৬
মাথা ভর্তি ম্যাগি-ম্যাগি চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমেছে। বাঁদিকের ভুরুতে ছোট্ট একটা সিলভার রিং। প্লাক করা আই ব্রো। চোখের ওপর ডার্ক শেডের আই শ্যাডো। কাজলে ঘেরা চোখ। কালো মণিটা চোখের ওপরের পাতা থেকে আধখানা চাঁদের মতো নেমে আছে। এক কথায় যাকে ঢুলুঢুলু চোখ বলে সেইরকম। নাকের মাঝে সিলভার নোজ রিং। ঠোঁটে কালচে সবুজ রঙের লিপস্টিক। ক্যাফের আলোয় মাঝেমাঝেই কালো লাগছে। হাসলে দু-গালে টোল পড়ে। ডান কানের লতি থেকে চারখানা দুল ধার ঘেঁষে ওপরের দিকে উঠেছে। ঠোঁট বেঁকিয়ে চক চক করে চুইংগাম চিবিয়ে চলেছে দিয়া। গায়ে গামছা প্রিন্টের স্লিভলেস জামাটা একেবারে হাঁটু পর্যন্ত নেমেছে। হাঁটুর পর থেকে ফর্সা মোম পলিশ করা পা দুটো রিভলবিং চেয়ারের রড ছুঁয়ে নেমে এসেছে। বাঁ পায়ের হাঁটুটা সামান্য পিছনে মোড়া। পায়ে লম্বা হিল দেওয়া জুতো। হাল ফ্যাশনের দুবলা চেহারা। সপ্তাহে তিনদিন দিয়া তার সাধের ক্যাফেতে আসে। রবিবারটা একটু বেশি ভিড় থাকে। তাই সেদিনটা ও আসেই। সারা সপ্তাহের হিসেবটাও সেদিন দেখে নেয়। বাকি দুদিন সপ্তাহের মধ্যে সুবিধে মত ম্যানেজ করে নেয়।
-এই শুভায়ূ
… পাশেই ট্রেতে খাবার সাজিয়ে চলা ছেলেটিকে ডাকল দিয়া।
-হ্যাঁ ম্যাডাম?
ছেলেটি এগিয়ে আসতে দিয়া হিসেবের ফাইলে রাখা একটা প্রিন্ট আউট দেখিয়ে বলে, ‘এখানে গ্লাসের দামটা কীসের জন্য?’ ছেলেটি জানায়, দুদিন আগে এক কাপল এসেছিল তাদের বাচ্চাকে নিয়ে। সেই বাচ্চাটি খেলতে খেলতে একটা গ্লাস ভেঙে ফেলে। কাস্টমার সেই দামটাই দিয়েছে। এর ফাঁকেই একজন কাস্টমার এসে পাশের মেয়েটিকে ক্যাশ পেমেন্ট করে। শুভায়ু হিসেব বুঝিয়ে ফিরে যায়। ঠিক তখনই দিয়া শুনতে পায় একটা ডাক। সামনে দাঁড়িয়ে কে যেন চাপাস্বরে ডাকল। চোখ তুলে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় সে। ‘হোয়াট আ সারপ্রাইজ! পথ ভুলে এলি নাকি?”
সুস্মিতা এসেছে। মাথার চুল তেমন করে গুছিয়ে বাঁধা নেই। মনে হচ্ছে দৌড়ে কোনওরকমে এসে হাজির হয়েছে। শাড়ি পরেছে। কিন্তু সুস্মিতা যা গোছানো মেয়ে তাতে তার শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয়ে থাকাটা একটু অস্বাভাবিক। সুস্মিতার নিজের বুটিক আছে। আর সেটা যথেষ্ট নাম করা । এছাড়া আজকাল মেকওভারের ক্লাসও করাচ্ছে আলাদা করে। সেরকমই শুনেছিল দিয়া। কিন্তু সুস্মিতা দিয়ার কথার পরেও চুপ করে আছে। কীরকম যেন থমথমে ভাব সারা মুখে। ‘কিছু হয়েছে?’ এবার সুস্মিতা চাপাস্বরে বলল, “শুনিসনি কিছু?”
-কী?
ক্যাফের এক কোণে একটা টেবিলে গিয়ে বসে দুই বন্ধু। হ্যাঁ, এরা দুজন বন্ধুই ছিল। সুস্মিতা নিজের মোবাইলে চট করে একটা লিঙ্ক খুলে দেখায় দিয়াকে। একটা নামী নিউজ পোর্টালে বেরিয়েছে অরুণার খুনের খবরটা। হেলান দিয়ে বসেছিল দিয়া। পড়ামাত্রই মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেল তার। দিয়ার চোখে আতঙ্ক। অস্ফুটে বলল, ‘হাউস ইট পসেবল?”
-অরুণা আমায় দুদিন আগেই কল করেছিল। তখন প্রায় মাঝরাত। -অরুণা তোকে ফোন করেছে?
-হ্যাঁ।
-বাট ও তো তোর সঙ্গে কথাই বলত না ।
-ওর বিয়ের পর এই প্রথম আমার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করল।
-কী বলেছিল?
-আমায় ব্লেম করছিল। আমি নাকি ওকে ফোন করে বেড়ালের ডাক শুনিয়ে ব্ল্যাকমেল করছি। তুই নাকি বলেছিস আমি বেড়াল পুষেছি । -হ্যাঁ। বলেছি। তোদের কম্পাউন্ডেই থাকেন ঋতজা নন্দী। আমার পরিচিত। একদিন কথায় কথায় তোর বুটিকের প্রশংসা করছিল। তখনই তোর কথা ওঠাতে ও বলে তুই একটা বেড়াল পুষেছিস। সেটা নিয়ে তোর আশেপাশের কয়েকজন আপত্তিও করেছে । এইসব । তারপরেই অরুণা আমায় কল করেছিল ওর ওই রহস্যময় ফোনের ব্যাপারে। আমি এমনি ইয়ার্কি মেরে বলেছিলাম যে দ্যাখ হয়তো সুস্মিতা তোর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করতে চাইছে। নিজে কথা বলতে পারছে না বলে ওর বেড়ালকে দিয়ে বলাচ্ছে।
সুস্মিতা চোখ ঘুরিয়ে কপালে হাত দিয়ে বসল। তারপর হালকা রাগ উগরে দিয়ে বলে উঠল, ‘আর এই জন্য ওর ধারণা হয়েছে আমি নাকি ব্ল্যাকমেল করছি ওকে
-তুই যদি না হোস তাহলে কে ওকে ফোন করত?
-আমি কী করে জানব?
চাপাস্বরে খিঁচিয়ে উঠল। দিয়া বিড়বিড় করল, ‘যে ফোন করত তাহলে সেই কী খুন…!’ সুস্মিতার দুচোখে উপচে উঠল ভয়। ‘যদি তাই হয় তাহলে সে বেড়ালের ডাক শোনাবে কেন?” শব্দগুলো উচ্চারণ করতেই দিয়া আর সুস্মিতা একে ওপরের দিকে পাথুরে স্থির দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইল। ধীরে ধীরে দুজনের চোখই কিঞ্চিৎ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। কিন্তু কেউই কাউকে কিছু বলল না। কেবল নীরবে চেয়ে রইল। কয়েক পলকের বিরতিতে খানিকটা কষ্ট করেই হেসে ফেলল দিয়া। বলা ভালো, ইচ্ছে করেই হাসির ভান করল। বুকের ওপর যে ভয়ের পাথর চেপেছে তাকে এভাবেই হালকা করতে বলে উঠল, ‘আমরা না সুস পাগল হয়ে যাচ্ছি বোধহয় জানিস! একটা সামান্য, নিতাআআআন্ত ক্ষুদ্র একটা ব্যাপারকে আমরাই অনেকটা বড় করে দেখে নিজেরা ভয় পাচ্ছি।’ সুস্মিতার আশ্চর্য লাগল। ব্যাপারটা এতটাই কি গুরুত্বহীন দিয়ার কাছে? দিয়া বলল, ‘তবে এই ভয়টা একটা ভালো কাজ করল, এতদিন বাদে তোকে আবার আমার কাছে নিয়ে এল।’
-আমি একদম ইয়ার্কির মুডে নেই বিশ্বাস কর। অরুণা যদি আর কাউকে বলে থাকে যে ও আমায় ফোন করেছে এবং আমার কাছে বেড়াল আছে। তাহলে তো পুলিশ এবার আমায় নিয়ে টানাটানি করবে।
-তুই না সেই একই রয়ে গেলি। ওপর ওপর ডোন্ট কেয়ার ভাব। যেন কত ইন্টালিজেন্ট, শার্প। এদিকে ভেতরে, আস্ত বাল।
সুস্মিতার ভয়ার্ত মুখে চিলতে অভিমান চলকে উঠল। যেন মৌন থেকে দিয়ার কথাকেই সমর্থন করল।
-পৃথিবীতে কী আর কারও বেড়াল নেই? তুই একাই বেড়াল পুষিষ? নাকি অরুণার সঙ্গে যার যার সম্পর্ক আছে তাদের প্রত্যেকে তুই চিনিস? তাছাড়া, তমালের সঙ্গে রিলেশনটা ইদানিং বেশ খারাপই যাচ্ছিল। যদি কিছু করার হয় তাহলে…
-না ৷
বেশ জোরালো গলায় প্রতিবাদ করে উঠল সুস্মিতা। ‘তমাল কিছুতেই এ কাজ করতে পারে না।’ দিয়ার ঢুলুঢুলু চোখদুটো বিস্ময়ে জ্বলজ্বল করে ওঠে, ‘বাআআআবা! এখনও?’
-দ্যাখ দিয়া, কে কীরকম মানুষ আমি খুব ভালো করে জানি। আর তাছাড়া এটা হওয়ারই ছিল। সব জায়গায় পরের ধনে পোদ্দারিটা চলে না। দিয়া বুঝতে পারে সুস্মিতার এই উষ্মার কারণ। সুস্মিতার হাতের ওপর হাত রেখে শান্ত করে দিয়া। বলে, ‘একবার মৃত্তিকাকে জানাই ।’
-ওর ছোট বাচ্চা। বেকার টেনশন দিয়ে লাভ নেই। খবরটা তো সব জায়গায় দেখাচ্ছে। ও নিশ্চয়ই জানতে পারবে। আননেসেসারি বেড়ালের কথাটা বলে আর…
দিয়া ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। সুস্মিতা ঠিকই বলেছে।
এত রাতেও বুড়োগুলোর চায়ে চুমুক দেবার ধরণ দেখলে বোঝাই যায় না রাত সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ঠোঁটের ভিতর চা টানার সুড়ুৎ সুড়ুৎ শব্দে বেশ রাত অব্দি গমগম করে সুরিলেন ও আশেপাশের গলিগুলো। আজ বিকেলের পর থেকে বৃষ্টি হয়নি বলে আয়োজনটা আরও জমাটি। তার ওপর চায়ের সঙ্গে গোপালের চপ। ওফ! ভরা শ্রাবণের সন্ধে জমে ক্ষীর। এই আসরের নিত্যসঙ্গী মিশ্র পুরোহিত। পুজো সেরে মন্দির থেকে ফেরার পথে এই আড্ডায় আসা চাই-ই তার। কোনওদিন যদি পাশ কাটিয়ে কাজের বাহানায় চলে যেতে যায় দাস আর গাঙ্গুলি তাকে টেনে বসাবেই। আজকের আসরে চায়ে-চপে মুখ ভরিয়ে এক ষাটোর্ধ্ব বললেন, ‘ব্যাপার কী বল তো ভটচায?’
-কীসের কী ব্যাপার ?
ভটচাযও ভুরু বেঁকিয়ে প্রশ্ন করলেন। বৃদ্ধ বললেন, ‘অলিতে গলিতে মামাদের উৎপাত হচ্ছে কেন?’ এমন হেঁয়ালি ভরা কথা হজম করতে একটু সময়ই লেগে গেল। ‘মামাদের উৎপাত মানে? কী বলছ খোলসা করে বল তো গাঙ্গুলি।’
-আরে বাবা পাশের গলিতেই আজ সকাল থেকে মুহুর্মুহূ পুলিশ আসছে দেখছ না?
আসরে উপস্থিত সবাই এবার বেশ অ্যাটেনশন মোডে। এদের মধ্যেই আরেক বয়স্ক বললেন, ‘ঠিক বলেছ মহিম, আমিও দেখলুম। বিকেলে ওই বিমল না তমাল কী যেন নাম গো ছেলেটার, তাকে তুলে নিয়ে গেল। আরে ওই বাঁডুজ্যেদের বাড়ির ছেলেটা। মাথার ওপর খোঁচা খোঁচা চুল। গোঁফ নেই এদিকে থুতনির কাছে রামছাগলের মতো দুগাছি দাড়ি ঝুলছে।’
-তমাল ব্যানার্জি!
বিড়বিড় করলেন মিশ্র পুরোহিত। গাঙ্গুলি বললেন, ‘আপনি কিছু জানেন নাকি মিশ্রঠাকুর? ও বাড়ির বউ তো নাকি আপনার মন্দিরে আসা যাওয়া করত।’
-হ্যাঁ কালকেই তো এসেছিল। ওদের স্বামী-স্ত্রীর কিছু সমস্যা চলছে। সে নিয়েই মুষড়ে থাকত মেয়েটা।
-অ । তাই বলো । তার মানে নিগঘাত স্বামীর নামে পুলিশে নালিশ করেছে বউটা। এসে বরটাকে তুলে নিয়ে গেছে।
-ওইটে তোমার ভাগ্নে না মিশ্রঠাকুর?
দাসবাবুর কথায় মিশ্র একটু হকচকিয়েই গেলেন। গলির মাথার দিকে চাইতে দেখলেন সত্যিই মিশ্রঠাকুরের ভাগ্নে আসছে। কেমন যেন হন্তদন্ত হয়েই এদিক পানে আসছে। দাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ গো, ও কী চাকরি করে কোথাও?’
-হ্যাঁ। চাকরি না করলে এই পুজো করে কী আর সংসার চলে?
-তা কোথায় করে?
কান এঁটো করা হাসি হেসে মিশ্র বললেন, ‘তেমন কিছু না। ওই কলেজস্ট্রিটের একটা দোকানে ।’
-অ। তা ভালো।
মিশ্র উঠে পড়লেন । গলা তুলে ডাকলেন, ‘এই তিরু…. ।’ মুখ তুলে তাকাল ভাগ্নে। এগিয়ে এসে বলল, ‘তুমি এখনও বাড়ি যাওনি?’ মিশ্র বললেন, ‘না। এই যাব। কিন্তু তুই এমন হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছিস কেন? বৃষ্টিতে পিছল হয়ে আছে চারদিক। কোথায় পড়বি পা হড়কে ।
-তোমরা শোনোনি কিছু?
-কী শুনব?
পাশ থেকে এই একই কথা আরেক বৃদ্ধও বললেন। তিরু বলল, ‘পাশের গলির তমাল ব্যানার্জিকে আজ বিকেলে পুলিশে ধরেছে। ওর বউটা নাকি খুন হয়েছে।’
-হ্যাঁঃ!
শব্দটা সকলের মুখ থেকে একসঙ্গে বেরোল। তিরু আরও বলল, ‘আজ ভোরে নাকি পার্ক সার্কাসের রেল লাইনের ধার থেকে বডি পাওয়া গেছে। টিভিতে তো দুপুর থেকেই দেখাচ্ছে।
-কী বলছিস রে?
গাঙ্গুলি চোখ পাকিয়ে বলে উঠলেন। দাস বললেন, ‘আমাদের তো সবসময় সিরিয়ালই চলছে। জানব আর কী করে?’ মিশ্র টলে গেলেন। সবাই ধর ধর করে রকে বসাল। দাস বললেন, “ও মিশ্র কী হল তোমার? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’ মিশ্রঠাকুর চোখ বুজে একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘আমি বউটাকে বড় মুখ করে বলেছিলাম, ঠাকুর তোমার সব কষ্ট দূর করে দেবেন। শুধু সময়ের অপেক্ষা। ভাবতে পারিনি মেয়েটাকেই পৃথিবী থেকে দূর করে দেবেন। উফফফফ! ঠাকুর, এ তোমার কী বিচার?’
-মামা, তুমি আর এসব ভেবো না তো। বাড়ি চলো। ওঠো। এসব ভেবে তোমার প্রেশার বাড়লে দেখবে কে শুনি? চলো চলো।
তিরু তার মামাকে ধরে অতি সাবধানে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকল ।
রাত ন’টা বেজে গেছে। শিবাঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে লেক থানায় এল স্বয়ম্ভু। যোধপুর পার্ক এই থানার আন্ডারেই পড়ে। অফিসার দিব্যেন্দু পাড়িয়া অপেক্ষা করছিলেন। ‘তমালকে আনা হয়েছে?’ ঢুকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভু।
-হ্যাঁ স্যার। ইন্টারোগেশন রুমে।
-সিসিটিভির কী খবর?
-পার্ক সার্কাসের রেল লাইনের ধারে কোনও সিসিটিভি নেই স্যার।
-বাহ দারুণ। আর শিয়ালদায় অরুণার বাড়ির চত্বরে?
পাড়িয়া একটু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আসলে স্যার ওনার বাড়িটা তো গলির মধ্যে। ওখানে সিসিটিভি নেই। রাস্তায় আছে। সেখানে সারাদিনে যে কটা গাড়ি ওই গলির মধ্যে ঢুকেছে এবং বেরিয়েছে সেগুলো ট্রেস করার চেষ্টা চলছে স্যার। দুটো ট্রেস করা গেছে। কিন্তু সেই গাড়ির ড্রাইভারের বক্তব্য এবং কার বুকিং ডিটেইলস চেক করে দেখা গেছে একজন মেল প্যাসেঞ্জার আর অন্যজন ফ্যামিলি নিয়ে বেরিয়েছে। যদিও কার বুকিংটা দুজন পুরুষ মানুষই করেছিলেন। শুধুমাত্র একজন ড্রাইভারের কোনও ট্রেস নেই আপাতত। খোঁজ চলছে।
-ট্রেস নেই মানে?
-ওই গাড়ির ড্রাইভারের মোবাইল পাওয়া যায়নি। গাড়ির নম্বর দিয়ে ড্রাইভারের ফোন নম্বর বের করা হয়েছে। বাট স্যার মৌলালির আশেপাশে দেখাচ্ছে ওর লাস্ট লোকেশন। তারপরেই ফোনটা বোধহয় বন্ধ হয়ে যায়। আর কোনও ট্রেস নেই ।
স্বয়ম্ভু তার ক্লিন শেভ গালে একবার হাত বুলিয়ে কী যেন ভাবল। সেই ফাঁকে পাড়িয়াকে প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী, ‘আপনারা ওই অঞ্চলের আর কোনও সিসিটিভির ফুটেজ চেক করেছেন? মানে আশেপাশের আর কোনও গলি বা রাস্তার?’
-না আর কোনও গলির করিনি কারণ পাশের গলিগুলোতেও সিসিটিভি নেই। যা আছে গলির মোড়ে, রাস্তার ওপর। আর তাছাড়া যে গাড়িটার ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না সেটা গলি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে মৌলালির দিকেই গেছে।
আবারও শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘বাই দ্য ওয়ে, ভিক্টিমের ফোনের কোনও ট্রেস পাওয়া গেছে?’
-না। সেটাও রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের কাছে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
-রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড!
অবাক হয়ে রাস্তার নামটা আওড়াল স্বয়ম্ভু।
-হ্যাঁ স্যার।
-ধরে নিচ্ছি অরুণা বাপের বাড়ি মানে যোধপুর পার্ক আসার জন্য গাড়িতে উঠেছিল। তাহলে তো সেটা মৌলালি থেকে বাঁদিকে। আর মৌলালি থেকে ডানদিকে বেঁকে গেলে রফি কিদ …
বাকি কথাগুলো স্বয়ম্ভুর মনের মধ্যে তালগোল পাকাতে থাকল। -স্যার, অরুণা কি অন্য কোথাও যেতে পারে?
শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে।
-সেটা যদি যায়ও তাহলে তো ফোন বন্ধ হবার কথা নয়। ওদিকে যাবেই বা কেন? তার মানে যা ঘটার সেটা এই মৌলালি চত্বর থেকে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের মধ্যেই ঘটেছে। এদিকে লাশ পাওয়া গেল পার্ক সার্কাস রেললাইনের ধারে। আচ্ছা ওই নম্বরের গাড়িটা শিয়ালদা থেকে পার্ক সার্কাস যাবার পথে কোনও জায়গায় পাওয়া যায়নি?
-স্যার, গাড়িটা সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ শিয়ালদায় দেখা গেছে। তারপর রাত আটটা এগারো মিনিটের পর লোকেশন ট্রেস করা যাচ্ছে না। কারণ তখন ফোন সুইচড অফ। এরপর থেকে গাড়িটার কোনও ট্রেস নেই । অ্যাপ ক্যাব কোম্পানির সঙ্গেও কন্ট্যাক্ট করেছি। বাট তাদের কাছেও এটা ধোঁয়াশা ড্রাইভারও কোনও যোগাযোগ করেনি। তাই সেই গাড়িটাকে যদি পার্ক সার্কাসের দিকে গেছে কিনা ট্রেস করতেই হয় তাহলে শিয়ালদা থেকে যে যে রাস্তা দিয়ে ওদিকে যাওয়া যেতে পারে সেদিকের প্রত্যেকটা সিসিটিভি চেক করতে হবে সন্ধে থেকে রাতের টাইম পর্যন্ত। সেটা স্যার খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মত অবস্থা। যথেষ্ট টাইম টেকিং। তার ওপর বৃষ্টি। ঝাপসা ছবি। তাছাড়া অনেক জায়গায় সিসিটিভি আছে কিন্তু কাজ করে না।
একদমই ভুল কথা বলেনি দিব্যেন্দু পাড়িয়া। স্বয়ম্ভু শুধু চিন্তান্বিত হতে একবার হুম বলল। তারপরেই বলল, ‘পাড়িয়াবাবু, আপনি এদের কল রেকর্ডিং আনার ব্যবস্থা করুন।’ টকের জ্বালায় পালিয়ে এসে তেঁতুল তলায় বাস। যদিও বা সিসিটিভির হ্যাপা কাটানো গেল, এ আবার আরেক ঝামেলা ঘাড়ে চাপল। ধুস শালা। মনে মনে আওড়ালেন পাড়িয়া। বেশ চাপ খেয়ে বললেন, ‘বেশ চাপের স্যার। তাও ট্রাই করছি।’
-আমাদের লাইফটাই চাপের দিব্যেন্দুবাবু। কাজটা করতেই হবে। সবার আগে এদের কল লিস্ট জোগাড় করে কালকের মধ্যে আমাকে দিন।
-শিওর স্যার।
-আর শুনুন, যে যে ফুটেজগুলো পেয়েছেন সেগুলোর একটা কপি আমায় দেবার ব্যবস্থা করুন।
-ওকে স্যার। এখুনি দিচ্ছি।
-ওহো ভালো কথা, তমালের ফোন থেকে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল?
-একটা বিশেষ নম্বর থেকে প্রতিদিন ফোন আসত, যেত এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথাও হয়েছে। স্পেশালি রাতের দিকে বেশি কথা হত।
-নম্বরটা কার?
-তর্পণা মিত্র নামের এক মহিলার। একজন ফ্লোরিস্ট। দেশপ্রিয় পার্কে ওনার নিজের দোকানও আছে।
-ফ্লোরিস্ট।
এই শব্দটা শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু দুজনে একসঙ্গে উচ্চারণ করল। পাড়িয়াবাবু একটু থমকেই গেলেন। ‘কী হল স্যার? চেনেন এনাকে?”
-এখনও না। তবে কাল ঠিক চিনে নেব। এখন চলুন জামাই আদরের ব্যবস্থা করি 1
তমাল আর স্বয়ম্ভুর মধ্যে মাত্র এক টেবিলের দূরত্ব। পাশে আলোআঁধারের মাঝে দুহাত পিছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিবাঙ্গী। দু-মিনিট কাটতে চলেছে স্বয়ম্ভু এসে চেয়ারে বসেছে। এর মধ্যে একটা প্রশ্নও করেনি তমালকে। তমালও ঢুঁ শব্দটিও মুখ থেকে বের করেনি। শুধু বিপুল অস্বস্তিতে পিটপিট করে চোখ তুলে দেখছে। তার গোয়েন্দা শ্যালকটি ঠিক কী করতে চাইছে বুঝতে পারছে না। এর মধ্যেই দুবার ঘাম মুছে নিয়েছে তমাল। কেউ কিচ্ছু বলছে না। ইন্টারোগেশন রুমটা যেন একটু বেশিরকম থমথমে। বাধ্য হয়ে তমালই মুখ খোলে, ‘আমি অরুণাকে মারিনি। বিশ্বাস কর ভোলাদা।’ এতক্ষণের নীরব স্থির মূর্তিভাব এক নিমেষে চুরমার হয়ে যায় এই ভোলাদা নাম শুনে। একেবারে থুথু ছেটাবার মতো করে বলে ওঠে স্বয়ম্ভু, ‘এই শাট আপ। তোমার মুখ থেকে এই, এই নাম আমি শুনতে চাই না। আমি শুধু ভাবছি আমার কপালটার কথা। তোমার ভালো কোনও জ্যোতিষী জানা আছে তমাল? জানো? বলো না। আমি দেখাব। এসবে বিশ্বাস নেই আমার। কিন্তু তাও দেখাতে চাই। তোমার বউকে কে এইভাবে ব্রুটালি মার্ডার করল সেটা তো জানো না। অ্যাটলিস্ট একটা জ্যোতিষীর সন্ধান তো দাও। এক সময় যাকে বাড়িতে ডেকে পরম আদরে জামাইষষ্ঠীর ভুঁড়িভোজ করিয়েছিলাম আজ সেই জামাই কিনা তার স্ত্রীয়ের খুনের সন্দেহভাজন হয়ে আমার সামনে ইন্টারোগেশন রুমে বসে আছে। এই দিনটা আমায় কেন দেখতে হল? কোন পাপে? আমি জানতে চাই। আমায় একটা জ্যোতিষীর সন্ধান দাও তমাল।’ এই সময় ঠিক কী বলা উচিত? উত্তরটা কী দেবে? নাকি চুপ থাকবে? চুপ থাকলে রুলের বাড়ি যে পড়বে না তার গ্যারান্টি কোথায়? তাই কতকটা ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠল তমাল, ‘আমিও বিশ্বাস করি না। তবে…’।
-তবে?
ভুরু বেঁকিয়ে মুখটাকে এগিয়ে আনল স্বয়ম্ভু ।
-অরুণা একজনকে চিনত। ও যেত তার কাছে।
-অরুণা! জ্যোতিষীর কাছে যেত?
রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ার মতই তথ্য পেল স্বয়ম্ভু। তমাল ওপর নীচে ঘাড় নাড়ল। ‘সুরিলেনের মোড়ে একটা বড় শনি মন্দির আছে। তার যে পুরোহিত সে নাকি এসব ওই হাত-ফাত দেখে বলতে পারে। আমাকে ও বলেছিল নিয়ে যাবে। আমি রাজি হইনি। ও প্রতি শনিবার সেখানে যেত।’
-গপ্পো দিচ্ছ শালা? ও সরি, তুমি কেন শালা হবে? আমি তো তোমার শালা। যে মেয়েটা কোনওদিন দুর্গাপুজোর অঞ্জলিই দিল না, ঢপের চপ বলে উড়িয়ে দিত। সে নাকি প্রতি শনিবার শনি মন্দিরে গিয়ে হাত দেখাত?
-বিশ্বাস না হলে খোঁজ নাও। অরুণা শেষের দিকে পালটে গিয়েছিল। কীসব ব্রতটত করতেও শুরু করেছিল।
-কেন?
তমাল চুপ। স্বয়ম্ভূ আবার অত্যধিক ঠান্ডা গলায় বলে, “চুপ করে থেকো না তমাল। তোমার বউ, যে কিনা আমারও ছোট বোন সে এখনও কয়েকটা বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে ঠান্ডা ঘরে শুয়ে অপেক্ষা করছে বিচারের বলোওওও।’
-বাচ্চার জন্য। অরুণা মা হতে চেয়েছিল।
বুকের ভিতরে শৈত্যপ্রবাহ চলছিল স্বয়ম্ভুর। হঠাৎ উষ্ণতায় কিছুটা বরফ যেন গলে যায়। একটা বাচাল মেয়ে, যে সব সময় উড়ে উড়ে বেড়াত। সংসারে মন ছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে মস্তি, পার্টি এমনকি মদ্যপান করে বেহেড মাতাল হয়েও বাড়ি ফিরেছিল দু-তিনবার। মাসি-মেসো স্বয়ম্ভুর মাকে ফোন করে মেয়ের নামে বদনাম পর্যন্ত করেছে। বিয়ের দেড় বছর কাটার পরেও যে বাচ্চা নেবার নাম শুনলে মুখ ব্যাঁকাত সেই মেয়ে কিনা মা হতে চেয়েছিল? এই আবেগ, অনুভূতি কবে কীভাবে অরুণার মধ্যে সঞ্চারিত হল? অরুণা কি তবে সত্যিই পাল্টাচ্ছিল?
-প্রবলেম ছিল কিছু?
-জানি না। বলেছিলাম ডাক্তারের কাছে চলো। ও যেন কোথা থেকে জানতে পেরেছিল ওই পুরোহিতের কথা। সে বলেছিল অরুণার সব দুঃখ চলে যাবে। ও মাও হতে পারবে। শুধু একটু অপেক্ষা করতে হবে। ও সেই অপেক্ষাটাই করছিল। আমি বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম। আজ এই চরণামৃত খাওয়াচ্ছে, পরের সপ্তাহে ঠাকুরের সিন্নি খাওয়াচ্ছে। যত সব রাবিশ।
-আর ঠিক সেই সময়েই তোমাদের দূরত্বের সুযোগ নিয়ে প্রবেশ করলেন তৰ্পণা মিত্র। তাই তো?
তমাল চমকে উঠল।
-বাবা! চমকে উঠলে যে জামাই! ভেবেছিলে ডুবে ডুবে জল খাবে আর কেউ কিছু বুঝতে পারবে না? বলো…।
-তর্পণার সঙ্গে আমার অনেকদিনের আলাপ ।
-কীভাবে?
-ফেসবুকে ৷
-আলাপের কারণ?
-সবার আগে ও-ই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট…
-ও-ই… বাহ! তারপর?
স্বয়ম্ভু ‘ও’ সম্বোধনটার ওপর চাপ দেওয়ায় খানিক থেমে গেল তমাল। চোখ নামিয়ে তুতলিয়ে বলল, ‘তর্পণাই নানান ফুলের ছবি পাঠাত। পোস্ট করত। মাঝেমধ্যে আমি লাইক করতাম। একদিন মেসেঞ্জারে আমায় একটা ইনভিটেশন পাঠাল। দেখলাম, দেশপ্রিয় পার্কে ও একটা ফুলের দোকান করেছে। সেটারই ইনগ্রেশন হবে। অনেকবার করে লিখল আমি যেন অবশ্যই আসি ফ্যামিলি নিয়ে। কিন্তু আমি যেতে পারিনি। তার কিছুদিন পরেই আমাদের অ্যানিভার্সারি ছিল। সেদিন সকালে হঠাৎ একজন ডেলিভারি বয় এসে দুর্দান্ত একটা ফুলের বোকে দিয়ে গেল। আমার নামেই এসেছিল। কার্ডে লেখা ছিল, ইনগ্রেশনে তো এলেন না তাই আমার পক্ষ থেকে আপনাদের বিবাহবার্ষিকীতে ছোট্ট একটা উপহার। নাম ছিল না। কিন্তু আমি বুঝে গিয়েছিলাম। অরুণা নামটা জানতে পারার পর ব্যাপারটা খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। একজন অপরিচিতা মেয়ে সে আমাদের হঠাৎ গিফট পাঠাবে এটা অবিশ্বাস্য। অরুণা ভাবতে শুরু করে মেয়েটির সঙ্গে আমার বহুদিনের আলাপ। আমি লুকিয়ে যাচ্ছি। নইলে বাড়ির ঠিকানা জানবে কেমন করে?’
-তুমি দিয়েছিলে?
-না। কোনওদিন তৰ্পণা ঠিকানা চায়ওনি। পরে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম তখন বলেছিল আমার এক কলিগের কাছ থেকে চুপি চুপি অ্যাড্রেসটা ‘জেনেছে।
-তোমার কলিগ?
স্বয়ম্ভুর কপালে গভীর ভাঁজ।
-হ্যাঁ। আসলে আমাদের এক কলিগের ফেয়ার ওয়েলে তর্পণার দোকান থেকে একটা ফ্লাওয়ার বোকে অর্ডার করেছিলাম। অর্ডারটা প্রিয়মের নম্বর থেকেই হয়েছিল। পরে প্রিয়মের থেকে জেনেছি ব্যাপারটা সত্যি। তৰ্পণা আমাদের সারপ্রাইজ দিতেই ওর কাছ থেকে আমার অ্যাড্রেস জেনেছিল। তাছাড়া এটা ওদের দোকানের একটা প্রোমোশনাল প্ল্যান। আরও অনেকের কাছেই এরকম সারপ্রাইজ গিফট গেছে বলে শুনেছি।
-তারাও কি তোমার পরিচিত?
-না ।
-তাহলে বুঝলে কী করে কথাটা সত্যি? বিল বা রিসিপ্ট কিছু দেখিয়েছে?
দুপাশে ঘাড় নাড়ল তমাল। স্বয়ম্ভু হাসল। ‘একটা মেয়ে তোমাকে পটাতে চাইল আর তুমিও অমনি পটে গেলে।’
-প্রত্যেকদিন যদি তোমার কানের গোড়ায় কেউ বলতে থাকে তর্পণার সঙ্গে তুমি প্রেম করো, ওর সঙ্গে তোমার প্রেমের সম্পর্ক, তুমি ওর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রেখে চলছ আর নিজের বউকে ঠকাচ্ছ। রোজ রোজ এই নিয়ে অশান্তি, কান্নাকাটি। অথচ সত্যিই সেরকম কিছু নেই তাহলে তোমার কীরকম ফিলিংস হবে বলো তো?
-ও আচ্ছা। তার মানে অরুণা বারবার তোমার কানের কাছে তর্পণার সঙ্গে প্রেম, তর্পণার সঙ্গে প্রেম বলে গজগজ করেছে, অশান্তি করেছে বলে বিরক্ত হয়ে তুমি ওর সঙ্গে প্রেম করতে শুরু করেছ? তাহলে কেউ যদি তোমার কানের কাছে বারবার কাঁদুনি গেয়ে, অশান্তি করে বলে যে তোমার বউকে সরিয়ে দাও, তোমার বউকে মেরে ফেলো তাহলে তুমি সেটাই করবে!
চিৎকার করে ওঠে তমাল, ‘না না মিথ্যে কথা। আমি অরুণাকে মারিনি।’ সমানভাবে গলা তুলে স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘কিন্তু তুমি তো সেরকমই বলছ তমাল!’
-এটা তুমি এইভাবে ইন্টারপ্রেট করছ।
-বেশ তো। তাহলে আসল কথাটা বলো। কে খুন করল?
-আমি জানি না। বিশ্বাস কর আমি জানি না। হ্যাঁ, এটা সত্যি আজ তর্পণার জন্য আমার একটা সফট কর্নার আছে। কিন্তু তাই বলে অরুণাকে….! একটা সময় আমি সত্যিই ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম ভোলাদা।
-এই শাট আপ। বলেছি না, এই নামটা তোমার মুখে মানায় না । -সরি। বাট আমি খুন করিনি। বিলিভ মি । -শিবাঙ্গী ।
-স্যার।
-একবার পাড়িয়াকে ডাকো তো।
-এখুনি ডাকছি ।
শিবাঙ্গী বেরিয়ে যেতেই তমালের দিকে কঠিন লাল চোখে চেয়ে স্বয়ম্ভু বলে, ‘তমাল, তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। আর সেটা আমিই করছি। অফিসিয়ালি । এই অঘটনটা তুমি যদি সত্যিই ঘটাও তাহলে বেশিদিন বাইরে থাকবে না। যাবার আগে নিজের ফোনটা নিয়ে নেবে।’ অনেকক্ষণ একটা শ্বাস আটকে বসেছিল তমাল। এবার সেটা ছাড়ল। পাড়িয়াকে নিয়ে ঢুকে এল শিবাঙ্গী । ‘স্যার ডাকছিলেন?’ পাড়িয়ার প্রশ্নে উঠে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। ‘হ্যাঁ। তমালকে আপাতত ছেড়ে দিন। আর ওর ফোনটাও দিয়ে দিন।’
-ছেড়ে দেব?
পাড়িয়া অবাক হয়ে বললেন। ‘হ্যাঁ দেবেন।’ গোয়েন্দার হুকুমের ওপর প্রশ্ন তোলায় একটু ক্ষুন্নই হয়েই উত্তরটা দিল স্বয়ম্ভু। বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে ‘ওকে স্যার’ বললেন পাড়িয়া। ঠোঁটের কোণায় হাসিটা রেখে বুঝিয়ে দিলেন যে গোয়েন্দার আত্মীয়কে যে ধরে রাখা যাবে না সেটা তিনি জানতেন। স্বয়ম্ভু বুঝে ফেলল পাড়িয়ার মনের কথা। কিন্তু কিছু বলল না। যাবার আগে তমালকে বলল স্বয়ম্ভু, ‘তদন্ত চলাকালীন স্টেশন লিভ করবে ‘না।’
-অরুণাকে কখন…?
লজ্জায় আর প্রশ্নটা পুরো করতে পারল না তমাল। স্বয়ম্ভুও মাথা নেড়ে উত্তর দিল, ‘তোমার হাতে আমরা কেউই অরুণাকে হ্যান্ডওভার করব না। কাল সকালে যোধপুর পার্কের বাড়িতে পাঠানো হবে। সেখানে এসো।’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল তমাল। শিবাঙ্গীকে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, ‘কী মনে হল শিবাঙ্গী?’ একটু ভেবে জবাব দিল, ‘সম্পর্ক খারাপ হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই লোকের পক্ষে খুন করাটা…’ মুখের নেতিবাচক অভিব্যক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে তমালের পক্ষে খুন সম্ভব নয়। ‘তবে…’ আরও বলল শিবাঙ্গী, ‘তর্পণা করাতেই পারে। মানে চান্স আছে। সে কেমন মেয়ে এখনও আমরা জানি না। তবে আরও একটা ব্যাপার খটকা লাগছে স্যার।’
-পায়ের নীচে পাতার চিহ্ন!
-হ্যাঁ স্যার।
-দেখো তৰ্পণা যদি ডেঞ্জারাস কোনও খুনি হয় মানে যারা মানুষ মেরে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ জানায়, আমায় ধরে দেখা শালা পারিস কিনা, এমন হলে সে পাতা আঁকতেই পারে নিজের পরিচয়ের সংকেত হিসেবে। কিন্তু, সে সম্ভাবনা নিতান্তই কম। কারণ ও খুব ভালো করেই জানে তমালের কাছ থেকে বা অরুণার আগের বলা কথা থেকে ওর নামটাই সবার আগে উঠে আসবে।
কথার ধরতাইটা শিবাঙ্গীই ধরল। ‘তো সেক্ষেত্রে এমন কেউ মেরেছে যে তর্পণাকে ফাঁসাতে চাইছে!”
-হুম! কিন্তু অরুণাকে মেরে তর্পণাকে ফাঁসাতে চাইবে কে? এদের সাথে তার সম্পর্কই বা কী?
-পুরনো কোনও বন্ধু!
-বন্ধু না শত্রু?
-একটা মানুষের গোপন থেকে গোপনতম তথ্য জানতে হলে আগে বন্ধু হতে হয়।
স্বয়ম্ভু ঠোঁট বেঁকিয়ে আড়চোখে চেয়ে হাসল। বলল, ‘আমার সঙ্গে থেকে থেকে বুদ্ধিটা বেশ খুলেছে দেখছি।’ শিবাঙ্গীও অমনি কপট অভিমানে বলে বসল, ‘তবুও তো মাংসের খিচুড়ি খেতে আমায় ডাকেন না।’ চোখ পাকায় স্বয়ম্ভু। বলে, ‘চলো তোমায় বাড়িতে নামিয়ে দিচ্ছি।’ শিবাঙ্গী বলল, ‘দরকার হবে না স্যার। আমি চলে যেতে পারব।’
-আমি জানি। তবু আমিই পৌঁছে দেব। নেমন্তন্ন না করার পাপটা যদি একটু হলেও কমে। চলো ।
বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়েও এমন করে রসিকতা করার গুণটা বেশ ভালো লাগে শিবাঙ্গীর। আর একটিও কথা না বাড়িয়ে গুটিগুটি স্বয়ম্ভুকে অনুসরণ করল শিবাঙ্গী।
বাড়িতে ফিরে ঘুমোতে পারল না স্বয়স্তু। সুচিত্রা দেবীর সঙ্গে ফোনে এক চোট কথা বলে মাসি-মেসোর অবস্থা জানতে চাইল। তারপর স্নান সেরে আবার ল্যাপটপ খুলে বসল। থানা থেকে দেওয়া পেনড্রাইভটা লাগাল। সিসিটিভি ফুটেজগুলো চালিয়ে ভালো করে দেখতে থাকল । গাড়িটা শিয়ালদার গলি থেকে বেরিয়ে ডানদিকে টার্ন নিল। কিছুটা যেতেই সিসিটিভির নাগালের বাইরে চলে গেল। ভিডিয়ো ফুটেজটা খানিকক্ষণ আগুপিছু করে, জুম করে ভালোভাবে দেখতে থাকল। তারপর বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে দিল। ফোনটা হাতে তুলে কল করল। ‘এত রাতে ফোন করার জন্য এক্সট্রিমলি সরি দিব্যেন্দুবাবু।’ ফোনের ওপার থেকে বিনয়ের সঙ্গে উত্তর এল, ‘না না স্যার, নো প্রবলেম, প্লিজ বলুন।’ একটা সময়ে বয়সে বড় ব্যক্তির থেকে স্যার সম্বোধনটা শুনতে বেশ অস্বস্তি হত। এখন স্বয়ম্ভুর অভ্যেস হয়ে গেছে। ‘আপনি কালকেই মৌলালি চত্ত্বর থেকে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড হয়ে গাড়িটা কোনদিকে গেছে তার সিসিটিভি ফুটেজগুলো জোগাড় করুন। যদি গলির ভেতর ঢুকে পড়ে তাহলে নাও পেতে পারেন। দেখুন কতটা পান?’
-ওকে স্যার।
-ও হো শুনুন, মৌলালি নয়। শিয়ালদা থেকে মেন রোডের ওপর যে কটা সিসিটিভি আছে সবকটার ফুটেজ আমার চাই ।
-ওকে স্যার।
ফোনটা কেটে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল স্বয়ম্ভু। সারাদিনের ধকলের পর বিছানায় পিঠটা দিতেই শরীরের পেশিগুলো যেন সমস্বরে ‘আআআআহহহ!’ বলে শ্বাস ছাড়ল। ঠিক তখনই আবার মোবাইলটা বেজে উঠল। শিবাঙ্গী কলিং। এত রাতে শিবাঙ্গীর ফোন! ‘হ্যাঁ বলো।’ ফোনের ওপার থেকে শিবাঙ্গী বলল, ‘সরি স্যার এত রাতে ডিস্টার্ব করছি।’
-ও ডিস্টার্ব করতে ফোন করেছ? তাহলে গুড নাইট! কাল কথা হবে।
-না না স্যার শুনুন ।
-বলছি তো বলো।
-ওই ড্রাইভারের ট্রেস পাওয়া গেছে।
-কোন ড্রাইভার?
-ওই যার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
স্বয়ম্ভু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসে। ‘কীভাবে? কোথায়?’
-আজ বিকেলে কবরডাঙ্গা থেকে গাড়ি আর ড্রাইভারকে উদ্ধার করা হয়।
-ও বাবা! সে তো সাউথ।
-হ্যাঁ স্যার। শুধু তাই না, সকাল থেকে গাড়িটাকে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকাল লোক গাড়ির কাচের মধ্যে উঁকি মেরে দেখে ড্রাইভার সামনের সিটের নীচে গুটিয়ে পড়ে আছে। ভয় পেয়ে লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। সেখান থেকে লোকটাকে উদ্ধার করে পুলিশই বাঙ্গুর হসপিটালে ভর্তি করে। খুবই খারাপ অবস্থা। জ্ঞান ফেরেনি।
-এক সেকেন্ড শিবাঙ্গী। সামনের সিটের নীচে লোকটা পড়েছিল?
-হ্যাঁ সেরকমই তো বলল ওর বাড়ির লোক ।
-তুমি বাড়িতেও যোগাযোগ করেছিলে?
-হ্যাঁ স্যার। আসলে আমার এক বন্ধু ওই ক্যাব কোম্পানিতে কাজ করে। গাড়ির নম্বর দিয়ে আমি ওকে বলে রেখেছিলাম। কোনও খবর পেলেই জানাবি। ও আমায় আধঘণ্টা আগে ফোন করে বলল পুলিশ নাকি ড্রাইভারের ফোন খুঁজে না পেয়ে কোম্পানিকে জানিয়েছিল। গাড়ি থেকে ড্রাইভারের লাইসেন্স, আই কার্ড সব পেয়েছে। পুলিশ ওর বাড়িতে লোক পাঠিয়ে জানিয়েছে ওর হাসপাতালে ভরতি হওয়ার কথা। ওর বউয়ের নম্বরও নিয়েছে। সেখানে ফোন করেই সব জানলাম।
-ব্যাপারটা কীভাবে হল কিছু জানা গেছে?
-না স্যার। লোকটার খুব খারাপ অবস্থা। সম্ভবত অনেক বেশি পরিমাণে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল।
-হুম। সেটা একবার নয়, দুবার তো দিয়েছেই। তিনবারও হতে পারে নইলে এতক্ষণ ধরে অজ্ঞান হয়ে থাকার কথা নয়। লোকটা যে বেঁচে আছে এই অনেক। এক কাজ করবে শিবাঙ্গী, কাল সকালেই তুমি বাঙ্গুরে চলে যেও। নিজে দেখো। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানাও আমায়। যদি বোঝো লোকটিকে অন্য কোনও ভালো হাসপাতালে ট্রান্সফার করতে হবে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে। ড্রাইভারকে বাঁচাতেই হবে। একমাত্র ওই আমাদের বলতে পারে ঠিক কী ঘটেছিল!
-ইয়েস স্যার।
-আমায় কাল একটু শ্মশানে যেতে হবে।
-ওকে স্যার।
-আর শোনো, তুমি অফিসে যা বলো, বলো। পার্সোনালি ফোন করে সব সময় স্যার স্যার কোরো না তো। এদিকে মাংসের খিচুড়ি খেতে চলে আসছে ওদিকে আবার স্যার স্যার করে মাথা খাচ্ছে। স্বয়ম্ভুদা বলবে। -দাদা!
স্বয়ম্ভূ স্পষ্ট দেখতে পেল শিবাঙ্গীর ভুরুতে বিকট একটা ভাঁজ পড়েছে। মুখে অপছন্দের অভিব্যক্তি। ‘পছন্দ হল না?’ -না না স্যার, সরি, স্বয়ম্ভুদা ৷
-টাটা গুড নাইট।
ফোনটা কেটে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল ঠিকই কিন্তু স্বয়ম্ভুর চোখে ঘুম এল না। অজস্র প্রশ্ন ক্রমাগত পাক খেতে খেতে এক প্রবল ঘূর্ণির সৃষ্টি করেছে।
