ম্যাও – ২৩

২৩

মাথার কাছে খোলা জানলা । মাঝ সকালের আলোটা ত্যারচা হয়ে মৃত্তিকার কপালে এসে পড়েছে। চোখ বুজে শুয়েছিল। একটা হাত কপাল স্পর্শ করতেই চোখ মেলে চাইল। ‘জ্বরটা ছাড়ছে।’ মৃত্তিকা জুলজুল করে তাকিয়ে আছে দীপায়নের দিকে। দীপায়ন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সপ্রেমে। ‘কী হয়েছিল তোমার? ভোর রাতে ওরকম চেঁচিয়ে উঠলে! তারপরেই অজ্ঞান হয়ে গেলে।’ খুব অস্ফুট স্বরে মৃত্তিকা বলে উঠল, ‘দেবী?’ নরম স্বরে উত্তর দিল দীপায়ন, ‘তোমার পাশে। ঘুমোচ্ছে।’ ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েকে দেখে নিল দুচোখ ভরে। গায়ের ওপর হালকা চাপা দেওয়া। কুণ্ডলী পাকিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে অকাতরে ঘুমোচ্ছে মেয়ে। মৃত্তিকা দীপায়নের হাত ধরে নিজের মুখে চেপে ধরে। নীরবে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ‘কী হয়েছে মৃত্তিকা? ভয় পেয়েছ? আমি আছি তো?’

-বীভৎস স্বপ্ন। ভয়ানক

-বুঝেছি। ওই ভিডিয়োটাই যত কাল করেছে। কিচ্ছু হবে না মৃত্তিকা। আমি বলছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। পুলিশ আর গোয়েন্দা ঘিরে রেখেছে আমাদের। ভয় কীসের? তুমি শুধু ভুলভাল কথা ভাবা বন্ধ কর। যা শুরু করেছ তাতে আর ডায়টেশিয়ানের কাছে গিয়ে ওজন কমাতে হবে না। এমনিই দশ কেজি কমে যাবে। শোনো, সামনে মেয়ের অন্নপ্রাশন । সবাইকে বলা হয়ে গেছে। তুমি কত প্ল্যান করেছ বলো তো? সকালে জলসইতে যাবে একটা শাড়ি পরে, মেয়েকে ভাত খাওয়াবার সময় আরেকটা আবার বিকেলে রিসেপশনে আরেকটা। মোট তিনটে শাড়ি কিনিয়েছ মনে থাকে যেন। একটাও আলমারিতে না পড়ে থাকে। পার্লার বুক করেছ?

মৃত্তিকা দুপাশে ঘাড় নাড়ল ।

-দেখেছ, সেটাও কি আমি করব?

-ফোনে বুকিং হয় না। যেতে হবে।

-তা যাও। জ্বরটা কমলে বেরোও। কিচ্ছু হবে না। বুক করে এসো। আমার কলেজে যাওয়ার তো আজকেও বারোটা বাজিয়ে দিলে। এমন করলে চাকরিটা থাকবে?

-জানো, ওই ভয়ংকর স্বপ্নে আমি দেবীকে শ্রীদেবী বলে ডেকে ফেলেছি। দীপায়নের মুখে যে প্রেমিক মনটা ছায়া ফেলেছিল নিমেষে সেটা বিস্ময়ের অতলে তলিয়ে যায়। ‘স্বপ্নে মানুষ সেটাই দেখে যেটা সে মন থেকে করতে চায় বা বলতে চায় । এই নামটা তো আমি দিয়েছিলাম। তোমার তো একদম পছন্দ নয়। তাহলে স্বপ্নে ডাকলে কেন?”

-আমি জানি না।

জামার বুক পকেটে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে দীপায়নের। হাতে নিয়ে দেখে। মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ফোনটা ধরে। ‘হ্যাঁ বল… । কে?… কেন?’ দীপায়নের ভুরুটা কুঁচকে ওঠে। এরপর অনেকক্ষণ চুপ করে শোনে। কুঞ্চিত ভ্রু দুটোর নীচে চিন্তায় ডুবে যাওয়া চোখটা আরও একবার মৃত্তিকাকে দেখে নেয়।

-এত তাড়াতাড়ি!… বড্ড কম সময়।… দেখছি। রাখলাম।

ছেঁড়া ছেঁড়া কথাগুলো শুনে মৃত্তিকার বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করে উঠল। ফোন রাখতেই জিজ্ঞেস করল, ‘কে ফোন করেছিল গো? কীসের কম সময়?’

-তিন বান্ডিল খাতা দিয়েছে। এদিকে দুদিনের মধ্যে নাকি জমা দিতে হবে কলেজে। আবার কলেজ থেকে ছুটিও দেবে না। অদ্ভুত। কোন দিকটা যে সামলাব?

নিশ্চিন্ত হল মৃত্তিকা। বলল, ‘আমায় নিয়ে ভেবো না। আমি ঠিক আছি। তাড়াতাড়ি কাজ সারলে তোমারই ভালো। অনুষ্ঠানে ফ্রি হয়ে যেতে পারবে । দীপায়ন হাসল। সত্যি, এইভাবে ভেবে দেখেনি বিষয়টা।

-তুমি শুয়ে থাকো। আজ বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে দেব।

-এই গাড়িটা আপনাদের?

গাড়ির নম্বর লেখা চিরকুটটা রিসেপশনে বাড়িয়ে দিল অভিনব রিসেপশনের দেওয়ালে বড় করে লেখা ‘ময়ূরী কার রেন্টাল কোম্পানি’ সালোয়ার পরা মেয়েটি দেখে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। এটা আমাদের।’ অভিনব বলল, ‘গতকাল পর্যন্ত শেষ তিনদিন এই গাড়িটা কোথায় কোথায় ভাড়া গেছে তার ডিটেলস প্রোভাইড করুন।’ -সরি স্যার।

খামোকা একটা জোয়ান ছেলে এসে হিসেব চাওয়াতে মেয়েটি অবাক হয়ে যায়। অভিনব পকেট থেকে আই কার্ড বার করে দেখাতেই মেয়েটির মুখের গড়নটাই পালটে যায়। তুতলিয়ে বলে ওঠে, ‘ও…ওকে স্যার। একটু সময় লাগবে।’

-বেশি সময় নেই। কুইক ।

-আচ্ছা। দিচ্ছি।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সব ডিটেলস চলে এল অভিনবর হাতে। লিস্টে বেশ অনেকজনের নাম, সময়, গাড়িটা কোথা থেকে কোথায় গেছে সব উল্লেখ আছে। সেখানে একবার চোখ বুলিয়ে মেয়েটিকে অভিনব বলল, “আপনারা কাস্টমারদের আই কার্ড রাখেন তো?”

-হ্যাঁ স্যার।

-এদের প্রত্যেকের আই কার্ডের প্রিন্ট আউট দিন।

-বলেছি স্যার। এখুনি নিয়ে আসছে।

-থ্যাংক ইউ ।

-স্যার চা, কফি কিছু?

-না থ্যাংকস।

একটু পরেই সব ডকুমেন্টস হাতে চলে এল। অভিনব নামগুলোতে চোখ বোলাতে থাকল। এক এক করে নামতে নামতে বারো নম্বরে এসে ওর চোখ আটকে গেল। নাম নয়, সময়টা সন্দেহজনক। গাড়িটার আউট টাইম বৃহস্পতিবার মানে যেদিন দিয়া খুন হয় সেদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আর ইন টাইম পরেরদিন ভোর পাঁচটা দশ। গাড়ি যিনি ভাড়া নিয়েছিলেন তার নাম দয়াময় সান্যাল। আই কার্ডের জেরক্সগুলো অফিসের ভিতর থেকে সরাসরি অভিনবর হাতে চলে এল। সবার আগে সে দয়াময় সান্যালের ছবিটা দেখল। ভোটার আই কার্ডের ছবি। সাদা কালোয় কিছুই বোঝার উপায় নেই। তবে আরও একটা জায়গায় গিয়ে চোখটা আটকে গেল অভিনবর।

তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গাড়িটা সূর্য সেন স্ট্রিট থেকে ডানদিকের গলিতে ঢুকে গেল। উল্টোদিকে আরও বেশ কিছু পরে রাতের দিকে বাইকটা মৌলালি ক্রস করে শিয়ালদার দিকে এগিয়ে গেল। ভিডিও পজ করে নম্বর মেলাবার চেষ্টা হল। একে বৃষ্টি, তার ওপর রাত। ছবি অনেকটাই ঝাপসা। তবু নম্বর প্লেটে লেখার অবয়বগুলোর সঙ্গে স্বয়ম্ভুর হাতে ধরা নম্বরের আঁকিবুকি মিলে যাচ্ছে। বাইকের রং, আরোহীর রেনকোট, হেলমেট সবই মিলছে। মৌলালির ট্রাফিক সিগনাল সবুজ হতেই শিয়ালদার দিকে এগিয়ে গেল বাইকটা। একটা সময় পর অন্ধকারে বাইকটা মিলিয়ে গেল। পরের সিসিটিভিতে দেখা গেল বাইকটা ঝড়ের গতিতে এসে সুরিলেনের গলিতে ঢুকল। তার কয়েক সেকেন্ড পরেই বেরিয়ে এল স্বয়ম্ভুদের বোলেরো। ভিডিয়ো বন্ধ হল।

চেয়ারে এলিয়ে চোখ বুজল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বলল, ‘সবই তো মিলে গেল স্যার। ওটা দীপায়নই ছিল।’

-হুম। কিন্তু অত রাতে সতেরো বাই দুই বাড়ির সামনে থামল কেন? শিবাঙ্গী খোঁজ শুরু করেছ?

-পঙ্কজ মিশ্ৰ?

-হুম ।

-সকালেই নর্থ বেঙ্গলের পি এসগুলোতে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। -বেশ। প্রিয়াংশুকে কখন আসতে বলেছ?

হাত উলটে ঘড়ি দেখে শিবাঙ্গী বলল, ‘বিকেল চারটের মধ্যে।’

সুস্মিতা আজ বুটিকে এসেছে। অফিস যাবার পথে প্রিয়াংশু নামিয়ে দিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ভয় কাটাবার চেষ্টা করছে। সুস্মিতা নিজেও বুঝেছে এইভাবে ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকলে ও পাগল হয়ে যাবে। তাই আজ দোকানে এসে সকাল থেকেই হিসেবনিকেষ দেখছে। নতুন নতুন ডিজাইন করার চেষ্টা করছে। এখন দুপুর সাড়ে তিনটে। বাইরে বেশ বৃষ্টি পড়ছিল খানিক আগেই। সঙ্গে মেঘের ডাক। অবশ্য এখন খানিকটা ধরেছে। কাচের দরজা ঠেলে বেগুনি রঙের রেনকোট চাপিয়ে একজন ঢুকে এল। সারা গা থই থই করছে জলে। দরজা থেকে সুস্মিতার ডেস্কের কাছে আসতেই দোকানটা ভিজে গেল রেনকোট থেকে ঝরা জলে। বেশ বিরক্তির স্বরে লোকটাকে কথা শোনাতে গিয়েও চুপ করে গেল সুস্মিতা। লোকটি তার আগেই পকেট থেকে কার্ড বের করে দেখিয়েছে। এই ক’দিনে কোলকাতা পুলিশের লোগো দেখে দেখে চোখ সয়ে গেছে সুস্মিতার। লোকটি মাস্কের আড়াল থেকে গম্ভীর গলায় বলল, ‘স্যার আর্জেন্ট কিছু কথা বলতে বললেন। একটু আলাদাভাবে বলতে হবে।’ আবার কী হল রে বাবা! তবে কী আজ রাতেই কিছু হবে বলে স্বয়ম্ভু লোক পাঠিয়েছে? সবেমাত্র ভয়টাকে কাটিয়ে উঠছিল। আবার কোথা থেকে কোলা ব্যাঙের মতো থুপথুপে ভয়টা ঝাঁপিয়ে পড়ল সুস্মিতার ঘাড়ে। ‘ও! ভেতরে চলুন। মীনাক্ষী তুমি একটু এদিকটা সামলে নিয়ো।’

-হ্যাঁ হ্যাঁ ।

পুলিশের লোকটি কড়া গলায় হুকুম করলেন মীনাক্ষীর উদ্দেশ্যে, ‘কোনও কাস্টমার ঢুকলে আমাদের এনকোয়্যারিতে প্রবলেম হবে। তাই আপনি যদি একটু বাইরে দাঁড়িয়ে কাউকে ঢুকতে না দেন ভালো হয়।’

-ওকে ওকে স্যার। নো প্রবলেম ।

লোকটি বাঁহাতের পাঁচটা আঙুল ছড়িয়ে বলল, ‘জাস্ট পনেরো মিনিট!

-আচ্ছা।

হাসিমুখে কথাটা বলে বেরিয়ে গেল মীনাক্ষী।

দুরুদুরু বক্ষে পুলিশকে নিয়ে ঘরে ঢুকল সুস্মিতা। পুলিশটি ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। তখন নিজের চেয়ারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সুস্মিতা। সজোরে এক রদ্দা পড়ল ঘাড়ের কাছে। আঁক করে শব্দ বেরিয়ে এল সুস্মিতার মুখ দিয়ে। চোখ অন্ধকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই ধরে নিল পুলিশটা। যত্ন করে মাটিতে শোয়াল। শব্দ হল না কোনও । রেনকোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এল গ্লাভস। দুহাত ঢেকে গেল তাতে। তাকে সাজিয়ে রাখা একটা সুন্দর শাড়ি বেছে নিল পুলিশ। রানি রঙের শাড়ি। দুহাতে উল্টেপাল্টে দেখল সেটা। তারপর দ্রুত হাত চালিয়ে কষে বেঁধে দিল মুখ। তারপর আরও চারটে শাড়ি দিয়ে বাঁধা হল দুটো হাত, দুটো পা। মোট পাঁচটা শাড়ি বেঁধে ফেলল সুস্মিতাকে। আরও একটা শাড়ি ভালো করে নিজের মুখের চারপাশে জড়িয়ে গায়ের মধ্যে জাপটে নিল। পুলিশটার হাত ঢুকে গেল রেনকোটের ভিতরে থাকা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে । সেখান থেকে বেরিয়ে এল ধারাল ছুরি। সজোরে গেঁথে গেল সুস্মিতার বুকের মাঝখানটায়। খ্যাচ করে শব্দ হতেই সুস্মিতার শরীরটা একবার ওপরের দিকে ঝাঁকিয়ে উঠল। তারপর নিথর। কিন্তু আততায়ী থামল না। বুক থেকে লম্বা করে ছুরির ঘা দিতে দিতে পেট অব্দি নামল। শেষে দুটো উরুতে একের পর এক আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। সুস্মিতার শরীরটার ওপর ঝুঁকে কুকুরের মত হাঁফাচ্ছে আততায়ী। ছুরিটা ডান পায়ের পাতার কাছে নিয়ে এল। ধারালো অংশটা দিয়ে চামড়া কেটে পাশাপাশি দুটো গোল চিহ্ন আঁকল। দুটো গোলের মাঝেই ছুরির মুখটা দিয়ে খুঁচিয়ে দুটো ফুটো করে দিল। রক্ত গড়াতে থাকল চামড়ার কাটা অংশটা দিয়ে। পায়ে বাঁধা নতুন শাড়িতে ভালো করে মুছে নিল রক্তাক্ত ছুরিটা। উঠে দাঁড়াল। দরজাটা সাবধানে খুলে মুখ বাড়িয়ে দেখল। কেউ নেই। রক্তের ছিটে লাগা রেনকোট পরে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। অতি সন্তর্পণে রেনকোটটা গা থেকে খুলে কলের তলায় মেলে ধরল। ধুয়ে গেল সব রক্তের দাগ। জলের সঙ্গে মিশে অতি সহজে এঁকেবেঁকে চলে গেল অন্ধকারের গর্ভে। ছুরিটাও ভালো করে ধুয়ে টাওয়েলে মুছে পুরে নিল ব্যাগের ভিতর। আবার গায়ে চাপিয়ে নিল রেনকোট। বাইরে বৃষ্টিটা ধরেছে। বাথরুম থেকে বেরোতে গিয়েও একটু থমকালো আততায়ী। হাতের গ্লাভসটাও ধুয়ে গায়ে পরে থাকা পুলিশের পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। দরজাটা আলতো ফাঁক করে দেখল এখনও দোকান খালি। রেনকোটের বোতাম লাগাল না। শেষবারের মতো সুস্মিতার লাশের কাছে গিয়ে বলল, ‘তোর কপালটা খুব ভালো। বেঁচে থাকতে বেশি কষ্ট পেলি না।’ তাক থেকে একটা নতুন শাড়ি অত্যন্ত সাবধানে তুলে নিয়ে ‘সুস্মিতা’স বুটিক’ লেখা প্যাকেটে পুরে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে। মীনাক্ষীকে বলল, ‘সুস্মিতা ভেতরের ঘরে একটা কলে আছেন লালবাজারের সাথে। এখন ওনাকে ডিস্টার্ব করতে বারণ করলেন। কল শেষ করে নিজেই বেরোবেন।’ মীনাক্ষী হাসিমুখে বলল, “আচ্ছা স্যার।’ পুলিশটি রাস্তা পেরলো। ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। দুম করে একটা লোক মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। কড়া চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কোন থানা?’ ফিক করে হাসল আততায়ী। ‘আমায় বেশ পুলিশ পুলিশ লাগছে তাহলে বলুন!’ উল্টোদিকের লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মানে?’ আততায়ী আবার হাসল। বলল, ‘মধুসূদন মঞ্চে শো আছে। সেখানে আমি দারোগার পাট করছি।’ লোকটি বেশ ব্যোমকেই গেল। আততায়ীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে নিয়ে বলল, ‘অভিনেতা?”

-আজ্ঞে।

-মাস্ক, চশমা সব খোলো ৷

আততায়ী থমকে গেল। লোকটি গলায় ঝাঁঝ আনল, ‘কী হল? খোলো।’ আততায়ী চশমা খুলল। মাস্কও সরে গেল মুখের ওপর থেকে। নাকের কাছে বড় একটা আঁচিল। ওপরের ঠোঁটটা মোটা কালো গোঁফে ঢাকা। চোখের নীচে কুঁচকনো চামড়া। গালে চাপা ঘন কালো দাড়ি। লোকটা বেশ কালো -তিলটা আসল না

নকল?

-নকল। তবে স্যার এটা আমায় খুলতে বলবেন না প্লিজ। এই তিল আটকানো বড় ঝামেলা ।

-ড্রেসটা খাঁকি কেন? পুলিশের তো সাদা পোশাক এখন।

-এটা পিরিয়ড পিস। নকশাল আন্দোলনের সময়কার গল্প। তখন আর সাদা কই?

-অ। ঠিকাছে যাও।

1 আততায়ী এক গাল হেসে লোকটিকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই, ‘এই শোনো।’ মুখটা মুহূর্তে ভার হয়ে গেল আততায়ীর তবু হাসি মুখেই বলল, ‘দাদা, এবার দেরি হয়ে যাবে আমার।’ লোকটি তবু ছাড়ল না। জিজ্ঞেস করল, ‘করছ তো দারোগার পাঠ। তাতে বুটিকের শাড়ি কী হবে?’

-খুনিকে ধরতে ছদ্মবেশ নেবে দারোগা। আমাদের সব পোশাক এই বুটিক থেকেই যায়। তাই এসেছিলাম এই শাড়িটা নিতে। এবার যাই দাদা? -ঠিকাছে ঠিকাছে।

আততায়ী টুকটুক করে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। স্বয়ম্ভুর ফিট করা লোকটি পকেট থেকে খৈনি বের করে হাতে তালি মেরে ডলতে থাকে।

-আমাকে এইভাবে ডেকে আনার মানেটা কী?

প্রিয়াংশু বেশ বিরক্ত। স্বয়ম্ভু বলল, ‘প্রশ্ন নয়। উত্তর শুনব বলে ডেকেছি । শ্রীদেবীকে রেপ করেছিলেন?’ শুরুতেই ঝাঁট জ্বলে গেল প্রিয়াংশুর। কে বলল এসব বাজে কথা?’

-আমি কিন্তু শুরুতেই বলেছি প্রশ্ন নয়, উত্তর চাই। -প্রশ্নটাই

অবান্তর।

স্বয়ম্ভুর চোয়াল শক্ত হল। ‘হ্যাঁ কি না?’

-না।

-তাহলে আপনার নামে কলেজে অভিযোগ উঠেছিল

কেন? -সেটা যে অভিযোগ করেছিল তাকেই জিজ্ঞেস করুন। -কে করেছিল অভিযোগ?

-আশ্চর্য! আমার নামে অভিযোগ করেছিল সেটা জানেন আর কে করেছিল সেটা জানেন না?

টেবিল চাপড়ে ক্ষেপে উঠল স্বয়ম্ভু, ‘আমরা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই প্রিয়াংশুবাবু।’ পাশের চেয়ারে বসে শিবাঙ্গী এক দৃষ্টে প্রিয়াংশুর দিকে চেয়ে আছে। এবার একটু থতমত খেয়ে ..াংশু বলল, ‘শ্রীকুমার ।

-বাহ! নামটা তো বেশ মনে আছে। আচ্ছা আপনার কী মনে হয়? হঠাৎ শ্রীদেবীর ভাই এসে খামোকা আপনাদের নামে কমপ্লেন কেন করবে? কী শত্রুতা ছিল আপনাদের সঙ্গে? ও তো কলেজেও পড়ত না ।

-আমি কিচ্ছু জানি না স্বয়ম্ভুবাবু৷

-এবার তো আপনি অবান্তর কথা বলছেন। দুম করে একটা ছেলে এসে কয়েকজন কলেজ স্টুডেন্টদের নামে যা ইচ্ছে তাই অভিযোগ করে দিল?

-তাই তো হয়েছে। খোঁজ নিয়েই দেখুন। শ্রীদেবী নিজে তো আমাদের নাম বলেনি। বরং সবার সামনে বলেছিল আমরা নিরাপরাধ। যা বলেছিল শ্রীকুমার ।

-তার আগে আপনি তো শ্রীদেবীকে মেরে ফেলার হুমকি দেন ।

-হোয়াট! কী আজেবাজে বকছেন?

-আরে মশাই আমাদের যাতে আজেবাজে বকতে না হয় সেই জন্যেই তো জিজ্ঞেস করা। যা যা হয়েছিল খোলসা করে বলে দিন। নইলে দেখতেই তো পাচ্ছেন, দিয়াও খুন হয়ে গেল। আমরা কিন্তু সুস্মিতাকে বাঁচাতে চাই।

-সুস্মিতার কিচ্ছু হবে না ।

চমকে ওঠে স্বয়ম্ভূ আর শিবাঙ্গী। ‘কী করে বলছেন এত জোর দিয়ে?’

ঝোঁকের মাথায় কথাটা বলে ফেলে বেশ ফাঁপরে পড়ল প্রিয়াংশু। ‘কী হল স্যার যা জিজ্ঞেস করছে বলুন। কী করে এত জোর দিয়ে বলছেন?’ শিবাঙ্গী চেপে ধরল। ‘তার মানে এই খুনের মধ্যে আপনিও জড়িত?’

-আরে বাবা, এটা আমার বিশ্বাস। কারণ আপনারা ওর ওপর, আমার ওপর সবসময় নজর রেখেছেন। সেদিন তো রাস্তায় আপনাদেরই লোককে দেখে ও ভয় পেয়ে আপনাকে কল করেছিল। করেনি?’ -করেছিল।

স্বয়ম্ভু বলল। ‘আমরা তো দিয়ার ওপরেও নজর রেখেছিলাম । কই, বাঁচাতে তো পারিনি।’

-ও তাহলে আপনারা নিজের মুখেই আপনাদের ব্যর্থতা স্বীকার করছেন? স্বয়ম্ভু চোখ বুজে নিজেকে সামলাল। অনেকক্ষণ কথার মারপ্যাঁচ চলছে। এবার স্বয়ম্ভুর মাথায় আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। ‘হ্যাঁ করছি। কারণ আমরা সৎভাবে একজনকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনওভাবে মিস করেছি। কিন্তু আপনি অসৎভাবে সব কিছু আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে যাচ্ছেন। সেটা ব্যর্থ হবার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ।’

-আমি কোনও অপরাধ করিনি।

-তাহলে সেদিন শিয়ালদার নেতাজি ইন্সটিটিউট থেকে লুকিয়ে বেরোলে কেন?

-মানে?

প্রিয়াংশুর মুখ চুন।

-যেদিন দিয়া খুন হয় সেদিন আপনি শিয়ালদার নেতাজি ইন্সটিটিউতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেরিয়েছেন কখন কেউ জানে না। কোথা দিয়ে পালালেন প্রিয়াংশুবাবু?

-মোটেও পালাইনি। পালাব কেন?

-তাহলে সবার সঙ্গে সামনের দরজা দিয়ে না বেরিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোলেন কেন? লোকে তো বৃষ্টি হলে জল কাদা এড়িয়ে চলে। কিন্তু আপনি পিছনের মাঠ দিয়ে জল কাদা মাড়িয়ে বেরোলেন? কেন?

-কে…কে বলল এসব?

-আবার প্রশ্ন করছেন? বলেছি না শুধু উত্তর দেবেন।

ধমকে উঠল স্বয়ম্ভু।

-ওটা শর্ট কাট । নইলে রাস্তা দিয়ে বাসরাস্তায় আসতে গেলে ঘুরতে হত। -বাহ! ভালো যুক্তি। তা সেদিন রাতে কখন বাড়ি ফিরলেন?

-সাড়ে এগারোটা বেজে গিয়েছিল। কিচ্ছু পাচ্ছিলাম না ।

-আপনি আসতে পারেন।

প্রিয়াংশু আশা করেছিল আরও অনেক প্রশ্ন করবে। কিন্তু তা না করে হঠাৎ করে ‘আসতে পারেন’ বলে দেওয়াতে বেশ অবাক হয়ে যায়। প্রিয়াংশু চলে যেতে স্বয়ম্ভু বলল, ‘শিবাঙ্গী, প্রদ্যুৎকে গিয়ে বলো আজ রাতে লুকোচুরি খেলতে হতে পারে।’

-ওকে স্যার।

শিবাঙ্গী চলে যেতে একা ঘরে ভাবনায় ডুবে গেল স্বয়ম্ভু। মাথার ওপর পাখাটা ঘুরে চলেছে। দুপুরে ঘণ্টা দেড়েক ঝেড়ে বৃষ্টি হওয়ায় বাইরের আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে আছে। তাই পাখাটা কমানো। ব্লেডগুলো দেখা যাচ্ছে। একেকটা ব্লেড স্বয়ম্ভুর ভাবনাগুলোকে কেটে কেটে কুচি কুচি করে ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্বয়ম্ভুর মনের মধ্যে এক পাগল বাউল গান ধরেছে, ‘তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলেম আর পেলেম না ।

-স্যার আসব?

ভাবনার দুনিয়া থেকে সোজা লালবাজারের ঘরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এসো অভিনব।’ গাড়ির সব ইনফরমেশন ধরিয়ে দিল স্বয়ম্ভুর হাতে। অভিনব তার মনের খটকার কথা জানাল, ‘স্যার, গত পরশুদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় দয়াময় সান্যালের নামে একটা গাড়ি বুক হয়। তার ডিটেলসটা একবার দেখুন।’

-এতগুলো লোকের মধ্যে হঠাৎ একেই বাছলে কেন?

-দুটো জায়গায় খটকা লাগছে। এক সময়টা মিলে যাচ্ছে। আর দুই, লোকটা লাটাগুড়ির।

জায়গার নামটা শুনেই মেরুদণ্ড সোজা করে বসল স্বয়স্তু । নিজেই বিড়বিড় করল, ‘লাটাগুড়ি!’ ঝটপট সবকটা পাতা ফেলে দিয়ে আগে দয়াময়ের আইডি কার্ডের জেরক্স কপিটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল স্বয়ম্ভু। বলল, ‘সবাই আধার কার্ড দিয়েছে। একমাত্র এরই ভোটার আই কার্ড।’ টেবিলে রাখা টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিল। একটা নম্বর টিপে কানে ধরে রইল। ‘প্রদ্যুৎ স্বয়ম্ভু।… হ্যাঁ ওটা তো করবেই। শিবাঙ্গীকে এক্ষুনি পাঠাও তো।’

শিবাঙ্গী প্রায় দ্রুত পায়ে এসে হাজির। দয়াময়ের আইডির জেরক্স কপিটা স্বয়স্তু এগিয়ে দিল, ‘এক্ষুনি এই ডিটেলস পাঠাও লাটাগুড়ি পুলিশ স্টেশনে। অ্যাসাপ খবর চাই।’

-ওকে স্যার।

শিবাঙ্গী কাগজটা নিয়ে বেরিয়ে যেতেই নিজের মনে মুচকি হাসল স্বয়ম্ভু। বিড়বিড় করল, ‘ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখোনি।’

আবারও মনের মধ্যে জড়ো হয়ে ছড়িয়ে থাকা খেলনার ভাঙা টুকরোগুলোকে এক এক করে জুড়তে শুরু করেছিল স্বয়ম্ভু। কিন্তু ঠিক তখনই ফোনটা এল।

-হ্যাঁ শুভায়ু বলো।… হোয়াট?

রাখো টেবিলের ওপর বসে ছিল স্বয়ম্ভু। এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে বলে উঠল, “কী বলছ কী? কখন?… তুমি কী করছিলে?… আসছি।’ অভিনব ঘরেই ছিল। কৌতূহলে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে স্যার?” -শিবাঙ্গীকে ডাকো। এক্ষুনি বেরোতে হবে। সুস্মিতা খুন হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *