১১
গেটকিপারের বয়ান অনুযায়ী সারা দিনে মাত্র একজনই সুস্মিতাদের ফ্ল্যাটে গেছে। সে ডেলিভারি বয়ই ছিল। তাকে দেখার জন্যই হামলে পড়ে সবাই সিসিটিভি ফুটেজ চেক করছে। মিনিট পাঁচেক এপাশ ওপাশ ফুটেজ দেখার পর গেটকিপারটাই চিনিয়ে দিল লোকটাকে। প্রিয়াংশুও বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই তো সে।’ স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী দুজনের চোখেই অপার বিস্ময় দুজনেই একে অপরের দিকে চেয়ে কিছু নীরব কথা চালাচালি করে নিল। স্বয়ম্ভু বুঝল শিবাঙ্গীর চোখের ভাষা আর শিবাঙ্গী বুঝল স্বয়ম্ভুর চাউনি। মুখে নীল মাস্ক। তার আড়াল থেকে চাপা দাড়ির উঁকিঝুঁকি। গায়ে নীল রঙের শার্ট। ফুটেজে টাইম দেখাচ্ছে সকাল ন’টা বারোতে ছেলেটি ঢুকেছে। লিফটের জন্য অপেক্ষা করেছে। ছ’তলায় উঠেছে। বেল বাজিয়েছে। দরজা খোলার জন্য ওয়েট করেছে। তারপর পার্সেল ডেলিভারি করে লিফটে করে নেমে বেরিয়ে গেছে ন’টা উনিশের মধ্যে
-আমরা ক’টায় কচুরি খাচ্ছিলাম শিবাঙ্গী?
-দশটা-সোয়া দশটা ।
-চেতলা থেকে ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক। মাঝে ট্রাফিক, জ্যাম এসব ঠেলেঠুলে….। মনে মনে ছকটা কষে নিল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘সময়টা মিলে যাচ্ছে স্যার।’
গাড়ির বনেটের ওপর দমাস করে একটা ঘুষি মারল স্বয়ম্ভু। ‘বড্ড ভুল হয়ে গেছে শিবাঙ্গী। দুর্দান্ত কচুরিটা আমাদের হাত থেকে দারুণ একটা সুযোগ কেড়ে নিল।’
-কিন্তু স্যার, নকল দাড়ি তো যে কেউ লাগাতে পারে। কত লোক তো পরচুলা পরে বেরোয়। তাতে তো কাউকে ধরা সম্ভব নয়।
স্বয়ম্ভু চোখগুলো ছোট করে শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে বলল, ‘বাইকের নম্বরটা তো নিতে পারতাম।’ শিবাঙ্গীর মাথায় এটা সত্যিই আসেনি। তবে পরক্ষণেই আরেকটা দিক খুলে যায় শিবাঙ্গীর চোখের সামনে, ‘স্যার, তাহলে কি খুনি মেয়ে নয়? ছেলে?’
-একটা ছেলে একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করল। তারপর তার হাত-পা বাঁধল। কিন্তু শরীরের কোনও অংশ ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখল না। কী করল? না একটা স্টিলেটো পরে মেয়েটার শরীরের ওপর তাতা থৈথৈ করে নেত্য করল যাতে সে মরে যায়। এত কষ্ট কেন করবে?
-হয়তো তার মেন্টাল কোনও প্রবলেম আছে!
-কার? এমন কেউ যে অবশ্যই অরুণা, সুস্মিতাকে চেনে। এদিকে সুস্মিতা তো এমন কারও কথা বলতেই পারল না।
-কিন্তু তৰ্পণা যে সুস্মিতাকে চেনে, ওর দোকান থেকে শাড়ি কেনে সেটা জানলেন কী করে?
-সুস্মিতার বুটিকের ওয়েবসাইটে আর সোশ্যাল মিডিয়ার পেজে যাও দেখতে পাবে। প্রতিটা কাস্টমার ওদের শাড়ি পরে ছবি পাঠালে সেটা বুটিকের পেজে পোস্ট হয়।
এই জন্যেই স্বয়ম্ভু সেন এত কম বয়সে এত বড় পদে বসে আছেন। অন্য কারও মাথায় যা আসে না ওনার মাথায় সেটা বিদ্যুতের চেয়েও তীব্র গতিতে খেলে যায়। মনে মনে গর্ব হল শিবাঙ্গীর। ভাব জগত থেকে বেরিয়ে শিবাঙ্গী বলল, ‘আমাদের ইমিডিয়েটলি বাকি বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে স্যার।’
-আমাদের ইমিডিয়েটলি আরও অনেক কিছু করতে হবে শিবাঙ্গী। সিসিটিভি চেক, এই ছেলেটিকে ট্র্যাক করা, তর্পণার ওপর সুস্মিতার কেন এত রাগ? এরপরের ভিক্টিম কি সুস্মিতা? সেটা বের করা। আমার মাসির সঙ্গে এই অবস্থার মধ্যেও কথা বলা, যদি অরুণা তাকে কিছুও বলে থাকে। তার থেকেও আরও একটা বড় প্রশ্ন, এমন খুন কোথায় করেছে খুনি? আরও অনেক অনেক, অনেক কিছু। আপাতত গাড়িতে ওঠ। বাড়ি চলো। মাথাটা জাস্ট আর কাজ করছে না।
কথাগুলো বলতে বলতেই গাড়িতে উঠে বসল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীও উঠে পাশের সিটে বসল। গাড়ি ছাড়ল। রাতের অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু স্ট্রিট লাইটের আলোর সঙ্গে এক ঝাঁক রহস্য মাথায় নিয়ে সবেগে হারিয়ে গেল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী।
শ্রাবণেও রোদ ঝলমল করে। কিন্তু সে রোদে চেপে রাখা কান্নার একটা ভ্যাপসা আমেজ থাকে। যেটা বুকের ওপর চেপে বসে থাকে। নিশ্বাস নিতে দেয় না। উজ্জ্বল একটা দিনের দিকে চেয়েও মনে হয় কেন এমন দিন এল? আজকের দিনটা তো এমন নাও হতে পারত। যদি আগের কিছু ভুল, কিছু অন্যায়, কিছু অবুঝপনা সচেতনভাবে এড়িয়ে যেত তাহলে তো আজকের রোদ্দুরের মানেটাই পালটে যেত। এত বছর বেঁচে থাকার পর মনে হত না কেন বেঁচে আছি! বসার ঘরের তক্তপোশের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে এমনই আরও কত কী আকাশ পাতাল ভেবে চলেছেন সুমিত্রা দেবী। পাশের সোফায় বসে পুলকেশ কীসব লিখে চলেছেন। সুচিত্রা দুটো বাটিতে দুধ চিঁড়ে মেখে এনেছে কলা দিয়ে। ‘সুমি আর বেলা করিস না। খেয়ে নে। পুলকেশ তুমিও খাও।’ সুমিত্রা দেবীর কোনও বিকার নেই। পুলকেশ মুখ তুলে একবার বাটির দিকে তাকাল। তারপর বড় করে শ্বাস ছাড়লেন। বারান্দায় গেট খোলার শব্দ হল। পুলকেশ মুখ বাড়ালেন। জুতো খুলে সরাসরি ঘরে ঢুকে এল স্বয়ম্ভু। পুলকেশ বললেন, ‘আয় বোস।’ সুচিত্রার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় মাসির অবস্থা জানতে চাইল। সুচিত্রা বিষন্ন মুখে শুধু দুপাশে ঘাড় নাড়ল। স্বয়স্তু নিজে থেকেই তার মেজ মাসির পাশে এসে বসল। জল ভরা চোখ তুলে তাকালেন সুমিত্রা। মুহূর্তের মধ্যে ঝরঝর করে কেঁদে স্বয়ম্ভুর বুকের ওপর মাথা রাখলেন। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘এ কী হল ভোলা? এ কী হয়ে গেল!’ ভোলা জড়িয়ে ধরল। কী বলবে বুঝে পেল না।
-বিয়ের আগে কতবার বারণ করেছিলাম। কত বাধা দিয়েছিলাম ওকে। কিচ্ছু শোনেনি। পালিয়ে গেল। আর এখন দ্যাখ, চিরকালের মতো পালিয়ে গেল মেয়েটা ।
-মাসি, মাসি এভাবে কেঁদো না। শরীর খারাপ করবে।
-আর বাঁচতে চাই না ভোলা। আর বাঁচতে চাই না।
-এসব বললে হবে নাকি। মেসোকে কে দেখবে?
-জানি না। কিচ্ছু জানি না। ওই ছেলেটাকে তুই ছাড়িস না ভোলা। আমি বলছি, ওই মেরেছে আমার মেয়েটাকে?
ওই ছেলে বলতে মেজ মাসি যে কাকে বোঝাচ্ছে সে ভালোই বুঝল স্বয়ম্ভু। ‘আমি সবটা দেখছি মেজ মাসি। তমাল অপরাধী হলে নিশ্চয়ই সাজা পাবে। কিন্তু সেটা যতক্ষণ না প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ তো আর ওকে ধরতে পারি না।’ সুমিত্রা প্রায় চোখ পাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘কী বলছিস ভোলা? একটা মেয়ের সঙ্গে তমালের মেলামেশা আছে। সেই জন্যেই তো আমার মেয়েটা মরল।’
-মেজ মাসি, অরুণা আত্মহত্যা তো করেনি। কোনও চিঠিও লিখে যায়নি। এমনকী কোনও ডায়রিও লিখত না। ওকে কেউ মেরেছে।
-ওই ছেলেটাই তো, ওই শয়তান তমালই মেরেছে পথের কাঁটা পরিষ্কার করবে বলে। কতবার অরুণাকে বলেছে যে মেরে পুঁতে রেখে দেবে।
-কী? কে বলেছে অরুণা?
স্বয়ম্ভু চমকে উঠল। সুমিত্রা বললেন, ‘ওদের যখনই ঝগড়া হত তখন মাঝেমাঝেই বলত। অরুণা একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেই ফেলল ।’
-কী বলল?
-বলল মা, একদিন যে লোকটা আমায় বলেছিল আমায় ছাড়া নাকি বাঁচতেই পারবে না, আজ সেই মানুষটাই বলছে মেরে পুঁতে দেব। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, তাও বলেছিলাম, অমন তো কত কথাই রাগের মাথায় বলে লোকে। সব কী আর ধরতে আছে? তখন তো বুঝিনি বাবা, আজকের দিনটাও আমাদের দেখতে হবে!
-আর কী বলেছে অরুণা? আচ্ছা, মেজ মাসি, একটা কথা বল এই অশান্তি শুরু হল কবে থেকে?
সুমিত্রা চোখের জল মুছে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘বছর দুই আগে একবার জামাইষষ্ঠীতে যখন তমালকে বলব বলে ফোন করেছি তখনই অশান্তির আঁচ পাই। তমাল ফোন তোলে না। অরুণাও কিছু বলতে চায় না। শুধু বলে আমরা এবারে আর যেতে পারব না। এরপরে আরও বেশ কয়েকবার আমি মেয়েকে ফোন করেছি কিন্তু গলা শুনে আমার কেমন যেন মনে হয়েছে। একদিন না জানিয়ে চলেই গেলাম মেয়ের কাছে। সেদিনই অরুণা সব বলল। তমাল নাকি তর্পণা নামের কোন এক মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বাড়িতে অশান্তি করছে। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁরে অরুণা তোরা বাচ্চা নিচ্ছিস না কেন? একটা বাচ্চাকাচ্চা থাকলে তো সংসারটাও সুন্দর হয়। সেই থেকে ওর মাথায় বাচ্চা নেওয়ার শখ চাপল। কতকটা জেদ চেপে গেল জানিস। এর আগে অরুণাই চায়নি এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিতে। কিন্তু যখন দেখল ঘরের মানুষটাই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন একটা বাচ্চার জন্য মেয়েটা ক্ষেপে উঠল। যদি তমালকে ধরে রাখতে পারে, এই আশায়!
-ক্ষেপে উঠল মানে?
-এক বছর চেষ্টার পরেও ওদের বাচ্চা হচ্ছিল না। ও নিজে ডাক্তারের খোঁজ নিয়ে ছুটে গেল। চিকিৎসা শুরু করল। ওদিকে তমাল কিছুতেই ডাক্তারের কাছে যাবে না। বললেই অরুণাকে আজেবাজে কথা বলত। শেষমেশ ও হাল ছেড়ে দিচ্ছিল।
-কিন্তু তমাল তো বলল, তমাল নাকি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। অরুণা যায়নি। কীসব নাকি জ্যোতিষ-ফোতিষ দেখাত ।
-হ্যাঁ, একজন পুরুতের কথা ও বলেছিল। কিন্তু ও তো ডাক্তারের কাছে নিজে গিয়েছিল। তমাল নাকি গায়েও হাত তুলতে শুরু করেছিল।
-গায়ে হাত তুলত? এটা কি অরুণা বলেছিল না আপনারা দেখেছিলেন কখনও?
সরু করে আঁকা ভুরু দুটো তুলে প্রশ্নটা করল শিবাঙ্গী। উল্টোদিকে বসে থাকা তমালের প্রতিবেশীনী বউটি বলল, ‘না না দেখিনি। তবে শুনেছি।’
-কী শুনেছেন?
-অরুণা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করত। বলত, এত বড় সাহস তুমি আমার গায়ে হাত তোলো। আমি সারা পাড়ার লোককে ডেকে বলব তুমি কতটা ছোটলোক।
পাশেই অফিসে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বসেছিলেন মহিলাটির স্বামী। এবার তিনি বলে উঠলেন, ‘একদিন বোধহয় অরুণা পুলিশের কাছে যাবার জন্য বেরোচ্ছিল। তমাল দেখলাম জোর করে টানতে টানতে ঘরে ঢুকিয়ে দিল।’ শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘আপনারা কোনওদিন কোনও মেয়েকে আসতে দেখেছেন?’ বউটি বলল, ‘না।’
-মেরে ফেলব বা খুন করে দেব এরকম কোনও কথা কি শুনেছেন কখনও?
এবার স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অস্বস্তিতে পড়ল। একই ঘরে বসে নিজের মনে সাদা পাতায় রং পেন্সিল বোলাচ্ছিল বাড়ির বাচ্চাটি। সাড়ে পাঁচের বেশি হবে না। ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়েই গম্ভীর হয়ে বাচ্চাটিকে বলে উঠল, ‘পাপান তোমায় বললাম না পাশের ঘরে গিয়ে আঁকতে? যাও।’ শিবাঙ্গী বেশ লজ্জায় পড়ল। ‘উপস সরি সরি। খেয়াল ছিল না আমার।’ বাচ্চাটি গলা তুলে বলল, ‘ও ঘরে তো মাম্মাম পুজো করছে। আমি গেলেই রাগ করে।’
-কেউ রাগ করবে না। যাও। আমি মাম্মামকে বলে দেব।
বাচ্চাটি ব্যাজার মুখে তার জিনিসপত্র গোটাতে শুরু করল। লোকটি বলল, ‘দেখুন ম্যাডাম, আমাকে এবার বেরোতে হবে। এর বেশি সত্যিই আমরা কিছু জানি না। আর এসবের মধ্যে জড়াতেও চাই না। বুঝতেই পারছেন, বাচ্চা নিয়ে থাকি।’ শিবাঙ্গীর শেষ প্রশ্নের উত্তরটার বড় দরকার ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়েছে দেখে হাত জোড় করে উঠেই যাচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধল বাচ্চাটি। দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়েও ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘আমি জানি।’ ঘরের মধ্যে সবাই হতবাক। ‘তুমি আবার কী জানো পাপান? নির্ঘাত গল্প বানাবে এবার। যাও ও ঘরে যাও।’
-না গল্প নয়। সত্যি।
কারুর কথা কানে না তুলেই শিবাঙ্গী এগিয়ে গেল বাচ্চাটির দিকে। শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী জানো সোনা?’
-ওই কাকুটা খুব খারাপ।
-কোন কাকুটা?
শিবাঙ্গী প্রশ্ন করতেই বাচ্চাটির মা তড়পে উঠল। ‘আহ! পাপান। কেন আজেবাজে কথা বলছ?’ উলটে শিবাঙ্গী এবার গরম নিল, ‘প্লিজ ম্যাডাম, পুলিশের কাজে বাধা দেবেন না।’ স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যোমকে গেল। ভীষণ নরম সুরে শিবাঙ্গী আবারও প্রশ্নটা করল পাপানকে, ‘কোন কাকুটা খারাপ পাপান?’
-পাশের বাড়ির কাকু ।
-কেন? কী করেছে সে?
-সেদিন কাকিমাকে বলছিল, তোমায় মেরে কুচি কুচি করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেব। দেখব, কোন শালা বাঁচায়!
-ইসসস।
পাপানের মা ভুরু কুঁচকে সারা মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে তুলল। পাপানের বাবা এবার এগিয়ে এসে পাল্টা গরম নিয়ে বলল, ‘অনেক হয়েছে ম্যাডাম। এবার রেহাই দিন। একে তো পাড়াটা নরক হয়ে গেছে। তার ওপর আপনাদের উল্টোপাল্টা প্রশ্নের জন্য বাচ্চাগুলোও…!’ শিবাঙ্গী হাত জোড় করে বলল, ‘বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। আর আমাদের উপকার করার জন্য ধন্যবাদ। এরপর আরেকদিন আসব। পাপানকে একটা ক্যাডবেরি দিয়ে যাব। ওটা ওর প্রাপ্য। চলি।’ শিবাঙ্গী গটগট করে বেরিয়ে গেল। শার্ট-প্যান্ট পরা মেয়েপুলিশটার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে রইল পাপান।
একটা কোনও ব্লু পাবেই এবার, সেই আশাতেই অধির আগ্রহে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল স্বয়ম্ভু। পাশে শিবাঙ্গী। চোখ থেকে চশমাটা কপালের ওপর তুলে রিসিপ্টটা ভালো করে দেখে দুপাশে ঘাড় নাড়লেন লোকটা। ‘না স্যার, এটা আমাদের এখান থেকে ডেলিভারি হয়নি।’
-এটা আপনাদের রিসিপ্ট নয়?
স্বয়ম্ভূ জিজ্ঞেস করল।
-লোগোটা আমাদেরই। কিন্তু এটা নকল ।
-কী করে বুঝলেন?
-সাইন ছাড়া কোনও কিছু আমাদের হাতে লেখা থাকে না। এখানে দেখুন, কী ডেলিভারি হচ্ছে সেটা হাতে লেখা। তাও আবার শুধু গিফট ।
স্বয়ম্ভু ডেলিভারি রিসিপ্টটা আবারও নিজে হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল। ইংলিশে লেখা গিফট শব্দটা। তাও জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি শিওর? কোনওভাবে এটাই হয়তো হাতে লেখা হয়েছে।’
-আমাদের এখান থেকে তিন-চারবার চেক হয়ে তবেই মাল ডেলিভারির জন্য বেরোয় স্যার।
-হুম। চেতলার সাউথ এন্ড হাইটসে কিছু ডেলিভারিও হয়নি কাল?
ম্যানেজার একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘দুমিনিট স্যার।’ ইন্টারকমের রিসিভারটা তুলে ইশিতা নামের কাউকে বললেন গতকালকের ডেলিভারি লিস্টটা দেবার জন্য। রিসিভার রেখে বললেন, ‘গতকাল আমাদের যা যা ডেলিভারি হয়েছে তার অর্ডার নাম্বার, টাইম, প্লেস এবং ডেলিভারি কে করেছে সব প্রিন্ট আউট আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি।’
-থ্যাংক ইউ। আরেকটা উপকার করুন…
-বলুন না স্যার।
-আপনাদের যে কজন ডেলিভারি বয় আছে সবার ছবি আমায় দেখান। রেকর্ড আছে নিশ্চয়ই?
-একদম স্যার। আমি এখুনি দেখিয়ে দিচ্ছি।
ম্যানেজার নিজেই ল্যাপটপ থেকে প্রত্যেকটা লোকের ছবি, নাম বের করে দেখিয়ে দিলেন। শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভূ দুজনেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তবে সেটা দেখে খুব একটা উপকার কিছু হল না। কারণ কচুরি খেতে যে গিয়েছিল তার দাড়ি ছিল নকল। মুখের মধ্যে এমন কোনও বিশেষত্ব ছিল না যা নজরে পড়ার মতো। তাও শিবাঙ্গী বলল, ‘এদের একবার সামনে দেখা গেলে ভালো হত না স্যার?’ স্বয়ম্ভু বলল, “লাভ নেই। নিজের অর্গানাইজেশনের নকল রিসিপ্ট কেউ বানাবে না। বানালে কোথায় হাতে লেখা হয়, কোথায় টাইপ করা হয় সেটা সে জানবে। এত বড় ভুল করবে না। তাছাড়া সিসিটিভিতে মুখ তো খুব ভালো করে ধরা কিছু পড়েনি। যা দেখার আমরা নিজের চোখে দেখেছি। সেক্ষেত্রে প্রমাণও নেই।’
-স্যার আসব?
-হ্যাঁ হ্যাঁ এসো ।
পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটি চুড়িদার পরা মেয়ে ঢুকে আসে ঘরে। খোলা চুলে স্টেপ কাট। গলায় আইডি কার্ড। এই সম্ভবত ইশিতা। হাতে ধরা কয়েকটা প্রিন্ট আউট ম্যানেজারকে দিয়ে বেরিয়ে গেল। এইটুকু সময়ের মধ্যেই মেয়েটিকে আপাদমস্তক মেপে নিল স্বয়স্তু। ম্যানেজার নিজে ভালো করে দেখে বলল, ‘না স্যার, কাল কোনও ডেলিভারি হয়নি।’ স্বয়ম্ভুকে কাগজগুলো দেওয়ামাত্রই সে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ। চলি।’ কাগজগুলো একবার রিচেকও করল না। ম্যানেজার প্রতি নমস্কার জানালেন ।
