১০
সারাদিন ভীষণ গুমোট করে ছিল। এখন রাতের দিকে বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। কোথাও বৃষ্টি হয়েছে মনে হয়। ‘কখন আসছ?’ অ্যাপার্টমেন্টের লনে দাঁড়িয়েই প্রিয়াংশুকে ফোন করল সুস্মিতা। ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এল, ‘সবে বেরোলাম । ‘
-মানে আজকেও রাত।
-সকালে বললাম তো বস এসেছে।
-কখন?
-দুপুরে। অবশ্য তখন তো মাথায় আগুন জ্বলছে তোমার। শুনতে পাওনি তাই ।
-আজ আমার মাথায় জ্বলেছে। দুদিন বাদে ঘরে জ্বলবে। যখন ওই মহিলা পুলিশের কাছে গিয়ে সব বলবে।
-সুস প্লিজ, সারাদিন প্রচুর চাপ গেছে। আর নিতে পারছি না। আর হ্যাঁ, এ মাসে অন্তত আর আগুন জ্বলার চান্স নেই।
লনের পাশের ঠাণ্ডা বাতাসটা সুস্মিতার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল। ‘রাখছি। তাড়াতাড়ি এস।’ ফোনটা কেটে বয়ে চলা হাওয়ায় মুখটাকে মেলে ধরল। আকাশের দিকে তাকাল। একটাও তারা নেই। মিশকালো আকাশ। কেবল গগনচুম্বি অট্টালিকার সারি আলোর মালায় সেজে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কীসের আশায়? নাকি লোভে? অট্টালিকার সারা গায়ে মৌচাকের মতো খোপ। সেই খোপে নানা ধরনের মন বাস করে। কোনও খোপে আলো জ্বলছে। আবার কোথাও অন্ধকার। একেকটা খোপে একেকটা গল্প। প্রতিদিন বয়ে চলেছে নিজের মতো করে। মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল সুস্মিতা।
দরজা খুলে বন্ধ ঘরে ঢুকতেই আধো-অন্ধকারে দুটো চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। বুকে হাত রেখে চমকে উঠল সুস্মিতা। তারপরে চোখটা সয়ে আসতে বুঝল তার আদরের পুষি আজ খাবার টেবিলের ওপর উঠে বসে রয়েছে। পটাস করে আলোটা জ্বালিয়ে দিতেই ম্যাও করে ডেকে উঠল বেড়ালটা। নাক টানল। কেমন একটা বাজে গন্ধ বেরোচ্ছে। বন্ধ ছিল বলে কী? দরজাটা খোলাই রাখল। এপাশ ওপাশ চোখ চালাতেই দেখল ডাইনিংয়ের এক কোণে মাছ-ভাত ছড়ানো। সম্পূর্ণটা বাবুর মুখে রোচেনি। ‘কালকেও খাবার নষ্ট করেছিস। আজকেও। দ্যাখ, কাল তোকে খেতেই দেব না।’ কপট রাগে বেড়ালটাকে বকে দিল সুস্মিতা। সে আবার ডাকল ম্যাওওওও। এইবার সুস্মিতার নজরে পড়ল আসল জিনিসটা। সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে ভুলেই গেছে। টেবিলেই পড়ে আছে পার্সেলটা। পুষি তার পাশে গিয়েই ঘন ঘন ডাকছে। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এসে পার্সেলটা হাতে তুলে নিল। ভেবেছিল ভার থাকবে বুঝি। তুলতে গিয়ে বুঝল এক্কেবারেই হালকা একটা বাক্স। উলটে পালটে দেখতে গিয়ে ভিতর থেকে খড়খড় করে কিছু জিনিসের ওলটপালট হবার শব্দ এল। পুষি ভীষণ এক্সাইটেড। বিচ্ছিরি গন্ধটা থেকে থেকেই ঝাপটা মারছে। কী আছে বাক্সতে সেটা দেখে খাবারের জায়গাটা পরিস্কার করবে।
খুলে ফেলল র্যাপার। একটা সাদা বাক্স বেরিয়ে এল। কোথাও কিছু লেখা নেই। একটু অবাকই হল সুস্মিতা। বাইরে লিফট খোলার শব্দ হল। পাশের ফ্ল্যাটের বউটা অফিস থেকে ফিরল। হিল খটখটিয়ে সবে নিজের ঘরের দিকে এগোতে যাবে অমনি গলা চিরে কে যেন আর্ত চিৎকার করে উঠল এক ঝটকায় পিছন ফিরে তাকাল পাশের ফ্ল্যাটের মহিলাটি। সুস্মিতাদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলা দেখে দৌড়ে গেল। 1
স্বয়ম্ভু সেনের কাছে সবেমাত্র পৌঁছেছে সিসিটিভির ফুটেজ। শিবাঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে সেগুলো দেখার জন্য নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে যেখানে সব ফুটেজ বড় স্ক্রিনে দেখা যাবে সেই রুমের দিকে এগোচ্ছিল স্বয়ম্ভু। মাঝপথে ফোনটা এল। দ্রুতপায়ে হাঁটতে থাকা স্বয়ম্ভু থমকে গেল। ফোনে কাকে যেন বলল, ‘আমরা এখুনি আসছি।’ ফোনটা রেখেই শিবাঙ্গীকে বলল, ‘চলো আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে।’ বলেই হাঁক দিল, ‘তপওওওওন, গাড়ি বের কর।’
-চেতলা। সাউথ এন্ড হাইটস।
-কেন স্যার?
শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল।
-খুনি আমাদের নিমন্ত্রণ করেছে।
তপনও বুঝল ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস। ঝটিতি ছুটল গাড়ির দিকে।
ভয়ে থরথর করে কাঁপছে সুস্মিতা। নিজের বিছানায় কুঁকড়ে বসে আছে। পাশে বসে প্রিয়াংশু সুস্মিতার মাথায় হাত বোলাচ্ছে। স্থানীয় থানার পুলিশ ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকে এদিক ওদিক দেখছে। চিৎকার শুনে যে বউটা ছুটে এসেছিল সেও ঘরের চেয়ারে বসে। ওদিকে লিফট থেকে বেরিয়ে সোজা ফ্ল্যাটে ঢুকে এল স্বয়ম্ভু ও শিবাঙ্গী। ঘরের মধ্যে তখনও ফ্ল্যাশের আলো ঝলসে উঠছে। ‘এ কী এত ভিড় কেন? হালকা করুন প্লিজ।’ ঢুকতে ঢুকতে হুকুম ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভু। ঘরে ঢুকতেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন, ‘আসুন স্যার, আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম।’
-শশাঙ্ক মুখার্জি?
নামটা উচ্চারণ করেই চোখ চালিয়ে দিল পুলিশ অফিসারের বুকে জ্বলজ্বল করছে নাম। ‘আপনাকে খবর দিল কে?’
-পাশের ফ্ল্যাটের এক মহিলা। সুস্মিতা দেবীর চিৎকার শুনে উনিই ছুটে আসেন।
স্বয়ম্ভু মাটির দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায়। একটা সাদা বাক্স ঢাকনা খুলে মাটিতে পড়ে আছে। এক মহিলার পায়ের তিনটে আঙুল পাশে ছড়িয়ে আছে। আর একটা আঙুল এখনও বাক্সের মধ্যে। নাকের কাছে আঙুল ঘষে মুখটা ব্যাজার করল স্বয়ম্ভু।
-এটা তো বাঁ পায়ের। তার মানে ডান পা-টাই….
শিবাঙ্গীর কথায় স্বয়ম্ভু ঘাড় নাড়ল।
-নমস্কার। আমি স্বয়ম্ভু সেন। গোয়েন্দা লালবাজার।
শিবাঙ্গীও নিজের পরিচয় দিল। এতক্ষণ মুখ গুঁজে বসেছিল সুস্মিতা। এবার চোখ তুলে তাকায়। প্রিয়াংশুর মুখটা পাংশু বর্ণ। ‘বসুন প্লিজ।’ প্রিয়াংশুকে ‘ইটস ওকে’ বলতে গিয়েই একটু থমকালো স্বয়ম্ভু। ঘরের হলদে আলোয় প্রিয়াংশুর মুখটা আরও একটু ভালো করে দেখার জন্য এগিয়ে গেল সে। পরিচয় জিজ্ঞেস করতে নাম বলল প্রিয়াংশু বড়াল।
-সুস্মিতা দেবীর হাজব্যান্ড?
প্রতিবেশীর দিকে একবার তাকিয়ে প্রিয়াংশু বলল, ‘না আমরা বিয়ে করিনি।’
-অ ৷ লিভ ইন?
-হুম ।
-কত বছর?
-তিন
-আচ্ছা। আপনাকে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে মিস্টার প্রিয়াংশু।
গোয়েন্দা প্রিয়াংশুকে চেনে শুনে পাশের ফ্ল্যাটের মহিলাটি অবাক হয়ে তাকাল। সুস্মিতাও বিস্ময় নিয়ে সকলের মুখ দেখে নিল। চোখের কাজল গলে গালে লেপে গেছে।
-যাক গে, একই দেখতে তো কত লোকই থাকে, তাই না?
কেউ উত্তর খুঁজে পেল না। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা সুস্মিতা দেবী, এই পার্সেলটা আপনার কাছে কখন আসে?’ উত্তরটা প্রিয়াংশু দেয়। যা যা ঘটেছে সবটাই বলে। পাশের ফ্ল্যাটের মহিলাটি বলেন, ‘স্যার, আমার খুব ভয় করছে।’
-কেন আপনার ভয়ের কী হল? আপনার ফ্ল্যাটে তো আর…
বলতে বলতেই কী একটা ভেবে বলল স্বয়স্তু, ‘ও, আপনি জড়িয়ে পড়লেন সেটা ভাবছেন?’
-আসলে একা থাকি তো। আমার হাজব্যান্ড নিউ জার্সিতে থাকে। পাশের ফ্ল্যাটেই এমন একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড!
-অরুণা বলে কাউকে চেনেন আপনি?
-অরুণা?
নামটা বিড়বিড় করলেন মহিলাটি। সুস্মিতা আর প্রিয়াংশু একবার দৃষ্টি বিনিময় করে নিল। ঢোঁক গিলল। মহিলাটি বলল, ‘না না, এ নামের কাউকে চিনি না ।’
-তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার কোনও ক্ষতি হবে না। বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটা?
-কমলিনী। কমলিনী ব্যানার্জি।
-বাহ! চমৎকার নাম। আচ্ছা, আপনার কোনও ডাকনাম আছে?
মহিলাটি এবার ভড়কে ভ। শিবাঙ্গীর ভুরুটাও কুঁচকে আসে। কমলিনী বলেন, ‘হ্যাঁ মানে সে তো অনেকগুলো।’ স্বয়ম্ভু সটান মহিলাটির দিকে ঘুরে গেল, ‘তাই নাকি! কীরকম?” স্যার এটা কী করছেন? কেনই বা জিজ্ঞেস করছেন? কিছু কি সন্দেহ করছেন? পুরো বিষয়টি শিবাঙ্গীর মাথার দশ হাত ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সুস্মিতা আর প্রিয়াংশুও কিচ্ছু বুঝছে না এই গোয়েন্দা ঠিক কী করতে চাইছেন! কমলিনী বলেন, ‘মা ডাকত কমল বলে। বাবা আমায় রাগিয়ে দেবার জন্য কোমলি বলে। হাজব্যান্ড ডাকে….’ একটু থামলেন। ভীত মুখে লজ্জা ফুটিয়ে বললেন, ‘ক্যামেলিয়া।’ এক গাল হেসে স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘একটা মানুষের এতগুলো সুন্দর ডাকনাম? আপনি ভাগ্যবান। মায়ের কী হয়েছিল?”
-ক্যান্স…
বলতে গিয়েও মহিলা হোঁচট খেলেন। ‘আপনি কী করে জানলেন?” আবারও হেসে স্বয়ম্ভু বলল, ‘ওই যে বললেন, কমল বলে ডাকত। বাকিদের ক্ষেত্রে কিন্তু ডাকে শব্দটা বললেন।’ একটা বোকা বোকা হাসি ফুটে উঠল কমলিনীর মুখে। ‘আপনি আসুন। কোনও ভয় নেই আপনার।
-থ্যাংক ইউ। আসি রে সুস্মিতা।
সুস্মিতা ঘাড় নাড়ল। খটখট করে পায়ে শব্দ হতেই স্বয়ম্ভূ কমলিনীর পায়ের দিকে নজর করল। ‘আপনার কত নম্বর জুতো?’ কমলিনী যেতে গিয়েও চমকে উঠল। ‘আমাকে বললেন?’
-হ্যাঁ, কত নম্বর জুতো পরেন আপনি?
-কেন বলুন তো?
-গোয়েন্দা প্রশ্ন করে। আর অন্যরা উত্তর দেয়।
স্বয়ম্ভু হঠাৎই কঠিন। কমলিনী একটু বিরক্ত হয়েই উত্তর দিলেন, ‘সাত নম্বর।’
-থ্যাংক ইউ আসুন।
হাত জোড় করে হেসে বলল স্বয়ম্ভু। কমলিনী চলে যেতেই বিছানায় বসে পড়ে স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী খাটের পাশের চেয়ারটায় বসে। সুস্মিতার দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় স্বয়ম্ভু, ‘আপনি চেনেন তো সুস্মিতা দেবী? সুস্মিতার গলায় স্বর নেই। শুধু অবাক হয়ে চেয়ে রইল। কাকে চেনার কথা বলছে?
-অরুণা ব্যানার্জিকে
স্বয়ম্ভু বলল। চোখের কোল কুঁচকে এল সুস্মিতার। ‘বন্ধু
-কীরকম?
-ভা-ভালো বন্ধুই ছিলাম ।
-ছিলাম?
-এখন তো ও আর নেই ।
-ও মানে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আপনাদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল?
সুস্মিতা প্রিয়াংশুর দিকে তাকাল। স্বয়ম্ভূ ফস করে বলে উঠল, ‘সুস্মিতা দেবী এখন কিন্তু এই মুখ চাওয়াচাওয়ি করার সময় নেই। আশা করি বুঝতে পারছেন?’ চাপা স্বরে সুস্মিতা বলল, ‘অরুণার বিয়ের আগে পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব ছিল। মানে ভালোই ছিল। একসঙ্গে ঘুরতেও গেছি। কিন্তু ওর বিয়ের ছয়মাস আগে থেকে আর আমি কোনও সম্পর্ক রাখিনি অরুণার সঙ্গে। অরুণাও রাখতে চায়নি।’
-কেন?
-বন্ধু হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল অরুণা। আমার কাছ থেকে আমার ভালোবাসাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল।
স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী দুজনেই বিস্মিত হয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে নেয়। স্বয়ম্ভু বলে, ‘এর মানে?’
-তমাল আমার প্রথম প্রেম।
প্রিয়াংশু মুখ ফিরিয়ে নেয় দেয়ালের দিকে। স্বয়ম্ভূ আকাশ থেকে পড়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তমালের সঙ্গে আলাপ হয় কোথায়? কলেজে?’
-না না। ও আমার সঙ্গে কোচিংয়ে পড়ত। একদিন আমরা ঠিক করি ট্রিংকাসে যাব ।
-বারেও যেতেন?
স্বয়ম্ভুর প্রশ্নের সুরে যে এক সমুদ্র বিস্ময় জমেছিল সেটা বুঝল সুস্মিতা। জলে ভারী হয়ে থাকা চোখদুটো দুবার পিটপিট করে বলে, ‘মাঝে মাঝে ওখানেই তমালের সঙ্গে অরুণার আলাপ করিয়ে দিই। সেদিন অরুণা আর তমাল দুজনেই মদ খেয়ে আউট হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকেই খেয়াল করি তমাল আমাকে কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে। অরুণাও আর আগের মতো আমাদের সঙ্গে মিশছে না। ছোটখাট ব্যাপারে তমাল খালি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে শুরু করে। আমি খুব আপসেট হয়ে পড়ি। মৃত্তিকা আমায় প্রথম বলেছিল, ওরা প্রেম করছে।’
-মৃত্তিকা কে?
শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে।
-আমাদের চারবন্ধুর একটা গ্রুপ ছিল। আমি, অরুণা, দিয়া আর মৃত্তিকা ।
-আপনার তো বুটিক?
-হ্যাঁ।
-দিয়ার ক্যাফে আছে দেশপ্রিয় পার্কে। রাইট?
-হ্যাঁ।
-আর মৃত্তিকা?
প্রশ্নগুলো পরপর করে গেল স্বয়ম্ভু। ‘মৃত্তিকা হাউজ ওয়াইফ। ওর হাজব্যান্ডের নাম দীপায়ন। সিটি কলেজের প্রফেসর।’ সুস্মিতা বলল। স্বয়ম্ভু পায়ের ওপর পা তুলে বসল। বলল, ‘তারপর? মৃত্তিকা আপনাকে জানাল যে তমাল আর অরুণা প্রেম করছে।’
-আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু ওদের দুজনকেই একদিন হাতেনাতে ধরে ফেলি। ব্রেক আপ করে দেয় তমাল। অরুণাকে বিয়ে করে। সেই থেকে আমি আর অরুণার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি ।
-তারপর আপনি যখন শুনলেন আপনার বিশ্বাসঘাতিনী বন্ধু সুখেই সংসার করছে তখন তার সংসার ভাঙার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। লেলিয়ে দিলেন তর্পণা মিত্রকে। যে কিনা আপনার বুটিকেই শাড়ি কিনতে আসেন।
-হোয়াট? কী বলছেন আপনি? ওই মেয়েকে আমি… কক্ষনও না ।
শিবাঙ্গীও টলে গেল স্বয়ম্ভুর কথা শুনে। কোথায় তৰ্পণা, কোথায় সুস্মিতা। সুস্মিতা যে তর্পণাকে চেনে সেটাই বা জানল কী করে স্বয়ম্ভু?
-ওই মেয়েকে? মানে আপনি তো খুব ভালো করেই চেনেন তর্পণাকে, তাই তো?
-হ্যাঁ, ওকে চিনব না কেন? শাড়ি কিনতে আসে।
প্রিয়াংশু ক্রমশ গুটিয়ে যাচ্ছে। ঘরে এসি চলছে তাও ঘামছে সে। ‘ঠাণ্ডাটা একটু বাড়িয়ে দিন প্রিয়াংশুবাবু। এখনিই এত ঘামলে পরে ঘামার সময় তো শুকিয়ে যাবেন।’
-মা… মানে?
-অমন তোতলাচ্ছেন কেন? আমি তো সাধারণ কথাই বললাম । আপনার স্ত্রী অবশ্য, থুড়ি থুড়ি, আপনার সঙ্গিনী অবশ্য অসাধারণ প্ল্যান ছকে একটি কাজ করেছেন। বিশ্বাসঘাতিনী বন্ধুকে খুন করে তর্পণার দোকান থেকে ফুলের তোড়া কিনে আমার বাড়িতে পাঠিয়েছেন। সঙ্গে আবার সেই বন্ধুর ডান পা থেকে কাটা চারটে আঙুল ভালো করে গিফট প্যাক করে উপহার দিয়েছেন।
-আপনি কীসব বলছেন স্বয়ম্ভুবাবু?
প্রিয়াংশু গলা চড়াল ৷
-একদম ঠিক বলছি।
সুস্মিতা কী বলবে বুঝতে না পেরে অনেক কিছু বলার জন্য হাঁ করে রইল।
-শুধু তাইই না, উনি ভাবতেও পারেননি মাত্র একটা খুন গোয়েন্দা বিভাগের হাতে পৌঁছে যাবে। যেই দেখেছেন কান টানলেই মাথা চলে আসবে অমনি নিজেকে সেফ সাইডে রাখার জন্য অরুণার বাঁ পায়ের আঙুলগুলো নিজের বাড়িতে ছড়িয়ে এই নাটক। যাতে পুলিশের নজর সুস্মিতার ওপর থেকে ঘুরে অন্যদিকে চলে যায়।
সুস্মিতা চিত্কার করে উঠল, ‘মিথ্যে কথাআআআআ, এ সব মিথ্যে!’
-সব সত্যি সেটা আপনিও জানেন সুস্মিতা।
স্বয়ম্ভু একেবারে সুস্মিতার ঘাড়ে চেপে বসেছে। সে যত বলছে আর সুস্মিতার ছটফটানি তত বাড়ছে। স্থানীয় থানার পুলিশ নির্বিকার হয়ে সব দেখে চলেছেন আর থেকে থেকে চোখ কপালে তুলছেন। ঘরটা বেশ থমথমে হয়েছিল। কিন্তু কোথা থেকে যে স্বয়ম্ভু এমন একখানা ঝড় তুলল সেটা দেখে শিবাঙ্গীও হতবাক। সুস্মিতা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠল, ‘আমি তর্পণাকে লেলিয়ে দিইনি। বিলিভ মি। ওকে আমি সহ্যও করতে পারি না।’
-কাস্টমারকে সহ্য করতে পারেন না?
ঝট করে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু। অমনি প্রিয়াংশু ব্যাপারটা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে সুস্মিতাকে শান্ত করতে চেষ্টা করল, ‘কী পাগলের মতো বলছিস? স্যার, ওর মাথার ঠিক নেই। কী বলতে কী বলছে ও নিজেই জানে না। আমি বলছি ও খুন করেনি। করতে পারে না ।
-পাগলের মতো উনি কী বলছেন? তর্পণাকে যদি উনি লেলিয়ে নাই থাকেন তাহলে কেন সুস্মিতা তাকে সহ্য করতে পারেন না? বলুন বলুন ।
ভীষণ বড় একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে সুস্মিতা। খেয়াল হতেই পরিস্থিতি সামলাতে বলল, ‘বড্ড বেশি ন্যাকা। দোকানে এসে এমন করে যেন আমার কর্মচারীগুলো আমার নয়, ওর। ওই ওদের মাইনে দেয়।’
-এই জন্য সহ্য হয় না?
-হ্যাঁ ।
বেশ জোরের সঙ্গে বলল সুস্মিতা। ‘আমার জায়গায় অন্য কেউ এসে খবরদারি করবে সেটা আমি সহ্য করতে পারি না।’
-আমিও তো সেটাই বলছি। অরুণাও আপনার জায়গা নিয়েছিল। তাই তাকে সহ্য করতে পারলেন না। সরিয়ে দিলেন।
সুস্মিতা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। খোলা চুলে দুহাতের আঙুলগুলো চালিয়ে দিয়ে পলকের জন্য চুপ করে রইল। তারপর বলে উঠল, ‘মারা যাবার দুদিন আগে অরুণা আমায় ফোন করেছিল।’ চাপা মেঘের মতো স্বরে কথাগুলো বাজল স্বয়ম্ভুর কানে। ‘কী?’ কানটা আরও একটু বেশি বাড়িয়ে দিল সুস্মিতার দিকে। ‘হুম’ বলে মাথা তুলল সুস্মিতা। চোখদুটো লাল। নাক টানল দুবার। বলল, ‘দীর্ঘ চার বছর পর ওর ফোন এল।
-কখন করেছিল?
-কত হবে? রাত সাড়ে এগারোটা কী তারও পরে।
-কী বলেছিল?
-ওকে কেউ একজন ফোন করছে কদিন ধরেই।
-কে?
-আননোন নম্বর ।
গিটারে ঝংকার তুলল দিয়া। গলা ছাড়ল, ‘আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে? আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি, পরান বান্ধিবি কেমনে?’ সামনের ছোট্ট টেবিলে সাজানো মদের গ্লাস। পাশেই বসে আছে কিয়ারা। হট প্যান্টের নীচে লম্বা ফর্সা পা-দুটো লম্বা করে ছড়ানো। টপটা কোমর পর্যন্ত নামেনি। নাভির কাছটা দেখা যাচ্ছে। গলায় একটা লম্বা চেন বুক ছুঁয়ে পেটের দিকে নেমে এসেছে। এক হাতে হুইস্কি, আরেক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। দিয়ার গানের তালে মাথা নাড়ছে আর চোখ বুজে সিলিংয়ের দিকে ধোঁয়া ছাড়ছে। গানের মাঝে ফোনটা ঝনঝনিয়ে বেজে উঠল। মাঝপথে থেমে গেল গান। দিয়ারও নেশা হয়েছে। চোখ টেনে দেখার চেষ্টা করল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা। নাহ, কোনও নাম তো নেই। এত রাতে আননোন নম্বর!
-এত রাতে কে রে?
কিয়ারা প্রশ্ন করল। ‘জানি না বাঁড়া। হ্যালো…. হ্যালোওওও!’ ওপারে নীরবতা। ‘কে বলছেন?’ কেউ বলছে না। ‘ধুস শালা’ বলে সবে ফোনটা নামিয়ে রাখতে যাবে অমনি ওপার থেকে ‘ম্যাওওওও’। কান থেকে সরাতে গিয়েও মোবাইলটা কানে ঠেকাল দিয়া। আবারও বেড়ালের ডাক ।
-হ্যালো।
দিয়ার গলায় সন্দেহ। কিন্তু আবারও ‘ম্যাও’ ডাক। নেশাটা কেটে গেল এক ঝটকায়। সুস্মিতার কথাগুলো মাথার মধ্যে নতুন করে ঝংকার দিয়ে উঠল। ‘এই শালা, কে বে তুই?’ বেড়ালটা এবার যেন একটা করুণ আর্তনাদে একটু চিৎকার করেই উঠল। দিয়াও ক্ষেপে গেল। কেঁপে উঠল গলা। তবু ঝাঁঝিয়ে খিস্তি দিয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল, ‘এই শালা খানকির ব্যাটা, বিচিতে দম থাকলে সামনে এসে কথা বল। ফোন করে বেড়ালের মতো ম্যাও ম্যাও করছিস কেন?’ পাশে বসে কিয়ারারও নেশা প্রায় ছুটে যায়। ‘কে ফোন করেছে? দিয়া?’ কিয়ারা হাতের সিগারেটটা অ্যাশ ট্রেতে ঘষে নিভিয়ে দিল। আরও কিছু খিস্তি ছুড়তে গিয়েও চমকে উঠল। এবার বেড়ালের ডাকের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে একটা মেয়ের গলার গান। উল্লাস করে গাইছে, ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দম দমা দম।’ একটু গাইতে না গাইতেই ফোনটা কেটে গেল ৷
– হ্যা… হ্যালো। হ্যালো!
দিয়ার চোখ লাল। বিস্ফারিত। মোবাইল ধরা হাতটা আপনা থেকেই কান থেকে নেমে আসে।
-এই দিয়া, কী হয়েছে? কে ফোন করেছিল?
কিয়ারা জিজ্ঞেস করল। নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে দিয়া বলল, ‘আননোন নম্বর। কেউ কথা বলল না।’
-দেখি ফোনটা দে তো। কোন শালা হারামিপনা করছে…
কিয়ারা কল ব্যাক করতেই যেটা শুনতে পেল, সেটাই দিয়া নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠল, ‘দিস নম্বর ডাজ নট এগজিস্ট। কিয়ারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দিয়ার দিকে তাকাল। দিয়া কী করে জানল যে ফোনটা আর পাওয়া যাবে না?
-বেড়ালের ডাক!
নিজেই কথাটা আওড়াল স্বয়ম্ভু। তারপর একটু চিন্তা করল। বলল, ‘লোকে ফোন করে হুমকি দেয়। কিন্তু এ বেড়ালের ডাক শোনাল?’ সুস্মিতা ঘাড় নাড়ল। শিবাঙ্গী বলল, ‘ম্যাডাম, এটাও কিন্তু আপনার দিকেই যাচ্ছে ঘুরেফিরে। আপনার তো বেড়াল আছে দেখলাম।’
-তো?
-শুধু এটাই নয়, ঢোকার সময় দেখলাম জুতোর র্যাকে একটা হিল তোলা জুতো রাখা যার মাপ আট। ওটা আপনারই তো?
-হ্যাঁ আমার। তাতে কী? আরে আমি তো কিছু বুঝতেই পারছি না আপনারা আমাকে বাঁচাতে এসেছেন না ফাঁসাতে?
ভয় ঝেড়ে সুস্মিতা এবার ক্ষেপে উঠেছে। স্বয়ম্ভূ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘অপরাধীকে ধরতে এসেছি।’
-আমরা কেউ অপরাধী নই শম্ভুবাবু।
চড়াক করে মাথাটা ধরে গেল স্বয়ম্ভুর। সিনিয়রের মুখের ভাব দেখে শিবাঙ্গীই নামবিভ্রাটটা তৎক্ষণাৎ শুধরে দিল ।
স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, ‘প্রিয়াংশুবাবুর সঙ্গে কোথায় আলাপ?’ উত্তরটা যে সুস্মিতার কাছ থেকেই আশা করছে সেটা পরিষ্কার। তবু উত্তরটা প্রিয়াংশুই দিল, ‘আমরা একই কলেজে পড়তাম।’
স্বয়ম্ভু বলল, ‘তার মানে আপনিও এদের গ্রুপটাকে চিনতেন?’
-হুম ।
-আপনার নিশ্চয়ই সুস্মিতাকে আগে থেকেই ভালো লাগত?
-হ্যাঁ। আমি সে কথা জানিয়েও ছিলাম। কিন্তু ও তখন তমালের প্রেমিকা । আমাকে পাত্তাও দেয়নি।
-তার মানে অরুণা আপনার জন্য লক্ষ্মী। আর সুস্মিতার জন্য অলক্ষ্মী। একজনের ভালোবাসা গেল। আরেকজন ভালোবাসা ফিরে পেল। বাবা! পুরো সিনেমা ৷
সুস্মিতা আর প্রিয়াংশু একে অপরের দিকে চায়। স্বয়ম্ভু বলে, ‘এই যে আঙুলগুলো উপহার পেলেন, কার পায়ের নিশ্চয়ই বুঝেছেন?’ সুস্মিতা কেঁদে ফেলল। প্রিয়াংশু বলল, ‘কিছু একটা করুন স্যার। আমাদের প্রচণ্ড ভয় করছে।’
-যে ডেলিভারি করতে এসেছিল তাকে আপনারা দেখেছেন তো?
-প্রিয়াংশু দেখেছে।
সুস্মিতা বলল ৷
-কীরকম দেখতে?
শিবাঙ্গীর ভুরুতে ধনুকের ছিলা।
-চোখে সানগ্লাস আর মুখে মাস্ক ছিল। সেরকমভাবে খুব একটা খেয়াল করিনি। কারণ তখন সুস্মিতার আঙুল কেটে গেছিল। সবে ফাস্ট এড করতে যাব তখনই বেল বাজে। কোনওরকমে পার্সেল নিয়ে সাইন করে দরজা বন্ধ করে দিই।
-তাও চুল, দাড়ি, গোঁফ, গায়ের জামাকাপড় কিছু?
প্রিয়াংশু ভাবনার অতলে ডুব দিল। চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করল। ‘গালে চাপা দাড়ি। গোঁফ আছে কিনা জানি না। গায়ে নীল বা সবুজ শার্ট থাকতে পারে। নাকি খয়েরি… নাহ! মনে পড়ছে না। আপনি সিসিটিভি চেক করতে পারেন তো।’ স্বয়ম্ভুর কপালে ভাঁজটা বাড়ছে। শিবাঙ্গীও কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। ঘরের মধ্যে কিচ্ছুক্ষণের নীরবতা। স্বয়ম্ভু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে, ‘দেখুন সুস্মিতা, অরুণা আপনার কাছ থেকে ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছিল। সেই রাগে আপনি যদি এই নাটকটা সাজিয়ে থাকেন তাহলে নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকেছেন। আর যদি সেটা না করে থাকেন তাহলে আপনাদের বন্ধুদের মধ্যে এমন কি কেউ আছে যে আপনাদের কমন শত্রু?’
চোখে ফুটে ওঠা চমকটা গোপন করল সুস্মিতা । প্রিয়াংশুর চোখ সুস্মিতাকে নিরীক্ষণ করছে। স্বয়ম্ভুর চোখের মণি শকুনের শবদেহ খুঁজে চলার মতো দুজনের ওপর ঘুরে চলেছে। পাশের ঘরে পুষিকে আটকে রেখেছিল। কে যেন দরজা খুলে দিতে সেও এ ঘরে এসে ম্যাও বলে ডেকে উঠল।
