। সেদিনই বহুদিন বাদে দেখলাম তমালকে। বেচারা এমন ঘাবড়ে গেছে কী বলব। ভাবতেই পারেনি তর্পণার চেনা সুস্মিতা আর তমালের পরিচিত সুস একই ব্যক্তি। প্রথমে বেশ খুশিই হয়েছিলাম জানিস। কপালের কী খেলা ভাব একবার। আমার না ভীষণ ইচ্ছে করছিল একবার তোকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি, কী রে অরুণা, কেমন আছিস? তারপরে ভাবলাম, থাক, আমি তো ভালো আছি। বেকার তোর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে কেন দেব! আমি তো জানি এই মুহূর্তে তুই কেমন থাকতে পারিস। বরের পরকীয়া কোন স্ত্রী আর মেনে নিতে পারে বল?

এই সময় সুস্মিতার পায়ের কাছে সাদা ধবধবে নাদুসনুদুস বেড়ালটা এসে একবার মিউ করে ডেকে ওঠে। এক হাতে তাকে কোলে তুলে নেয় সুস্মিতা। অন্য হাতে মোবাইল ধরা। পাশ থেকে এক রাশ বিরক্তি উগরে দিয়ে প্রিয়াংশু ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘রাখ না ফোনটা।’ সুস্মিতা এবার কড়া গলায় বলে, ‘তুই এখন সুস্থ নেই। ফোনটা রেখে ঘুমো। বিছানায় আমার জন্য প্রিয়াংশু ওয়েট করছে রে। আর শোন, আমি না সব ভুলে গেছি। সব মানে সব। গুড নাইট।’ আর কোনও প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করে ফোনটা কেটে সুইচড অফ করে দেয়। তারপর কোলে চড়ে থাকা বেড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে একটা চুমু খায় সুস্মিতা। মাটিতে নামিয়ে দিতেই বেড়ালটাও গুটিগুটি পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

অরুণা সোফায় বসেই জ্বলতে থাকে। কাঁদতে থাকে। সুস্মিতা যদি নাই হবে তাহলে কে প্রতি রাতে ফোন করে ওকে? কেন বেড়ালের ডাক শোনায় অরুণাকে? কী বলতে চায়? নাকি কিছু ইঙ্গিত করছে? ফোন নম্বরটাই বা মুহূর্তের মধ্যে অস্তিত্বহীন হয়ে যায় কীভাবে? একজন লোকই করছে নাকি আরও কেউ আছে তার পিছনে? সুস্মিতা তো জাস্ট ইগনোর করে গেল। আচ্ছা, তমালের এক্সট্রা ম্যারেটালের পিছনে সুস্মিতার প্রতিশোধ নেই তো? পুরনো রাগটা সুস্মিতা ভুলতে পারছে না। আজ তাই ইচ্ছে করেই ওর জন্য প্রিয়াংশুর বিছানায় ওয়েট করার কথা শোনাল। সত্যি পাগল-পাগল লাগছে অরুণার। ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিল। সোফার ওপরেই দুবার ড্রপ খেয়ে ফোনটা মাটিতে পড়তে গিয়েও পড়ল না। এক্কেবারে কোণার কাছে মোবাইলটার অর্ধেক শরীর ঝুলে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *