ম্যাও – ২৬

২৬

ইংলিশ, বাংলা, হিন্দি মিলিয়ে পরপর ছ’টা খবরের কাগজ স্বয়ম্ভুর মুখের সামনে সাজিয়ে দিলেন জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। কোনও কথা বললেন না। শুধু বাঘের মতো চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইলেন স্বয়ম্ভুর দিকে। প্রথম কথাটা স্বয়স্তুই বলল, ‘দেখেছি স্যার।’

-স্লোগানগুলো শুনেছে তো? কাল থেকে নিউজ চ্যানেলগুলোতে যেগুলো দেখাচ্ছে!

-ইয়েস স্যার।

বাঘের চোখে চোখ রেখেই বলল স্বয়ম্ভু। শুভঙ্কর যেমন লম্বা তেমনি পেটানো চেহারা। দুটো গালে শুধু বসন্তের দাগ। কথা বললে মনে হয় কোনও কেঁদো বাঘ তেড়ে একটা হালুম করার আগে গলা ঝেড়ে নিচ্ছে। সেই গলাটাই যতটা নরম করা যায় ততটা করেই সাপ খেলানো সুরে শুভঙ্কর বললেন, ‘কী কী স্লোগান বলো তো। দেখি মনে আছে কিনা ।’ যেন কোচিং ক্লাসে আগের দিনের পড়া ধরছেন স্যার। স্বয়ম্ভু চোখ নামাল। বাধ্য ছাত্রের মতো বলল, ‘ভুয়ো স্বয়ম্ভু দূর হটো। ফুটো গোয়েন্দার ফাটা মাথা, কোলকাতা পুলিশের ছেঁড়া কাঁথা। অপদার্থ প্রশাসনের মুখে থুতু।’ আরও বেশ কয়েকটা বলার জন্য প্রস্তুত ছিল স্বয়ম্ভূ কিন্তু তার আগেই শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল নাটকীয় সুরে হাত তালি দিয়ে উঠলেন। দাঁতের পাটি বের করে খানিকটা উৎপল দত্তের আদলে বলে উঠলেন, ‘ক্যায়া বাত ক্যায়া বাত। তুমি ক পেয়েছ স্বয়ম্ভু। গোয়েন্দা না হয়ে প্রফেসর হতে পারতে তো। এমন সুন্দর পড়া মুখস্থ করতে পারো।’

-স্যার প্লিজ।

করুণ সুরে বাজল স্বয়ম্ভু। ঠিক ততটাই নিদারুণ উত্তর ধেয়ে এল তার দিকে, ‘তা এরপর কী করবে কিছু ভেবেছ?’

-হ্যাঁ স্যার। আমার প্ল্যান পুরো ছকা আছে।

-গুড। ভেরি গুড। না মানে দেখো, একটা মানুষ একটা বিষয়ে ফেল করেছে মানে তো এই নয় যে সে সব বিষয়ে ধ্যাড়াবে তাই না?

স্বয়ম্ভু ভেবেছিল সিপি হয়তো এই কেসের পরের প্ল্যান জানতে চেয়েছেন। কিন্তু না, সেটাও এক চরম ঠাট্টা। সিপি বললেন, ‘তা কী করবে ভেবেছ? প্রশাসনের কোনও বিভাগে থাকবে? নাকি কলেজ টলেজে ট্রাই করবে?”

-প্রশাসনেই থাকব স্যার।

শুভঙ্করের একটা ভুরু উঠে গেল, ‘হুঁ? কী করতে চাও বলো আমি রেকমেন্ড করে দিচ্ছি।’ মেরুদণ্ড সোজা রেখে দৃঢ় স্বরে বলল, ‘এখন যেটা করছি। সেটাই করব স্যার।’ শুভঙ্করের মুখের পেশীগুলো শক্ত হল। চোখেমুখে যে তামাশার তাশা বাজছিল, সেটা ভেঙে চুরচুর হয়ে গেল৷ স্বয়ম্ভু বলল, ‘এই কেসটা আমি নিজে যেচে হাতে নিয়েছি। কিন্তু এখনও আমি কোনও সমাধান করতে পারিনি। তার মানে এটা দাঁড়াচ্ছে অরুণার পর আর যারা যারা মারা গেছে তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী। স্বয়ম্ভু সেন দায়ী। এখানে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট কোনওভাবে দায়ী নয়। শুধু একটাই অনুরোধ স্যার। আমায় আর চারটে দিন সময় দিন। প্লিজ।’

-যাতে বাকি যে আছে তার লাশটাও খুঁজে পাওয়া যায়?

-কথা দিলাম স্যার, প্রয়োজনে আমার জবানবন্দি আপনি রেকর্ড করেও রাখতে পারেন।

-কী কথা?

-এই চারদিনে এই কেস সংক্রান্ত একটাও লাশ পড়বে না

-চারদিন বাদে পড়তে পারে।

-সে সম্ভাবনা এক শতাংশ।

-কী প্রমাণ আছে যে এতটা শিওর হয়ে বলছ?

-সরি স্যার, সেটা এই মুহূর্তে বলাটা সম্ভব নয় ।

-আর যদি চারদিনে বাদেও তুমি ফেল করো!

-যা শাস্তি দেবেন মাথা পেতে নেব। এতগুলো খুনের দায় নিয়ে যদি হাজতবাস বা ফাঁসি হয় সেটাও আমি স্বীকার করব।

শুভঙ্কর রিভলবিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে স্বয়ম্ভুর দিকে পিছন ফিরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর ঝড়ের গতিতে আবার ঘুরে গিয়ে বললেন, ‘বেশ। চারদিনই সময় দিলাম। যদি কোনও বিশেষ সাহায্য লাগে আমায় জানাতে হেজিটেড করবে না।’

-থ্যাংক ইউ স্যার।

বাঘের ডেরা থেকে বেরোতেই দেখল শিবাঙ্গী মুখ লাল করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘কী হল স্যার?’ স্বয়ম্ভু অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে শিবাঙ্গী? এরকম সারা মুখ লাল করে ঘেমে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন?’ -টেনশনে।

কী বললেন?

-বোঝো। আমি দিব্যি বাঘের ডেরা থেকে গটগট করে বেরিয়ে এলাম। আর তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে…..

-বাঘের ডেরায় সিংহ গেলে তার কিছু হয় না স্যার।

-শিবাঙ্গী, তেলের দামটা কিন্তু অনেক বেড়েছে।

হেসে ফেলল শিবাঙ্গী। ‘উফফফ ইয়ারকি ছাড়ুন। বলুন না কী বলল? অবশ্য যদি বলা যায়!’

-আমাদের হাতে চারদিন সময়। এর মধ্যে কেসটা সল্ভড না হলে আমায় জেলে কিংবা ফাঁসিতে লটকাতে হবে। -মানে?

-এই শাস্তিটা আমিই চেয়ে নিয়েছি।

-কেন?

শিবাঙ্গীর পা দুটো টলে গেল।

-নইলে এখুনি সরে যেতে হত কেসটা থেকে। শোনো শিবাঙ্গী, এখন একমাত্র তুমিই আমায় বাঁচাতে পারো।

এতক্ষণ শিবাঙ্গী যে টেনশনে ছিল সেটা এখন চতুর্গুণ বেড়ে গেল। বুকের মধ্যে কোথাও একটা ভালো লাগার হাওয়াও লাগল। শিবাঙ্গী বুঝল কী? -আমি কীভাবে বাঁচাব স্যার?

-মৃত্তিকাকে মরতে দেওয়া চলবে না। আজ থেকে তিনদিন তুমি ওদের ওপর শকুনের মতো নজর রাখবে। যদিও শমন মৃত্তিকার বাড়ির মধ্যেই আছে হয়তো! জানি না। যাই হোক, তুমি এক মুহূর্তের জন্য ওকে নজর ছাড়া করবে না। আমি বলেছিলাম না, আজ আমায় আউট অফ কোলকাতা যেতেই হবে।

-পারব স্যার।

উত্তরটা স্বয়ম্ভুর বুকে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারল। আগেরদিন স্বয়ম্ভুর না থাকার খবর শুনে যেরকম ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছিল শিবাঙ্গী আজ ঠিক তার উল্টো অভিব্যক্তি। সে কী স্বয়ম্ভুর মাথায় খাঁড়া ঝুলছে বলে?

-বাবা! তুমি কী আজকে বোর্নভিটা বা এনশিওর কিছু খেয়ে এসেছ নাকি?

-এই জন্যেই আপনাকে সিংহ বলেছি। শিয়রে শমন, অথচ দেখুন কেমন আমার পেছনে লাগছেন! ও হো, একটা খবর আছে স্যার।

-কী?

-দয়াময় সান্যাল ।

নামটা শুনেই শিবাঙ্গীর দিকে ঘুরে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু।

–লাটাগুড়ি পুলিশ স্টেশনেই কাজ করতেন অ্যাজ আ কনস্টেবল।

-হোয়াট!

-হ্যাঁ স্যার। আজ থেকে দশ বছর আগে সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোথায় চলে যায় কেউ জানে না। পি এস থেকে ছবিও পাঠিয়েছে।

মোবাইলে ছবিটা খুলে স্বয়ম্ভুর দিকে বাড়িয়ে দেয়। স্বয়ম্ভু দেখে ভালো করে। চোখের সামনে একটা ঝড় ওঠে স্বয়ম্ভুর। মোবাইলটা শিবাঙ্গীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘ছবিটা আর্টিস্টকে দাও। বলো আমায় কল করতে। আর এই লোকটার হিস্ট্রি বের কর।’

-করেছি স্যার। দয়াময়ের রেকর্ড খুব ভালো ছিল। বউ আর ছেলেকে নিয়ে লাটাগুড়িতেই থাকত। বউটা বিহারী ছিল। নাম রামাইয়া। সামনেই একটা হোটেলে রান্নার কাজ করত। দুর্দান্ত রান্না করত রামাইয়া। হঠাৎ একটা অ্যাক্সিডেন্টে ওদের বাচ্চাটা মারা যায়। বউটা স্বাভাবিকভাবেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। শারীরিক ও মানসিক। তারপরে হঠাৎ একদিন রামাইয়া সুইসাইড করে। গলায় দড়ি।’

-ছেলের শোকেই নাকি অন্য কোনও কারণ?

-ওখানকার লোকে তো বলে ছেলের শোকেই ।

-যদি ছেলের শোকের জন্যেই হয় তাহলে আগেই তো গলায় দড়ি দিত।

-তখন দয়াময় সঙ্গে ছিল। তাই হয়তো দিতে পারেনি। দয়াময় কাজের জন্য বাইরে যেতেই…

-হুম!

ফোনটা বেজে উঠল স্বয়ম্ভুর। প্রাঞ্জল। ‘হ্যাঁ প্রাঞ্জল উদ্ধার হল কিছু?’ স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল। তারপর ওপার থেকে কিছু কথা ভেসে আসার পরই স্বয়ম্ভু থম মেরে গেল। বলল, ‘আমি আসছি দাঁড়াও।’ নিমেষের মধ্যে প্রাঞ্জলের কাছে এল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। প্রাঞ্জল একটা মোবাইলের হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখাল। ‘এই দেখুন, ঠিক দুদিন আগে এই নম্বর থেকে সুস্মিতার কাছে কিছু একটা আসে। যেটা ডিলিট হয় সুস্মিতার তরফেই।’

-নম্বরটা কোথাকার?

-আফ্রিকা।

স্বয়ম্ভু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ‘খুনি তো দেখছি ওয়ার্ল্ড ট্যুর করিয়ে ছাড়বে।’ শিবাঙ্গী হেসে ফেলল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘এই মেসেজে কী এমন ছিল যেটা সুস্মিতা তার ফোনে রাখতে চায়নি?’ প্রাঞ্জল বলল, ‘এটা যে পাঠিয়েছে সেও ডিলিট করতে পারে স্যার।’

-পারে। বাট করেনি। কারণ জিনিসটা যাতে সুস্মিতা পড়ে বা দেখতে পায় খুনি তো সেই জন্যেই পাঠিয়েছে। ভুল করে তো আর পাঠায়নি। তার মানে একটা নির্দিষ্ট সময় অব্দি সেটা রাখতে হবে। ডিলিট করলে তারপরে করবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, খুনি কি এই সাইট খুলে বসেছিল নির্দিষ্ট সময় পরে সেটা ডিলিট করবে বলে? বা কোনও সাইট থেকে ভিডিয়ো পাঠালে সেটা কি আদৌ আর ডিলিট করা যায়? আমার মনে হয় না। সে খুব ভালো করে জানে আমরা সব সময় সজাগ আছি। মেসেজটা পাঠিয়েই সে সাইটটা থেকে বেরিয়ে গেছে। একবার যদি বেরিয়ে যায় পরেরবার এই সাইটে ঢুকে ডিলিট করা চাপ। কারণ ততক্ষণে নম্বর বদলে যায়। নয় তো, ধরা পড়ার চান্স থাকে। হতেই তো পারত সুস্মিতা ভয় পেয়ে সেটা পুলিশকে জানিয়ে দেবে। আর পুলিশ নম্বর ট্র্যাক করে ফেলবে কারণ খুনি তখন অনলাইন। আই পি অ্যাড্রেসটা একই থাকছে। খুনি এত বড় ভুল করবে না। তাই সুস্মিতাই ডিলিট করেছে। এক কাজ কর প্রাঞ্জল, এই ডিলিটেড মালটা বের করার চেষ্টা কর।’

-ওকে স্যার।

-কল লিস্টের কী খবর?

-লাস্ট তিনদিনের মধ্যে তিনবার ফোন এসেছে। রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া আর কেরালা।

-যাক একটা অন্তত দেশের মধ্যে রয়েছে।

শিবাঙ্গী বলল, ‘তিনবার কল এসেছে মানে তিনবার ম্যাও?’

-সেটাই হ…

বলতে গিয়ে আটকে গেল স্বয়ম্ভু। অন্তর্চক্ষে কিছু একটা ছবি যেন চলকে উঠল। চুপ করে ভাবল ।

-কী হল স্যার?

প্রাঞ্জল প্রশ্ন করল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘একটা কাগজ আর পেন দাও তো।’ সঙ্গে সঙ্গে চলে এল। স্বয়ম্ভূ আঁকতে শুরু করল। প্রথমে একটা পাতা। যার দুপাশের দুটো রেখা বৃন্তের কাছে এসে মিলছে না। সেটা ডানদিকে কিছুটা হেলে আছে। হুবহু আরেকটা পাতা বাঁদিকে হেলিয়ে আঁকল। এরও বৃন্তের কাছটা জোড়েনি। মনে হচ্ছে কেউ পাতা দুটোর নীচের দিকটা কাঁচি দিয়ে কেটে দিয়েছে। তারপর পাতা দুটোর নীচে একটা বাটির নিম্নাংশের মতো অর্ধেক গোল রেখা টানল। যদিও গোলের নীচের দিকটা ঈষৎ ছুঁচলো। অনেকটা একটা মুখের অবয়বের মতো। দুপাশের গাল থেকে চিবুক পর্যন্ত নেমেছে। এবার ওপরে দুটো পাতা আর নীচের মুখের অবয়বের রেখাটির মাঝে দুটো গোল আঁকে স্বয়ম্ভু। দুটো গোলেরই মাঝে দুটো ছোট বিন্দু আঁকে একটু মোটা করে। ছবিটার দিকে তাকায় স্বয়ম্ভু। ঠোঁটের কোণে হাসির রেশ। দুটো পাতার মাঝে একটু ফাঁকা অংশ ছিল। সেটাকে একটা রেখা দিয়ে যুক্ত করে দিল। আঁকাটা ঘুরিয়ে প্রাঞ্জল আর শিবাঙ্গীর দিকে দেখাল। ‘বলো তো এটা কী?’ শিবাঙ্গী আর প্রাঞ্জল প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল, ‘বেড়ালের মুখ?’

-কারেক্ট। শুধু গোঁফগুলো মিসিং।

প্রাঞ্জল জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ এটা আঁকলেন কেন?’ শিবাঙ্গী বলল, ‘আমি জানি।’

-বলে ফেলো।

স্বয়ম্ভু একটা ভুরু তুলে বলল।

-অরুণার পায়ের তলায় দুটো পাতা আঁকা ছিল। দুটো পাতারই নীচের অংশ ছিল না। আমরা পাতা ভেবে ভুল করেছিলাম। আসলে ও দুটো বেড়ালের কান।

স্বয়ম্ভুর ঠোঁটের হাসিটা একটু চওড়া হল। শিবাঙ্গী বলল, ‘দিয়ার পায়ের পাতায় হাফ সার্কেল আঁকা ছিল। কিছুটা ইংলিশ ভি-এর মতো লেগেছিল নীচের দিকটা ছুঁচলো ছিল বলে। মুখের মতো লাগলেও বুঝতে পারিনি। যেটা বেড়ালের মুখের একটা স্কেচ বলা যেতে পারে। আর সুস্মিতার পায়ের নীচে বেড়ালের চোখ।’ প্রাঞ্জল বেশ চোখ বড় বড় করে বলে উঠল, ‘তার মানে গোঁফটা…।’

-মৃত্তিকার পায়ে আঁকা হবে।

শেষ পেরেকটা স্বয়ম্ভু পুঁতে দিল। ঘরের মধ্যে থমথমে নীরবতা। হাওয়৷টা ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে।

-কী অবস্থা তোমার তপন?

-আজ কিছুটা বেটার স্যার। জ্বর নেই। তবে মাথা তুলতে পারছি না। -হুম। এখন এরকমই হচ্ছে।

-কিছু কাজ ছিল স্যার?

-কাজ তো ছিলই। যাক, তুমি রেস্ট নাও। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। রাখলাম।

‘এই দুপুরে ভাত খেতে খেতে কথা বলছিল স্বয়ম্ভু। ফোনটা রেখে বলল, তপনটা অসুস্থ হয়ে বড় বিপদ হল। আসলে ও আমাদের সঙ্গে সব সময় থেকে থেকে আমাদের মতো হয়ে গেছে। ওয়েভ লেন্থটা ম্যাচ করে খুব।’ শশার টুকরোটা মুখে পুরে শিবাঙ্গী বলল, ‘কী করবেন কৃষ্ণকে নিয়ে যাবেন?’

-অগত্যা। এই আবার মা ফোন করেছে। হ্যালো বাড়ি ঢুকেছ?

সুচিত্রা বললেন, ‘এই তো আধঘণ্টা হল।’

-মাসি মেসো?

-আছে একরকম। অভ্যেস তো করতেই হবে।

-হুম ।

একটা ভারী নিশ্বাস বেরিয়ে এল স্বয়ম্ভুর। তখনই সুচিত্রা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই ঠিক আছিস?’ গলাটা করুণ হয়ে স্বয়ম্ভুর কানে বাজল।

-আমি! হ্যাঁ! ঠিকই তো…..

বলেই বুঝল মা কেন এই কথা জিজ্ঞেস করছে। মাকে শুনিয়ে হাসল স্বয়ম্ভু। বলল, ‘আমি বিন্দাস। কেন? তোমায় কেউ কিছু বলেছে?’

-লোকের কথায় আমি আবার কবে পাত্তা দিয়েছি? তুইও দিস না। যে যা খুশি বলে বলুক। তুই তোর কাজ করে যা। তোর যেটা ঠিক মনে হবে সেটাই করবি।

স্বয়ম্ভুর শিরদাঁড়ার ওপর দিয়ে কেউ যেন ভরসার নরম হাত বুলিয়ে দিল। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে সাহস দিল। ‘আমার তো চিন্তা তোমায় নিয়ে। বাড়িতে একা থাকবে তুমি!’

-তোর বাবা চলে যাবার পর আমি একা বাঁচতে শিখে গেছি। আমায় নিয়ে ভাবিস না তো। কাজে মন দে। শিবাঙ্গী যাচ্ছে তোর সাথে? -না না। মেয়েদের কেউ এসব কাজে নিয়ে যায়?

শিবাঙ্গী দিব্যি খাচ্ছিল। কোথা থেকে যেন মোক্ষম একটা অদৃশ্য খোঁচা এসে লাগাতে প্যাটপ্যাট করে তাকাল স্বয়ম্ভুর দিকে। সুচিত্রা বলল, ‘নিশ্চয়ই সঙ্গে আছে তোর?’

-হ্যাঁ। লেজুড় আর যাবে কোথায়? সামনেই বসে।

এবার শিবাঙ্গী নিশ্চিত। কপট রাগে তাকাল স্বয়ম্ভুর দিকে।

গড়গড় ঢেঁকুর তুলে হাত দুটোকে মাথার ওপর ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী তাকাতেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘পেটপুরে ভাত খেয়ে একটু শব্দ করে ঢেঁকুরই যদি না তুলি তাহলে বাঙালি হয়ে জন্মেছি কেন? ওসব সরি ফরি আমি বলতে পারব না।’

-কানা মনে মনে জানা।

শিবাঙ্গীও দিল পাল্টা। স্বয়ম্ভু হাসিটাকে লুকিয়ে নিয়ে বলল, ‘পান খাবে?’ এক গাল হাসি নিয়ে শিবাঙ্গীর উত্তর, ‘মিষ্টি পান।’ মুখটা ব্যাজার হয়ে গেল স্বয়ম্ভুর। ‘না নেই না কোনও কিছুতে?’

-ও মা! কেউ ভালোবেসে পান খাওয়াতে চাইলে খামোকা না বলব কেন? -সেই। চলো ।

সামনেই একটা অল্প বয়সী ছেলের পানের দোকান। স্যান্ডো গেঞ্জি আর বার্মুডা পরে বসে পান সাজছে। স্বয়ম্ভুকে দেখেই ‘সেলাম সাব’ বলে উঠল। ছেলেটির ওস্তাদি দেখে স্বয়ম্ভুও তামাশা করে দুহাত জড়ো করে বলল, ‘নমস্কার। দুটো মিষ্টি পান দিন।’ ফ্যাক করে হেসে ফাজিল ছেলেটির জবাব, ‘জো হুকুম মেরে আকা।’ স্বয়ম্ভু সঙ্গে সঙ্গে একটা আদুরে চড় তুলে বলে উঠল, ‘মারব না এমন!’

-থার্ড ডিগ্রি?

-সব শিখে গেছিস না তুই?

-লালবাজারে পান বিক্কিরি করি। এসব না শিখলে চলে স্যার?

-বুঝেছি। ভালো করে সাজ। নইলে….

স্বয়ম্ভুর হঠাৎ চোখ পড়ে ছেলেটির হাতের দিকে। জাঁতি দিয়ে টকাস টকাস করে সুপুরি কাটছে। স্বয়ম্ভুর অবস্থার পরিবর্তন টের পায় শিবাঙ্গী । কিছু প্রশ্ন করার আগেই স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘শিবাঙ্গী, কৃষ্ণকে ফোন কর । বলো এখুনি এখানে আসতে। বেরোবো।’ বিনাপ্রশ্নেই কাজ হয়ে গেল। পান চিবোতে চিবোতে গাড়িতে উঠেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘ফুলবাগান চলো।’ শিবাঙ্গী হকচকিয়ে গেছে।

মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে গাড়িটা এসে দাঁড়াল একটা কামারশালার সামনে। সেখানে তখনও চ্যাঁ চোঁ করে কোনও ধাতব শরীরে শান দেওয়া চলছে। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী হানা দিল সেই কামারশালায়। কামারের সামনে হাঁটু মুড়ে বসল স্বয়ম্ভু। লোকটি কাজ থামিয়ে অবাক চোখে চেয়ে রইল। ‘কিছু করাবেন বাবু?’ স্বয়ম্ভু গোঁফের কাছটা একটু চুলকে বলল, ‘হ্যাঁ দাদা। একটা বিশেষ জিনিস করাব ।

-বলেন।

-একটা জাঁতি চাই আমার।

-অ। তা সে তো কিনতেই পাওয়া যায়। এই রাস্তা ধরে সোজা গেলেই দোকান ।

-সুপুরি কাটার জাঁতিতে হবে না আমার।

-তবে?

স্বয়ম্ভু নিজের হাত দেখিয়ে বলল, ‘এই ধরুন আমার হাতের আঙুল থেকে কনুই পর্যন্ত হলে যেরকম মাপ হবে সেরকম একটা জাঁতি যদি হয়।

-অ। বুঝেছি বুঝেছি। আপনি কি দীপুবাবুর কেউ হন?

-কে দীপু?

-দীপায়ন চ্যাটার্জি। এই তো এইখানে থাকে ৷

-কেন বলুন তো?

-এই হপ্তাদুয়েক আগে উনি এসে এরকমই একটা বিশাল জাঁতির অর্ডার দেন।

কথাটা শিবাঙ্গীরও কানে যায়। সেও স্বয়ম্ভুর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। স্বয়ম্ভু বলে, “আপনি ঠিক দেখেছেন যে ওটা দীপায়নবাবুই ছিল?’

-রাতের বেলা এসেছিল। বৃষ্টি পড়ছিল। একেবারে মাথা পর্যন্ত রেনকোটে ঢাকা। মুখে আবার মাস্ক। প্রথমে বুঝতে পারিনি। উনি নিজেই বললেন, আমাকে চিনতে পারছ না তাই না? এতসব পরে আছি তো। আমি বললাম না। কে বলেন তো? দীপু গো দীপু। দীপায়ন চ্যাটার্জি। তখন বুঝলাম।

-মুখ তো দেখেননি। ওনার নাম করে অন্য কেউও তো হতে পারত। -চোখের নীচে আঁচিল। অন্য লোকেরও একই কী করে হবে? -রাতের বেলা। রেনকোটে ঢাকা মাথা। মুখে মাস্ক। তারপরেও আপনি চোখের নীচে আঁচিল খেয়াল করলেন?

-প্রথমে করিনি। দীপুবাবু কেবলই চোখটা চুলকোচ্ছিল। আমায় জিজ্ঞেস করল, দেখো তো পলুদা, চোখে কিছু পড়েছে? আমি ভালো করে টর্চ মেরে দেখলাম। তখনই আঁচিলটা নজরে পড়ল। পরে একদিন সকালে এখান দিয়ে বাজার যাচ্ছিল। আমায় বলল, পলুদা আওয়াজটা একটু কম করতে পারো তো। কান তো এবার খসে যাবে। তখনও তো দেখলাম। চোখের নীচে আঁচিল ।

স্বয়স্তুও দীপায়নের সঙ্গে কথা বলাকালীন খেয়াল করেছিল বাঁ চোখের নীচে ঠেলে ওঠা আঁচিলটা। তাই লোকটা যে ভুল কিছু বলছে না সেটা একদম প্রমাণিত।

-কবে দিলেন?

স্বয়স্তু জানতে চাইল ।

-তিনদিন পর। রাতের বেলা এসে নিয়ে গেলেন।

-কীসে করে নিলেন? ব্যাগ এনেছিলেন?

এবারের প্রশ্নটা শিবাঙ্গী করল।

-অই তো, জাঁতিটা কয়েকটা কাগজে মুড়ে নিলেন ভালো করে।

-কী কাগজ? খবরের কাগজ?

পলুদা হেসে ফেলল। বলল, “বাবা আপনারা তো গোয়েন্দার মত প্রশ্ন করছেন। অত কী দেখেছি ছাই?’ বলে ভাবল খানিক। তারপর বলল, “না, খবরের কাগজ ছিল না। সাদা পাতার ওপর কীসব যেন লেখা ছিল। তা সে দিয়ে মুড়েমাড়ে একটা সাদা নাইলনের বস্তা এনেছিল। সেটার মধ্যে পুরে নিয়ে গেল। তা আপনি সেরকমই চান তো?

স্বয়ম্ভু হাসল। বলল, ‘আমি জাস্ট জানতে এসেছিলাম আপনি করেন কিনা। সময়মতো অর্ডার দিয়ে যাব। আজ আসি পলুদা।’

-অ্যাঁ! হ্যাঁ… আসেন।

কেন যে এল! কেনই বা হাজারটা প্রশ্ন করে চলে যাচ্ছে কিছুই ঢুকল না পলুর মাথায়। গাড়িতে উঠেই স্টার্ট দিতে বলল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বলল, ‘একবার দীপায়নের কাছে গেলে হত না স্যার?’

-না। জিনিসটা ওর কাছে নেই।

-তাহলে?

-যে বা যারা পা থেকে আঙুল কাটার খেলায় মেতেছে তাদের কাছে আছে। তাই এখন কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারব না। উলটে সতর্ক হয়ে যাবে । ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করে ওদের প্ল্যানের বাইরে গিয়ে মৃত্তিকাকে শেষ করে দেবে। যেমন সুস্মিতাকে করল।

-মৃত্তিকা তো দীপায়নের স্ত্রী।

-তবু তো ওই নৃশংস ভিডিয়োটা সে পেল। কেন পেল? শুধু ভয় দেখানো? নাকি মৃত্যুর সংকেত? মৃত্তিকাকে সরাবার প্ল্যান না থাকলে ভিডিয়োটা পেত না মৃত্তিকা ।

-কিন্তু কেন?

-তার জন্যেই তো ওদের অতীতটা জানতে হবে শিবাঙ্গী। দীপায়ন কেন তার স্ত্রীকে খুন করতে চাইবে? শ্রীকুমার আর শ্রীদেবীর মধ্যে দীপায়ন এল কোথা থেকে? এদিকে দীপায়ন একটা ক্রাইম থ্রিলার লিখেছে। গল্পের সঙ্গে যদিও এই ঘটনার কোনও মিল নেই।

-আপনি পড়েছেন?

-হুম ।

-গল্পের সঙ্গে বাস্তবের মিল না থাকলেও দীপায়নের মাথায় ক্রাইম থ্রিলারের প্লট ভালোই খেলে। তাই ওর পক্ষে আরেকটা কোনও… এই এই দেখে কৃষ্ণ ৷

গাড়িটা সজোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে। নইলে মহিলাটা এক্ষুনি গাড়ির তলায় চাপা পড়ত। মহিলাটি কোনওরকমে গাড়ির বনেটের ওপর হুমড়ি খেয়ে নিজেকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়। শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু দুজনেই দ্রুততার সঙ্গে নেমে যায়। মহিলাটি তাকাতেই স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী চমকে ওঠে।

-মৃত্তিকা!

স্বয়ম্ভু বলে ওঠে। কৃষ্ণকে গাড়ি সাইড করতে বলে মৃত্তিকাকেও রাস্তার পাশে নিয়ে আসে। ‘এইভাবে কেউ রাস্তা পেরোয়? দেখে পেরোবেন তো?”

-সরি স্বয়ম্ভুবাবু, আসলে আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।

-সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কেন? রাস্তায় বেরিয়ে এত কীসের ভাবনা?

-কিছু না। আমি আসি ।

-দাঁড়ান। আমায় বলতে পারেন। মানে প্লিজ বলুন। নিশ্চয়ই সুস্মিতার খবরটা…

কথাটা না শুনেই দুটো হাত দিয়ে কান চাপা দিল মৃত্তিকা। অসম্ভব ভয় পেয়ে আছে সে। ‘আমি শুনতে চাই না। দেখতে চাই না। খবরটা শোনার পর থেকে আমি ভয়ে সিঁটিয়ে আছি। আবার যদি ওইরকম নৃশংস ভিডিয়ো পাঠায়!

-না। এই খুনের কোনও ভিডিয়ো হয়নি মৃত্তিকা। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

-একে একে সবাই চলে গেল। বাকি শুধু আমি। ওই বেড়ালের ডাকটা… -বেড়ালের ডাক!

স্বয়স্তু আর শিবাঙ্গী প্রায় সমস্বরে বলে উঠল। স্বয়ম্ভু জানতে চাইল, “ওই ফোনটা আপনিও পেয়েছেন?’

-গতকাল রাতে।

-দীপায়নবাবুকে বলেছেন?

-হ্যাঁ ।

-উনি কী বললেন?

-গা করল না। বলল, তুমি সারাদিন ওইসব ভাবছ বলে ওরকম শুনেছ। নেটওয়ার্কের প্রবলেম ছিল তাই হয়তো কথা শুনতে পাওনি। ও আমায় ভুলিয়ে রাখবে বলে জোর করে পার্লারে পাঠাল জানেন। -পার্লারে!

-হ্যাঁ। দুদিন বাদেই তো দেবীর অন্নপ্রাশন। তাই পার্লার বুক করতে এসেছিলাম ।

-আপনার মেয়ের নাম দেবী?

-ওটা আমি ডাকি। ওর বাবা ডাকে শ্রীদেবী।

কয়েক সেকেন্ডের জন্যে হলেও গাড়িঘোড়ার শব্দগুলো স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর কান থেকে লুপ্ত হয়ে যায়।

-উনি কী শ্রীদেবীর ফ্যান?

-হ্যাঁ। ছোট থেকে। আমার ভীষণ আপত্তি ছিল। ওই নামটা আমি সহ্য করতে পারি না।

– স্বাভাবিক ।

স্বয়ম্ভুর প্রত্যুত্তরে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল মৃত্তিকা। চোখ নামিয়ে নিল। শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘তা শ্রীদেবী কি আপনার মেয়ের ভালো নাম?”

-না। দেবোত্তমা। আমি আসি। থ্যাংক ইউ ।

-একটা কথা সত্যি করে বলবেন?

মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরে তাকাল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘শ্রীদেবীর সঙ্গে বেড়ালের কী সম্পর্ক? খুনি কেন ফোন করে বেড়ালের ডাকই শোনাচ্ছে আপনাদের?’

-পাপ! যে পাপের কোনও তদন্ত হয় না। আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না প্লিজ।

গলায় কান্না জড়িয়ে আছে মৃত্তিকার। শিবাঙ্গীর প্রশ্ন আবারও পথ আটকাল মৃত্তিকার, ‘পার্লারটার নাম জানতে পারি?’ মৃত্তিকা ঘুরে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কে…কেন?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *