ম্যাও – ২৯

২৯

হুড়মুড় করে ক্যান্টিনে ঢুকতে গিয়ে মারল ধাক্কা।

-কানা নাকি?

আরেকটি মেয়ে গাল দিয়ে চলে গেল। তাতে কী? দাঁত বের করে হাসতে হাসতে করালবদনী দেবী জিভ কাটলেন। মেয়েটি যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে আরও একটা সুধাবচন ঝেড়ে গেল, ‘ইডিয়ট’।

-একটা ম্যাগি দাও না কাকু ৷

ক্যান্টিনের লোকটাকে খাবার অর্ডার করা মাত্রই পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘তোর তো মাথা ভর্তি ম্যাগি। ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে নে।’ আশেপাশের সকলে হেসে উঠল। শ্রীদেবী দেখে এখানেও দুই মূর্তিমান হাজির। দিয়া আর সুস্মিতা। শ্রীদেবী পাত্তা দিল না। ম্যাগিটা নিয়ে সবে টেবিলে বসেছে সে। অরুণা টেবিল থেকে জলের বোতলটা তুলে নিল। কোণের টেবিল থেকে মৃত্তিকা ডাকল, ‘কীরে আয় এখানে।’

-দাঁড়া জলটা খেয়ে নিই ।

কাঁটা চামচে ম্যাগি তুলে ফুঁ দিয়ে মুখে তুলল শ্রীদেবী। যে যা করছে করুক। তাতে ওর কী? বোতলের ছিপি খুলে অরুণা গলায় জল ঢালল। না, গলা অব্দি পৌঁছল না। গালের মধ্যেই জড়ো হয়ে রইল। সেই জলটাই হঠাৎ ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল শ্রীদেবীর ম্যাগির বাটির ওপরে। বেশ কিছুটা ছিটকে এসে কামিজটা ভিজিয়ে দিল। ঝট করে উঠে পড়ল শ্রীদেবী। ‘এ কী করলে? ইসসস!’

-উপস, সরি রে, ভিজে গেল? যাক গে, খেয়ে নে না। বেশ স্যুপ স্যুপ লাগবে।

আবারও চাপা হাসি চারপাশ থেকে। কারণে অকারণে শ্রীদেবী হাসে বলে গাঁয়ের লোকে ওকে পাগল বলে। কিন্তু শহরের লোক তো আরও ভয়ানক পাগল। মানুষের ক্ষতি করে হা হা করে হাসে। সেদিনের মতো খাওয়া ঘুচে গেল শ্রীদেবীর। কারণ টিফিনের বরাদ্দ পয়সা আজকের মতো শেষ। মুখ শুকিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল সে ৷

কলেজ থেকে বেরোলেই বাস রাস্তা। বই ভর্তি ব্যাগটাকে পেটে চেপে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে রইল শ্রীদেবী। হঠাৎ মুখের সামনে একটা কেকের প্যাকেট চলে এল। চমকে তাকাতেই দেখে প্রিয়াংশু। ‘আমি সব দেখেছি। ওরা তোমায় খেতে দেয়নি।’ শ্রীদেবীর হাসতে ইচ্ছে করল। হাহা বা হিহি করে নয়। নীরবে। ‘নাও। এটা খাও।’ সরল শ্রীদেবী প্রিয়াংশুর হাত থেকে কেকটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে খেতে লাগল। প্রিয়াংশুও সেই সুযোগে পাশে এসে বসল। ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করে বলল, ‘এটা থার্ড পেপারের খাতা। পেপারটা বেশ টাফ। হাতের লেখা বুঝতে না পারলে বোলো।’

-না না। তোমার হাতের লেখা বেশ ভালো। আগের যে নোটসগুলো দিলে সেগুলো তো দিব্যি পড়া যাচ্ছে।

-তাই । বাহ । তাহলে তো ভালো । তাও যদি কিছু বুঝতে না পারো বোলো । টুক করে এক সময়ে তোমার বাড়িতে গিয়ে বুঝিয়ে দেব। ঘণ্টাখানেকের জন্য বন্ধু গেলে বাড়িউলি কিচ্ছু বলবে না। আমি ম্যানেজ করে নেব ।

-তোমার কথা আমি ঠাকমাকে, ভাইকে বলেছি জানো। ঠাকমা বলেছে সব সময় তোমার কথা শুনে চলতে। শহরে এসে এমন ভালো বন্ধু পাওয়া নাকি ভাগ্যের ব্যাপার ।

প্রিয়াংশু হাসে। কিছু বলে না। শ্রীদেবী আরও বলে, ‘তবে ভাইটা তো

আমার একটু বেশিই পাকা তাই জ্ঞানও দিয়ে দিয়েছে।’ -কী জ্ঞান?

-বলে কিনা, শোন দিদি, শহরে এমন অনেক ছেলে মেয়েদের পটাবার জন্য ভালোমানুষির ভাব করে। খবরদার পটিস না। সব সময় যাচাই করে নিবি।

প্রিয়াংশু এবার হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে একদিন আলাপ করতে হবে তো। কীসে পড়ে ভাই?’

-এই তো ইলেভেন হল। ভাবখানা চাকরি করা বাবুদের মতো। আসলে বাবা মারা যাবার পর আমাদের বাড়িতে ছেলে বলতে ভাই। মা খালি ওকে বলে, শোন শ্রীকুমার, তুই একমাত্র এই বংশের বাতি। তোকেই সব সামলে রাখতে হবে। এতবার বলেছে যে ওর মধ্যে বেশ একটা বাবা বাবা ভাব এসে গেছে।

আবারও হাসল প্রিয়াংশু। ‘বেশ কথা বলো তুমি।’

-তোমার ভালো লাগে আমার কথা?

-হ্যাঁ লাগে তো।

-সব্বোনাশ । আমার মা, সরযু ঠাকমা সবাই তো বলে আমার গলায় নাকি বাঁশ পুরে দেবে। এত কথা বলা ঘুচে যাবে। এই প্রথম তুমিই বললে আমি ভালো কথা বলি।

-ভালো মেয়েরা ভালো কথা তো বলবেই ।

-এই প্রথম কেউ আমায় ভালো মেয়ে বলল। তবে সরযু ঠাকমা অন্যরকম। আমায় খুব ভালোবাসে।

-আমিও তো বাসি।

-অ্যাঁ?

-হ্যাঁ। ভালো না বাসলে তোমায় এত হেল্প করি বলো?

‘ একটু ভেবে বেশ সিরিয়াস মুখে বলে ওঠে শ্রীদেবী, ‘হ্যাঁ, এটা তো ভেবে দেখিনি। যাক বাবা, শহরে তাহলে একজন কেউ আছে যে আমায় ভালোবাসে। নিশ্চিন্দি। ‘

আবারও একটা বোকাবোকা হাসি হেসে কেকটা পুরোটা সাবাড় করে দেয় শ্রীদেবী। প্রিয়াংশুর মুখটাও কীরকম যেন ভ্যাবলাকুমারের মত হয়ে যায়।

তেড়ে বৃষ্টি পড়ছে সেদিন। কারেন্ট নেই। নিজের ঘরে বাতি জ্বেলে বেশ দুলে দুলে জোরে উচ্চারণ করে পড়ছে শ্রীদেবী। কম দামী মোবাইলটা ঝনঝনিয়ে উঠল। অচেনা নম্বর।

-হ্যালো ৷

-আমি মৃত্তিকা বলছি শ্রীদেবী।

-কে?

-মৃত্তিকা। প্রিয়াংশুর বন্ধু ।

-ও হ্যাঁ বলো।

শ্রীদেবী একটু হকচকিয়ে গেল। আবার কোন বদ মতলবে ফোন করেছে কে জানে? মৃত্তিকা বলল, ‘প্রিয়াংশুর একটা বিপদ হয়েছে শ্রীদেবী। একমাত্র তুমিই হেল্প করতে পারো।’

-বিপদ! কী হয়েছে প্রিয়াংশুদার?

এতক্ষণ চেয়ারে হেলে বসেছিল। বিপদের কথা শুনেই সটান উঠে বসেছে। মৃত্তিকা বলল, ‘ওর ধুম জ্বর। বাড়িতে ওর বাবা মা কেউ নেই । দেশের বাড়ি গেছে। উঠে খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত করতে পারছে না। তুমি একটু গিয়ে ওকে ওষুধ খাইয়ে দাও। ওষুধ নেবার ক্ষমতাটুকুও নেই। রাতে বাড়ির লোক চলে আসবে। তুমি তখন চলে এসো। আমি তো অনেক দূরে থাকি তাই যেতে পারছি না।’ মহা ফাঁপরে পড়ল শ্রীদেবী। ‘কিন্তু এই বৃষ্টিতে যাব কী করে? কালকে তো পরীক্ষাও আছে।’

-বেরোলেই অটো পেয়ে যাবে।

-আসলে আমি তো চিনি না কিছু।

-অটোয় বলো সুগম পার্ক যাব। ছ’টাকা ভাড়া নেবে। তোমার বাড়ির কাছে।

-কিন্তু… এইভাবে…

আমতা আমতা করছে শ্রীদেবী। কী করবে বুঝতে পারছে না৷ শেষে মৃত্তিকাই বলল, ‘তুমি যদি না যেতে পার তাহলে অরুণাকে বলব।’ -হ্যাঁ মৃত্তিকাদি, তুমি সেটাই বরং কর।

-বেশ।

ফোন কেটে গেল। বাইরে বাজ পড়ল। বৃষ্টির ঝাটে বাইরের ছোট্ট বারান্দাটা ভিজে যাচ্ছে। শ্রীদেবীর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। প্রিয়াংশুদা এত খেয়াল রাখে ওর। আর তারই বিপদে ও যেতে পারল না!

খানিকবাদে আবার ফোন। এবারে আরেকটা অচেনা নম্বর । -হ্যালো ।

-অরুণাদি বলছি রে।

-হ্যাঁ বলো ।

-মৃত্তিকা আমায় ফোন করেছিল। কিন্তু আমিও তো যেতে পারছি না। পা মচকে পড়ে আছি। এদিকে সুস্মিতা বা দিয়া যে আসবে তারও উপায় নেই। অনেক দূরে থাকে। একমাত্র তুইই কাছে থাকিস। একটু যা না সোনা।

-আমি মানে… অরুণাদি…।

-দ্যাখ, সময়ে অসময়ে প্রিয়াংশু তোর পাশে থাকে। শহরে এসে তোকে একটা টিচারও নিতে দেয়নি। সব নোটস দিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ও তোকে ভালোওবাসে। প্রিয়াংশুর জন্য এইটুকু করতে পারবি না? রাতে ফিরে এসে বাকি পড়া করে নিবি। ছেলেটা নইলে মরে যাবে রে। কী জানি কীভাবে পড়ে আছে জানি না ।

অরুণা শ্রীদেবীর নরম জায়গায় খুঁচিয়ে দিয়েছে। বুকের মধ্যে ভয় থাকলেও রাজি হল সে।

কাশতে কাশতে প্রিয়াংশু দরজা খুলে দেখল শ্রীদেবী এসেছে৷ ভিজে একশা হয়ে গেছে। এত বৃষ্টি কী আর বাঁধ মানে? সঙ্গে এলোপাথাড়ি হাওয়া । ‘আরে তুমি! এসো এসো! ইসসস পুরো ভিজে গেছ তো।’ শ্রীদেবী ঘরে ঢুকে এল। অবাক হয়ে দেখল প্রিয়াংশু কাশছে ঠিকই। কিন্তু দিব্যি হেঁটে চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘ওরা যে বলল তুমি উঠতে পারছ না!’

-আগে বোসো তো। ওরা ঠিকই বলেছে।

শ্রীদেবী অতি সংকোচে সোফায় বসল। প্রিয়াংশু পাশের সোফাটায় এসে বসল। শ্রীদেবীর ভেজা হাতে হাত রেখে বলল, ‘আমার সত্যিই খুব শরীর খারাপ। উঠতেও পারছিলাম না। কিন্তু কোনওরকমে ওষুধ খুঁজে খেয়ে এখন একটু বেটার লাগছে।’

-তাহলে আমি যাই প্রিয়াংশুদা।

-পাগল নাকি? এই বৃষ্টিতে একে ভিজে এসেছ। তার ওপর যদি ঠাণ্ডা লেগে যায় পরীক্ষা দেবে কী করে? বৃষ্টিটা একটু ধরুক। বাবা-মাও এসে যাবে। ওদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। তারপর আমাদের ড্রাইভার তোমায় নামিয়ে দিয়ে আসবে। তার আগে এক কাজ কর জামাকাপড় ছেড়ে ফেলো।

-এ মা! সে কী করে হবে? আমি তো কিছু আনিনি

-চিন্তা নেই। আমার মায়ের চুড়িদার আছে। দাঁড়াও।

সংকোচ সত্ত্বেও বাথরুমে ঢুকে জামাকাপড় ছাড়ল শ্রীদেবী। বাথরুমে দুটো মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছে প্রিয়াংশু। তাই শ্রীদেবীর কোনও অসুবিধেই হল না। ঘরে এসে বসতেই প্রিয়াংশু সরবত এনে দিল।

-না না, এসবের দরকার নেই।

-মা বলে বাড়িতে অতিথি এলে কখনও তাকে খালি মুখে ফেরাবি না। খেয়ে নাও। আমার ফেবারিট সরবত।

বলেই নিজের গ্লাসে চুমুক দিল প্রিয়াংশু। এক গাল হেসে শ্রীদেবীও চুমুক দিল। ‘ইসসস চুলগুলো ঠিক করে মোছনি? জল পড়ছে তো।’ কথাটা বলতে বলতেই সরাসরি শ্রীদেবীর চুলের ভিড়ে প্রিয়াংশুর হাত ঢুকে যায়। শ্রীদেবী বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। মাথা সরিয়ে বলে, ‘আমি ঠিক আছি।’

-মাথায় জল বসলে তোমার শরীর খারাপ হবে শ্রী। আমার সেবা করতে এসে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমার খারাপ লাগবে।

প্রিয়াংশুর ফোনটা বেজে ওঠে। শ্রীদেবীর চুল থেকে হাত সরিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে যায়। ফোনটা একটু দূরে রাখা ছিল। হাতে তুলে দেখে। তারপর ফোনটা কেটে দেয়। ‘যতসব ভুলভাল নম্বর থেকে ফোন আসে।’ ততক্ষণে ঢকঢক করে সরবত প্রায় শেষ করে ফেলেছে শ্রীদেবী। খুব ক্লান্ত লাগছে ওর। শরীরটা ছেড়ে দিচ্ছে আস্তে আস্তে। সোজা হয়ে বসতে চাইলেও পারছে না। চোখ টেনে আসছে। এই সময় ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি নিয়ে শ্রীদেবীর পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় প্রিয়াংশু। দুটো হাত শ্রীয়ের মাথার মধ্যে চালিয়ে দিয়ে মাসাজ করতে থাকে। শ্রীদেবীর শরীরটা আরামবিলাসী হয়ে ওঠে। নেতিয়ে পড়ে সে। তারপর ঘুম নেমে আসে। গভীর ঘুম।

ভোর রাতে ঘুম ভাঙে শ্রীদেবীর। তলপেটের কাছে খুব ব্যথা। ভালো করে চোখ খুলে সে নিজেকে খুঁজে পায় একটা ঘরের বিছানায়। গায়ের ওপর শুধু একটা চাদর ছাড়া একটা সুতোও নেই। আঁতকে ওঠে সে। পাশে এলোগায়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে প্রিয়াংশু। তার গায়েও জাঙ্গিয়া ছাড়া কোনও বস্ত্র নেই। ওর জামাকাপড় দূরে মাটিতে ছড়িয়ে আছে। পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে থেকে থেকে। সরল সাধাসিধে শ্রীদেবী আর হাসতে পারছে না। তার কান্না পাচ্ছে। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

-ওই শালা, ট্রিট কবে দিচ্ছিস?

অরুণা বলে উঠল। কলেজের পাশে জড়ো হয়েছে পঙ্গপালের দল। সবকটা মাথা একসঙ্গে আছে। প্রিয়াংশু বলল, ‘ট্রিট কীসের?’ -কী হারামি রে তুই?

দিয়ার কথার ওপর দিয়ে সুস্মিতা ফুট কাটল, ‘আমাদের মধ্যে সবার আগে অ্যাডাল্ট হলি তুই। তাও আবার আমাদের দয়ায়।’ -একদমই তাই।

সায় দিয়ে মৃত্তিকা বলল, ‘এই এতদিন ধরে আমরা যদি ভিলেনের অ্যাক্টিংটা না করতাম তুই হিরো হতে পারতিস?

-ইসসসস! তোরা যেন কত ভালো হিরোইন সব। কলেজের সব প্রফেসর

তোদের চারটেকে তো এমনি এমনি ফোর মাস্কেটিয়ার্স বলে ডাকে তাই না? চোখ পাকিয়ে মৃত্তিকা বলে উঠল, ‘দেখ দেখ, কীরকম বেইমান শালা। এই জন্যে বলে কারও ভালো করতে নেই ।

-আরে বাল খাওয়াব খাওয়াব। একটু ব্যাপারটা বুঝে নিতে দে।

প্রিয়াংশু বেশ সিরিয়াসলিই বলল কথাটা। দিয়ার কীরকম যেন খটকা লাগল। বলল, ‘হ্যাঁ রে প্রিয়াংশু, কন্ডোম নিয়েছিলি তো?’ প্রিয়াংশু মুখে পুচ করে একটা শব্দ করে ওঠে 1

-এই পুচ করছিস কী রে? নিসনি?

-শেষ মুহূর্তে শালা কী যে হল। ইচ্ছেই করল না।

-গাঁড় মেরেছে বাঁড়া!

দিয়ার মাথায় হাত। অরুণা, সুস্মিতা আর মৃত্তিকা এক পা করে পিছিয়ে গেল। দিয়া দাঁতে দাঁত পিষে বলল, ‘শালা নিজের তো কেনার মুরোদ ছিল না। লজ্জায় বাবু মরে যাচ্ছিলেন। আমরা চাঁদা তুলে সবথেকে বেস্ট মালটা কিনে দিলাম আর তুই ইউজই করলি না? এই বাল, তোকে আমাদের খাওয়াতে হবে না। তুই ফুটে যা। বছরখানেক বাদে একেবারে মুখেভাতের নেমন্তন্ন করিস গিয়ে। খেয়ে আসব।’

-দূর বালটা দাঁড়া তো। কবে কী হবে তার ঠিক নেই….

প্রিয়াংশুকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে কাজটা নিয়ে সে নিজেও বেশ ভয়ে -আর তিনি যদি হাসতে হাসতে বাওয়াল করেন তখন? এবার প্রিয়াংশুর ঠোঁটে খুনে হাসি।

আছে। ‘কিচ্ছু হবে না। তেমন কিছু হলে খসিয়ে দেব।’

-পারব না। কিছুতেই পারব না।

গলাটা কেঁপে উঠল শ্রীদেবীর। এই কয়েক মাসে আমুল বদলে গেছে সে। আগের মতো অকারণে সে আর হাসে না। কোনও কারণ ঘটলে ঠোঁটে তার নকল একটা হাসি দেখতে পায় সবাই। রেজাল্ট ভালো হচ্ছে না। সামনেই ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা। ভরদুপুরবেলা গলির মুখে দাঁড়িয়ে প্রিয়াংশুকে শুনিয়েছে ভয়ানক কথাটা। মা হতে চলেছে সে। প্রিয়াংশু একটু টলে গিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিয়েছে। অ্যাবরশনের প্রস্তাব রাখতেই শ্রীদেবী খারিজ করে দেয়।

-কেন পারবে না? কত লোকে তো করছে।

-আর পাঁচজন খুন করছে বলে আমাকেও করতে হবে? তাছাড়া সাড়ে তিনমাস হয়ে গেছে। দুদিন বাদে লোকে বুঝতে পারবে। তুমি বাড়িতে বলো। আমরা বিয়ে করে নিই

-আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। তুমি সত্যিই বদ্ধ উন্মাদ। সবে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করব। এর মধ্যে বিয়ে?

-ও। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট না করে বন্ধুদের দিয়ে মিথ্যে বলিয়ে আরেকটা মেয়ের সর্বনাশ করা যায়, নষ্টামি করা যায়, কিন্তু বিয়ে করা যায় না? বেশ। তোমায় কিচ্ছু করতে হবে না। আমি তোমার আর ওই চারজনের নামে কালকেই কমপ্লেন করব প্রিন্সিপালের কাছে।

-পাগলামো কোরো না ।

-আমি তো পাগলই। তুমি তো জানো। আমার যা সর্বনাশ করার তা তো করেইছ। দুদিন বাদে এমনিতেও সবাই জানতে পারবে। তার আগে আমিই সবাইকে জানাব।

প্রিয়াংশুর মুখটা রোদ্দুরে ঝলমল করছিল। হঠাৎ করেই যেন সেটা আলো-ছায়ার খেলায় একটা রহস্যময় মুখোশ হয়ে যায়। বলে, ‘যেদিন আমার নেওয়া চেয়ারটা টেনে নিয়েছিলে। সেদিনই বুঝেছিলাম তুমি সহজে সিধে হবে না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, চেয়ারের মতোই তে মার পায়ের তলার মাটিটা আমি সরিয়ে দেব।’ কথাটা বলতে বলতে নিজে মোবাইলটা শ্রীদেবীর মুখের সামনে ধরে। একটা ভিডিয়ো চলছে। বাথরুমে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। শ্রীদেবীর নগ্ন শরীরটা আগুন তাতে গনগন করছে। ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে টাওয়েল দিয়ে ভালো করে গায়ে বসে থাকা জল মুছে নিচ্ছে। শেষে প্রিয়াংশুর মায়ের চুড়িদার গায়ে চাপিয়ে নিল। শ্রীদেবী ভয়ে লজ্জায় থরথর করে কাঁপতে থাকে। সত্যি সত্যি পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে।

-এই সুন্দর ভিডিয়োটা সবার মোবাইলে ছড়িয়ে দেব। বলব, শ্রীদেবী গ্রাম থেকে এসে শহরে একা থাকে। এইসব ভিডিয়ো বানিয়ে ঘরে ছেলে ঢোকায়। আর এইভাবেই পয়সা কামায় ৷

মুখে হাত চাপা দিয়ে পিছনে সরে গেল শ্রীদেবী। প্রিয়াংশু বলে, ‘বাচ্চা রাখো আর না রাখো, আমার নাম যদি কোথাও উচ্চারণ কর সবার সামনে তোমায় বেশ্যা প্রমাণ করে ছাড়ব। তাতে শুধু তুমি নয়, তোমার পরিবার গ্রামে মুখ দেখাতে পারবে না। কারণ গ্রামের প্রতিটা লোকের মোবাইলে এই ভিডিয়ো চলে যাবে। বলা যায় না, তোমার মা হয়তো গলায় দড়ি দিল। ছোট ভাইটা পুকুরে ডুবে মরল। সরযু ঠাকুমার হার্ট ফেল করল। তোমাদের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিল সবাই। অনেএএএক কিছু হতে পারে শ্রীদেবী। খবরদার আমার নাম উচ্চারণও করবে না।’ শ্রীদেবী দুহাতে মুখ চেপে, দুচোখ ভর্তি জল নিয়ে পিছোতে পিছোতে মুখ ঘুরিয়ে দৌড়তে থাকে ।

প্রিয়াংশু সামনের দিকে ঝুঁকে দুচোখে হাত চাপা দেয়। বসে থাকে নীরব হয়ে। তখন ফোন করে শিবাঙ্গীকে ডেকে পাঠিয়েছিল প্রিয়াংশু। স্বপ্নের ভয়াবহতা সহ্য করতে পারেনি। উলটোদিকের সোফায় বসে থাকা শিবাঙ্গী বলে ওঠে, ‘এই লজ্জাটা যদি সেদিন পেতেন তাহলে আজকের প্রাণগুলো অকালে চলে যেত না। সুস্মিতাকে এইভাবে মরতে হত না।’

-তখন আমাদের বয়স কম। মাথায় উল্টোপাল্টা চিন্তা। তখন ভাবতাম, শালা আমরাই দুনিয়াটাকে পালটে দেব। আমাদের কথায় সবাই ওঠবোস করবে। এমনই আরও কত ভুলভাল ভাবনা ।

-তারপর? শ্রীদেবী তো বলেনি আপনাদের নাম।

-সেদিন দুপুরে আমায় যখন প্রথম মা হওয়ার কথা বলল, ও তার আগেই ওর ভাইকে বলেছিল। কাউকে বলতে বারণ করেছিল। কিন্তু ওর ভাই শোনেনি। শ্রীদেবীকে যে পড়াত, তপা না কী নাম তাকেও বলেছিল । কিন্তু সে কখনও সামনে আসেনি। ওর ভাই শ্রীকুমার সোজা এসে প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ করে। তখন শ্রীদেবীকে দেখে যে কেউ বলে দেবে ও প্রেগনেন্ট। প্রিন্সিপাল আমাদের ডেকে পাঠান। মৃত্তিকার খুব শরীর খারাপ ছিল বলে ও আসতে পারেনি। আমরা যাই। কলেজের সব প্রফেসরদের সামনে শ্রীদেবীকে আনা হয়। প্রিন্সিপাল প্রশ্ন করেন….

-তোমার এই অবস্থার জন্য কে দায়ী?

শ্রীদেবী চুপ। চোখের তলায় কালি। পেট ঈষৎ ফুলে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে শ্রীকুমার। সারা গালে হালকা দাড়ি। নাকের নীচে গোঁফের রেখা। গালদুটো চ্যাপ্টা। চোখে আশঙ্কা। ‘দিদি বল সত্যিটা। কিচ্ছু লুকোস না।’ অরুণা, দিয়া, প্রিয়াংশু, সুস্মিতা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে যেন। তিনটে মেয়ে শ্রীদেবীর দিকে তাকিয়ে। প্রিয়াংশুর চোখ মাটির দিকে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে প্রিয়াংশুকে দেখে নিচ্ছে। প্রিন্সিপাল বলেন, ‘তোমার কোনও ভয় নেই। নির্দ্বিধায় বলো। তোমার এই অবস্থার জন্য কে দায়ী?’ শ্রীদেবী এখনও চুপ। শ্রীকুমার বলল, ‘দিদি গত দুদিন ধরে কোনও কথাই বলছে না। এমনকি খিদে পেলেও নয়। আমি বলছি স্যার, এই চারজন আমার দিদিকে ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে দিয়েছে।’

-এটা শুধু তুমি বললে হবে না। যার ওপর এই অন্যায়টা হয়েছে তাকেই বলতে হবে। শ্রীদেবী মুখ বন্ধ করে থাকলে আমরা ধরে নেব দোষটা সম্পূর্ণ তোমার দিদির। এরা নিরাপরাধ ।

-না স্যার।

প্রতিবাদ করে উঠল শ্রীকুমার। এরা শুরু থেকে আমার দিদিকে নানাভাবে জ্বালাতন করেছে। অপমান করেছে। সেদিন মৃত্তিকা, অরুণা এরাই ফোন করে দিদিকে প্রিয়াংশুর বাড়ি পাঠিয়েছিল।

-ওরা পাঠাল আর তোমার দিদিও চলে গেল? শ্রীদেবী কি বাচ্চা মেয়ে? -না স্যার। আমার দিদি ভীষণ সরল। মনে কোনও প্যাঁচ নেই । প্রিয়াংশু অসুস্থ শুনে দৌড়ে গিয়েছিল।

ঠিক তখনই অরুণা মুখ খুলল, ‘স্যার, প্রিয়াংশু অসুস্থ হলে ওকে পাঠাব কেন? প্রিয়াংশুর বন্ধু তো আমরা। ও দু’বছরের জুনিয়র।’

-তাছাড়া কেউ যদি বলেই থাকে তাহলে ওর কীসের এত গরজ পড়েছে সিনিয়র ছেলের বাড়ি ছুটে যাবার? তাও আবার রাতে!

কথাগুলো বলল সুস্মিতা। সুযোগ পেয়ে দিয়াও তাল ঠুকল। ‘স্যার আমরাও তো মেয়ে। আরেকটা মেয়েকে বিপদে ফেলে আমাদের লাভটা কী? আসলে স্যার, শ্রীদেবী গ্রামের মেয়ে তো। শহরে এসে মাথা ঘুরে গেছে। একা একা থাকে। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন স্যার, বাড়িওয়ালি নাকি কাউকে বাড়িতে আসতে দেয় না। বিশেষ করে ছেলে বন্ধুদের তো নয়ই নিশ্চয়ই ওর চরিত্র সম্পর্কে জানে তাই। বাধ্য হয়ে ও বাইরে বেরিয়ে…’।

-শাট আপ। সব মিথ্যে কথা ।

তড়পে ওঠে শ্রীকুমার। প্রিন্সিপাল কড়া গলায় বলে, ‘গলা নামিয়ে শ্রীকুমার। এটা একটা কলেজ।’

-সরি স্যার। তবে এরা সবাই মিথ্যে বলছে।

আরেক প্রফেসর বলে ওঠেন, ‘তাহলে তোমার দিদি মুখ কেন খুলছে না? শ্রীদেবী তোমার কিছু বলার আছে কী?’

-দিদি এইভাবে ভয় পেয়ে হেরে যাস না। তুই বল দিদি ওরা কী কী করেছে।

শ্রীকুমার ঝাঁকিয়ে দেয় শ্রীদেবীকে। শ্রীদেবী যেন মাটির মূর্তি। প্রাণ নেই কোনও। মুখ নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শুধু চোখ ফেটে টপটপ করে জল পড়ল। ঘরে আরও কিছু সময়ের নীরবতা। তারপর প্রিন্সিপাল বললেন, ‘সরি, আমাদের হাতে আর সময় নেই। আমরা ধরে নিচ্ছি এই চারজন এবং মৃত্তিকা নির্দোষ। কারণ কোনও কিছুই প্রমাণ হল না।’

-হবে স্যার। প্রমাণ হবে।

ঘরের মধ্যে সকলেই কমবেশি চমকে ওঠে। শ্রীকুমার এখনও বলে চলেছে! প্রিন্সিপাল প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কীভাবে?’

-ডি এন এ টেস্ট।

ঘরের মধ্যে শব্দ হল একটা। আসলে শব্দটা প্রিয়াংশুর মাথায় মধ্যে বজ্রপাত হবার শব্দ । ভাইয়ের কথা শুনে শ্রীদেবীও যেন সাড় ফিরে পেল । কী সর্বনাশ করতে চলেছে ভাই! এমনিতেই তো জন্ম ইস্তক সকলের হাড়মাস কালি করে দিয়েছে শ্রীদেবী। সেরকমটা শুনেই বড় হয়েছে সে। তার পরে এই সত্য প্রমাণ হলে তো বাড়িতে আগুন জ্বলবে। প্রিয়াংশুর হয়তো শাস্তি হবে। কিন্তু তাতে শ্রীদেবীর কলঙ্ক কিছুমাত্র কমবে কি? ভরা সভায় এই প্রথম কথা বলে উঠল শ্রীদেবী, ‘না। কোনও টেস্ট হবে না।’ সবাই শ্রীদেবীর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকায়। শ্রীদেবী নিচু কণ্ঠে প্রিন্সিপালের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘সব দোষ আমার। কারও কোনও দোষ নেই।’

-দিদি কি বলছিস তুই? তুই আমায় এদের নাম না বললে আমি জানব কোত্থেকে?

-আমার মাথার ঠিক ছিল না রে ভাই। আসলে ওদের ওপর আমার রাগ ছিল। ওরা সত্যিই আমায় জ্বালাত। তাই আমি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছি।

প্রিন্সিপাল রেগে বললেন, ‘এটা কি তামাশা হচ্ছে? জানো এর জন্য তোমার কি শাস্তি হতে পারে?”

-আমাকে কলেজ থেকে বের করে দেবেন তো? তাই দিন। শহরের কলেজে পড়ার সাধ আমার মিটে গেছে।

চোখ নামিয়ে নেয় শ্রীদেবী। প্রিন্সিপালের চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে একটা গ্রামের মেয়ের এতটা স্পর্ধা দেখে। ‘বেশ। অপরাধ প্রমাণ না হওয়ায় অরুণা দত্ত, দিয়া চৌধুরি, সুস্মিতা মুখার্জি, মৃত্তিকা ভট্টাচার্য এবং প্রিয়াংশু বড়ালকে ছেড়ে দেওয়া হল। আপনারাও এক মত তো?’ শেষ কথাটা বাকি প্রফেসরদের উদ্দেশ্যে বললেন প্রিন্সিপাল। সবাই সম্মতি জানালেন । তারপর প্রিন্সিপাল বললেন, ‘কিন্তু উই আর সরি শ্রীদেবী, তোমাকে সত্যিই আর এই কলেজে রাখতে পারছি না।’ শ্রীদেবী শুধু নীরবে চোখ বুজল। শেষ অশ্রুটা গড়িয়ে পড়ল চোখের কোল বেয়ে। শ্রীকুমার প্রচণ্ড রাগে দুটো হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে রইল। উপস্থিত চারজন অপরাধীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকাল। সবার সামনে দিয়ে অপমানে লাল হয়ে দিদিকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল শ্রীকুমার। শহুরে হায়নাগুলো চোখ তুলে তাকাতে পারেনি সেদিন।

-ওরা কী তারপর গ্রামে ফিরে যায়?

-কোনও খোঁজ রাখিনি। আট-ন মাস পর খবর পাই শ্রীদেবী মারা গেছে। -কীভাবে? মেন্টাল অ্যাসাইলামে ছিল। সেখানেই গলায় দড়ি দেয় ।

-আর বাচ্চাটা?

কিছুক্ষণ চুপ থাকে প্রিয়াংশু। আজ তারও চোখ দিয়ে নোনতা জলের ধারা।

-শুনেছিলাম, একটা মেয়ে হয়েছিল।

গলাটা কেঁপে উঠল প্রিয়াংশুর।

-সে কোথায়?

-আর কিচ্ছু জানি না। কিচ্ছু না।

-একটা কথা বলুন তো প্রিয়াংশুবাবু, হঠাৎ আজ আমায় ডেকে এই কথাগুলো কনফেস করছেন কেন? বিবেকের দংশন! নাকি ভয়?

শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল। সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে প্রিয়াংশু বলল, ‘একটা ভয়ানক স্বপ্ন!

পাখির ডানায় সন্ধে নামছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে এখনও শাঁখের শব্দ ভেসে আসে চন্দ্রকোণায়। তুলসীতলায় গঙ্গাজলের ছড়া দিল বৃদ্ধা সরফুর ছেলের বউ। শাঁখ বাজাল। গলায় আঁচল জড়িয়ে প্রণাম করল। বৃদ্ধা দাওয়ায় বসে প্রণাম সারলেন। স্বয়ম্ভু অপেক্ষা করছিল। উমা সন্ধে দিয়ে ঘরে চলে যেতে বৃদ্ধা বললেন, ‘এবার রামায়ণ পাঠ করব আমি। তুমি আজ রাতে খেয়ে যেও বাবা । ‘

-না মাসিমা। এমনিতেই দুপুরে যা খাইয়েছেন তাতে পেটে জল খাবারও জায়গা নেই।

-বোঝো। এই তোমাদের এখন যে কী রোগা হবার বাই উঠেছে বুজি নি বাপু। জুয়ান তাগড়া ছ্যানা। দুহাতে খাবে। শক্তিশালী হবে তা না।

-পরে এসে আবার খাব। এখন শুধু দু-তিনটে প্রশ্ন করেই বিদেয় হব! -কী প্ৰশ্ন?

-বাচ্চাটা কোথায়?

-শুনেছিলাম পাগলা গারদ থেকেই তাকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। শ্রীকুমার জানত হয়তো। বলেনি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম একবার। দেখায়নি। তারপর তো মেয়েটাও চলে গেল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বৃদ্ধা বললেন, ‘আর দেখতেও চাইনি।’

-শ্রীদেবীদের বাড়ি কি এখন বন্ধই থাকে? নাকি কেউ আসে? স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল।

-বেশিরভাগ সময় বন্ধই থাকে। তবে মাজে মাজে শ্রীকুমার এসে ঝাড়পোঁছ করে যায় ।

-শ্রীকুমার কোথায়?

-কলকাতায়। কোন একটা দকানে কাজ করে বলেছিল।

-কোন দোকানে?

-বই-টই হবে।

-বই!

স্বয়ম্ভু একটু থমকে গেল। মনের মধ্যে যাকে নিয়ে সন্দেহ ছিল তার সঙ্গে কোথায় যেন গরমিল হল! ‘আচ্ছা এই তপা কে? কোথায় থাকে?”

-তপাও কোলকাতায়। এই পাড়ায়েই অর মা থাকে। বাবা গেল বছর মারা গেচে।

-তপার পুরো নাম কী?

বৃদ্ধার স্মৃতি আর কাজ করল না। ছেলেকে ডাকলেন। ছেলে বলল, ‘ওর নাম বোধহয় ত্রিদিব অধিকারী।’

-ত্রিদিব অধিকারী!

-হ্যাঁ। উ তো প্রভা বউয়ের ছেলে।

বৃদ্ধার কথার রেশ ধরে তার ছেলে বলল, ‘কাকিমার পুরো নাম সুপ্রভা অধিকারী।’ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্বয়ম্ভু। সুপ্রভা নামটা দুবার মনে মনে আওড়ে নিল সে। সঙ্গে আরও কয়েকটা নাম মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডে। যেদিন সুস্মিতা তার বুটিকে খুন হয় সেদিন ঘটনাস্থল থেকে একটি মেয়ে ও একটি ছেলেকে মিশ্রঠাকুরের বাড়ি সরেজমিনে তদন্ত করতে পাঠায় স্বয়ম্ভু। কারণ তার আগেই জানতে পেরেছিল সে বাড়িটি সুপ্রভা অধিকারী নামক একজন মহিলার। কর্পোরেশন থেকে পুরনো বাড়ির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে দুজনে গিয়ে জানতে পেরেছিল পঙ্কজ মিশ্রর দিদি সুপ্রভা অধিকারী। এটা মনে পড়তেই ঝট করে প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু, ‘আচ্ছা এই সুপ্রভা অধিকারীর কোনও ভাই আছে? যে সুপ্রভারই কোলকাতার বাড়িতে থাকে?’ বৃদ্ধা ছেলের দিকে তাকাল। ছেলেও দুপাশে মাথা নেড়ে বলল, ‘এটা জানি না। তবে তপার মুখে তার কোনও মামার কথা তো শুনিনি কখনও। মাঝে মাঝে মাসির কথা বলত।’ ঝট করে আবার চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে স্বয়ম্ভু। ছদ্মবেশে পাঠানো ছেলে ও মেয়েটির থেকেই জানতে পেরেছিল, মিশ্রঠাকুরের ভাগ্নের নাম ত্রিদিব মণ্ডল। এই তো, নামটা মিলে যাচ্ছে। কিন্তু তপাই যদি ত্রিদিব হয় তাহলে মণ্ডল কেন? মিশ্রঠাকুর বলেছিল তার ছোড়দির ছেলে ত্রিদিব। যার ডাকনাম তিরু। তাহলে তপা কি তিরু নয়? এদিকে তপা সুপ্রভারই ছেলে। কিন্তু মিশ্র সেটা বলেনি। স্বয়ম্ভূ আবার জিজ্ঞেস করে, “আপনাদের কাছে তপা অর্থাৎ ত্রিদিবের কোনও ছবি আছে? সঙ্গে শ্রীকুমার আর শ্রীদেবীর?’ ঠোঁট উলটে বৃদ্ধা আবার তার ছেলের দিকে তাকায় ৷

বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে রাত আটটা বেজে যায় শিবাঙ্গীর। অপর্ণা মেয়েকে দেখেই কীরকম যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে একভাবে।

-কী গো মা কী দেখছ?

-তোর কী শরীর খারাপ?

-না তো? কেন? দেখে মনে হচ্ছে?

-না না। এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলি তাই।

-উফ মা!

শিবাঙ্গী টাওয়েলটা কাঁধে নিয়ে সবে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে যাবে অমনি ফোনটা টুংটাং শব্দ করে উঠল। হোয়াটসঅ্যাপ। স্বয়ম্ভু।

-সরষের মধ্যেই ভূত। আমাদের বড্ড ভুল হয়ে গেছে শিবাঙ্গী।

শিবাঙ্গী বেশ ধাক্কা খেল। ভুল হয়েছে মানে? ঘুরিয়ে ফোন করতেই

ফোনটা কেটে দিল স্বয়ম্ভু। আবার হোয়াটসঅ্যাপ টোন বেজে উঠল। -গাড়িতে আছি। কথা বলা যাবে না। আজই ফিরছি। রাত হবে। কাল কথা বলছি। গুড নাইট ।

শেষের এই গুড নাইট, তাও আবার রাত আটটার সময়! এটাই বেশ ভাবাচ্ছে শিবাঙ্গীকে। বিছানায় বসেই পড়ল। বুকের মধ্যেটা ধুকপুক করছে। এমনিতেই স্যারের মাথায় খাঁড়া ঝুলছে। তার ওপর ভুল! আর গাড়িতে যখন আছেন তখন কথা কেন বলতে পারবেন না? পুলিশের গাড়ি নিয়েই তো গেছেন। কোনও বিপদ হল না তো?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *